প্রেম ও মৃত্যুর গল্প

লেখক:

মাসুদা ভাট্টি

 

১৭ বছর অপেক্ষা করালে?

তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করেছ? বিশ্বাস হচ্ছে না।

আমি অপেক্ষা করেছি। আমি তোমার সাফল্য দেখেছি এখান থেকে।

আমি তোমার ফেলে আসা কাজটুকুই করেছি কেবল, তুমি যেখানে শেষ করেছিলে, অবশ্য তুমি তো শেষ করতে পারনি, তার আগেই চলে এলে।

চলে আসারই কথা ছিল, আসতে চাইনি যদিও। কে আসতে চায় বলো? পৃথিবীটা তো আনন্দের জায়গা, আমি মনের আনন্দে বেঁচেছি।

আমি জানি, তোমার জীবন-যাপন, জীবনের প্রতি ভালোবাসা, নিজেকে ভালোবাসতে পারা, সবকিছু ঈর্ষণীয় ছিল আমার কাছে।

কেন, তুমি ভালোবাসতে না? জীবনকে? তোমাকে?

আমি নিশ্চিত নই। দশ বছর বয়স হওয়ার আগেই মা-বাবাকে হারিয়েছিলাম। তারপর যখন ইংল্যান্ডে পড়তে চলে যাই, আমার ভেতর কোনো বোধ তখনো তৈরি হয়নি। ক্রমশ যখন বুঝতে পারি, আমি সত্যি সত্যিই বোধহীন হয়ে গিয়েছিলাম তখন। তারপর তোমার সঙ্গে বিয়ে হলো, তোমাকে তো আগে থেকেই চিনতাম, পারিবারিক সম্পর্ক তো ছিলই। তাছাড়া তোমার নিজেকে ভালোবাসার কথা তখনই জানা ছিল, জানতাম তোমার একের অধিক প্রেমের ব্যাপারেও। তার পরও তোমার মায়ের কথায় আমি রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম তুমি আমাকে পছন্দ করোনি, আমি পছন্দ করার মতো ছিলামও না। নিজের চেহারা নিয়ে মেয়েদের যেসব কারণে গর্ব করার কথা, তা আমার ছিল না। আমি তুলনামূলক লম্বা, আমার দাঁতের সারি সামনের দিকে বের করা, আমার চওড়া কাঁধ, আমি জেনেছি পরে, তুমি আমাকে তোমার শয্যার নারী হিসেবে ভাবতেই পারোনি।

কী ভুল, কী ভুল! তাহলে আমাদের ছটি সন্তান? তারা এলো কী করে?

দ্যাখো, সন্তান উৎপাদনের জন্য ভালোবাসার প্রয়োজন, তোমায় কে বলল? তুমি আমার সঙ্গে দিনযাপন করেছ কেবল, আমাকে হয়তো ব্যস্ত রেখেছ সন্তানের পর সন্তান দিয়ে। আমি তাদেরকে নিয়ে সময় কাটিয়েছি, তাদেরকে বড় করেছি। তুমি রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থেকেছ, তোমার লক্ষ্য আমি জানতাম, আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলাম, তুমি প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর বক্তৃতা লিখে দিতে, কিন্তু তোমার স্পষ্ট লক্ষ্য ছিল একদিন ওই পদে নিজে দাঁড়ানোর। কেন নয়? আমার তো এক সময় মনে হতো, আমি যদি সাবেক প্রেসিডেন্টের ভাইয়ের মেয়ে না হতাম তাহলে কি তুমি আমাকে বিয়ে করতে? আমি নিশ্চিত নই, হয়তো করতে না।

তুমি আগেও কঠিন করে কথা বলতে, এখনো বলছ, মানুষ তো বদলায়, বদলায় না?

না, মানুষ বদলায় না। মানুষ যা, মানুষ তাই-ই।

হ্যাঁ, আমি প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছিলাম, কেন তাতে কি কোনো অন্যায় ছিল?

না, তাতে আমি কোনোই অন্যায় দেখিনি। কিন্তু আমি ভীতি বোধ করতাম তোমাকে নিয়ে, যদি তুমি না পারো? তাহলে কী হবে? তোমার যখন দুরারোগ্য পোলিও ধরা পড়ল, যখন তোমার হাঁটাচলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো, তখন আমি প্রতিদিন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতাম, যেন তিনি তোমাকে এই শাস্তি না দেন। যেন তিনি তোমাকে অন্তত প্রেসিডেন্ট হওয়া পর্যন্ত রোগমুক্ত রাখেন। কিন্তু তা হয়নি, মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তোমার পা দুটো অচল হলো, ডাক্তার তোমাকে লোহার খাঁচা বানিয়ে দিলেন, তুমি প্রতিদিন সকালে উঠে ওই বারান্দা থেকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সদর দরোজা পর্যন্ত যাওয়ার চেষ্টা করতে, সে সময় তুমি প্রচন্ড ঘেমে যেতে, আমার মনে হতো, এরকম কষ্ট করে তোমার না আবার অন্য কোনো সমস্যা হয়। হলোও তাই, তোমার হৃদরোগ ধরা পড়ল, প্রেসার চড়ে যেত হঠাৎ হঠাৎ। তুমি নিষেধ শুনতে না, তুমি তোমার মতো জীবন কাটাতে। দিনে অন্তত ত্রিশ থেকে চল্লিশ শলা সিগারেট পান করতে তুমি। আর…

আর কী? থামলে কেন? বলো? শুনতে ভালো লাগছে।

এবার হয়তো শুনতে ভালো নাও লাগতে পারে। তারপরও বলছি, তুমি তোমার ওই অবস্থাতেও আমার সোস্যাল সেক্রেটারি লুসি মার্সারের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছ। আমি বাচ্চা সামলে, তোমাকে নিয়মিত দেখাশুনা করেও তোমার মন পাইনি, কারণ তোমার মনটা তখন লুসির কাছে। আমার মনে আছে, আমি তখন আবারো অন্তঃসত্ত্বা। তুমি ইংল্যান্ড গিয়েছিলে। ফিরে এসেছ। আমি তোমার কাপড় গুছিয়ে তুলছি। তার ভেতর থেকে হঠাৎই একগাদা চিঠি বেরুল। কৌতূহলবশতই পড়লাম, প্রতিটি লাইন পড়ছি আর চমকে চমকে উঠছি। আমার তলপেটে বাচ্চাটাই আঘাত করছে নাকি তোমার চিঠির ভাষা, বলতে পারব না। আমি পড়তে পড়তে বসে পড়েছি। এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তোমার সঙ্গে আর নয়। এখানেই ইতি। আমি জানিয়েছি তোমাকে সে রাতে। তুমি অস্বীকার করোনি। তুমি সত্য গোপন করতে পারতে না। তুমি আমাকে অনুরোধ করেছ, থাকতে। আমি যাবই। তুমি নিশ্চয়ই তোমার মাকে এর মধ্যে টেনে এনেছিলেন, তিনিই আমাকে থামিয়েছে। বলেছেন, তোমার রাজনৈতিক জীবন এত বড় স্ক্যান্ডালের চাপ নিতে পারবে না, তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি থেকে গেছি। তুমি তোমার মায়ের সামনে আমাকে কথা দিয়েছিলে, লুসির সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখবে না। ভেবেছি, তোমার মায়ের মতো শক্ত ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়িয়ে তুমি হয়তো মিথ্যে বলছ না। তোমার মা, আমাকে আমার জীবন পালন করতে দেননি কোনোদিন, তা নিয়ে আমার ক্ষোভ নেই কোনো, কিন্তু সেদিন তোমার মাকে আমার মনে হয়েছিল, ভদ্রমহিলা সত্যিই ক্ষমতাধর।

হ্যাঁ, কথা দিয়েছিলাম। ধন্যবাদ তোমাকে আমায় ছেড়ে না যাওয়ার জন্য। আমি তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারতাম না, সত্যিই বলছি।

কিন্তু কথা রাখনি। রেখেছ? আমি জেনেছি, তুমি কথা রাখনি। তুমি প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর মিসেস পল জনসন নামে যে নারী গোপনে তোমাকে অভিনন্দন জানাতে এসেছিল সে আর কেউ নয়, লুসি। তাই নয়? বলো তুমি?

তুমি কি এখনো আমাকে জেরা করবে? চলো না অন্য গল্প করি? কত গল্প জমে আছে তোমার সঙ্গে আমার।

নিশ্চয়ই, এখন তো গল্প করবই, চুপ করে থাকার তো আর প্রয়োজন নেই। আমরা দুজনেই চুপ করে থাকার দিন ফেলে এসেছি।

আমার প্রথম প্রেসিডেন্সির সময়কালটা কিন্তু বেশ ছিল। কেউ বুঝতেই পারেনি যে, তাদের প্রেসিডেন্ট আসলে হুইল চেয়ারে করে চলাফেরা করে। কোনো প্রেস রিপোর্টও হয়নি এ নিয়ে। জনগণের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, সত্যিই।

সে তো হওয়াই উচিত। একবার-দুবার নয়, চারবার তোমাকে তারা প্রেসিডেন্ট হিসেবে ম্যান্ডেট দিয়েছে। তুমিও তাদের জন্য কম করোনি। জাতির ইতিহাসে তুমি একজন নির্মাণকারী হিসেবে চিহ্নিত, জানো তো?

সত্যিই, তুমি তাই মনে করো?

দ্যাখো, তোমার সঙ্গে আমার সমস্যাটি অন্য জায়গায়, ব্যক্তিগত, সেখানে সমষ্টির কোনো স্থান নেই। সমষ্টির জন্য তোমার কাজগুলো সত্যিই প্রশংসনীয়। তুমি কাজ বুঝতে, তুমি রাজনীতি বুঝতে, বুঝতে পৃথিবীকে।

রাজনীতি তুমিও কিছু কম বুঝতে না। ফার্স্ট লেডি পদটিকে তুমি বদলে দিয়েছ, তুমিই মানুষকে বুঝতে শিখিয়েছ, এই পদটি কোনো আলংকারিক পদ নয়, বরং এই পদে থেকেও মানুষের জন্য করার অনেককিছু আছে। আমার অবাক লাগত, জানো, যখন তুমি প্রেস কনফারেন্স করতে, রাজনীতি নিয়ে আমার সঙ্গে তর্ক করতে, আমার সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে। আমি তোমার সঙ্গে কথা বলাটা খুউব আনন্দ নিয়ে উপভোগ করতাম।

আমি অবশ্য সেটা টের পাইনি কোনোদিন। বরং মনে হতো, তুমি সমালোচনা সহ্য করতে পারো না। তুমি বিরক্ত হতে খুউব। আমি তোমার অর্থনৈতিক সংস্কার মানতে পারিনি, মানতে পারিনি ত্রিশের দশকের মন্দা কাটানো দেশটাকে তুমি যেভাবে প্রস্ত্তত করছিলে যুদ্ধনীতির ওপর, সেটা। তুমি আমার কাছে গোপন করেছিলে; কিন্তু আমি ঠিকই জানতে পেরেছিলাম প্রজেক্ট ম্যানহাটনের কথা, তুমি পরমাণু বোমা তৈরি করাচ্ছিলে। আমি অসমর্থ রাগে ক্ষিপ্ত হতাম, তোমার সঙ্গে বিনা কারণে তর্ক করতাম। কিন্তু তুমি শান্ত, অতলান্তিক সাগরের মতো থাকতে।

ভুল জানো, আমার ভেতরটা কখনো দ্যাখোনি তুমি। আমি ভেতরে ভেতরে অস্বস্তিতে ভুগতাম, নিজের শরীরের অসামর্থ্য নিয়ে, সারাক্ষণ লোহার খাঁচার ভেতর থাকতে, যার ওপর ভর দিয়ে আমাকে দাঁড়াতে হতো মানুষের সামনে। আমার হুইল চেয়ার, আমার সমালোচকদের করুণাদৃষ্টি, আমাকে প্রতিক্ষণ হত্যা করত, তুমি বুঝতে না সেটা। তুমি কোনোদিন বুঝতে চাওনি। তুমি স্বার্থপর ছিলে বেশ।

আমি স্বার্থপর ছিলাম? হবে হয়তো। নিজেকে আমি এখনো চিনতে পারিনি আসলে। নিজেকে চেনা যায় না, গেলে হয়তো বুঝতে পারতাম যে, আমি আসলে পৃথিবীকে কেমন দেখতে চেয়েছিলাম। আমি মানুষের অধিকারে বিশ্বাসী, মানুষকে খর্ব করায় নয়। আমি সবার জন্য বাসযোগ্য একটি পৃথিবীকে চেয়েছি, আমি নারী-পুরুষ সমান অধিকার চেয়েছি, নারীর ভোটের অধিকার চেয়েছি। এবং এগুলোই আমার লেখার বিষয় ছিল, বলার বিষয় ছিল। কিন্তু বারবার আমি হোঁচট খেয়েছি এটা ভেবে যে, যে-মানুষটির সঙ্গে আমি বসবাস করি, যিনি আমার সন্তানের পিতা, যার তুলনায় ক্ষমতাধর আর কেউ তখনকার পৃথিবীতে ছিল না, সেই মানুষটিকে আমি এই সমকক্ষতার বিষয়টি বোঝাতে পারিনি। সেই মানুষটি আমাকে বুঝতে চায়নি, তার ধারণা ছিল, আমি আসলে নারীবাদী। তুমিই আমাকে কথাটি বলেছিলে এবং আমি মেনে নিয়ে সে-পরিচয়েই পরিচিত হতে আপত্তি করিনি। এর আগ পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল, পুরুষ নারীর তুলনায় সবদিক দিয়েই ওপরে, কিন্তু ক্রমশ আমি দেখেছি সেটা সত্য নয়। কিন্তু সেই সত্য আবিষ্কারে তুমি আমাকে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছ, আমার পুরুষ চেনার শুরু ও শেষ তুমিই।

তুমি নারীবাদী ছিলে না? তোমার সেই বন্ধুরা ন্যান্সি, ম্যারিয়ন, লরেনা, ফ্রান্সিস, প্রত্যেকেই একেকটা সাক্ষাৎ নারীবাদী।

আমি জানি তুমি তাদেরকে পছন্দ করতে না। তুমি ওদের কাউকে কাউকে ‘শি-মেল’ বলে সমালোচনা করেছ বলেও আমি জানি। কিন্তু তুমি ভুলে যাচ্ছ, তোমার পৃথিবীতে আঘাত পেয়ে আমি আরেক পৃথিবীতে গেছি, ভাগ্যক্রমে সে-পৃথিবী মানুষের, এর চেয়ে খারাপ কিছুও হতে পারত। দ্যাখো, আমার মাকে দেখেছি আমি খুউব ছোট্ট বয়সে, সেজেগুজে পার্টি করাই ছিল তার জীবন, ডিপথেরিয়া হয়ে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। আর বাবা মদ্যপান করতে করতে শেষ পর্যন্ত নিজেকেই শেষ করে দিলেন। আমি তখন আমাদের দেশের সংস্কৃতিতে পুরুষের বহুগামী চরিত্র দেখে দেখে তিক্ত হয়ে উঠেছিলাম। তার ওপর তুমি, একেবারে পাশের মানুষটিও সেই দলে যখন যোগ দিয়েছিল তখন আমার আর দাঁড়ানোর জায়গা ছিল না। তুমি আমাকে নারীবাদী বলে গাল দিলেও, আমি আসলে ছিলাম মানুষবাদী। তুমি ব্যাপারটি পছন্দ করোনি, আর তাই আমার সমালোচকরা আমাকে সেজন্য গাল দিয়েছে, অনেক সময় সীমা ছাড়িয়ে আমার সেই নারী বন্ধুদের সঙ্গে আমার অনৈতিক সম্পর্কের খবর খুঁজেছে। আহ্ আমি ক্লান্ত, ক্লান্ত খুউব।

সেসব তো পেছনে পড়ে আছে, তুমি ভাবছ কেন? তোমার মহাযুদ্ধের স্মৃতি আছে?

তুমি মহাযুদ্ধের স্মৃতির কথা বলছ? আমি ভেতরে ভেতরে কতগুলো মহাযুদ্ধ করেছি বলতে পারব না। আমার ভেতরে প্রশ্ন জেগেছে, আসলে তুমি কি ইচ্ছে করেই মহাযুদ্ধে জড়িয়েছিলে কিনা? মাত্র ত্রিশের মন্দা কাটিয়ে দাঁড়িয়েছি আমরা, তোমার প্রিয় নৌবাহিনী একের পর এক যুদ্ধজাহাজ তৈরি করেছে, তোমার সংগ্রহে তখন ব্যাপক যুদ্ধাস্ত্র, ইউরোপ তখন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে, মহাসাগরের ওপারে বলে এই যুদ্ধে তুমি নেই। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন আরো ক্ষমতা চাইছে দেশে দেশে, যদিও একেবারে ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা তার। ঠিক সে সময় তুমি মহাযুদ্ধে না জড়ালেও পারতে।

না, পারতাম না। তুমি পার্ল হারবারে জাপানি আক্রমণের কথা ভুলে গেছ।

না, ভুলিনি, কিন্তু আমি এ-ও ভুলিনি যে, জাপানকে এই আক্রমণের জন্য কীভাবে উস্কে দেওয়া হয়েছিল। তোমার নজর ছিল প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে, তুমি নৌবাহিনী নিয়ে সেদিকে আগাতে চেয়েছিলে এবং পার্ল হারবারে জাপানি আক্রমণ সে-সুযোগ দিয়েছিল। তুমি    যে-কোনো ছুতোয় এই মহাযুদ্ধে জড়াতে, তাতে তোমার স্বার্থ ছিল, পার্ল হারবারের আক্রমণ সেটা যৌক্তিক করেছিল কেবল। কি তাই না?

তুমি বড্ড তর্ক করতে ভালোবাসো, এখনো।

তর্ক করাটা কি খারাপ?

না খারাপ নয়, কিন্তু তোমার কি মনে নেই, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের স্বপ্নকে আমি কীভাবে লালন করতাম?

হ্যাঁ, খুউব মনে আছে। সেজন্য তোমার অনেক অন্যায়কে আমি ক্ষমা করতে পারি, করেওছি।

অন্যায়? কী অন্যায়? কাকে তুমি অন্যায় বলবে?

সেক্রেটারির সঙ্গে অনৈতিক প্রেম, একই সঙ্গে কয়েক নারীতে আসক্ত হওয়া, মনের ভেতর গোপন যুদ্ধবাদ পোষণ করা এবং সে-লক্ষ্যে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, তুমি জানতে যে, এই যুদ্ধে আমাদের দেশের বড় কোনো ক্ষতি হবে না, সৈন্যদের আত্মাহুতি দেওয়া ছাড়া। কারণ মহাসমুদ্রের এপারে আসতে ওদের সময় লাগবে ঢের, এভাবে চেপে ধরলে ইউরোপের ওই যুদ্ধবাজ নেতাকে ঠিকই কাবু করা যাবে – এসবই আমার কাছে অন্যায়। তুমি হয়তো মনে করো না।

না, আমি মনে করি না, বিশেষ করে মহাযুদ্ধে জড়ানোটা অন্যায় নয় মোটেই। কারণ একটি ধ্বংসের ভেতর থেকেই আরেকটি কঠিন সত্য দাঁড়াতে পারে, তুমি স্বীকার করবে সেটা? এই মহাযুদ্ধ না হলে আমরা শক্তিশালী রাষ্ট্রপুঞ্জ পেতাম না, পেতাম না শক্তিময়তা।

তাহলে বলো, তুমি শক্তি চেয়েছিলে। তুমি সেনাবাহিনীকে দেশের মানুষের সামনে মহিমান্বিত করতে চেয়েছিলে, তুমি সফল হয়েছ, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই।

কেন, আমি সফল হইনি রাষ্ট্রপুঞ্জ গড়তে?

হয়েছ, অবশ্যই হয়েছ।

তোমার মনে আছে, কী অসম্ভব শারীরিক কষ্ট নিয়েই না আমি গিয়েছিলাম তেহরান সম্মেলনে। কাসাব্লাঙ্কা পর্যন্ত জাহাজে চেপে গিয়েছিলাম, আমার জন্য নৌবাহিনীর জাহাজে বাথটাব বানানো হয়েছিল, এর আগ পর্যন্ত নৌবাহিনীর জাহাজে বাথটাব থাকত না, আমার তো দাঁড়িয়ে স্নান করার সামর্থ্য ছিল না। কাসাব্লাঙ্কা থেকে তেহরান, এই দীর্ঘ বিমান ভ্রমণও কষ্টকর ছিল আমার জন্য। কিন্তু আমি গিয়েছি। আমি হাত মিলিয়েছি স্তালিনের সঙ্গে, সে-সময় এর প্রয়োজনীয়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। চার্চিল চাননি সেটা, তিনি কথায় কথায় আঘাত করতেন স্তালিনকে। ওদের দু’জনের মধ্যে উত্তেজনা আমাকে থামাতে হয়েছে। আমি গভীরভাবে ভেবে দেখেছি, এই যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার না করে তাহলে এই যুদ্ধে আমাদের পরাজয় ঠেকানো যাবে না। এবং স্তালিন সেটা প্রমাণ করেছেন, তার কারণেই এই যুদ্ধ জয় করা সম্ভব হয়েছে। আমি বলেছি সে-কথা স্পষ্ট করেই। আমার এ-ও মনে হয়েছে, জাতিসংঘের

মতো শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে হলে সোভিয়েত নেতৃত্বের সঙ্গে আমাদের সদ্ভাব রাখতেই হবে। কিন্তু চার্চিল সেটা চাননি, তিনি সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নকে মেনে নিতে পারতেন না, কোনোভাবেই।

দ্যাখো, সে-সময়কার রাজনীতি নিয়ে তুমি অনেক ভালো বুঝতে, সেটা আমি তোমাকে বলেছিও। কিন্তু চার্চিলের চাওয়ার নিশ্চয়ই কোনো কারণ ছিল? ছিল না?

নিশ্চয়ই ছিল, সমাজতন্ত্র জনপ্রিয় হলে চার্চিলের সাম্রাজ্যবাদ শেষ হয়ে যাবে, ক্ষুদ্র ইংল্যান্ডের পৃথিবী শাসনের অবসান ঘটবে, এটাই ছিল মূল কারণ। কিন্তু সেটা ছাড়াও ব্যক্তিগতভাবেই চার্চিল স্তালিনকে পছন্দ করতেন না। কটাক্ষ করতেন কথায় কথায়। স্তালিনও বেশ উগ্র মেজাজের মানুষ, তিনিও খোঁচা দিতেন। মাঝখানে আমি অনেক মাথা ঠান্ডা রেখে হিসাব-নিকাশ করে কথা বলতাম। বেশি উত্তেজনা দেখলে বলতাম, আপনারা উত্তেজনাকর আলোচনা শেষ করুন, তারপর আমাকে ডাকবেন, আমি এসে শান্তির কথা বলব। কাজ হতো জানো? দুজনেই কথা শুনতেন।

তোমার তো সম্মোহনী ক্ষমতা ছিল মানুষকে দিয়ে কথা শোনানোর। তুমি তো পেরেছ, সবাইকে বশ করতে।

কই আর পেরেছি, তোমাকে পেরেছি?

আমি তোমার কথা শুনিনি, আমি আমার কথা শুনেছি। আমি তোমাকে তোমার মতো, তোমার পৃথিবীতে থাকতে দিয়ে সরে গেছি, দূরে। ব্যস্ত হয়ে গেছি নিজের কাজ নিয়ে, লেখালেখি নিয়ে, আমার উদ্দেশ্য নিয়ে। তুমি যখন তেহরান সম্মেলন থেকে ফিরে এসেছ তখন সারা পৃথিবীতে তোমার নাম-ডাক ছড়িয়ে পড়েছে, সবাই ধন্য ধন্য করছে। আমি সারাদেশে তোমার এই সাফল্য নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি, মহাযুদ্ধের সেই ভয়ংকর সময়ে এটা আমার দায়িত্ব বলে মনে করেছি। তোমাকে যতটা অপছন্দ করেছি, তোমার কাজকে আমি ততটা অপছন্দ করতে পারিনি। কিন্তু আমার ভেতরে সারাক্ষণ এ প্রশ্নটি ছিল জানো, যে-মানুষ এরকম শান্তির কথা বলে, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে, সে-মানুষটিই আবার কী করে পরমাণু বোমা বানানোর জন্য এত বিশাল অর্থ খরচ করে? আমি মেলাতে পারি না।

তুমি বুঝবে না, পৃথিবীতে এটার প্রয়োজন ছিল, না হলে পৃথিবীকে দমানো যেত না। মানুষকে ভীত করার চেয়ে বড় কোনো অস্ত্র নেই, মানুষ যখনই ভীত হয় তখনই কেবল শান্ত থাকে, না হলে যে অস্থিরতা শুরু হতো তাতে হয়তো আমি না করলেও এমন কোথাও পারমাণবিক বোমা তৈরি হতো, যা হতো পৃথিবীর জন্য ভয়ংকর। দুর্জনের হাতে ক্ষমতা গেলে তার অপব্যবহারের সুযোগও তৈরি হয়।

তুমি বাকি পৃথিবীকে দুর্জন মনে করো?

তুমি বাজে তর্ক করতে পছন্দ করো। মজার ব্যাপার কি জানো? তেহরানে আমাদের সঙ্গে চায়নিজ লিডার চিয়াং কাইশেকও ছিলেন; কিন্তু কেউ সে-কথা জানত না। কোনোদিন প্রকাশও হয়নি সেটা।

কে বলল প্রকাশ হয়নি? মানুষ সেটা জেনেও না জানার ভান করেছে। আমি জানি না তোমাদের ইয়াল্টা সম্মেলনে কাইশেক ছিলেন কিনা।

সেটা আমি তোমাকে এখনো বলবো না। তবে ইয়াল্টা সম্মেলনে গিয়ে মনে হয়েছিল, এখান থেকে আমি আর ফিরে যেতে পারব না। সতেরো ঘণ্টার বিমান ভ্রমণ আমাকে এতটাই কাবু করে ফেলেছিল যে, আমার শরীরকে মনে হচ্ছিল এ আমার নয়, অন্য কারো। তোমাকে বোঝাতে পারব না, সে কষ্টের কথা। আমি শুয়ে শুয়ে নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি, ভাবতে পারো? কেবল ব্রেকফাস্ট টেবিলে আমি ভালো থাকতাম আর তখনকার ছবিই যেত মিডিয়ায়। বাকিটা সময় আমি মৃতের মতো পড়ে থাকতাম বিছানায়। এর মধ্যেই স্তালিন আর চার্চিলের মধ্যে ধুন্ধুমার কান্ড বেধে গেল। যুদ্ধের পর ইউরোপের দখলদারিত্ব কার হাতে যাবে তা নিয়ে দ্বন্দ্ব, আমি সে-দ্বন্দ্বে থাকতে চাইনি।  স্তালিন নিশ্চয়ই পূর্ব ইউরোপের দখল ছাড়তে চাইবেন না, সে-কথা ভেবে তাকে পশ্চিম ইউরোপে ঢুকতেই দেওয়া হবে না, এটাই চার্চিলের মতামত। বার্লিন পর্যন্ত গিয়েই যেন রেড আর্মি থেমে যায়, এরপর যেন আর না এগোয় সেটা নিশ্চিত করার জন্য চার্চিল আমাকে চাপ দিচ্ছিলেন। আর স্তালিন তার গমগমে গলায় কেবলই বলছেন, যুদ্ধকে যুদ্ধের মতো এগোতে দিন, একে নির্দেশনা দেবেন না, তাতে ফল ভালো হবে না। দুজনে সে কি বিতর্ক, আমাকে আবারো বলতে হলো, আপনারা যখন ইউরোপ জয় শেষ করবেন তখন আমাকে জানাবেন, আমি পৃথিবীর কথা বলতে এসেছি। কাজ হলো, জানো? মনে হলো দুজনেই চুপ হয়ে গেলেন।

আমি অবশ্য ভেবে পাই না যে, এরকম দখলদারিত্বের মনোভাব নিয়ে মানুষ রাষ্ট্র চালায় কী করে? একটি দেশকে দখল করার কত বিশাল পরিণাম হতে পারে সেটা কেন তারা ভাবেননি, বলো তো?

দ্যাখো, পৃথিবী তখন কেবল রাজা-প্রজা সম্পর্ক থেকে বেরুতে শুরু করেছে। শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাছবিচার করা শেখেনি, এমনকি এটাকে অন্যায় বলেও মানতে শেখেনি। নিশ্চয়ই সেটা পরে বদলাবে, বদলেছেও হয়তো, কি বদলায়নি?

ঘোড়ার ডিম বদলেছে। কিছুই বদলায়নি। পৃথিবীতে আরো নতুন নতুন দখলদারির ঘটনা ঘটেছে। তুমি ঠেকাতে পারোনি সেটা, চাওনি আসলে, তাই না?

বাদ দাও, ইয়াল্টা থেকে ফিরেই আমি ব্যস্ত হয়ে গেলাম অনেক, কত কাজ। মহাযুদ্ধ শেষ হলে অর্থনীতি কেমন হবে? কেমন হবে শিল্পনীতি, এসব নিয়ে তখনকার ব্যস্ততা তোমার মনে আছে?

মনে থাকবে না কেন? আমি কিছুই ভুলিনি, ভুলব কেমন করে? আমি যার অংশ, তা ভোলাটা কি খুব সোজা?

কিন্তু আমার শরীর ক্রমশ খারাপ হতে থাকল। আমার ডাক্তার আমাকে কিছু জানায় না, ডাক্তার আমার বন্ধু, স্মিড। নিজে নিজেই চিকিৎসা করে। কিন্তু একবার বেথেসডা হাসপাতালের এক ডাক্তার আমাকে দেখলেন এবং বললেন, একটি মুহূর্তও আর নষ্ট করা যাবে না, পুরোপুরি বিশ্রাম নিতে হবে আমাকে। আমি চলে গেলাম হাই পার্কের বাড়িতে। তুমি এলে না। তোমার তখন কত ব্যস্ততা। তুমি আসতে চাইলে না।

একদম সত্যি নয়, তুমিই চাওনি আমি যাই। আর কেন চাওনি, তার কারণও আমি পরে জেনেছি। তুমি আমাদের বড় মেয়ে আনাকে নিয়ে চলে গেলে। সেই-ই তখন তোমার দেখাশোনা করে। আমি ভেবেছি, ঠিক আছে, তুমি ওর সঙ্গেই ভালো থাকবে। আমার সামনে তুমি ঠিক সহজ হতে পারো না। মন খুলে কথা বলতে পারো না, তুমি হাসো না অথচ আমি দূর থেকে শুনতে পাই তুমি সেক্রেটারিদের সঙ্গে, অন্য নারীদের সঙ্গে কি দরাজ গলায় হেসে উঠছ, ওদের সঙ্গে খুনসুটি করছ, আমি সামনে থাকলেই সব কেমন চুপচাপ। আমি তোমার কোনো আনন্দ নষ্ট করতে চাইনি। তাছাড়া আমাদের মধ্যে কোনো ধরনের সম্পর্ক কি আসলে ছিল? আমরা বিছানা বদলেছিলাম কত আগে সে-কথা কি তুমিও মনে করতে পারো?

তুমি যাওনি, সেটাই সত্য। আমি সেখানে থেকে কাজ করছি দিন-রাত, দেশের জন্য, পৃথিবীর জন্য।

না, সেখানে তুমি আরো একটা কাজ করেছ, এখনো সেটা গোপন করে যাচ্ছ। তুমি সেখানে গোপনে লুসির সঙ্গে দেখা করতে। লুসির তখন ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল। আমাদের মেয়ে আনাই লুসিকে তোমার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ করে দিত, ভাবত তুমি হয়তো এতে ভালো থাকবে। আমি মাত্র কদিন আগেই সেটা জেনেছি। কেন বলো তো? কী ছিল লুসির মধ্যে? ও অনেক সুন্দরী, অন্তত আমার তুলনায়, সেটা আমি জানি। কিন্তু কেবল সৌন্দর্যই কি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারে? তাহলে সুন্দরী মেয়েদের স্বামীরা কেন অন্য মেয়েতে আসক্ত হয়? আমি এখনো ঠিক বুঝতে পারি না ব্যাপারটা, আমি অন্য অনেক কিছুই বুঝি, মানবাধিকার বুঝি, নারীর অধিকার বুঝি কিন্তু সম্পর্কের এই জটিল রসায়ন আমি ধরতে পারি না। তুমি লুসির সঙ্গে গল্প করে আনন্দ পেতে, ওর সঙ্গ তোমাকে ভালোলাগায় ভরিয়ে দিত, আনা আমাকে পরে বলেছে। আমি কষ্ট পেয়েছি খুউব, কিন্তু কিছু করার তো ছিল না তখন। আমার অবশ্য কখনই কিছু করার ছিল না, তাই আমি আমার জগৎটাকেই তোমার থেকে আলাদা করে ফেলেছিলাম।

তোমার জগতে তো তুমি জয়িতা, তুমি যা যা চেয়েছ করতে পেরেছ।

পেরেছি, তুমি চলে আসার পর। তুমি থাকলে হয়তো পারতাম না।

তার মানে আমাকে তুমি তোমার কাজের জন্য বাধা মনে করতে? অথচ দ্যাখো, আমি তখন কত বড় দ্বিধা নিয়ে, শরীরের অসম্ভব কষ্ট নিয়ে দিন কাটাচ্ছি।

সেটা আমি দেখেছি, আমি জানতে পেরেছিলাম যে, পরমাণু বোমা তৈরি হয়েছে ঠিকই; কিন্তু সেটা ব্যবহারের কোনো ক্ষেত্র খুঁজে পাচ্ছ না তুমি। তুমি সেটা ব্যবহারের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছ। প্রশান্ত মহাসাগর দখল করার জন্য তোমার নৌবাহিনী তখন তুমুল আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। তোমাকে আমার তখন অস্থির লাগত খুউব, তুমি প্রচন্ড অস্থিরতায় ভুগতে, কেবল শারীরিক নয়, মানসিকও। তুমি এই চাপ নিতে পারোনি। নিতে পারনি বলেই হঠাৎ চলে গেলে। জর্জিয়ার ওই বাড়িতেও তখন লুসি ছিল তোমার চলে যাওয়ার সময়। আমি ছিলাম না। আমি খবর পেয়ে যখন এসেছি, যখন ঢুকছি বাড়িতে, তখন লুসিকে বেরিয়ে যেতে দেখে আমার মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল। আমি তখন তোমাকে খুন করতে পারতাম, জানো?

আমি তো তখন খুনের ঊর্ধ্বে চলে গেছি। আচ্ছা জানো, আমার ভেতর একটা প্রশ্ন আছে, আমাকে কি বিষ খাওয়ানো হতো? তুমি কি জানতে কিছু?

কী বলছ এসব? আমাকে কি তোমার এত ক্ষুদ্র কখনো মনে হয়েছে?

নাহ্ হয়নি বলেই তো আমি জানতে চাইছি। স্তালিন আমার মৃত্যুর পর তার অ্যাম্বাসাডরকে পাঠিয়েছিলেন আমার মৃতদেহ দেখার জন্য, তুমি তাকে আমার মৃতদেহের কাছে ঘেঁষতে দাওনি। তার বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও আমার শরীর দেখার সুযোগ দাওনি তুমি তাকে, কেন? স্তালিনের সন্দেহ ছিল    চার্চিল-গ্যাঙ আমাকে হত্যা করেছে বিষপ্রয়োগ করে। আমার শরীর বেশি খারাপ হওয়ার পর আমাকে সে-কথা স্তালিন  সরাসরি জিজ্ঞেসও করেছে, আমি ভেবেছি, সেনাবাহিনীর মানুষ, গণতন্ত্র বোঝে না, কেবলই মানুষকে সন্দেহ করে। কিন্তু আমার মৃত্যুর পর আমাদের ছেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিন্তু স্তালিন এ-প্রশ্ন তুলেছিলেন, ছেলেকে বলেছিলেন, তোমার কাছে বিষয়টা জানতে। ও কখনো জানতে চেয়েছে তোমার  কাছে কিছু?

না, সে সাহস ওর হয়নি হয়তো। কখনো কিছুই বলেনি। দ্যাখো, আমি কোনো সন্দেহকেই পাত্তা দিতে চাই না যে-সন্দেহ আমাকে তাড়িত করেছে জীবনভর সেরকম কিংবা তার চেয়েও ভয়ংকর কোনো সন্দেহ পৃথিবীকে তাড়িত করুক, সেটা আমি চাইনি। তোমাকে শান্তিতে থাকতে দিতে চেয়েছি, নিজে শান্তি থাকতে চেয়েছি এবং চেয়েছি দেশ ও পৃথিবীর মানুষকে শান্তিতে রাখতে। তুমিও এটাই চাইতে।

নিশ্চয়ই ঠিক কাজ করেছ। আমার মৃত্যুর পর ১৭ বছর কেমন কাটল আমাকে ছাড়া?

তোমারই বানানো পরমাণু বোমা জাপানে পরীক্ষা করা হলো অথচ দ্যাখো, যুদ্ধ কিন্তু থেমেই গিয়েছিল, বার্লিনের পতনের পর এই যুদ্ধের আর কোনো প্রয়োজন ছিল না, তুমি এপ্রিলে চলে গেলে, মে মাসেই বার্লিনের দখল এলো। তারপর খন্ড খন্ডভাবে ইউরোপে যুদ্ধ চলছিল ঠিকই; কিন্তু আগস্ট মাসের ৬ তারিখে হিরোশিমা শহরে বোমা ফেলে জাপানকে কী শিক্ষা দিতে হলো, আমি কোনোদিনই বুঝতে পারিনি। স্তালিন কিন্তু তোমাকে দেওয়া কথা রেখেছিলেন, তিনি বার্লিন থেকে এগোননি আর। এমনকি সানফ্রান্সিসকোতে জাতিসংঘের যে-সম্মেলন হলো, সেখানেও প্রধানমন্ত্রী মোলাতভকে পাঠিয়েছিলেন। নিরাপত্তা পরিষদ সেখানেই গঠন হলো। তুমি যা চেয়েছ পেয়েছ, এমনকি তোমার মৃত্যুও তোমার চাওয়াগুলোকে অপূর্ণ রাখতে পারেনি। তুমি সবদিয়েই সার্থক।

তোমার সার্থকতা কি কম? আমি এখান থেকেই জেনেছি যে, তুমি জাতিসংঘে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছ, হিউম্যান রাইটস্ ডিক্লারেশন পাস করিয়েছ। তোমার সাফল্যের তালিকাও দীর্ঘ।

তোমার ছায়ায় ছিলাম, সেজন্যই হয়েছে এসব, তোমার ছায়ার বাইরে বেরুতে পারিনি, দাঁড়াতেও পারিনি। তুমি যে-শক্তি দিয়ে এসেছিলে দেশের মানুষকে, সেই শক্তিতে পৃথিবীতে এখন ক্ষমতার লড়াই করে যাচ্ছে এদেশ। ঠান্ডা যুদ্ধ চলছে পুরোদমে। শান্তি কিন্তু আসেনি।

আর ভেবো না, আমাদের যা করার ছিল আমরা করেছি, বাকিটা যারা আছে তাদের বোধ-বুদ্ধি এবং দায়িত্বের ওপর ছেড়ে দাও। দেখি তোমার হাতটা দাও, কতদিন তোমার হাত ধরা হয়নি।

আমার হাত? কখনো ধরতে চাওনি তো? আচ্ছা এই নাও… কিন্তু একি, হাত বাড়াতে পারছি না তো। মাঝখানে এক শক্ত দেয়াল।

তাহলে আমরা কথা বলছি কী করে? আমরা কি তবে কথা বলতেই পারব? ছুঁতে পারব না কেউ কাউকে?

হয়তো তাই, দুটো মানুষ একসঙ্গে আজীবন থেকেও কেউ কাউকে ছুঁতে পারে না, দুটো কবর যেমন পাশাপাশি থাকে, তেমনই বেঁচে থাকাও তাই, একে অপরকে শুনতে পায় ঠিকই; কিন্তু ছুঁতে পারে না।

জীবন কি তবে কবরেরই আরেক রূপ?

জানি না, আমি অত কিছু কি বুঝি? বলো?

 

[নিউইয়র্ক শহর   !⁋ প্রায় ৫০ কি!vমিটার দূ!⁩ হাইড পা!⁋©র একটি বিশাল বাড়ি, পাতা ঝরার কাল চল!⁑,  মধĔযোই যাই কর!⁑, শীত আসি আসি, চারদি!⁋ আগুন ধরা!⁢v রং পাতায় পাতায়, একটু গভীরভা!⁥ কান পাত!ই  vনা যায়  ⁋মন অ”↢ুত শ!⃣ পাতারা পড়!⁑, বিছি!ⁱ আ!⁑ চারদি!⁋, এর  ⁦ত!⁩

[নিউইয়র্ক শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে হাইড পার্কের একটি বিশাল বাড়ি, পাতা ঝরার কাল চলছে, হেমন্ত যাই যাই করছে, শীত আসি আসি, চারদিকে আগুন ধরানো রং পাতায় পাতায়, একটু গভীরভাবে কান পাতলেই শোনা যায় কেমন অদ্ভুত শব্দে পাতারা পড়ছে, বিছিয়ে আছে চারদিকে, এর ভেতরে

ই দুটো কবর পাশাপাশি; তাদের কথোপকথন আরো একটু গভীরতায় গেলে ঠিক শুনতে পাওয়া যায়। এখানে অপরূপ রঙের পাতাদের তলে ফ্রাঙ্কলিন ডিলানো রুজভেল্ট আর ইলিয়ানর রুজভেল্ট শুয়ে আছেন।]