প্রথাবিরোধী শিল্পী প্রকাশ কর্মকার ও তাঁর শিল্প-সুকৃতি

লেখক:

রবিউল হুসাইন

তাঁকে বলা হতো ‘গরিবের পিকাসো’ কিংবা ‘চিত্রশিল্পের শক্তি চট্টোপাধ্যায়’। শিল্পী প্রকাশ কর্মকারের অনুসারী নতুন প্রজন্মের অনেক শিল্পী তাঁর প্রকাশিয়ানায় নিমগ্ন হয়ে চেতনায় বা অবচেতনায়, পরোক্ষে অথবা প্রত্যক্ষে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর শুভার্থী বন্ধুরা বলতেন, ‘যে কর্ম করত আর প্রকাশ করত – এরকম স্ব-নাম-ধন্য খুব কম। নিরন্তর, অক্লান্ত কাজ করে গেছেন সমস্ত বিশৃঙ্খলার ভেতরেও সার্থকনাম। – আদ্যন্ত প্রগতিশীল ও বন্ধুঅন্তপ্রাণ।’ তাঁকে বলা হয় ‘বাংলার একমাত্র লৌকিক আধুনিকোত্তর শিল্পী’ হিসেবে। তিনি ছিলেন একজন ‘অ-গৃহস্থ-শিল্পী’ এবং পঞ্চাশের দশকের দ্বিতীয়ার্ধের আধুনিক প্রতিনিধি – নৈরাজ্যের সৌন্দর্য ছিল তাঁর মধ্যে।’ স্বাধীনতার পর ভারতীয় শিল্পকলার অন্যতম প্রতীচ্য প্রভাবহীন নিজস্ব দৈশিক ঘরানার আধুনিকোত্তর ঔপনিবেশিক খোয়ারিহীন উজ্জ্বল সৃজনশীল শিল্পী হলেন প্রকাশ কর্মকার। ১৯৩৩ সালে এই বোহেমিয়ান শিল্পী কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার বিখ্যাত শিল্পী প্রহ্লাদ কর্মকার, যিনি কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুল পড়ে কলেজে পড়তে পাড়ি জমান এবং ওখানেই থেকে যান। প্রকাশের যখন তেরো বছর বয়স তিনি তখন পিতাকে হারান। তখন দুর্ভিক্ষ, বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, দাঙ্গার পাশাপাশি অস্বাভাবিক পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে বড় হতে থাকেন। এই ভেতর-বাইরের টানাপড়েন আর ডামাডোল পরিস্থিতি তাঁর শিল্পীজীবনকে নিরন্তর অস্থিরতা ও তার বিপরীতে এক সুসংহত সামঞ্জস্যতার প্রতিবেশ সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছে। ভেতরে প্রচুর ভাংচুর, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিক্ষুব্ধতা সংগ্রাম-যুদ্ধ-লড়াই কিন্তু বাইরে তার প্রকাশ স্থিতধী, শান্তশ্রী, স্নিগ্ধ সৌন্দর্যে আকর্ষণীয়। শিল্পী নিমগ্ন হয়েছেন মানুষ আর প্রকৃতিতে। বৃক্ষ, ঝিল, শস্য, ফসল, পাখি, প্রজাপতি – সব নারীর শারীরিক অনুষঙ্গে বিধৃত যেন শরীরের বিভিন্ন অংশ চোখ, নিমম্ব, স্তন, চিবুক, ভ্রু, হাত-পা, গ্রীবা, কেশদাম, ভঙ্গি – সব এক-একটি প্রকৃতিরই অবিচ্ছিন্ন অংশ। এসবের সঙ্গে বিন্দু, রং, রেখা, আকার, আবরণ, বুনুনি, গঠন প্রক্রিয়া, শিল্পী বিশেষায়িত হবে : সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বা অপূর্ণাঙ্গ বাস্তবতায় রূপ পেয়েছে। শিল্পী মূর্ততায় বিশ্বাসী ও পারঙ্গম ছিলেন, যেহেতু তা দৈশিক পরম্পরায় গড়ে ওঠার সোপানে ব্যাপৃত। বিপরীতে বিমূর্ততা শেকড়হীন অবয়বে। তাই কখনো সেটাকে কেন্দ্র করে অগ্রসর হননি। তিনি বলেছেন, ‘আমার অঙ্কনে ভাংচুর থাকে টুটা জীবন। ভাঙাচোরা বাড়িঘর। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা দেখে আমরা বড়ো হয়েছি। এসব ভয়াবহ আরতি। নিসর্গের মধ্যেও আমি সবকিছুকে বাঁকিয়ে চরিয়ে বিন্যাস করি। এই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি ভারত। দুর্নীতিভরা প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা, তার মাঝে ভুখা জনগণকে মৃত যাত্রীর কৌটো খুলে গোগ্রাসে খাবার খেতে হয়।’ এরকম অতিবাস্তবতায় গঠিত প্রকাশের বোধানুভব। ছবিতে তাই বিপরীত স্নিগ্ধতার এক পরিপূর্ণ শান্ত প্রচ্ছায়ার পরিচয় পাওয়া যায়, যা দৃষ্টিনন্দন এক ইউটোপিয়া – চিরশান্তি ও চিরমুগ্ধতাময়। ২০১৪-এর ২৪ ফেব্রুয়ারি নিরীশ্বরবাদী এই শিল্পী দেহত্যাগ করেন। ৮১ বছর বেঁচে ছিলেন। প্রথম জীবনে কলকাতা, পরে এলাহাবাদ। বালি-নৈনিতে ষোলো বছর কাটিয়ে ফের কলকাতায় পদার্পণ। মাঝে তিন বছর প্যারিসে। পিতা হিসেবে স্বামী হিসেবে, পারিবারিক কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করেছেন। পঞ্চাশের দশকে বিজন চৌধুরী, রবীন মন্ডলের সঙ্গে শিল্পযাত্রা। এ-সময়ে নীরদ মজুমদার তাঁকে সুপরামর্শ দিয়ে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছেন, যা পরবর্তী শিল্পীজীবনে প্রভাব ফেলে। তিনি অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল, যামিনী রায় এঁদের উত্তরসূরি লোকশিল্প – স্বদেশিতায় শিল্পীজীবনে প্রভাব ফেলে। শিল্পীদের শিল্পপ্রকাশ বা চিত্রভাষার রূপকল্প আত্মজীবনীমূলক, প্রকাশের বেলায়ও তা সত্য। ব্যক্তিগত প্রকাশের সর্বজনীনতা দেখা যায় এবং তা আর্কিটাইপের আদিরূপে প্রকাশিত। কবিদের খুব প্রিয় এই মায়াবাদী শিল্পী নিজেও একজন কবি ছিলেন। ভারতীয় দর্শনের নামরূপ জগৎ আদর্শে বাস্তব থেকে স্বপ্নময় পরাবাস্তব সংসারে থেকেও তিনি সন্ন্যাসী, একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে ছিলেন। প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেনকে নিয়ে দশ নারীমুখ এঁকেছিলেন, সঙ্গে তাঁর কবিতাও। কবি অরুণকুমার সরকার তাঁর সেসব ছবি নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন – ‘প্রকাশ তোমার ছবি দশবছর আমার দেয়ালে।/ কেন চোখ উপড়ে নিয়েছ/ ওই লুব্ধ নরনারীদের?/ মানুষ সবাই বুঝি অন্ধ আবেগে ধাবমান?/ কিসের প্রতীক্ষা যদি সূর্য স্থির নিরন্ত নিস্তেজ?/ প্রতীক্ষা প্রতীক্ষা বুঝি প্রতীক্ষা প্রতীক্ষা শুধু/ তটরেখা মায়াবী হরিণ?’ প্রথমে সামাজিক অস্থিরতা, অবক্ষয়, ক্লান্তি, জীবনের অবসাদ, পরে নারীর শরীর শিল্পীর প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। জীবনের চলৎশক্তির অন্যতম হলো লিবিডো এবং তা পার্থিব ও বাস্তবতাময়। এর মধ্য দিয়েই জীবন-মাধুর্যের পরিপূর্ণতা আসে তাই নর-নারীর মিলন বা ঘনিষ্ঠ সাহচর্য যা তাঁর ছবিতে স্পষ্ট, তা জীবনকে এড়িয়ে নয়, বরং অতি জীবনমুখী। শিল্পীর ছবিতে এই শিল্প-দর্শন খুব জোরালোভাবে প্রকাশিত। তাঁর ছবিতে কৃত্রিমতা নেই, সব প্রাকৃতিক ও সহজিয়া অস্তিত্বে বিরাজমান।

সম্প্রতি ধানমন্ডির গ্যালারি চিত্রকে শিল্পী প্রকাশ কর্মকারের বেশ কয়েকটি উজ্জ্বল ও বিভূতিময় ছবি নিয়ে ২১ থেকে ২৯ আগস্ট, ২০১৪ – নয় দিনব্যাপী একটি শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রকাশের উদ্দেশে চিত্র-প্রদর্শনী হয়ে গেল। প্রাগুক্ত কথামালা সেই প্রসঙ্গে। অ্যাক্রিলিক, তেল, ড্রাই প্যাস্টেল দিয়ে ছবিগুলো বিভিন্ন আকারে বিধৃত। নিসর্গ, নর-নারীর দেহভঙ্গিমা, অসহায় মানুষের জীবনযাত্রা, ক্ষুধার্তদের আর্তনাদ খুব অতিবাস্তবতায় এবং অতিপ্রাকৃতিকতায় প্রকাশিত। উজ্জ্বল আকর্ষণীয়  রং, মোটা রেখা, দেহজ সাবলীল দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া অবয়ব – সব বিভিন্ন আঙ্গিক ও গঠনে প্রকাশিত। ছবিগুলি দেখে ভাবতে বাধ্য করে বা শেখাতে চায়। সেসবের মূল উৎসকে কেন্দ্র করে কিছু জিজ্ঞাসা করতে উৎসাহিত করে। শিল্পীর এখানেই সার্থকতা নিহিত। তিনি যেমন নিজস্ব জগতের এক ব্যক্তিগত নিসর্গ সৃষ্টি করেন, তেমনিভাবে নিজস্ব মানব-মানবীকেও নিজের মতো করে তৈরি করেন, যারা বৃহত্তর সমাজ বা পরিসরের বাইরে নয়, একান্তভাবেই এই জগৎসংসারের বাসিন্দা তারা। শিল্প সর্বজনীন হলেও শিল্পী যে শিল্প সৃষ্টি করেন তা সেই স্থান বা জায়গার আর্থ-সামাজিক-রাজনীতির প্রভাবে গড়ে ওঠে। মন ও মননে থাকে বিশ্বজগৎ কিন্তু কার্যধারা লৌকিক ও দৈশিক। সব শিল্পের বেলায় প্রযোজ্য। ঘরের বাইরে গেলে আধুনিক কিন্তু ঘরে ফেরাই উত্তরাধুনিক। আমাদের সবার তো এখন ঘরে ফেরার পালা। চোখে দেখে যা সৃষ্টি করি সেসব বাস্তবতাময় মূর্ততায় অস্তিত্বশীল। মনের সঙ্গে অনুভূতি দিয়ে সৃষ্টি হলে তা বিমূর্ত রং-রেখা আকার বুনুনিতে পরিণতি পায়। শিল্পী প্রকাশ কর্মকার সেই বিমূর্ততায় অবগাহিত হননি। তিনি তাঁর নিজস্ব সৃষ্ট পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠা এক সম্পূর্ণত মূর্ত বাস্তবতার শিল্পী-স্রষ্টা। তাঁর বিদেহী আত্মার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক প্রার্থনা করি আমরা। চিত্রকের কর্ণধার শিল্পী মনিরুজ্জামান ও শিল্পী জহিরকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই এরূপ একটি চমৎকার প্রদর্শনীর জন্য। পরিশেষে শিল্পী-কবি প্রকাশ কর্মকারের কয়েকটি কবিতা দিয়ে শেষ করা যাক এই শ্রদ্ধার্ঘ্য-নিবন্ধ-শিল্প বাক্যাবলি : ‘শুনেছ নিশ্চয়ই তার নাম/ সারাটা জীবন যে ছিল ক্লান্ত/ মশানে শ্মশানে/ কবিতার অক্ষরে’

‘দেখলাম জন্মস্থান/ যৌবন, ফণা তুলে ফোঁস করে -/ হিস্ হিস্/ ঝঙ্কারে’

‘এখন সবসময়/ প্রশ্ন ক’রে স্থবিরতা।/ চুপিসারে সে প্রতীক্ষায়/ রেখে যায় ‘মৃত্যু’/ দুটি অক্ষরে।’

‘আমিও বুঝেছিলাম ফসিলের পৃথিবীকে/ পোয়াতি চাঁদের মত ভনিতার ক্ষয়ে যাওয়া/ স্থাবর অন্ধকারে।’

‘এসেছো?/ ডানা মেলে নিয়ে যাও পাখি/ ভাল লাগে না আর/ উঠোনে ছায়া/ তোমাকে সঙ্গ দেবে উড়ে উড়ে…