পুনর্জন্মের বর্ণমালা

লেখক:

কামাল হোসেন

ঢাউস সাইজের দুখানা সুটকেস থেকে একজন বিচক্ষণ জাদুকরের মতো অজস্র জিনিস বের করে সোমার সামনে রাখছিলেন মলয়।
বড় সাবেকি খাটের ওপর দুজনে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছেন। সামনে উপচে পড়ছে শাড়ি, হাউস কোট, লিঙ্গেরি, নানা রকম অলঙ্কার, প্রসাধন সামগ্রী, ইলেকট্রনিক গ্যাজেট প্রভৃতি অনেক কিছু।
সোমা বললেন, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছিল? গুচ্ছের পয়সা নষ্ট।
মলয় বললেন, তুমি তো জানো, কেনাকাটা করতে আমার ভালো লাগে।
বাজারে ঢুকলেই তোমার মাথা খারাপ হয়ে যায়।
অ্যাবসলিউটলি। প্রতিটা জিনিসই তোমার জন্য।
ঘরে তো আর জিনিস রাখার জায়গা নেই। কোথায় রাখবে বলো?
সেজন্যেই দোতলা বানাবো।
কোনো মানে হয়? আমাদের ছেলে নেই পুলে নেই, শুধু শুধু অ্যাসেট বাড়ানো নিছক মূর্খতা।
পয়সা জমিয়ে রেখেই বা কী করব বলো? তাই যেটা যখন মাথায় আসে, খরচ করে ফেলি।
তাই বলে মেড ইন চায়না মাল এত বিপুল পরিমাণে কেউ কেনে।
চায়নার নামে অত অছেদ্দা দেখিও না ম্যাডাম। নিজের চোখে দেখে এলাম একটা দেশ কী পরিমাণ বিষয়ে-সম্পদে এগিয়ে যাচ্ছে।
দেশের বাইরে গেছো, স্যুভেনির হিসেবে দু-চারটে জিনিস নিশ্চয়ই আনবে। তার মানে এই নয় যে, ক্রেডিট কার্ডে লাখখানেক টাকার মাল কিনে বাড়িতে নিয়ে আসবে। তুমি নিজেই বলো, এর মধ্যে সব কটা জিনিসই আমার আছে। শুধু শুধু বাজে খরচ করলে খুব গায়ে লাগে।
বিদেশে কেনাকাটা করতে গিয়ে আমি কিন্তু ঠকে যাইনি সোমা। আমার গাইড কাম দোভাষী মেয়েটি রীতিমতো দরদাম করে পছন্দ করে জিনিসগুলো কিনে দিয়েছে।
ফোনে তুমি মেয়েটির কথা বলছিলে অবশ্য।
হ্যাঁ, ফ্যাং হুয়া। ওখানকার যে স্টিল কোম্পানির সঙ্গে আমাদের ডিল হচ্ছে, তাদের কাছে পিআরওর কাজ করে। ইংরেজিটা ভালো জানে। আমি তো চায়নিজ সেরকম কিছু জানি না। ও ছিল বলে বিজনেস আলোচনা করতে কোনো অসুবিধা হয়নি।
কত বয়স যেন মেয়েটার? তুমি অবশ্য মেয়েদের বয়স কিছু বোঝো না।
শুধু চেহারা দেখলেই কি সত্যিকারের বয়স বোঝা যায়? আমাদের কথাই ধরো। আমার আটষট্টি, তোমার বাষট্টি। অথচ আমাদের শরীরে এখনো জরা স্পর্শ করেনি। চুলে এখনো কলপ দিতে হয়নি। দেহ-ত্বক এখনো উজ্জ্বল, টানটান। যারা জানে না, তারা প্রত্যেকেই আমাদের মিড-ফর্টির কাপল বলে ভুল করে।
আমরা নিয়মিত জিমে যাই, খাওয়া-দাওয়া বুঝে খাই, ছেলেপুলে নেই, তাই টেনশন ফ্রি লাইফ। সাজপোশাক আধুনিক ছেলেমেয়েদের মতো করি, সেজন্যেই হয়তো আসল বয়সের থেকে কিছুটা কম লাগে।
মনের দিক থেকেও আমরা যথেষ্ট তরুণ। হা-হা করে হাসতে হাসতে বললেন মলয়।
মুখে ছদ্ম ভয়ের প্রলেপ সাজিয়ে সোমা বললেন, সেজন্যেই তো মেয়েছেলেটার বয়স জানতে চাইছি। কী যেন নাম মেয়েটার?
বললাম তো – ফ্যাং হুয়া।
চীনা নাম মনে থাকে না বাপু। অং বং চং এসব নামের মধ্যে আলাদা করে মনে রাখাও ভারি সমস্যার ব্যাপার।
কিছু সমস্যার নেই। আমাদের ভাষার উচ্চারণও বিদেশিদের কাছে শক্ত মনে হয়। অথচ প্রতিটি ভাষার নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, প্রতিটি নামের মধ্যে লুকিয়ে থাকে বাবা-মায়ের স্নেহ ও ভালোবাসা।
সর্বনাশ, তোমার মতো কেঠো ইঞ্জিনিয়ারের মুখে ভাষা সম্পর্কে এত মাখো মাখো বাক্যবিস্তার মোটেই সুবিধার ব্যাপার নয়। হাসতে হাসতে সোমা বললেন।
এ্যাই, ইয়ার্কি মারবে না বলছি।
তোমার সঙ্গে ইয়ার্কি মারব না তো কার সঙ্গে মারব। আমাদের দুজনের মধ্যে এই পঁয়ত্রিশ বছর বিবাহিত জীবনে তারুণ্য বজায় রাখার এটাই তো হিডেন সিক্রেট।
মাথা নেড়ে মলয় বললেন, আমরা শুধু স্বামী-স্ত্রী নই, তার থেকেও বড় ব্যাপার, আমরা দুজনে খুব ভালো বন্ধু। পরস্পরের সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করি। কোনো কিছু লুকোছাপা নেই দুজনের মধ্যে।
সেজন্যেই তো আমি অবাক হচ্ছি গত পঁয়ত্রিশ বছরে বাইরের মেয়েমানুষের কোনো দোষ দেখিনি তোমার মধ্যে। হঠাৎ চীন দেশে গিয়ে এক নাক বোঁচা মেয়ে দেখে তোমার মতিভ্রম হলো কেন, সেটাই তো বুঝতে চেষ্টা করছি।
মোটেই ওরকম খারাপ কথা বলবে না সোমা। মেয়েটার বয়স মাত্র তিরিশ। ঠিক সময়ে সন্তান হলে ওর বয়সী ছেলেমেয়ে থাকতো আমাদের।
ফোনের মধ্যে ওখান থেকে মেয়েটি সম্পর্কে গদগদ হয়ে সার্টিফিকেট দিচ্ছিলে। আমরা মেয়েরা সব বুঝতে পারি মশাই। আর ম্যান-উইম্যান রিলেশনশিপের ক্ষেত্রে বয়সের পার্থক্য কোনো ফ্যাক্টর নয়। গম্ভীর গলায় সোমা বললেন।
আহত হয়ে মলয় বললেন, তুমি আমাকে সন্দেহ করছো সোমা?
সত্যি কথা বলতে কী, আমার মনে খটকা জাগছে। তোমাকে তো আমি গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে চিনি। বলতে পারো অাঁশে অাঁশে চিনি। তোমার প্রতিটা এক্সপ্রেশন আমার মুখস্থ।
তুমি বললেই আমাকে মানতে হবে, আমি আমার অজান্তে একস্ট্রা-ম্যারিটাল অ্যাফেয়ারে জড়িয়ে পড়েছি? অসহায়ভাবে মলয় বললেন।
মনে করে দ্যাখো, ওখান থেকে ফোনে তুমি আমাকে বললে, তোমার কেনাকাটায় মেয়েটি খুব হেল্প করছে, তাই ওকে কিছু গিফট দিতে চাও তুমি।
হ্যাঁ, বলেছিলাম তো। একটা বাচ্চা মেয়ে আমার বউয়ের জন্য একগাদা জিনিস পছন্দ করে দিচ্ছে, বাজারে বাজারে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছে, দরদাম করছে, আমার ইচ্ছে করবে না তাকে কিছু উপহার দিই। কৃতজ্ঞতা বলে কিছু থাকবে না আমার মধ্যে?
তুমি নিজেই বলেছ, বেশ দামি একটা সোনার ঝুমকো গিফট করেছ ওকে।
আমি কিছুই লুকোইনি। এই এতটুকু ছোট্ট একটা কিউট ঝুমকো। মেয়েটার ছোট্ট সুন্দর মুখের সঙ্গে কী অপূর্ব মানিয়েছিল, ভাবতে পারবে না। আমার মেয়ে থাকলেও তো আমি তাকে দোকানে নিয়ে গিয়ে কত কিছু গিফট দিতাম।
তোমার এই মেয়ে বলে আদিখ্যেতা বন্ধ করবে প্লিজ।
সামান্য একটা গিফট দেওয়া নিয়ে তুমি এত রিঅ্যাক্ট করছো কেন বুঝতে পারছি না সোমা। তোমার ভাইঝি মিনিকে ছোটবেলা থেকে এখনো পর্যন্ত এর থেকেও কত দামি-দামি গিফট আমি দিয়ে আসছি।
মিনিকে তুমি জন্ম থেকে চেনো। কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছো। আর এই মেয়েটা তিরিশ বছরের ধাড়ি মেয়ে। তাকে দেখে তোমার বাৎসল্য রস উথলে উঠল?
তুমি মিথ্যে হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করছ সোমা। মেয়েটা হাজার হাজার মাইল দূরে থাকে। ইচ্ছে করলেই তাকে জলজ্যান্ত দেখতে পাবো না এ-জীবনে।
এভাবে জীবনবৃত্তান্ত শুনিয়ো না মলয়। আমিই কি জানতাম, পঁয়ত্রিশ বছর সংসার করে তোমার এই ভীমরতি হবে। তুমি বলতে পারবে, আমার সঙ্গে অন্য কোনো ব্যাটা ছেলের এতটুকু কোনো রকম অ্যাফেয়ার ঘটেছে?
খুব বিপন্ন গলায় মলয় বললেন, এটা কোনো অ্যাফেয়ার নয়, এটা আমি কীভবে বোঝাবো সোমা? মেয়েটার সঙ্গে কোনো সেক্স করা দূরে থাক একটা কিস পর্যন্ত খাইনি। হ্যাঁ, স্বীকার করছি, তিরিশ বছরের ওই মেয়েটির আন্তরিক ব্যবহার, স্মার্টনেস আমাকে মুগ্ধ করেছে। ব্যস, ওই পর্যন্ত।
তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে সোমা শুধালেন, মেয়েটার বিয়ে হয়নি?
অফ কোর্স। বিবাহিতা। মেয়েটির স্বামী একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। হ্যাপি ফ্যামিলি। লাভ ম্যারেজ। সব থেকে মজার খবর কী জানো সোমা, এক চোখ টিপে মলয় বললেন, খুব শিগগির আমরা দাদু-দিদা হতে চলেছি।
মানে?
মেয়েটি কনসিভ করেছে। তিন মাস চলছে।
ফাইন। বাপের কাছে গর্ভ-সমাচার শুনিয়েছে।
এটা তো আনন্দের খবর সোমা। আনন্দের মিষ্টি সকলে মিলে শেয়ার করার মধ্যেই তো আসল খুশি। তুমি দিন দিন এমন রসকষহীন হয়ে যাচ্ছো কেন বলো তো ম্যাডাম?

বাহবা। আমি রসকষহীন বুড়ি হয়ে গেছি, এতদিন বাদে ওই চীনা বুড়ির সঙ্গ পেয়ে তুমি বুঝতে পারলে। তোমার অনেক উন্নতি হয়েছে!

 

দুই

চায়না টাউনে একটি পরিচিত রেস্তোরাঁয় সন্ধেবেলায় বসে আছেন দুজনে। মাঝে মাঝে এখানে এসে চীনা খাবার খেতে তাদের ভালো লাগে।

মুখোমুখি বসে আছেন তারা। ওয়েটার এসে অর্ডার নিয়ে গেল। খাবার দিতে দেরি হবে। ততোক্ষণ অলসভাবে বসে আড্ডা মারতে চিরকালই দুজনের ভালো লাগে।

সোমা বললেন, ভিলাই থেকে এসে কলকাতায় ফিরে ভাবছিলাম মানিয়ে নিতে পারবো কিনা।

মলয় হাসতে হাসতে বললেন, তোমার আসতে ইচ্ছে করছিল না।

আসলে আমার স্কুলটা নিয়ে প্রবলেম ছিল। বাচ্চাদের স্কুল। প্রতিষ্ঠানের সকলে কত ভালোবাসতো। কেউ ছাড়তে চাইছিল না।

জানি তো সব। কী আর করা যাবে বলো? আমার রিটায়ারমেন্ট হয়ে যাওয়ার পর কলকাতার এই কোম্পানিতে কাজ করার সুযোগ পেলাম। কাজ ছাড়া আমি বাঁচতে পারি না। তাছাড়া এই বয়সে এত ভালো প্যাকেজ পাচ্ছি, লোভ সামলাতে পারলাম না। এখানে তোমার একটা চাকরি হলে খুব ভালো হয়। মাইনেটা বড় কথা না। নিজেকে কাজের মধ্যে ব্যস্ত রাখাটাও খুব জরুরি।
কোথাও কিছু পাচ্ছি না। সকলেই বলছে, বয়স হয়ে গেছে। প্রাইভেট কনভেন্টগুলোর সঙ্গে সেরকম যোগাযোগের রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না।
আমাদের অফিসের সান্যাল বলছিল, ব্রিটিশ কাউন্সিলের ইংরেজি শেখানোর নাকি নানা রকম প্রোগ্রাম আছে। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।
মেজদি একটা খোঁজ দিয়েছিল। একটা আশ্রমমতো। মেয়েরা চালায়। ওদের একটা মেয়েদের স্কুল আছে। বাঁকুড়ার দিকে। নানারকম সেবাকাজ করে ওরা। ওদের কয়েকজন সন্ন্যাসিনীর সঙ্গে মেজদির যোগাযোগ আছে। মেজদি বললে হয়ে যাবে।
অাঁতকে উঠে মলয় বললেন, তার মানে তুমি বাঁকুড়া গিয়ে ওই মহিলাদের আশ্রমে থাকবে নাকি?
ছদ্ম গাম্ভীর্য দেখিয়ে সোমা বললেন, তাই।
মাথা খারাপ, না পেট খারাপ?
হঠাৎ এসব বলছো কেন?
একে আমাদের ছেলেপুলে নেই। বুড়ো বয়সে দুজনে আরো বেশি করে পরস্পরকে কাছে পাওয়া দরকার।
ও।

তুমি হঠাৎ মাঝে মাঝে এমন উলটোপালটা চিন্তা করো কেন বলো তো?
কী জানি।
শোনো, মাথা খারাপ করো না। তোমার এনগেজ থাকার মতো একটা কিছু কাজ এর মধ্যে জোগাড় হয়ে যাবে। সত্যি সত্যি তোমার রোজগার করার দরকার নেই, এটা তুমিও জানো। আমি কত রোজগার করি, তোমার সেটা অজানা নয়।

জানি। কিন্তু তুমি রোজগার করো এন্তার খরচ করার জন্য। শপিংমলে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় একগাদা জিনিস কেনো। ফাইভ স্টার হোটেলে গিয়ে গান্ডে-পিন্ডে খাওয়া-দাওয়া। আর বড় বড় গাড়ি কেনা। তুমি একটা রিয়েল মাল মাইরি।

এক চোখ টিপে মলয় বললেন, চিরকাল আমি এরকমই। ছোটবেলা থেকেই আমার গোল ছিল প্রচুর রোজগার করবো। অনেক বিলাসিতা করবো। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াবো। বিশাল বিশাল সাইজের গাড়ি কিনবো। দু-চার বছর বাদে বাদে গাড়ি পালটাবো।

তোমার জীবনের উদ্দেশ্য পূর্ণ হইয়াছে মলয়বাবু। ছেলেমানুষি গলায় সোমা বললেন।

সবটা পূর্ণ হয়নি সোমা। আরো অনেক বড়লোক হলে ইচ্ছে মতো প্লেন কিনতাম। নিজের প্লেনে চেপে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াতাম।

হ্যাঁ, এটা একটা অপূর্ণতা বটে।

আরো কত হেরে যাওয়া থাকে।

যেমন?

আমাদের একটা সন্তান হলো না। পথে-ঘাটে নালা-নর্দমার ইঁদুরের বাচ্চার মতো গরিব মানুষদের গাদা গাদা ছেলেপুলে দেখতে দেখতে আমার ক্রোধ হয়। ভীষণ রেগে যাই আমি। ভগবানের এ কীরকম অবিচার। আমার ঘরে একটা ছেলে বা মেয়ে থাকলে তাকে আমি ফরেনে রেখে পড়াতাম। দশজনের একজন হতো সেই ছেলে।

শান্তভাবে সোমা বোঝালেন, সন্তান না-হওয়ার দুঃখ আমাদের দুজনেরই। কী করা যাবে বলো? এদেশের সব থেকে নামি ডাক্তারদের দেখিয়েছি আমরা। দুজনের শরীরেই এমন কিছু অসুবিধে আছে, হাজার চিকিৎসাতেও তা ঠিক হলো না। আর্টিফিসিয়াল ইনসেমিনেশনের চেষ্টাও কয়েকবার হলো, কিছুই সাকসেসফুল হলো না।

সোমার চোখের কোনাতে অশ্রু চিকচিক করতে থাকল।

নিজেদের কেমন পরাজিত মানুষের দলে ভিড় করা লোকজন মনে হচ্ছিল মলয়ের। চিরকাল কর্মজীবনে প্রচন্ড সফলতা পাওয়া মানুষটি চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে থাকলেন।

সমবেদনা জানিয়ে সোমা বললেন, আমরা কোনোদিন সন্তান না থাকার দুঃখকে প্রশ্রয় দিয়েছি? চারপাশে নিয়মিত দেখছি, সন্তানরাও কত যন্ত্রণা দেয় বুড়ো বাপ-মাকে। খেতে-পরতে দেয় না, দিনরাত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা করে, অনেকে বাড়ি থেকে তাড়িয়েও দেয়। অনেকে আদালতের কাছে গিয়ে বিচার প্রার্থনা করে। নিউজপেপারে মাঝে মাঝেই পড়ি।

গালে হাত দিয়ে মলয় বললেন, আ ডিফিট ইজ অলওয়েজ আ ডিফিট।

নরম গলায় সোমা বললেন, কতকগুলো জায়গায় প্রকৃতির আদেশের বাইরে আমরা যেতে পারি না। আমাদের মধ্যে সত্যি সত্যি অনেক অসহায়তা রয়েছে মলয়।

একসঙ্গে ট্রে ভর্তি করে অনেক খাবার এনে দিলো ওয়েটার।

মলয় তাকে বললেন, দুজনকে ভাগ করে দাও।

খেতে বসার আগে কী মনে হতে ওয়েটারকে আবার ডেকে মলয় শুধালেন, তোমাদের এখানে চপস্টিক আছে?

সে ঘাড় নেড়ে ভেতর থেকে আনতে গেল।

চোখ সরু করে সোমা শুধালেন, তুমি তো কোনোদিন চপস্টিক দিয়ে খাও না?

জানতাম না তো। সিঙ্গাপুরে বিজনেস ট্যুরে গিয়ে ব্যানার্জিদের সঙ্গে খেতে বসে দেখলাম ওরা কী সহজভাবে চপস্টিক দিয়ে চাইনিজ খানা খায়। তখনই আমার মনে হয়েছিল, যেদেশের খাবার সেদেশের ধরনে খেলে মজাটা জমে দারুণ।

চমৎকার। তা চপস্টিকের ট্রেনিং কি সেই ব্যাং না ফ্যাং চীনা মেয়েছেলেটা দিয়েছিল?

ফ্যাং হুয়া। হ্যাঁ, ও-ই আগ্রহভরে আমাকে শিখিয়েছিল।

ওয়েটারের এনে দেওয়া চপস্টিকে সহজ ভঙ্গিতে খেতে খেতে মলয় বললেন, কেমন সুন্দর খাচ্ছি বলো তো?

তোমার পরিবর্তন দেখে আমি অবাক হচ্ছি।

এটা এমন কিছু আহামরি কর্ম না। আমিও তোমাকে শিখিয়ে দেব দুটো কাঠি দিয়ে খাবার খাওয়ার রহস্য।

আমার এতটুকু আগ্রহ নেই মলয়। আমার দিশি সহবৎ নিয়ে আমি দারুণ আছি। জোর করে চীনে সভ্যতা শিখে আমার কাজ নেই।

আমাদের মেয়ে ফ্যাং হুয়া নামের মানে জানো সোমা? সুগন্ধি ফুল।

বারবার আমাদের মেয়ে কেন বলো তো? ও তোমারও মেয়ে না আমারও মেয়ে না। আমি বলি, ও তোমার ইনফ্যাচুয়েশন। বুড়ো বয়সের ধেড়ে রোগ। অনেক পুরুষেরই এ-বয়সে ও-রোগ দেখা দেয়।

 

তিন

সকালে টিভিতে তারা মিউজিক চ্যানেলে রবীন্দ্রসংগীতের সুরে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন মলয়।

রকিং চেয়ারে দুলতে দুলতে। একটুকু ছোঁয়া লাগে…

গান শুনতে শুনতে তুমি কাঁদছ? সোমা অবাক গলায় শুধালেন।

কাঁদছি।

তোমার সত্যি সত্যিই ভীমরতি ধরেছে।

এটা আমার ছেলেবেলার অভ্যাস। গান শুনতে শুনতে, সিনেমা দেখতে দেখতে ইমোশনালি অ্যাটাচড হয়ে গেলে আমার চোখে জল এসে যায়।

শুধু গান শুনতে শুনতে কেন, সেই চীনা ছুড়ির ই-মেইল পড়তে পড়তেও তুমি কান্নাকাটি করো। সবকিছুই ইমোশনাল বনডেজ।

আমি তোমার কাছে কিছুই লুকোই না সোমা। আমার কাছে, আসা ওর প্রতিটি ই-মেইল তোমাকে পড়াই। আমি কী লিখছি, সেটাও তোমাকে পড়াই নিয়মিত। আমার কোনো লুকোছাপা নেই। আমার ই-মেইল আইডি তোমাকে জানিয়ে দিয়েছি। মেইল খোলার ব্যাপার-স্যাপার তোমাকে শিখিয়ে দিয়েছি।

আমি সব বুঝি। বুড়ো বয়সে এরকম খুল্লাম খুল্লা প্রেম করতে তোমার লজ্জা হওয়া উচিত। এখন সেই মেয়েছেলের কথা ভাবতে ভাবতে চোখের জল ফেলছো।

আমাদের ই-মেইলগুলো পড়তে গিয়ে কখনো খারাপ কিছু চোখে পড়েছে?

বিটুইন দ্য লাইনস আমি সব বুঝতে পারি। আমার কত কালের কন্যারে। নিজের জন্ম দেওয়া বাপের সঙ্গে ইলেকট্রা কমপ্লেক্স গড়ে ওঠে, এ কোথাকার মেয়েছেলে।

মনে মনে মলয় শুধান, তোমার নিজের বাবার সঙ্গেও কি কখনো সেক্সের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল সোমা? আমাকে এভাবে কথায় কথায় এত অপমান করো কেন? আমি নিজেও জানি না, ফ্যাং হুয়া নামে সেই তিরিশ বছরের উজ্জ্বল মেয়েটির সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?

একটা চিঠিতে তুমি লিখেছিলে, আই ফেল ইন লাভ উইথ ইউ। এই সহজ কথার মানে বোঝার মতো বুদ্ধি বা শিক্ষা আমার নেই বলতে চাও? কী ভাবো তুমি আমাকে?

মনে মনে মলয় বলেন, আমাদের সব সম্পর্কই তো আসলে ভালোবাসার সম্পর্ক সোমা।

কী মনে হতে সোমা বললেন, তোমার সেই প্রোমোটার বন্ধু ফোন করেছিলেন। তোমাকে মোবাইলে পাননি কাল দুপুরে।

অফিসের মিটিং চলছিল। মোবাইল বন্ধ ছিল। তা রতনবাবু কী বললেন?

করপোরেশনে প্ল্যান স্যাংশন করিয়েছেন। এবার তাড়াতাড়ি দোতলার কাজ শুরু করবেন।

নিউ আলিপুরে মলয়দের এই পৈতৃক বাড়িটা অনেক পুরনো একতলা বাড়ি। অনেকদিন দেখাশোনার অভাবে বাড়িটার অবস্থা ভালো নয়। মলয়ের ইচ্ছে একটা আধুনিক কায়দার দোতলা বাড়ি বানাবেন।

স্বস্তিপূর্ণ গলায় মলয় বললেন, যাক বাড়িটা দোতলা হলে তুমি একটু হাত-পা ছড়িয়ে বাস করতে পারবে। আত্মীয়স্বজন এলে থাকার অসুবিধা হবে না।

ভালো।

তুমি খুশি হওনি সোমা?

আসলে তোমাকে জানানো হয়নি, মেজদির পরিচিত সেই বাঁকুড়ার মেয়েদের আশ্রম থেকে চিঠি এসেছে। দু-চারদিনের মধ্যেই আমি ওখানে জয়েন করবো।

রাখো তো ওসব পাগলামির কথা। তোমার ঘরসংসার সবকিছু ছেড়ে কোন চুলোয় তুমি মরতে যাবে?

তুমি মানুষটার থেকেই আমি অনেক দূরে সরে গেছি মলয়। তোমাকে কোনো দোষ দিচ্ছি না। কিন্তু প্রতিদিন আমি                         বুঝতে পারছি, ফ্যাং হুয়া নামে ওই মেয়েটির কাছে আমি হেরে গেছি।

সবটাই তোমার ভুল ধারণা সোমা। তুমি প্যারানয়েড হয়ে যাচ্ছো।

জানি না। তবে এটা বুঝতে পারছি, দিন নেই, রাত নেই সবসময় তুমি ওই মেয়ের ধ্যান করো। তোমার অস্তিত্বের মধ্যে ঢুকে পড়েছে ওই ভয়ঙ্করী মেয়ে। ও সত্যি সত্যিই তোমাকে জাদু করেছে।

তুমি কেন এমন হিংসা করছো সোমা? আর হয়তো সারাজীবনেও ওর সঙ্গে আমার দেখা হবে না। যেটুকু যোগাযোগ ই-মেইল আর ফোনে। বাস্তবে রক্তমাংসের দুজন মানুষের মধ্যে কোনো যোগাযোগ নেই। সবটাই ভারচুয়াল রিয়ালিটি; ইচ্ছে করলেও কেউ কাউকে ছুঁতে পারব না।

ক্লান্ত গলায় সোমা বললেন, সম্পর্কের মধ্যে ছোঁয়াটাই কি বড় কথা, আসল তো মনের যোগাযোগ, যেখানে আমি এখন তোমার কাছে অনেক দূরের মানুষ।

চোখ বন্ধ করে রকিং চেয়ারে আপনমনে দোল খেয়ে যাচ্ছিলেন মলয়। টিভিতে কেউ তখন গাইতে শুরু করেছেন, আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী…

মলয়ের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াতে থাকে।

সেদিকে তাকিয়ে সোমা আরো বেশি বিষণ্ণ বোধ করেন। রাগতে গিয়েও রাগতে পারেন না। নিজেকে খুব একা লাগে। প্রতারিত মনে হয়। অসহায় বোধ করেন। হঠাৎ বুঝি মনে পড়তে থাকে, কত সবুজ ছিল আমার এই সকালের আকাশ, রূপকথার মতো সবুজ প্রজাপতি ও সবুজ গৃহকোণ…