যে-সব দিনকে সবাই দিন বলে গুনে গুনে যাচ্ছে, ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টাচ্ছে, জন্মদিন পালন করছে, নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখলাম, এগুলো কোনো দিনই নয়। দেখাই তো যাচ্ছে, দিন এখানে মাসিক বেতনে চাকরিজীবী। অনেকটা নিভুনিভু কেরানির মতো এই দিন, আসছে ও চলে যাচ্ছে, ভালো করে না তাকালে চোখেই পড়ে না। অর্থাৎ সোনালি রোদের ডায়েরি-লেখা ছাত্রীটির কাছে এই দিন গৌরবহীন, ম্রিয়মাণ, স্তব্ধব্যাকুল; অনেকটা ধর্ষণের পর হত্যা করা মেয়েটিকে মর্গ থেকে ফেরত এনে কবরে নামানোর আগে বিষণ্নতায় মোড়ানো তার পরিবারের মতো, হতবিহ্বল। প্রক্সি চলছে। এসময় যে-পাখি ডাকছে দূরে, তার কণ্ঠেও সঙ্গী হারানোর সুর …

যে-সব অন্ধকারকে সবাই সন্ধে-সন্ধে বলে শাঁখ বাজিয়ে দিচ্ছে, যে-সব রাতকে সবাই বালিশের উপরে রেখে আলস্যে ঘুমিয়ে পড়ছে, এও খুব খেয়াল করে দেখলাম, এগুলো সন্ধেও নয়, রাত তো নয়। এই রাত প্রকৃত রাত হলে রায়মঙ্গলা নদীর ওধারে সারারাত বাঁশি কেন বাজবে? সন্ধে যেমন সন্ধে হলে কেউ বাড়ি ফেরারও পথ ভুলে যায়? প্রকৃত রাত হলে ঘুমের মধ্যে বড়রাও ছোট হয়ে যেত বা শিশু হয়ে যেত; মেলায় যাওয়ার পথে বাবার হাতের আঙুল ধরে হাঁটত, বাবাও তো শিশু। মা তখন কোথায়? কুয়োতলায় বাসন মাজতে মাজতে ও রান্নাঘরে চুলার পাশে বসেই তার একটা জীবন পার? অভাবের সংসারে কী রান্না করল মা? তার হৃৎপিণ্ড? আমরা মা’র হৃৎপিণ্ড খেয়ে বড় হওয়া মানুষ! এই রাত রাত হলে ধর্মগুরু বলতেন, নিরাকার ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিই মা। প্রক্সি চলছে। এই সন্ধে সন্ধে হলে ছাতিম ফুলের ঘ্রাণ ঠিকই পাওয়া যেত। কেউ কি দূরের কীর্তনধ্বনি শুনতে পাচ্ছ?

হয়তো সময় যাচ্ছে। আমি এই সময়ের কোনো শিরোনাম দিতে পারছি না। আমার ব্যর্থতা অনেক, যা ভাবছি তা বলতে পারছি না, লিখতে পারছি না, আমি বলতে পারছি না তুমি চাতুর্যকে কীভাবে শিল্পকলা করে তোলো! আমি জানাতে পারছি না, কাঠঠোকরা সময়, তোমার উপস্থিতিতে আমি আরো বেশি ক্ষত হই। স্বেচ্ছায় তো তোমাকেই তো পাঁজরের ট্যাংক খুলে একদিন পড়তে দিছিলাম সেই পাণ্ডুলিপি, যার মধ্যে আমার রক্ত-বর্ণমালায় কিছু শ্বাসপ্রশ্বাস লেখাজোকা আছে। সেই লেখা কোনোদিন ছাপা হবে না, ক্রমশ পুরোনো হতে থাকা ঘুমন্ত কোনো ডায়েরিতেই তার অধিবাস।

তবে কি পেন্ডুলাম থেকে খসে গেছে নির্ণয়ের কাঁটা? এই দিন কি তবে প্রকৃত দিনের প্রক্সি দিয়ে যাচ্ছে? রাত প্রক্সি দিচ্ছে রাতের? ভালোবাসাকেও আজ প্রক্সি পদ্ধতিতে টিকে থাকতে হচ্ছে? আমিও কি লিখে যাচ্ছি প্রক্সি কবিতা?

Leave a Reply