নীপার রঙের তৃষ্ণা

লেখক:

মোবাশ্বির আলম মজুমদার

তোমারও নেই ঘর

আছে ঘরের দিকে যাওয়া।

সমসত্ম সংসার

হাওয়া উঠছে নীল ধুলোয় সবুজ অদ্ভুত;

দিনের অগ্নিদূত

আবার কালো চক্ষে বর্ষার নামে ধার।

– অমিয় চক্রবর্তী

 

মাকসুদা ইকবাল নীপা তাঁর মনোভূমির ভাষা দর্শককে জানিয়েছেন রং আর বুনটের সাহায্যে। রঙের ওপর রঙের প্রলেপে গড়ে ওঠা আসত্মর নির্দিষ্ট ভাষা তৈরি করে। এবারের প্রদর্শনীর কাজে উষ্ণ ও শীতল রঙের বিভাজন স্পষ্ট। ক্যানভাসে উষ্ণ রঙের ব্যবহার শিল্পীর মনোভূমির বিক্ষুব্ধ অবস্থা প্রকাশ করে। স্থির অথচ গতিশীল আবহে ছবির নিজস্ব ভাষা তৈরি করেছে। নীপার এ-প্রদর্শনীর কাজগুলো বেশিরভাগই ক্যানভাসে তেলরঙে অাঁকা। এছাড়া বেশকিছু কাগজে তেলরং মাধ্যমের কাজ আছে। এবারের প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘কালার’স ডিলিউশন্স’।

প্রতিটি রঙের নির্দিষ্ট ভাষা আছে। নিজস্ব মায়া আছে। রঙের এ-সূক্ষ্মবোধের অভ্যমত্মরে নীপা নিরীক্ষা করেন।

নিরীক্ষার সত্মর বিন্যসত্ম হয় দুভাবে। প্রথমত, নীপার কাজের ভূমিতে অমসৃণ বুনট তৈরি। তারপর সে-বুনটের ওপর আবার বিপরীত রং অথবা সহনীয় রঙের ব্যবহার। রঙের আসত্মরে কাটাকুটি, দাগ, টানা, বিন্দু ও বুনটের ব্যবহারে ছবির বিষয় গড়েন। রঙের ভাষায় তৈরি করেন মায়া।

নির্দিষ্ট রং বাছাই করে ক্যানভাস সাজানোকে রঙের তৃষ্ণা বলা যায়। নীপা বেগুনি, সিঁদুররঙা লাল, গাঢ় লাল, উজ্জ্বল হলুদ, নীল ও নীলের সত্মরসমূহ ব্যবহার করে কাজ সম্পন্ন করেন। সহনীয় মাত্রায় রং ব্যবহার দর্শকদের কাছে নন্দিত হয়। মাকসুদা ইকবাল রং ব্যবহারের সময় দর্শকের ভাবনা মনে রাখেন। ‘স্টোরি অব দ্য ফিল্ড’ শিরোনামের কাজে ক্যানভাসের ওপরের দিকে উজ্জ্বল হলুদ রং ব্যবহার করেছেন তিনি। ক্যানভাসের নিচের অংশে হলুদ আর লাল রংকে মিশিয়ে মাঠের সোনালি রংকে মনে করিয়ে দেন।

‘থ্রো কালার’ শিরোনামের কাজে শুধু গাঢ় লাল ও সিঁদুররঙা লালের প্রলেপ দেখা যায়। এ-ছবিতে রঙের নির্দিষ্ট দ্যুতির কথাকে তিনি স্পষ্ট করে তুলেছেন।

মোটা রঙের আসত্মরণ রঙের দ্যুতিকে ছাড়িয়ে বুনট তৈরি করেছে। ‘থ্রো কালার-২’ ছবিতে নীলচে সবুজের প্রলেপ থেকে বেরিয়ে আসছে উজ্জ্বল সবুজ রং। সবুজ বুনটের সঙ্গে উজ্জ্বল সবুজের বন্ধনে এক বিশেষ মায়া তৈরি হয়। ছবির ভূমি আর বাসত্মবে দেখা আমাদের চারপাশের ভূমিতে কিছুটা পার্থক্য থাকে। বুনট, সারফেস, এসবের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠে নীপার ক্যানভাস। এসব ছবির পাঠ নিতে গিয়ে দর্শক ভাবতে পারেন, তাহলে এ-ছবির বিষয়গুলো কী হতে পারে? শিল্পী বাসত্মব দেখে অাঁকেন। কল্পনা থেকেও অাঁকেন। নীপা আমাদের চারপাশে রোজ দেখা বিষয় যেমন – দেয়াল, ভূমি, গোধূলি, নদী, আকাশ, সবুজ বনানী এসব দেখে বিষয় নির্ধারণ করেন। বিশ্বশিল্পকলার ইতিহাসে নির্বস্ত্তক বিষয়ের আধিক্য দেখা যায়। ফরমায়েশি শিল্পকর্মে বিষয় গুরম্নত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হতো। এখনো তাই। মননের গভীরে জমে থাকা বিষয়কে ক্যানভাসে হাজির করেন নীপা রঙের মাধ্যমে, রেখার মাধ্যমে। নীপার কাজগুলো আমাদের সে-কথাই বলে দেয়। ‘বেনেথ দ্য সারফেস-১’ ছবিতে দেখা যায় নীল ও সবুজ রঙের আধিক্য। ছবির জমিন তৈরি করেছেন আলট্রামেরিন বস্নু রঙের সাহায্যে। তার ওপর হালকা সবুজ রঙের প্রলেপে নীল রং ঢেকে সবুজ আবহ তৈরি হয়েছে। ‘বেনেথ দ্য সারফেস-২’ ছবিতে প্রম্নশিয়ান বস্নু আর গোলাপ রঙের ব্যবহার সন্ধ্যার আকাশের কথা মনে করিয়ে দেয়। আকাশের ভূমিতে থাকা গাঢ় আর হালকা নীলের চলাচলকে শিল্পী তুলে আনেন। লাল, হলুদ, সবুজ, নীল, বেগুনি, গোলাপি ও হালকা সবুজ রঙের সারফেসে রঙের দ্যুতির সঙ্গে বুনট ও বিন্দুবিসর্গের সমন্বয়কে নতুন করে দর্শক দেখতে পাবেন। মাকসুদা ইকবাল নীপা রং ও বিন্দু আর বুনটের নিরীক্ষায় সফল। বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে গত ৩ নভেম্বর শুরম্ন হওয়া এ-প্রদর্শনী শেষ হয় ২২ নভেম্বর।