পরিমলের বাবা

লেখক:

শাহাবুদ্দীন নাগরী

চোদ্দ বছরের পরিমল বুঝে যায় ও আর বাবাকে নিয়ে বাসায় ফিরতে পারবে না।

কেন যে ওরা বেরিয়েছিল?

মা পথ আটকে বলেছিল, ‘না গেলে কি হয় না?’

পরিমলের বাবা সরকারি অফিসে ছোট একটা পদে চাকরি করত। টেকনিক্যাল পোস্টের চাকরিতে এ-যাবত মাত্র একটা প্রমোশন পেয়েছিল, ভবিষ্যতে পেত কিনা পরের কথা। তার মধ্যেই দেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়ে গেল, আর পঁচিশে মার্চ রাতে ঢাকাসহ সবখানেই গণহত্যার বিভীষিকা নিয়ে নেমে এলো চৌকস পাকিসত্মানি সেনাবাহিনী। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে গণহত্যার এ-খবর পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, পরিমলরা এসব রেডিও থেকে শুনেছে।

কিন্তু পরিমলের বাবার এক কথা, সে পাকিসত্মান গভর্নমেন্টের একজন চাকরিজীবী, তাকে কেউ কিছু বলবে না। পাড়া-পড়শিরা অনেকেই গ্রামের দিকে সরে গেছে, যাওয়ার সময় পরিমলের বাবাকে বলেছিল, ‘দাদা, আপনিও চলেন, জীবনের রিস্ক নিয়ে লাভ নেই।’

চট্টগ্রাম শহর পুরোটা দখল করে নিয়েছে সেনাবাহিনী। রাসত্মার মোড়ে-মোড়ে বাঙ্কার খুঁড়ে পজিশন নিয়েছে। ক্যান্টনমেন্ট ছাড়াও স্টেডিয়াম, ষোলশহর, চট্টেশ্বরী রোড, সিআরবি ভবন, সার্কিট হাউস সব জায়গায় ছোট-ছোট ক্যাম্প গড়ে তুলেছে। ক্রমশই ওরা ওদের পরিধি বিসত্মার করছে গ্রামের পর গ্রাম দখল করে নিয়ে। এদিকে রেডিও পাকিসত্মান, চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে সরকারি অফিসার-কর্মচারীদের কাজে যোগদান করার জন্য বারবার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

দোটানায় পড়ে যায় পরিমলের বাবা।

কী করবে না করবে সে দিশা করতে পারছিল না। সরকারি চাকুরেদের মাসশেষে হাতে এমনিতেই টাকা-পয়সা থাকে না। ছাবিবশে মার্চ দুপুরে পরিমলের বাবা স্যুটকেস খুলে দেখে তার সঞ্চয়ে রয়েছে মাত্র পনেরো টাকা। আর সাত-আটটা দিন পার করতে পারলেই মার্চ মাসের বেতনটা পেত। পনেরো টাকা হাতে নিয়ে শিকড় উপড়ে অনিশ্চিতের পথে বেরিয়ে যাওয়া যায় না। তাছাড়া বয়স্ক মা, স্ত্রী আর চার ছেলেমেয়ে নিয়ে কোথায় পালাবে ওরা? পরিমল রেডিওতে শুনেছে, ঢাকা থেকে মানুষজন সব সীমামেত্মর দিকে চলে যাচ্ছে, ভারত সরকার অনুমতি দিলে হয়তো ওরা ভারতে ঢুকে যাবে। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে ভারতীয় সীমান্ত অনেক দূরের পথ, পায়ে হেঁটে এত পথ পাড়ি দেওয়া ওদের পরিবারের জন্য উত্তাল সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার মতো হবে।

 

পরিমলের বাবার পুরো নাম সুবিমল চক্রবর্তী।

‘তো, আপ সুবিমল চ্যাটার্জি হ্যায়?’

পাঞ্জাবি সৈন্যটা তার বাবার বুক বরাবর অটোমেটিক রাইফেল তাক করে আছে। ভঙ্গিটা এমন করেছে যেন এক্ষুনি গুলি করে দেবে।

‘ইয়েস, আই অ্যাম সুবিমল চ্যাটার্জি, আই অ্যাম এ গভর্নমেন্ট সার্ভিস হোল্ডার অব পাকিসত্মান।’

‘উর্দু নেহি আতা সুবিমল সাহাব? আপ জরুর গোস্বা কিয়া, ইস লিয়ে ইংলিশমে বাতচিৎ শুরু কিয়া।’

 

চট্টগ্রাম স্টেট ব্যাংকের বাইরে সেনাদের ছাউনি চোখে পড়েছিল পরিমলের। মেইন গেট, ব্যাংকের গেট, বিল্ডিংয়ের ছাদে, এমনকি ব্যাংকের ভেতরেও রাইফেল হাতে সৈন্যদের চলাচল করতে দেখেছে ও। কোনোরকম বাধা এবং জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই ওরা ব্যাংকের ভেতরে ঢুকেছিল। ভেতরে খুব বেশি লোকজন ছিল না। অনেক কাউন্টার ফাঁকা পড়ে ছিল, যারা এসেছে তারা প্রায় সবাই টাকা তুলতেই এসেছে, পরিমল সেটা খেয়াল করেছিল। বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির সেকেন্ড বয় পরিমল চক্রবর্তীর এটা না বোঝার কথা নয়। দশ টাকা মূল্যের পঞ্চাশটা প্রাইজবন্ড জমিয়েছিল ওর বাবা সুবিমল চক্রবর্তী। এগুলো জমা দিয়ে টাকা নেওয়ার উদ্দেশ্যেই ওরা এসেছিল স্টেট ব্যাংকে। পাঁচশো টাকা নগদ হাতে থাকলে সিদ্ধামেত্মর জন্য অনেক কিছু ভাবা যায়। ব্যাংকের কাউন্টারে ওর বাবা যখন টাকা নেওয়ার জন্য প্রাইজবন্ডগুলো রেখেছিল তখন একজন সৈন্য গোল চোখ করে তাকিয়েছিল ওদের দিকে। তখনই খটকা লেগেছিল পরিমলের। কিন্তু কিছুই করার ছিল না তখন। ওর বাবার নগদ টাকা দরকার।

টাকাটা গুনে নিয়ে পকেটে রেখে সুবিমল চক্রবর্তী যখন ছেলের হাত ধরে পায়ে-পায়ে হাঁটছিল তখন সৈনিকটা অনুসরণ করছিল ওদের। সিঁড়ি ভেঙে গেট দিয়ে নামতেই আর একজন সৈনিক তাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়, রাইফেলের নলটা তাক করে ধরে ওর বাবার দিকে। পরিমল ঘাবড়ে যায়। ওর বাবা উর্দু জানে না, তবে ইংরেজি ভালো বলে। কিন্তু ইংরেজি বলতে শুনে সৈন্যরা যেভাবে ওর বাবাকে টিটকারি মেরে কথা বলছে তা যে ভালো কিছুর নমুনা নয় তা পরিমল বুঝে নেয়।

‘তো সুবিমল সাহাব, আপ ইন্ডিয়ান এজেন্ট হ্যায় না?’

‘নো-নো, আই অ্যাম নট অ্যান ইন্ডিয়ান এজেন্ট, আই অ্যাম এ গভর্নমেন্ট সার্ভিস হোল্ডার। পাকিসত্মান ইজ মাই কান্ট্রি। মাই ফাদার ডিডিন্ট লেফট পাকিসত্মান আফটার দি সেপারেশন অব ফরটি সেভেন।’

‘তো রুপিয়া কিস লিয়ে মাঙ্গা? ইন্ডিয়া যায়ে গা?’

‘নো ব্রাদার। আই হ্যাভ নো মানি ইন হ্যান্ড। স্টিল উই হ্যাভ নট গট আওয়ার স্যালারি। উই নিড টু সারভাইভ।’

কথাগুলো পরিমলের বাবা বলছে বটে, কিন্তু কণ্ঠটা তার শুকিয়ে আসছে দ্রম্নত। এপ্রিল মাসের এই আগুন-আগুন দুপুরে ওর মনে হচ্ছে কর্ণফুলী নদীর সবটুকু জল ও এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেলতে পারে। প্যান্টের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তার পা দুটো যে শরীরের ভার আর সহ্য করতে পারছে না, তা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাও বুঝতে পারছে বোধহয়।

সৈনিকগুলোর মুখে তির্যক হাসি, পরিমল বুঝতে পারে ওর বাবার কথা ওরা একবিন্দুও বিশ্বাস করছে না। কোথাও ফট্ফট্ করে গুলির আওয়াজ হয়। কোনো নিরীহ বাঙালির বুক শয়তানগুলো ঝাঁঝরা করে দিলো হয়তো।

‘আপ কাঁহা নকরি করতা সুবিমল সাহাব?’

‘ল্যান্ড রেকর্ডস অফিস, আওয়ার অফিস ইজ ইন মেহেদিবাগ।’

‘মা-হা-দী-বা-গ…।’

বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল সৈনিকটা।

 

এলাকার লোকজনের কাছে ইতোমধ্যে পরিমল শুনেছিল বেলুচ সৈন্যরা অনেক ধীরস্থির, কথাবার্তা শোনে, কিন্তু পাঞ্জাবিগুলো অত্যন্ত বদমেজাজি এবং হারামি। সব বাঙালি ‘ইন্ডিয়ান এজেন্ট’ এটা ওদের মগজে খোদাই করে পাঠানো হয়েছে এদেশে। ধরো এবং হত্যা করো এটাই তাই ওদের প্রধান কাজ।

পরিমল ধরে নেয় এটা পাঞ্জাবি সৈন্য।

ইতোমধ্যে আরো দুজন সৈন্য এসে বিদঘুটে হারামিটার পাশে দাঁড়িয়েছে।

ফিস্ফিস্ করে কীসব কথা বলল ওরা। মনে হলো কিছু একটা সিদ্ধান্ত নিল।

‘তো চালিয়ে সুবিমল সাহাব, কর্নেল সাহাব কো অফিস মে তসরিফ দেনে কে লিয়ে চালিয়ে।’

সুবিমল চক্রবর্তী ঘাবড়ে গেল এবার। জমি রেকর্ডস অফিসের কানুনগো তার সারাজীবনের সঞ্চিত সমস্ত সাহস যেন হারিয়ে ফেলল মুহূর্তেই। ফ্যাকাশে চোখে তাকাল পরিমলের দিকে।

‘ইয়ে আপকা বেটা হ্যায় না?’

‘ইয়েস।’

‘উসকো মাকান মে ভেজ দো। আপ চালিয়ে হামারা সাথ।’

কণ্ঠটা খুব রূঢ় শোনাল পরিমলের কাছে।

চট্টগ্রাম শহরে ছড়ানো-ছিটানো পাকিসত্মানিদের ক্যাম্প। কর্নেল সাহেবের অফিস কোথায় ও জানে না। ওর বাবাকে ওরা কোথায় নিয়ে যাবে? ক্যান্টনমেন্টে? ওখানে ধরে নিয়ে গেলে কেউ কি আর ফিরে আসে? তাহলে কি চিরদিনের জন্য বাবাকে হারাতে যাচ্ছে পরিমল?

পরিমল কাঁদতে শুরু করে।

‘রো মাত রো মাত।’

পাশ থেকে কেউ একজন বলল। অন্য কোনো সৈনিক হতে পারে। কিন্তু সুবিমল চক্রবর্তী তার ভবিষ্যৎ পড়ে ফেলেছে। সে সরকারি চাকরি করে কিনা এটা ওদের বিবেচ্য নয়। ওর বাবা যে এদেশকে ভালোবেসে ১৯৪৭ সালে ভারতে চলে যায়নি, এটাও ওদের কোনো হিসাব নয়। একজন হিন্দুকে ওরা হাতের কাছে পেয়েছে, ছাড়বে কেন? ওদের কাছে সব ‘মালাউন’ ভারতের গুপ্তচর।

‘ক্যান আয় টক টু মাই অফিস ব্রাদার?’

সুবিমল চক্রবর্তীর মুখ দিয়ে অস্ফুট শব্দে বেরিয়ে আসে আরজিটা।

‘সুবিমল সাহাব, উস বাতচিৎ মে কোয়ি ফায়দা নেহি। আপ কর্নেল সাহাব কা পাস চালো, উস কি সাথ বাতচিৎ করো, ফায়দা মিল যায়ে গা।’

 

পরিমল বুঝতে পারে, ওর বাবাকে নিয়ে যাওয়া মানে তার আর ফিরে না আসা। সৈন্যগুলো ওদেরকে এতক্ষণ গুলি করে মেরে ফেলতে পারত। মারেনি। এই না-মারার কারণ হচ্ছে ওর বাবাকে ওরা ইন্ডিয়ার এজেন্ট ধরে নিয়েছে। এই এজেন্টের কাছ থেকে ওরা তথ্য বের করবে। অত্যাচার করবে বন্দি করে রেখে।

পঁচিশ মার্চ রাতে ঢাকায় যখন সৈন্যরা নেমে গণহত্যা শুরু করে চট্টগ্রামে তখনো পাকিসত্মানি সৈন্যরা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে বন্দি। বাইরের বিভিন্ন ছাউনিতে যে কজন অবাঙালি সৈন্য ছিল, বাঙালি সৈন্যরা তাদের নিরস্ত্র করে আটকে রেখেছিল। ইপিআর ক্যাম্পগুলো থেকে সৈনিকরা বেরিয়ে পড়েছিল। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরামর্শে ইপিআরদের সঙ্গে নিয়ে বাঙালি সৈন্যরা ঘেরাও করেছিল ক্যান্টনমেন্ট। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও যোগ দিয়েছিল এদের সঙ্গে। কিন্তু নেতৃত্বশূন্য এ-ধরনের ঘেরাও কয়েকদিন মাত্র টিকেছিল। ঢাকা থেকে জঙ্গি বিমান উড়ে এসে অবিরাম বোমাবর্ষণ করতে থাকায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় প্রতিরোধ। কালুরঘাটের বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে ‘স্বাধীন বাংলা বিপস্নবী বেতার কেন্দ্র’ নামে যে-বেতারকেন্দ্রটি চালু করা হয়েছিল সেখানেও বোমা হামলা করে পাকিসত্মানি বিমানগুলো। বেতারকেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে থাকা পাকিসত্মানি সৈন্যরা পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে মেশিনগানের গুলি বাঙালিদের ওপর খরচ করতে-করতে দখল করে নেয় চট্টগ্রাম শহর এবং আশেপাশের এলাকা।

 

পলায়নপর ইপিআরদের দেখে একদিন অশ্রম্নসজল হয়ে উঠেছিল সুবিমল চক্রবর্তীর চোখ। সারারাত অবিশ্রান্ত গোলাগুলির শব্দ আতঙ্কিত করে তুলেছিল সবাইকে। বাঙালি এমন শব্দ কখনো শোনেনি। বাকলিয়ার নিজ বাড়ির সামনে খুব ভোরে উঠে এসে বসে ছিল সুবিমল। পাড়ার লোকজন রাসত্মার মোড়ে জটলা করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছিল। ওরা জেনেছিল, বাঙালি সৈন্যরা এমন পরিকল্পনা করেছে যে, ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে থাকা একজন অবাঙালি সৈন্যকেও ওরা জীবিত বের হতে দেবে না। বন্দরের জেটিতে থাকা বাবর জাহাজ থেকে কয়েক রাত ধরে অবিরাম শেল নিক্ষেপ করেও পাকিসত্মানিরা বাঙালি সৈন্যদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। কিন্তু ঢাকায় গণহত্যা শুরু হওয়ার চার-পাঁচ দিনের মাথায় চট্টগ্রামেও যে সব প্রতিরোধ ভেঙে পাকিসত্মানিরা বেরিয়ে আসবে তা ওরা ভাবতেও পারেনি।

ইপিআরদের বিধ্বস্ত চেহারা আর পরিচ্ছদ দেখে সুবিমল এগিয়ে গিয়েছিল ওদের কাছে।

‘আপনারা কি চলে যাচ্ছেন শহর ছেড়ে?’

ওদের ভেতর কেউ একজন বলেছিল, ‘আপাতত আমরা পটিয়ার দিকে সরে যাচ্ছি, রসদ পেলে আবার ফিরে আসব।’

রসদ মানে অস্ত্র।

‘আমার বাসায় একটু জলপান করে যাবেন কি?’

সুবিমলের এমন প্রসত্মাবে না করেনি ইপিআরগুলো।

চার-পাঁচ দিনের অভুক্ত শরীর ওরা টানতে পারছিল না। সুবিমল ওদের নিয়ে ঘরের ভেতর বসিয়েছিল। তারপর বউকে চটজলদি রুটি, গুড় আর জলের ব্যবস্থা করতে বলেছিল। মনের ভেতর সাহস জুগিয়েছিল কেউ। ছয়-সাতজন অভুক্ত সৈন্য পরম স্বাদ নিয়ে রুটি-গুড় কীভাবে নিঃশেষ করেছিল তা দেখে একটা পরিতৃপ্তির হাসি ফুটে উঠেছিল সুবিমলের মুখে। ঘটি-ঘটি জল খেয়ে ওরা আর দেরি করেনি। যাওয়ার সমময় সুবিমলের হাত চেপে ধরে বলেছিল, ‘আপনার কথা আমরা কখনো ভুলব না দাদা। বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে।’

সুবিমল কি নিজেই এখন বাঁচবে?

ফ্ল্যাশব্যাকের মতো দৃশ্যগুলো ভেসে উঠে আবার মিলিয়ে গেল সুবিমলের মনের পর্দায়।

ছোট মেয়েটা মার্চ মাসের মাঝামাঝি একদিন ওকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বাবা অসহযোগ কী?’

ক্লাশ টুতে পড়া মেয়েটাকে অসহযোগের অর্থ বোঝাতে পারেনি সুবিমল চক্রবর্তী। সাত বছরের মেয়েকে অসহযোগের অর্থ বোঝানো যায় না। ক্ষমতা বাঙালিদের হাতে চলে গেলে পশ্চিম পাকিসত্মানিদের কী অবস্থা হবে এমন একটি আশঙ্কায় থেকে অবাঙালি শাসকগোষ্ঠী যখন সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বন্ধ ঘোষণা করে, তখন যে অসহযোগ আন্দোলনই একমাত্র পথ এবং বাঙালিকে এক সুতোয় একাট্টা করার কৌশল, এটি বাঙালি নেতৃত্ব বুঝেছিল।

মেয়েটার কপালে চুমু দিয়ে সুবিমল বলেছিল, ‘তুমি বড় হও, তখন বুঝবে অসহযোগ কী।’

সুবিমল ডুকরে কেঁদে ওঠে।

ওর মেয়েগুলো কীভাবে বড় হবে? কীভাবে বাঁচবে ওরা? কী করবে পরিমল?

 

পার্কিং থেকে একটা জিপ এসে থামে ওদের পাশে। পাঞ্জাবি সৈনিকটা এবার তাক করে রাখা অটোমেটিক রাইফেলটা নামায়। হাত ধরে টেনে পরিমলকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে বলে, ‘সুবিমল সাহাব, জিপ মে বাইঠিয়ে।’

এরপর সুবিমলের প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ব্যাংক থেকে সদ্য তোলা টাকাটা বের করে নিজের পকেটে রেখে দেয়।

যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো কাঁপতে-কাঁপতে সুবিমল চক্রবর্তী জিপের পেছনে গিয়ে উঠে বসে।

পরিমলের ভেতরটা হু-হু করে ওঠে। সে ঠায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে তার চারপাশ কীভাবে ঢেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। একটা ঘোরের মধ্যে সে ডুবে যেতে থাকে। হাত দুটো তার মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যায়। অসীম শক্তি এসে জড়ো হয় শরীরে। চোদ্দো বছরের কিশোর যেন মুহূর্তে টান-টান বুকে তরুণ হয়ে যায়। এক হ্যাঁচকায় সে পাঞ্জাবি সৈনিকটার হাত থেকে ছিনিয়ে নেয় রাইফেলটা। তারপর ট্রিগারে চাপ দিয়ে গুলি ছুড়তে থাকে। সামনে-পেছনে-বাঙ্কারে-ছাদে যতগুলো সৈন্য চোখে পড়ে সব কটাকে পাখির মতো গুলি করে ফেলে দেয় মাটিতে। রাইফেলের ভারে কাঁপতে থাকে পরিমলের হাত। আচমকা ওর ঘোর ছুটে যায় যখন স্টার্ট নেওয়ার সময় পুরনো জিপের সাইলেন্সার থেকে কালো ধোঁয়া এসে ওর ওপর লাফিয়ে পড়ে। পাঞ্জাবি সৈন্যটা ততক্ষণে উঠে বসেছে জিপে। ঘাড়টা কাত করে সুবিমল ছেলের দিকে তাকায়। পিতা-পুত্রের দুজোড়া চোখ আটকে যায় চুম্বকের মতো। ধুলো উড়িয়ে জিপটা তার সামনে থেকে দ্রম্নত অদৃশ্য হয়ে যায়। নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হয় পরিমলের। ও এখন কী করবে?

 

এপ্রিল মাস পার হয়ে যায়। চট্টগ্রামের ল্যান্ড রেকর্ডস অফিসের কানুনগো সুবিমল চক্রবর্তী, মানে পরিমলের বাবার আর খোঁজ পাওয়া যায় না।