প্রকৃতির ঐশ্বর্যে বিস্ময় ভ্রমণ

লেখক:

জাহিদ মুস্তাফা

নিসর্গের ছায়ায় চমকিত আলোর উচ্ছ্বাসে, অনুভবের দোলায় বিস্মিত-শিহরিত শিল্পীর পরিভ্রমণ আমরা প্রত্যক্ষ করি বেঙ্গল শিল্পালয়ে বিপাশা হায়াতের চিত্রপটে – তাঁর ‘ভ্রমি বিস্ময়ে’ শীর্ষক একক চিত্রপ্রদর্শনীতে। এমন শিল্পী তিনি, যাঁর রক্তধারায় শিল্প। শিল্পী তিনি অভিনয়ের এবং চারুশিল্পের। তিনি মঞ্চ ও টেলিভিশন তারকা বিপাশা হায়াত। ঢাকার চারুকলার শিক্ষার্থী তিনি নববইয়ের দশকের। তখনই মঞ্চ ও টিভি নাট্যাভিনয়ে তাঁর তুমুল জনপ্রিয়তা। ছবি অাঁকার অ্যাকাডেমিক পর্যায়ে কেমন দক্ষতা অর্জন করেছেন তা অনুভবের সুযোগ হয়েছিল ২০০২ সালে চারুকলার জয়নুল চিত্রশালায় সমসাময়িক আরেকজন শিল্পীর সঙ্গে আয়োজিত দ্বৈত প্রদর্শনীতে। সে-কাজগুলো ছিল স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষাপ্রধান। কিছুটা অঙ্কন-নির্ভর নারী অবয়ব আর আলো-ছায়ার নাটকীয়তাভরা ছিল অধিকাংশ কাজ। কাছাকাছি সময়ে বিপাশা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র হুমায়ূন আহমেদের আগুনের পরশমণিতে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। টিভি নাটকের জন্যও কয়েকবার পুরস্কৃত হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে।

এখন তিনি নাটক লেখা, অভিনয় ও উপস্থাপনার পাশাপাশি ছবি অাঁকছেন। ইদানীং কয়েকটি আর্ট ক্যাম্পে অংশ নিয়ে ছবি এঁকেছেন। গত বছর ডিসেম্বরে বিজয় দিবস চিত্রমালার আর্ট ক্যাম্পে ছবি  এঁকেছেন দেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশতজন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত ১৫০ জন চারুশিল্পীর বিশেষ চিত্রকর্ম-প্রদর্শনীতেও অংশ নিয়েছেন বিপাশা।

শিল্পের যিনি অভিযাত্রী – তাঁর বিস্ময় তো সর্বত্র, দেখায়, অাঁকায় – পরিভ্রমণের নানা পরতে পরতে। কারণ একজন শিল্পী কখনো অভ্যস্ত ভ্রমণকারীর মতো নিরাসক্ত নন। চেনা, চিরপরিচিত জায়গাতেও তাঁর জন্য অবাক সৌন্দর্য, বিস্ময়াবিষ্ট রূপ কিংবা কালিমাক্লিষ্ট অসুন্দর অপেক্ষায় আছে। তাকে নিয়ে রঙ্গ করা, ব্যঙ্গ করা নতুবা তার   অন্তর্নিহিত রূপের গভীরে যাওয়ার প্রচেষ্টায় শিল্পী নিয়োজিত হন তাঁর স্বকীয়তা নিয়ে। একেকজনের একেকরকম দেখা; তার প্রকাশধরনও আলাদা। নিজের সঙ্গে অন্যের মিল যেমন আছে, অমিলও আছে তেমনি। সেই মিল-অমিলের ছায়া বিপাশার চিত্রপটেও বিদ্যমান।

প্রকাশবাদী বিমূর্ততার এমন এক ধরন তাঁর, সেখানে অনেক অগ্রজ শিল্পীর কর্মসাধনার পথপরিক্রমার ছাপ আছে। গড়িয়ে দেওয়া বর্ণের ওপর ভিন্ন বর্ণের পর্দা, নানা বর্ণের আড়াল-আবডাল মিলে এমন এক মায়া তৈরি হয় – শিল্পীমন বলে সে থাক, থেকে যাক চিত্রপটের বুকে। আবার খানিক পরেই সে-সৃজনকে আরো সৌন্দর্যময় করার তাগিদ তৈরি হয় শিল্পীমনে, সে তখন তুলি হাতে বর্ণলেপনে এমন গতিমান, ক্যানভাসের বুকে জমে ওঠা বিন্দু বিন্দু ভালোলাগা-মন্দলাগা অতিক্রম করে আরো সম্ভাবনা তৈরিতে তৎপর হয়ে ওঠে। এই তৎপরতা আমরা বিপাশার ক্ষেত্রেও লক্ষ করি। যেমন ৬০ গুণিতক ৬০ আকৃতির ক্যানভাসে অাঁকা ‘দ্য পিওর সোল’। নমিত বর্ণের নানা পর্দা তৈরি করে অন্ধকারে আলোর উদ্ভাস এনেছেন শিল্পী।

শুরু করেছিলেন যিনি এখানে, সেই গুরুশিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া চলে গেছেন এ-বছরই। কিবরিয়া স্কুলের অনেক শিল্পীই আছেন স্বনামধন্য। কাজ করতে করতে কিছু স্বকীয়তাও চলে এসেছে তাঁদের চিত্রপটে। বিপাশা হায়াতও আপন আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।

এ-প্রদর্শনীতে মোট চিত্রকর্ম ছিল ঊনষাটটি। বিভিন্ন মাধ্যমে এঁকেছেন শিল্পী – কখনো ক্যানভাসে তেলরঙে, কখনো অ্যাক্রিলিকে। কাগজেও এঁকেছেন এবং মনোপ্রিন্ট করেছেন কয়েকটি। মাধ্যমের বিভিন্নতা তাঁর প্রদর্শনীকে করেছে বৈচিত্র্যময়। প্রকাশ ধরনের  বৈচিত্র্যও আছে তাঁর নানা কাজে। কয়েকটি চিত্রে আছে অবয়বের ব্যবহার। যেমন – ‘ফান উইথ শ্যাডো’ চিত্রে তরুণী এক অবয়বের আলো-ছায়ায় অসংখ্য কালো লাল ফোঁটা বৃষ্টির প্রয়োগ দেখা গেল। সহজ-সাদামাটা ছবিটিও অনেক ভারি কাজের ভিড়ে দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে। অবয়বিক আরো কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে – ‘মডেল উইথ রোজ’, ‘রিলেশন’। মডেল নিয়ে অনেক শিল্পীই এঁকেছেন, অাঁকছেন। আমাদের সমকালীন শিল্পীদের মধ্যে জামাল আহমেদ, কুহুসহ বেশ কজন এরকম অবয়বপ্রধান কাজ করছেন। এমনকি চারুকলার অ্যাকাডেমিক শিক্ষায় মডেল ড্রয়িং বিষয়টি থাকায় স্বভাবতই এই বিষয়ে প্রচুর কাজ হয়। কিন্তু বেশিরভাগ শিল্পী কেন যেন মডেল ড্রয়িং ছেড়ে দেন। বিপাশা এখনো ড্রয়িংটাকে ধরে রেখেছেন – এটি ভালো লক্ষণ।

বিপাশা হায়াতের মনোপ্রিন্ট চিত্রগুলোয় বর্ণ অনেকটা ধূসর  – যেন অতীতাশ্রয়ী এই বর্ণপ্রক্ষেপণ। সেখানে আলো-ছায়া আছে, আছে পরিমিতিবোধও। সাদাকালো আর ধূসর হলুদাভার বর্ণের আভিজাত্য তাতে। তবে অ্যাক্রিলিকের কাজগুলোয় বর্ণ উচ্ছ্বসিত, উৎফুল্ল তার বৈভব নিয়ে। বর্ণের উষ্ণতা আছে বটে, তবে তা পরিশীলিত রূপে নমিত বর্ণের সঙ্গে সখ্য হয়ে।

বিপাশা হায়াতের চিত্রকর্মে দেখি নিসর্গের বিচিত্র সব রূপ আর তার আলোছায়ার খেলা। তাঁর চিত্রপটের প্রান্তরে আছে এবড়ো-খেবড়ো ভূমি, খানাখন্দ, জলাভূমি, শ্যাওলা সবুজ রঙের বৃক্ষশোভিত প্রকৃতি। কিংবা অন্যভাবে বলা যায় – পুঞ্জীভূত কালো মেঘ, আসন্ন বৃষ্টির সম্ভাবনা আর তৃষ্ণাকাতর আকাশ। পাখির চোখ দিয়ে দেখা জমির বিভাজন নিয়েও তিনি চিত্র রচনা করেছেন – শিরোনাম ‘ফ্লোটিং সোসাইটি’। চিত্র শিরোনামের পাশেই ব্রোশিওরে একজন করে জগদ্বিখ্যাত শিল্পীর অনুভূতির প্রকাশ তুলে ধরেছেন। পল ক্লি, অঁরি মাতিস, ক্লদ মনে, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, অ্যান্ডি ওয়ারহল, কামিল পিসারো, জন কনস্টেবল, মরিস দ্য ভ্লামিনিক, পাবলো পিকাসো, মার্ক শাগাল, পিয়েরে অগুস্ত রেনোয়াঁ, গুস্তাভ কোর্বে, উসেন, ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ, মাইকেলেঞ্জেলো, ইউজিন দেলাক্রোয়া, অগুস্ত রদ্যাঁ ও দার্শনিক অ্যারিস্টটলের উদ্ধৃতি তুলে ধরে শিল্পীর অনুভবের বিশালতা চিহ্নিত করার প্রয়াস পেয়েছেন।

যে-চিত্রকর্মের পেছনে থাকে দর্শন, তা সার্থক সৃজন। তার গভীরতা মাপা যায় না, তার ভেতরে ঢুকলে বহু ভাবের উদ্রেক হয়। বিপাশা হায়াতের চিত্রকর্মের পেছনে দর্শনের ছায়া থাকলেও তা কতটুকু গভীরতার অনুভূতি আনে সে-বিবেচনায় যাওয়ার সময় এখনো হয়নি। কারণ তিনি শিল্পের এই বিশেষ জায়গাটিতে নবীন, তবে সম্ভাবনাময়। তাঁর চিত্রকর্মের শিরোনামগুলোও দর্শক মনে ভালোলাগার অনুরণন তোলে। যেমন – ‘এপিটাফ অব অ্যাগনয়’, ‘দ্য রিকল্ড ইমেজ’, ‘সেরেনিটি’, ‘আনফরগটেবল’, ‘মেলানচোলি’, ‘ইনটু দ্য ডিপ’, ‘সং অব ফরেস্ট’ প্রভৃতি। বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ, শত্রুবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের অনুভব নিয়ে শিল্পী রচনা করেছেন বেশকটি চিত্র। এর অন্যতম – ‘২৫ মার্চ ১৯৭১’। কাগজে মিশ্রমাধ্যমে অাঁকা। উত্তাল মার্চের সেই কালরাত্রি আর রক্তের ছোপ দিয়ে শিল্পী আমাদের গৌরবগাথাকে তুলে ধরেছেন পরম মমতায়। একজন তারকাশিল্পীর এই দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধ প্রীতিতে অনুপ্রাণিত হবে নতুন প্রজন্ম।

এ-প্রদর্শনী চলেছে ২৫ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত।