নোবেল পুরস্কার ২০১৮ ইউরোপের শীর্ষ সৃষ্টিশীল ঔপন্যাসিক পুরস্কার পেলেন

লেখক: মাসুদুজ্জামান

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার নিয়ে বিশ্বজুড়ে পাঠকদের আগ্রহের পারদ যেমন তুঙ্গে থাকে, তেমনি একে ঘিরে কেলেঙ্কারিরও বুঝি শেষ নেই। এবারো এই পুরস্কারটি বিতর্কমুক্ত হতে পারল না। যে দুজন পুরস্কার পেলেন তাঁদের একজন গণহত্যার সমর্থক হিসেবে প্রচ- নিন্দিত ছিলেন। কিন্তু একে উপেক্ষা করেই, বলা যায়, চলতি বছরের (২০১৯) পুরস্কারটি তাঁর হাতেই তুলে দেওয়া হলো। যাঁর বিরুদ্ধে এই গণহত্যাকে বৈধতা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তিনি হচ্ছেন অস্ট্রিয়ার জার্মানভাষী লেখক পিটার হান্ডকে। হান্ডকে পেয়েছেন ২০১৯ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার আর ২০১৮ সালের পুরস্কারটি পেয়েছেন পোলিশ কথাসাহিত্যিক ওলগা তোকারচুক। এও এক কা-, প্রতিবছর পুরস্কার প্রদানের যে-প্রথা ছিল, সেটিও গত বছর অনুসরণ করতে পারেনি নোবেল অ্যাকাডেমি। সেটাও ঘটেছে অন্য আরেক কেলেঙ্কারির কারণে। আমার এই লেখাটি শুরু করা যায় সেখান থেকেই।

দুই
অন্যান্য পুরস্কারের সঙ্গে প্রতিবছর নোবেল সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়; কিন্তু ২০১৮ সালে যৌন কেলেঙ্কারি আর আর্থিক অব্যবস্থাপনার কারণে পুরস্কারটি স্থগিত হয়ে যায়। পুরস্কার কমিটির প্রায় সবাই পদত্যাগ করেন। সৃষ্টি হয় নৈরাজ্য আর এই নৈরাজ্যের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী এ-পুরস্কারটি কাউকে দেওয়া যায়নি। সংকটের সূত্রপাত সুইডিশ অ্যাকাডেমির সদস্য ক্যাটারিনা ফরস্টেশনের স্বামী জ্যঁ-ক্লদে আরনল্টকে কেন্দ্র করে। তিনি রাজকুমারীর সঙ্গে অসদাচরণ করেছিলেন বলে শোরগোল পড়ে যায়। তিনিই আবার পুরস্কারের গোপনীয়তা ফাঁস করে দিয়েছিলেন বলে সংবাদ বেরোয়। যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগে আরনল্টের দুই বছরের কারাভোগের শাস্তি হয়। আরনল্টের স্ত্রী ফরস্টেশন সুইডিশ অ্যাকাডেমির সদস্যপদ ত্যাগ করেন। পদত্যাগ করেন আরো অনেকেই, যদিও অ্যাকাডেমির বিধান অনুসারে এর সদস্যরা ছিলেন এর আজীবন সদস্য। পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়াটি এভাবেই বাধাগ্রসত্ম হওয়ায় সুইডিশ অ্যাকাডেমি গত বছর কাউকে পুরস্কার দেয়নি, দেয়নি নয়, বলা ভালো দিতে পারেনি। এই প্রেক্ষাপটে এ-বছর পুরস্কার দেওয়ার আগে সুইডিশ অ্যাকাডেমির পুরস্কার কমিটির প্রধান অ্যান্ডার্স অলসন জানিয়েছিলেন, পুরস্কার দেওয়ার নিয়মকানুন তাঁরা বদলে ফেলেছেন। এখন থেকে সুইডিশ অ্যাকাডেমির সদস্যরা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সদস্য থাকবেন, আজীবনের জন্য নন। ইউরোকেন্দ্রিকতা, অর্থাৎ ইউরোপীয় লেখকরাই পুরস্কার পান বলে যে-দুর্নাম রয়েছে আর নারী-লেখকদের উপেক্ষা করার যে-প্রবণতা দেখা গেছে, এসব থেকে তাঁরা সরে আসবেন। গত বছরের স্থগিত পুরস্কারটি এ-বছর দেওয়া হবে আর এ-বছরের পুরস্কার তো থাকছেই। অলসনের এ-কথার মধ্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে, একশ চোদ্দো বছরের নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে যে ১৪ জন নারী-লেখক পুরস্কার পেয়েছেন, সে-তালিকায় এবার আরো একজন নারী-লেখক নিশ্চিতভাবেই যুক্ত হবেন। ঘটেছেও তাই। কিন্তু এবারো পুরস্কার কমিটির সদস্যরা ইউরোকেন্দ্রিকতা থেকে সরে আসতে পারেননি। ওলগা ও হান্ডকে দুজনই ইউরোপের দুটি দেশের লেখক। পুরস্কারটি সেদিক থেকে ‘অল-ইউরোপীয়’ হয়ে গেছে। সুইডিশ কমিটি যে-ইঙ্গিত দিয়েছিল, তার সঙ্গে বাসত্মবের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া গেল না। অন্য মহাদেশের লেখকদের প্রতি পুরস্কার কমিটির সদস্যদের দৃষ্টি প্রসারিত হলো না। তবে দুজন লেখকের একজন যে নারী হবেন, সে-অঙ্গীকার তাঁরা রক্ষা করেছেন। কিন্তু আরেকটি কলঙ্কের দাগ ২০১৮ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কারকে অনেকটাই মস্নান করে দিলো। সেটা হচ্ছে, গত শতকের নয়ের দশকে বসনীয় গণহত্যার প্রধান অভিযুক্ত রাজনীতিক সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট সেস্নাবোদান মিলোসেভিচের সমর্থক ছিলেন পিটার হান্ডকে। তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন মিলোসেভিচের অমেত্ম্যষ্টিক্রিয়ায়। হান্ডকের এ-ভূমিকার বিরুদ্ধে তখনই মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার অন্য অনেকের সঙ্গে এর নিন্দা জানিয়েছিলেন সালমান রুশদিসহ অনেক লেখক। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর হান্ডকের এই নিন্দনীয় ভূমিকার বিষয়টি আবারো আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। নোবেল কমিটি এরকম একজনকে পুরস্কার দেওয়ায় সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠেন বিশ্বের নানা প্রামেত্মর লেখকরা। সেটি যে নিঃসনেদহে ঘৃণ্য একটি বিষয় হয়ে উঠেছে, সে-কথা বলাই বাহুল্য। অথচ নোবেল সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তনের মুহূর্তে এর প্রতিষ্ঠাতা আলফ্রেড নোবেল এই পুরস্কার পাওয়ার মানদ- হিসেবে উলেস্নখ করেছিলেন, ‘মানবতার পক্ষে’ যে-লেখক অবদান রাখবেন, তাঁকেই পুরস্কারটি দেওয়া হবে। কিন্তু হান্ডকে যা করেছেন তাতে তাঁর এই পুরস্কার পাওয়ার কথা নয়। বিশ্বজুড়ে তাই মানবাধিকারকর্মীরা তো বটেই, লেখকরাও বিস্মিত হয়েছেন। নোবেল সাহিত্য পুরস্কারটিও কলঙ্কের হাত থেকে মুক্ত হতে পারল না। আগে তো বিতর্ক হতো ঠিক ঠিক যোগ্য লেখককে পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে কিনা তা নিয়ে, এবার একেবারে নোবেল পুরস্কার চেতনার বিরুদ্ধেই সুইডিশ অ্যাকাডেমি কাজ করল বলে নিন্দার ঝড় উঠেছে। তবে এই নিন্দার মধ্যেও ওলগা তোকারচুকের পুরস্কারপ্রাপ্তির বিষয়টি অনেকের মধ্যেই একধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে। আমি গণহত্যার সমর্থক কোনো লেখক সম্পর্কে না লিখে তাই শুধু তোকারচুক সম্পর্কে লিখছি।

তিন
প্রথমেই যে-তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো, ২০১৮ সালে ‘ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ’ পেয়েছিলেন ওলগা তোকারচুক। এই পুরস্কারটি, মনে করা হয়, নোবেলের পরই সাহিত্যের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার। বুকারের মহিমা হচ্ছে, বুকারপ্রাপ্ত অনেক কথাসাহিত্যিক বিভিন্ন সময়ে নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। কয়েকজনের কথা এখানে উলেস্নখ করা যেতে পারে : জে এম কোয়েজি, ভি এস নাইপল, নাদিন গর্ডিমার, উইলিয়াম গোল্ডিং, কাজুও ইশিগুরো প্রমুখ। ফলে, তোকারচুকের পুরস্কার পাওয়া নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক হয়নি। বরং তোকারচুক কয়েক বছর ধরে ইংরেজি ভাষাসাহিত্য বা পশ্চিমি পরিম-লে যেভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন, তাতে তাঁর এই পুরস্কার নিয়ে পাঠক ও সমালোচকদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।

চার
আধুনিকতাবাদী অথবা উত্তর-আধুনিকতাবাদী সাহিত্য মূলত আত্মজৈবনিক। এই আত্মজৈবনিকতার সঙ্গে অবধারিতভাবে যুক্ত থাকে দেশকালের অনুষঙ্গ আর লেখকের আত্মগত পটভূমি। যুদ্ধোত্তর ইউরোপ আর স্নায়ু-যুদ্ধোত্তর ইউরোপে অধিকাংশ লেখক মানুষের আত্মদীর্ণ অবস্থাকে তুলে ধরেছেন অস্তিত্বের বৃহত্তর সার্বিক ইতিহাসের কাঠামোয়, যে-ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমকাল। তোকারচুকের লেখাতেও এই ব্যক্তিসত্তা আর ইতিহাসের সম্মিলন ঘটেছে। ন্যারেটিভের নিজস্ব ধরন আর কল্পবাসত্মবতার ঐশ্বর্যে যা বিপুলভাবে সমৃদ্ধ।
তোকারচুকের উপন্যাসে কবিতার একজন কল্পিত অনুবাদক আছেন, কবিতার একটা লাইনকে পাঁচভাবে অনুবাদ করতে করতে যার মাথা ধরে যায়। অনুবাদক আমেত্মানিও লয়েড-জোনসেরও তোকারচুকের উপন্যাস অনুবাদ করতে করতে বাসত্মবে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল, প্রচ- মাথাব্যথায় কাতর হয়ে পড়েন। আরেক উপন্যাসে ঘরের দরজা আর প্রাণীরা গান গেয়ে ওঠে। একটা সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, মধ্য-ইউরোপের সাহিত্য পশ্চিমের অন্য স্থানগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। প্রথমত, যে-বিষয়টি আমাদের কথাসাহিত্যে দেখা যায় সেটা হলো আমরা বাসত্মবতায় বিশ্বাসী নই। ইংরেজি উপন্যাস একটা কারণে আমার খুব প্রিয় আর সেটা হলো নির্ভয়ে অন্তর্গত মনসত্মত্ত্বকে উপন্যাসে তুলে ধরা হয়। এই ধরনের উপন্যাস সরলরৈখিকভাবে অগ্রসর হয়। কিন্তু আমাদের এই ধৈর্যটা নেই। সবসময়ই মনে হয় কী যেন ঘটে যাচ্ছে, ফলে আমাদের গল্পগুলো একরৈখিক নয়। আরেকটি পার্থক্য হচ্ছে, অন্য দেশের ঔপন্যাসিকরা যেখানে গভীরভাবে মনঃসমীক্ষণে শিকড়িত, আমরা সেখানে পুরাণে প্রোথিত। তোকারচুক আরো বলেছেন, অ্যাক্টিভিজমের প্ররোচনায় যদি কেউ উপন্যাস লেখেন তবে তা ভালো শিল্প বলে গণ্য হতে পারে না। প্রোপাগান্ডা-প্রভাবিত কোনো রচনাই শিল্প নয়। একইসঙ্গে বাসত্মবতাবিবর্জিত সাহিত্যও পছন্দ করেন না তোকারচুক। তোকারচুক জনেমছেন ও বেড়ে উঠেছেন পোল্যান্ডের ইতিহাসের এক জটিল সময়ে।
গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে ১৯৬২ সালে পোল্যান্ডের একটা ছোট্ট শহর সুলেখোয় তাঁর জন্ম। পোল্যান্ডে তখন চলছিল কমিউনিস্টদের শাসন। জন্মের ছ-বছরের মাথায় কমিউনিস্টবিরোধী বুদ্ধিজীবী আর ছাত্র-আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে পোল্যান্ড। এর আগেই তাঁর পরিবার ইউক্রেন থেকে উদ্বাস্ত্ত হিসেবে এই শহরে আসে। বাবা-মা দুজনেই ছিলেন শিক্ষক। তাঁরা, তোকারচুকের বর্ণনা অনুসারে, ‘বাম-বুদ্ধিজীবী অধ্যুষিত একটা দ্বীপে বাস করলেও কমিউনিস্ট ছিলেন না।’ বাড়ির সেলফগুলোতে ছিল সারি সারি বই। এই বই পড়তে পড়তেই ভবিষ্যতের লেখক হয়ে উঠতে থাকেন তোকারচুক। এরপর ভর্তি হন ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনার বিষয় ছিল মনসত্মত্ত্ব। গুসত্মাভ কার্ল য়ুঙের ভাবনা তখন তাঁকে প্রভাবিত করে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে তাঁর লেখায়। গ্র্যাজুয়েশন করার পর মনোবিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি একটা হাসপাতালে চাকরি নেন। বিয়ে করেন সহকর্মী আরেক মনোবিজ্ঞানীকে। জন্ম হয় এক পুত্রসন্তানের। কিন্তু ওই হাসপাতালে পাঁচ বছর চাকরি করার পর একদিন এক মনোরোগীকে দেখার পর মনে হয়, ‘আমি বোধহয় তার চেয়েও অনেক বেশি সমস্যায় ভুগছি।’ তোকারচুক ছেড়ে দিলেন হাসপাতালের কাজ। প্রকাশ করলেন কবিতার একটা সংকলন। এর পরই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস : গ্রন্থ-মানবের ভ্রমণগাথা। এটি একটা প্যারাবল, সতেরো শতকের ফ্রান্সের পটভূমিতে লেখা। শ্রেষ্ঠ সূচনা-উপন্যাস হিসেবে এটি পুরস্কার অর্জন করে। এই সাফল্য সত্ত্বেও মধ্য-তিরিশবর্ষীয় তোকারচুক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ – তাইওয়ান থেকে নিউজিল্যান্ড অবধি ভ্রমণ করেছেন। আসলে তোকারচুকের মধ্যে রয়েছে একধরনের ভ্রামণিক সত্তা, কলিন উইলসন যাকে অনেক আগেই ‘আউটসাইডার’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইউরোপের শিকড়চ্যুত মানুষ যখন গৃহহীন উদ্বাস্ত্ত হয়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই এ-প্রবণতার সূচনা ঘটে। এখানে আবার স্মরণ করিয়ে দিই, তোকারচুকের পরিবারও ইউক্রেন থেকে পোল্যান্ডে এসে থিতু হয়েছিল। তাঁর সত্তার মধ্যে হিপ্পি ধরনের বোহেমীয় প্রবণতা রয়ে গেছে।
তাঁর চুল বাঁধার বিশেষ ধরন থেকে অনেকেরই এই ধারণা হয়েছে। তোকারচুক নিজেও বলেছেন, এই ধরনের চুলের
স্টাইল ইউরোপে পোল্যান্ডই প্রবর্তন
করে।
ভ্রমণে সময় ব্যয় করলেও তোকারচুকের লেখালেখি থেমে থাকেনি। ধীরে ধীরে ইউরোপে সমাদৃত হতে থাকেন। ইন্দো-ফরাসি পাঠকদের মধ্যে তিনি জনপ্রিয় হতে থাকেন। সমসত্ম ইউরোপেই তাঁর বই প্রকাশিত হতে থাকে। এই পর্বে তাঁর যে-বইটি সাড়া ফেলে দেয় সেটি হচ্ছে দিনের বাড়ি, রাতের বাড়ি; প্রথমে পোলিশ ভাষায় ১৯৯৮ সালে প্রকাশের পাঁচ বছর পরে ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে ইউরো-মার্কিন পাঠকের কাছে পৌঁছে যায় বইটি। এই বইয়ে তোকারচুক ন্যারেটিভের একটা বিশেষ ধরনের আশ্রয় নিয়েছিলেন, যাকে তিনি বলেছেন ‘নক্ষত্র পরম্পরিত’ রীতি, ইংরেজিতে একে বলা হয়েছে ‘কনস্টিলেশন স্টাইল’ (constellation style)। গুগলে এর অর্থ বা ব্যাখ্যা করা হয়েছে এভাবে : A constellation is a group of stars that forms an imaginary outline or pattern on the celestial sphere, typically representing an animal, mythological person or creature, a God, or an inanimate object. The origins of the earliest constellations likely go back to prehistory. যে-ব্যাখ্যা এখানে পাওয়া যাচ্ছে, তাকে অভিনবই বলতে হবে। পরস্পর সম্পর্কযুক্ত একগুচ্ছ নক্ষত্র, যে-নক্ষত্রগুলো প্রাগৈতিহাসিক জীবজন্তু, পৌরাণিক ব্যক্তি অথবা প্রাণী, ঈশ্বর অথবা কোনো অপ্রাণীবাচক বস্ত্তকে নির্দেশ করে, সেই তারকাগুচ্ছকেই বলা হচ্ছে কনস্টিলেশন, আমি যার বাংলা করেছি ‘পরম্পরিত নক্ষত্রগুচ্ছ’। কিন্তু এই বঙ্গীকরণ যে প্রাণী, ঈশ্বর, অপ্রাণীবাচক প্রাগৈতিহাসিক কোনো অনুষঙ্গকে নির্দেশ করে না, সেটা বলাই বাহুল্য আর এভাবে যদি উপন্যাস লেখা হয় তাহলে সে-উপন্যাসে যে নানান বিচিত্র ঘটনার সমাহার ঘটবে, সে-কথা বলাই বাহুল্য। তোকারচুকের উপন্যাসের ন্যারেটিভও গড়ে উঠেছে এরকম ছিন্নবিচ্ছিন্ন টুকরো টুকরো ঐতিহাসিক ঘটনার সম্মিলনে। অন্যদিকে প্রত্নজীবন ও অন্য সময় শীর্ষক উপন্যাসে পাওয়া যায় ১৯১৪ সালের দিককার কল্পিত কিছু মানুষের ক্রমিক জীবনকথা। চারটি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণিত হয়েছে এর গল্পগুলো ও ন্যারেটিভটি। এই উপন্যাসটি তোকারচুক পোলিশ ভাষায় লিখেছিলেন ১৯৯৬ সালে আর ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালে।
‘আমার উপন্যাসের বিষয়আশয় হচ্ছে বহুমাত্রিক পোল্যান্ডের সংস্কৃতি’ – একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তোকারচুক। পোল্যান্ডের ইতিহাসে এই বহুমাত্রিকতার দিকটি একেবারেই নতুন। তোকারচুক এই নতুনতর প্রেক্ষাপটেই লিখেছিলেন জ্যাকবের বই শীর্ষক উপন্যাস। নতুন ধরনের ন্যারেটিভের কারণে অনেকেই উপন্যাসটি পাঠ করে স্বস্তিবোধ করেননি। তোকারচুকের কাছে আসলে ন্যারেটিভটাই আসল। তিনি নিজেই বলেছেন, এখন বিশ্বব্যাপী যে যুদ্ধ চলছে, সেটা ন্যারেটিভ বা বাচনিক যুদ্ধ। রাসত্মায় রাসত্মায় বা যুদ্ধক্ষেত্রে এখন আর তেমন যুদ্ধ হয় না। রাশিয়ার পুতিনের
কথাই ধরুন, কে কার চেয়ে বেশি বাগাড়ম্বর করতে পারবেন, এখন চলছে তারই যুদ্ধ। ন্যারেটিভের কথা বলতে গিয়ে এরকমটাই বলেছেন তোকারচুক।
ন্যারেটিভের পাশাপাশি অন্যান্য প্রখ্যাত ঔপন্যাসিকের মতো তোকারচুকও গুরুত্ব দিয়েছেন ব্যক্তিমানুষের একক ও যৌথ আত্মপরিচয়ের ওপর। তিনি নতুন ধরনের ন্যারেটিভের সঙ্গে ‘জাতি’ বা নেশনের সম্পর্ক আছে বলে মনে করেন। জাতি ও জাতীয়তাবাদের পটভূমিতেই ব্যক্তির আত্মপরিচয়কে বুঝতে বা শনাক্তকরণ করতে হবে। ‘জাতি’র বিষয়টি আসলে একধরনের বসত্মাপচা জিনিস, তোকারচুক ‘রটেন’ শব্দটা ব্যবহার করে এর বিরুদ্ধে আপত্তি প্রকাশ করেছেন। শুধু জাতি বললে মানুষের পরিচয় পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ পায় না বলে তাঁর ধারণা। জাতিগত ধারণাকে ত্যাগ করে যৌথ বা গোষ্ঠীগত বা সমাজের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির আত্মপরিচয় অনুসন্ধান করা উচিত বলে তোকারচুক মনে করেন। তাঁর ভাবনার এই দিকটিই প্রাধান্য পেয়েছে জ্যাকবের বই উপন্যাসে। এতকিছুর পরও মানুষ জাতিভাবনার কাছে ফিরে আসবে। মধ্য-ইউরোপে পোল্যান্ডের অবস্থানও এরকমই। পোল্যান্ডও একটা জাতি। কিন্তু এই দেশটিতে সাধারণ মানুষের জায়গায় স্থান করে দেওয়া হয়েছে পোলিশ সেনাবাহিনীকে। পোল্যান্ডের বিভক্তিই এর জাতিগত পরিচয়কে ক্ষুণ্ণ করেছে। এখন ‘নৃতাত্ত্বিকভাবে পোলিশ’ বলে কিছু আর অবশিষ্ট নেই। এই ধারণাটি এখন মারাত্মক ক্ষতিকর একটি ভাবনা। মানুষের অবস্থান এখন ইতিহাসের বাইরে। তোকারচুক তাঁর উপন্যাসে ইতিহাসের বাইরে চলে আসা মানুষেরই গল্প বলেছেন, ডিসকোর্স দিয়েছেন। তোকারচুক তাঁর উপন্যাসে দেখিয়েছেন, পোল্যান্ড বিভিন্ন রাষ্ট্র ও
সংস্কৃতির সঙ্গে নানান বিষয় নিয়ে দরকষাকষি করে। এই রাষ্ট্র ও সংস্কৃতির মধ্যে মুসলমান, বিশেষ করে অটোমান সাম্রাজ্যের মুসলমানরাও রয়েছেন। জ্যাকবের বই উপন্যাসের নায়ক একজন ইহুদি। এই ইহুদি লোকটি তাঁর ধর্ম ও পরিচয় বদলে ফেলে পোলিশ হয়ে যায়। এই উপন্যাসেই ঐতিহ্যবাহী পোলিশ সংস্কৃতির কথা আছে। পোল্যান্ডের সংস্কৃতি যেন, তার কাহিনি ও ডিসকোর্সের কারণে মনে হয় একটা ‘মেল্টিং পট’, যা ধারণ করতে পারে নানান দেশের বিভিন্ন সংস্কৃতিকে।
জ্যাকবের জন্য বই গ্রন্থের সূত্রেই বলা যায়, তোকারচুকের অবস্থান জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে। তিনি জাতীয়তাবাদকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে বিশ্ববোধের কথা বলেছেন। তাঁর এই ভাবনার সঙ্গে, বিস্ময়কর হলেও, রবীন্দ্রনাথের ভাবনা মিলে যায়। রবীন্দ্রনাথ উপনিবেশবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এই বিশ্বাত্মবোধের কথাই বলেছিলেন। প্রাচ্য-প্রতীচ্য, পৃথিবীর দুই প্রামেত্ম গিয়েই তিনি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করেছেন। পরবর্তীকালে প্রকাশিত তাঁর ন্যাশনালিজম গ্রন্থটিতে সংকলিত হয়েছে ওই প্রবন্ধগুলো।
আগেই বলেছি, তোকারচুক একজন মনোবিজ্ঞানী। শরীর, বিশেষ করে শরীরের অদৃশ্য অন্তর্গত ‘মন’ তাঁর উপন্যাসে প্রধান হয়ে ওঠে। ম্যান বুকার পাওয়া ফ্লাইট্স বা উড়াল উপন্যাসটিকে সেদিক থেকে মনোকথন বা মনোবাসত্মবতার আখ্যান ও ডিসকোর্স বলা যেতে পারে। মনের সঙ্গে শরীরের সম্পর্ক যে গভীর তাঁর চেয়ে কে আর বেশি বুঝবেন? সাংবাদিক মাইকেল ক্রোনিন জানাচ্ছেন, তোকারচুকের সঙ্গে তাঁর একবার পোল্যান্ডের একটা হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে দেখা হয়েছিল। তিনি রুটিন চেকআপের জন্য নিয়মিতভাবে হাসপাতালে যান। কেন তাঁর এভাবে হাসপাতালে যাওয়া, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন এভাবে, ‘আমরা এই মহাকাশ ও নক্ষত্রমণ্ডল সম্পর্কে কত কথা জানি, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্ত্ত সম্পর্কেও আমাদের কৌতূহল আছে, অথচ আমরা আমাদের শরীরের অন্তর্গত দিকগুলো সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না। আমাদের গায়ের চামড়ার নিচে যে মাইক্রোজোম আছে, জানা নেই তা আসলে কী।’
ঔপন্যাসিক হিসেবে তোকারচুকের এই ভাবনা নতুন নয়। বিশ শতকের শুরুতেই ফ্রয়েড মনের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তোকারচুকের উপন্যাসে আবার এই ‘শরীর’ ও ‘মনে’র দিকটি প্রবলভাবে
ফিরে এসেছে। ফ্লাইট্স উপন্যাসটি এই শরীর-মন বা মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বের কথা মনে রেখেই রচনা করা হয়েছে। উপন্যাসটির ঘটনাকাল ও ঘটনাস্থল সতেরো শতকের ডাচ সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত বেলজিয়ামের ভস্ন্যানডেরিন থেকে আঠারো শতকের
ভিয়েনা আর উনিশ শতকের প্যারি পর্যন্ত প্রসারিত। উপন্যাসটির বিষয়-আশয়ও শরীর-সংশিস্নষ্ট। ভ্রমণের সূত্র ধরে সাইকোঅ্যানালাইসিস বা মনঃসমীক্ষণের কোন দিকগুলো মানুষের মধ্যে বিশেষভাবে ফুটে ওঠে, সেটাই হচ্ছে এই উপন্যাসের বিষয়। ‘আমি যা দেখি, আমি তাই।’ কার্তেসীয় দর্শনকে কীভাবে ভ্রামণিক মনঃসমীক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন তোকারচুক। এই হচ্ছে আসলে আধুনিক সাইকির কথা। এই সত্তা বা সাইকি কখনো স্থির হয় না, সবসময় সে চলিষ্ণু।
‘আপনি কি মনে করেন, চলমানতাই হচ্ছে আপনার লেখার মূল থিম?’ তোকারচুককে এরকম একটা প্রশ্ন করেছিলেন এক সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, তাই।’ দিনের বাড়ি, রাতের বাড়ি, তোকারচুকের এই একটিমাত্র উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট বা প্রধান চরিত্রসহ অন্য চরিত্ররা স্থির একটা পরিবেশের মধ্যে জীবন যাপন করে। এক নারী, যে-উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র, একটা বাড়ি কেনে আর উপলব্ধি করতে শুরু করে, শিকড়ে প্রোথিত থাকা কতটা সুখের। এই উপন্যাসটা তোকারচুক লিখেছিলেন ‘স্বপ্নের মধ্যে’। এর কাহিনি যেমন মধুর, তেমনি তিক্ত-বেদনাবহও বটে। শিকড়চ্যুতি, অনিকেত চেতনা বা চলিষ্ণুতা, তোকারচুক নিজেই মনে করেন, তাঁর উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর প্রথম উপন্যাস থেকেই এই শিকড়চ্যুতির বিষয়টি প্রাধান্য পেতে থাকে। পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় মধ্য-ইউরোপের সাহিত্য এরই সূত্র ধরে অনেকটাই আলাদা হয়ে গেছে বলে মনে করেন তোকারচুক। পশ্চিম ইউরোপের সাহিত্য যেখানে অনেকটা অবসরযাপন বা আনন্দ পাওয়ার মাধ্যম হয়ে উঠেছে, মধ্য-ইউরোপের সাহিত্য সেখানে রাজনৈতিক আর ভাষাগত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ‘সাহিত্য সবসময়ই রাজনৈতিক, সাহিত্য রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করবেই।’ একটা সাক্ষাৎকারে এ-কথাই বলেছিলেন তোকারচুক। তবে প্রোপাগান্ডার ভূমিকা সাহিত্য পালন করে না। সাহিত্যে প্রোপাগান্ডার কোনো স্থান নেই।
পোল্যান্ডের সাহিত্যের সংকট সম্পর্কেও তোকারচুক বেশ সচেতন, বোঝাই যায়। তিনি তো খোলাখুলি বলেছেন, পোল্যান্ডে কোনো মধ্যবিত্ত শ্রেণি নেই। যাঁরা আছেন তাঁরা জার্মান ও রুশ ভাষায় কথা বলেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণি নেই বলেই পোল্যান্ডে সাহিত্যের পাঠকও নেই। কোনো দেশে যদি লাখ লাখ নিরক্ষর মানুষ থাকে, তাহলে সেখানে বইয়ের কোনো বাজার থাকবে না। আর বাজার না থাকলে পাঠকও থাকেন না। পোল্যান্ডে কবিতা বেশ জনপ্রিয়। দুজন পোলিশ কবি আছেন, যাঁরা নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। কবিতার আবেদন হৃদয়ের কাছে। মঞ্চে আবৃত্তি করাও সহজ, কিন্তু উপন্যাসের সে-সুযোগ নেই। ফলে, পোল্যান্ডে উপন্যাস পঠিত হয় কম। তবে এটা কম হলেও উপন্যাস রচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে পোল্যান্ড। পোল্যান্ডের বেশিরভাগ উপন্যাসই ইতিহাসকে প্রাধান্য দিয়েছে। ‘এই ইতিহাসেও আমাদের হৃদয়ের কথা প্রবলভাবে উঠে এসেছে’, বলেছেন তোকারচুক। এই ধরনের ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনায় তোকারচুক যে নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাস লিখেছেন, সে-প্রবণতাটির সঙ্গে পশ্চিম ইউরোপীয় উপন্যাসের মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। ‘আমাকে পশ্চিমের অনেকেই প্রশ্ন করে, তোমার উপন্যাস এত নিরীক্ষাধর্মী কেন? এই কথার জবাবে আমি বলেছি, আমরা বাসত্মবতাকে দেখি ভিন্নভাবে। আমাদের জীবন স্থির নয়, সুসংহত নয়, যেমনটা দেখা যায় ইংল্যান্ডে অথবা অন্যান্য দ্বীপে। সেখানে সবকিছুই সবসময় স্থির – একই ধরনের বাড়িঘর, পানশালা। সেখানে সবাই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু আমাদের পরিবেশটা এমন নয়।’ তোকারচুকের এই কথাগুলো থেকে বোঝা যায়, স্থান-কাল-পরিবেশ অনুসারে উপন্যাসের রীতিপ্রকরণ যে আলাদা হয়ে যায়, সে-কথা তিনি বিলক্ষণ জানেন। এরপরই আরো
বিসত্মৃতভাবে এর ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আপনাদের যদি ওয়ারশর মতো একটা রাজধানী থাকত, যে-শহরটি কিনা যুদ্ধের সময় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, তাহলে আপনিও সাহিত্যে যা খুশি করতে পারেন। আমাদের অনুভবটা আসলে অস্থিতিশীল, ভঙ্গুর, বিচূর্ণ। ক্ল্যাসিক ঢংয়ে শুরু থেকে গল্প শুরু করে শেষে এসে শেষ করি না আমরা। আমাদের এখানে কোনো কিছুই এরকম সরলরৈখিকভাবে ঘটে না।’ নিজের কথারই প্রতিধ্বনি পাওয়া যাবে তোকারচুকেরই উপন্যাসে। ফ্লাইট্স উপন্যাসটিতে এই টুকরো টুকরো ছিন্নবিচ্ছিন্ন গল্প আর জীবনের কথা পাওয়া যায়। প্রবল বিপুল নিরীক্ষারও পরিচয় মেলে এই উপন্যাসের ন্যারেটিভে। বলা বাহুল্য, এই নিরীক্ষা সত্ত্বেও তোকারচুক এ-মুহূর্তে পোল্যান্ডের যেমন বেস্টসেলার ঔপন্যাসিক, তেমনি ইউরোপের সবচেয়ে বহুলপঠিত লেখক। তাঁর জ্যাকবের বই উপন্যাসটি পোল্যান্ডেই এক লাখ সত্তর হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। অন্য উপন্যাসগুলোর বিক্রির পরিমাণও অনেক। শুধু পরিমাণগত দিক থেকে নয়, গুণগত দিক থেকে তিনি যে মৌলিক সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন, সেটাই প্রমাণিত হয় গত বছর ম্যান বুকার পুরস্কার পাওয়ায়। তাঁর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তিতেও তাই কেউ খুব একটা বিস্মিত হননি।
তোকারচুকের সর্বশেষ অনূদিত উপন্যাস মৃতদের হাড়গোড়ের ওপর দিয়ে লাঙল চালাও। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জেনিনা দুজেকো চেক সীমামেত্মর কাছে বসবাস করে আর প্রায়শই সীমামেত্মর এপার-ওপার করে। এই পারাপারের বিষয়টি বেশ উপভোগ করেন বলেই তোকারচুক উপন্যাসটি লিখেছেন, ‘আমি সীমান্ত অতিক্রম করতে ভালোবাসি।’ তাঁর উপন্যাসের প্রেরণা হিসেবে উলেস্নখ করেছেন মার্কিন
চলচ্চিত্র-পরিচালক স্ট্যানলি কুবরিকের
কথা। কুবরিকের ভিন্ন ভিন্ন মুভিতে ভিন্ন ভিন্নভাবে গল্প বলাটাই তোকারচুককে তীব্রভাবে আকর্ষণ করেছে। উপন্যাসের একটা ধরন বা রীতি থেকে তাই তিনি আরেকটা রীতি, একটা বিষয় থেকে আরেকটা বিষয়ে সঞ্চরণ করতে ভালোবাসেন। নৃতাত্ত্বিকভাবেও বিশুদ্ধ রক্তের অধিকারী নন তিনি, ফলে বিশুদ্ধ সরলরৈখিক উপন্যাস রচনাও অসম্ভব বলে মনে করেন এই লেখক। এই বিশুদ্ধতার অভাবই বলা যায়, তাঁর লেখালেখিকে দিয়েছে বৈচিত্র্য – বিষয়আশয় আর শৈলীর দিক থেকে। তিনি উপন্যাস রচনায় নিরীক্ষা করার সুযোগ পেয়েছেন না বলে বলা যেতে পারে, তাঁর প্রতিটি উপন্যাসই নিরীক্ষাধর্মী উপন্যাস। ফলে, ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছেন নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া তোকারচুক। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে যে মানবিকতার বোধ এবং নৈতিকতার বোধ একজন লেখককে মহান করে তোলে, তার সবই প্রবলভাবে তোকারচুকের উপন্যাসে উপস্থিত। সমকালীন ইউরোপের মহান কণ্ঠস্বর তিনি। এ কারণেই তিনি যখন যে-কথা বলেন, তা-ই পোল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সংবাদ শিরোনাম হয়। তিনি যেন শুধু ঔপন্যাসিক নন, স্পষ্টবাদী বুদ্ধিজীবীদের কণ্ঠস্বর ও প্রবক্তা। এই ব্যাপারটি বুকার বা নোবেল পাওয়ার পর ঘটছে এমনটা নয়, গত প্রায় এক দশক ধরে তিনি হয়ে উঠেছেন ইউরোপের সাহিত্যের ক্যানন বা আইকন।
নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ায় অভিনন্দিত করছি তাঁকে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: