পালানাট্যের অভূতপূর্ব উৎসব

লেখক:

আবু সাঈদ তুলু

‘শাপে বর’ প্রবাদটি বাঙালি সমাজে কারো অপরিচিত নয়। বাংলাদেশে ঢাকাকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় প্রায় তেমনই এক ঘটনা লক্ষ করা গেল কয়েকদিন আগে। নাট্যতীর্থ নামে এক তারুণ্যদীপ্ত নাট্যদল তাদের দলীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নাট্যমেলার আয়োজন করে। দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সুন্দরী নারীচরিত্রকে প্রাধান্য দিয়ে পরিবেশিত নাটকগুলোর মধ্য থেকে বাছাইকৃত কিছু নাটক নিয়ে তাদের এবারের আয়োজন। উৎসবের নামকরণ করা হয় ‘সুন্দরী নাট্যমেলা-২০১৬’। কিন্তু দেখা গেল, এ ‘সুন্দরী’ বৈশিষ্ট্যধারী নারীচরিত্র প্রাধান্যের প্রায় প্রতিটি নাটকই আবহমান বাংলার নাট্যপালা আঙ্গিকের। ফলে গত ২ থেকে ৭ ডিসেম্বর শিল্পকলা একাডেমি অঙ্গনে ‘নারীর সৃজনে ঋদ্ধ বিশ্ব চরাচর’ সেøাগানকে সামনে রেখে অনুষ্ঠিত ‘সুন্দরী নাট্যমেলা-২০১৬’ এক অর্থে পালানাট্যোৎসবে পরিণত হয়েছিল। এতে প্রদর্শিত হয় ছয়টি নাটক। আবহমান পালানাট্যের নারীপ্রধান চরিত্রগুলোই ভেসে উঠছিল এসব নাটকে। গীতিকার নারীরা নিতান্তই গৃহবন্দি নন। একদিকে যেমন প্রেমময়ী, অন্যদিকে তেমনি অপরিসীম ব্যক্তিত্ব, সাহস ও শৌর্যের অধিকারী। ওই উৎসবের ওপর ভিত্তি করে আবহমান পালানাট্য প্রসঙ্গ, প্রদর্শিত প্রযোজনাগুলোর বৈশিষ্ট্য-বৈচিত্র্য, নান্দনিকতা ও দর্শক উপযোগিতার স্বরূপ আলোচনাই লেখাটির মূল অভীষ্ট।

বাংলাদেশের আবহমান নাট্যধারা ‘পালা’। গ্রামগঞ্জে এখনো প্রতিনিয়ত শত-শত পালা, জারি, যাত্রা মঞ্চস্থ হয়ে চলেছে। যদিও আধুনিকতার দোহাই দিয়ে এসব পরিবেশনাকে ‘ফোক’ স্টাডিজে আবদ্ধ করে দূরে ঠেলে রাখা হয়। আজো গ্রামীণ বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় পরিবেশনা ‘পালা’। সাধারণত গ্রামে পরিবেশনযোগ্য কাহিনিকেই ‘পালা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কাহিনির প্রাধান্য বা নির্ভরতা বিদ্যমান থাকে বলেই এ-শ্রেণির নাট্যকে ‘পালা’ বলে। বন্দনা, বর্ণনা, নাচ, গান ও অভিনয়ের মাধ্যমে পালা উপস্থাপিত হয়। ‘পালা’ আঙ্গিকটি বাঙালি জীবনের মধ্যযুগে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যযুগে মঙ্গলকাব্য ধারার উপস্থাপনরীতি ছিল প্রধানত পাঁচালি কিংবা পালাকেন্দ্রিক। বৈশিষ্ট্য ও বিষয় অনুসারে ‘পালা’ ভিন্ন-ভিন্ন নামেও পরিচিত। মধ্যযুগে মঙ্গলকাব্য দিনে পরিবেশিত হলে বলা হতো দিবাপালা আর রাত্রিকালে উপস্থাপিত হলে বলা হতো নিশাপালা। সমকালীন বাংলাদেশে মানবীয় প্রেমাখ্যান নিয়ে নানা নামকরণে ‘পালা’ পরিবেশিত হয়ে থাকে।

এ-নাট্যাঙ্গিক চারপাশে দর্শকবেষ্টিত খোলা মঞ্চে অভিনীত হতো। কখনো-কখনো কৃত্রিম মঞ্চেও প্রদর্শিত হয়। পালা সাধারণত লোকায়ত হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় বা বিশ্বাসগত বিষয়বস্তু এবং বাঙালি জীবনের ইতিহাস ও ঐতিহ্যনির্ভর নানা বিষয় ও চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। পালাগানে একজন মূল গায়েন বা বয়াতি থাকেন। পালার সংগীত, কাহিনি ও নাট্যিক উপস্থাপনে দোহারগণ সাহায্য করে থাকেন। পালাগানের কবিকে সাধারণত পদকর্তা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। ঔপনিবেশিক পরিভাষায় ‘পালা’কে ‘গীতিকা’ বা ‘ব্যালেড’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। বিংশ শতকের শুরুতে দীনেশচন্দ্র সেন চন্দ্রকুমার দে-র সহায়তায় বাংলাদেশে প্রচলিত কিছু পালা সংগ্রহ করে সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। প্রকাশিত বিভিন্ন পালার মধ্যে তাঁর সংকলিত ও সম্পাদিত মৈমনসিং গীতিকা বাঙালি বিদ্বৎসমাজে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পায়। এটি বাংলা সংস্কৃতির অনন্য সম্পদ। পালার বৈশিষ্ট্যে বর্ণনা, ঘটনা, অভিনয়, সংগীত, নৃত্য ইত্যাদির অদ্বৈত রূপ উপস্থাপনে বিদ্যমান থাকে। সেলিম আল দীন বলতেন, এ-পালাগুলোই আমাদের নাট্য (সেলিম আল দীন, কথাপুচ্ছ, যৈবতী কন্যার মন)। এগুলো রচনাতেও আবহমান বাংলার রচনারীতিকেই ধারণ করে থাকে। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে এখন বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে পালানাট্য প্রদর্শিত হচ্ছে। সমকালে কুষ্টিয়ার মানিক সরকারের জয়নাল উদ্ধার ও হানিফার লড়াই পালা, রেজাউল হক সলকের নছিমনের পালা, পার্বতীপুরের নবীন চাঁদের কান্দনী বিষহরীর পালা, পঞ্চগড়ের বাবুল চক্রবর্তীর চৌদ্দ গোঁসাইয়ের পালা, বাগেরহাটের সুনীল চক্রবর্তীর রাধার মানভঞ্জন পালা প্রভৃতিসহ নানা পালা অত্যন্ত জনপ্রিয়। এগুলো ছাড়াও মানবীয় বিষয়াশ্রিত জনপ্রিয় পালাগুলো হচ্ছে – আমেনা বিবির পালা, বেদেনির পালা, বউ বন্ধক জারি, ভেলুয়ার পালা, পরিবানুর পালা, নছিমনের পালা ইত্যাদি। নাগরিক পর্যায়েও নানা নিরীক্ষায় নানাভাবে পালানাট্যের চর্চা সুবিদিত।

এ উৎসবে আয়োজক নাট্যতীর্থ নারীবাদী পারস্পেকটিভ ধারণ করলেও এতে আবহমান বাংলার পালার নিরীক্ষা ও আধুনিকতার নিরিখেই পরিবেশিত হয়েছে। পরিবেশিত হয় – মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়ের শিবানী সুন্দরী, বঙ্গলোকের পরিবেশনা রূপচাঁন সুন্দরী, নাট্যতীর্থের প্রযোজনা কমলা সুন্দরী, কিশোরগঞ্জের একতা নাট্যগোষ্ঠীর মহুয়া সুন্দরী, থিয়েটার আর্ট ইউনিটের আমিনা সুন্দরী এবং ময়মনসিংহের অন্বেষা থিয়েটারের প্রযোজনায় ভানু সুন্দরী।

এ নারীচরিত্রগুলোর মধ্যে ‘কমলা’ ও ‘মহুয়া’ চরিত্রদুটি সরাসরি দীনেশচন্দ্র সেনের মৈমনসিং গীতিকার পালা অবলম্বনে নির্মিত। ‘আমিনা’ চরিত্র ও নামকরণ নতুন হলেও পূর্ববঙ্গ গীতিকার ‘পালা’কে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। ‘শিবানী’, ‘রূপচাঁন’ ও ‘ভানু’ চরিত্রত্রয়ী বাংলাদেশে সমকালীন প্রচলিত পালানাট্যের আলেখ্যে গড়ে উঠেছে। এ চরিত্র-ত্রয়ীতেও ষোড়শ, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের ‘মহুয়া’, ‘মলুয়া’, ‘কাঞ্চনকন্যা’, ‘দেওয়ানা মদিনা’র মতোই বোধ ও জীবনবিন্যাসের পরম্পরা প্রকাশিত হয়ে উঠেছে।

দর্শকমুখর পরিবেশে গত ২ ডিসেম্বর শিল্পকলা একাডেমির মূলমঞ্চে সন্ধ্যা ৭টায় ‘সুন্দরী নাট্যমেলা-২০১৬’-এর উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। উদ্বোধন করেন নাট্যশিল্পী ফেরদৌসী মজুমদার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। উদ্বোধন ঘোষণার পর প্রদর্শিত হয় মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়ের শিবানী সুন্দরীর পালা। নাটকটির রচনায় সালাম সাকলাইন এবং নির্দেশনায় দেবাশীষ ঘোষ। মহাকাল নাট্যসম্প্রদায় শিবানী সুন্দরী নাটকটি মঞ্চে এনেছিল ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে। পনেরোটি শো করার পর নাটকটির আর প্রদর্শনী হয়নি। দীর্ঘদিন পর ‘সুন্দরী নাট্যমেলা’ উপলক্ষে নাটকটি আবার পুনর্নির্মাণ করা হয়। তবে পুনর্নির্মাণে নাটকটির আগের ডিজাইন রাখা হয়নি। নতুন আঙ্গিকে নতুন ব্যাখ্যায় নাটকটি উপস্থাপন করা হয়। উপচেপড়া দর্শকের উপস্থিতিতে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। শিবানী নামে এক নারীর ভালোবাসা, বিরহগাথা ও বিচ্ছেদ এক মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায় বিবৃত হয়ে উঠেছে। এটি মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়ের ১৭তম প্রযোজনা।

নাটকের কাহিনিসংক্ষেপ এমন যে, রূপে-গুণে অনন্যা বণিককন্যা শিবানী সুন্দরী। সে ভালোবাসে ঋষিপুত্র নন্দকুমারকে। কিন্তু নন্দকুমারের বাবা এ-সম্পর্কের কথা জেনে ভীষণ রেগে যান পুত্রের প্রতি। কারণ সন্ন্যাসধর্মে নারীসংস্পর্শ সর্বদাই পরিত্যাজ্য। কিন্তু ঋষিপুত্র নন্দকুমার ভালোবাসে শিবানী সুন্দরীকে। পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্বের এক পর্যায়ে নন্দকুমার আশ্রম ত্যাগ করে দূরে জঙ্গলের পথে চলে যায়। অন্যদিকে শিবানী নন্দকুমারকে খুঁজতে নিজের রাজ্য ত্যাগ করে। ভীম নামে এক দেহরক্ষী সর্বদা শিবানীকে সাহায্য ও নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। এদিকে আকাশের একদল পরী জঙ্গলে পড়ে থাকা নন্দকুমারকে দেখে ভালোবেসে ফেলে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পরীরা মানুষকে ভালোবাসতে পারে না। শেষ পর্যন্ত পরীকন্যা কুন্তি পরিত্ব চিরতরে পরিত্যাগ করে মানবী হয়ে নন্দকুমারকে কামনা করে। কিন্তু নন্দকুমার ছিল কুন্তির প্রতি উদাসীন। শিবানী যখন বনের পথে নন্দকুমারকে খুঁজে ফিরছিল, তখন এক জাদুকর শিবানীর রূপে-গুণে পাগল হয়ে ওঠে। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে নন্দের সন্ধান পায় শিবানী। তখনই ঘটনা আবার ভিন্নদিকে মোড় নেয়। জাদুকর পরীকন্যা কুন্তিকে দিয়ে চক্রান্তের জাল বোনে। জাদুকর মন্ত্রবলে নন্দকে অদৃশ্য করে কুন্তিকে বাঘ আর ভীমকে পাথর বানিয়ে শিবানীকে অপহরণ করে। অন্যদিকে শিবানীর রূপের বর্ণনা শুনে আরেক সওদাগরপুত্র মমিন শিবানীকে পাওয়ার জন্য সপ্তডিঙা সমুদ্রে ভাসায়। শেষে নানা ঘটনা-উপঘটনার পর কুন্তি, ভীম জাদুমন্ত্রে মুক্তি পায় বটে; কিন্তু অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নন্দকুমারকে আর ফেরত আনা যায় না। শিবানী নন্দকে ছাড়া আর কিছুই চায় না। এমন এক নারীবিরহের মধ্য দিয়ে নাটকের সমাপ্তি ঘটে।

গ্রামীণ পুতুল নাট্যধারাকে আশ্রয় করে যাত্রা, পুঁথিপাঠসহ নানা আঙ্গিকের সমন্বয়ে এটি উপস্থাপন করা হয়েছে। নির্দেশক দেবাশীষ ঘোষের নির্মাণের নতুনত্বে যারপরনাই বিস্মিত হতে হয়েছে। সহজ-সরল অথচ কী অসাধারণ উপস্থাপনা। পালানাট্যের মতোই বর্ণনা; নাচ, গান, অভিনয় ও পুতুলসহ নানা মাত্রার এক অভেদ রূপ উপস্থাপিত হয়েছে নাটকে। পুতুলগুলোও কখনো-কখনো জীবন্ত চরিত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। তিনটি মাধ্যমকে অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে ব্যবহার করেছেন নির্দেশক। কাহিনি একইসঙ্গে মাধ্যমগুলোতে শিফট করেছে। অপার্থিব এক আনন্দস্রোতে অনায়াসে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে শিবানী সুন্দরীর পালা।

মাস্টার চরিত্রে মীর জাহিদ হাসান নাটকের সূত্রধরের কাজ করেছেন। তাঁর সাত্ত্বিক ভাব ও অনবদ্য উপস্থাপন শুধু মুগ্ধতাই সৃষ্টি করেছে। সুন্দরী শিবানীর চরিত্র সবসময়ই প্রাণবন্ত। ভীম চরিত্রে শাহরিয়ার হোসেন পলিনের শক্তি প্রকাশ করতে বড় শক্ত করে

কথা বলা আরেক হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে। ভিন্ন-ভিন্ন চরিত্রের আলাদা-আলাদা বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট ছিল নাটকে। টিমওয়ার্ক অসাধারণ ছিল। মঞ্চে ঘটনাদৃশ্যের সেট তৈরি করেননি। নিরাভরণ মঞ্চে পুতুলনাট্য উপস্থাপনার সাজেশনে সমস্ত কাহিনি উপস্থাপিত। পোশাকগুলোর রং ও আলোয় যথাযথ ঘটনা প্রকাশে ভালোলাগা সৃষ্টি করেছে। গল্প, নাচ, গান ও হাস্যরসে মাতিয়ে রেখেছিল প্রায় দেড় ঘণ্টারও অধিক সময়। এতে অভিনয় করেছেন – মীর জাহিদ, সুরেলা নাজিম, বেবী শিকদার, ফারুক আহমেদ সেন্টু, বাবু স্বপ্নওয়ালা, রিফাত, বিপ্লব, মো. জাহাঙ্গীর, রাহুল, বাঁধন, মীর জাহিদ হাসান, মৈত্রী সরকার, সারমীন সুলতানা আশরা, শিবলী সরকার, সৈয়দ ফেরদৌস ইকরাম, সুফিয়া খানম শোভা, রাজিব হোসেন, তারকেশ্বর, শাহরিয়ার হোসেন পলিন, কবির আহমেদ, সামিউল জীবন, আসাদুজ্জামান রাফিন, ইকবাল চৌধুরী, ফারাবী আকন্দ হীরা ও সাইমুন। পুতুলনাচ প্রশিক্ষণে খেলু মিয়া, মঞ্চে জুনায়েদ ইউসুফ, সংগীতে শিশির রহমান।

দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যায় পরিবেশিত হয় রূপচাঁন সুন্দরীর পালা। নির্দেশনায় সায়িক সিদ্দিকী। বঙ্গলোক নাট্যদলের এটিই প্রথম প্রযোজনা। রূপচাঁন সুন্দরী নাম্নী এক নারীর প্রেম বিরহগাথা আত্মহননই এ-পালার মূল উপজীব্য। গায়েনের বর্ণনা, নৃত্য, গীত, কাহিনি, অভিনয় ও দোহারের সংগত, মিউজিক এক অপার্থিব আনন্দস্রোতে দর্শককে ভাসাল প্রায় দেড় ঘণ্টা সময়। বিশুদ্ধ পালা আঙ্গিকের অনবদ্য পরিবেশনা এই রূপচাঁন সুন্দরীর পালা।

মূল গায়েন ছিলেন সায়িক সিদ্দিকী। সঙ্গে দোহার ছিলেন জিয়াউল হক সোহাগ, রাজীব রাজ, তানবীর হোসেন সামদানী, রবিন বসাক প্রমুুখ। গায়েনের বন্দনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় কাহিনির আরম্ভ। পালাটির গল্প এমন – সুন্দরী কন্যা রূপচাঁন ষোলো বছরের যুবতী। রূপচাঁন ভালোবাসে গ্রামেরই ছেলে সুজনকে। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তাদের বিয়ে হয়; কিন্তু বিয়ের রাতেই ঘটে অঘটন – রূপচাঁন সুন্দরীর সৎমা কৌশলে রূপচাঁনের অজান্তে তার ভাইপো সেফা মিয়ার পরামর্শে রূপচাঁনের হাতে তুলে দেয় বিষ-মেশানো শরবতের গ্লাস। বিষের যন্ত্রণায় ছটফট করতে-করতে বাসরঘরেই সুজন মারা যায়। সুজনের মৃত্যুকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না রূপচাঁন। চতুর সেফা কৌশলে রূপচাঁনকে তুলে নিয়ে যায়। ধর্ষিত হয় রূপচাঁন। সুজনের সঙ্গে সাক্ষাতে আশায় আত্মহত্যার মাধ্যমে তারই পথযাত্রী হয় রূপচাঁন। এভাবেই কাহিনি এগিয়ে চলে।

গ্রামীণ পটভূমিতে এক নারীর বিয়োগান্ত পরিণতি এ-পালার কাহিনি। সহজ-সরল গ্রাম্যজীবন ও চতুরতার এক অনবদ্য রূপ ফুটে উঠেছে নাটকে। পালাকার সায়িক সিদ্দিকীর অসাধারণ গায়কি ঢঙে যেন গ্রামীণ জীবনের রূপ, রস ও গন্ধ অনবদ্যভাবে ধরা দিচ্ছিল সেদিনের উপস্থাপনায়। কথোপকথন ও সমকালীন ঘটনাপ্রবাহে হাসতে-হাসতে দর্শকের নাভিশ্বাস উঠেছিল প্রায়। নৃত্য ও সংগীত মুগ্ধতা সৃষ্টি করেছে। গায়েনের অত্যন্ত পরিমিত মুভমেন্ট। অত্যন্ত বিশ্বাসপূর্ণ চরিত্রাভিনয়; অভিব্যক্তি। গায়েন, দোহার ও দর্শক মিলে এক অভেদ ঐক্য সৃষ্টি হয়েছিল, তা ইন্দ্রিয়াতীত। অত্যন্ত শৈল্পিক প্রযোজনা এটি। পালাটিতে দোতরায় সংগত করেছেন তানভীর হোসেন সামদানী, বাঁশিতে বিশ্বজিৎ বৈরাগী, ঢোলে তন্ময় ঘোষ ও পোশাকে রবিন বসাক। এর অধিকর্তা  শামীমা শওকত লাভলী।

রূপচাঁন সুন্দরীর পালা দেখতে-দেখতে মনে হয়েছে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্রেখ্টের এলিনিয়েশন তত্ত্ব শিখতে ও শেখাতে কতই না কষ্ট করতে হয়। মোহবিযুক্তিকরণ কাকে বলে, তা শিক্ষণীয় হতে পারে এই রূপচাঁন সুন্দরীর পালা। আমাদের পালাগুলোতে যেমন মোহচৈতন্যে ভাসা আছে, তেমনি বিযুক্তিকরণও আছে। এ-পালায় সীমিত অর্থে বিযুক্তিকরণ নয়। বরং বিযুক্তিকরণ এত উচ্চাঙ্গে পৌঁছেছে যে, দর্শকদের নিয়ে আরেক নাট্যবাস্তবতা তৈরি হয়েছে। দর্শক প্রতিক্রিয়াশীলতায় সৃষ্ট নতুন নাট্যবাস্তবতা বিশ্বে আরেক নতুন পাঠ্যবিষয়ও হতে পারে। প্রসঙ্গত বলা যায়, অগাস্ত বোয়াল যদি আমাদের এ-নাট্যক্রিয়ায় সরাসরি দর্শকদের পরিবর্তিত আচরণ দেখতে পেতেন, তাহলে তাঁর নাট্যের শিক্ষা-যোগাযোগ ভাবনায় হয়তো পালামাধ্যমকে আশ্রয় করে বেড়াতে পারতেন। গায়েন যখন মাথায় কাপড় টেনে নিরাভরণ মঞ্চে বাড়ির দহলা দেখাচ্ছিলেন, তখন বারবার পিটার ব্রুকের কথা মনে পড়ছিল। রবীন্দ্রনাথের ‘রঙ্গমঞ্চ’ প্রবন্ধের লাইনগুলো চোখে ভাসছিল – ‘ভরতের নাট্যশাস্ত্রে নাট্যমঞ্চের বর্ণনা আছে। তাহাতে দৃশ্যপটের কোনো উল্লেখ দেখিতে পাই না। তাহাতে যে বিশেষ ক্ষতি হইয়াছিল, এরূপ আমি বোধ করি না।’ … ‘মালিনী যখন তাহার পুষ্পবিরল বাগানে ফুল খুঁজিয়া বেলা করিয়া দিতেছে, তখন সেটাকে সপ্রমাণ করিবার জন্য আসরের মধ্যে আস্ত আস্ত গাছ আনিয়া ফেলিবার কী দরকার আছে – একা মালিনীর মধ্যে সমস্ত বাগান আপনি জাগিয়ে ওঠে। তাই যদি না হবে, তবে মালিনীরই বা কী গুণ, আর দর্শকগুলোই বা কাঠের মূর্তির মতো কি করিতে বসিয়া আছে?’ রূপচাঁন সুন্দরী প্রযোজনাটিতে নানা জটিলতা থাকতে পারে; কিন্তু নাট্য-বিশেষজ্ঞগণ এ-পালাগুলোর বিশুদ্ধতা ও বিকাশে যদি এগিয়ে আসেন, তাহলে এ-নাট্যপালাগুলোই একদিন বিশ্বজয় করবে সত্য।

তৃতীয় ও চতুর্থ দিন যথাক্রমে পরিবেশিত হয় নাট্যতীর্থের কমলা সুন্দরী এবং কিশোরগঞ্জের একতা নাট্যগোষ্ঠীর নাটক মহুয়া সুন্দরী। মৈমনসিং গীতিকা থেকে নেওয়া এ-গল্পপালা দুটি বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে অত্যন্ত পরিচিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন দল অসংখ্যবার এ-কাহিনি দুটো উপস্থাপন করেছে। জনপ্রিয়তার কারণেই এ-দুটো পালার কাহিনি প্রায় সবারই জানা। নাট্যতীর্থের কমলা সুন্দরী পালাটি মৈমনসিং গীতিকার দ্বিজ ঈশানের পালা অবলম্বনে প্রসেনিয়াম ধারায় উপস্থাপিত। পালাগানের মতোই বন্দনা, বর্ণনা আছে এতে। আছে নাচ, গান ও চরিত্রাভিনয়ের মধ্য দিয়ে উপস্থাপন। নির্দেশনায় তপন হাফিজ। তবে এ-পালার অভিনয়, নৃত্যগীত ও উপস্থাপনা নিয়ে আরো প্রচুর কাজ করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়েছে। আর চতুর্থ দিনের পরিবেশনা মহুয়া সুন্দরী। মৈমনসিং গীতিকার ‘মহুয়া’ নাম্নী নারীর বিয়োগান্ত জীবনের কাহিনিই এ-নাটকের উপজীব্য। একতা নাট্যগোষ্ঠী এ-নাটক মূলত নৃত্যনাট্য আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছে। রেকর্ডেড মিউজিক ও ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে নৃত্য ও অভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে। নির্দেশনায় ছিলেন মানস কর।

উৎসবের পঞ্চম দিন পরিবেশিত হয় থিয়েটার আর্ট ইউনিটের আমিনা সুন্দরী। আবহমান বাংলায় প্রচলিত নছর মালুম ও ভেলুয়া সুন্দরীর পালা অনুসারে নাটক আমিনা সুন্দরী। পতিভক্ত আমিনার জীবনের প্রেম ও বিরহগাথাই এ-নাটকের মূল উপজীব্য। নাটকটি রচনায় এস এম সোলায়মান এবং নির্দেশনায় রোকেয়া রফিক বেবী।

ইউরোপীয় প্রসেনিয়াম ধারায় নাট্যটি উপস্থাপিত। বাঙালি সমাজে বহমান নছর মালুম ও ভেলুয়া সুন্দরী পালাকে আশ্রয় করে নতুন এক গল্প বলার চেষ্টা আমিনা সুন্দরী পালানাট্যটি। বাঙালি নারীর চিরন্তন প্রেমের স্বরূপ উদ্ঘাটনে এ-কাহিনি ব্যাপৃত। বাঙালি গ্রামীণ এক নারীর বিরহগাথার অনুপম শিল্পভাষ্য এটি।

আমিনার প্রতীক্ষার মধ্য দিয়ে কাহিনিতে প্রবেশ। আমিনার ভালোবাসার মানুষ নছর বর্মা মুল্লুকে গেছে বাণিজ্যে। একের পর এক সমাজের নানা কুচক্রী বিভিন্ন সমস্যার বিস্তার ঘটাতে থাকলেও আমিনা মনপ্রাণ সঁপে নছরের জন্যই প্রতীক্ষা করতে থাকে। একসময় আমিনার পরিবার সমাজের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের কাছে হার মানে। অথচ আমিনার আদ্যোপান্ত অপেক্ষাই নছরকে ঘিরে। নিজের সম্মান ও অর্থলোভে নিজের মা কৌশলে আমিনাকে অন্যত্র বিয়ে দিতে চায়। বিভিন্ন সময় ভিন্ন-ভিন্ন কৌশলে রক্ষা পেলেও শেষ পর্যন্ত আমিনাকে পরাস্ত হতে হয় পুরুষশাসিত সমাজের কৌশলের কাছে। পলায়নরত আমিনা ধৃত হয় ভোলা সওদাগরের কাছে। ভোলা সওদাগরকে নানা কৌশলে অবদমিত করেও নছরের জন্যই প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে থাকে আমিনা। অন্যদিকে নছর বর্মা মুল্লুকে এক সওদাগরের সুন্দরী কন্যাকে মিথ্যা কৌশলে বিয়ে করে সুখে দিনাতিপাত করতে থাকে। নছর যেমন প্রতারণা করেছে, তেমনি তাকেও প্রতারিত হতে হয় একসময়। নছর ভুল বুঝতে পেরে আমিনার জন্য পাগল হয়ে যায়। নছর যখন আমিনা সুন্দরীর সন্ধান পায় আমিনা তখন ভোলার কাছে বন্দি। বিচারের কৌশলে আমিনা রক্ষা পায় বটে; কিন্তু পরক্ষণেই পুরুষ বিচারকের চক্রান্তের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। নানা কষ্ট ও কৌশলের পর আমিনা উদ্ধার হয়। নছর ও আমিনার মিলনের মুহূর্ত ঘনিয়ে আসে। নছরের কৌতূহল ও সন্দেহ জাগে। বারো বছরের বিরহে আমিনা কি তার সতীত্ব ধরে রেখেছে! এমন হীন ভাবনায় আমিনা মর্মাহত হয়। বারো বছরের বিরহ আমিনা কেমন কষ্টে কাটিয়েছে তার খবর না নিয়ে সতীত্ব নিয়ে প্রশ্ন? এ নিচু মানসিকতায় আমিনা আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এভাবে পুরুষের প্রেম-ভালোবাসার প্রতি ঘৃণার বিষ তীব্র হয়ে ওঠে আমিনার মধ্যে। আত্মহননের মধ্য দিয়ে পুরুষতান্ত্রিকতার নিগড় থেকে মুক্তি খোঁজে সে। এভাবেই কাহিনি পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়।

প্রসেনিয়াম মঞ্চে আবহমান বাংলা নাট্যবৈশিষ্ট্যে উপস্থাপিত হয়েছে। বন্দনার মধ্য দিয়ে নাটকটি শুরু হয়। বর্ণনা, নাচ, গান ও উক্তি-প্রত্যুক্তির মধ্য দিয়ে নাট্যটির প্রবাহ। আমিনা চরিত্রে বিভিন্নজন অভিনয় করেছেন। ওড়না পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমিনার চরিত্রে অভিনেত্রীর পরিবর্তন এক অনন্য শিল্পসুষমা তৈরি করেছে। সেট হিসেবে একটি সাম্পানের সাজেশন ছিল। সাম্পান ভেঙে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দৃশ্য তৈরি করেছে। স্পেসের ব্যবহারও অসাধারণ যৌক্তিক ছিল। বিরহপ্রকাশে অসাধারণ শিল্পবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। সংগীতগুলোও হৃদয়স্পর্শী। সাত্ত্বিক অভিনয় সত্যিই বিস্ময় জাগানোর মতোই। অসাধারণ প্রাণবন্ত ও মেধাদীপ্ত অভিনয়। স্বরের বৈচিত্র্য ও বাচিক প্রক্ষেপণেও মুগ্ধতা সৃষ্টি করেছে। নাটকের দ্বন্দ্বগুলো অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। চরিত্রায়নগুলো খুবই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম। প্রায় সবারই অভিনয়ই অসাধারণ, শৈল্পিক ও উপভোগ্য। রঙের ব্যবহারও আনন্দের দোলা দেয়। প্রযোজনাটি সুখদর্শন তৈরি করেছে। নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন – সেলিম মাহবুব, চন্দন রেজা, প্রশান্ত হালদার, রিয়াজ হোসেন, ফেরদৌস আমিন বিপ্লব, সাইফ সুমন, কামরুজ্জামান মিল্লাত, ফৌজিয়া করিম অনু, আনিকা মাহিন, দীপ্তা, হাসনাত প্রদীপ, সুজন, শাপলা, লেলিন প্রমুখ।

উৎসবের শেষদিন নাট্য প্রদর্শনীর পূর্বে বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ষোলোজন নারী নাট্যাভিনেত্রীকে উৎসবের পক্ষ থেকে সম্মাননা জানানো হয়। তারপর পরিবেশিত হয় ময়মনসিংহের অন্বেষা থিয়েটারের প্রযোজনা ভানু সুন্দরীর পালা। পালাটির রচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন সায়িক সিদ্দিকী। ভানু সুন্দরীর পালাটি কালজয়ী নাট্যকার রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েটের ছায়া অবলম্বনে আবহমান বাংলার পালানাট্য ধারায় উপস্থাপিত। মূল গায়েন সায়িক সিদ্দিকী। দোহার ও অভিনয়ে – সাখাওয়াত জামিল সৈকত, মনির হোসেন জীবন, সামিউল হক আকাশ, রুবেল হোসেন, আতিকুর রহমান সুজন, তন্ময় তনু, অমল বসাক, আল আমিন, শাহানাজ আক্তার ইতি, নুসরাত জাহান শিমু, তানজিয়া পিয়াস মিষ্টি, সাদী মোহাম্মদ শুভ, আমজাদ শ্রাবণ প্রমুখ।

পালার কাহিনি এমন – ভানু সুন্দরী ভালোবাসে চন্দ্রকুমারকে। চন্দ্রকুমারও জীবন দিয়ে ভালোবাসে ভানুমতিকে। কিন্তু সমস্যা দুই পরিবার। ভানুর বাবা রমেশ চ্যাটার্জি আর চন্দ্রকুমারের বাবা বিমল গাঙ্গুলীর দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব যেন শেষ হওয়ার নয়। দুই পরিবারের বিরোধ থেকে বাঁচতে ভানু ও চন্দ্রকুমার মন্দিরে গোপনে দুজন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে সেদিনই খুন হয় চন্দ্রকুমারের বন্ধু। প্রতিশোধ নিতে চন্দ্রকুমার হত্যা করে চ্যাটার্জি পরিবারের কেনারামকে। শুরু হয় ভানু ও চন্দ্রকুমারের বিরহ পর্ব। ভানুমতির পিতা ভানুর বিয়ে ঠিক করে। ভানু কোনো উপায়ান্তর না দেখে মন্দিরের সেবকের কাছে ছুটে যায়। সেবকের পরামর্শে এক বিশেষ ওষুধে অচেতন হয়ে পড়ে থাকে ভানু। পরিবারের সবাই মৃত ভেবে ভানুকে নিয়ে আসে শ্মশানে। মন্দিরের সেবক ভানুমতিকে গোপনে সরিয়ে ফেলে। কিন্তু চন্দ্রকুমার ভানুমতির এ নকল মৃত্যু দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। মন্দিরেই বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে। অপরদিকে ভানুমতির জ্ঞান ফিরলে চন্দ্রকুমারের আত্মহত্যাকে মেনে নিতে পারে না। তাই নিজেই নিজের ছুরি দিয়ে আত্মহত্যা করে। বিয়োগান্ত এক পরিণতির মধ্য দিয়ে ভানু সুন্দরীর পালা শেষ হয়।

ভানু সুন্দরীর পালা আরম্ভ হয় বন্দনাগীতের মধ্য দিয়ে। তারপর গায়েন ও তিনজন দোহারের লাস্যময়ী নৃত্যগীতের মধ্য দিয়ে ঘটনায় প্রবেশ করেন। অপূর্ব মাধুর্যম-িত সংগীত ও নৃত্যের সমন্বয়ে এক ভালোলাগার স্পর্শে হৃদয় ছুঁয়ে যায়। গায়েনের বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে দোহার ও চরিত্রাভিনয়ের মাধ্যমে ঘটনা উপস্থাপিত হতে থাকে। পালাটিতে সংযাত্রার কিছু ঢংও লক্ষ করা গেছে। গ্রামের জীবনের নানা অনুষঙ্গ অত্যন্ত চমৎকার হাস্যরসের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগও অসাধারণ।

পালাটিতে প্রধান গায়েন ছাড়াও প্রায় প্রত্যেকেই প্রাণবন্ত, সাত্ত্বিক ও মেধাদীপ্ত অভিনয় করেছেন। প্রধান গায়েন ছিলেন সায়িক সিদ্দিকী। কী অসাধারণ তাঁর গায়কি ঢং, অপূর্ব নৃত্যচলন, প্রাণবন্ত ভাবপ্রকাশ ক্ষমতায় বারবারই তিনি মুগ্ধ করেছেন দর্শকদের। সায়িক সিদ্দিকীর প্রত্যুৎপন্ন অভিনয়ক্ষমতায় বিস্মিত হতেই হয়েছে। গান, নাচ, গল্পকথন, হাস্যকৌতুক এবং অভিনয়ে মাতিয়ে রেখেছিল ময়মনসিংহের অন্বেষা নাট্যদল। তবে, নাটকের পেছনে গ্রাম্যবাড়ির সাজেশন দরকার ছিল বলে মনে হয় না। ভানু সুন্দরী নিজেই একটি স্বতন্ত্র গল্প তৈরি করেছে। সেক্ষেত্রে শেক্সপিয়র নাম ব্যবহারের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।

এ-পালায় গায়েনের অভিনয় দেখতে দেখতে মনে হয়েছে পৃথিবীর নানা স্থানে অভিনয়-কৌশলকে তত্ত্ববদ্ধ বা সূত্রবদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে ঐতিহ্যধারার অভিনয় কৌশলের কোনো তত্ত্ববদ্ধ সূত্র পাওয়া যায় না। ভানু সুন্দরীর পালার অভিনয় দেখতে দেখতে আরো মনে হয়েছে, বাস্তববাদী অভিনয় শিখতে ও শেখাতে স্নানিস্তাভøস্কির কাছে হুমড়ি খেয়ে না পড়ে আমরা আমাদের গায়েনদের দিকেও তাকাতে পারি। বাস্তববাদী চরিত্রাভিনয়ের শিক্ষা এখানেও আছে। মেয়রহোল্ড-গোটক্সিচর্চার শরীর-মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা ভাবপ্রকাশ ক্ষমতার প্রস্তুতিকৌশলে আমাদের গায়েনদের কাছ থেকেও দীক্ষিত হতে পারি। কারণ তাঁরা একই সঙ্গে চরিত্র নির্মাণ করেন, ভাঙচুর করেন, চরিত্র পরিবর্তন করেন এবং দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগও করেন। শুধু তাই নয়, তাদাকা সুজুকির আবেগপ্রকাশ ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ গায়েনের কাছে বেশি পাওয়া যাবে নিশ্চিত। গায়েনদের কাছ থেকে অভিনয়ের বোনাস আরো অনেক কিছু শেখার আছে। নাচ, গান তো আছেই। গায়েনরা একাধারে ভাষ্যকার, অভিনেতা, নাট্যকার, ডিজাইনার ও নির্দেশকও বটে।

আমাদের ঐতিহ্যবাহী অভিনয়-কৌশলের কোনো শৃঙ্খলা বা সূত্রবদ্ধ নিয়ম আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি। অথচ আমাদের দেশের এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগ আছে। আবহমান বাংলা নাটকের ইতিহাসও অনেক পুরনো। আমাদের শিল্পরুচি যে পাশ্চাত্য থেকে ভিন্ন, তা-ই আমরা বুঝতে চাই না। তার আরো প্রমাণ পাওয়া গেল এ-পালা পরিবেশনের সময় উপচেপড়া হলভর্তি দর্শক ও তাদের উচ্ছ্বাস দেখে।

উৎসবের আরেকটি অংশ ছিল সেমিনারের আয়োজন। এতে মাহফুজা হেলালী ‘বাংলাদেশের নাটকে নারীর ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন। এছাড়া নাট্যবন্ধু সম্মাননা এবং প্রতিদিন একজন করে নারী-নাট্যকর্মীকে সম্মান জানানো হয়। ছয়দিনের ছয়জন নারী হচ্ছেন – ফেরদৌসী মজুমদার, সারা যাকের, শিমূল ইউসুুফ, লাকী ইনাম, কৃষ্টি হেফাজ ও নুনা আফরোজ। ইতিপূর্বে লোকনাট্য দল আয়োজন করেছিল মৈমনসিং গীতিকা নাট্যোৎসব। বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় সমকালীন পালার এমন আলাদা উৎসবের আয়োজনে বাংলার নিজস্বতার সমৃদ্ধিই চোখে পড়ে। বাংলা নাট্য নিজস্ব স্বকীয় বৈশিষ্ট্যবৈচিত্র্যে বিশ্বের কাছে সুমহিমান্বিত হোক এটাই আমাদের সবার চাওয়া। বাংলাদেশের নাটকের উত্তরোত্তর বিশ্বজনীন বিকাশ হোক তা আমরা সবাই চাই।