নৈঃশব্দ্য

অ্যালিস মুনরো

অনুবাদ : আসফা হোসেন

জুলিয়েট অল্প ফেরিপথে বাকলি বে থেকে ডেনম্যান আইল্যান্ডে যাচ্ছিলেন। তিনি গাড়ি থেকে নেমে গ্রীষ্মের বাতাসে ফেরির সামনে দাঁড়ালেন। এক মহিলা তাকে দেখে চিনতে পারলেন এবং কথা বলা শুরু করলেন। একবার দেখার পর দ্বিতীয়বার আবার দেখলে তাকে চেনাটা এবং কোথাও তার সঙ্গে দেখা হয়েছে বলে মনে করাটা অস্বাভাবিক নয়। তাকে ধারাবাহিকভাবে প্রাদেশিক টেলিভিশনে উপস্থাপিকা হিসেবে সাক্ষাৎকার নিতে দেখা যায় ‘Issue of the Day’ প্রোগ্রামে। এখন তার চুল ছোট করে কাটা, খুবই ছোট, আর তার লালচে রঙের চশমার ফ্রেমের সঙ্গে ম্যাচিং। তিনি প্রায়ই কালো প্যান্ট পরেন, আজো সেটা পরা। ভেতরে ঘিয়ে রঙের সিল্কের শার্ট, তার ওপরে মাঝে মাঝে একটি কালো জ্যাকেট। তার মা এই সম্পূর্ণ রূপটাকে আকর্ষণীয় বলতেন। – ‘মাফ করবেন। মনে হয় লোকে আপনাকে প্রায়ই বিরক্ত করে।’

জুলিয়েট বললেন, ‘না ঠিক আছে। শুধু যখন আমি ডেন্টিস্টের কাছে যাই, তখন আলাপ করতে পারি না।’ মহিলাটি প্রায় জুলিয়েটের বয়সী, লম্বা কাঁচাপাকা চুল, সাজসজ্জাহীন, পরনে লম্বা ডেনিম স্কার্ট।

তিনি ডেনম্যানে বাস করেন। সেজন্য জুলিয়েট মনে করলেন, তিনি কি ‘আত্মিক সমতা কেন্দ্র’ সম্পর্কে জানেন। ‘আমার মেয়ে ওখানে আছে। সে ওখানে ছয় মাসের জন্য নির্জনে গিয়েছে, কিন্তু আমি জানি না, এসব কেন্দ্রকে কী বলা হয়? এটা হলো ছয় মাসে তাকে প্রথমবার দেখতে আসা।’

মহিলাটি বললেন – ‘এরকম কয়েকটি স্থান আছে, এসব স্থান প্রায়ই গড়ে ওঠে আবার হারিয়ে যায়। আমি মনে করি, এসব সেন্টার কিন্তু সন্দেহজনক নয়। তারা সমাজের বিধিবিধানের মধ্যে থাকে না, তাই সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। বিচ্ছিন্ন না হলে তারা কীভাবে নির্জনে যায়?’

মহিলাটি আরো বললেন, ‘আপনি অবশ্যই আগ্রহের সঙ্গে মেয়ের এই সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করছেন।’ জুলিয়েট বললেন – ‘অবশ্যই। খুবই। আমার মেয়ে কুড়ি বছরের, সামনের মাসে তার একুশ হবে। আমরা কিন্তু একে অপরের থেকে বেশি ভিন্ন        থাকিনি।’

মহিলাটি বলেন, তার একটি বিশ বছরের ছেলে, একটি আঠারো বছরের মেয়ে ও আরেকটি পনেরো বছরের। কিছু সময় আছে তারা ফি দিয়ে এককভাবে বা একসঙ্গে নির্জনে যায়।

জুলিয়েট হেসে বললেন – ‘ভাগ্যিস আমার শুধু একজন। আমি নিশ্চয়তা দিতে পারব না যে, কয়েক সপ্তাহ পরে তাকে না আবার ফিরে আসতে হয়।’

এ-ধরনের মা-মেয়ের পারিবারিক আলাপে জুলিয়েট খুব স্বস্তিবোধ করেন। (তিনি এ-বিষয়ে দৃঢ়ভাবে জবাব দিতে বিশেষ পারদর্শী।) সত্যি যে, পেনিলোপের বিষয়ে কোনো অভিযোগ করার কারণ নেই। পেনিলোপের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা খুব কঠিন হবে, ছয় মাসের জন্য তো দূরের ব্যাপার। পেনিলোপ গরমের সময়ে Banff চেম্বারে মেইডের কাজ করেছে। তিনি বাসে চেপে মেক্সিকো ও Hitchhiking-এ Newfoundland গিয়েছিল। কিন্তু সবসময় জুলিয়েটের সঙ্গে থেকেছেন। কখনো ছয় মাসের মতো একটা দীর্ঘ বিরতি হয়নি।

জুলিয়েট বলতে পারতেন – ‘পেনিলোপ আমাকে অনেক আনন্দ দেয়, কিন্তু নাচ-গান পরিবেশন করে বা সহজ কিছু দিয়ে নিজেকে আনন্দিত করে না। আশা করি, আমি তাকে তার চাইতে অনেক ভালোভাবে মানুষ করেছি। সে এক বিজ্ঞ ব্যক্তির মতো যেন এই পৃথিবীতে করুণা ও মাধুর্যের সঙ্গে আশি বছর ধরে আছে। সে কিন্তু আমার মতন না, সে চিমত্মাশীল, কিন্তু তার বাবার মতো স্বল্পভাষী, দেখতে পরীর মতো, আমার মায়ের মতো সোনালি চুল, কিন্তু লাজুক না, শক্ত ও আভিজাত্যপূর্ণ। লোকে যা-ই ভাবুক, আমি কিন্তু সামান্যতম ঈর্ষান্বিত নই; দীর্ঘদিন তার কাছ থেকে কোনো খবরাখবর পাইনি। কারণ, ‘আত্মিক সমতা কেন্দ্রে’ কোনো চিঠি পাঠানো বা ফোনালাপ করা নিষিদ্ধ। আমি যেন মরুভূমিতে ছিলাম। যখন তার সাক্ষাতের খবর আসল, তখন আমার অনুভূতিটা হলো চৌচির হওয়া মাটির বৃষ্টির পানি পাওয়ার আনন্দের মতো।’

– ‘আশা করি, তোমার সঙ্গে দেখা হবে রোববার অপরাহ্ণে।’ ‘সময় হয়েছে’ যাওয়ার। জুলিয়েট আশা করলেন, এটা পেনিলোপের বাড়ি ফেরার কথা বলছে, কিন্তু এটা তার ওপরই নির্ভর করে।

জুলিয়েট কিছুক্ষণের মধ্যে পেনিলোপের আঁকা খসড়া ধরনের একটা মানচিত্র অনুসরণ করে পুরনো একটা গির্জার সামনে গাড়িটা রাখলেন। গির্জাটা পঁচাত্তর বা আশি বছরের পুরনো, চুন-সুরকির আস্তরণ দিয়ে ঢাকা – জুলিয়েট কানাডার যেখানে বড় হয়েছেন সেখানকার চার্চের মতো অত পুরনো বা জাঁকজমকপূর্ণ নয়। গির্জার পেছনে একটা নতুন তৈরি ভবন, যার ঢালু ছাদ এবং সামনের দেয়ালে অনেকগুলো জানালা। একটা সাদামাটা মঞ্চ, কিছু বেঞ্চি এবং একটা ভলিবল কোর্ট, যেখানে ঝোলানো নেট। সবকিছুতেই একটা অযত্নের ছাপ। এককালে পরিচর্যা করা জায়গাটি ঝাউগাছ ও চিরহরিৎ গুল্ম দিয়ে বেদখল হয়ে আছে।

জুলিয়েট বুঝতে পারেননি, তারা পুরুষ কিংবা মহিলা, তারা মঞ্চে কিছু কাঠের কাজে ব্যস্ত মনে হলো। কয়েকটি লোক বেঞ্চে বসা ছিল। অন্যরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বসেছিল, সবার পরনে সাধারণ পোশাক, পাদ্রিদের মতো হলুদ গাউন নয়, কিংবা ওই ধরনের কিছুই নয়। কিছু সময়ের জন্য জুলিয়েটের গাড়ি সবার দৃষ্টির বাইরে ছিল।

বেঞ্চে বসা লোকদের থেকে একজন মধ্যবয়সী চশমাপরিহিত খাটো লোক বেঞ্চ থেকে উঠে ধীরে ধীরে জুলিয়েটের দিকে এগিয়ে এলেন।

জুলিয়েট গাড়ি থেকে নেমেই তাকে স্বাগত জানিয়ে পেনিলোপের কথা জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি জবাব দিলেন না, বোধহয় নীরবতার নীতি ছিল। মাথা ঝুঁকিয়ে পেছন ফিরে চার্চের ভেতরে ঢুকে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে পেনিলোপ নয়, একজন ভারি ধীরগতিসম্পন্ন শুভ্রকেশি, পরনে জিন্স ও একটা ঢিলেঢালা সোয়েটার পরিহিত মহিলা এলেন।

– ‘কী সৌভাগ্য, আপনার সাক্ষাতে।’ মহিলাটি বললেন, ‘ভেতরে আসুন।’

‘আমি জনিকে বলেছি, আমাদের চা দিতে।’ চওড়া সতেজ মুখ, কোমল ও দুষ্টুমিপূর্ণ হাসি, জুলিয়েট যেটা অনুভব করেন দুষ্টুমিভরা চোখে।

তিনি বললেন, ‘আমার নাম জোয়ান।’

জুলিয়েট একটা সহজ নাম আশা করেছিলেন, তার নাম হবে serenity-র (প্রশান্তি) মতো অথবা কিছুটা প্রাচ্যঘেঁষা, জনের মতো এত সাদামাটা নয়। অবশ্য তার মনে পড়ল, পোপ জনের নাম।

জুলিয়েট সহজভাবে প্রশ্ন করলেন। ‘আমি ঠিক জায়গায় এসেছি তো? ডেনম্যানে আমি নতুন।’

‘আমি এখানে পেনিলোপকে দেখতে এসেছি।’

জোয়ান নামটা টেনে টেনে বললেন, ‘অবশ্যই, পেনিলোপকে দেখতে এসেছেন।’

বেগুনি কাপড় দিয়ে উঁচু জানালাগুলো ঢাকার ফলে গির্জার ভেতরটা অন্ধকার। গির্জার সংরক্ষিত আসন সরানো হয়েছে। হাসপাতালের ওয়ার্ডের মতো সাদা পর্দা দিয়ে ব্যক্তিগত কক্ষগুলো বিভক্ত। যে-কক্ষে তাকে পাঠানো হলো, সেখানে কোনো খাট ছিল না, শুধু কয়েকটি প্লাস্টিকের চেয়ার। কিছু কাগজ এলোমেলোভাবে সত্মূপাকারে খোলা সেলফে রয়েছে। জোয়ান মাফ চাইলেন এই এলোমেলো পরিবেশের জন্য এবং জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনাকে কি আমি আপনার নামেই ডাকব।’

জুলিয়েট বললেন, ‘হ্যাঁ – নিশ্চয়।’

জোয়ান হাতজোড় করে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বললেন, ‘আমি সেলিব্রেটিদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে অভ্যস্ত নই। আমি জানি না, আমি কি আপনার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক হবো, কি হবো না।’

– আমি কিন্তু অতটা বিখ্যাত নই।

– ওহ্, আপনি বিখ্যাতই, নিশ্চয় আপনি বিখ্যাত। ও-ধরনের কথা বলবেন না, আমি এটা বলে নিজে স্বসিত্মবোধ করছি। আপনার কাজ অন্ধকারে আলোর মতো প্রশংসনীয়। আপনার অনুষ্ঠান দেখার মতো।

– ধন্যবাদ, আমি পেনিলোপ থেকে একটা নোট পেয়েছি। –  জুলিয়েট বললেন।

– আমি জানি, কিন্তু আমি দুঃখিত। আমি খুবই দুঃখিত, আমি আপনাকে হতাশ করব না। পেনিলোপ এখানে নেই। – জোয়ান খুব হালকাভাবে বললেন।

পেনিলোপের অনুপস্থিতিটা একটা আশ্চর্যের বিষয়, এমনকি তাদের দুজনের কাছেই আনন্দের বিষয়।

খবরটা শুনে জুলিয়েট এক মুহূর্তের জন্য বাক্যহীন হয়ে গেলেন। তিনি দীর্ঘ নিশ্বাস নিলেন। তিনি ভীত হলেন। এ যেন আগাম আভাস – পরে ব্যাপারটি বুঝতে পেরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেন। তিনি তার ব্যাগের ভেতরে হাতড়াতে লাগলেন। তিনি বলার চেষ্টা করলেন – ‘আমি আশা করেছিলাম’ –

‘আমি জানি, আমি জানি’, জোয়ান বললেন। ‘সে এখানে ছিল, কিন্তু থাকতে পারল না।’

– কোথায় সে? কোথায় গেছে সে?

– আমি সেটা বলতে পারব না।

– তার মানে, আপনি জানেন কিন্তু বলবেন না।

– আমি পারব না, আমি জানি না। একটা জিনিস বলতে পারি যেটা আপনাকে স্বসিত্ম দেবে। যেখানেই সে গিয়েছে, যা কিছু ভেবেছে, সেটা তার জন্য ঠিকই হয়েছে। এটা তার আধ্যাত্মিকতা ও তার মানসিক শক্তি বাড়াবে।

জুলিয়েট এ-ব্যাপারটা ছেড়ে দিলেন। ‘আধ্যাত্মিকতা’ শব্দটা তার কণ্ঠকে রোধ করে দিলো।

পেনিলোপ বুদ্ধিমতী, – সে নিশ্চয় এতে জড়াবে না। ‘আমি জানতে চাচ্ছি, কারণ যদি সে তার কোনো জিনিসপত্র আমাকে পাঠাতে চায়।’

– তার জিনিসপত্র?

জোয়ান তার মুখভরা হাসি লুকাতে পারলেন না। যদিও তিনি একটা কোমল প্রকাশভঙ্গি উপস্থাপন করলেন। পেনিলোপের এসবের কোনো ভাবনাই নেই।

জুলিয়েট মাঝে মাঝে যেমন কোনো সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাঝখানে অনুভব করেন যে, যার সাক্ষাৎকার তিনি নিচ্ছেন তার ভেতরে শত্রম্ন মনোভাবের চাপ রয়েছে, যা ক্যামেরা চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত। যার সম্বন্ধে তার নিচু ধারণা আছে এমনকি যাকে স্টুপিড ভাবে, তার একটা ভিন্ন ধরনের শক্তি অনুভূত হয় ইন্টারভিউর সময়। হালকা কিন্তু সাংঘাতিক প্রতিকূলতা – এটা ইন্টারভিউর সময় কিছুতেই প্রকাশ করা যাবে না।

জোয়ান বললেন – ‘বৃদ্ধি বলতে আমি বোঝাতে চাচ্ছি ভেতরের বৃদ্ধি।’

– ‘বুঝতে পেরেছি।’ – জুলিয়েট তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন।

– পেনিলোপের জীবনে এরকম চমৎকার সুযোগ, আকর্ষণীয় লোকজনের সঙ্গে মেশার সুযোগ এসেছিল। হে ঈশ্বর! – তার এটার প্রয়োজনই ছিল না। সে তো বড় হয়েছে আপনারই কাছে, আপনি তার মা, আপনি তো নিজেই চমৎকার মানুষ। কিন্তু আপনি জানেন – ‘যখন ছেলেমেয়েরা বড় হতে থাকে, কিছু একটা ঘাটতি থেকেই যায়, মনে হয় সে কিছু থেকে বঞ্চিত হয়েছে।’

– ও হ্যাঁ, ‘আমি জানি, এ-ধরনের বাড়ন্ত ছেলেমেয়েদের কিছু অভিযোগ থাকে’ – জুলিয়েট বললেন। জোয়ান একটু কঠোরভাবে এ-ব্যাপারটা বিবেচনা করলেন।

– পেনিলোপের জীবনে আধ্যাত্মিকতার মাত্রা একেবারে যে নেই সেটা নয় – আমি স্বীকার করছি, সে বড় হয়নি কোনো ধার্মিক বাড়িতে। কিন্তু সেখানে ধর্ম নিষিদ্ধ ছিল না। আমরা ধর্ম নিয়ে আলোচনা করতাম।

– কিন্তু কীভাবে আলোচনাটা করেছেন – আপনার বুদ্ধিবৃত্তিক পথে? আপনি নিশ্চয় ধরতে পেরেছেন – আমি কী বোঝাতে চাচ্ছি। আপনি তো খুব বুদ্ধিমান, জোয়ান বিনয়ের সঙ্গে বললেন।

– ‘আপনি যা মনে করেন।’

জুলিয়েট তার সাক্ষাৎকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানেন, কিন্তু এখানে নিয়ন্ত্রণ করলে তার স্বকীয়তা হারিয়ে যেতে পারে।

জোয়ান মন্তব্য করলেন, পেনিলোপ একটি আদুরে চমৎকার মেয়ে, কিন্তু তার ভেতরে রয়েছে এক বিরাট শূন্যতা, তাই সে এখানে এসেছে। যেসব উপকরণ সে বাড়িতে পায়নি, তার জন্য শূন্যতা। তখন, তুমি তোমার সাফল্যের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ব্যস্ত ছিলে। কিন্তু আমি তোমাকে অবশ্য বলছি – ‘তোমার মেয়ে নিঃসঙ্গ ছিল। দুঃখ তার অজানা ছিল না।’

জুলিয়েট বললেন, প্রায় মানুষই কোনো না কোনো সময় একাকী ও শূন্যতা অনুভব করে।

– জুলিয়েট, আমার বলা শোভা পায় না, আপনার রয়েছে প্রশংসনীয় দূরদৃষ্টি। আমি আপনার ইন্টারভিউ প্রোগ্রাম দেখি, আর আমি ভাবি কী করে আপনি একটা বিষয়ের মূলে চলে যান। সবসময় এত নম্র-ভদ্রভাবে লোকের সাক্ষাৎকার নেন। আমি ভাবতে পারিনি, আপনার মুখোমুখি বসে এভাবে কথা বলতে পারব। সেখানে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারছি। আপনার ধারণাটা ভুল। আপনি বোধহয় দুঃখিত। এটা স্বাভাবিক যে, আপনি একটু দুঃখবোধ করবেন। আমার ধারণা, পেনিলোপ নিশ্চয় আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।

কয়েক সপ্তাহ পরে পেনিলোপ জুলিয়েটের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। পেনিলোপের জন্মদিনের কার্ড এলো ১৯ জুন তার একুশতম জন্মদিনে। এ-ধরনের কার্ড পরিচিত মানুষের কাছে আসে, যা
মা-মেয়ের ভেতর সম্পর্কের মধ্যে পড়ে না। এটা কোনো হাস্যকর কিংবা আবেদনময়ী কার্ড নয়। কার্ডের প্রথম পৃষ্ঠায় হলো একটা ফুলের গোছা; একটা পাতলা বেগুনি ফিতার লেজের শেষের দিকে বানান করে লেখা – Happy Birthday। এটার ভেতরের পৃষ্ঠায় একই লেখা, তার সঙ্গে সোনালি অক্ষরে যুক্ত Wishing you a very…। আর এখানে কোনো স্বাক্ষর ছিল না। জুলিয়েট ভাবলেন, এটা কেউ পেনিলোপকে পাঠিয়েছে এবং স্বাক্ষর দিতে ভুলে গেছে। সে ভুলে খুলে ফেলেছে। কেউ হয়তো পেনিলোপের নাম ও জন্মদিনের তারিখ জানত। বোধহয় তার ডেন্টিস্ট কিংবা তার ড্রাইভিং শিক্ষক। কিন্তু তিনি যখন লেখাটা দেখলেন, এখানে কোনো ভুল ছিল না। এখানে তার নিজের নামও নিজের হাতে লেখা। খামের ওপরের সিল বা ছাপ কোনো স্থানের নির্দেশনা দেয় না। সব ছাপ দেখায় Canada Post। জুলিয়েট ভেবেছিলেন পোস্ট অফিসকে জিজ্ঞাসা করলে এটা কোন প্রদেশ থেকে এসেছে সেটা কোনোভাবে জানা যাবে। চিঠি নিয়ে Post Office-এ গেলে ডাকঘর জিজ্ঞাসা করবে, কী জানতে চান তার জন্য আপনার তথ্য জানার অধিকার রয়েছে, আর ওখানে নিশ্চয় কেউ তাকে চিনবে।

জুলিয়েট তার পুরনো বন্ধু ক্রিস্টার সঙ্গে ‘হোয়েল বে’তে দেখা করতে গেলেন। যেখানে জুলিয়েটও একসময় থাকতেন, পেনিলোপের জন্মের পূর্বে।

ক্রিস্টা ছিলেন কিটসিলানোতে, যেটা চিকিৎসাসুবিধা সেন্টার, তার ছিল মাল্টিপল sclerosis। তার কামরাটি ছিল নিচতলায়, সঙ্গে ছোট একটা ব্যক্তিগত বারান্দা, বারান্দাটির সামনে রৌদ্রোজ্জ্বল চত্বর। ময়লার বালতিটা ওয়েস্টারিয়া ফুলের বেড়া দিয়ে ঢাকা। জুলিয়েট ক্রিস্টার সঙ্গে এই patio-তেই বসেন। জুলিয়েট ক্রিস্টাকে তার ডেনম্যান আয়ল্যান্ড ভ্রমণের পুরো গল্পটা জানালেন। তিনি কিন্তু কাউকেই এটা বলেননি। আশা করেন আর কাউকেই যেন বলতে না হয়। প্রতিদিন যখন জুলিয়েট কাজ থেকে বাড়ি ফিরে যান, তার একটা আশা থাকত, পেনিলোপকে ঘিরে। তিনি মনে মনে আশা করতেন, পেনিলোপ অ্যাপার্টমেন্টে অপেক্ষা করছে। অন্তত তার একটা চিঠি থাকবে এবং ওখানে ছিল সেই অপ্রত্যাশিত কার্ড। তিনি  তার কম্পমান হাতে ছিঁড়ে কার্ডটি খুললেন।

– ‘এটা কিছু না।’ ক্রিস্টা বললেন। এটা তোমাকে জানানোর জন্য যে সে ঠিক আছে। ধৈর্য ধরো, কিছু হবে। কিছু হবেই।

জুলিয়েট কিছুক্ষণ তিক্তভাবে মাদার শিপটন সম্বন্ধে আলাপ করলেন। অসন্তুষ্টি নিয়ে হালকাভাবে চিমত্মা করলেন তাকে পোপ জোয়ান বলা যাবে না। অবশেষে জুলিয়েট শিপটন নামেই তাকে ডাকবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন।

– কী জঘন্য ছলনা! তিনি বললেন। এই ধর্মীয় মুখোশের পেছনে একটা বিচ্ছিরি নোংরামি রয়েছে। এটা বিশ্বাসযোগ্য নয় যে, পেনিলোপ তার অনুভবে মেতেছে।

ক্রিস্টা সান্তবনা দিলেন যে, পেনিলোপ ওখানে গেছে বোধহয় ওই জায়গা সম্বন্ধে কিছু লিখতে। বোধহয় কিছু অনুসন্ধানী রিপোর্টের জন্য। মাঠপর্যায়ের কাজ। বর্তমানে ব্যক্তিগত ভঙ্গিতে লেখার চল।

– ছয় মাস ধরে অনুসন্ধান? জুলিয়েট বললেন। পেনিলোপ একটা চালাক-চতুর মেয়ে, সে তো দশ মিনিটেই মাদার শিপটনের মুখোশ বুঝতে পারত।

ক্রিস্টা স্বীকার করলেন, ‘এটা আধ্যাত্মিক।’

– শিপটন পরিকল্পনা করে আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করল, আমিও বোকা হয়ে গেলাম। একটা নাটকীয় চরিত্রের মধ্যে যে বোকার মতো কিছু বলে ফেলল, সবার মত ঘুরে গেল কারণ তারা কিছু জানে, কিন্তু সে জানে না।

– ‘এ-ধরনের নাটক আজকাল আর হয় না।’ ক্রিস্টা বললেন, এখন কেউ কিছু জানে না।

– না – পেনিলোপ আমার ওপরও আপনার মতো আস্থা রাখেনি। কেন করবে সে। সে জানে, আমি তোমাকে সবকিছু বলে দেবো।

জুলিয়েট কিছুক্ষণ গম্ভীরভাবে চুপ থাকলেন এবং বললেন, তুমি আমাকে অনেক কিছুই বলোনি।

– ও! প্রভুর দোহাই! কোনো বিদ্বেষ নিও না। এটা আর না। ক্রিস্টা বললেন।

– এটা আর না, জুলিয়েট সম্মতি জানালেন। আমি এখন একটা খারাপ মুডে আছি, এই যা -,

– থামো! পেনিলোপ তোমাকে মায়ের কর্তব্য পালন করার বেশি সুযোগ দেয়নি। এক বছরেই এটা ইতিহাস হয়ে যাবে।

জুলিয়েট তাকে জানাননি যে, সে ওখান থেকে মানসিক বিফলতা নিয়ে ফিরে এসেছিল।

– তোমাকে কী বলেছিল সে?

জুলিয়েটের আশ্চর্য মনোভাব লক্ষ করে মাদার শিপটন তার দিকে ঠোঁট বন্ধ করে সমবেদনা প্রকাশ করলেন মাথা ঝুঁকিয়ে। পরবর্তী বছরে জুলিয়েট মাঝেমধ্যে পেনিলোপের বন্ধুবান্ধবীদের কাছ থেকে টেলিফোন কল পেতেন। তারা জানতে চাইত, কেমন আছে ও        কোথায় আছে। উত্তরটা সবসময় একই হতো।

পেনিলোপ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন – ভ্রমণ করবেন। তাও বছরখানেক হলো। তার ভ্রমণের কোনো নির্ধারিত গন্তব্য ছিল না। আর জুলিয়েটের সঙ্গে তার কোনোরকম যোগাযোগের উপায়ই ছিল না। কিংবা কোনো ঠিকানাও তাদের দিতে পারেননি। জুলিয়েট তার কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছ থেকে এ-ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ পাননি।

পেনিলোপের যারা ঘনিষ্ঠ, তারা বোধহয় জানেন তিনি কোথায় আছেন, অথবা তারাও ওই বিদেশ ভ্রমণে গেছেন। অন্য অঞ্চলে চাকরি পেয়েছেন, নতুন জীবনযাপন করছেন। তারা ব্যস্ততার মধ্যে পুরনো বন্ধুবান্ধবের কথা জিজ্ঞাসা করেন না। (পুরনো বন্ধু মানে যারা তাকে ছয় মাস দেখেননি)।

জুলিয়েট যখন ঘরে ফিরতেন, তখন তার প্রথম দৃষ্টি পড়ত টেলিফোনের আনসারিং মেশিনের বাতির ওপর। এই জিনিসটা আগে তিনি এড়িয়ে যেতেন সবসময়। মনে করতেন, কেউ তাকে বিরক্ত করবে সাক্ষাৎকার বিষয়ে। আগে তিনি ফোন এড়িয়ে যেতেন। কিন্তু পেনিলোপ চলে যাওয়ার পরে, তিনি ফোনের অপেক্ষায় থাকেন আর কতটুকু যেতে হবে (ফোনের কাছে, অন্য স্থান থেকে) সেই স্টেপ গুনতেন, কীভাবে তিনি ফোন তুলবেন এবং সেজন্য কত সময় লাগবে… খোদা, জানি! ও – হয়। কিছুই কাজ করল না, তারপর মনে হলো – সবকিছুই শূন্য। যাদের পেনিলোপ চিনতেন, তাদের থেকেও একটা শূন্যতা ছিল। পেনিলোপ ছেলেবন্ধুদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন, যারা তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল এবং যে-মেয়েবন্ধুদের সঙ্গে গল্পগুজব করেছিলেন, এসব গোপনীয় বিষয় তাদের বিশ্বাস করে বলেছিলেন। এখন যারা তার কলেজের বন্ধু তারা বিভিন্ন শহরের – কেউ আলাস্কা, কেউ প্রিন্সজর্জ কিংবা পেরু  থেকে এসেছিল। এ-ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুবান্ধব যেটা প্রাইভেট মেয়েদের টরেন্স হাউস বোর্ডিং স্কুলের মতো শিক্ষাব্যবস্থায় তৈরি করে, সেটা পাবলিক হাইস্কুলে হয় না। এটা শুধুই সম্ভব প্রাইভেট শিক্ষাব্যবস্থায়।

পেনিলোপের কাছ থেকে ক্রিসমাসে কোনো সংবাদ ছিল না। জুনে আরেকটা কার্ড এলো ঠিক আগেরটার মতো। ভেতরে একটা অক্ষরও লেখা নেই। জুলিয়েট একঢোক ওয়াইন পান করলেন এটা খোলার আগে। খোলার পর তৎক্ষণাৎ ফেলে দিলেন।

প্রচ- উত্তেজনায় তিনি সবেগে কান্না জুড়ে দিলেন এবং নিয়ন্ত্রণহীনভাবে কাঁপছিলেন। এক হাত আরেক হাতের ওপর রাগে বাড়ি মারছিলেন। আসল অর্থে এই রাগটা ছিল মাদার শিপটনের ওপর। কিন্তু জুলিয়েটের মুখে শিপটনের সেই ছাপটা ধূসর হয়ে গিয়েছিল। শেষে জুলিয়েট এটাকে তার আত্মতৃপ্তি হিসেবে নিলেন।

পেনিলোপের সব ছবি জুলিয়েটের শোবার ঘরে স্থান পেল। তার বই, একটা কফিমেকার (সে এগুলো কিনেছিল ম্যাকডোনাল্ডের প্রথম রোজগারের পয়সায়) আরো কিছু খামখেয়ালি উপহার – tiny পস্নাস্টিকের ফ্যান-ফ্রিজের ওপর সাঁটানোর জন্য, একটা চাবি দেওয়া খেলনা ট্রাক্টর, একটা কাচের পুঁতির পর্দা – বাথরুমে ঝোলানোর জন্য, জুলিয়েট পেনিলোপের জিনিসগুলোর মধ্যে তার উপস্থিতি উপলব্ধি করতেন। জুলিয়েট প্রায়ই ভাবতেন, এই অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দিয়ে নতুন পরিবেশে গেলে কিছুটা স্বসিত্ম হতো। ক্রিস্টাকে তিনি বললেন, সে এটা করতে পারে না। পেনিলোপ এই ঠিকানাটাই শুধু জানে। আগামী তিন মাসের অপেক্ষায় থাকবে। জানি, – চিঠিপত্র এখানেই আসবে।

– সে তো তোমার কর্মস্থলে যোগাযোগ করতে পারে। ক্রিস্টা বললেন।

– কী জানি, কতদিন আমি ওখানে থাকব। জুলিয়েট বললেন। সে বোধহয় কোনো সংঘে আছে, আর তাদেরকে বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয় না। কিছু গুরু নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত এবং তাদের রাস্তায় ভিক্ষায় নামায়। আমি যদি তাকে কোনো ধর্মীয় স্কুলে পাঠাতাম আর প্রার্থনা শেখাতাম, তাহলে কিন্তু এটা ঘটত না। আমার এটা করা উচিত ছিল (জুলিয়েট আওড়ালেন।) তাহলে একটা টিকা দেওয়ার মতো প্রতিরোধ করা যেত। আমি তাকে আধ্যাত্মিকতা থেকে বঞ্চিত করেছি। মাদার শিপটন এ-কথাই বলেছেন।

পেনিলোপ তেরো বছর বয়সে টরেন্স হাউসে তার বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার কুটিনেতে পাহাড়ে ক্যাম্পেইন ভ্রমণে গিয়েছিলেন। জুলিয়েটের সম্মতি ছিল। পেনিলোপ টরেন্স হাউসে বছরখানেক ছিলেন এবং অর্থনৈতিক সাপোর্ট পেয়েছিলেন। কারণ তার মা সেখানে শিক্ষকতা করেছিলেন।

জুলিয়েট আনন্দিত যে, তার দৃঢ় বন্ধুত্বের জন্য তারা তাকে আপন করে নিয়েছিলেন। যদিও জুলিয়েট শৈশবে এ-ধরনের ভ্রমণে যেতে পারেননি। কিন্তু তিনি খুশি এজন্য যে, তার মেয়ে সেটা পেরেছে। জুলিয়েট পেনিলোপের ওই বয়সের স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দিতে পেরেছিলেন, যা থেকে তিনি নিজে বঞ্চিত ছিলেন। এরিক পেনিলোপের ট্রিপের বিষয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। তিনি মনে করেছিলেন, তার বয়স খুব কম। সে এটা পছন্দ করেননি, যাদের সঙ্গে পেনিলোপ ছুটিতে যাবে, তাদের সম্বন্ধে সে কম জানত। বোর্ডিং স্কুলে যাওয়ার পর থেকে এরিক ও জুলিয়েটের সঙ্গে এমনিতেই পেনিলোপের খুব কম সময় কাটত। তাই ক্যাম্পিংয়ে গিয়ে এটাকে আরো দীর্ঘায়িত করার কী দরকার ছিল।

পেনিলোপকে গ্রীষ্মের ছুটিতে ক্যাম্পিংয়ে পাঠানোর আরো একটা কারণ ছিল।

এরিক ও জুলিয়েটের মধ্যে কিছু অমীমাংসিত বিষয় তারা সমাধান করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেটা হয়নি। পেনিলোপের জন্য সব ঠিক আছে, এটা ভান করার কোনো যুক্তি ছিল না।

এ-ব্যাপারে এরিকের চিমত্মাধারা জুলিয়েটের থেকে ভিন্ন। আন্তরিকতা, ভদ্রতা দিয়ে কিছু প্রকৃত ভালোবাসা খুঁজে পাওয়া যায়। এরিক মনে করেন এটাই যথেষ্ট।

জুলিয়েট মনে করেন, নিশ্চয় এরিক পারত। পেনিলোপ যখন বাসায় থাকত তখন তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার একটা ভালো আচরণ থাকত, যার কারণ ছিল ভালো বোঝাপড়াটা দেখানো।

এরিকের মতে, জুলিয়েটই গোলমালটা করত। এই চিমত্মাটা এরিকের ছিল। সেটাই তাদের ভেতর একটা তিক্ততার সম্পর্ক তৈরি করে। কারণ জুলিয়েট পেনিলোপকে খুব মিস করে। তাদের ঝগড়ার কারণ খুবই সাধারণ এবং পুরনো। তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী অ্যালিও বসন্তের কোনো একসময় কিছু ছোটখাটো বিষয়ে খোলামেলা কিংবা দুরভিসন্ধির মধ্যে এরিকের মৃত বউয়ের অন্তরঙ্গতা এবং জুলিয়েটের প্রতি কিছু বিদ্বেষ প্রকাশ করে। জুলিয়েট জানতে পেরেছিলেন, ক্রিস্টার সঙ্গে এরিকের একটা সম্পর্ক ছিল।

ক্রিস্টা জুলিয়েটের অনেকদিনের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। তার আগে ক্রিস্টা এরিকের বান্ধবী ও প্রেমিকা ছিলেন। এ-সম্বন্ধে এখন আর কেউ কিছু বলেন না। তারা বিচ্ছিন্ন হলেন, যখন জুলিয়েট এরিকের সঙ্গে থাকতে এলেন।

জুলিয়েট ক্রিস্টা সম্বন্ধে সবই জানতেন; কিন্তু আগে যেটা ঘটে গেছে সে-বিষয়ে তিনি আর বেশি মাথা ঘামাননি।

এরিকের সঙ্গে জুলিয়েটের পরিচয় হওয়ার পর এরিক ক্রিস্টার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। জুলিয়েট এরিক ও ক্রিস্টার পূর্বের সম্পর্কের কথা জানলেও যে-সম্পর্কটা আগে ঘটে গেছে সে-বিষয়ে তার আপত্তি ছিল না। আপত্তি ছিল তখন, যখন পেনিলোপের এক বছর বয়সে তাকে সঙ্গে নিয়ে অন্টারিওতে জুলিয়েটের মা-বাবার বাড়িতে গিয়েছিলেন আর জুলিয়েটের মা মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। ওই সময় এরিক তার মদপান করার পুরনো অভ্যাসে ফিরে যান, তবু এরিকের প্রতি জুলিয়েটের ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমেনি।

জুলিয়েট অনেক খোঁচানোর পর তিনি বলতে বাধ্য হলেন যে, তিনি একবার পান করেছিলেন। আর এখানেও বোধহয় এর চেয়ে বেশি পান করেছেন। মনে হয়, আর তিনি মনে করতে পারেননি, কতবার তিনি পান করেছেন। তার মনে পড়ল।

ক্রিস্টা জুলিয়েটকে সান্তবনা দিতে চেষ্টা করলেন কিন্তু জুলিয়েট তাকে চলে যেতে বললেন। ক্রিস্টা সিদ্ধান্ত নিলেন এটা ভালো সময় যে, ক্যালিফোর্নিয়ায় তার ভাইয়ের বাসা থেকে ঘুরে আসা। ক্রিস্টার প্রতি জুলিয়েটের যে সাংঘাতিক ক্রোধ ছিল তা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র, তিনি ভালোভাবেই জানতেন যে, পুরনো সম্পর্কের একটা টান থাকেই। সেটা নতুন নারীর সঙ্গে নতুন সম্পর্কের মতো নয়।

জুলিয়েটের ক্রোধটা এত দৃঢ় ছিল যে, যেটা কাউকে অপবাদ দিতে পারে না। জুলিয়েট মনে মনে ভাবতেন, এরিক কোনোদিনই তাকে ভালোবাসেননি। এ নিয়ে জুলিয়েট অসন্তুষ্ট ছিলেন। এরিক তাকে উপহাস করতেন। অ্যালিওর মতো লোকের সামনে প্রায় তাকে অবজ্ঞার সঙ্গে চিহ্নিত করতেন  (যারা তাকে ঘৃণা করত), যা জুলিয়েটকে পীড়া দিত। জুলিয়েট ভাবতেন, এরিক তার সঙ্গে ভালোবাসার ভান করছে। তাদের সম্পর্কটা একটি মিথ্যা সম্পর্ক। এরিকের সঙ্গে তার শারীরিক সম্পর্কটা ঠুনকোমাত্র অথবা পবিত্রতার বন্ধনটা শূন্য। তিনি আরো মনে করতেন, তার সঙ্গে আশপাশের যে কোনো লোকের সঙ্গেই সম্পর্ক হতে পারে।

জুলিয়েট যখন স্বসিত্মতে থাকতেন তখন তিনি বুঝতে পারতেন যে, এরিক সম্বন্ধে তিনি যে চিমত্মা করেন তার কিছুটা সত্য নয়। এসব চিমত্মাভাবনা তাকে ক্ষুব্ধ করত। তিনি কাঁদতেন, কিন্তু ক্রিস্টার মতো মহিলা কখনো এ-ধরনের আচরণ করতেন না। ক্রিস্টা শক্ত, ধৈর্যশীলা নারী। ক্রিস্টা জুলিয়েটের মতো দোদুল্যমান ছিলেন না।

যে-জিনিসটা বারো বছর আগে ঘটে গেছে, সেটাই কেন জুলিয়েটকে মাঝে মাঝে কষ্ট দেয়, এরিক তা বুঝতে পারতেন না।

মাঝেমধ্যে এরিক মনে করতেন, পুরো ব্যাপারটাই জুলিয়েটের ছলনা। তিনি আরো ভাবতেন, হয়তো তার জন্যই জুলিয়েট তীব্র কষ্টভোগ করছে। এই মর্মযন্ত্রণা তাদের একে অপরকে শারীরিক সম্পর্কের দিকে ধাবিত করত। এরিক মনে করতেন – এ-সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু সেটা হয়নি। এটা ছিল তার ভুল ধারণা।

এ-ধরনের পরিস্থিতিতে জুলিয়েট নানা ধরনের হাসিখুশির গল্প বলতেন, যেখানে ব্যভিচারী প্রাধান্য পেত। এমন একটা গল্প – পেপি চরিত্র, যে তার স্বামীকে ঘুমের মধ্যে ব্যভিচারীর জন্য মেরে ফেলবে বলে চিমত্মা করে।

এই হাস্যোজ্জ্বল গল্পগুজবের পরিবেশের পর এরিক সাগরের ধারে চিংড়ি মাছ ধরার খাঁচা (ফলই) নিয়ে রওনা দিতে চাইলেই জুলিয়েটের মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে যেত এবং তিনি ভাবতেন, এরিক যেন বর্ষার মধ্যে অন্য কোনো নারীর সঙ্গে সমুদ্রের মাঝে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছে।

দিনটি ছিল জুনের শেষদিকে। সমুদ্র ছিল অশান্ত। এরিক সেই বিকেলবেলায় বের হলেন, তখন সাগরে উত্তাল বাতাস বইছে। সাগরে হঠাৎ দমকা বাতাস এলো দক্ষিণ-পূর্বদিক থেকে এবং ম্যালাপিনা স্ট্রেইটের পানিকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিলো। ঝড় সন্ধ্যা পর্যন্ত চলল। সত্যি বলতে কি, ঝড়টা সম্পূর্ণ থামেনি। জুনের শেষ সপ্তাহের বেলা ১১টার আগ পর্যন্ত এ-ঝড় থামেনি। এ-সময়ের মধ্যে ক্যাম্পবেল নদীতে একটি সেইল বোট খুঁজে পাওয়া গেল না। সেইল বোটে তিনজন মানুষ ছিল। আরো দুটি নৌকা পাওয়া যায়নি; একটিতে ছিল দুজন মানুষ, আরেকটিতে একজন, তিনি এরিক। পরের দিন সকালটা খুব শান্ত, রৌদ্রোজ্জ্বল, সতেজ ছিল। আগের দিনের ঝড়ে যে-দুটি মাছ ধরার নৌকা ও একটি সেইল বোট নিখোঁজ হয়েছিল। এটা কেউ ভাবেনি যে, তাদের নৌকাগুলো ডুবে যাবে। তারা ভেবেছিল – হয়তো কোথাও আশ্রয় নিয়েছে। জেলেদের জন্য এটাই বেশি প্রযোজ্য ছিল। সেইল বোটে যে-পরিবার ছিল তারা স্থানীয় নয়, তারা সিয়াটল থেকে এসেছিল।

উদ্ধারকর্মীরা আসার পর প্রথমে দুটো বাচ্চাকে মৃত অবস্থায় পেল এবং দিনের শেষে তাদের পিতা-মাতার মৃতদেহ পাওয়া গেল। দ্বিতীয় দিনে তাদের দাদাকে উদ্ধার করা হলো মৃত অবস্থায়। কিন্তু জেলেদের কোনো হদিস মেলেনি। অবশ্য তাদের নৌকার কিছু ভগ্নাংশ রিফিউজি কোভে পাওয়া গেল। এরিকের মৃতদেহ পাওয়া গেল তৃতীয় দিনে। এরিকের মৃতদেহটি বিকৃত হয়ে যাওয়ার কারণে জুলিয়েটকে আর দেখতে দেওয়া হয়নি। অনেকে মনে করে যে, সম্ভবত কোনো জন্তু তার সমুদ্রকূলে ভেসে আসা মৃতদেহটিকে ক্ষত-বিক্ষত করেছিল। আর এ-কারণেই এরিকের পুরনো বন্ধুবান্ধব ও জেলে সহকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিল যে, জুলিয়েটকে মৃতদেহ দেখানোরও দরকার নেই এবং শবাধারে পাঠানোর দরকার নেই, তাকে সাগরপাড়েই পোড়ানো হোক, যাতে জুলিয়েট অমত করেননি।

হোয়েল বে-তে যে-ডাক্তার সপ্তাহে একদিন আসতেন, তাকে Powell River-এ আসার জন্য টেলিফোন করা হলো এবং অ্যালিও তার সহকারী ছিলেন, তিনি একটা রেজিস্ট্রার নার্সকে ডেথ সার্টিফিকেট তৈরি করার দায়িত্ব দিলেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সবকিছু সম্পন্ন হয়ে গেল। যা হোক, খবর হয়ে গেল – অল্প সময়ের মধ্যে খাবার নিয়ে মহিলারা আসা শুরু করল।

অ্যালিওর রক্তে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান রক্তধারা – যেন দীর্ঘদেহী সমুদ্রের ভেতর থেকে উঠে আসা বৈধব্যের মতো। তিনি সবকিছুর দায়িত্ব নিলেন।

অনেক ভেসে আসা বিক্ষিপ্ত কাঠ – আর নোনা গাছের ছাল জড়ো করা হলো, যা চিতার আগুনকে উত্তপ্ত করবে। চিতার আগুনের পাশ থেকে দৌড়াদৌড়ি করা শিশুদের ধ্বনি করে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। কাপড় দিয়ে ঢাকা ছোট পোঁটলার মধ্যে এরিকের দেহ।

মহিলারা কোনো এক চার্চ থেকে কফি, বিয়ার, সফ্ট ড্রিংকস নজরবত নয় এমন সুবিবেচনার সঙ্গে গাড়ি এবং ট্রাকের পেছনে রেখে দিয়েছিল, এই হাফ প্যাগনে আনুষ্ঠানিকতায়।

জুলিয়েট সবাইকে কফি দিতে ব্যস্ত ছিলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো – এরিক সম্বন্ধে কে বলবে এবং কে চিতায় আগুন দেবে।

তিনি (হেসে) বললেন – তাদের ধারণা ভুল (ব্যঙ্গস্বরে), একজন বিধবা হিসেবে তিনি কি নিজেকে আগুনে সঁপে দেবেন? যারা তাকে প্রশ্ন করেছিল, তারা পিছিয়ে গেল। ভাবল, শোকে হয়তো তিনি হাবিজাবি বকছেন।

যে-লোকটি এরিকের অধিকাংশ সময়ের সহকর্মী ছিলেন, তিনি বক্তব্য দিতে এলেন – কিন্তু তিনি বললেন – সে ভালো বক্তা ছিল না।

অনেকেই মনে করেছিল এ-ব্যাপারে তাকে পছন্দ করা ভালো হয়নি। কারণ তার বউ ছিল ইভানজেলিক্যাল অ্যাংলিক্যান এবং তিনি অনেক কথা বললেন, যেটা এরিক শুনলে খুব ক্ষুব্ধ হতেন।

তারপর অ্যালিওর স্বামী বলতে এলেন। অনেক বছর আগে নৌকোর আগুনে অ্যালিওর স্বামীর দেহ কিছুটা বিকৃত হয়ে গিয়েছিল।  তিনি ছিলেন ক্ষুব্ধ সোশ্যালিস্ট এবং নাসিত্মক। অ্যালিওর স্বামী এরিক সম্বন্ধে বলতে এগিয়ে এলেন। এরিক সম্বন্ধে না বলে অন্য বিষয়ে চলে গেলেন। কেবল তার জীবিকা যুদ্ধের সহকর্মী হিসেবে। অ্যালিও তাকে দাবিয়ে রাখতেন। সে-কারণে কথা বলার সুযোগ পেয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। লোকজন তার বক্তব্যে বিরক্ত। অনেকে ভাবছিল, অনুষ্ঠানটায় কোনো ধর্মীয় গাম্ভীর্য ও হৃদয়গ্রাহিতা নেই, যা লোকে আশা করেনি। যখন আগুন জ্বলতে শুরু করেছিল, তখন ওইসব অনুভূতি উড়ে গেল। তখন লোকদের মগ্নতা আগুনের দিকে; দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো আগুনে খেয়ে ফেলছে; যকৃৎ, কিডনি, হৃদয় যেগুলো আগুনে পুড়ছিল। দেহ পোড়ার বিকট শব্দগুলো লোকদের বিচলিত করল। চিতার আগুনের স্থান থেকে মহিলারা তাদের বাচ্চাদের সরিয়ে নিল। পুরুষরাই শেষ পর্যন্ত ছিল।

এই আগুনে পোড়ানোর বিষয়টা কিছুটা কলঙ্কের, যদিও না এ-বিষয়ে এটি অবৈধ।

জুলিয়েট মানসিকভাবে কিন্তু ওখানে ছিলেন না, আগুনের তাপে তার চোখ বড় বড় হয়ে গিয়েছিল। তিনি ভাবছিলেন – শেলির ‘Trelawny’র আগুনে দেহ পোড়ার মতো তার হৃদয়ও পুড়ে নিঃশেষ হয়ে গেল।

এরিকের কোনো চিহ্নই থাকল না। হৃদয় পোড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সাহস-ভালোবাসাও ভস্মীভূত হলো। এটা ছিল ভস্ম, জ্বলন্ত – এরিকের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই থাকল না। পেনিলোপ এ-বিষয়ে কিছুই জানতেন না। ভ্যানকুভারের খবরের কাগজে একটা ছোট খবর বের হয়েছিল – সাগরপাড়ের পোড়ানোর বিষয়ে নয়। কিন্তু নৌকা ডোবার বিষয়ে ছোট সংবাদ মাত্র। কুটিনে পর্বতাঞ্চলে কোনো রেডিও ও খবরের কাগজের সংবাদ পৌঁছাত না। তিনি যখন ভ্যানকুভারে ফিরে এলেন, বন্ধু হেদারের বাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে ফোন করলেন। ক্রিস্টা ফোনে জবাব দিলেন – ‘তিনি দেহ পোড়ানোর অনুষ্ঠানে ছিলেন না কিন্তু জুলিয়েটের সঙ্গে ছিলেন।’ তিনি মিথ্যা বললেন,  ‘জুলিয়েট বাড়ি নেই।’ আর ক্রিস্টা হেদারের মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। তিনি সবকিছু হেদারের মাকে জানালেন। আর বললেন, ‘তিনি জুলিয়েটকে ভ্যানকুভারে নিয়ে আসতে তৎক্ষণাৎ রওনা দেবেন। আর জুলিয়েট নিজেই পেনিলোপকে সবকিছু জানাবে।’

যে-বন্ধুর বাড়িতে পেনিলোপ ছিলেন, সেখানে ক্রিস্টা জুলিয়েটকে নামিয়ে দিলেন। জুলিয়েট একাই ভেতরে গেলেন। পেনিলোপ যেখানে অপেক্ষা করছিলেন, হেদারের মা জুলিয়েটকে সেখানে নিয়ে গেলেন। পেনিলোপ এরিকের খবরটা পেয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হলেন। অপ্রস্ত্তত হয়ে জুলিয়েট তাকে জড়িয়ে ধরলেন।

এই ভয়ংকর খবরটা পেনিলোপকে হেদারের বাড়ির সাদা-সবুজ আর কমলা -sunroom এবং পেছনের বাগানে হেদারের ভাইদের শুটিং বাস্কেটগুলোর পরিবেশে কোনো উপলব্ধি করতে দেয়নি। এরিকের চিতায় পোড়ানোর খবরটা জানানো হয়নি। এই বাড়িতে আর পার্শ্ববর্তী বাড়িগুলোর কাছে এ-ব্যাপারটা খুবই অসামাজিক ও বিচ্ছিরি। এই বাড়িতে জুলিয়েটের প্রাণচঞ্চল আচরণ যেটা কেউ আশা করেনি।

এটা ছিল প্রায় good sport. হালকা টোকা দিয়ে হেদারের মা কক্ষে প্রবেশ করলেন গস্নাস আর ঠান্ডা চা নিয়ে।

পেনিলোপ একঢোকেই পান করলেন। আর হেদারের কাছে গেলেন, যে হলের আশপাশে ছিল। খুব অল্প সময়ের জন্য কিছু বাস্তব কথা বলার জন্য হেদারের মা জুলিয়েটের কাছে ক্ষমা চাইলেন। তিনি এবং হেদারের বাবা এক মাসের জন্য পূর্বদিকে যাবেন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে। তারা হেদারকে সঙ্গে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন; কিন্তু হেদার যেতে রাজি হননি। তারা ছেলেরা ক্যাম্পে যাবে। হেদার অনুরোধ করলেন, তিনি তাদের বাড়িতে পেনিলোপের সঙ্গে থাকবেন। একটা চোদ্দ ও তেরো বছরের মেয়েকে একা রাখা ঠিক হবে না।

তাই জুলিয়েটকে তাদের সঙ্গে থাকার জন্য বললেন। আর জুলিয়েট তাদের সঙ্গে থাকলে তারও একটা পরিবর্তন আসত। সত্যিই, হেদারের বাড়িতে থাকা তার জন্য অন্য পরিবেশ ছিল। একটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন উজ্জ্বল বাড়ি – সুন্দরভাবে গোছানো, যেটা জুলিয়েটের কাছে মনে হলো বিলাসবহুল। বাড়িটা পরিপাটি আর গোছানো। একই ধরনের বাড়িগুলো বাঁকানো রাস্তার ধারে, আর বাড়ির পেছনে সুবিন্যস্ত ঝোপঝাড় এবং ফুলের বাগান। এই মাসের জন্য মৌসুমটা – হালকা বাতাসপূর্ণ – নাতিশীতোষ্ণ আর উজ্জ্বল। পেনিলোপ আর হেদার ব্যাডমিন্টন খেলতেন – সাঁতার কাটতেন, সিনেমায় যেতেন, বিস্কুট বানাতেন, গোগ্রাসে খেতেন, আবার ডায়েটও করতেন। তারা tans-এর ওপরে কাজ করতেন, বাড়িটা সংগীতে ভরে থাকত, আর যে বাজনা-গীত বাজত তা জুলিয়েটের কাছে রসালো এবং অপছন্দের ছিল। কোনো কোনো সময় তারা মেয়েবন্ধুদের আসতে বলতেন কিন্তু তারা ঠিক ছেলেবন্ধুদের আসতে বলতেন না, তবে বাড়ির পাশ দিয়ে কিংবা পাশের বাড়িতে যারা আসতেন বা জড়ো হতেন, তাদের সঙ্গে উদ্দেশ্যহীন কথা বলতেন।

ঘটনাক্রমে জুলিয়েট শুনতে পেলেন – পেনিলোপ একটা মেয়েকে বলছে, ‘আচ্ছা, আমি কিন্তু তাকে ভালোভাবে জানতাম না।’ তিনি তার বাপের কথা বলছিলেন। ‘কী আশ্চর্য!’

যখন সমুদ্রের পানি উত্থাল থাকত, তখন তিনি তার বাপের সঙ্গে সমুদ্রে যেতে ভয় পেতেন না, যেটা জুলিয়েট পেতেন। তিনি তাকে সমুদ্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাবার কাছে ঘ্যানঘ্যান করতেন এবং প্রায়ই সফল হতেন। পেনিলোপ যখন এরিকের সঙ্গে সাগরে যেতেন তার একটা পেশাদারি ভাবভঙ্গি থাকত। তিনি একটা কমলা রঙের লাইফ জ্যাকেট পরিধান করতেন এবং সিরিয়াস ভাব থাকত।

তিনি দক্ষতার সঙ্গে জাল সেটিং করতেন এবং তাড়াতাড়ি ও নিষ্ঠুরতার সঙ্গে মাছের মাথা আলাদা করে ব্যাগে ভরতেন। তার শৈশবকালে (আট থেকে এগারো বছর বয়সে) সবসময় বলতেন যে, তিনি বড় হয়ে জেলে হবেন। এরিক বলতেন, আজকাল মেয়েরা এ-ধরনের কাজ করছে। জুলিয়েট ভাবতেন, এটা সম্ভব। কারণ পেনিলোপ ছিলেন উজ্জ্বল, স্বাস্থ্যবতী ও সাহসী, কিন্তু পড়াশোনায় মনোযোগী নন। অথচ এরিক (পেনিলোপের শোনার বাইরে) বলতেন, এই স্বপ্নটা তার বাদ হয়ে যাবে। এ-ধরনের জীবন তিনি কারো জন্যই আশা করেন না।

কিন্তু তিনি তার কাজে গর্বিত ছিলেন, এটা জুলিয়েট ভাবতেন। ইদানীং পেনিলোপ পায়ের নখে বেগুনি পলিশ আর পেটের মাঝখানে ফল্স ট্যাটু লাগান। যে-এরিক তার পুরো জীবনকে ঘিরে পরিপূর্ণ করে রেখেছিলেন, তাকে তার মন থেকে মুছে ফেললেন।

জুলিয়েটও ভাবতেন, তিনি বোধহয় একই জিনিস করছেন। অবশ্য তিনি একটা চাকরি খোঁজা ও একটা জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করার জন্য ব্যস্ত ছিলেন।

হোয়েল বে-তে তিনি থাকতে চাননি আর তিনি এরই মধ্যে বাড়িটা বিক্রির জন্য দিলেন। এরিকের ট্রাকটা বিক্রি করলেন এবং যন্ত্রপাতি, মাছ ধরার জাল ও ডিঙি দিয়ে দিয়েছিলেন, Saskatchewan থেকে এরিকের সাবালক ছেলে এসে শুধু কুকুরটা নিয়ে গেল।

জুলিয়েট একটা ইউনিভার্সিটি রেফারেন্স বিভাগে আর একটা পাবলিক লাইব্রেরিতে চাকরির আবেদন করেছিলেন। তিনি ধারণা করেছিলেন একটা না একটা চাকরি হবেই। তিনি কিটসিলানো, ডানবার ও পয়েন্ট গ্রে এলাকায় অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজছিলেন। তিনি আশ্চর্য হতেন, শহরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সাজানো-গোছানো দেখে। এখানে বোধহয় পুরুষরা ঘরের বাইরে অতটা কাজ করে না। বাইরের সঙ্গে ভেতরের কাজের কোনো মিল থাকে না। আবহাওয়া যেখানে একটা ভাবের পরিবর্তন করতে পারে; কিন্তু জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে না। আগে তাদের চিংড়ি, শ্যামন মাছ ধরা ছিল খুবই আনন্দের ব্যাপার; কিন্তু এমন কোনো বড় ব্যাপার ছিল না। কয়েকদিন আগে হোয়েল বে-তে যে জীবনযাপন করছিলেন সেটা এখন তুলনামূলকভাবে অগোছালো মনে হচ্ছে। তিনি এখন চটপটে, দক্ষ এবং আগের চেয়ে অনেকটা বেশি পরিপাটি। তিনি তার অনুভূতিকে বিগত মাসগুলোর থেকে উন্নত করলেন।

তিনি নতুনরূপে আবির্ভূত, এরিকের এখন তাকে দেখা উচিত।

তিনি জানতেন এরিক এখন আর নেই, তবু সর্বদা তিনি আগের মতোই এরিককে তার চিমত্মার ভেতরে রাখতেন। তা সত্ত্বেও তিনি তার মনে তার উলেস্নখ করতেন, যেন এরিক বেঁচে থাকার মতোই তার সামনে অবস্থান করছেন। অন্যদের চেয়ে তিনি এটা বেশিই অনুভব করতেন। যেমন এখনো তিনি সেই ব্যক্তি, যার তিনি চোখের মণি হতে চাইতেন। আরো তিনি তার সঙ্গে যুক্তিতর্ক, তথ্য আদান-প্রদান করতেন।

এটা জুলিয়েটের অবচেতন মনেই চলে আসত। অভ্যাসবশত এরিকের মৃত্যু তার জীবনে কোনো প্রভাব ফেলেনি। তাদের শেষ ঝগড়াটি মীমাংসিত হয়নি। তিনি কিন্তু তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। এ-বিষয়গুলো তার মধ্যে ওই ব্যাপারে আন্দোলিত করে।

 

এরিকের মৃত্যু – ঝড় – দেহ পোড়ানো একটা নাটকের মতো ছিল। তিনি এটা দেখতে বাধ্য হয়েছিলেন আর তাকে বিশ্বাস করতে হয়েছিল। এরিক ও তার মধ্যে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না। তিনি রেফারেন্স লাইব্রেরিতে চাকরি পেলেন। তিনি দুটো বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিলেন। ভাড়াটা তার সাধ্যের মধ্যেই ছিল।

পেনিলোপ আবার টরেন্স হাউসে ফিরে গেলেন আবাসিক ছাত্রী হয়ে। তাদের হোয়েল বে-র জীবনের অধ্যায় শেষ হয়ে গেল। ক্রিস্টাও হোয়েল বে থেকে গুটিয়ে বসন্তে ভ্যানকুভারে চলে এলেন। এক ফেব্রম্নয়ারির দিনে তার অপরাহ্ণ কাজের শেষে ক্যাম্পাসে বাস থামার-ছাউনিতে তিনি অপেক্ষা করছিলেন। বৃষ্টি থামল, পশ্চিমের আকাশটা পরিষ্কার, যেখানে লাল সূর্যাস্ত হলো – Strait of Georgia-র ওপরে এই দীর্ঘদিনের আভাসটা মৌসুম পরিবর্তনের ধারা। অপ্রত্যাশিতভাবে আবহাওয়ার এই পরিবর্তনটার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝতে পারলেন এরিক আর বেঁচে নেই।

মনে হচ্ছিল জুলিয়েট যখন ভ্যানকুভারে ছিলেন, তখন এরিক কোনোখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, যেন তার সঙ্গে আবার একাত্ম হতে পারেন। তার সঙ্গে থাকার একটা খোলা সুযোগ ছিল। আর বর্তমান অবস্থান পূর্বের এরিকের প্রেক্ষাপটে চালিত জীবনের মতোই রয়েছে। তিনি কিছুতেই বুঝতে পারছেন না – এরিক নেই। তার স্মৃতি ও দৈনন্দিন জীবন থেকে এরিকের স্মৃতি মুছে যাচ্ছে।

এটাই হলো শোক। তিনি অনুভব করছেন – তার মন কংক্রিটের মতো হয়ে যাচ্ছে, যেন একবস্তা সিমেন্ট তার শরীরের ওপর ঢালা হয়েছে। তিনি শোকে আর নড়তে পারছেন না। বাসে চড়া, বাস থেকে নামা, তার বিল্ডিংয়ে হেঁটে যাওয়া মনে হতো যেন পাহাড়ে আরোহণ করছেন। এখন তিনি এই অনুভূতিগুলো পেনিলোপ থেকে লুকিয়ে রাখেন। খাওয়ার টেবিলে তিনি কাঁপতে থাকলেন, তিনি কাঁটা আর ছুরিটা স্বাভাবিক হাতে ব্যবহার করতে পারছিলেন না। পেনিলোপ টেবিলের কাছে ঘুরে কৌতূহলের সঙ্গে মায়ের হাত খুলে দিলো। তিনি বললেন, ‘বাবার জন্য, তাই না?’

জুলিয়েট কয়েকজনকে বললেন – যথা ক্রিস্টার মতো – পেনিলোপের আবেগপ্রবণ কথাগুলো তাকে মুক্তি দিলো, যা কেউ কখনো তাকে বলেনি। জুলিয়েটের হাতের ভেতরে পেনিলোপের ঠান্ডা হাতের পরশ বুলিয়ে গেল। পরের দিন লাইব্রেরিতে ফোন করে বললেন, তার মা অসুস্থ, তিনি যেতে পারবেন না। কয়েকদিন তার মাকে দেখাশোনা করলেন। জুলিয়েট সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত পেনিলোপ স্কুলে গেলেন না। অথবা যতদিন ফারাটা না কাটে। ওই দিনগুলোতে জুলিয়েট পেনিলোপকে সবকিছু বললেন, যা তিনি এতদিন পেনিলোপের কাছ থেকে গোপন করেছিলেন। ক্রিস্টা সম্বন্ধে, ঝগড়া, সাগরপাড়ে তার বাবার শবদাহ সম্বন্ধে। সবকিছু।

– ‘এসবের সঙ্গে তোমাকে আমি জড়াতে চাই না।’

– পেনিলোপ বললেন, ঠিক আছে, ভালো, নয়তোবা, তার নীতিতে দৃঢ়ভাবে বললেন – ‘তোমাকে মাফ করলাম, কিন্তু আমি নই।’

পেনিলোপের কথা শুনে তিনি নিজের জগতে ফিরে গেলেন, সেদিনকার বাসস্টপের প্রবল অনুভূতির মতো তিনি।

তার লাইব্রেরিতে গবেষণার কাজের মাধ্যমে সেখানকার প্রভিনশিয়াল টেলিভিশন চ্যানেলের লোকের সঙ্গে পরিচয় হলো এবং চ্যানেলের চাকরির প্রস্তাব পেয়ে সেটা তিনি গ্রহণ করলেন। সেখানে বছরখানেক চাকরির পর তিনি সাক্ষাৎকারের কাজগুলো শুরু করলেন। এতদিনের পাঁচমিশালি পড়া, ছোটখাটো তথ্য,
বিসত্মৃতি কৌতূহল এবং দ্রম্নত আয়ত্তে আনাগুলো এই চাকরিতে খুব কাজে এলো। তার নিজস্ব যুক্তি প্রদর্শন, সামান্য পরিহাসমূলক প্রশ্ন, যা ভালোভাবে উপভোগ্য হতো। বাড়িতে গিয়ে তিনি পায়চারি করতেন আর নিজের বিরক্তি প্রকাশ করতেন, ক্যামেরার সামনে কিছু জিনিস তার অস্পষ্ট হতো। তাকে কিছু জিনিস এলোমেলো করে দেয়-এগুলো মনে করলে তার খুব খারাপ লাগত, বোধহয় তিনি কিছু জিনিস ভুল করেছেন বা ভুল উচ্চারণ হয়েছে।

পাঁচ বছর পর জন্মদিনের কার্ড আসা থেমে গেল।

‘এটা কিছু না’, ক্রিস্টা বললেন। ‘এগুলো ছিল বলার জন্য তিনি কোথাও বেঁচে আছেন। তিনি বুঝেছেন, তিনি সঠিক তথ্যটি পেয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তুমি তার পেছনে কোনো গোয়েন্দা পাঠাবে না। ঠিক আছে, ‘আমি কি তার উদ্বেগের কারণ?’

– ‘ওহ! জুল।’

– ‘এটা শুধু এরিকের মরার বিষয় নয়, অন্যান্য পুরুষের ব্যাপারেও, আমি তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, আমার নির্বোধতা।’

পেনিলোপ যখন চোদ্দ ও একুশের মধ্যে, তখন জুলিয়েট দুজন পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে, তিনি তড়িঘড়ি করে দুজনের প্রেমে পড়লেন। পরে তিনি এ-বিষয়ে লজ্জিত। একজন ছিল তার চেয়ে বয়সে অনেক বড় আর পুরোপুরি বিবাহিত। আবার অন্যজন ছিল তার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট আর জুলিয়েটের মানসিক আবেগে আতঙ্কিত ছিল। পরে জুলিয়েট ভাবলেন, তাদের এ-সম্পর্ক আবেগহীন।

ক্লান্ত ক্রিস্টা বললেন, ‘তোমার তার জন্য যে কোনো অনুভূতি ছিল না, আমি সেটাই ভেবেছি।’ ‘হে ঈশ্বর, আমি যে কি বোকা, আমি এভাবে পুরুষদের সম্পর্কে ভাবি না, ভাবি কি?’

ক্রিস্টা কিছু বললেন না, কারণ এটা হতে পারে যে, তার বেশি পুরুষপ্রার্থী ছিল না।’

– ‘না, জুল না।’

– ‘আসলে’, আমি এমন কিছু খারাপ কাজ করিনি। জুলিয়েট উজ্জ্বলভাবে বললেন, আমি যে কেন সবসময় দুঃখিত হই, বোধহয় এটা আমার দোষ।

– তিনি একটা ধাঁধা, এটাই বাস্তব। তিনি একটা রেজুলেশনের প্যারোডি করে বললেন, – তিনি একটা ধাঁধা এবং রক্তহীন মরা মাছ।

– না, ক্রিস্টা বললেন।

– জুলিয়েট বললেন, না, না, না – ওটা সত্য নয়।

২ জুনের পর পেনিলোপের কাছ থেকে যখন কোনো খবর পেলেন না, তখন জুলিয়েট ওই বাসা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ক্রিস্টাকে বললেন, প্রথম পাঁচ বছর তিনি জুন মাসে অপেক্ষা করেছেন, জুন এই ভেবে যে, কোনো খবর আসতে পারে। আর প্রতিদিন হতাশা।

তিনি তার আগের বাসা থেকে West End-এর উঁচু ভবনে বাসা পরিবর্তন করলেন, তিনি চেয়েছিলেন, পেনিলোপের কামরার সব জিনিস ফেলে দেবেন, কিন্তু শেষে গারবেজ ব্যাগে ভরে তার সঙ্গে নিয়ে এলেন। এখানে তার শুধু একটা বেডরুম আর স্টোরের জায়গা ছিল সর্বতলে। তিনি জগিং করা শুরু করলেন স্ট্যানলি পার্কে। এখন  তিনি কালেভদ্রে পেনিলোপের কথা বলেন, এমনকি ক্রিস্টাকেও। তার এখন একটা বয়ফ্রেন্ড। আজকাল বোধহয় তাদের এটাই বলা হয়। – তিনি পেনিলোপ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না।

ক্রিস্টা ধীরে ধীরে রোগা ও খিটখিটে হয়ে এলো এবং হঠাৎ করে জানুয়ারিতে তিনি মারা গেলেন।

যা-হোক, একই মুখশ্রী দেখতে দর্শকরা আগ্রহী থাকুক, না কেন, একটা সময়, তারা ভিন্ন কাউকে আশা করে চিরদিন টেলিভিশনের উপস্থাপনা করা যায় না। জুলিয়েটের অন্য চাকরিরও প্রস্তাব ছিল – গবেষণা, writing voice ন্যাচারাল অনুষ্ঠানের জন্য; তিনি হাসিমুখে এসব নাকচ করে দিলেন, আসলে তার একটা পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। তিনি ফিরে গেলেন ক্লাসিক্যাল স্টাডিতে, এই ডিপার্টমেন্টটা এখন আগের চেয়েও ছোট, এখানে এসে তার Ph.D. থিসিস লেখার কাজ আবার শুরু করবেন।

তিনি কিছু অর্থ বাঁচানোর জন্য হাইরাইজ অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ব্যাচেলর ফ্ল্যাটে চলে এলেন।

তার বয়ফ্রেন্ড চায়নায় একটা শিক্ষকতার চাকরি পেয়েছেন। তার ফ্ল্যাট ছিল বাড়িটার সর্বনিচতলায়, সস্নাইডিং দরজাগুলো পেছনে নিচতলার লেভেলে খুলত। সেখানে তার ছিল ইটপাতা বারান্দা, মাচাই ছিল; মটরশুঁটির লতা আর বনলতাবিশেষ। আর টবে ছিল শক্ত ডাঁটার লতা ও ফুলগাছ। তার জীবনে প্রথমবারের মতো খুব নগণ্যভাবে তিনি তার বাবার মতো একজন মালি হলেন।

কখনো কখনো – বাইরে গেলে – এই যেমন দোকানে, ক্যাম্পাসে বাসে চড়ার সময় লোক বলত – ‘মাফ করবেন, আপনার মুখটা খুব পরিচিত।’ কিংবা ‘আপনি সেই টেলিভিশনের মহিলা না?’

কিছুদিন পর – লোকে আর জিজ্ঞাসা করত না। সময় কাটত – বসে, বই পড়ে, রাস্তার ধারে টেবিলে কফি পান করে আর কেউ তাকে লক্ষ করত না। তার চুল অনেক লম্বা হলো। বছরগুলোতে চুলটা লাল রাঙানো ছিল, প্রকৃতির যে ব্রাউন রং ছিল সে-উজ্জ্বলতা হারিয়ে গেছে। তার চুলের রং  এখন বেশ রুপালি – বাদামি, মিহি আর ঢেউকাটা। নিজেকে মনে হতো তার মা সারার মতো। সারার চুল নরম, রুপালি, বাতাসে ওড়ার মতো এবং ধূসর থেকে সাদা।

ফ্ল্যাটটা এত ছোট ছিল যে, লোকজনকে দাওয়াত করে আপ্যায়ন করার জন্য কোনো জায়গা ছিল না। রান্না করার উৎসাহও ছিল না। তিনি একঘেয়ে পুষ্টিহীন খাবার খেতেন। তার বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এটা আশ্চর্যের কিছু ছিল না।

তিনি প্রাণবন্ত, সচেতন, দক্ষ তথ্যসমৃদ্ধ ব্যক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন সাধারণ জীবনযাপন থেকে। যতক্ষণ তিনি জেগে থাকতেন ততক্ষণ বইয়ের মধ্যে মগ্ন থাকতেন, আর যে-কোনো বিষয়ে তিনি পড়া শুরু করতেন এবং সেই বিষয়টার গভীরে ঢুকতেন এবং পরিবর্তিত রূপ নিতেন। পড়ায় এতই মগ্ন থাকতেন যে, এক সপ্তাহ পর্যন্ত বিশ্বখবর দেখাও হতো না। তিনি তার থিসিসের কাজ বাদ দিলেন।

তার আগ্রহ হলো গ্রিক লেখকদের প্রতি, যেসব লেখা গ্রিক সাহিত্যের শেষের দিকের (যেটা শুরু হয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে, তিনি এখন এটাই বলেন এবং চলমান মধ্যযুগের শুরু পর্যন্ত)। Arsteides, Longus, Heliodorus, Achilles Tatius, তাদের বেশিরভাগ লেখাই হারিয়ে গেছে আর কিছু খ- খ- এবং যা অশস্নীল হিসেবে পরিচিত। কিন্তু Heliodorus-এর লেখা রোমান্স যাকে ‘ইথিওপিকা’ বলা হয়। (যার মূল রচনাটি অরিজিনাল বুদার ব্যক্তিগত পাঠাগারে রয়েছে) এবং ইউরোপে পরিচিত, যা বেসলে ১৫৩৪ সালে প্রকাশিত হয়।

‘ইথিওপিকা’ গল্পে ইথিপিয়ার রানী একটি সাদা বাচ্চার জন্ম দেন, একটি কন্যা এবং ব্যভিচারের অপরাধে দায়ী হওয়ার ভয়ে তিনি তার কন্যাকে দিগম্বর সন্ন্যাসীর কাছে দিয়ে দিলেন লালন-পালন করার জন্য। যোগী নগ্ন সন্ন্যাসীরা ছিলেন – নগ্ন দার্শনিক, সন্ন্যাসী ও আধ্যাত্মিক। মেয়েটার নাম ছিল Charicleia, অবশেষে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো ডেলফিতে, যেখানে তিনি হলেন Artemis-এর একজন পুরোহিত। ওখানে তার সাক্ষাৎ হলো noble Thessalian-এর সঙ্গে, যে তার প্রেমে পড়ল আর একজন চতুর ইজিপ্টশিয়ানের সাহায্যে মেয়েটাকে উদ্ধার করল। বিষয়টা হলো – ইজিপ্টশিয়ান রানী – তিনি কখনো তার মেয়েকে ভুলতে পারেননি। এই ইজিপ্টশিয়ানকে নিযুক্ত করলেন তার মেয়েকে খুঁজে বের করতে। অনেক ঘটনার মধ্য দিয়ে মোরিওতে সব চরিত্রের এক জায়গায় সাক্ষাৎ ঘটল এবং Charicleia-কে উদ্ধার করা হলো – শেষ মুহূর্তে, যখন তার বাবা তাকে বলি দিতে যাচ্ছিল।

মেয়েটাকে কেন্দ্র করে এই গল্পটা মৌমাছির চক্রের মতো জুলিয়েটকে সবসময় আকর্ষণ ও মুগ্ধ করত। বিশেষ করে দিগম্বর সন্ন্যাসীর অংশটুকু। তিনি তাদের সম্বন্ধে যথাযথভাবে তথ্য বের করার চেষ্টা করতেন, যারা হিন্দু দার্শনিক হিসেবে পরিচিত। এ-বিষয়ে এটা কি হতে পারে ইন্ডিয়া ইথিওপিয়ার পাশে? না Heliodorus – অনেক পরে এসেছে, তার ভূগোলজ্ঞান তো বেশ ভালোই ছিল। এই যোগী নগ্ন সন্ন্যাসীরা দূরদূরান্তে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াতেন, আকর্ষণের সঙ্গে আবার বিকর্ষণ করত, যারা তাদের সঙ্গে বসবাস করত আর তারা পার্থিব বস্তুর আকাঙ্ক্ষা এড়িয়ে চলতেন, এমনকি কাপড় এবং খাবারের প্রতিও তাদের ছিল এমনই অনীহা। একটি সুন্দরী মহিলা দিগম্বর সন্ন্যাসীদের মাঝে বেড়ে উঠলে তার জীবনে কিছু বিকৃত উজ্জ্বল চাহিদা হতো, কিন্তু জীবনটা তাদের মতোই শূন্য।

ল্যারি হলো জুলিয়েটের নতুন বন্ধু। তিনি গ্রিক পড়াতেন আর জুলিয়েটকে তার বাড়ির বেজমেন্টে পেনিলোপের জিনিসপত্র রাখতে দিলেন। তার কল্পনা ছিল, কী করে তারা এথিওপিকাকে সংগীত-সংস্কৃতিতে দাঁড় করাবেন। জুলিয়েট এটায় সহযোগী হিসেবে চমৎকার নিরীহ গান আর অযৌক্তিক স্টেজের প্রভাবের সঙ্গে মিলিয়ে কাজ করার চিমত্মাভাবনা করেন। কিন্তু তিনি গোপনে এটার শেষ অংশটা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, যেটা এথিওপিকার শেষে ছিল, যেটা রানীর মেয়েটার ঘটনা।

সেটাকে তিনি ঘুরিয়ে দিলেন, জুলিয়েট চাইলেন মেয়েটি নিশ্চয় বৃদ্ধ প–তের সঙ্গে জালিয়াতির সম্পর্ক গড়ছিল, যেটা ছিল নকল নিকৃষ্ট, আর এটাই জুলিয়েট চেয়েছিলেন। অবশেষে ইথিওপিয়ার রানীর উদারতায় ও অনুশোচনায় পুনরায় তাদের সম্পর্ক স্থাপন হলো।

জুলিয়েট একেবারে নিশ্চিত যে, তিনি মাদার শিপটনকে ভ্যানকুভারে দেখেছেন। তিনি কিছু তার পরনের কাপড়জামা যেগুলো সে কোনোদিন আর পরবেন না, সেগুলো Salvation Army Thrift store-এ দিতে যান (ওয়্যারড্রোবে এখন শুধু ব্যবহারের উপযোগী কাপড়গুলো)।

যে-কক্ষে কাপড়চোপড় জমা নেওয়া হয়, সেখানে একজন বয়স্ক মোটা মহিলাকে দেখল, যে ট্রাউজারে MuvMuu Fixing ট্যাগ লাগাচ্ছে।

মহিলাটা অন্য কর্মচারীর সঙ্গে কথাবার্তায় ব্যস্ত। তার ভাব ছিল একজন সুপারভাইজরের হাসিখুশি কিন্তু অতিসতর্ক ওভারশিয়ার
অথবা তার ভাবমূর্তিটি ছিল একজন অফিসিয়াল উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার মতো, যদিও তিনি তা ছিলেন না। যদি তিনি আদৌ মাদার শিপটন, তিনি তার আগের অবস্থান থেকে অনেক নিচে কিন্তু খুব বেশি নয়।

যদি তিনি মাদার শিপটন, তাহলে প্রাণবন্তময় এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েও, এতটা নিচে নামা কি তার পক্ষে সম্ভব?

ঝাঁকে ঝাঁকে উপদেশ, একগাদা উপদেশ, বিষাক্ত উপদেশ; প্রচ- ক্ষুধা নিয়ে তিনি আমাদের কাছে এসেছিলেন।

জুলিয়েট ল্যারিকে পেনিলোপের কথা বললেন। একজনকে পেনিলোপের কথা বলা জরুরি ছিল। ‘আমার কি তাকে একটা noble লাইফের কথা বলা উচিত ছিল’ – জুলিয়েট বললেন। ‘বিসর্জন? নিজের জীবনকে কি অন্যের সামনে মেলে ধরবে? আমি কিন্তু এভাবে চিমত্মা করিনি। আমার জীবনে যে-ঘটনাগুলো ছিল সেগুলো আমার মতো, তার জন্য ভালো হতো না, হয়তো বিতৃষ্ণ করত?’

ল্যারি এমন একজন পুরুষ ছিলেন যার জুলিয়েটের কাছে কোনো চাহিদা ছিল না। শুধু তার বন্ধুত্ব ও হাসিখুশি Humor। তিনি ছিলেন, যাকে বলা যায় পুরনো ধাঁচের ব্যাচেলর, আর যৌন চাহিদাহীন ব্যক্তি এবং তার ব্যক্তিগত বিষয়ে খুঁতখুঁতে কিন্তু ফুর্তিবাজ।

আরো দুজন পুরুষ মানুষ তার সংস্পর্শে এলো, যারা তার সহযোগী হতে চেয়েছিলেন। একজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয় side walk table-এ এবং তিনি ছিলেন সাম্প্রতিক বিপত্নীক। জুলিয়েট তাকে পছন্দ করতেন, কিন্তু তার একাকিত্ব সাম্প্রতিক ছিল আর জুলিয়েটের প্রতি তার এত উন্মাদ আকর্ষণ ছিল, যা জুলিয়েটকে ঘাবড়ে দিলো।

আরেকজন ছিলেন ক্রিস্টার ভাই, যার সঙ্গে তার বহুবার সাক্ষাৎ হয়েছে ক্রিস্টার জীবিতকালে। তিনি অনেকটা ছিলেন ক্রিস্টার মতো। তার সঙ্গ জুলিয়েটের সঙ্গে মানানসই। তার বিবাহ অনেকদিন আগে ভেঙে যায়। আর তিনি উন্মাদ ছিলেন না, ক্রিস্টার কাছ থেকে জুলিয়েট জানতেন। অনেক মহিলাই তাকে বিবাহ করার জন্য প্রস্ত্তত ছিল; কিন্তু তিনি সেগুলো এড়িয়ে যেতেন। তিনি খুব বাস্তববাদী ছিলেন, তিনি জুলিয়েটকে পছন্দ করেন তার স্বার্থসিদ্ধির জন্য। সেখানে ছিল কিছু মানহানিকর অবস্থা।

কিন্তু মানহানি?

এমন ছিল না যে, তিনি তাকে ভালোবাসতেন। ক্রিস্টার ভাই Gary Lamb-এর সঙ্গে তার যখন সম্পর্ক হয়, জুলিয়েটের ভ্যানকুভারের এক রাস্তায় হেদারের সঙ্গে তার দেখা হয়। সেই সন্ধ্যায় জুলিয়েট আর গ্যারি থিয়েটার দেখে বের হয়ে আলোচনা করছিলেন রাতে কোথায় ডিনার করবেন। সেটি ছিল একটি গ্রীষ্মের রাত, আকাশে তখনো আলো ছিল।

‘এক মহিলা পার্শ্ব রাস্তায় হেঁটে যাওয়া গ্রম্নপ থেকে পৃথক হয়ে জুলিয়েটের সামনে এলো। মহিলাটির বয়স প্রায় তিরিশের শেষে – রোগা, আধুনিকমনস্ক – তার গাঢ় গুচ্ছ চুল ওয়েলসের লোকের মতো।

‘মিসেস পর্টিয়াস; মিসেস পর্টিয়াস।’

জুলিয়েট কণ্ঠটা চিনল। তিনি কখনো তার মুখটা চিনতেন না। এটা তো সেই হেদার।

‘কী আশ্চর্য’ হেদার বললেন, আমার স্বামী একটা কনফারেন্সে এসেছেন। আমি তার সঙ্গে তিনদিন ধরে এখানে এসেছি আর আগামীকাল চলে যাব। আমি মনে করেছি এখানে বোধহয় কাউকেই চিনি না; কিন্তু হঠাৎ করে তোমাকে দেখলাম।

জুলিয়েট তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এখন তিনি কোথায় আছেন?

উত্তরে তিনি বললেন – কানেটিকাটে আছি।

‘তোমার কি আমার ভাই যশকে মনে আছে?’ ‘তিন সপ্তাহ আগে আমি Edmonton-এ আমার ভাই যশ ও তার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম এবং ঠিক এরকমই এক রাস্তায় পেনিলোপের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। না, আসলে দেখা হলো একটা বিরাট মলে। তার সঙ্গে কয়েকজন ছেলেমেয়ে। সে তাদের এখানে এনেছিল স্কুলের ড্রেস কেনার জন্য। সবকটিই ছেলে ছিল। আমরা একজন আরেকজনকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমি তাকে না চিনলেও সে আমাকে চিনল। সে থাকত উত্তরে। সে বলল, উত্তরাঞ্চল ছিল সভ্য। সে উত্তরাঞ্চল থেকে এখানে পেস্ননে করে এসেছে। সে বলল, ‘জুলিয়েট এখানেই থাকে। আমি এখন কিছু লোকের সঙ্গে এসেছি, যারা আমার স্বামীর বন্ধু, তাই আমি তোমাকে কোনো ফোন করার সময়ই পাইনি।’

জুলিয়েট ইশারা করে বললেন, নিশ্চয় তোমার কোনো সময় ছিল না আর কোনো প্রয়োজনও ছিল না। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, হেদারের কটি ছেলেমেয়ে।

– তিনটি। তারা দুর্দান্ত। আশা করি তারা যেন তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়। আমার জীবনটা পেনিলোপের চেয়ে অনেক আয়েশি। তার তো পাঁচজন।

– ‘আচ্ছা’।

– ‘আমাদের তাড়া আছে, আমরা এখন একটা সিনেমা দেখতে যাব, আমি সিনেমা সম্পর্কে কিছুই জানি না। ফরাসি সিনেমা ভালো লাগে না। কিন্তু সবকিছু মিলে তোমার সঙ্গে এভাবে সাক্ষাৎ একটা বিরাট ব্যাপার। আমার মা-বাবা এখন হোয়াইট রকে আছে। তারা সবসময় তোমাকে টিভিতে দেখত এবং বড়াই করে তাদের বন্ধুদের কাছে বলত, তুমি আমাদের বাসায় থাকতে। আমার বাবা-মা বলল, এখন নাকি তুমি আর টিভিতে নেই? তোমার কি টিভির প্রতি অভক্তি এসেছিল?’

– কিছুটা ওরকমই।

– ‘আমি আসছি। আমি আসছি।’ সে জুলিয়েটকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিলো, যেটা আজকাল সবাই এভাবে করে আর সে দৌড়ে তার বন্ধুদের কাছে চলে গেল।

আচ্ছা। পেনিলোপ তো এডমন্টনে থাকে না – সে পেস্ননে করে এডমন্টনে এসেছিল। তার মানে নিশ্চয় সে হোয়াইটহর্স বা ইয়েলোনাইফে বসবাস করে। না হলে কোনো জায়গাকে বেশ সভ্য বলে বর্ণনা করতে পারে। হতে পারে, পেনিলোপ হেদারকে ব্যঙ্গবিদ্রম্নপ করে কথাটা বলেছে।

পেনিলোপের পাঁচ সমত্মানের মধ্যে অন্তত দুটি ছেলে। তারা স্কুলড্রেস বানাতে মলে এসেছিল। তার মানে তারা প্রাইভেট স্কুলে পড়াশোনা করে। তার মানে তার অর্থ আছে।

হেদার তাকে প্রথমেই চিনতে পারেননি। তাহলে কি পেনিলোপের চেহারায় বয়সের ছাপ পড়েছিল? পাঁচটা সমত্মানের গর্ভধারণের পর কি সে আর তার শরীরের গড়নের দিকে যত্ন নেয়নি? অবশ্য হেদার নিয়েছিলেন জুলিয়েটের মতোই।

তিনি এমন একজন মহিলা, যার কাছে বাচ্চা হওয়ার পর শরীরের প্রতি যত্ন নেওয়াটা একটা হাস্যকর। এটা নিরাপত্তাহীনের স্বীকারোক্তি? অথবা তার এ-বিষয়ে চিমত্মা করার কোনো সময়ই ছিল না।

জুলিয়েট ভেবেছিলেন – পেনিলোপ বোধহয় অতিপ্রাকৃত সাধুদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এবং সে সাধু হলো – আর তার জীবনটা গভীর ধ্যানেই কাটাত। নয়তো তার জীবনটা খুব সাদামাটা জীবন হতো – তার রুজি হতো কষ্টের অনিশ্চিত জীবন – যথা জেলে, সম্ভবত এক স্বামী, আর কিছু গ্রাম্য ছেলেমেয়ের সঙ্গে সে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার উপকূলের এক খুব ঠান্ডা পানির স্থানে বসবাস করত।

মোটেই না। সে এখন স্বাবলম্বী এবং সংসারী। হতে পারে, তার এক ডাক্তারের সঙ্গে বিবাহ হয়েছে কিংবা আমলাদের একজন, যে দেশের উত্তরাংশে দায়িত্বে ছিল। আর যখন তাদের প্রাধান্য কমিয়ে সচেতনভাবে বিতর্ক ছাড়াই ভালোভাবে স্থানীয়দের কাছে স্থানান্তর করা হয়, পেনিলোপের সঙ্গে যদি আদৌই দেখা হয়, তখন তারা এসব চিমত্মাধারা হেসেই উড়িয়ে দিয়ে জুলিয়েটের এসব ধারণা যে ভুল ছিল তা প্রতিষ্ঠিত হলো, যখন জুলিয়েট আর পেনিলোপের ভিন্নভাবে হেদারের সঙ্গে দেখা হয়েছে – এ-কথাটা বললেই তারা হাসত।

– ‘না, না।’

বিষয়টা ছিল যে জুলিয়েট পেনিলোপকে ঘিরে অনেক হেসেছে। অনেক বিষয়ই ঠাট্টা যথা – অনেক জিনিসের মতোই – ব্যক্তিগত জিনিস, ভালোবাসা যেটা ছিল সুখকর, এটা দুঃখজনক হতো। তার মাতৃত্বের প্রবৃত্তি, আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অভাব ছিল।

পেনিলোপ হেদারকে বলেননি যে, মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন। শুধু বলেছেন যে, জুলিয়েট এখন ভ্যানকুভারে থাকেন। যদি পেনিলোপ এটা বলতেন, তাহলে হেদার জুলিয়েটের সঙ্গে এত খোলামেলা কথাবার্তা বলতেন না।

যদি না তিনি টেলিফোন ডিরেক্টরি চেক করে থাকেন তবে পেনিলোপ কীভাবে জানলেন যে, তার মা এখানে আছেন।

যদি জানতেনই, এটার মানেটা কী?

কিছুই না, এটার কোনো মানে নেই।

যখন পেনিলোপের ব্যাপারে হেদারের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল, তখন গ্যারি কিছুটা দূরে সরে গিয়ে, পরে আবার জুলিয়েটের সঙ্গে যোগ দিলেন।

হোয়াইটহর্স, ইয়েলোনাইফ নামগুলো ভাবলেই জুলিয়েটের খুব কষ্ট হতো। এখানে তিনি পেস্ননে চড়ে যেতে পারতেন। রাস্তায় ঘুরতেন আর তাকে একঝলক দেখার আশা করতেন।

কিন্তু জুলিয়েট উন্মাদ ছিলেন না। তিনি এত উন্মাদ হতে পারেন না।

ডিনারে, তিনি বসে পেনিলোপের ভালো থাকার খবরে অনেকটা আশ্বস্ত হলেন আর ভাবলেন গ্যারির সঙ্গে বিবাহ বা থাকা সম্পর্কে – যেটা তিনি চাইতেন সেটা হতো। এখন কোনো চিমত্মার কারণ নেই, বরং পেনিলোপ কোনো ছায়ামূর্তিও নয় – তিনি নিরাপদ আছেন, সম্ভবত তিনি সুখী। তিনি জুলিয়েটের থেকে আলাদা হয়েছেন, খুব সম্ভবত জুলিয়েটের স্মৃতিও মুছে গেছে এবং জুলিয়েটের অবস্থাও তার চেয়ে বেশি ভালো নয়।

যখন হেদারকে পেনিলোপ বলেছিলেন যে – জুলিয়েট ভ্যানকুভারে আছে। তিনি কি জুলিয়েট বলে ডেকেছিলেন? নাকি, ‘মা, আমার মা’ বলেছিলেন?

জুলিয়েট গ্যারিকে বলেছিলেন, হেদার তার পুরনো বন্ধুদের মেয়ে। তিনি কখনো গ্যারিকে পেনিলোপ সম্বন্ধে কিছু বলেননি আর তিনিও কৌতূহল প্রকাশ করেননি পেনিলোপের অসিত্মত্ব নিয়ে। এটা সম্ভব যে, ক্রিস্টা তাকে পেনিলোপ সম্বন্ধে কিছু বলেননি আর গ্যারিও এ-বিষয়ে চুপচাপ ছিলেন। অথবা ক্রিস্টা বলে থাকলেও তিনি ভুলে গেছেন। হতে পারে ক্রিস্টা কখনো পেনিলোপ সম্বন্ধে কিছুই বলেননি, এমনকি তার নামও বলেননি। যদি জুলিয়েট তার সঙ্গে থাকতেন তাহলেও পেনিলোপের কথা উত্থাপন হতো না। প্রকৃতই উত্থাপন হতো না – আর তার অসিত্মত্বই ছিল না।

পেনিলোপের অসিত্মত্বই ছিল না। পেনিলোপ-জুলিয়েটের সম্পর্ক শেষ। যে-মহিলাকে হেদার এডমন্টনে দেখেছিলেন, যে মা তার ছেলেমেয়েকে স্কুল ইউনিফর্ম ক্রয়ের জন্য মলে এনেছিলেন, যার মুখ আর শরীর পরিবর্তিত, তাই হেদার তাকে চিনতে পারেননি আর জুলিয়েটের চেনার মধ্যে ছিল না।

জুলিয়েট কি এটা বিশ্বাস করেন?

জুলিয়েটের অস্থিরতা যেন গ্যারি না দেখার ভান করতেন।

কিন্তু সম্ভবত ওই সন্ধ্যায় তারা দুজনেই বুঝতে পেরেছেন, তারা কখনো একসঙ্গে থাকতে পারবেন না। যদি এটাই সম্ভব হতো তবে জুলিয়েট বোধহয় তাকে বলতেন।

‘আমার মেয়ে আমার কাছ থেকে বিদায় না নিয়েই চলে গিয়েছিল, আর সে বোধহয় বুঝতে পারেনি, সে চলে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারেনি এটা তার মঙ্গল, তারপরে ধীরে ধীরে, আমি বিশ্বাস করি যে, তার ভেতরে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা হয়েছিল। এটাই ছিল তার নতুন জীবনধারার উদ্দেশ্য।’

‘এটা বোধহয় সে আমাকে বোঝাতে একটু দ্বিধাবোধ করেছিল। অথবা এটা বলার সময়ই ছিল না, সত্যিকার অর্থে আমরা সর্বদা ধারণা করি, কারণ কী? আর ওই কারণটা বের করার চেষ্টা করি। এবং আমি অনেক কিছুই বলতে পারি, যেটা আমার ভুল হয়েছে। কিন্তু বিষয়টা অত সহজে বিশেস্নষণ করা যায় না। তার স্বভাবে ছিল কিছুটা পবিত্রতা। হ্যাঁ, তার ভেতরে ছিল সূক্ষ্মতা, সুস্পষ্টতা এবং পবিত্রতা আর পাথরের মতো শক্ত স্বচ্ছতা। আমার বাবা বলতেন, যদি কারো ভেতরে ওই বিষয়গুলো না থাকত তবে তার কাছে তার কোনো অসিত্মত্ব থাকত না। এসব কথার অর্থ সেগুলোই কি বোঝাত না? পেনিলোপের বোধহয় আমার আর প্রয়োজন নেই। হতে পারে সে আমাকে সহ্য করতে পারে না। সেটাই সম্ভব।’

জুলিয়েটের এখন কিছু বন্ধু আছে, কিন্তু আগের মতো নয়, কিন্তু বন্ধু। ল্যারি এখনো আসেন এবং হাসিঠাট্টা করেন।

জুলিয়েট পড়াশোনা নিয়ে থাকেন। তার এটাকে তার কর্মের সঙ্গে স্টাডি অর্থ বলার চেয়ে – অনুসন্ধানটাই মানানসই।

জুলিয়েট যে কফির দোকানে রাস্তার দিকের টেবিলে বসে দীর্ঘ সময় কাটাতেন, সেখানেই তিনি প্রতি সপ্তাহে দীর্ঘ সময় কাজ করতেন টাকা-পয়সার ঘাটতির কারণে। তার এ-কাজটার সঙ্গে প্রাচীন গ্রিকের কাজের একটা সামঞ্জস্য আছে। তাই তিনি বিশ্বাস করেন, তিনি এই কর্মটা ছাড়বেন না এবং যথাসম্ভব কাজটা করবেন। তিনি খুব জোরালোভাবে আশা করেন না যে, পেনিলোপের কাছ থেকে একটা খবর পেতে পারেন। যেসব লোক জানে তিনি তাদের মতোই ভালো আশা করেন; অসংগত আশীর্বাদ, স্বতঃস্ফূর্ততা, ক্ষমা, ওই ধরনের জিনিস।

Leave a Reply

%d bloggers like this: