পদ্মাবতী চরিত্র : কাব্যিকতা থেকে নাট্যিকতায় রূপান্তর

লেখক: ফাহমিদা সুলতানা তানজী

আলাওল সপ্তদশ শতকের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি। পদ্মাবতী আলাওলের শ্রেষ্ঠ রচনা। আলাওল তাঁর পদ্মাবতী রচনা করেন ১৬৪৮ সালে। পদ্মাবতী কাব্যটি মৌলিক রচনা নয়, অনুবাদ। মূল কাব্যটি আওধি হিন্দি ভাষায় লেখা, মালিক মোহাম্মদ জায়সীর – পদ্মাবৎ। অনুবাদের সময় শেষাংশ বাদে আলাওল পদ্মাবৎ-এর অধিকাংশ খ–র বেশিরভাগ স্তবকই নিষ্ঠার সঙ্গে অনুসরণ করেছেন। আলাওলের পদ্মাবতী কাব্যে দুটি পৃথক রসের পস্নট দেখা যায়। প্রথম পর্বে পদ্মাবতী কাব্যে মিলনাত্মক সমাপ্তি দেখানো হয়েছে। কাব্যের দ্বিতীয় অংশটি ইতিহাসকেন্দ্রিক। এই অংশে আছে বীরত্ব ও যুদ্ধবিগ্রহের উত্তেজনা। বাঙালি কবি আলাওল দ্বিতীয় পর্বের ট্র্যাজিক পরিণতিতে কিছু পরিবর্তন এনেছিলেন এবং পরিণামগত অনৌচিত্য সত্ত্বেও কাব্যটি মিলনাত্মক পরিসমাপ্তি লাভ করে। প্রবন্ধের আলোচনার বিষয় – কাব্যিকতা থেকে নাট্যিকতায় পদ্মাবতী চরিত্রটির রূপান্তর প্রক্রিয়া অনুসন্ধান।
পদ্মাবতী চরিত্র সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে চরিত্রটি সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন। চরিত্র হচ্ছে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো গল্পে, নাটকে, উপন্যাসে ঘটনা এগিয়ে যায় চরিত্রের মাধ্যমে। নাটকে চরিত্র উন্মোচিত হয় কিছু বিষয়ের মাধ্যমে – নাট্যকারের নির্দেশনার মাধ্যমে, চরিত্র নিজের সম্পর্কে কিছু কথা বলার মাধ্যমে, অন্য চরিত্র সেই চরিত্র সম্পর্কে বলার মাধ্যমে, চরিত্রের নিজ ক্রিয়ার মাধ্যমে। নাটকের ক্ষেত্রে কোনো অভিনেতার পক্ষে এসব বিষয় মেনে সঠিকরূপে চরিত্রায়ণ করা সত্যি কষ্টকর। পদ্মাবতী চরিত্রটি প্রথমে আমরা পাই কাব্যে। তারপর সেখান থেকে নাটকে রূপান্তর করা হয়েছে। একটি কাব্যে শব্দের ছন্দোময় বিন্যাস থাকে এবং সেখানে কবির আবেগান্বিত অনুভূতি, উপমা চিত্রকল্পের সাহায্যে প্রকাশ করা হয়। আর নাটক হচ্ছে সাহিত্যের বিশেষ ধরন, যেখানে একটি লিখিত পা-ুলিপি অনুসরণ করে নাটক পরিবেশন করা হয়ে থাকে। নাটক লেখা হয় অভিনয় করার জন্য। কেবল লিখিত একটি পা-ুলিপি নিষ্প্রাণ দেহসম। অভিনয়ের মাধ্যমেই নাটকে প্রাণ আসে। পদ্মাবতী কাব্য থেকে নাটকে রূপান্তর সেরকম একটি প্রচেষ্টা।
আলাওল মধ্যযুগের একজন বাঙালি কবি। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে ধর্মীয় বিষয়বস্ত্তর গতানুগতিক পরিসীমায় রোমান্টিক প্রণয়-কাব্যধারা প্রবর্তনকারী হিসেবে মুসলমান কবিগণের অবদান সর্বজনস্বীকৃত। এ-সময়ে তাঁরা আরবি, ফারসি ও হিন্দি সাহিত্যের বিষয়বস্ত্ত ও ভাববৈচিত্র্য অবলম্বনে কাব্য রচনায় এক নবযুগ সৃষ্টি করেন। এই পর্যায়ের কবিগণের মধ্যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বিচারে কবি আলাওলকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়। আলাওলের প্রধান কাব্য পদ্মাবতী, যা ছিল কবি মালিক মোহাম্মদ জায়সীর হিন্দি কাব্য পদ্মাবৎ-এর অনুবাদ। এই পদ্মাবতী কাব্যের পদ্মাবতী চরিত্রটি বর্তমান প্রবন্ধের উদ্দিষ্ট বিষয়বস্ত্ত।
পদ্মাবতী আলাওলের সর্বপ্রথম রচনা।১ আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো পদ্মাবতী কাব্যটি মৌলিক গ্রন্থ নয়, অনুবাদ। মূল কাব্যটি হিন্দি ভাষায় লিখিত। সামান্য কিছু পরিবর্তন ছাড়া পুরো কাব্যটি মূল কাব্যকে অনুসরণ করে লেখা। কাব্যটি পড়তে গিয়ে কখনো পদ্মাবতীকে অবাঙালি বলে বোধ হয়নি। আলাওলের বর্ণনায় পদ্মাবতী বিস্ময়কর রূপে বাঙালি হয়ে উঠেছে এবং তা প্রশ্নাতীত। আলাওলের কাহিনিটি নিম্নরূপ :
সিংহল রাজকন্যা পদ্মাবতীর একটি পাখি ছিল – নাম তার হীরামণি। রাজরোষে সে বনে পলায়ন করলে ব্যাধ তাকে ধরে এবং ব্রাহ্মণের কাছে বিক্রি করে দেয়। হীরামণি কিন্তু সাধারণ কোনো পাখি ছিল না। ব্রাহ্মণ পাখিটির পা–ত্য দেখে চিতোরের রাজা রত্নসেনের কাছে এক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়। একদিন রানি নাগমতির (রত্নসেনের স্ত্রী) সঙ্গে কথোপকথনের সময় হীরামণি পদ্মাবতীর রূপের প্রশংসা করে। রানি পাখিটিকে মেরে ফেলার আদেশ দিলে দাসী তাকে বাঁচিয়ে রাখে এবং রাজার কাছে সমর্পণ করে। রাজা পাখির মুখে পদ্মাবতীর রূপের প্রশংসা শুনে ষোলোশো অনুচর নিয়ে যোগীবেশে সিংহলের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সিংহলে পৌঁছানোর পর হীরামণির সাহায্যে পদ্মাবতীর সঙ্গে রাজা রত্নসেনের সাক্ষাৎ হয়। অতঃপর নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে রত্নসেন পদ্মাবতীকে স্ত্রীরূপে লাভ করেন এবং স্বদেশে ফেরার পর নাগমতি ও পদ্মাবতীকে নিয়ে রাজা রত্নসেন সুখে দিন কাটাতে লাগলেন। এই পর্যন্ত পদ্মাবতী কাব্যের প্রথম পর্বের মিলনাত্মক পরিসমাপ্তি। দ্বিতীয় পস্নটে এক ধরনের ট্র্যাজিক সুর রয়েছে এবং কাহিনিটি ইতিহাসকেন্দ্রিক। সিংহল রাজকন্যা ও চিতোর রাজের রোমান্টিক মিলনের বিপরীতে দেখা যায় দিল্লিশ^রের অশ^ক্ষুরধ্বনি। দিল্লির সুলতান আলাউদ্দীন চিতোরের রাজসভা থেকে বিতাড়িত রাঘব চেতনের কাছ থেকে পদ্মাবতীর রূপের বর্ণনা শুনে উন্মত্ত হয়ে উঠলেন। ক্রুদ্ধ সুলতান আট বছর চিতোর অবরোধ করে রাখলেও অধিকার করতে ব্যর্থ হন। অতঃপর চিতোর রাজের সঙ্গে সন্ধি এবং সন্ধির শর্ত ভঙ্গ ও রত্নসেনকে বন্দি করে দিল্লি নিয়ে যান। আবার যুদ্ধ। রত্নসেন মুক্ত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ইতোমধ্যে নাগমতি ও পদ্মাবতীর গর্ভে দুটি পুত্রসন্তান জন্মাল। এর কিছুকাল পর রত্নসেন মারা গেলেন এবং নাগমতি ও পদ্মাবতী সতী হলেন।
মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় পশুশ্রমজীবী প্রচুর অবসরপুষ্ট রাজা ও সভাসদবর্গ যুদ্ধ ও প্রেমকাহিনির মধ্যে রোমান্সের যে উত্তেজনা সন্ধান করতেন তার মধ্যে তত্ত্বকথার বিশেষ স্থান ছিল না। আলাওল এই সামন্ততান্ত্রিক রুচির পরিবেশে কাব্যসুধা পরিবেশন করতে বসে জায়সীর পদ্মাবৎ কাব্যের তত্ত্বাংশকে যতদূর সম্ভব এড়িয়ে গিয়ে প্রেম ও যুদ্ধের রোমান্স-রসকে মুখ্য করে তুলেছেন। স্ত্ততি খ– যদিও জায়সীর অনুসরণে আলাওল সৃষ্টিতত্ত্ব, ভগবৎতত্ত্ব, সুফি প্রেমতত্ত্ব সম্পর্কে বিসত্মৃত আলোচনা করেছেন;
কিন্তু কাব্যকাহিনি আরম্ভ হওয়ার পর এসব তত্ত্বকথার পরিবর্তে কাহিনি-রসই মুখ্য হয়ে উঠেছে।২
পদ্মাবতী কাব্যে দেখা যায়, কাব্যের নায়ক-নায়িকা সমাজের ওপরতলার মানুষ। নায়িকার অন্বেষণে নায়কের দুঃসাহসিক অভিযান, নর-নারীর রোমান্টিক প্রেম এবং সেই প্রেম নিয়ে নায়কের সঙ্গে খলনায়কের প্রতিযোগিতা ও যুদ্ধ এই কাব্যের মুখ্য বিষয়। প্রথমেই বলা হয়েছে, আলাওলের পদ্মাবতী কাব্যটি অনুবাদ এবং এক্ষেত্রে আলাওল আক্ষরিক অনুবাদ করেননি। আলাওল দেখালেন প্রেম ও মৈত্রীর মাধ্যমে সমস্ত বিরোধের অবসান।
বর্তমান আলোচনার উদ্দেশ্য ‘পদ্মাবতী’ চরিত্রটির কাব্যিকতা থেকে নাট্যিকতায় রূপান্তর প্রক্রিয়া মূল্যায়ন। পদ্মাবতী কাব্যটি যেহেতু মধ্যযুগের সৃষ্টি এবং ‘মধ্যযুগের বাঙ্গলা নাট্যধারা, কাব্য, সঙ্গীত ও নৃত্যের মিশ্রণে আসরকেন্দ্রিক উপস্থাপনা এবং তা নিঃসন্দেহে নাট্যমূলক।’৩ বহু আলোচনা, গবেষণার পর আজ আমরা এই বিশ্বাসে স্থির হয়েছি যে, বাংলা নাট্যশিল্প হাজার বছর ধরে গীত বাদ্য, নৃত্য-অভিনয় ও কথার অভিন্নগ্রন্থনে এক বিশিষ্ট অভিনয়রীতির আশ্রয়ে গড়ে উঠেছে।৪ পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বাংলা নাট্যসাহিত্যের আঙ্গিক ও উপস্থাপনারীতিতে যা দেখা যাচ্ছিল তারও পূর্বে হাজার বছর ধরে এদেশে বিভিন্ন ধারার নাটকের প্রচলন ছিল। বাঙালির নাট্যরস-পিপাসা সবসময়ই স্বউদ্ভাবিত দেশজ শিল্পরুচির ধারায় নিবৃত্ত হয়েছে। এমনকি সংস্কৃত নাটকের শক্তিও মধ্যযুগের বাংলা নাটকে ছায়াপাত করতে পারেনি। মধ্যযুগের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত। তবে আলোচনার সুবিধার্থে প্রসঙ্গক্রমে আধুনিক আলোচনায়ও মধ্যযুগে বাংলা নাট্য পরিবেশনারীতির বিচারে আলাওলের পদ্মাবতী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আলাওলের পদ্মাবতী ছাপ্পান্ন খ– বিভক্ত সুবৃহৎ আখ্যান কাব্য। পদ্মাবতীর কাহিনি রচনা কৌশলের মধ্যেই এর আঙ্গিক ও পরিবেশনারীতির পরিচয় অন্বিষ্ট। পদ্মাবতী কাব্যে আলাওল আখ্যান কাব্যের বহু স্থানে বর্ণনা ও সংলাপের উপস্থিতি এমনভাবে নিশ্চিত করেছেন, যেখানে প্রায়ই বর্ণনাকে জীবন্ত ও গতিশীল বলে মনে হয়। আবার কাব্যে উক্তি প্রত্যুক্তিমূলক পদগুলো চরিত্রের মনসত্মাত্ত্বিক উন্মোচন ও কাহিনির অগ্রগতি সাধনের এক সূক্ষ্ম অথচ প্রাণবন্ত শিল্পকৌশলের দৃষ্টান্ত।
মধুর বচনে কন্যা বোলে পরিহার।
কহিও পিতৃর আগে মিনতি আমার \
পক্ষে জাতি হীনমতি কিবা বুদ্ধি তার।
সবে মাত্র জানে দুই উরন আহার \
হৃদয় নয়ন জার নাইছে প্রকাশ।
বুদ্ধি জনে তার বাক্য না করে বিশ্বাস \
রত্নমনি না করে দারিম বিজ তুল।
হেম হোন্তে বনফল জানে ধিক মূল \
সব ফিরি গেল ষুনি কন্যার উত্তর।
ত্রাসযুক্ত যুতবর কমপীত অন্তর \
কন্যা সম্বদিয়া কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস।
আজ্ঞা দেয় এড়ে আমি জাইব বনবাস \৫
উপযুক্ত পদটি যেন নাট্যগীতের আঙ্গিক ও পরিবেশনারীতির দিকে তাকিয়ে রচনা করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, সংলাপাত্মক পদের পরিসর পদ্মাবতী কাব্যেও প্রায় সর্বত্র পাওয়া যায়। লক্ষণীয় যে, বর্ণনার অংশগুলো বাদ দিলে সম্পূর্ণ পদ্মাবতী যেন একটি নাটক। শুকপাখির মুখে পদ্মাবতীর রূপবর্ণনা, যা শুনে রাজা রত্নসেন যোগীবেশে পদ্মাবতীকে খুঁজতে বের হন এবং পরবর্তী সময়ে পদ্মাবতীকে লাভ করা – এসবই যেন আলাওলের নিপুণ নাট্যকৌশল। চরিত্র ও ঘটনাগত নাট্যকৌতূহল পড়ে এ-যুগের পাঠককেও বিস্মিত হতে হয়। এ-কাব্য পাঠ করার পর এমন প্রতীতি জন্মে যেন, নাটক রচনাতেই আলাওলের শ্রেষ্ঠত্ব। পদ্মাবতীতে নাট্যকৌশলের যে আঙ্গিক ও মাত্রা দেখা যায় তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।
আলাওলের পদ্মাবতী নিয়ে ২০১২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শামীম হাসান বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পদ্মাবতী নামে একটি পরিবেশনা প্রস্ত্তত করেন এবং পরিবেশনাটি একাধিকবার মঞ্চস্থ হয়। এই পরিবেশনাতেও কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘পদ্মাবতী’। পদ্মাবতী চরিত্রের হাসি-আনন্দ,
সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালোবাসা, মিলন-বিরহ পুরো নাটকে দেখানো হয়েছে। তবে পরিবেশনায় ‘পদ্মাবতী’ চরিত্রটিকে মধ্যযুগীয় নয়, বরং একবিংশ শতকের দর্শকের গ্রহণযোগ্য করে প্রস্ত্তত করা হয়। এক্ষেত্রে মূল কাব্যরস থেকে পরিচালক সরে আসেননি। আলাওল যেমন জায়সীর থেকে কিছুটা পৃথক হয়ে বাঙালির জন্য ‘পদ্মাবতী’কে তৈরি করেছেন, তেমনি পরিচালক শামীম হাসানও আলাওল থেকে কিছুটা সরে এসেছেন। পরিবেশনাটি শেষে ‘পদ্মাবতী’ চরিত্রটিকে কেবল বাঙালি নারী নয়; বরং পৃথিবীর একজন মানুষ বলেই বোধ হয়।
বিপত্নীক হইলে পুরুষ যায় না নারীর সনে।
তবে …
পুরুষের সাথে কেন নারী যাবে সহমরণে?
এ-প্রশ্ন দর্শকের সামনে রেখে শেষ হয় পদ্মাবতী পরিবেশনাটি। মজার বিষয় হলো, এরপরও দর্শকের মূল টেক্সট পড়ার অভিজ্ঞতা নষ্ট হয়ে যায় না। বরং শেষ সংলাপের দ্বারা পদ্মাবতী পরিবেশনাটি ভিন্ন অবস্থানে পৌঁছেছে। মনে হয় যেন পদ্মাবতী পরিবেশনাটি পদ্মাবতী কাব্যের থেকে বাড়তি পাওনা। আলাওলের পদ্মাবতী এবং পরিবেশনার পদ্মাবতী দুজন পৃথক শিল্পীর সৃষ্টি। শিল্প হিসেবে দুটোর একটিকেও অপূর্ণ বলা যাবে না। প্রতিটি শিল্প সৃষ্টির পেছনে লুকানো থাকে কিছু রহস্য। এতে করে একই বিষয় নিয়ে দুজন শিল্পী কাজ করলেও তাঁদের সৃজনকৌশল হবে ভিন্ন। এমনি চমৎকার বিষয় পরিলক্ষেত হয় কাব্য ও পরিবেশনার পদ্মাবতীতে। পরিবেশনার এই পরিবর্তন আধুনিক বাঙালি দর্শকের মনে নাটকটিকে আরো গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। পদ্মাবতী কাব্যের পরিবেশনা মধ্যযুগীয় প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হলে পরিবেশনাটি এতটা গ্রহণযোগ্যতা পেত না। মধ্যযুগে রচিত পদ্মাবতী কাব্যটি আজ আর সেকালের নয়। বরং আজ তা আশ্রয় পেয়েছে সাধারণ বাঙালির মধ্যে। কাজেই পুরনো পরিবেশনারীতি বা ভাষার ধ্রম্নপদী বন্ধন বাঙালির রুচির অনুকূল নয় বলেই আধুনিক চিন্তায় রূপান্তর ঘটল পদ্মাবতী কাব্যের।
পদ্মাবতী কাব্যের পরিবেশনার শুরুতে বন্দনা আছে। রসুল, পিরের প্রশসিত্ম পরিলক্ষেত হয়। এমনকি প্রেম ব্যাকুলতাকে বন্দনার শেষ অংশে দেখানো হয়েছে। পুরো পরিবেশনাটিতে পুরুষের শৌর্য ও রুচি, নারীর সৌন্দর্য, প্রেমার্ত-প্রাণের মিলনে প্রতিবন্ধকতা এক আশ্চর্য শিল্পরূপে অভিষিক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অন্যান্য লোকনাট্যের পাশাপাশি স্থান করে নিয়েছে পরিচালক শামীম হাসানের পদ্মাবতী পরিবেশনাটি। ভাষা-রুচি ও প্রয়োগ কৌশলগত বৈচিত্র্যকে অবলম্বন করে এটি বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে নিয়েছে। এই পরিবেশনায় একাধিক গায়েন পুরো আখ্যানকাব্যটি উপস্থাপন করেন এবং চরিত্র অনুযায়ী অভিনেতাও ছিলেন ভিন্ন। পরিবেশনার কাহিনি ও চরিত্রগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন চরিত্র কিংবা ভৌগোলিক পরিম-ল পূর্ণত বাংলার। পরিচালক তাঁর দেশকাল এবং নিজস্ব ভাবনার সংযোগে মধ্যযুগীয় কাহিনিকে দেশজ আঙ্গিকে রূপান্তর করেছেন। ধারণা করা যায়, এই রূপান্তরের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল। এই পরিবেশনা সংগীত, নৃত্য ও অভিনয়ের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়েছে। কাজেই বলা যায়, পরিচালকের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল আসর ও দর্শক। এ-কারণে তিনি মধ্যযুগীয় একটি কাহিনিকে, যার পটভূমি এদেশীয় নয়, তার চরিত্র ও ঘটনাকে দেশজ পটভূমিতে সংস্থাপন করেন। এদিক থেকে পদ্মাবতী চরিত্রটির সমস্ত আবেগ যেন একজন বাঙালি নারীর আবেগ। অর্থাৎ পদ্মাবতী আর সিংহলের রাজকন্যা নয়, বরং সে বাঙালি নারীর প্রতিনিধিত্ব করছে।
সমগ্র পরিবেশনায় পরিচালক আলাওলের পদ্মাবতী কাব্যের অনুসরণ করলেও কাব্যের শেষাংশে দুজনের মতপার্থক্য পরিলক্ষেত হয়। কাব্যের শেষাংশে নাগমতি ও পদ্মাবতী উভয় চরিত্রকেই আলাওল সহমরণের পথে নিয়ে গেছেন। আর এখানেই মূল থেকে সরে এনেছেন পরিচালক শামীম হাসান। এখানে পরিচালকের অভিসন্ধির বিষয়টি অনুসন্ধান প্রয়োজন। মূলত আত্মহত্যা প্রেমের পরিণতি নয় – একে প্রেমসাধনা বলা যায় না। আত্মার বিকাশই প্রেমসাধনার লক্ষ্য হওয়া উচিত। আর আত্মাকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন শরীর। শরীর ও আত্মা দুয়ের সমন্বয়ে টিকে থাকবে প্রেম। এই প্রেম স্বর্গীয়। আজ আমরা সহমরণ বন্ধের ইতিহাস সবাই
কম-বেশি জানি। বেঁচে থাকার অধিকার পৃথিবীর সব প্রাণীর আছে। ক্ষুদ্র পুণ্য অর্জনের চেয়ে দীর্ঘজীবন নিঃসঙ্গভাবে কাটিয়ে দেওয়া অনেক ভালো। তা ছাড়া এই পুণ্য কেবল নারীর জন্য তো নয়। জীবনে চলার পথে নারীকে কেন বারবার অবহেলিত, বঞ্চিত, শোষিত হতে হয়? পুরুষের সাধের জন্য, আনন্দের জন্য, ভোগের জন্যই নারীর জন্ম নয়। পুরুষের স্বার্থের অনবরত ব্যবহারের ফলে আজ এই আধুনিক যুগেও নারীকে মনে হয় তুচ্ছ পাপোশের মতো। বিশ্ব অগ্রসর হচ্ছে। প্রগতিবাদীরা প্রগতিশীলতার কথা বলছে, মানবতাবাদীরা বিভিন্ন বৈশ্বিক তত্ত্ব নিয়ে নারীর অগ্রযাত্রার পথ প্রতিষ্ঠা করছে, অথচ এখনো নারী পুরুষের ভোগ্যসামগ্রী। এমন অবস্থায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারী নিজেকে অন্যের বোঝা ভাবতে ভাবতে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, নিজেকে অপাঙ্ক্তেয় ভাবতে থাকে – এমনকি স্বামীর মৃত্যু ঘটলে আত্মহত্যার কথা ভাবে, অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যা করেও ফেলে। এমনই সমাজের চরিত্র ‘পদ্মাবতী’। কিন্তু নির্দেশক পদ্মাবতীর মুখে দিলেন প্রতিবাদের ভাষা। নির্দেশক দেখালেন নারীর সৌন্দর্যের, শিল্পের, জ্ঞানের, বোধের দ্যুতিতে আলোকিত পদ্মাবতীকে। নির্দেশক পদ্মাবতীর দেহগত সৌন্দর্য থেকে বের হয়ে এসে অন্তর্গত সৌন্দর্যের দিকে হাত বাড়িয়েছেন। শেষ পর্যন্ত পদ্মাবতীর যে প্রশ্ন দর্শকের উদ্দেশে ছুড়ে দেওয়া হয়েছে তা অযৌক্তিক নয়। নারীকে যে কেবল সংসার রক্ষার দায় নিতে হবে এমন তো নয়। সে তো কেবল ত্যাগ করতে এ ধরণিতে ভূমিষ্ঠ হয়নি। যৌক্তিকভাবে সেও ভোগ করতে চায় এ ধরণির সুধা।
কবি এবং নির্দেশক উভয়েই ‘পদ্মাবতী’ চরিত্রটিকে এঁকেছেন এমনভাবে যে, একবার দেখলেই প্রেমে পড়ে যায় পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তের পুরুষ। নারীর এমন অপার সৌন্দর্যের বর্ণনা বাংলা সাহিত্যে খুব কম সাহিত্যিক এমন অপরূপভাবে আঁকতে পেরেছেন।
কদাচিৎ গগনে উঠিলে ইন্দ্রধনু।
ভুরু ভঙ্গী দরশে লুকাএ নিজ তনু \
ভুরুক ভঙ্গিমা হেরী ভুজঙ্গ সকল।
ভাবিয়া চিমিত্ময়া মনে গেল রসাতল \৭
পদ্মাবতীর এ-সৌন্দর্যে কাম নয়, মন আনন্দিত হয়ে ওঠে। মূলত সুন্দর ধারণামূলক, এর আকার বা আকৃতি নেই। আর তাই কোনো সুন্দর দৃশ্য দেখলে আমরা আনন্দিত হয়ে উঠি। এর সঙ্গে রুচি ও রসবোধ সম্পৃক্ত। ফ্রিডরিখ শিলারের মতে, ‘আকৃতির স্বাধীনতাই হচ্ছে সৌন্দর্য।’৮ তবে অনেক দার্শনিকই মনে করেন বহিঃসত্তা নয়, মনই সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। কবি যখন বলতে চান :
কদাচিৎ গগনে উঠিল ইন্দ্রধনু।
ভুরু ভঙ্গী দরশে লুকাএ নিজ তনু
তখন কল্পনার ছোঁয়ায় এই রূপ আরো সুন্দর হয়ে ওঠে। বাহ্যরূপ বা
প্রকৃতি আমাদের উদ্বুদ্ধ করে। যার প্রকাশ ঘটে সুরে, রঙে, ভাষায়। কিন্তু কল্পনা মানেই খেয়ালিপনা নয়। তাই একজন নির্দেশককে সৃজনধর্মী কল্পনা প্রতিভাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়। কল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনুভূতি, ধ্যান। কবি যেমন জানেন কোন শব্দ ও বাক্য কীভাবে বিন্যস্ত করলে সৌন্দর্যমূর্তি রচিত হবে, তেমনি নির্দেশকও জানেন শব্দ ও বাক্য কিরূপে প্রক্ষেপ করলে সেই সৌন্দর্য হৃদয়গ্রাহী হবে।
মানুষের শরীর যতই নমনীয় হোক না কেন যদি শক্ত হাড়ের ওপর শরীরের পত্তন না হয় তবে পরিপূর্ণ মানুষ বলে বোধ হবে না – কেবল একদলা মাংসপি- বলেই বোধ হবে। কাব্যের ভিত্তি যদি শক্ত না হয় তবে কেবল তা খাপছাড়া গল্প হবে আর পরিবেশনার ভিত্তি যদি শক্ত না হয় তবে তা হবে নিতান্ত পাগলামি, পরস্পর সম্পর্কবিহীন কিছু ছবি। এই যে শক্ত ভিত্তির কথা বলা হলো সেটাই হলো কাব্য বা পরিবেশনার সংযম। এর মধ্যে আছে বিচার, ত্যাগ, দৃঢ়তা। কোনো সৌন্দর্যকে পুরোমাত্রায় ভোগ করতে গেলে এই সংযমের প্রয়োজন। নতুবা যদি তা হয় অসংযত তবে তা বাচ্চা ছেলে ভাতের থালায় ভাত নিয়ে সারা গায়ে, মাটিতে ভাত ফেলে যেমন অনর্থক হাস্যকর কা- করে, তেমনি হবে। শিল্প বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা গায়েই মাখি, ভোগ করতে পারি না। অসংযত কল্পনাবৃত্তি দিয়ে শিল্প সৃষ্টি সম্ভব নয়। ঘরে আগুন ছড়ালে পুরো ঘরই পুড়ে যাবে; তাকে সান্ধ্যপ্রদীপ জ্বালানো বলে না, সান্ধ্যপ্রদীপ জ্বালানোর জন্য চাই একটুখানি আগুন। ঘর আলোকিত করার জন্য যেমন আগুনের ওপর দখল থাকা প্রয়োজন, শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। নদী বহমান, এর প্রতিটি ঢেউ পৃথক রূপে বইতে থাকলেও তাদের গন্তব্য সমুদ্র। কেউ কারো পথের বাধা নয়। এর মধ্যে বাধা সৃষ্টি হলে পানি এক স্থানেই ঘুরতে থাকে, চলার পথে বাধা দিয়ে সব ডুবিয়ে ফেলে নদীর গতিতে ব্যাঘাত ঘটিয়ে স্থিরতা লাভ অসম্ভব, এতে অগ্রসর হওয়া যায় না। সভ্যতা অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার মান হচ্ছে উন্নত। কিন্তু একই সঙ্গে নারীর প্রতি বাড়ছে অসম্মান। আজো সমাজ নারীকে কোমল রূপে প্রত্যাশা করে। [নারী কেন নিজ সত্তাকে বাদ দিয়ে সমাজের চাওয়া-পাওয়ার কাছে মাথা নত করবে?] এ-অবস্থায় নারীর মনের একান্ত গোপন কথা বলার ক্ষুদ্র একটা প্রয়াস লক্ষ করা যায় পদ্মাবতী পরিবেশনাটিতে। বলতে দ্বিধা নেই, কাব্যের ‘পদ্মাবতী’ ও পরিবেশনার ‘পদ্মাবতী’ উভয়েই শিল্পের দিক থেকে পূর্ণ। পার্থক্য কেবল ক্ষুদ্র এক জায়গায়। নিজের জীবনের ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস আমরা পরিবেশনার পদ্মাবতীর কাছে দেখতে পাই। সমাজের নিয়মকে তুচ্ছজ্ঞান করে, অজানা, লুকানো বিপদকে উড়িয়ে দিয়ে এ-ধরনের সিদ্ধান্ত একজন সাহসী আধুনিক নারীই নিতে পারে। তবে সনাতন ধ্যান-ধারণার বশবর্তী সমাজ কখনোই এত বড় সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না কিংবা মেনে নিতে চাইবে না। স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে পা-ুলিপি থেকে পরিবেশনায় যাওয়ার পথে পরিচালকের পক্ষে সব ক্ষেত্রে মূল টেক্সটকে অনুসরণ করা সম্ভব হয়নি – আর এটিই কাব্যের ‘পদ্মাবতী’ থেকে পরিবেশনার ‘পদ্মাবতী’কে ভিন্ন অবস্থানে নিয়ে গেছে। পদ্মাবতী পরিবেশনায় কথা, সুর, তাল, লয়, ছন্দের সাহায্যে এমন এক ‘পদ্মাবতী’কে সৃষ্টি করা হয়েছে, যাকে যে-কোনো আধুনিক রসিক মানুষ গ্রহণ করবে। সম্ভাবনার সোপানে দাঁড়িয়ে সার্থকতার শীর্ষ ছুঁয়ে গেছে পরিবেশনাটি। স্পষ্টই উপলব্ধি করা যায় যে, পরিবেশনার ‘পদ্মাবতী’ বর্তমান সময়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য কাব্যের ‘পদ্মাবতী’র চেয়ে।

তথ্যসূত্র
১. পদ্মাবতী, জায়সী ও আলাওল (দ্বিতীয় খ-), সম্পাদনা : দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা, ১৯৮৫, পৃ ৩।
২. ওই, পৃ ৯।
৩. মধ্যযুগের বাংলা নাট্য, চান্দা, সেলিম আল দীন, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৬, ভূমিকা অংশ থেকে নেওয়া।
৪. (ঐতিহ্যবাহী) বাংলা নাট্যের পরিবেশনারীতি ও বিবর্তন (প্রবন্ধ), কামাল উদ্দিন কবির, পৃ ১।
৫. পদ্মাবতী, জায়সী ও আলাওল (দ্বিতীয় খ-), সম্পাদনা : দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা, ১৯৮৫, পৃ ৪২-৪৩।
৬. আলাওলের পদ্মাবতী, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ-সম্পাদিত, বাংলা সাহিত্য সমিতির পক্ষে মহিউদ্দিন আহমদ, আহমদ পাবলিশিং হাউস, প্রথম প্রকাশ ১৯৭৭, পৃ ৯৩।
৭. পদ্মাবতী, জায়সী ও আলাওল (দ্বিতীয় খ-), সম্পাদনা : দেবনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা, ১৯৮৫।
৮. নন্দনতত্ত্ব জিজ্ঞাসা, সম্পাদনা : তরুণ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা, দেজ পাবলিশিং, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৪, পৃ ১২০।

Leave a Reply

%d bloggers like this: