মৃত্যুর মতো অবধারিত আর কিছুই নেই, তবু কোনো কোনো মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয় – এমন কেন হয়! কেন কোনো চলে যাওয়াকে কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। অথচ এও তো জানি শরীরের অবসান কারো বিরাটত্বকে খাটো করতে পারে না, মানুষের বেঁচে থাকা তাঁর কীর্তিতেই। ২০২১-এর ২১ এপ্রিল প্রয়াণ হলো শঙ্খ ঘোষের, তাঁর অনুরাগীদের কাছে রয়ে গেল তাঁর গদ্য, কবিতা, স্মৃতিলেখমালা, রবীন্দ্রভাবনার পরিচয়। লিখিত পাঠের বাইরেও সকলে মনে রাখবেন তাঁর মানবিক মুখশ্রী, তাঁর প্রতিবাদ, তাঁর সমাজ-ভাবনাচিন্তায় ও কর্মে তাঁর স্বতন্ত্র উপস্থিতি।

একটা   দেশ   দু-টুকরো   হওয়ার   আগেই  ১৯৩২-এর ৫ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্ম হয়েছিল ত্রিপুরার চাঁদপুরে, মামাবাড়িতে। নদীর পারে পারে তাঁর বেড়ে ওঠা। ঢাকায় একুশে গ্রন্থমেলায় অতিথির ভাষণে সে-কথা তিনি নিজেই মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। সন্ধ্যা নদী ছুঁয়ে তাঁর গ্রাম বানারীপাড়া, কিছুদিন কীর্তনখোলা নদীর তীরে বরিশালে, বাল্যকাল কাটল পদ্মাবিধৌত পাকশীতে। দেশভাগ তাঁকে, তাঁদের শিকড়চ্যুত করেছিল ঠিকই, কিন্তু মন থেকে মুছে নিতে পারেনি সেই সজল পুব বাংলাকে।

তরুণ শঙ্খ এসে পড়লেন কলকাতার জনারণ্যে। শহরপথের ধুলো মেখে তারপর বাকি জীবন তাঁর পথচলা। পথচলা কোনো আলংকারিক কথা নয়, তাঁর অগ্রজ বন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতোই তিনি অক্লান্ত পদাতিক। পথকে কি তিনি পেয়েছিলেন তাঁর প্রিয় রবীন্দ্রনাথ থেকে! এই কলকাতা শহরের রাস্তায় গলিতে তিনি ক্লান্তিহীন হেঁটে বেড়িয়েছেন, গ্রীষ্মে বর্ষায় শীতে বসন্তে। উল্টোডাঙা থেকে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে অকারণেই হেঁটে গেছেন এয়ারপোর্ট অবধি, চালের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ বেরিয়ে পড়েছেন তুমুল বৃষ্টির মধ্যে – তাঁর পরিচিতজনদের কাছে এ ছিল খুবই চেনা দৃশ্য। আর যখন পথে নয়, ঘরে তখন তিনি খুলে রেখেছেন তাঁর দরজা, বাহির এসে ভিড় করেছে তাঁর ঘরে। ঘর ও পথ, সদর ও অন্দর, ভিতর ও বাহিরকে মিলিয়ে নেওয়াই তো তাঁর কবিতা।

উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে, আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের কিছুটা অবাক করে দিয়েই বাংলায় অনার্স নিয়ে। সেই তরুণ ছাত্রের বন্ধুমণ্ডলীও ছিল ঈর্ষণীয়। প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য বা শচীন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো মেধা ও মননে উজ্জ্বল ছাত্ররা তো বটেই, অনুজ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তও। এমএ পড়তে এলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখানেই বন্ধু হিসেবে পেলেন অশ্রুকুমার শিকদারকে। আর এখানেই তাঁর সহপাঠিনী উত্তরবঙ্গ থেকে আসা দুর্দান্ত মেধাবী ছাত্রী প্রতিমা বিশ্বাস, যাঁর অন্য নাম ইভা, যে-ইভাকে তাঁর প্রথম কবিতার বই দিনগুলি রাতগুলি উৎসর্গ করবেন এই কবি।

সেই ছাত্রজীবনেই তো পরিচয় পত্রিকায় বেরিয়েছিল ‘দিনগুলি রাতগুলি’ নামের দীর্ঘ কবিতাটি, আর পাঠক সচকিত হয়ে উঠেছিলেন এক নবীন কবির আবির্ভাবে। সেই লেখাটির নামেই বইয়ের নাম, যে-বইয়ের কবিতা তর্কে টেনে এনেছিল এমনকি বুদ্ধদেব বসুকেও। শান্তিনিকেতনের সাহিত্যসভায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মুখে ‘যমুনাবতী’ কবিতার প্রশস্তি শুনে উত্তেজিত বুদ্ধদেব সেদিন নিজেরই অসম্মতি ও অনিচ্ছাকে ভেঙে মঞ্চে উঠে কবিতার এই ধরনটিকে মেনে নিতে তাঁর আপত্তি জানিয়েছিলেন সজোরেই। তরুণ শঙ্খর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া যেমনই হোক, সেখানেই তাঁর ভেতর দিকে মুখ ঘোরানো আর বাইরের দিকে মুখ ফেরানো কবিতাকে মিলিয়ে নেওয়া শুরু।

দশক ভাগের অযৌক্তিক রেওয়াজ অনুসারে শঙ্খ ঘোষ পঞ্চাশের কবি – তাঁর কবিসতীর্থরা কেউ কৃত্তিবাসে, কেউ শতভিষায়। তিনি ঠিক এঁদের কোনো গোষ্ঠীরই নন, যদিও কৃত্তিবাসের সঙ্গে তাঁর সখ্য কিছুটা গভীর, তাঁরা তাঁর স্নেহ ও প্রশ্রয় পেয়েছেন একটু বেশি। হয়তো সেই শুরুর দিনগুলিতে কবিতার গোটা খাতা নিয়ে গিয়ে তাঁর কবিতা ছেপেছিল কৃত্তিবাস, সেই ভালোবাসার স্মৃতিকে এভাবেই তিনি ধরে রেখেছিলেন। তবু তিনি কৃত্তিবাসের কবি নন। পঞ্চাশের কবি – এই অভিধাও তাঁকে এক সংকীর্ণ গণ্ডিতে আটকে রাখতে চায়। শঙ্খ ঘোষ একজন কবি, বাংলা ভাষার কবি, বাংলা ভাষার মধ্য দিয়ে তিনি ছুঁয়েছেন জীবনকে, সত্যকে।

সত্য বলা ছাড়া কবিতার আর কোনো কাজ নেই, এমন কিছু বলেছিলেন কবি। তাঁর কবিতায় সেই সত্যের উচ্চারণ, তাঁর গদ্যে সেই সত্যের অন্বেষণ। সেই সত্য তাঁর অনুভূত ও উপলব্ধ। সে-সত্য কখনো অন্তর্জগতের, কখনো বহির্জগতের, কখনো বা দুই মিশে যায়। পঁচিশটি কবিতার বই, এখন পর্যন্ত এগারো খণ্ডে সংকলিত গদ্য আর অন্যান্য লেখার মধ্য দিয়ে পাঠকের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক সত্যান্বেষী সাহিত্যব্রতীর রূপ, আজীবন যিনি কথা বলেছেন শিল্পের শর্তকে একটুও লঙ্ঘন না করে।

তাঁর কবিতা, প্রবন্ধ, রবীন্দ্রভাবনা ইত্যাদির পাশে তাঁকে জেনেছি এক সমাজচিন্তক বলে। তাঁর সমাজচিন্তা প্রবলভাবে মানবিক। সেই মানবিক দাবিতেই তাঁর লেখা যেমন প্রতিবাদী হয়ে ওঠে, তেমনই সে-প্রতিবাদ ব্যক্ত হয় তাঁর সক্রিয়তায়। কোনো দলীয় আনুগত্য ছাড়াই যে সদর্থে রাজনৈতিক হয়ে ওঠা যায় শঙ্খ ঘোষ তাঁর নিদর্শন। 

২১ এপ্রিল সকালবেলায় চলে গেলেন তিনি। রেখে গেলেন তাঁর লেখা, তাঁর নানা স্মৃতি; আর কাছের  মানুষ এবং ভালোবাসায় সিক্ত ছাত্রছাত্রীদের জন্য একরাশ শূন্যতা।

Leave a Reply