ফজিলন বালা

লেখক: মিলটন রহমান

পাড়ে নোঙর ফেলে জলসন্তরণের বিপরীতে স্থির হয়ে আছে নৌকাটি। কোনো তাড়া নেই অন্য কোথাও যাওয়ার। জলের বুকে ব্যসত্ম বৈঠা গেঁথে গেঁথে নৌকাগুলো চলে যাচ্ছে গঞ্জে কিংবা অন্য পাড়ে। কেবল এ-নৌকাটির অন্য কোনো গন্তব্য নেই। এখানেই রোদের শামিয়ানার নিচে থির হয়ে আছে। মাঝে চিৎ হয়ে শূন্য আকাশের সঙ্গে কথা বলছে তরুণ মাঝি আকিনূর। চোখের পলক পড়ে না। দ্রুত চলে যাওয়া নৌকার ঠেলে দেওয়া ঢেউ আকিনূরকে দোলা দিয়ে যায়। তার নৌকা জল কামড়ে থির হয়ে থাকে। অকস্মাৎ ঘূর্ণির মতো মোচড় দিয়ে ওঠে নৌকা। কোনোমতে টাল সামলে উঠে বসে আকিনূর। দেখে, চোখের সামনে দাঁড়ানো একপেড়ে তাঁতের শাড়ি পরা এক তরুণী। ঝাঁঝালো কণ্ঠ আকিনূরের –

– ওই নৌকা যাইবো না, নামেন।

শুনেছে কি শোনেনি বোঝা গেল না। একপাশে বসে পড়ল তরুণী।

– কইলাম না যামু না, বসলা ক্যান?

তরুণী চোখ তুলে তাকায়। খিলখিল হাসে।

– রাগো ক্যান মাঝি। আমারে একটু গাঙের ওই পাড় থিকা ঘুরাইয়া আনো। তোমার লগে বেড়াইতে চাই।

মুহূর্তেই আকিনূরের চোখ গেঁথে যায় তরুণীর চোখে। এত সুন্দরী এই গাঙে এলো কোথা থেকে! যাবেইবা কোথায়?

– বাড়ি কই, আর যাইবেন কই?

– এই গাঙই আমার বাড়ি। এইহানেই আমারে একটু ঘোরাও মাঝি। তোমারে গল্প কমু।

– আমার গল্প হুননের কাম নাই। কই যাইবেন কন, নামাইয়া দিয়া আহি।

– কইলাম তো, এই গাঙই আমার বাড়ি।

– আমার লগে ফাইজলামি করেন, নামেন নৌকা থিকা।

– গল্প শুনবা না মাঝি?

কী এক মুশকিল। আকিনূরের চোখ-মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ে বিরক্তি। কত সুন্দর তাতানো রোদে শরীরটা মেলে ধরেছিল। তার চোখে-মুখে জিজ্ঞাসা, কী গল্প বলতে চায় তরুণী? কে সে? এত রূপসী মেয়ে তাদের গাঁয়ে দেখেনি আগে। কোথা থেকে এলো? কোথায় যাবে? আবার বলছে, এ-গাঙই তার বাড়ি। পাকানো এসব কথার কোনো জট খুলতে পারে না সে। চেঁচিয়ে বলে –

– কন কী গল্প হুনাইতে চান।

 

দুই

জলের ঢেউ আছড়ে পড়ে নৌকায় মিশে গিয়ে যেন শেষ হয় তরুণীর বাঁকানো শরীরে। গল্প শুরু করার আগে কাটা তরমুজের মতো ঠোঁট কেঁপে কেঁপে ওঠে। চোখে-মুখে শূন্যতা। নদীর পাঁজর চিরে দ্রুত চলে যাওয়া একটি নৌকার দিকে ইঙ্গিত করেই গল্প শুরু করে তরুণী।

– এই পথেই আসা-যাওয়া আছিল ফজিলন বালার। কি রইদ, কি বিষ্টি, কি ঝড়, কি তুফান, কোনো কিছুই থামাইতে পারতো না তারে। এই পথেই গাঙের ওইপাড়ে যাইতো কবিরের লগে দেহা করতে। কোনো কোনো দিন কবিরও আইতো এই পাড়ে। সেই সত্তর-একাত্তর সালের কথা। তখন এই পাড়ার মাইয়ারা কোনো পোলার লগে সম্পর্ক করার কথা স্বপ্নেও ভাবতো না। ফজিলন আছিলো উলটা। কাউরে ডরাইতো না। রূপের তার কমতি আছিলো না। কত পুরুষ যে তারে পছন করতো তার কোনো হিসাব নাই। কিন্তু কাউরেই সে গোনায় ধরতো না। কেবল কবিরই আছিলো তার সব। ওই সময় আবার দেখা দিলো গণ্ডগোল। সারাদেশে কেবল গণ্ডগোলের খবর। পাড়ায় পাড়ায় পাকিস্তানি পুলিশ। এই গাঙে সারাক্ষণ পুলিশ আর আর্মিরা যাইতো আর আইতো। পাকিস্তানিদের পক্ষে একটা দল হইলো শান্তিবাহিনী নামে। তারা বাড়িতে বাড়িতে গিয়া সাবধান করে, কেউ যেন মুক্তিবাহিনীতে না যায়। তারপরও অনেক পোলা ভারতে চইলা গেছিলো ট্রেনিং নিতে। হেই খবর যখন পাকিস্তানি মিলিটারি জানলো, শুরু হইলো নির্যাতন। ফজিলনদের গ্রামের মোল্লাবাড়িতে একদিন আস্তানা গাড়লো পাকিস্তানি মিলিটারি। যাগোর পোলারা মুক্তিবাহিনীতে গেছে তাগোরে ডাইকা কইলো, যেন তাগো পোলাদের ফিরাইয়া আনে। যারা গেছে তারা কি আর ফিরা আহে? আহে নাই। তারপর তো শুরু হইলো বাড়ি জ্বালাও। প্রায় সব বাড়ি থেকেই ধইরা নিয়া গেলো কমবয়সী মাইয়াগোর। সেই তখন, ফজিলন বালা ছাড়লো বাড়ি। তার রূপের সুন্দরও হইয়া গেছিলো কাল। করলো কী, সারা শরীরে কালি মাইখা, ছিঁড়া শাড়ি পইরা, গেলো কবিরের কাছে। কইলো, চলো কবির যুদ্ধে যাই। শত্রুগোরে খেদাইতে না পারলে কাউরে বাঁচতে দিবো না। চলো কবির ভারতে গিয়া ট্রেনিং লইয়া যুদ্ধে নামি। কার কথা কে হুনে। কবির যাইতে রাজি হয় না। তার বাবা-মা উলটা ফজিলনরে কইলো, হেই যদি কবিররে যুদ্ধে নিতে চায় তাইলে মিলিটারিরে কইয়া দিবো। ফজিলনরে ধরাইয়া দিবো। কবির সাফ জানাইয়া দেয়, যুদ্ধে যাইবো না।

আকিনূর মগ্ন হয়ে শোনে তরুণীর কথা। যত শোনে ততই চোখে জেগে ওঠে বিস্ময়।

– কী কও, কোন জাতের পোলা কবির! দেশের এমুন গণ্ডগোলে যুদ্ধে যাইতে চাইলো না। অথচ ফজিলন মাইয়া হইয়া কইলো যুদ্ধে যাইবো।

– হ, কবির গেলো না। ফজিলন পলাইয়া যুদ্ধে যোগ দিতে চইলা গেলো। ট্রেনিং নিতে যোগ দিলো আগরতলার লেম্বুচোরা ক্যাম্পে। পুরুষ যোদ্ধাগোর লগে বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্প থেকে আনা হইলো আরো নয়জন মাইয়া, যাগো বয়স প্রায় ফজিলনের সমান। দশজনের একটি দল বানাইলো কমান্ডার। ওই দশজনের মইধ্যে ফজিলন সুইসাইড স্কোয়াডের ট্রেনিংও নিছিলো। ট্রেনিং শেষে  যোগ দিলো মতিনগর সাব-সেক্টরে। তার সাহস দেইখা কমান্ডার লেফটেন্যান্ট দিদারুল আলম নতুন নতুন অপারেশনের পরিকল্পনা করে। প্রথম অপারেশন হইবো পয়েলগাছায়। হেইখানে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালাইতে হইবো। একটা বোর্ডের মইধ্যে মানচিত্র আঁইকা কমান্ডার সবাইরে বুঝাইয়া দিলো, কোন দিক থিকা আক্রমণ শুরু করতে অইবো। কোন দিকে কতজন থাকবো। কার লগে কোন অস্ত্র থাকবো। মাইয়াগো কী করতে অইবো। সব বুঝাইয়া দেওনের পরে শুরু হইয়া গেলো চলা। মতিনগর থিকা মাঝরাইতে বিশজনের একটি দল রওনা দিলো পয়েলগাছার দিহে। আগেই দুইজনরে পাঠানো হইছিলো আশপাশে অবস্থান লইয়া খবর দেওনের লাগি। ঠিক ফজরের আজানের আগে আগে সবাই হাজির হয় পয়েলগাছায় সেই আর্মি ক্যাম্পের কাছে। বিশজন ভাগ হইয়া গেলো চাইর ভাগে। আগে আসা দুইজনের একজন আইসা কইলো, সূর্য ওঠার আগেই আক্রমণ করতে অইবো। কমান্ডারের আদেশমতোই ফজিলন আরো দুইডা মাইয়ারে লইয়া ঢুকলো ক্যাম্পের ভিতর। সবার কোমরে শাড়ির নিচে বান্ধা স্টেনগান। সোজা ঢুইকাই এক সিপাহিরে কইলো, তোমার বসের কাছে লইয়া চলো, আমরা তারে একটা খবর দিতে আইছি। সুন্দরী ফজিলনরে দেইখা সিপাহি বেটা দৌড় দিয়া তার কমান্ডাররে ডাইকা নিয়া আইলো। কমান্ডার উর্দুতে তাদের অন্দরে যাইতে কইলো। অন্দরে যাইয়াই কমান্ডাররে কইলো – দরজা লাগাও, তোমার লগে জরুরি কথা আছে। কমান্ডার সিপাহিরে বাইর কইরা দিলো দরজা লাগায়া। খাস কামরায় গিয়া ফজিলন কোমর থিকা স্টেনগান বাইর কইরা ঝাঁঝরা কইরা দিলো কমান্ডারের বুক। সঙ্গে সঙ্গে চাইরদিকে থাকা মুক্তিরাও খইয়ের মতো আক্রমণ করলো। হেইবার কোনো মুক্তিযোদ্ধা মরে নাই। মরছিল পাকিস্তানি আর্মির ছয় সিপাহি ও তাগো কমান্ডার। অপারেশন শেষ কইরা সূর্য ওঠার আগেই সবাই অবস্থান লইলো বিশাল এক পানের বরজের মাঝখানে।

আকিনূর বিস্ময়াবিভূত চোখে গল্পবলিয়ে তরুণীকে দেখছে আর তার বলা গল্প ভক্ত-শ্রোতার মতো শুনছে। আকিনূরের কানে আর কোনো জল চিরে চলে যাওয়া নৌকার শব্দ আসে না। এমনকি ঠিক কোথায় সে বসে আছে তাও স্মরণে নেই। তরুণী বলতে থাকে –

– হেই পানের বরজ থাকি আবার বাইর হইলো পরের দিন মাঝরাইতে। পানবরজের মালিক মুন্সি ব্যাপারীর বাড়িতে হইছে খাওনের আয়োজন। কোনো আলো নাই। গুটগুইট্টা আন্ধারে সবাই উঠলো ব্যাপারীর বাড়িত। খাওনের মাঝামাঝি সুময় শুরু হইলো গোলাগুলি। চারদিক থিকা পাকিস্তানি আর্মি ঘিরা ফালাইছে ব্যাপারীবাড়ি। শুরু হইলো পালটা গুলি। প্রায় এক ঘণ্টা গোলাগুলির মইধ্যে ফজিলনের লগে থাকা দুই মাইয়ার একজন মারা যায়, সঙ্গে মারা যায় দলের আরো দুই পোলা, হারাধন আর শফিক। শফিক দেইখতে ছিলো কবিরের মতো। হের লাইগা ফজিলন তারে খুব পছন্দ করতো। শফিক মইরা যাওয়ার পর কবিররে আরো বেশি করে মনে পড়ে তার। ফজিলনের মন পোড়ে। নিজে নিজে কথা কয়, কবির কোথায় আছে; গিরামে কি আছে, নাকি পালায়ছে অন্য কোনোহানে? তাইলে তো গিরামে গেলে কবিররে পাওন যাইবো না। কবিররে পাইবো না, এ-কথা মনে হইতেই চোখ ভাইসা কান্দন আহে তার। আর বুকে  স্টেনগান চাইপা পালাইতে থাকে। কাউরেই লগে নিতে পারে নাই ফজিলনরা। অন্ধকারে কোরলিন কইরা ব্যাপারীবাড়ির পিছন দিয়া পালায় ফজিলনসহ বাকিরা। হেরপর কে কোন দিহে গেছে কোনো পাত্তা নাই। ফজিলন একা পালাইয়া আশ্রয় নিলো এক গোয়ালঘরে। ওই ঘরে যে কখন ঘুমাইয়া পড়ছিলো তার মনে নাই। ঘুম থাকি জাইগা, চোখ কচলাইতে কচলাইতে দেহে চারদিকে। কোনোহানে কোনো মানুষের আলাপ পাওন যায় না। বাইর হইয়া বাড়ির উঠানে আইসা খাড়ায় ফজিলন। আস্তে আস্তে ডাকে, কেউ আছেন নাহি বাড়ি? নীরব-নিস্তব্ধ বাড়িতে তার ডাকের শব্দ চক্কর দিয়া মনে লয় আবার তার কাছেই ফিরা আহে। কয়েকবার ডাকার পর এক বৃদ্ধ জানালা দিয়া দেহে, আর জিগায় – কারে চাও গো মা? মা ডাক হুইনা হাঁটু গাইরা উঠানে বইসা পড়ে ফজিলন। চিৎকার করে কাঁদে। মনে পড়ে বাপ-মারে। কই আছে তারা, কেমুন আছে? বৃদ্ধ আইসা তারে লইয়া যায় ঘরে। ঘরে ঢুইকাই অবাক হইয়া যায় ফজিলন। দেহে তিনডা মাইয়া কোনোরহমে ছিঁড়া কাপড় দিয়া গা ঢাইকা রাখছে। অমনি আর দেরি করে না। বৃদ্ধ পুরুষ মানুষটির দিকে উঠাইয়া ধরে স্টেনগান। চিৎকার কইরা ওঠে ওই তিন মাইয়া।

– তিনিই আমাগোরে বাঁচাইছেন। কাইল রাইতে ওই মাদরাসার ক্যাম্পে হানাদার বাহিনীর লোকেরা আমাগোরে ইচ্ছামতোন ব্যবহার করছে। মুক্তির লোকেরা যখন হামলা চালাইলো, তখন এই চাচা নামাজ পড়তে গেছিলো। গোলাগুলির ওই ফাঁকে চাচা আমাগোরে লইয়া পালাইয়া নিয়ে আইলো এই বাড়িতে। এই বাড়িও চাচার না। এইহানে থাকতো এক হিন্দু পরিবার। তাগো এক মাইয়া ও পোলারে পাকিস্তানি বাহিনী ধইরা লইয়া যাওনের পর বাকিরা চইলা গেছে গিরাম ছাইড়া। হানাদাররা জানে, এই বাড়িতে কেউ থাহে না, তাই চাচা আমাগোরে এইহানে নিয়া আইছে।

 

তিন

আকিনূর তরুণীর মুখে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে শুনতে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। নিজের ভেতরে নিজে আছে কিনা টের পায় না।  হানাদারদের বীভৎসতা আর ফজিলনের সাহস তার মধ্যে মেঘ আর আলোর মতো বেজে যায়। পাকিস্তানিদের কঠিন চেহারা তার মনে এক ধরনের মেঘাচ্ছন্ন দেয়াল তুলে রেখেছে। অন্যদিকে ফজিলন, তার কাছে হয়ে উঠেছে সূর্যের আলোর মতো তীক্ষ্ণ এবং ক্ষিপ্র।

– তারপর কী হইলো কও না ক্যান?

– ফজিলন ঠিক করে, এই বাড়িতেই থাকবো কয়দিন। এইহানেই তিন মাইয়ারে ট্রেনিং দিবো। তারপর আক্রমণ হইবো ওই মাদরাসা ক্যাম্পে; কিন্তু আরো তো অস্ত্র দরকার। পাইবো কই? ওই চাচায় কইলো বর্ডারের কাছে মুক্তিবাহিনীর একটা দল আছে। ওইহান থেইকা হয়তো কিছু অস্ত্র জোগাড় করা যাইতে পারে। আর তা না হইলে চুরি কইরতে অইবো পাকিস্তানি ক্যাম্প থাইকা। চাচার দ্বিতীয় কথাটা ফজিলনের মনে ধইরলো। কিন্তু অস্ত্র কেমুন কইরা চুরি কইরতে অইবো? রাইতের মধ্যেই চাচারে কইলো তার লুঙ্গি, পাইঞ্জাবি আর একটা টুপি আনতে। যেই চিন্তা হেই কাজ। পরদিন হাইঞ্জাবেলায় চাচার পাইঞ্জাবি, লুঙ্গি আর চুল ছোট কইরা কাইটা টুপি পইরা মাদরাসার মসজিদের দিকে রওনা করে ফজিলন। পুকুরের ঘাটে গিয়া অজুর ভান কইরা দেইখা লয় সিপাহিগোর অবস্থান। এরই মইধ্যে হুনা যায় আরো কিছু মাইয়ার কান্দনের শব্দ। ফজিলন আর দেরি করে না, পুকুরের পাড় ধইরা পিছন থেইকা ঢুইকা পড়ে ক্যাম্পে। কয়েকজন সিপাহি দরজার বাইরে রাইফেল রাইখা ভিতরে আটক মাইগোর লগে খারাপ কাম করে। ফজিলন চিন্তা করলো, এখন কিছু করা যাইবো না। এখন কেবল তিনটা রাইফেল আর ম্যাগাজিন লইয়া যাইতে অইবো। যেই ভাবা সেই কাজ। তিনটা একে-৪৭ রাইফেল আর দশ-বারোটা ম্যাগাজিন লইয়া ফজিলন সোজা নাইমা পড়ে পুকুরে। অন্ধকারে কিছুই দেহা যায় না। ফজিলন পুকুরের উত্তর পাড় ঘেঁইষা যাইয়া উঠে পুবপাড়ে। রাস্তায় না উইঠা জমির আইল ধইরা কোনাকুনি গিয়া ওঠে ওই বাড়িতে। আইসা দেহে, চাচা মাইয়াগোর লাগি কাপড়সহ বাজার-সদাই নিয়া আইছে। এই বাড়িতেই রাইতে চলে তিন মাইয়ার ট্রেনিং। রানু, বালি আর সুজাতা, এই তিনজন ট্রেনিং নেয় আর ক্ষোভ নিয়া অপেক্ষা করে কখন হামলা চালাইবো ক্যাম্পে। কিন্তু খারাপ খবর লইয়া আহে চাচা। রাইফেল চুরি যাওয়ায় ক্যাম্পে রইটা গেছে এই এলাকায় মুক্তিবাহিনী আইছে। পুরা গ্রামে তল্লাশি করতাছে হানাদার বাহিনী। এই বাড়িও বাদ যাইবো না। যা করার আইজ রাইতেই করতে অইবো। গোয়ালঘরের পাশ থেইকা দুইখান কোদাল লইয়া আইলো ফজিলন। বাড়ির পিছনে জংলামতো জায়গায় খুঁড়তে শুরু কইরলো অদল-বদল কইরা। বিশাল এক গর্ত কইরা ভিতরেই অবস্থান লইলো সবাই। গর্তের মুখ বন্ধ করা হইলো গাছের ডাল-পাতা দিয়া। চাচারে কইলো তার বাড়িতে ফেরত যাইতে। দেখা গেলো, সূর্য ওঠার আগেই হাজির হইলো পাকিস্তানি সিপাহিরা। তন্নতন্ন কইরা খুঁজলো। কাউরে না পাইয়া উল্লাস শুরু কইরা দিলো। কইলো, এই বাড়িতেই তারা অবস্থান করবো। নিরিবিলি বাড়ি। গনিমতের মাল এই বাড়িতেই আইনা উঠাইবো। মহাবিপদে পড়ে যায় ফজিলনরা। তবু সাহসহারা হয় না। অপেক্ষা করে আরেকটা রাইতের। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা ঘটে যায় দুপুরেই। চাচা যখন এই বাড়িতে খাবার লইয়া আইলো, ঝাপটাইয়া ধরলো সিপাহিরা। জিগাইলো, কার জন্য খাবার আনছে। চাচা কইলো কইবো না। চিৎকার কইরা কইলো, মাইয়াগুলারে, কী করছস তোরা? ওরা তোগোরে শেষ কইরা দিবো। এ কটি কথা বলার পরপর এক সিপাহির গুলিতে ঝাঁঝরা হইয়া যায় চাচার বুক। কলমা পইড়তে পইড়তে চাচা লুইটা পড়ে মাটিতে। ফজিলনরা সব দেখতে পায় বাড়ির পিছন থেইকা। কেবল অপেক্ষা রাইতের। রাইতে যে করেই হোক অপারেশন করতেই অইবো। সারাদিন কোনো খাওয়া নাই। সঙ্গে কেবল এক কলসি পানি ছিলো। পানি খাইয়া চারজনে দিন কাবার করলো। হাইঞ্জার একটু পরে গর্ত থাকি বাইর অইয়া বাড়ির চাইরদিকে অবস্থান লয় ফজিলনরা। কথা আছে, শিস দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু অইবো আক্রমণ। যেই কথা হেই কাজ। ফজিলনের শিস হুইনাই শুরু হয় চাইরদিক থেইকা গুলি। ঘরের মইধ্যে থাকা ছয়জন সিপাহির দুইজন পলাইয়া যায়, বাকি চারজন গুলি খাইয়া ওইখানেই মইরা যায়। কিন্তু এইহানেই শেষ না। হুনা যায়, মাদরাসার ক্যাম্প থাকি গুলি কইরতে কইরতে আইতাছে আর্মিরা। ফজিলনরা ছয় সিপাহির অস্ত্রগুলা লইয়া আবারো অবস্থান নেয় গর্তে। আর্মিরা আইসা সিপাহিদের মরা দেইখাই আগুন লাগাইয়া দেয় বাড়িতে। দাউদাউ কইরা জ্বলে বাড়ি।

 

চার

আকিনূর থির বসে থাকে। তার দৃষ্টি সম্মুখে শূন্যতার পর্দায় যেন ভেসে উঠছে তরুণীর বয়ানকৃত দৃশ্য। এখন তরুণীর কণ্ঠ শোনে কেবল, আর দেখে দৃশ্য, যে-দৃশ্য একের পর এক নির্মাণ করে যাচ্ছে তরুণী।

– কোনো মাইনষের আনাগোনা নাই। পোড়াবাড়ি, কোনো আড়ালও নাই। ফজিলনরা রাত পোহানোর পর হারাদিন আর বাইর হইতে পারে নাই গর্ত থেইকা। ওই গর্ত থেইকায় হুনছে চারদিকে মানুষের কান্দন। গিরামের পিরাই সব বাড়িতে হামলা দিছে হানাদাররা। ধইরা নিয়া গেছে কমবয়সী মাইয়াগোরে। রানু, বালি, সুজাতা আর সুময় লইবার চায় না। ফজিলনরে বলে, চলো মাদরাসা ক্যাম্পে হামলা করি। ফজিলন আরো সুময় লইতে চায়। তয় বেশি সুময় না। রাইতে বাইর হইয়া চারজনই মাদরাসার চাইরধার ঘুইরা রেকি কইরা আহে। পরে হারাদিন গর্তে বইসা পরিকল্পনা লয় কীভাবে হামলা করন যায়। ওই ক্যাম্পে কমপক্ষে কুড়িজন আর্মি আছে। আর ফজিলনরা মাত্র চাইরজন; কিন্তু জান হাতে লইয়া হামলা করনই লাগবো। অনেকগুলা মাইয়ারে আটকায়া রাখছে। কোনোমতে তাগোরে মুক্ত করা গেলেই তো দলের সদস্য বাইরা যাইবো। হেই হিসাবে মাদরাসার পিছনে যেই ঘরে মাইয়াগোরে আটকাইয়া রাখা হইছে, হেই ঘরেই প্রথম হামলা করার পরিকল্পনা ঠিক করে ফজিলন। পরিকল্পনা শেষে অপেক্ষা রাইতের। হাইঞ্জা নামনের কিছু পরেই ফজিলন বাইর হইয়া আরেকবার দেইখা আহে আশপাশের পরিস্থিতি। গর্তে ফিরাই তৈরি করতে থাকে অস্ত্র। ভাগ কইরা লয় চাইরজনে। মাইঝ রাইতে বাইর হইয়া বিল ধইরা হাঁটতে থাকে মাদরাসার দিহে। ফজিলন আর সুজাতা গেলো মাদরাসার পিছনে যেইহানে মাইয়াগোরে আটক করা হইছে। বালি আর রানু গেলো মাদরাসার সামনের দিকে, যাতে আক্রমণ করার সুময় কেউ বাইর অইতে না পারে। ফজিলন আর সুজাতা কোরলিন কইরা ওই ঘরের দরজার সামনে গিয়া খাড়ায়। কান পাইতা হুনে। কয়েকটা মাইয়া বিলাপ কইরা কানতাছে। আর একজন কইতাছে, আমার উপরে আর কতজন সওয়ার হইবেন। আমি তো মইরা যামু। আমারে ছাইড়া দেন। অমনিতেই ভাইসা আসে অট্টহাসি। হানাদার বেটারা মাইয়াগো ফরিয়াদ হুইনা হাসে। ফজিলন আর থির থাকতে পারে না। দুইজনে গুলি কইরতে কইরতে ঢুইকা পড়ে ভিতরে। হাউমাউ কইরা আটক মাইয়ারা যে যেভাবে পারছে বাইর হইয়া পালাইতে শুরু করে। ওইদিকে সামনে থেইকা আক্রমণ শুরু করে বালি আর রানু। মাইয়াগোর ঘরে থাকা চাইর জওয়ানরে কিছু বুইঝা ওঠার আগেই কতল করে ফজিলন আর সুজাতা। এর মইধ্যেই ওগোরে ঘিইরা ফেলে আর্মিরা। ওইদিকে সুজাতা আর রানুর কোনো আলাপ পাওয়া যায় না। ফজিলনরা আবার গুলি চালাইতে শুরু করে। তাগোর দিকে ছুইটা আসে পালটা গুলি। সুজাতার ঠিক বাঁ-বুকে আইসা লাগে গুলি। ঝাঁঝরা বুক লইয়াও অনেকক্ষণ গুলি চালাইলো। কিছুক্ষণ পর হুইয়া পড়লো মাটিতে। একহাতে স্টেনগান তুইলা কইলো – ‘জয় বাংলা’। আর কোনো শব্দ পাওয়া যায় নাই সুজাতার মুখে। ফজিলন গুলি কইরতে কইরতে মাটিতে কয়েক গড়ান দিয়া পড়লো পুকুরে। দেখলো, হেই সুময় বালি আর রানুরে ঘিরা রাখছে চাইর জওয়ান। পালাও ফজিলন কইয়াই ওরা চালাইতে শুরু করলো গুলি। দুই জওয়ান কতল হইলেও বাকি দুই জওয়ানের গুলিতে মাটিতে লুইটা পড়ে বালি আর রানু। দুইজনেই একলগে চিৎকার কইরা কয় ‘জয় বাংলা’। এরপর দুই রাউন্ড গুলির শব্দ ছাড়া আর তাগোর কোনো কথা হুনা যায় নাই। ততক্ষণে ফজিলন ওই এলাকা ছাইড়া অন্য এলাকার পথে। পাঁচ

এরপর ফজিলনের গন্তব্য কোথায়? দলহারা এই যোদ্ধা বারবার একা হয়ে যাচ্ছে। প্রথম তাকে একা করেছে কবির। তারপর দলছুট হয়ে দল গড়া, আবার একা হয়ে যাওয়া। আকিনূরের ইচ্ছা করে চিৎকার করে বলে, ফজিলন যেন তাকে সঙ্গে নিয়ে চলে। কিন্তু গলা থেকে কথা সরে না। কেবল দেখে, বিধ্বস্ত গ্রামের পর গ্রামের ভিতর দিয়ে ছুটে চলেছে এক ফজিলন। যতদূর ছুটে যাচ্ছে ততদূর লেখা হয়ে যাচ্ছে একটি নাম ‘বাংলাদেশ’। এই নামটির জন্যই একদিন কবিরকে ছেড়ে যুদ্ধে নেমেছিল ফজিলন। আকিনূরের মনে অনেক ঘৃণা দলা পাকিয়ে ওঠে কবিরের জন্য। আকিনূর কবিরকে সরিয়ে দিতে চায় আর ফজিলনের সামনে গিয়ে নিজেই দাঁড়াতে চায়। বৈঠার আঘাতে ছিঁড়ে-যাওয়া জলের মতো তার পাঁজরও যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। ফজিলনের এই দৃশ্য সে আর দেখতে চায় না। এসব ভাবতে ভাবতে আকিনূর রক্তচোখে আবারো দেখতে থাকে তরুণী-বিরচিত দৃশ্য।

– ফজিলন দৌড়ায় আর কবিরের কথা ভাবে। আইজ কবির যদি লগে থাকতো আরো সাহস লইয়া যুদ্ধ করা যাইতো। হারা রাইত কাবার হইয়া যায়, ফজিলনের হাঁটা থামে না। একসময় ফজরের আজানের পরপর আইসা দাঁড়ায় এই গাঙের পাড়ে। কোনো মানুষের আনাগোনা নাই। গিরামের বাড়িঘর বলে কিচ্ছু নাই। গাঙপাড়
থিকাই ফজিলন দেখে খাড়াইয়া আছে তাগো পোড়াবাড়ি। কোথায় তার বাবা-মা হেই খবর লওনের মতো কোনো মানুষের দেখা মিললো না। পুরা গিরামে কোনো মানুষ নাই। গাঙ পার অওনের নৌকা নাই। গাঙপাড় ধইরা হাঁটতে হাঁটতে একসুময় দেখলো, একটা নৌকা বান্ধা ঘাটে। ওই নৌকা লইয়া নিজে বৈঠা বাইয়া পার হইলো ওইপারে। রাস্তা ধইরা না যাইয়া, জমির আইল ধইরা গিয়া উঠলো কবিরদের বাড়ি। কবিরের বাবা-মা ফজিলনরে দেইখা শুরু করে চিৎকার। কবির ঘর থিকা বাইর অয় না। ফজিলন দৌড়াইয়া ঘরের ভিতর যায়। কয়, কবির দেখো, আমি যুদ্ধ থেকে আইছি তোমারে নিতে। তুমি থাকলে আমি আরো যুদ্ধ করুম। তোমারে আমি স্বাধীন একখান দেশে বিয়া করুম। হেইদিন আমাগোর লগে আর কেউ মাথা তুইলা কথা কইতে পারবো না। আমাগোরে গনিমতের মাল ভাববো না কেউ। আমি তখন বউ অইয়া তোমার সংসার করুম। চলো কবির যুদ্ধে যাই। এই সুময় কবিরের মা চিৎকার কইরা ওঠে – ‘হুনো, তুমি যদি না যাও আমরা তোমারে হানাদারগো হাতে উঠাইয়া দিমু। আমার ছেলে মুক্তিবাহিনীতে যাইবো না। হে মুক্তিবাহিনীর খবর দেয় পাকিস্তানিগো কাছে। তোমার খবরও দিয়া দিবো।’ ফজিলন বিশ্বাস কইরতে পারে না কবিরের মায়ের কথা। সে আরো সুময় লয়। কবিরের ধারে বইসা থাহে। কবির কোনো কথা কয় না। কিছুক্ষণ পরেই দেখে, কবিরের বাবার লগে ঘরে আইসা ঢুকলো দুই আর্মি জওয়ান। ফজিলনের চুল ধইরা টান মাইরা খাড়া কইরা কয়, খুব সুরত লেরকি হায়। ফজিলন চুপ অইয়া যায়। কোমরে বান্ধা স্টেনগান তুইলা দেয় আর্মিগো হাতে। কোনো কথা ছাড়াই হাঁটতে থাহে আর্মি ক্যাম্পের দিহে। ক্যাম্পে একটা ঘরে আরো মাইয়াগো লগে রাখে ফজিলনরে। রাইত ঘনাইয়া আইলেই তারে এক জওয়ান আইসা লইয়া যায় কমান্ডারের ঘরে। কিছুই কয় না। কমান্ডার ফজিলনের কাপড় ধইরা টান মারার লগে লগে চোখ তুইলা তাকায়। কোমরে বাইন্ধা রাখা হাত-বোমাটা ছুইড়া মারে কমান্ডারের দিহে। চারদিকে অন্ধকার হইয়া যায়। ক্যাম্পে আটকা বাকি মাইয়ারাও চিল্লাচিল্লি কইরা পালাইতে থাকে। হেই দলে ফজিলনও আছিলো বইলা হুনা যায়। কিন্তু ফজিলনরে আর কেউ কোনোদিন দেখছে বইলা হুনা যায় নাই।

 

আকিনূর তরুণীর কথা শেষ না হতেই তীরের মতো তীব্র ফলা তুলে দাঁড়ায়। কেঁপে ওঠে নৌকা। লাফ দিয়ে উঠতে থাকে নদীতীরের দিকে। পিছন থেকে তরুণী ডাকে, কই যাও আকিনূর? আকিনূর পিছন ফিরে না তাকিয়েই উত্তর দেয়, ফজিলনরে খুঁইজতে যাই। আমারে থামাইও না, আমি বাংলাদেশরে খুঁইজতে যাই। পিছন থেকে তরুণীর কণ্ঠ বাতাসের মতো ভেসে আসে, কোথায় যাও, এইতো আমি এইহানে, আমিই ফজিলন। তীব্রবেগে পিছন ফিরে তাকায় আকিনূর। দেখে শূন্য নৌকাটি ভাসছে নদীর জলে। কেউ নাই। কোনো তরুণী কিংবা ফজিলন। আকিনূর পা চালায়। ফজিলনের খোঁজে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: