ফকরের বলি

লেখক: আখতার জাহান

জবা আমার বয়সী হইবো। আমার মার লেগা দাওয়াই আনবার গেছিলাম আজিমপুর ডাক্তরখানায়। জবারে আমি চিনবার পারি নাই। দেখি একটা মাইয়া দাওয়াইআলার হাত-পাও ধরতাছে, বাকিতে নেশার সুই দিবার কয়। কান্দন শুরু করলো। চাইরো দিকের মানুষ দেখতাছে আর হাসি-মশকরা করতাছে। কেউ আঁচল ধইরা টানে, কেউ পানির ছিটা দেয়। মাইয়াটা যেই না ঘুরছে, দেইখা আমি তো থম মাইরা গেছি, এইটা আমি কুন জবারে দেখতাছি? কই গেল ওই রূপ, কী লাম্বা চুল, কী গতরের রং আর চেহারাসুরত কিছুই নাই। সব শ্যাষ। আমি কী করুম, মার দাওয়াই লিয়া মাথা নিচা কইরা আয়া পড়ছি। ওইদিন রাইতে হুইবার যায়া আর হুইবার পারি না। সারারাইত ছটপট কইরা কটায়া দিলাম।

আজিমপুর এতিমখানার পিছে জবাগো নিজের বাড়ি আছিলো, দ্যাশের বাড়ি যশোর। পুরা ফ্যামিলি শিক্ষিত। সব বড় বড় পোস্টে চাকরি করে। যশোরে বেশুমার সম্পত্তির মালিক আছিলো। বাড়িতে সবতে অরা গানবাজনা করতো। এক ফুপু তো নামকরা গায়িকা আছিল। আর ফুপা গান লেখতোবি আবার সুরবি করতো। নাম কইলে চিনবার পারবেন।

এই জবার পেয়ার-মহববত হয়া গেল অগো বাড়ির

উল্টাদিকের এক বাড়ির ঢাকাইয়া ছ্যাড়ার লগে। ছ্যাড়ার নাম শরিফ। দোতালার বারেন্দা থেকা চোখাচোখি চিঠি চালাচালি চলে। ছ্যাড়াগো

ট্যাকা-পয়সা আছে। বাপের দুই বউ। দুই ঘরের পোলাপান দিয়া বাড়ি খালি গিজগিজ করে। বাপের শরবতের দোকান। চকবাজারে ঠান্ডা-গরম বইলা কিছু আছিল না। বারো মাস শরবত চলে। চকবাজার সব ওক্তে গরম। মালিক বি গরম, পাইকার বি গরম। ওই শরবতের দোকানে মানুষ লাইন ধইরা শরবত কিনতো। বড় বড় ঠোঙ্গা ভইরা আমদানির ট্যাকা আনতো বাড়িত। শরিফের বাপেরে সবতে রহমত শরবতআলা বইলা এক নামে চিনতো। চাইর-পাঁচটা বাড়ির মালিক আছিলো। মিন্তির মাথায় কইরা দুনিয়ার বাজার আনতো রোজ। পোলাপানগো গলা মিহিত খিলায়াবি মরদানার দিল ভরতো না। কোরবানির ওক্তে সাত গরু কোরবানি দিত। মরদের এতো রোবাব আছিল যে, অর কথার পিষ্টে কথা কওনের হিম্মত কেউর আছিল না। নিজেরেই খালি মানুষ মনে করতো। আর সবতে কিড়া-মাকড়। সাদা লুঙ্গি আর সাদা ব্যাপারী শার্ট পিনতো। বামহাত দিয়া একদিকের লুঙ্গি এক হাঁটুর উপরে উঠায়া যবে হাঁইটা যাইতো, দেখলে ঘিন লাগতো। মুখ তো আছিল না, আছিল ডাসবিন। সব ওক্তে

গাইল লাইগা থাকতো মুখে। এই মরদের পোলা শরিফের লেগা পেয়ার-মহববতে দিওয়ানা হয়া গেল জবা। আল্লাই মালুম, ওই ছ্যাড়ার ভিতরে কী দেখছিল ছেড়ি।

জবার মা-বাপে ট্যার পাইলো, ছাদে, বারেন্দায় ওই অর দিকে খালি তাকায়া থাকে আর ইশারা-বিশারা করে। মইয়ারে বহুত বুঝাইলো। আদর কইরা মাইরা-ধইরা বাপ-চাচায় কত কী কইলো। মাগার এতো বুঝানেও কুনু ফায়দা হইলো না।

 

রহমত শরবতআলা বাইরেত থেকা হুইনা আইছে শরিফের পেয়ার-মহববতের কথা। বাড়িত আয়া বড় বউরে ডাইকা কয় – ‘আই, তেরা বেটা শরিফ বাহুত এজ্জাতকা কাম কাররাহা। বাড়িকা সামনে অপিসার শালা রাহেতানি, ওনোকা ছোটা বেটি হায়নি, ওই খানকিকা বেটিকা সাথে তেরা বেটা মহববাত কারতা। তু কুছ জানতি?’ (ওই, তর পোলা শরিফ বহুত ইজ্জতের কাম করতাছে। বাড়ির সামনে অপিসার হালা থাকে না, অগো ছোট মাইয়া আছে না, ওই খানকির মাইয়ার লগে তর পোলা মহববত করে। তুই কিছু জানছ?)

শরিফের মা জানে না হুইনা কইল – ‘তু কাহাসে জানেগি? তু তো খাতি আর শোনে জানতি। বোলা তেরা বেটাকো। খানকিকা বেটাকা গাড়কা ছাল আজ ওঠা ডালেঙ্গে।’ (তুই কইত্থে জানবি? তুই তো খাইবার আর হুইবার জানছ। ডাক তর পোলারে। খানকির পোলার হোগার ছাল আইজকা উঠায়া ফালামু।)

শরিফের মা কইলো – ‘উ তো ঘারমে হাইনি। আনেসে আপকা পাস ভেজ দেঙ্গে।’ (ওই তো ঘরে নাই। আইলে আপনের কাছে পাঠায়া দিমু।)

রাইতে বড় পোলা সাত্তার বাড়িতে আহনের বাদে অর বড় আম্মা, বাপ যে সব জাইনা গেছে বড় পোলারে সব কইলো। পোলা বাপের ঘরে যায়া ঢুকলো – ‘আববা আপ নিন্দ আগায়ে?’ (আববা আপনে ঘুমায়া গেছেন?)

– ‘নাই তু মেরা সামনে আ। তেরা ছোটানে কেয়া কারিসে? মিসকো মু দেখানেকা লায়েক রাকখিসে? ওই অপিসার শালা, ওনোকা কই আওকাত হায় মেরা সামনে খাড়া হোনেকা? মেরাতারে রোপিয়া ওনোকা হায়? শালা, ওনো মেরা সাথ গোমান দেখাতা।’ (না, তুই আমার সামনে আয়। তর ছোটটা কী করছে? আমার মুখ দেখানের লায়েক রাখছে? ওই অফিসার হালাগো কুনু আওকাত আছে আমার সামনে খাড়ানের? অগো আমার মথন ট্যাকা আছে? হালা, অরা আমার লগে গুমান দেখায়।)

– ‘আববা আপ এতনা সোচিয়ে মাত। সাব ঠিক হো যায়েগা। ম্যায় ছোটাকো সামঝা দেঙ্গে। আববা আপ নিন্দ আইয়ে, ম্যায় যাতে।’ (আববা আপনে এতো সোচ কইরেন না। সব ঠিক হয়া যাইবোগা। আমি ছোটরে বুঝায়া দিমুনে।)

– ‘হা যা, আর তেরা ছোটা আম্মাকো ভেজ দে।’ (হ যা, আর তর ছোট আম্মারে পাঠায়া দে।)

বাপের ঘর থেকা বাইরায়া সাত্তার দেখে শরিফ বারেন্দায় খাড়ায়া। বড় ভাইরে চোখের ইশারায় জিগায় – বাপে কী কইছে। বড়টায় কইল – ‘সোচ মাত, সাব ঠিক হো যায়েগা, ম্যায় হায়নি? বারি ভোরকো আববাকা দেল দেমাগ আচ্ছা রাহেতা, মেরা সাথে

যাকে তু আববাকা পাওমে গেরেগা।’ (চিন্তা করিছ না, সব ঠিক হয়া যাইবো, আমি আছি না। খুব বিহানে আববার মন-মিজাজ ভালা থাকে। আমার সাথে যায়া তুই আববার পায়ে পড়বি।)

বাদের দিন বিহানে শরবতআলার দুই বউ নাস্তা খাওনের ওক্তে কেঠা পানি দিবো, কেঠা আন্ডা ভুনবো হরিপি লাইগা যায়। মাগার রহমত মিয়া চা-টা খাইবো ছোট বউর হাতে। পোলারা জানে অগো ছোট আম্মা সামনে থাকলে বাপের মন-মিজাজ ভালা থাকে। সাত্তার শরিফরে লিয়া বাপের সামনে দুই চটকানা মাইরা কয় – ‘আববাকা পাও পাকাড়কে মাফ মাঙ্গ।’ (আববার পাও ধইরা মাফ চা।)

শরিফ বাপের পাও ধইরা কান্দন শুরু কইরা দিলো। ছোট বউ কইল – ‘আপ রাজি হো যাইয়ে, বেটি লানেসে অফিসার আপকা পাস নিচা হো যায়েগা। আপ লাড়কাকা বাপ।’ (আপনে রাজি হয়া যান। মাইয়া আনলে অপিসার আপনের কাছে নিচা হয়া যাইবো। আপনে পোলার বাপ।)

রহমত শরবতআলা বউর কথা হুইনা খুশি হয়া গেছে। চেয়ার থেকা ফাল দিয়া খাড়ায়া বড় পোলারে কয় – ‘ইবিব রিস্তাকা পায়গাম লেকে মোতাসা ভেজ।’ (অখনি রিস্তা করনের পয়গাম লিয়া মোতাসা পাঠা।)

দুই দিন বাদে রবিবার আছিল, শরিফের বাপে আলাউদ্দিন মিঠাইয়ের দোকানে ফরমাইশ দিয়া এক সের ওজনের এক একটা চমচম, বিশ বাঙে বিশটা চমচম দিয়া মোতাসারে পাঠাইছে জবাগো বাড়ি। মোতাসা তো ফরকাইতে ফরকাইতে মিঠাই লিয়া যায়া হাজির, সোফাসেটে বয়া কয়, ‘জলদি আমার লেগা এক গেলাস লেম্বুর শরবত বানায়া আনেন। আদমণ মিঠাই টাইনা আমি পেরেশান হয়া গেছি। দেখেন কত বড় বড় মিঠাই।’ জবার বাপ-মা হা হয়া তাকায়া রইছে। কী হইতাছে কিছু বুঝবার পারতাছে না। মোতাসা কয়, ‘আপনের মাইয়া তো চান কপাল, রাজরানি হইব। রহমত শরবতআলা আপনের মাইয়ার লগে অর পোলা শরিফের বিয়ার পয়গাম পাঠাইছে।’ এতক্ষণে অরা বুঝবার পারল যে মতলবটা কী। এর বাদে জবার বাপে কইল, ‘আপনি এই মিষ্টি নিয়ে এখনি চলে যান আর উনি ভাবলেন কী করে যে আমি আমার মেয়েকে একটা অশিক্ষিত পরিবারে বিয়ে দেবো।’ মোতাসা কিছু কওনের কোশিশ করছিল, মাগার ইমুন দাবড়ানি দিছে যে মোতাসা বাড়িত থেকা ছুইটা পলাইছে। জবার মায় কইলো, ‘আপনি মিষ্টিগুলো নিয়ে যান।’ জবা তো সামনেই আছিল, খাড়ায়া সবই দেখছে। বাপ কইল, ‘তুমি ভেতরে যাও।’

শরিফ বাড়িতে বয়া রইছে। খোশখবর হুননের লেগা। শরবতআলা বারেন্দায় চেয়ারে বয়া তস্ত্তরিতে চা ঢাইলা ফুরুত ফুরুত কইরা চা খাইতাছে আর টেপরেকডে ইন্ডিয়ান বাহার সিনেমার গান হুনতাছে –

সাইয়া দিলমে আনা রে

আকে ফিরনা যানা রে …

ছাম ছামা ছাম ছাম।

মোতাসা মিঠাইগুলি হেঁচড়াইতে হেঁচড়াইতে লিয়া আয়া বারেন্দায় ধপ কইরা বয়া কান্দন শুরু করছে। রহমত শরবতআলা মিঠাই দেইখাই আন্দাজ কইরা ফালাইছে। চেহেরা লাল অহন শুরু করছে। পোলাপান সবতে এই দরজা ওই দরজা দিয়া ফুচকি দিয়া দেখতাছে। মোতাসা কানতে কানতে কওন শুরু করল, ‘আমার জেন্দেগিতে এত বিয়া লাগাইছি, মাগার এতো বেইজ্জতি কুনুদিন অহি নাই। বড়বড় মানুষ আমারে কত ইজ্জত দেয়।’ এর বাদে জবার বাপে যা কইছে ওইটার লগে বানায়া-চুনায়া কওন শুরু করল। আপনেরা একিন করবেন না, মোতাসার মুখে সব হুইনা এই জাঁহাবাজ মর্দানা কিছুই কইলো না। মোতাসারে পঞ্চাশটা ট্যাকা হাতে দিয়া কইল, এই কথা যিমুন বাইরে ফায়েশ না করে। এক বাঙ মিঠাইবি হাতে দিয়া দিছে। মোতাসা বাড়ির বাইরে আয়া বিড়বিড়ায়া কয়, ‘এতোগুনি মিঠাই টাইনা লিয়া গেলাম আনলাম, দুই বাঙবি দিলো না।’

রহমত শরবতআলা ঘরে যায়া দুই পোলারে ডাকল, সাত্তার আর শরিফ ঘরে ঢুকনের বাদে কইল, ‘দারোজা লাগা।’ (দরজা বন্দ কর।) তারপর শরিফের দিকে তাকায়া কইল, ‘আগার তু মেরা জানাকা বেটা হায়, তো এই ছোগরিকো এই বাড়িকা বউ কারকে দেখাগা। নাইতো তোমোকো তেরা মা সোদ্দা নেকাল দেঙ্গে। আর শোন সাত্তার, তু গাওয়া রাহা।’ (যদি তুই আমার জনমের পোলা হয়া থাকছ, তাইলে এই ছেড়িরে এই বাড়ির বউ কইরা দেখাবি। নাইলে তগো তর মা সুদ্দা বাড়িত থেকা বাইর কইরা দিমু। হুন সাত্তার, তুই সাক্ষী রইলি।)

এর বাদে শরিফগো বাড়ির দোতালার বারেন্দায় শরিফ আর আইত না। জবার বাপ-মায় বহুত খুশি। দিলে সুকুন পাইছে, জবার বাপে কয়, ‘একটা ব্যাপার দেখেছ জবার মা, ওরা কী রকম চুপ হয়ে গেছে।’ মাগার মাইয়া যে তলে তলে ছ্যাড়ার লগে লাইন ঠিকই রাখছে। ওইটা অর বাপ-মায় বুঝবার পারে নাই। কলেজের সামনে অগো হররোজ মোলাকাত হইতাছে। সাহেলির হাত দিয়া চিঠিবি দিতাছে।

একদিন দেখা গেল সাম হয়া গেছে তাবিবি জবা কলেজ থেকা ফিরা আহে নাই। মার ভিতর হুহু কইরা উঠতাছে। মাইয়ার ঘরে যায়া দেখে, ছেড়ি একটা কাগজে লেইখা গেছে, – ‘মা আমাকে খোঁজার চেষ্টা করো না। আমার নির্বাচিত পথে আমাকে যেতে দাও।’ আলমসাব বাড়িত আহনের বাদে জবার মা চিঠিটা দেখাইল। মানুষ পাঠায়া খবর লয়া দেখে জবা ওইখানেবি যায় নাই। ছেড়া বাড়িত ঘুরতাছে। আপনা বেগানা সবতেরে খবর দিয়া আনাইল। সবতে থানায় গেছে রিপোট লেখবার। থানার দারোগা কয় চবিবশ ঘণ্টার আগে রিপোট লেখব না। এরা হইছে অপিসার মানুষ, উপরেবি তো এগো হাত আছে। উপরেতথে দিছে ঠেলা, তার বাদে রিপোট লেখছে। কইলও, – ‘আমরা দেখব।’

এইদিকে শরবতআলা থানায় টেকা দিয়া রাখছে, তা কেউ জানে না। ওই রাইত তো কুনু রকমে পার হইছে। বিহানে জবাগো বাড়ির মানুষ দেখে শরিফগো বাড়িতে যিমুন বিয়া লাইগা গেছে। জোরে জোরে গান বাজতাছে। রান্দন হইতাছে বাবুর্চি দিয়া। আর শরবতআলায় তো বাড়ির গেটের সামনে চেয়ার লাগায়া বিহান সাতটা থেকা বয়া রইছে আর এর-ওর লগে গাবলাইতাছে। দুপ্ফরে দেখা গেল শরবতআলার বাড়ি থেকা একটা রেসকা ভ্যানে কইরা এক ড্যাগ বিরানি কই জানি যাইতাছে। জবাগো বাড়ির চাকরটা আছিল বহুত সেয়ানা। ছ্যাড়ায় ভ্যানের পিছে পিছে যায়া উঠল সাত রওজায় রহমত শরবতআলার হউর বাড়ি। রাস্তায় অগো বাড়ির পোলাপান গো মুখে হুইনা আইছে কাইলকা রাইতে শরিফের লগে এক ছেড়ির বিয়া হইছে। বউ এই বাড়িতেই আছে। এইটা হুইনা ছ্যাড়া লৌড় পারতে পারতে আলমসাবের বাড়িতে আয়া সব খবর কইল। সবতে বুইঝা গেছে, জবা ওই বাড়িতেই আছে।

ওইদিন দুপ্ফরে সবতে খাইবার বইছে। বড় মামানি বাইড়া বুইড়া খিলাইতাছে। পুরা বাড়ি বিরানির খোশবোতে ভইরা গেছে। মরদগনরা সবতে কামে-কাজে বাইরে। ইমুন ওক্তে দারোগা, পুলিশ, মানুষজন লিয়া জবার বাপে মড়মড়ায়া বাড়ির ভিতরে ঢুইকা গেছে। বাড়ির জানানারা জবারে লিয়া ঘরের দরজা লাগায়া বয়া রইছে। বড় মামু খবর পায়া দুই-চাইরজন এলাকার মুরুবিবগো লিয়া হাজির। জবার বাপে কইতাছে, ‘আমি একটু জবার সাথে কথা বলতে চাই।’ জবা বি ঠ্যাটামি কইরা বয়া রইছে। দেখা করবো না। বড় মামু সবতেরে ঘরে লিয়া বহাইল। নাস্তা-পানি সবতের সামনে দিলো, কইল, ‘আপনেরা একটু কিছু মুখে দেন। জবা আইতাছে।’

জবারে কইল, ‘যাও তোমার বাপের লগে দেখা কইরা তোমার কী কওনের কয়া আহ।’ বড় মামু আর শরিফের লগে জবা

বাপ-চাচাগো সামনে আয়া খাড়াইল। জবার বাপ মাইয়ারে সিনায় সাটায়া কী যে কান্দন। আর কইতাছে, ‘জবা মা, তুমি আমার সাথে চলো। এমন ভুল অনেকেই করে। এখনো সময় আছে এই ভুল শোধরানোর। তুমি বাসায় চলো।’

জবা কইল, ‘আমার বিয়ে হয়ে গেছে। আমি আমার স্বামীর সাথে থাকব।’

ফুপা মাথায় হাত বুলায়া কত আদর কইরা বুঝাইল, ‘সামনে তোমার জীবনের লম্বা সময় পড়ে আছে। মামণি জীবনটা ছেলেখেলা নয়। তুমি আমাদের সাথে চলো।’ জবার এক কথা, ওই যাইবো না। শ্যাষম্যাশ অরা বিয়ার কাবিন দেখবার চাইলো। কাবিন দেইখা জবার বাপের মাথাটা নিচা হয়া গেল। একজন মুরুবিব কইল, ‘কী আর করবেন, এখন তো কিছু করনের নাই। অগো দোয়া করেন, যিমুন সুকুনের লগে জেন্দেগিটা বিতাইবার পারে।’ জবার বাপে মুখটা কালা কইরা সবতেরে লিয়া বাইর হয়া গেল।

ওইদিন রাইতেই রহমত শরবতআলা পোলা আর পোলার বউরে নিজের বাড়িত লিয়া আইল। বাড়ির ছোটবড়, পয়-পোলাপান জবারে লিয়া ঘিরা ধরল। সবতে যে কী খুশি। শরিফের বড় আম্মা ছয়টা নিরালা সোনার বাতানা হাতে পিন্দায়া পোলার বউর মুখ দেখল। ছোট আম্মা পাঁচ ভরির সোনার হার গলায় পিন্দায়া, কপালে চুমা দিয়া বউরে আদর করল। বাদের দিন রহমত শরবতআলা ঘুম থেকা উইঠা বড় বউরে জিগায়, ‘অফিসার শালাকা বেটি নিন্দসে ওটঠিসে?’ (অফিসার হালার মাইয়া ঘুমেতথে উঠছে?)

একজেসি বাদে শরিফের ছোট বইন রিনা দুই হড়ি আর হউরেরে পাও ধইরা সালাম করাইল। আর কইল, ‘ঘুম থেকা উইঠা বিহানের পয়লা কাম হইল মুরুবিবগো পাও ধইরা সালাম করন।’

রহমত মিয়া নাস্তা কইরা দোকানে যাওনের আগে জিগাইল, ‘অপিসারকা বেটিকো আচ্ছা তারে নাস্তাপানি খেলায়ে?’ (অপিসারের মাইয়ারে ভালা কইরা চা নাস্তা খিলাইছস?)

পোলারা বাপের লগেই নাস্তা করনের বাদে বাড়ির সব

বউ-মাইয়্যারা একলগে নাস্তা করে। দেওর-নন্দেরা জবার লগে হাসি-মশকরা কইরা নাস্তা খাইলো। ছোট নন্দে কয়, ‘বড় ভাবি, জবা ভাবিরে বেশি কইরা পারাটা দেন। নাইলে শরমায়া প্যাট ভইরা খাইব না।’ এইদিকে শরবতআলা বাইরে আয়া চাকররে ডাইকা কইল, ‘আই জাকিরা আমারে একটা চেয়ার আইনা দে। আমি চকে যাওনের আগে একজেসি গেটে বহি।’ এর বাদে গেটে বয়া মহল্লার মানুষজন লিয়া খালি গাবলাগাবলি করন শুরু করল। জবার বাপে অরে দেখলে মাথা নিচা কইরা যায়গা। আলমসাবেরে দেইখা শরবতআলার মুখে একটা বিজাইতা হাসি লাইগা থাকে। এই মরদ বাড়িত আইলে লাগে যিমুন তুফান আহে। বউঝি সব চুট্টি বিলাইয়ের মথন ছাইপা থাকে। এই মরদ একটা কথা বহুত একিন করত, ‘খিলাও হাত্তির ভোগ, দেখাও বাঘের চোখ।’

একদিন রাইতে জবা আর শরিফের ডাক পড়ল রহমত মিয়ার ঘরে। হউরের ঘরে ডাক পড়ছে হুইনা জবা বহুত ডরাইছে। ঘরে ঢুকনের আগে শরিফ জবার ঘুমটা টাইনাটুইনা ঠিক কইরা দিলো। পোলা আর পোলার বউ সামনে আয়া মাথা নিচা কইরা খাড়াইল। রহমত মিয়া কুরসিতে বয়া জবারে নসিহত দেওন শুরু করল, ‘আমি তোমারে কয়েকটা কথা কওনের লেগা ডাকছি।’ শরিফরে দেখায়া কয়, ‘অরে সামনে রাখি এইটার লেগা যে, ওই তোমার খসম। অর জরুরে আমি যা কমু ওইটা অরবি জানন জরুরত আছে। তুমি আয়া পড়ছ শরিফের লগে, তোমার বাপে যে কথা কইছে এর বাদে তোমারে এই বাড়িতে জাগা দেওনের কথা না। মাগার আমি তোমারে ফালাই নাই। আমার বাড়িত থাকতে হইলে আমার হুকুমমাফিক চলবা। তুমি গান গাইবার পারবা না, পরদা করবা, ইমুনকি দোতালার পিছের বারেন্দায়বি যাইবার পারবা না। খসমের সব হুকুম তামিল করবা। কুনু সওয়াল করবা না। আমি এক কথার মানুষ।’ শরিফের মায়রে কইল, ‘তেরা ঘরমে লেকে তেরা বেটা-বউ কো বোঝা দে মায় কেসা এক বাতকা আদমি।’ (তর ঘরে লিয়া তর পোলার বউরে বুঝায়া দে আমি কিমুন এক কথার মানুষ।)

হড়ি জবারে লিয়া নিজের ঘরে গেল। বাপে পোলারে কইল, ‘জরুকো ঠিক রাখনে চাতা তো বেছানামে জরু, উসকা বাদে বান্দি বানাকে রাকখেগা।’ (বউরে ঠিক যদি রাখবার চাছ তাইলে বিছানাতেই খালি বউ, এর বাদে বান্দি বানায়া রাখবি।)

শরিফের আম্মা জবারে কওন শুরু করল, ‘শরিফের আববার লগে আমার যবে বিয়া হইছে আমার ওম্মর আছিল তেরো বচ্ছর। এই রহমত গরিব আছিল। চকে রাস্তার কিনারে খাড়ায়া শরবত বেচত। এরে-অরে ধইরা একটা দোকান ঘর লিলো। এর বাদে আল­v তরুক্কি দেওন শুরু করল। পিছে ফিরা আর তাকান লাগে নাই। একে একে তিনটা বাড়ি হইল। ওই সমে আমি পাঁচ পোলাপানের মা আর শায়লা আমার প্যাটে। একটা ছেড়ি ছোট ওক্তের থেকা আমার কাছে কাম করত। শরিফের আববারে আববা আমারে আম্মা ডাকত। ছেড়ি যে সমে জুয়ান হয়া উঠল শরিফের বাপের নজর হয়া গেল অন্যরকম। ছেড়ির দিকে কেমনে জানি তাকায়। ছেড়ির লেগা দরদ যিমুন উছলায়া উছলায়া উঠে। কিছু কিছু আন্দাজ করবার পারতাছিলাম। ডালমে কুছ কালা হ্যায়। মাগার আমার তো রাও করনেরও কুনু হিম্মত নাই। আমি কিছু কইলে এই মরদানা আমারে চাইর ফাল­v কইরা ফালাইবো না। একদিন রাইতে শরিফের বাপে আমার মাথায় ঠাটা ফালানের মথন কইরা কইল, ওই ছেড়িরে বিয়া করুম।’ আমি কইলাম, ‘আপনে এইসব কী কন? আপনের মাথা পাগলায়া গেছে? মাইয়ার বয়সী ছেড়িরে বিয়া করবার চান?’ আমারে দিন-রাইত মোরোববার মথন ক্যাচন শুরু করল। চেহারার দিকে তাকান যায় না। জুলুম সিতিম বাড়ায়া দিলো। আমারে কয়, ‘তুই বুড়ি, তর উপরে আমার দিল লাগে না।’ নিজে যে বুইড়া হয়া গেছে ওইটা তাল নাই। আমারে কয়, ‘তুই নিজে গিয়া আমারে বিয়া করাবি। তুই যুদি খাড়ায় থাইকা বিয়া না করাবি তে ছাও অহনের বাদে তরে তালাক দিয়া বিয়া করুম।’ ওই সমে শায়লা আমার সাত মাসের প্যাটে। আমি পাঁচ-ছয়টা আওলাদ লিয়া কই যামু। বাপ নাই, ভাইয়েরা গরিব। আমি তো জানি আমি যুদি খাড়ায়া থাইকা বিয়া না করামু তে আমারে তালাক দিব। আমি তো অরে চিনি, এক কথার মানুষ। আওরাতরা খসমরে আজরাইলের হাতে সপুরস করবার চায়, মাগার সতিনের হাতে সপুরস করবার চায় না। বুকে পাত্থর বাইন্দা চোখের পানি ফালাইতে ফালাইতে আমি নিজে আমার মৌজুদে রিনার মায়েরে বিয়া করাইলাম। যে আছিল আমার কামের ছেড়ি ওই হইল আমার বরাবরের হকদার। এই মরদের হুকুম বরখেলাপ করনের এক্তিয়ার আমার নাই। এই বাড়ির কেউরই নাই। মা গো  তুমি এই মানুষের হুকুমের বরখেলাপ কইর না।’

জবা দোতালায় নিজের ঘরে আয়া কইল শরিফরে, ‘ছি ছি তোমার বাবা এমন? এই বাড়ির তোমরা সবাই মেরুদ-হীন।’ শরিফ মাথা নিচা কইরা বয়া রইছে। একজেসি বাদে কইল, ‘আর যাই হউক, আববার হুকুম মাইনা চলন লাগব।’ বিহানে বিছানার থেকা উঠনের আগে জবারে মেরুদ- দেখানের লেগা কয় অর পাওটা টিপা দিবার। মহববত ইমুন যে পেয়ারের মানুষের গু বি ফালান যায়, আর জবা তো শরিফের মহববতে মাতোয়ারা।

ওই বাড়ির সবতে হিন্দি গান বেশি হুনে। শরিফবি হিন্দি উর্দু গান হুনে। জবা হুনে বাংলা গান আর রবীন্দ্রসংগীত। বাড়ির সবতে রবীন্দ্রসংগীত পসন করে না, কয়, ‘এইটা একটা গান হইল? খালি প্যা প্যা করে। ম্যান্দা মারা গান।’ একদিন রহমত মিয়া শরিফরে ডাইকা কয়, ‘তেরা জরু এ সাব কেয়া গানা শোনতি? এই সব বেদীনকা গানা শোননা আচ্ছানি। তেরা জরু কো এই সাব গানা শোননে দে মাত।’ (তর বউ এইসব কী গান হুনে? এইসব বেদীনের গান হুনন ভালা না। তর বউরে এইসব গান হুনতে দিছ না।) শরিফ বাপেরে বি ডরায় আবার জবারে বি রবীন্দ্রসংগীত হুনবার না করতে শরমায়। তার বাদেবি মনে করছে বাপের লগে তো পারবো না, জবারেই বুঝায়া কইবো। জবারে যবে শরিফ এই গান হুনবার না করছে, জবা শরিফের দিকে তব্দা খায়া চায়া রইছে। চোখে টলটলা পানি। যিমুন লাগতাছে অখনি চোখেত থেকা টপকায়া পইড়া যাইব। শরিফের এইটা দেইখা মায়া লাইগা যায়। জবারে কইল ঘর বন্দ কইরা আওয়াজ কমায়া গান হুনবার। জবা তো এইসব হিকে নাই। ওই আর গান হুনে নাই। ঘরে যা-ই দুই-চাইরটা বই আছে ওইগুলি আর কয়বার পড়ন যায়। জবার ফাঁপর ফাঁপর লাগে। শরিফ ঘরের ভিতরে জবারে বহুত মহববত করে। লেকিন সবতের সামনে বুইঝা চলে। জবা সব বুঝে মাগার শরিফরে বুঝবার দেয় না। আর অরে নিজের সামনে নিচা করবার চায় না। শরিফ বাপের দোকানে বহে। পিন্দন-উরন, খাওন-লওন কুনুটাই কম না। লেকিন আজাদি নাই।

তিন মাস বাদে হড়িরা ট্যার পাইল জবা মা হইব। বিহান ওক্তে বমি করে। খাইবার পারে না, মাথা ঘুরায়। মহল্লার দাইরে ডাইকা দেখাইল। দাই দেইখা কয়, ‘খোশ খবর, পোলা হইব। আমারে পাঁচ কাপড় দেওন লাগব কোলাম।’ দুইদিন ধইরা জবা বিহানে ঘুম থেকা দেরি কইরা উঠে। হউড় হড়িগো সালাম করবার যায় দেরি কইরা। দুই দিন দেইখা শরবতআলা নিজের বড় জরুরে কয়, ‘অপিসার শালাকা বেটি কাবসে ফের লাট সাবকা বেটি হো গাই? নিন্দসে দেরি কারকে ওঠতি।’ (অপিসার হালার মাইয়া কবেতথে আবার লাটসাবের মাইয়্যা হয়া গেছে? ঘুমেতথে দেরি কইরা উঠে।) শরিফের মায় মিনমিন কইরা কইল, ‘বাচ্চা পেটমে, দোজিয়া তো, আরাম কারতি।’ (বাচ্চা প্যাটে, দুই জান তো, আরাম করে।)

‘তো? তো কেয়া হুয়া? তোমোকা হুয়ানি? বেশি সেরমে ওঠাগি তো ওতার সাকিগিনি। খানাপিনা কুছ কাম গেরা তো কাও, কেয়া কেয়া লাগেগা মাংগাকে দেতে। লেকিন সালাম টাইমমে কারনা পারেগা। শোন, ভোরকো ওঠকে পাও পাকাড়কে সালামঠো হুয়া, মেরা আর তেরা সামনে সারাদিন শের নিচা কারকে রাখনা। শের নিচা রাখতে রাখতে আদাত পার যাতা।’ (তে? তে কী হইছে?

তগো অহে নাই? বেশি মাথায় উঠাইবি তো নামাইবার পারবি না। খাওন-দাওন কিছু কম পড়ছে তে ক কী কী লাগবো, আনায়া দেই। মাগার সালাম টাইমমথন করন লাগবো। হুন, বিহানে উইঠা পাও ধইরা সালাম করনটা হইল আমার আর তর সামনে সারাদিন মাথা নিচা কইরা থাকন। মাথা নিচা রাখতে রাখতে আদত হয়া যাইব।)

ছাও প্যাটে আহনের পাঁচ মাসের ওক্তে জবারে পাঁচ ফল খিলানের রসমবি পুরা করলো। জবারে ফলফলারি, দুধ, আন্ডা, মাছ, গোস এই সব হড়িরা খেয়াল কইরা খিলায়। হউড় কয়, ‘অপিসারকা বেটিকো জি ভারকে খেলাগি।’ (অপিসারের মাইয়্যারে মন ভইরা খিলাবি।) যবে থেকা ছাও প্যাটে আইছে জবার খালি অর মার কথা মনে পড়ে। মায়েরে দেখবার দিল চায়। সাত মাসে হাতসার রসম পুরা করনের কথা উঠল। পোলাপান ছোট আম্মারে ধরছে হাতসা বড় কইরা করন লাগবো। রিনার মা খসমের কাছে যায়া কইল, ‘শরিফকা জরুকা সাতোয়াসা কারনা লাগেগা আপ কেয়া কায়তে?’ (শরিফের বউয়ের হাতসা করন লাগবো, আপনে কী কন?) ‘কর্, বাহুত ধুমধাম কর্, আপনা এগানাকো নেওতা দে। কোনদিন কারেগি কাও, বাওর্চিকো খাবার দেতে।’ (কর, বহুত ধুমধাম কর, আত্মীয়স্বজনরে দাওয়াত দে। কুন দিন করবি ক, বাবুর্চিরে খবর দেই।)

সাতদিন আগে থেকা হাতসার ইমেত্মজাম শুরু হয়া গেছে। কত রকম পিঠাপুলি যে বানাইছে। হাতসার দিন আপনা এগানা দিয়া বাড়ি গমগম করতাছে। সবতে খোন্চা ভইরা খানপোশ দিয়া ঢাইকা নানান রকমের ফলফলারি, মিঠাই, পুরিসওয়ালি পিঠা, পুয়া পিঠা, চুই পিঠা আর রোট পিঠা লিয়া আইছে। আর আনছে চুড়ি-কাপড়। রহমত মিয়া সোনার নেকলেস সালামি দিলো। মাগার জবার যে আপনা কেউ আছে এটা সবতে ভুইলা গেলো। হাতসার রিত-রসম পুরা অহনের বাদে দেখা গেল হাতসায় একশ পাঁচটা শাড়ি উঠছে, তিনটা তো খালি বানারসি শাড়ি। জবাগো চাকর ছ্যাড়াটা খবর লিয়া আয়া জবার মায়েরে কইল, ‘খালাম্মা ছোট আফার বাচ্চা হইব।’ হুইনা জবার মায় বহুত কানছে। জবার বাপে বাড়িতে আহনের বাদে অর বাপেরে কইল, ‘জবা মা হবে। এই সময়ে মেয়ে মার কাছে থাকে।’ জবার বাপে মুখটা বানায়া কইল, ‘কিছুই করার নাই।’

এত আদর-যতনও জবার মনে শান্তি আনবার পারে না। বাপের বাড়ির লেগা দিল তড়পায়। শরিফরে কইলে কয়, ‘আমিই তো আছি। আমাকে তুমি ভালোবাসো না? ওই বাড়ির কথা ভুলে যাও।’ একদিন বেচইন হয়া দোতালার পিছের বারেন্দায় যায়া মায়েরে এক নজর দেখবার লেগা খাড়ায়া রইছে। শরিফ দেইখা জলদি কইরা অরে ঘরে আইনা দরজা লাগায়া দিলো। জবা শরিফের দিকে তাকায়া রইল। মুখ ফুইটা কিছু কয় নাই। বাদে বহুত কানছে। শরিফ অর বড় ভাবিরে কয়, ‘কী আর কমু ভাবি, মায়ের কথা মনে কইরা জবা সারাদিন গুমসুম হয়া থাকে। আর ভালা লাগে না। একদিন মায়রে দেখনের লেগা পিছের বারেন্দায়বি গেছিলোগা। আববায় যুদি আন্দাজ পায় আমাগো বাড়িতথে বাইর কইরা দিবো না?’ ভাবি কইল, ‘ছোট মিয়া আপনে বুঝবেন না। এই ওক্তে মাইয়াগো বহুত বেচইন লাগে। খালি মার কাছে থাকবার মন চায়। পয়লা পলোঠা তো, দিলে ডর থাকে। যিমুন লাগে মায় সব মুশকিল আসান কইরা দিব।’

কুচিতে-কাচিতে জবা আর শরিফের ঠোকরা-ঠুকরি লাগত। আবার নিজেরাই ঘরে মিটায়া ফালাইত। ঘরের কথা বাইরে আইত না।

দিন-মাস পুরা অহনের বাদে জবার ছাও হইছে। পোলা ছাও। ওই সুম খালি মা-মা করছে। যিমুন লাগছে ওইখানে কেউ অর সাহারা নাই। ছাও অহনের বাদে সবতে খালি ছাওরেই আলাদুলা করে। জবারে কেউ বেশি খেয়াল করে না। জবা মনে অহে শরিফবি অরে আগের মথন মহববত করে না। পোলার নাম রাখছে রাজীব। দুইটা খাসি জবাই কইরা আকিকা দিছে। দাদায় সোনার চেন দিয়া নাতির মুখ দেখছে। একদিন জবার মায় মাইয়া আর নাতিরে দেখনের লেগা বহুত কান্দনে জবার বাপের দিলে রহম আয়া পড়ল, কইল, ‘যাও নাতিকে দেখে এসো।’ অর মায় নাতির লেগা খেতা, কাপড়, আংটি মিঠাই লিয়া একদিন বিয়ালে শরিফগো বাড়িতে যায়া হাজির। শরিফের দুই আম্মা সমদিনরে খাতির কইরা দোতালায় লিয়া গেল। মায়েরে দেইখা মাইয়ার দুই চোখ দিয়া তাড়ালে পানি ঝরতে লাগল। মার চোখবি হুকনা থাকে নাই। নাতিটারে লিয়া সিনায় সাপটায়া বয়া রইছে। শরবতআলা রিনার মায়েরে ডাইকা কয়, ‘আপিসারকা জরুকো আচ্ছতারে খাতের কারকে দে।’ (অপিসারের বউরে ভালা কইরা খাতির কইরা দে।)

দোকানে ফোন কইরা অর বাপে শরিফরে কয়া দিলো অখন বাড়িতে না আইবার।

সাম ওক্তে জবার মায় সবতের কাছ থেকা বিদায় লিয়া বাড়িতে গেছে। জবার বাপে জিগাইল, ‘কেমন দেখলে মেয়ে আর নাতিকে? ওরা ভালো আছে?’

– ওরা ভালো আছে। তোমার নাতি খুব সুন্দর হয়েছে।

– শরিফের সাথে দেখা হয়েছে?

– না জামাইয়ের সাথে দেখা হয়নি।

– সবাই ভালো ব্যবহার করেছে তো?

– সবাই খুব ভদ্র, ব্যবহারও খুব ভালো।

সব হুইনা জবার বাপে সুকুনের হাসি হাসল।

একজেসি বাদে জবার মা যা যা লিয়া আইছিল সব জাকিরার হাতে অগো বাড়িতে ফিরায়া দিছে। এইসব দেইখা চেইতা জবার বাপের প্রেসার বাইড়া গেছে। এত বড় অপমান? বাদে কাইন্দা কইছে, ‘জবার মা আমরা বোধহয় চিরদিনের জন্য মেয়েটাকে হারিয়ে ফেললাম।’

সবকিছু ফিরায়া দেওনের বাদে জবার দিল বহুত খরাপ হয়া গেছে। জবার দিল খরাপ দেইখা অর হড়ি কইল, ‘তোমারে আমরা কিছু কম দেই? তোমার কিছু টান পড়ে? ওই বাড়ির এই ছাতানাতা দিয়া কী হইব?’ জবা মুখ দিয়া কিছু না কউক মাগার অর দিলের ভিতরে গোমরায়া গোমরায়া উঠে। কান্দন ঠেইলা বাইরাইবার চায়। শরিফের উপরে বি গোস্সা লাগে অর এই ম্যান্দা মারা খাইসলত দেইখা। আবার মায়া বি লাগে। আহারে ওই কিছু কইবার পারে না, বাপেরে কী ডরান ডরায়। ছাও অহনের চলিস্নশ দিনের দিন আবার কী ধুমধাম। বাড়ির সবতেরে কাপড় পিন্দাইল, চাকর-নোকর সুদ্দা। দাইরে পাঁচ কাপড় দিয়া খুশি কইরা দিছে। দাই কয়া বেড়াইল এই মহল্লায় শরবতআলার মথন দিল কেউর নাই। নাতি অহনের খুশিতে অপনা এগানা আর পুরা মহল্লায় মণকে মণ মিঠাই বাটছে। জবা কইছিল, ‘এত অপচয় না করে ছেলের নামে কিছু টাকা ব্যাংকে রেখে দিলে ভালো হতো না?’ শরিফ চেইতা উইঠা কইছে, ‘খাস ঢাকাইয়াগো এইটাবি একটা রেওয়াজ। নাইলে আমাগো মান-ইজ্জত থাকব না। পোলা তো ফকিন্নির ঘরে জনম লেয় নাই।’

ছাও হারা রাইত কান্দে, ঠিকেতথে হোয় না, গেদা ছাও তো। পোলার পিছে যত খাটনি জবাই করে। শরিফ হারা রাইত হুয়া থাকে। জবা ডাকলে কয়, ‘ঘুমাইতে দাও, সকালে দোকানে যেতে হবে।’ একদিন পোলার পিছে হারা রাইত জাইগা বিহানে মা পোলা বেখবর ঘুমা। ঘুম ভাঙ্গছে দেরি কইরা। সালাম করবার গেছে দেরিতে। ওইদিন রাইতে হুইবার যায়া শরিফ জবার লগে দিছে কাইজা লাড়াই বাজায়া।

– তুমি এত দেরি কইরা ঘুম থেকা উঠেছ, সালাম দিতে দেরি হওয়ায় কথা উঠেছে। আমি বেইজ্জতি হইছি।

জবা চেইতা গেছে, ‘তুমি বলতে পার নাই যে বাচ্চা সারারাত ঘুমায় নাই? তোমাদের বাড়িতে মেয়েদের কোনো সম্মান নাই। তুমিও তাই। তোমারও কোনো বিবেক নাই। তুমি শুধু বিয়েই করেছ; কিন্তু স্বামী হিসেবে আমার মনের দুঃখ-কষ্ট, সুবিধা-অসুবিধা দেখেছ?’

– তোমাকে শাড়ি-গহনা কম দিয়েছি? খাওয়া-দাওয়া কখনো কম হয়েছে?’ শরিফ জিগায়। জবা মুখটা আন্ধার কইরা মুস্কুরায়া একজেসি হাইসা বহুত না কওয়া কথার জওয়াব দিয়া দিছে। জবার ওই হাসিতে যে কী সেদমা আছিল শরিফ বুঝবার পারে নাই, জিদ্দে কয়া বইল, ‘তোমার এখানে থাকতে মন না চাইলে চলে যাও।’ এই কথা কয়া শরিফ হুয়া রইছে। জবা সারা রাইত হোয় নাই, বয়া রইছে আর সোচ করছে, যার হাত ধইরা, যারে সাহারা মনে কইরা সমুদ্দুর পাড়ি দিতেবি ডরায় নাই, ওই মানুষটাই এই দুই-চাইর কথায় চোখ উল্টায়া ফালাইল! বিহানে পাঁচ মাসের ছাওরে দুধ খিলায়া, শরিফের লগে হোলায়া, এক কাপড়ে বাড়িতথে বাইরায়া সিধা বাপের বাড়ি। এত বিহানে জবারে অর মায় দেইখা অস্থির হয়া গেছে। বাপেরে জলদি কইরা ঘুমেতথে উঠাইছে। জবার দুই চোখ লাল আর কানতাছে। বাপে জিগাইল ছাও কই। কিছু কয় না জবা। বাপে কয়, ‘এখানে এসেছ কেন? তুমি না আমাদের ছেড়ে চলে গেছ? যেখানে গেছ সেখানেই তো থাকতে হবে।’ জবার মা অর বাপরে একটা ধমকি দিয়া কইল, ‘তুমি চুপ করো। মেয়েটা এসেছে, ওকে একটু স্থির হতে দাও।’ জবা খালি কান্দে আর কান্দে। বিহান থেকা এক ফোঁটা পানিবি মুখে দেয় নাই। তার বাদে দুপ্ফরের দিকে মায়েরে কাইন্দা কয়, ‘মা আমি ওদের বাড়ি আর যাবো না। মা কইল, ‘তুমি নাস্তা খাও নাই, এখন গোসল করে ভাত খাও।’ মাইয়ারে

নালায়া-ধোলায়া বহুত মানায়া ভাত খিলাইল। ভাত খাইবার বয়া পোলার কথা মনে কইরা কী কান্দন! মায় মাথায় বিলি কাইটা কয়, ‘তুমি একটু ঘুমাও। সব ঠিক হয়ে যাবে।’ জবা খালি ছটফটান শুরু কইরা দিছে।

ছাওটার কান্দনের আওয়াজ পায়া শরিফের ঘুম ভাঙছে। মাগার মনে করচে জবা আছে। আরেক দিকে ঘুইরা হুয়া রইছে। ছাও খালি কানতাছে। চুপ আর অহে না। শরিফ উইঠা দেখে জবা নাই। বাচ্চার খেতা মুতে ভিজা চুপচুপা। গোসলখানায় দেখে, নাই। বাওর্চিখানায় দেখে নাই। পুরা বাড়ি বিছরায়া না পায়া মার কাছে ছাওটারে লিয়া গেছে। পুরা বাড়ি জাইনা গেছে, জবা বাড়ি নাই। পোলারে বাপের কাছে ফালায়া গেছেগা। রহমত শরবতআলার কাছেবি খবরটা গেছে। বড় বিবিরে ডাইকা কয়, ‘আই তেরা বেটাকা বউ বলে ভাগ গাই? ভাগুরি ভাগকে আইথি ভাগকে চালেগাই। আর এই বাড়িমে চাড়েন দেঙেনি। এই বাত তু ইয়াদ রাকখেগি। বাচ্ছাকো ডিবিয়াকা দুধ খেলাকে তেরা পাস রাখ।’ (ওই তর পোলার বউ বলে ভাইগা গেছে? ভাগুরি ভাইগা আইছিল, ভাইগা গেছেগা। আর এই বাড়িতে চড়বার দিমু না। তুই এই কথা মনে রাখবি। ছাওরে ডিববার দুধ খিলায়া তর কাছে রাখ।)

শরিফের দিল খরাব হয়া গেছে। এখন জবার লেগা বেচইন লাগতাছে। বারেন্দায় যায়া জবাগো বাড়ির দিকে ফুচকি দিয়া দেখনের কোশিশ করে। শ্যাষম্যাষ চকে যায়া জবাগো বাড়িতে ফোন করছে। জবার মায় ধরছে। শরিফ সালাম দিয়া জিগাইল জবা আইছে কি না। জবা এই বাড়িতে আছে হুইনা দিলে একজেসি তসুলি­ আইল। জবার মায়রে কইল জবারে দিবার। জবা হুয়া রইছে কওনে শরিফ মনে করল অর মা চাল কইরা মিছা কথা কইতাছে। জবার মা জিগাইল, ‘বাচ্চা কেমন আছে?’ শরিফ কইল কান্তাছে। ফোন রাইখা অর মায় আয়া দেখে জবা ছটপটাইতাছে। মা কইল, ‘শরিফ ফোন করেছিল। তুমি ঘুমিয়েছিলে বলে তোমাকে দিতে পারিনি। তোমার বাচ্চা কাঁদছে।’ জবারে ডাইকা ফোন দেয় নাই কেলে­গা, এলে­গা জবা চেইতা গেছে। বিয়ালে জবার বুক ভারী হওন শুরু করল। ছাতির বিষে জবার জার লাগতাছে। চোখে খালি পোলার মুখ ভাসতাছে। সাম ওক্তে এই পাঁচ মাসের ছাওয়ের মা আর থাকবার পারে নাই। নিজের মারে কয়া শরিফগো বাড়িত গেছে। গেট দিয়া ঢুইকাই দেখে বারেন্দায় রহমত শরবতআলা চেয়ারে বয়া সেগ্রেট টানতাছে। দাদির গোদে জবার ছাও। জবা লৌড় দিয়া পোলারে গোদে লিবার গেছে। শরবতআলা জরুরে কয়, ‘বাচ্চাকো লেকে ঘারমে যা।’ (ছাওরে লিয়া ঘরে যা।) জবা বি পিছে পিছে যাইবার লিছে। শরবতআলা কয়, ‘তুমি কই যাও? তোমার আমার বাড়িতে জাগা নাই। তুমি কার হুকুমে ওই বাড়িতে গেছ? তুমি আমার হুকুম তামিল কর নাই। যেখান থেকা আইছ ওইখানে যাও।’ জবা বহুত কইল, ‘আমি ভুল করেছি। আমাকে মাফ করে দিন।’ শরবতআলা  মুখ ঘুরায়া বয়া রইল। শ্যাষম্যাষ জবা ছাওটারে লিয়া যাইবার চাইল। শরবতআলা কইল ছাও বাপের কাছে থাকব। ছাওটারে দুই চোখে দেখবারবি দিলো না। জবা অগো বাড়িত আয়া কানতে শুরু করল। জবা ফিরা আইছে দেইখা অর মার কলিজা কাঁইপা উঠছে। রাইতে শরিফ বাড়িত আহনের বাদে শরবতআলার ঘরে ডাক পড়ল। শরিফ পোলাটারে কলিজার ভিতরে সাটায়া রাখছে। পোলা এর মুখের দিকে চায় অর মুখের দিকে চায়। কারে জানি বিছরায় আর ভ্যাটকায়া ভ্যাটকায়া কান্দে। কারে রাইখা কার গোদে যাইব, ছিল­y বিল­y হালত। শরিফের মুখ হুকনা। বাপের ঘরে যাওনে বাপে কয়, ‘ওই অপিসার শালাকা ভাগুরি বেটি আইথি, বেদা কর দিয়া। শোন তু তেরা জরুকো ঠিকসে চালা সাকেনি। শালাকা জানা গাইকো বানকে রাসি্স নেজকা হাতমে রাকনা লাগতা। তু গাই রাসি্স সাবই ছোড় দিয়ে। ইসকো ঘরমে লেনেসে ঘরকা কই আওরাত ঠিক রাকখা জাগানি। তু ইসকো ভুল যা। মায় তেরা দুসরা শাদি দেঙ্গে। তেরা বেটাকো তেরা আম্মা পালিগি।’ (ওই অপিসার হালার ভাগুরি মাইয়া আইছিল, বিদায় কইরা দিছি। হুন, তুই তর বউরে ঠিকেতথে চালাইবার পারছ নাই। হালার জানা, গাইরে বাইন্দা রসি্স নিজের হাতে রাখন লাগে। তুই গাই রসি্স সবই ছাইড়া দিছস। এরে ঘরে লিলে ঘরের কুনু মেয়েলোকরে ঠিক রাখন যাইব না। তুই এর কথা ভুইলা যা। আমি তর আরেকটা বিয়া দিমু। তর পোলারে তর মায় পালব।)

শরিফ পোলারে ঘরে লিয়া আয়া হাউমাউ কইরা কান্দন শুরু কইরা দিছে।

রাইতে জবা খালি হাঁটছে। বিছানায় পিঠ লাগাইবার পারতাছে না। খাওন-লওন বন্দ। জবার মা অর বাপেরে কয়, ‘তুমি জবাকে নিয়ে যাও। শরিফের আববা তোমার কথা ফেলতে পারবে না।’

জবার বাপে কইল, ‘কী বলছ, ওই অশিক্ষিত, অহংকারী লোকের সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছাই আমার নেই। যাদের কোনো বিবেক নেই, একটা শিশুকে যারা মার কাছ থেকে আলাদা করে রেখেছে, আমি তাদের মানুষ ভাবতে পারি না।’

– তুমি তো মানুষ। তোমার মেয়ের সংসারটা জোড়া লাগানোর চেষ্টা তুমিই না হয় করো, বাচ্চাটার জন্য তোমার অহংকারটা ভেঙে।

জবার বাপে চুপ কইরা কী জানি সোচ করবার লাগছে। জবা তো লাম্বা লাশ হয়া পইড়া রইছে। বাপে মাইয়ার এই হালত সইবার না পাইরা কইল, ‘রাত্রে যাবো।’

জাকিরা লৌড় পারতে পারতে পেরেশান হয়া আয়া কয়, ‘চাচা অপিসার আইতাছে।’ কয়া দাঁতটা বিজলায়া হি হি কইরা হাসন শুরু করছে।  ‘চোপ শালা, তুই আমার সামনের থেকা যা।’ শরবতআলা চেইতা গেছে। জবার বাপ জবারে লিয়া ঘরে ঢুকনের লগে লগে শরবতআলা কয়, ‘সালামালেকম, আসেন আসেন। আপনে কিমুন আছেন?’ জবার বাপে বয়া কইল, ‘আপনি ভালো আছেন তো?’

– হ, ভালাই আছি। কী ব্যাপার? কেলে­গা আইছেন?

– জবাকে মাফ করে দিন, ও ভুল করেছে।

– ‘এই কথা বাদ দিয়া কথা কওন যায় না?’ জবা যে এই ঘরেই আছে শরবতআলা যিমুন অরে দেখেই নাই।

– জবা আপনার সন্তান হলে আপনি কী করতেন? জবা তো আপনার সন্তানতুল্য।

– অই জাকিরা চা-নাস্তা লিয়া আয়। হুনেন অপিসার সাব, আপনের মাইয়ার লায়েক আমার পোলা না। আপনেরা শিক্ষিত মানুষ। আপনেগো মাইয়ারে আপনেরা ভালা শিক্ষা দিছেন। আমার নালায়েক পোলা অর দামবি দিবার পারে নাই অর কদরবি বুঝবার পারে নাই। আর আমার মাইয়ার কথা কইতাছেন? শরবতআলার মাইয়াগো এত দিমাক দেখান চলে না। আপনা সংসার, খসম, আওলাদ কী এইটাবি অরা ভালাই জানে। আপনে আমারে মাফ করেন।

জবার বাপে উইঠা শরবতআলার দুইটা হাত ধইরা ফালাইল। জবা তো শরবতআলার পায়ে পইড়াই রইছে। জবার বাপে কইল, ‘ভাইসাহেব তিনটা জীবন, ওদের দিকে দেখেন। একটা শিশুর

বাবা-মা দুজনকেই প্রয়োজন।’ শরবতআলা চেইতা উইঠা কয়, ‘আপনের ওই ভাগুরি মাইয়ার পরছাইবি আমার নাতির উপরে পড়বার দিমু না।’ এই কথা কয়া মুখ ঘুরায়া এই যে চাট্টানের মথন বয়া রইছে, ব্যাটা আর মুখই ঘুরাইল না। জবার বাপে আর কী করবো! মাইয়ারে পায়ের উপরেতথেকা উঠায়া লিয়া গেছে। মাইয়া পাও ছাইড়া উঠবার চায় না। আহনের ওক্তে জবা চাইরো দিকে চায়া কাউরে দেখলো না। আল­ই মালুম কারে বিছরাইছে মাগার অর পিয়াসী চোখ অর জিগরের টুকরারে কুনুদিকেই দেখলো না। বাপে একরকম জোর কইরাই মাইয়ারে বাড়িত লিয়া গেল। জবারে লিয়া বাড়িত ঢুকনের লগে লগে অর মা বুইঝা গেল যে আর কুনু উমিদ নাই। ঠান্ডা কিসিমের খসমরে জিন্দেগিতে কুনু দিন চেতবার দেখে নাই, ওই মানুষ চেইতা চোখ গরম কইরা মাইয়ারে কইল, ‘তোমার আর তোমার সন্তানের কথা ভেবে আমি এই লোকের হাত ধরে অনুরোধ করেছি, কিন্তু শরবতওয়ালা তার যথার্থ পরিচয় তার ব্যবহার ও কথায় দিয়ে দিয়েছে।’ এরবাদে মাইয়ার দিকে তাকায়া কইছে, ‘তুমি আমার সন্তান। তুমি এখানে থাকো। কিন্তু ওই বাড়ির কারো স্থান আমার বাড়িতে হবে না।’ জবা তো শানের উপরে তব্দা লাইগা ল্যাত্থর খায়া বয়া রইছে। বাপের কথা কানে গেল কিনা বুঝা গেল না।

শরিফ বাড়িতে আয়া সব হুইনা বাপের ঘরে যায়া এইবার মুখ খুলল, ‘আববা আপ এতনা ছোটা গালাদকা কই মাফ নাই দেকে এতনা বড়া সাজা দিয়ে? আল্লাকা আরাশবি কাঁপকে ওটঠেগা।’ (আববা আপনে এত ছোট ভুলের কুনু মাফ না দিয়া এত বড় সাজা দিলেন? আল্লার আরশবি কাঁইপা উঠব।) শরবতআলা শরিফের কথার উত্তর দেওনের কুনু জরুরতই মনে করে নাই। চেয়ারে বয়া পাও নাচাইতাছে আর পান চাবাইতাছে। জবা শরিফের নানিবাড়ি সাত রাওজায় গেছিল। অর ছোট মামু শরিফরে চকবাজারে যায়া ডাইকা আনছে। ছ্যাড়া জবারে কইল, ‘সবুর করো। আমি কোশিশ করুম আববারে মানাইবার।’ জবা ছাওয়ের কথা জিগানে কইল, ‘ওই ভালা আছে। তুমি অর কথা সোচ কইরো না। তোমার ছাও তোমার সিনায় বহুত জলদি আয়া পড়বো।’ দুইজন দুইজনরে সিনায় সাটায়া বহুতক্ষণ রইল। শরিফ জবারে রেসকায় উঠায়া দিছে। জবা এই তসুলি­ লিয়া ফিরা আইছে যে বহুত জলদি ওই অর সংসারে ফিরা যাইব। মামুরাবি বহুত কোশিশ করছে শরবতআলারে ফিরাইবার, মাগার কুনু ফায়দা অহে নাই।

নানিগো বাড়িতে জবা আর শরিফের যে মোলাকাত হইছে এই কথা শরবতআলার কানে যাওনে ওইদিনই উকিলের লগে সলা কইরা রাইতে বাড়িতে আইছে। বিহানে বাপের ঘরে শরিফের ডাক পড়ল। যায়া দেখে, সাত্তার আর একটা ব্যাটারে লিয়া অর বাপে বয়া রইছে। কুনু বাতচিত ছাড়া আতখা একটা কাগজ বাইর কইরা কয়, ‘এ কাগাজমে সাইন দে। ওই অপিসার শালাকা বেটিকো তালাক দে।’ (এই কাগজে সই দে। ওই অপিসার হালার মাইয়ারে তালাক দে।) এই কথা হুইনা শরিফ ঘরেতথে বাইর হয়া যাইবার লিছে। বাপে সাত্তাররে হুকুম দিলো, ‘পাকাড় এই শুয়ারকো।’ (ধর এই শুয়োররে।) সাত্তার শরিফরে ধইরা কইল, ‘বাপে যা হকুম করে হুন। বাপের কথার বরখেলাপ করিছ না।’ রহমত মিয়া উকিলরে কইল, ‘ওই কাগজটা বাইর করেন তো উকিল সাব।’ এর বাদে পোলারে কইল, ‘তু তালাককা কাগাজমে সাইন নাই কারনেসে মায় ইবিব এই কাগাজমে সাইন কারকে তিসকো তামাম সাম্পাত্তিসে বেহাক কর দেঙ্গে। এই ওখাত তেরা বেটাকো লেকে মেরা বাডড়সে নেকাল যা। জেন্দগিমে তেরা এই সুরাত মিসকো দেখাগানি।’ (তুই তালাকের কাগজে সই না দিলে আমি এখন এই কাগজে সই কইরা তরে সব সম্পত্তির থেকা বেহক কইরা দিমু। এখনি তর পোলারে লিয়া আমার বাড়িতথে বাইরায়া যাবি। জেন্দগিতে তর এই চেহারা আমারে দেখাবি না।) সাত্তার তালাকের কাগজটা হাতে লিয়া কইল, ‘লে সই কর।’ শরিফ কাগজে সই করনের বাদে শরবতআলা বড় পোলারে কইল, ‘একঠো কাগাজ অপিসার শালাকা বাড়িমে ভেজ দে আর একঠো মেরা হাতমে লাকে দে।’ (একটা কাগজ অপিসার হালার বাড়িতে পাঠায়া দে আর একটা আমার হাতে আইনা দে।) শরিফ সই করনের বাদে একটা ভাঙ্গাচুরা মানুষের মথন বাপের ঘরেতথে বাইর হইল। অর কাছে লাগতাছে ওই নিজেই জবারে মাইরা ফালাইছে। অর পোলার মা মইরা গেছে।

 

শরবতআলা শরিফের মায়েরে নিজের ঘরে ডাইকা কইলো, ‘সামকো সিক্কাটোলিমে যানা লাগেগা তেরা বড়া বাহেনকা বাড়িমে। ওনোকা বড়া বেটি আসমাকা সাথে শরিফকা শাদি দেঙ্গে।’ (সাম ওক্তে সিক্কাটুলিতে তর বড় বইনের বাড়িতে যাওন লাগবো। অগো বড় মাইয়া আসমার লগে শরিফের বিয়া দিমু।)

চমকায়া উঠলো শরিফের মা। বরো বচ্ছর ধইরা দুই বইনের লগে অনতবনত লাইগা রইছে। কুনু বুলচাল নাই। ওই বইনের কাছে কেমনে যায়া কুন মুখে মাইয়া চাইবো? মরদানা অর জরুরে কুনু ফিকির করবার না করল, ওই সব সামলায়া লিবো। সাম ওক্তে দুই বিবিরে এক রেসকায় উঠায়া সাত্তাররে কইলো শরিফরে লিয়া সিক্কাটুলিতে অর বড় খালার বাড়িত যাইবার। আর নিজে আলাউদ্দিন সুইটমিট থেকা দুই মণ মিঠাই কিনা ছোট হালারে লগে লিয়া গিয়া উঠলো বাচ্চুহাজির বাড়িত। অর সারু ভাইয়ের নাম বাচ্চুহাজি। বেসরম মরদানা যায়াই হাঁকডাক শুরু কইরা দিলো, ‘ভাইসাব আপ কাঁহা? ম্যায় রহমত আয়ে।’ (ভাইসাব আপনে কই? আমি রহমত আইছি।) বাচ্চুহাজি তো তাজ্জুব বইনা গেছে। ওই মরদানাবি তো কম ফায়েক না, এর বাদে ওইবি হাঁকডাক শুরু কইরা দিলো, ‘আই দেখকে যা কেনো আইসে! গারিবকা বাড়িমে হাতিকা পারা। আসমানকা চান কোন তাড়াফসে ওটঠা!’ (আই দেইখা যা কারা আইছে! গরিবের বাড়িতে হাত্তির পারা। আসমানের চান কুনদিকে উঠছে!)

বড় বইন তো খুশি হয়া গেছে। এই দিমাকি ছোটো বইন যার এত ফকর, ওই অর বাড়িতে নিচা হয়া আইছে! বইনরে আর বইনের হতিনরে খাতির কইরা ঘরে লিয়া বহাইলো। শরবতআলার দুই পোলা, বড় বইনের পোলাপান গাবলাগাবলি শুরু কইরা দিলো। শরবতআলা করল কি সারু ভাইরে লিয়া একটা ঘরে দরজা লাগায়া বাচ্চুহাজির হাত ধইরা কইল, ‘ভাইসাব ম্যায় আপকা পাস আসমাকো ভিখ মাঙ্গতে। আপকা বেটিকো ভিখ দেকে মেরা শরিফকা জেন্দেগি বাখসিজে।’ (ভাইসাব আমি আপনের কাছে আসমারে ভিক্ষা চাইতাছি। আপনের আসমারে ভিক্ষা দিয়া আমার শরিফের জেন্দেগিটা শুধরান।) তালাকের কাগজ জেব থেকা বাইর কইরা দেখাইল বাচ্চুহাজিরে। তার বাদে হাত ধইরা কয়, ‘আপ জাবান দিজে, আসমাকো শরিফকা পাস শাদি দিজেগা।’ (আমারে কথা দেন আসমারে শরিফের কাছে বিয়া দিবেন।) বাচ্চুহাজি নিজে পড়বার না পারুক বড় পোলারে ঘরে ডাইকা তালাকের কাগজটা পড়ায়া শরবতআলারে জবান দিয়া দিলো। দুই সারুভাই বাইরে আয়া সবতের সামনে এলান করল আসমার লগে শরিফের শাদির কথা। আসমার বড় ভাইয়ের পসন্দ না। অর মার বি এরাদা নাই। অর এই আবিয়াত মাইয়ারে এই বরগুনা পোলার লগে শাদি দেওনের। মাগার অর বাপে কইলো ওই জবান দিয়া দিছে। শরিফের ছোট আম্মা কইল, ‘হামো এ উমিদ কারকে আয়ে সব ঠিক হায় তো শাদি আজই হো যাউক।’ (আমরা এই আশা কইরা আইছি, সব কিছু ঠিকঠাক থকলে বিয়া আইজই হয়া যাউক।) আসমার বড়ভাই কয়া উঠল, ‘শরিফের একটা পোলাবি তো আছে।’ শরবতআলা থাতাবারি দিয়া কয়া উঠল, ‘পোলা অর দাদির কাছে থাকে, থাকব। মনে কর শরিফের কুনু পোলা নাই।’

ওই রাইতেই কাজি আইনা দুই লাখ ট্যাকা দেনমোহরানায় শরিফের লগে আসমার শাদি হয়া গেল শরিফ কিছু বুইঝা উঠনের আগেই। বাচ্চুহাজি সিদ্দিকবাজার থেকা হাজির বিরানি আইনা সবতেরে খিলায়া মাইয়ারে বিদায় দিলো। মাহারা তো আগেই হইছে, ওই রাইত থেকা রাজীব বাপ হারাবি হয়া গেল।

ওইদিন তালাকের কাগজ পায়া জবার কী হালত হইছিল আমি আর লেখলাম না। জবা তো শরিফরে মহববত করছিল। বাদের দিন জবারা খবর পাইল, শরিফ অর খালাত বইনেরে শাদি কইরা লিয়া আইছে। জবা আর শরিফগো একলগে বাড়ি মাগার ওইদিন থেকা আর কুনুদিন জবা শরিফের দিকে তাকায়া দেখে নাই। শরিফ জবারে দেখলে চোট্টার মথন পলায়া যায়। শরিফের নয়া শাদিবি সুখের অহেনি। পোলাটারে লিয়া অশান্তি লাইগা থাকত। যুদিবি বাচ্চাটা দাদির বুকে থাকে।

জবার কী হইছিল? জবা সারারাইত হুইতো না। তামাম রাইত ভূতের মথন জাইগা থাকত। নাহন-খাওন ভুইলা গেছিল। অর দিলের সেদমায় গাছের পাতা ঝরত। অর এক সাহেলি মেডিকেলে পড়ত। ওই অরে ঘুমাইবার লেগা পেথেডিন ইন্জেকশন দিলো। জবা দাওয়াইয়ের নেশায় পইড়া রইল টানা তিনদিন। বাদে চুপকে চুপকে নেশার সুই লেওন শুরু করল। সব সমে নেশায় বুঁদ হয়া থাকে। নেশা কাইটা গেলে পোলার হাসি খালি অর চোখে ভাসে। মা-বাপে বহুত ভালা ভালা শিক্ষিত পোলার লগে বিয়া দেওনের কোশিশ করছিল। জবা ওইদিকে চায়া দেখে নাই। নেশায় নেশায় পাগলের মথন হয়া গেছিল। জবার এলাজ বি করছিল মাগার জবা ভালা হওনের কুনু ইরাদা করে নাই।

জবা পোলা রাজীবের উম্মর অখন দশ বচ্ছর। দাদিরা রাজীবের কাছে অর মার বহুত গিল­v করে। পয়লা একিন করত মাগার পরে পোলা মার কাছে আইত। মা নেশায় ইমুন বুঁদ হয়া থাকত, নিজের পোলা যে এত বড় হয়া গেল চিনবার পারত না। ও-ই খালি অর পাঁচ মাসের রাজীবরে বিছরাইত। জবার ইমুন হালত হইল যে, নেশার জ্বালায় পাগলের মথন হয়া যাইত। নিজের কাছে ট্যাকা না থাকলে মানুষের কাছে ইমুন গিরগির করত যে এলাকার পোলাপানের কাছে ওই একটা তামশা হয়া গেছিল। মহল্লায় যারা অরে ছোটতথে দেখছে ওই মুরুবিবরা বহুত আফসোস করে আর রহমত শরবতআলার এই বেইনসাফির লেগা নাল­ত দেয়। এই ফুলের মথন মাইয়া সবতের চোখের সামনে মুঝরায়া গেল বাসি ফুলের মথন। সবতে কয়, আমার দুশমনের মাইয়ার বি যিমুন ইমুন নসিব না অহে।

জবা এমনেবি মইরা যাইত। সবতে বুঝবার পারতাছিল যে ওই মউতের দিকে আগে বাড়তাছে। হয়তো অর সেদমা এতই বাইড়া গেছিল যে কুদরতি মউতের ইমেত্মজার করবার পারে নাই। আজরাইলরে আগেই নেওতা দিয়া জোর কইরা ডাইকা লিয়া আইছে। একদিন জবা অর নিজের জেন্দেগির সব জ্বালা সিতিম জুড়াইবার লেগা নিজেরে ফাঁসিকে ঝুলায়া দিলো অগো সিঁড়িঘরে। জবা সুকুন পাইছে কি না জানি না, মাগার জবার হিস্টুরি যে হুনে অর মনে দাগ কাইটা যায়।

রহমত শরবতআলা নিজে বি গুজরায়া গেছে। ভালা কাম করলে মানুষ সুনাম করে। মাগার রহমত শরবতআলারে মাইনষে কী কয় ওইটা আমি পাঠকগো কাছে কমু না। অর দাদি বি বাঁইচা নাই। মইরা যাওনের আগে অর সব সম্পত্তি রাজীবের নামে লেইখা দিয়া গেছে।

কান্দে, অহন বি কান্দে। জবার লেগা রাজীব কান্দে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: