পাগল, কোকিল ও পলাশ ফুল

লেখক:

বিশ্বজিৎ চৌধুরী

শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে ভিজেছে বেশ কিছুটা সময় ধরে। সারা গায়ে সাবান মেখেছে। ধারাজলে সেই সাবানের সবটুকু ফেনা শরীর বেয়ে নেমে যাওয়ার পর কল বন্ধ করে সরে এলো শাওয়ারের নিচ থেকে। এতক্ষণ যে গুনগুন গানটা পানির শব্দে হারিয়ে যাচ্ছিল, সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবার। বাথরুমে ঢোকার আগে কোনো একটা টিভি চ্যানেলে গান শুনেছিল। সেই গানের রেশ ছিল মনে, নিজের অজান্তে গাইতেও শুরু করেছিল। ছোট্ট কক্ষের চার দেয়ালে সেই গান প্রতিধ্বনিত হয়ে এখন শ্রুতিমধুর হয়ে উঠছে নিজেরই কাছে। ভেজা শরীরটা মুছে নিচ্ছে তোয়ালে দিয়ে। বুকসমান আয়নাটার সামনে দাঁড়ালে প্রতিদিনই নিজের অনাবৃত শরীরের প্রতিবিম্ব রোমাঞ্চিত করে তাকে, আজো করল। বলো আয়না, সবচেয়ে সুন্দরী কে? – তুমি।

একটু হেসে আয়নাকে কপট ভৎর্সনা করে সরে আসছিল, ঠিক তখনই সেই চিৎকারটা শুনতে পেল। বাজখাঁই গলা, গগনবিদারী চিৎকার – হই, হই লাইনে যা, লাইনে যা…।

কেঁপে উঠল আপাদমস্তক, একটা ভয়, নাকি শিহরণ যেন বয়ে গেল শরীরের ওপর থেকে নিচের দিকে। তাড়াতাড়ি তোয়ালেটা জড়িয়ে নিল গায়ে।

বাথরুম একা থাকার এমন এক জায়গা, নিজেকে নিয়ে থাকার, এমনকি ওইটুকু পরিসরে অন্যের অগোচরে উদ্ভট কিছু করার সুযোগও যেন অবাধ। এই যেমন এখন স্টিলের বালতিটা ঠেলে জানালার নিচটায় নিয়ে গেল, উপুড় করে রেখে ওটার ওপর দাঁড়িয়ে গেল দুপায়ের ভারসাম্য রেখে। এবার মুখটা তুলে দৃষ্টি রাখতে পারল বাথরুমের ছোট্ট জানালায়। এখান থেকে গলির মোড় পর্যন্ত অনেকটা দেখা যায়। সেখানে প্রতিদিনের  নিয়মমাফিক ব্যস্ততা। কিন্তু লোকটাকে কোথাও দেখা গেল না।

রিয়া…।

দ্রুত নেমে এসে ফারিয়া বলল, জি আম্মু…।

আর কতক্ষণ… কলেজে যাবি না?

এই যে হয়ে গেছে, আসছি।

বাথরুমে ঢুকলে ঘণ্টা পেরিয়ে যায়, তারপর রাজ্যের তাড়াহুড়া, খাওয়ার সময় নেই…।

মায়ের গজগজ শুনতে পায়। দ্রুত জামাকাপড় পরে, তোয়ালেটা ভেজা চুলে জড়িয়ে বেরিয়ে আসে ফারিয়া।

কদিন হলো এ-পাড়ায় এক উটকো ঝামেলা এসে পড়েছে। গলির এ-মাথা থেকে ও-মাথা ঘুরে বেড়াচ্ছে একটা পাগল, সম্পূর্ণ নগ্ন। মাঝে মাঝেই সে চিৎকার করে ওঠে, হই, হই লাইনে যা লাইনে যা…।  আগে নাকি গলি থেকে একটু দূরে বড় রাস্তায় দাঁড়াত লোকটা, স্ব-দায়িত্বে ট্রাফিক কন্ট্রোল করত। পাগলদের মধ্যে অনেককেই এরকম স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ট্রাফিক কন্ট্রোলের দায়িত্ব নিতে দেখা যায়। নিজেদের মনের ভেতর বিশৃঙ্খলা ঘটে যাওয়ার পর সম্ভবত বাইরের কোনো বিশৃঙ্খলা বরদাশত করতে পারে না তারা। যানবাহনকে নিয়মে চলার পথ দেখায়। তা দেখাক, শহুরে রাস্তায় শত-শত গাড়ি আর পথচারী, তার মধ্যে এরকম দু-একজন অপ্রকৃতিস্থ লোকের উদ্ভট আচরণ এড়িয়ে পথ পেরিয়ে গেলেই হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, লোকটা হঠাৎ বৃহত্তর পরিসর ছেড়ে কেন যেন ঢুকে পড়ল গলিতে। রীতিমতো মূর্তিমান ঝামেলা।  তবে আচরণে কোনো সহিংসতা নেই, শুধু মাঝে মাঝে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠে, হই, হই…। পাড়ার লোকজন আসা-যাওয়ার পথে এরকম একটা দৃশ্যের সম্মুখীন হয়ে ভয়ানক অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেল। এলাকার বউ-ঝিদের জন্য তো ব্যাপারটা আরো বিব্রতকর।

পাড়ার ছেলেরা মিলে একদিন প্যাঁদানি দিয়েছিল, টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে ছেড়ে দিয়ে এসেছিল গলির বাইরে বড় রাস্তায়। কিন্তু সকালে দেখা গেল নগ্নমূর্তি ফের হাজির। মুখ ফুলে গেছে, শরীরের এখানে-ওখানে ছিঁড়ে-ছড়ে গেছে। কিন্তু নির্বিকার, কষ্ট-যন্ত্রণার বোধ থাকলে সে আর পাগল কেন! সেই আগের মতো চিৎকার করে উঠছে মাঝে মাঝে, হই, হই লাইনে যা…।

তার লজ্জাস্থান ঢেকে দিয়ে নিজেদের সম্ভ্রম রক্ষার উদ্যোগও নিয়েছিল কেউ। একটা লুঙ্গি পরিয়ে দিয়েছিল জোর করে। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি কিছুই, একটানে সেটা খুলে ফেলে পতাকার মতো হাতে দোলাতে দোলাতে চিৎকার করে উঠেছে, লাইনে যা, লাইনে যা।

অতঃপর ব্যাপারটিকে মেনে নিয়েছে অসহায় এলাকাবাসী। যতটা সম্ভব পাশ কাটিয়ে, দৃষ্টি বাঁচিয়ে চলতে হয়। অন্যমনস্ক হয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ বাজখাঁই গলার চিৎকার শুনে কেঁপেও উঠতে হয় কখনো।

প্রথমবার ফারিয়ার চোখে পড়েছিল কলেজে যাওয়ার সময়। সকাল ৯টার দিকে মেহেরুন্নিসা গার্লস কলেজের বাস আসে গলির মোড়ে। এ-পাড়ার স্কুল-কলেজের মেয়েরা এ-সময় দলবেঁধে গলির পথ পেরোয়। ফারিয়া সিনিয়র, এখানে বিএ ক্লাসের ছাত্রী তো সে একজনই। ফলে অন্যদের সঙ্গে একটু দূরত্ব রেখে হাঁটে। সেদিন কিছুদূর গিয়ে হঠাৎ দেখল মেয়েরা সব জড়োসড়ো হয়ে দ্রুত পথ পেরিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপার কী বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ এক চিলচিৎকারে কেঁপে উঠেছিল সে। আতঙ্ক ভর করেছিল চোখে-মুখে, অন্যদের দেখাদেখি প্রায় শ্বাস বন্ধ করে দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছিল বিপজ্জনক এলাকাটি। তখনই চোখে পড়ল। সম্পূর্ণ উলঙ্গ একটা লোক। এক নজরই তো দেখা, তাতেই মনে হলো চুল-দাড়িতে লোকটার চেহারায় যিশুখ্রিষ্টের আদল। বয়স কত হবে? ২৭ থেকে ৩০? গ্রিক ভাস্কর্যের মতো নির্মেদ শক্তপোক্ত শরীর। মনে পড়ে, হাঁটার গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়েছিল, আরো একবার মুখ ঘুরিয়ে দেখেছিল পাগলটাকে।

অস্বস্তিকর পথটুকু পেরিয়ে কলকলিয়ে উঠেছে স্কুলের মেয়েগুলো, হেসে একে অন্যের গায়ে প্রায় গড়িয়ে পড়েছে। এই বয়সের মেয়েদের সবকিছুতেই তো হাসি পায়, এই হাসি বোধহয় ওই পাগলটাকে নিয়ে, তার নির্লজ্জ নগ্নতা নিয়ে।  ফারিয়ার হাসি পায় না, কেমন যেন লাগে তার, ঠিক বুঝতে পারে না।

বড় রাস্তায় এসে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। দৈনন্দিন ব্যস্ততার কোলাহল, যানবাহনের হর্নের শব্দ ছাপিয়ে হঠাৎ কোকিলের ডাক শুনতে পেল। এই এলাকায় আগে কি কখনো কোকিল ডেকেছিল? মনে করার চেষ্টা করছিল, আর ঠিক তখনই উলটোদিকের রাস্তায় ফুটপাতের পাশে পলাশ গাছটার দিকে চোখ পড়ল। অবাক হয়ে গেল ফারিয়া। লালে লাল হয়ে আছে গাছটা, কখন ফুটল এতো ফুল, গাছের পাতাই যেন দেখা যায় না আর।

সীমা এসে দাঁড়িয়েছিল পাশে, মেহেরুন্নিসায় পড়ে, ফারিয়ার ক্লাসমেট, পাশের গলিতে থাকে।

কী রে, কী দেখছিস অমন হাঁ করে?

পলাশ গাছটা কেমন লাল হয়ে আছে দেখেছিস, ভাবছি এতো ফুল ফুটল কবে?

আজ দেখলি? পলাশ তো ফুটেছে অনেকদিন, এটা ফাগুন মাস না…।

তাই তো এতোদিন চোখে পড়ল না কেন, ফারিয়া ভাবে, এটা তো ফাগুন মাস। হাওয়াটা যেন কেমন, মন এলোমেলো করে দেয়, একটু শীতের স্পর্শও আছে।

কলেজের বাস এসে পড়েছে, সীমা তাড়া দিতেই, কী ভেবে ফারিয়া বলল, আমি যাব না রে, শরীরটা কেমন খারাপ লাগছে।

হঠাৎ?  পিরিয়ড?

না, পেটটা মোচড়াচ্ছে…।

তাহলে তাড়াতাড়ি বাসায় গিয়ে টয়লেটে ঢোক, পরে একগ্লাস স্যালাইন ওয়াটার…, হা হা হা।

হাসতে হাসতে বাসে উঠে পড়ল সীমা। ফারিয়া নিজেও কি একটু বিস্মিত হয়েছিল নিজের সিদ্ধান্তে? কলেজে যাবে বলে তৈরি হয়ে এলো, এর মধ্যে কী এমন ঘটে গেল যে, সীমাকে মিথ্যে একটা অজুহাত দেখিয়ে ফিরে যাচ্ছে বাসায়? সেখানে আম্মুকেও একই মিথ্যে বলতে হবে।

ফিরে আসার পথে আবার দেখা হয়ে গিয়েছিল গ্রিক ভাস্কর্যটির সঙ্গে। না-না করেও একবার ওদিকে না তাকিয়ে পারেনি। এবার চোখাচোখি হয়ে গেছে লোকটার সঙ্গে। ফারিয়ার দৃষ্টিতে কি কিছু ছিল? আশ্চর্য, যে-লোকটা দিন-রাত্রি উদোম হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে মহল্লায়, সে হঠাৎ ফারিয়ার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল যেন, তাড়াতাড়ি দুহাত দিয়ে ঢেকে ফেলেছিল তার ঊরুসন্ধি। একটু গ্লানি বোধ করল ফারিয়া, দ্রুতপায়ে বাকি পথটা পেরিয়ে ঘরে ফিরেছিল।

সেদিনের পর থেকে বারবার এরকম ঘটেছে। কলেজে যাওয়ার পথে বা যে-কোনো কাজে পথে বেরোলেই অনেক শাসন করেও নিজেকে এই অদ্ভুত কৌতূহল থেকে বিরত রাখতে পারেনি। লোকচক্ষু বাঁচিয়ে একবার তাকিয়েছে পাগলটার দিকে।  যাওয়া-আসার পথে কত লোকেরই হয়তো ইচ্ছা-অনিচ্ছায় চোখ পড়ে যায়, কিন্তু শুধু তারই দৃষ্টির সামনে কেমন কুঁকড়ে যায় যিশুখ্রিষ্ট, তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে ঢেকে নেয় লজ্জাস্থানটি।

কৌতূহল তার এমন অদম্য হয়ে উঠেছিল, নিজের চারতলার পড়ার ঘরের জানালা দিয়েও তাকিয়েছে। সবসময় দেখা যায় না, দু-একবার দেখেছে। দূর থেকে চোখাচোখি হতেই তাড়াতাড়ি দুহাতে লজ্জা ঢেকেছে, এমনকি ছুটে সরে গেছে তার দৃষ্টিসীমা থেকে। প্রতিবারই নিজেকে তীব্র ধিক্কার দিয়েছে, কিন্তু মন তার শাসন মানেনি।

একদিন শেষ রাতের দিকে অদ্ভুত অনুচিত একটা স্বপ্ন দেখল ফারিয়া। বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকলে নাকি সেরকম ঘটনা স্বপ্নে ঘটে না। কিন্তু সেরকম কোনো অভিজ্ঞতা তো তার নেই। পাশের ফ্ল্যাটের রতনভাইয়ের সঙ্গে একটু ভাব হয়েছিল কিছুদিন। সম্পর্কটা গড়াতে পারত, কিন্তু বড়ভাইয়ের এক শালির সঙ্গে রতনের অনেকদিনের সম্পর্ক এ-কথা জানার পর কষ্ট পেয়েছিল। আর ও-মুখো হয়নি। এই রতনভাই-ই এক সন্ধ্যায় ছাদে একা পেয়ে ফারিয়াকে প্রায় জোর করে চুমু খেয়েছিল। অনিচ্ছায় বলে কিনা কে জানে, বিস্বাদ লেগেছিল। আর রেবা, রেবার কাছে শুনেছিল নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে নানা অশ্লীল কথা। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরপরই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল রেবার। একান্ত আড্ডার সময়গুলোতে স্বামীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের কথা রসিয়ে বলতো নির্লজ্জ মেয়েটা। কান জ্বলতো, কিন্তু অস্বীকার করবে কী করে শুনতে ইচ্ছেও করতো।  রেবাই একদিন দুপুরে তার একা ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়ে ডিভিডিতে নীল ছবি দেখিয়েছিল তাকে। জঘন্য! এসব কসরত দেখে বিবমিষা হয়েছিল তার।

তবু এরকম স্বপ্নটা ফারিয়া দেখেছে শেষরাতে। যিশুখ্রিষ্টের মুখের আদলের গ্রিক ভাস্কর্যটার সঙ্গে নিজের শারীরিক মিলনের স্বপ্ন। ঘুম ভাঙার পর বিস্মিত হয়েছে, অপরাধবোধে ভারী হয়ে গেছে মন, ছিঃ রাস্তার একটা পাগল! স্বপ্নই তো, আর কিছু তো নয়, তবু কেন তীব্র এক স্পর্শের অনুভবে তখনো আচ্ছন্ন হয়ে আছে শরীর!

সকালে বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে ভিজল বেশ কিছুটা সময় ধরে। সাবান মেখে মেখে ধুয়ে ফেলতে চাইল সবকিছু। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অনাবৃত শরীরের প্রতিবিম্ব দেখে রোমাঞ্চিত বোধ করল। বলো আয়না, সবচেয়ে সুন্দরী কে? – তুমি।

এদিকে পাড়ার লোকজন এক সকালে অবাক হয়ে দেখল, পাগলটা লুঙ্গি আর আধময়লা একটা পাঞ্জাবি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হইহই করে চিৎকারও করছে না আর। কী যেন বিড়বিড় করছে আপনমনে, আর মাঝে মাঝে কাসেম সাহেবের বিল্ডিংটার তিন-চারতলার দিকে তাকিয়ে কী যেন খুঁজছে। লোকটাকে এখন পাগল মনে হচ্ছে না আর, বরং ভিখারি, একটা কাঙাল ভিখারি মনে হচ্ছে তাকে।