পাপুয়া নিউগিনির বিলুম এবং ভ্যান গঘের ‘আমন্ড ব্লসম’

লেখক:

লায়লা খন্দকার
অফিস যাওয়ার পথে জনিওর সঙ্গে টুকটাক গল্প করা আমার প্রতিদিনের প্রিয় বিষয়গুলোর অন্যতম। গোরোকায় কোনো সংস্থায় কর্মরত নারী গাড়িচালকের সংখ্যা হাতে গোনা যায়; সে তাদের একজন। মৃদু হাসি-মাখানো মুখ তার আর আছে দরদি একটা মন। প্রতি সকালে এমন স্নিগ্ধ এক মানুষের সান্নিধ্যে আসতে কার না ভালো লাগে? গোরোকার মেঘ-বৃষ্টি, বাজারের নতুন সবজি আর ফল, সামনের নির্বাচন, পরিবারের সদস্যদের খবরাখবর – সবকিছুই থাকে আমাদের আলাপচারিতায়। পাপুয়া নিউগিনির সমাজ ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে জানতে চাই; সে ধৈর্য ধরে উত্তর দেয়। পাহাড়ি সবুজের মাঝ দিয়ে অাঁকাবাঁকা পথে গাড়ি চলে। চোখে পড়ে বৃক্ষরাজি, ফুলের উজ্জ্বল রং, পায়ে হেঁটে চলা বিদ্যালয়গামী শিশু ও নানা বয়সী নারী-পুরুষ। কেউ কেউ পথের ধারে মাদুর পেতে দোকান সাজাচ্ছে, জেগে উঠছে একটা শহর। তার মাঝে জনিওর সঙ্গে কথা বলতে বলতে মনে পড়ে সুমনের গান – ‘আজ সকালকে ডেকে বলি/ গাও রবি-নজরুলগীতি/ তাতে আমার ভীষণ প্রীতি/ দেখো সূর্যের পরিমিতি, দেখো সূর্যের পরিমিতি…’
এক সকালে জনিওকে বিলুম (হাতে তৈরি ব্যাগ) নিয়ে কী একটা প্রশ্ন করেছিলাম। সে জানায়, ‘মেনা তোমার জন্য একটা বিলুম বানাতে চেয়েছে।’ মেনা তার বোন। কিছুদিন আগে জেনেছি যে, সে মা হতে চলেছে। তারপর তার খবরাখবর নিতাম। কথা বলে বুঝলাম, তার ও অনাগত সন্তানের কুশল জানতে চেয়েছি এই কৃতজ্ঞতায় সে আমার জন্য বিলুম তৈরি করবে। আমি বিস্মিত হতাম, কিন্তু তার আগেই এদেশের নারীদের হৃদয়ের ঔদার্যের পরিচয় পেয়েছি কয়েকবার। তাই ভীষণ ভালো লাগলেও অবাক হই না। এখানকার সহজ-সরল মানুষগুলোর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর মানবিক উষ্ণতায় আরেকবার গভীরভাবে কৃতজ্ঞবোধ করে উঠি।
দুই
পাপুয়া নিউগিনিতে নারীদের হাতেবোনা এক নকশাময় ব্যাগের নাম বিলুম। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশটির মোট ২২টি প্রদেশের মাঝে পাহাড়ি প্রদেশের সংখ্যা আট; সেসব স্থানেই এর প্রচলন আছে। আগে তা তৈরি করা হতো গাছের তন্তু থেকে বানানো দড়ি দিয়ে। রান্না করার কাঠ আর সবজি থেকে শুরু করে শিশু বহনের জন্য তা ব্যবহৃত হতো। বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে বণিকদের আগমনের পর কারখানায় তৈরি উল দিয়ে বিলুম বানানো শুরু হয়। ফলে বিভিন্ন রঙের বৈচিত্র্যপূর্ণ নকশার ব্যাগ বোনা সম্ভবপর হয়েছে। এগুলো আগের চেয়ে শক্ত, ধোয়াও সহজ।
বিলুম অসংখ্য নকশার হয়। তার প্রতিটি একটি নির্দিষ্ট স্থান বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে। এখানে আসার কিছুদিন পর জনিওর স্বামী একটা বিলুম উপহার দিয়েছিল। জনিও ব্যাখ্যা করেছে, ‘এই নকশা বেনা শহরের।’ তার স্বামী সে-অঞ্চলের মানুষ। এখানকার অনেকেই ব্যাগ দেখে তা কোন এলাকার তা বলে দিতে পারে। বেশ কিছু জটিল ও বিশেষ নকশা আছে যা বিয়ে, মৃত্যু, শস্য বা নৃত্য উৎসবের মতো অনুষ্ঠানের জন্যে। একটি গ্রামে অল্পসংখ্যক নারী বংশপরম্পরায় তা সৃষ্টির দক্ষতা অর্জন করে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অন্যসব কিছুর মতো বিলুমেও পরিবর্তন আসছে। আগে তা মাথা থেকে পেছনে ঝুলিয়ে রাখা হতো। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে আর্থিক লেনদেন শুরুর পর টাকা ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বহন করার প্রয়োজন হয়। তখন কাঁধে ঝোলানো বিলুমের প্রচলন হয়। এটি আবার দুই রকমের – লম্বা ও খাটো স্ট্র্যাপের। বিলুম সাধারণত খোলা থাকে, তবে সম্প্রতি চেইন দিয়ে ওপরের অংশ আটকানো যায় এমন ব্যাগ বানানো হচ্ছে; তার সংখ্যা অবশ্য খুব কম। ইদানীং তো বিলুম দিয়ে মেয়েদের পোশাকও তৈরি হয়; গ্র্যাজুয়েশনসহ নানা অনুষ্ঠানে অনেকেই তা পরছে। প্রবাসী পাপুয়া নিউগিনিয়ানদের মাঝেও এর কদর আছে। গোরোকার পথে দেখা শিশু ও নানা বয়সী নারী-পুরুষের প্রায় সবাই বিলুম বহন করে; বই-খাতা, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, সবজি ইত্যাদি বহনের কাজেই এর ব্যবহার। চোখে পড়ে যে, একেকজন ব্যাগ নেয় একেকভাবে। কাঁধে ব্যাগ থাকে অনেকের; তার মাঝে কেউবা তা বহন করে এক কাঁধ থেকে অন্যদিকে কোনাকুনিভাবে। কেউ কেউ গলা থেকে সামনের দিকে বিলুম ঝোলায়, আর অল্পসংখ্যক মানুষ (প্রধানত নারী) ভারী ব্যাগ পিঠে বহন করে। এক জায়গায় এত রকমভাবে ব্যাগ নিতে আমি আর কোথাও দেখিনি।
গোরোকা অসংখ্য রকমের ফুলের জন্য বিখ্যাত; তা শহরটিকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। পাশাপাশি বিচিত্র রং আর শৈলীর বিলুম এক জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রাকৃতিক আর মানুষের তৈরি সৌন্দর্যে প্রতিদিন স্নাত হই। বর্তমান সময়ে বেশকিছু মানুষ পশ্চিমা ধরনের ব্যাগ বহন করছে। ভয় হয়, বিলুম টিকে থাকতে পারবে তো? খুব মন খারাপ হয় দোকানগুলোতে প্লাস্টিকের ছড়াছড়ি দেখলে। যে-দেশে বিলুমের মতো পরিবেশবান্ধব জিনিস শতাব্দী ধরে চলে আসছে সেখানে প্লাস্টিক নামের ক্ষতিকর জিনিসের প্রচলন করল কারা, কেন? তথাকথিত উন্নয়নের জোয়ারে অনেক জঞ্জাল ঢুকে পড়ে; নানা দেশের অভিজ্ঞতা সে-সাক্ষ্য দিচ্ছে।
দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার ছাড়াও বিলুমের অন্য গুরুত্ব আছে। বর্তমানে অনেক নারী এটি বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করছে। গোরোকা যার প্রধান শহর সেই ইস্টার্ন হাইল্যান্ডস প্রদেশের কথাই ধরা যাক। গ্রামের মানুষ ফসলের ওপর নির্ভরশীল তাদের জীবিকার জন্য। কফি অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল, কিন্তু তা ঋতুভিত্তিক। তাই বিলুম বিক্রি করে নারীরা পরিবারের উপার্জন বাড়াচ্ছে। অনেকে নিজের বাগানের সবজিও বিক্রি করে। এভাবে উপার্জিত অর্থ তাদের অনেকেই খরচ করছে সন্তানদের লেখাপড়া আর অন্য প্রয়োজনীয় কাজে।
তিন
উপহার হিসেবে বিলুমের প্রতীকী গুরুত্বের কথা জনিওর কাছেই শোনা। সে বলে, ‘কখনো কখনো কারো প্রশংসা করার জন্য বিলুম দেওয়া হয়। যেমন কোনো মা যদি সন্তানের শিক্ষকের ওপর খুশি হয় তাহলে বছরশেষে তাকে একটা বিলুম তৈরি করে দিতে পারে।’ আরেক সহকর্মী জোসেফিনের কাছে জানি উপহার ছাড়াও এর অন্য তাৎপর্য। কখনো দুই গোষ্ঠীর মাঝে বিবাদ মেটানোর সময় বিলুম-বিনিময় হয়।
এক স্থানীয় সংস্থার ১০ বছরপূর্তি অনুষ্ঠানে বেশ কিছু অতিথিকে বিলুম দেওয়া হয়। আমরা দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে কাজ করছি বলে আমিও একটা পাই উপহার হিসেবে। সাদা-কালোর নকশার ব্যাগটি একজন বৃদ্ধা বানিয়েছেন বলে জানতে পারি। বোনার সময় তিনি কী ভাবছিলেন? কখনো তা জানা হবে না। মনে হয়, প্রতিটি বিলুমের নিজস্ব গল্প আছে; যে তৈরি করছে তার জীবনের গল্পের সঙ্গে তা জড়িত।
কোনো কারণ ছাড়া বিলুম দেওয়ার উদাহরণ নিজের চোখেই দেখলাম। জনিও আমাদের অফিসের এক নিরাপত্তারক্ষীর জন্য বিলুম বানালো কারণ সে খেয়াল করেছিল যে, তার মাত্র একটা ব্যাগ আছে যা সবকিছু বহনের জন্য যথেষ্ট নয়। ইচ্ছা করলে সে তৈরি করা বিলুমটি বিক্রি করতে পারত, কিন্তু তা না করে উপহার হিসেবে দেওয়ায় জনিওকে মানুষ হিসেবে আরো বেশি শ্রদ্ধা করতে শুরু করি। পাপুয়া নিউগিনিতে কাজ করতে যাচ্ছি শুনে ঢাকায় পরিচিতজনরা নানা মন্তব্য করেছে। (একটা দেশ সম্পর্কে প্রায় কিছুই না জেনে বা খুব স্বল্প জানা থেকে মানুষ যে কত কথা বলতে পারে!)। তাদের একজন বলেছিল, ‘ওখানে তো তোমার কোনো সোশ্যাল লাইফ থাকবে না, তুমি কারো সঙ্গে মিশতে পারবে না, কারণ ওরা তো এখনো সিভিলাইজড হয়নি।’ তথাকথিত ‘সভ্য’ পৃথিবীর মানুষ অসংখ্য মানুষকে অভুক্ত আর অসুস্থ রেখে প্রতি বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার যুদ্ধের পেছনে খরচ করছে। আর যে-দেশের মানুষ ‘সভ্যতার সংস্পর্শে আসেনি’ (আমার পরিচিত ব্যক্তিটির মতে) সেখানকার এক নারী নিজ শ্রমে বোনা বিলুম বিক্রি না করে সহকর্মীকে দিয়েছে। পরিবার খরচ চালাতে না পারায় জনিও নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে বিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। তার বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই, মাঝে মাঝে পানির সংকটও হয়। কিন্তু তার কোনো অভিযোগ নেই; পরোপকার করে আর হাসি বিলিয়ে জীবন কাটাচ্ছে। ঢাকায় আপত্তিকর মন্তব্য করা ব্যক্তিটি যদি তার মতো মানুষদের জানত। ‘সভ্যতা’র সংজ্ঞা কী আর কে তা নির্ধারণ করে?

চার
মেনার ছেলে হয়েছে, তার নাম ডেভিড। মা ও সন্তান ভালো আছে – জনিওর কাছ থেকেই নিয়মিত খবর পেয়েছি। তখনি কথা ছিল যে, ডেভিড একটু বড় হলে সবাই মিলে আমার বাসায় বেড়াতে আসবে। আমরা গল্প করব, একসঙ্গে দুপুরের খাবার খাব, আর আমি তাদের ছবি তুলব যাতে পরে প্রিন্ট করে দিতে পারি। ডেভিডের বয়স মাসদুয়েক হলে ওরা সবাই এলো। মেনা ও জনিও দুজনই আমার জন্য বিলুম বানিয়ে এনেছে। কালোর মাঝে কমলা রঙের জনিওর সৃষ্ট বিলুমটি বাংলাদেশের বসন্তের কথা মনে করিয়ে দিলো। আর মেনা বানিয়েছে সাদা, হালকা ও গাঢ় বেগুনির জটিল নকশার এক ব্যাগ। জানি, তাদের দুজনই কয়েক সপ্তাহ ব্যয় করেছে এর পেছনে। কিছু কিছু ঋণ এ-জীবনে শোধ হওয়ার নয়; আমরা শুধু তা স্বীকার করতে পারি।
মেনার সঙ্গে কথা হয় জনিওর মাধ্যমে, কারণ আমি তার ভাষা জানি না। বেশি আলাপ না করলেও তার পাশে বসে থাকতেই ভালো লাগে। মানুষ হিসেবে সরলতা আর ভালোত্বই হয়তো তার চেহারায় এক অদ্ভুত মাধুর্য দিয়েছে। মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা, ‘সংসার মাঝে কয়েকটি সুর/ রেখে দিয়ে যাব করিয়া মধুর/ দুএকটি কাঁটা করি দিব দূর/ তারপর ছুটি নেব।’ মেনা আর জনিওর মতো মানুষের জন্যই বোধহয় যুদ্ধ, সংঘাত আর ভুল বোঝাবুঝির পৃথিবীটা এখনো বাসযোগ্য আছে।
পাঁচ
আমস্টারডামে ভ্যান গঘ মিউজিয়ামে ‘আমন্ড ব্লসম’ ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। নেদারল্যান্ডসে এলে এখানে সময় কাটানো তীর্থ দর্শনের মতো। ১৮৯০ সালে অাঁকা এ-চিত্রকর্মটি প্রথমবার দেখার পর থেকেই মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে। সে কি এর সঙ্গে জড়িত গল্পটির জন্যই? ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ তাঁর ভাই থিও ও ভ্রাতৃবধূ জোকে এটি উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন তাঁদের সন্তানের জন্মের পর। এই অসাধারণ শিল্পীর জীবনে থিও ছিল ভাইয়ের অধিক বন্ধু ও হয়তো জীবিতাবস্থায় তাঁর একমাত্র সুহৃদ। এমন প্রগাঢ় মানবিক সম্পর্কের নজির বোধহয় খুব বেশি নেই। থিও তাঁর ভাইয়ের নামে নিজের ছেলের নাম রেখেছিল ভিনসেন্ট উইলেম। জাপানি প্রভাবে অাঁকা ‘আমন্ড ব্লসমে’র দিকে তাকালেই একটা সহজতা টের পাওয়া যায় – নীল আকাশের পটভূমিতে কিছু সাদা ফুল যেন পৃথিবীর সব শুভেচ্ছার প্রতীক হয়ে দুলছে। গেয়ে উঠতে ইচ্ছা করে, ‘আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে।’ তখন ভ্যান গঘের জীবনে ভীষণ টালমাটাল একটা সময় চলছিল। (তাঁর জীবনে একটাও সুস্থির মুহূর্ত ছিল কি?)। তিনি যেন নিজের জীবনের সব যন্ত্রণাকে খুশিতে পরিণত করে প্রাণপ্রিয় থিওর ছেলেকে এই বিশ্বে স্বাগত জানিয়েছিলেন এই ছবিটার মাধ্যমে। কখনো কখনো আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির পার্থক্য ঘুচে যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠিকই বলেছেন। ভ্যান গঘের ‘আমন্ড ব্লসম’ আর মেনা ও জনিওর আমাকে দেওয়ার জন্য বিলুম তৈরি কি খাঁটি মানবিক অনুভূতির বিচারে সমমানের নয়? জোর চিঠি থেকে জানা যায়, শিশু ভিনসেন্ট অবাক হয়ে তাঁদের ঘরের দেয়ালে ঝোলানো শিল্পকর্মটির দিকে তাকিয়ে থাকত। আমি প্রায়ই মুগ্ধ হয়ে উপহার হিসেবে পাওয়া বিলুম দুটি দেখি, মাঝে মাঝে তা কাঁধে ঝুলিয়ে বেড়াতে যাই; এক অদ্ভুত ভালো লাগায় মন ভরে ওঠে। পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত দোকানের ভীষণ দামের কোনো ব্যাগ কোনোদিন আমাকে এই অনুভূতি দিতে পারত না, পারে না। প্রকৃত বিচারে মূল্যবান জিনিসগুলো কি কখনো টাকা দিয়ে কেনা যায়?

ছয়
গোরোকায় আছে দেশের সবচেয়ে বড় বিলুম বাজার। সেখানে রাস্তার পাশে গ্রিলের ওপর ঝোলানো থাকে অনেক ব্যাগ। শহরের বিভিন্ন এলাকা আর আশপাশের গ্রাম থেকে নারীরা সকালেই আসে। কেউ কেউ বিক্রির পাশাপাশি সেখানে বসেই বিলুম বোনে। প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসার পথে রঙের বাহার আর নকশার নান্দনিক সৌন্দর্য দেখি; এই উন্মুক্ত আর্ট গ্যালারিতে মুগ্ধ হই।
এক দুপুরে সেই বাজারে ঘুরতে গিয়েছিলাম। সময় নিয়ে নকশাগুলো দেখি। প্রতিটির আলাদা নাম আছে। জনিও কয়েকটির নাম বলে – পতাকা, হীরা, পর্দা, কম্পিউটার, ব্যাটারি। শেষের দুটির নাম নিশ্চয়ই সাম্প্রতিককালের হবে? অনুমানটি সঠিক। কোনো কোনো নারী নতুন নকশা তৈরি করে নাম দেয়; পরবর্তীকালে অন্যরা তার কাছ থেকে শিখে নেয়। কয়েকজন বিলুমশিল্পীর সঙ্গে কথা বললাম। জানলাম, নকশার ওপর ভিত্তি করে এক থেকে দশটা কাঁটা ব্যবহার করা হয় ব্যাগগুলো তৈরির সময়। একজনকে প্রশ্ন করি, ‘আপনি কীভাবে বিলুম বানাতে শিখেছেন?’ জনিও তার হয়ে উত্তর দেয়, ‘সে তো একজন নারী, সে জানে কীভাবে বিলুম বানাতে হয়।’ বুঝি, এই শিল্পে দখল নারীদের সহজাত গুণ হিসেবে স্বীকৃত। এখানকার প্রায় সব মেয়েই বিলুম বানাতে পারে। জনিও শিখেছিল মায়ের কাছে, আর তার দুই মেয়ে শিখেছে বান্ধবীদের কাছ থেকে। জনিও কয়েকটা নকশা মেয়েদের কাছ থেকেও তুলে নিয়েছে।
সহকর্মীদের কাছে জানি যে, তারা বিলুম বানাতে পারে, তবে পেশাগত কাজ আর সাংসারিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকে ইদানীং সময় করে উঠতে পারে না। তবে এখনো অনেক নারী অন্যদের সঙ্গে গল্প করতে করতে বিলুম বুনে অবসর কাটায়। (বাংলাদেশের নকশিকাঁথার ঐতিহ্যটা বোধহয় এমনই ছিল, তাই না?)। প্রতি সোমবার জনিওকে প্রশ্ন করি, ‘উইক এন্ডে কী করেছ?’ সে সংসারের নানা দায়িত্ব পালন করে বলে জানতে পারি। তার সঙ্গে প্রায়ই যোগ করে, ‘প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্প করেছি আর বিলুম বুনেছি।’ অন্য কাজের ফাঁকে বিলুম তৈরিও বেশ স্বাভাবিক। পথের পাশে সবজি বা সুপারির পসরা সাজিয়ে বসা অনেক নারীকে দেখা যায়। কেউ কেউ সেখানে বসেই বিলুমও বোনে। মাত্র ৪০ হাজার অধিবাসীর শহর গোরোকায় জীবন চলে ধীরগতিতে। কারো কোনো বিষয়ে তাড়াহুড়া নেই। তার মাঝে বিলুম বোনা দেখলে বেশ প্রশান্ত একটা অনুভূতি হয়, যেন সবকিছু মিলিয়ে এক সুসামঞ্জস্য আছে। মনে পড়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় :
আমাদের এখানে সবকিছুই, এমনকি ক্ষিদে পর্যন্ত
অত্যন্ত রহস্যময়ভাবে সরল…
আমরা আকাশকে রেখেছি নীল
আমরা নীলাভ ছায়ার মধ্যে খুঁজে বেড়াই আমাদের ভ্রমর
আমরা আবহমানকালকে ‘দাঁড়াও’ বলে
থমকে রেখেছি।

কিন্তু কতদিন সাংস্কৃতিকভাবে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ বিলুম তৈরির চর্চাটি টিকে থাকবে সেটাই ভাবনার বিষয়। বাংলাদেশে আমার শৈশবেও তো পরিচিত অনেক নারীকে শীতকালে উলের জামা-কাপড় বানাতে দেখেছি, এখন তো আর তা তেমন একটা চোখে পড়ে না। অন্যদের কথা কী বলব, আমি নিজেই তো উলের কাজ পারি না। এখানকার নারীদের বিলুম বানাতে দেখে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের কোনো হস্তশিল্পে দক্ষতা থাকলে খুব ভালো হতো। তাহলে হয়তো আমিও মেনা আর জনিওকে উপহার হিসেবে নিজ সময় ও শ্রম দিয়ে তৈরি সুন্দর কিছু দিতে পারতাম, যা আমার সংস্কৃতিকে তুলে ধরত।

সাত
মাঝে মাঝে একটা প্রশ্ন মাথায় এমনভাবে ঘুরপাক খায় যে তা থেকে নিস্তার নেই। কিছুদিন থেকে ভাবছি, যে-কোনো সামগ্রীর মূল্য কে নির্ধারণ করে? বাজার? বণিক সভ্যতার এই যুগে বাজারের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে? সাধারণত ৪০ থেকে ৮০ কিনায় (২০ থেকে ৪০ ডলার) একটা বিলুম কিনতে পাওয়া যায়। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকার দামি দোকানে ব্যাগ দেখি – একেকটি কয়েকশো ডলারে বিক্রি হচ্ছে। বিখ্যাত ডিজাইনাররা নকশা করেছেন, আর তৈরি ও বিপণনে আছে দামি ব্র্যান্ডের কোম্পানি। আমার কাছে তো পাপুয়া নিউগিনির নারীদের সৃষ্ট বিলুমগুলোকে সেগুলোর তুলনায় কোনো অংশে কম আকর্ষণীয় মনে হয় না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের আবেদন আমার কাছে বেশি, কারণ এগুলো একটি জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করছে; এর মাঝে আছে সাধারণ নারীদের সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর, যাদের আমরা প্রথাগত অর্থে শিল্পী বলে মূল্য দিতে এখনো শিখিনি। পেশাগত প্রয়োজনে প্রায়ই অস্ট্রেলিয়া যেতে হয়; একবার মেলবোর্নে কয়েকদিন থাকার পর মনে হচ্ছিল, পথেঘাটে রঙের বড় অভাব, কেমন যেন বিবর্ণ সবকিছু! বুঝলাম যে, বিলুমের সৌন্দর্য বেশ ভালো প্রভাব ফেলেছে আমার ওপর।
পশ্চিমা নামি কোনো ডিজাইনার বিলুম দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ব্যাগ বা অন্য কোনো কিছু বানালে হয়তো পাপুয়া নিউগিনির সমৃদ্ধ এক ঐতিহ্য সম্পর্কে বহির্বিশ্ব জানবে। (তার আগে এই অসাধারণ শিল্পটি পেটেন্ট করার জন্য দেশটি উদ্যোগ নেবে কি?)। যে-কোম্পানি তা বাজারজাত করবে তার হয়তো মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার মুনাফা হবে। ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’র এই সময়ে মেনা ও জনিওর মতো শিল্পীরা ভালোবেসে উপহার হিসেবে বিলুম বানিয়ে যাবেন, আর সেই বিশুদ্ধ প্রাণের আবেগের ছোঁয়ায় আমরা ধন্য হবো। 

১ thought on “পাপুয়া নিউগিনির বিলুম এবং ভ্যান গঘের ‘আমন্ড ব্লসম’