বইপোকা

লেখক:

কানাই কুন্ডু

অঞ্জনকে সবাই বইপোকা বলে। কিন্তু অঞ্জন বই খায় না, পড়ে। মানুষের নানা অভ্যাস থাকে। কেউ ঘুড়ি ওড়ায়, গান গায়। নাচে, কেউ গপ্পো-কবিতা লেখে, নাটক করে। কেউ অভিনেতা, পরিচালক, আবার কেউ গুছিয়ে ঘর-সংসার করে। অঞ্জন এসব করে না। পড়ে। যত পুরনো, ততো আগ্রহ। এই অভ্যেসে সে বাংলাবাজারের পুরনো বইপাড়ায় ঘোরে। ইউনিভার্সিটির চত্বরে, আড়ংয়ের ফুটপাতে বিছানো যত নানান নতুন-পুরনো বই। আবার পাইরেসির ইংরেজি বা ইন্ডিয়ার লেখকদের বই খোঁজে। কোনোটার মলাট ফর্দাফাই, হলদেটে পাতা পোকায় ফুটো করা। অথবা টাইটেল পেজ নেই। নেই লেখকের নাম বা শেষের পৃষ্ঠা। ওপরে আঠা দিয়ে জড়ানো কাগজে নাম এবং লেখকের নাম। সেটা হুমায়ূন আহমেদ, আজিজুল হক বা হায়াৎ মামুদও হতে পারে।

এভাবেই গোলাম মুরশিদ, আনিসুজ্জামান সাহেব, শামসুল হক, রণেশ দাশগুপ্ত, ওয়ালিউল্লাহ্ থেকে পদাবলি সাহিত্য, মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথের, এমনকি বিদ্যাসাগরের রচনাও তার সংগ্রহে। ড্যানিয়েল ডিফো, চার্লস ল্যাম্ব, শলকভ, ডস্টয়েভস্কি, টলস্টয় থেকে কামু, শাঁর্ত, বর্হেস, চিনুয়া আচিবি প্রমুখ। ব্যতিক্রম কেবল উইপোকার মানচিত্র একটি সঞ্চয়িতা।

সকালের এজমালি খবরকাগজ হাতে আসতে প্রায় নটা। তাও পাতা ভাগ করে পড়া। কেউ আবার আলাদা কাগজ নেয়। তিন নম্বর রুমের নতুন ছোকড়া আশফাক নেয় ইংরেজি কাগজ। বিজ্ঞাপন দেখে চাকরির দরখাস্ত পাঠায়। হামিদুলের গল্পবাতিক। সে কাগজে নেয় শুক্রবার। নটার আগে থেকেই নিচে জমানো চৌবাচ্চার জলে স্নানের হুড়োহুড়ি। দুমুঠো গুঁজে বেরিয়ে পড়া।

অঞ্জন যায় দশটায়। তার তাড়া নেই। ভিড় কমলে স্নান-খাওয়া সেরে হাঁটতে হাঁটতে গুলশানে সরকারি দপ্তর। একই চেয়ার-ট্যাবলে এক খাতা থেকে অন্য খাতায় টোকাটুকিতে বিশ বছর। অথচ এই চাকরিতে বহালি হতে গ্র্যাজুয়েশনের প্রথম বিভাগ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা! ছুটির পর ফুটপাত থেকে ফুটপাতে বই খোঁজা। নিজের তালিকা নির্মাণ। মাসের তলব পেলে, এক সপ্তাহ ধরে কেনাকাটা। দোকানদার তাকে চেনে। তার পছন্দের বই সরিয়ে রাখে। না কিনতে পারলে অন্য খরিদ্দারকে বিক্রি করে।

একবার কেনাকাটায় তার সঙ্গী ছিলাম। ভাইঝির এমএ ক্লাসে বায়রনের বই দরকার। অঞ্জন বুদ্ধি বাতলেছিল, অত টাকা খরচ করে নতুন কিনবেন কেন, পুরনো বইয়ের দোকানে পাবেন। অনেক সস্তা।

অফিসপাড়া থেকে হাঁটতে হাঁটতে লঞ্চঘাট। আমার ধৈর্য এবং হাঁটার ক্ষমতা শেষ। অঞ্জন তখনো আশ্বাস দেয়, ঠিক পাওয়া যাবে। আর একটু এগোলেই বাংলাবাজার। জগন্নাথ কলেজের আশপাশে হয়তো পাব।

চলো কোথাও একটু বসি। চা খাই।

আগে বইটা কিনি। অকারণ খরচ করবেন কেন?

পার্কের বাস-স্টপেজের এক দোকানে সত্যিই পাওয়া গেল। প্রায় একটা ডায়েরির আকৃতি। মলাট ঝাপসা। ম্যাটমেটে বোর্ডে নতুন করে লেখা : বায়রনস পোয়েমস। কবিতা তখনো পোয়েট্রি হয়নি। প্রিফেসের পাতা থেকে তার অস্তিত্ব। প্রকাশকাল ১৮১৩, দ্বিতীয় মুদ্রণ। শেষের পাতায় ফুলের ছবি। এবং টেম্পল প্রেস, লেচওয়র্থ, গ্রেট ব্রিটেন। ব্রিটেন তখন গ্রেট ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর বই একবিংশ শতাব্দীর ফুটপাতে। দাম অঞ্জনের খাতিরে মাত্র চল্লিশ।

সেই দিন থেকে আবার চোখে অঞ্জন ভিন্ন মানুষ এবং একা।

অঞ্জনকে রোগাসোগাই বলতে হয়। লম্বা, চোখের চশমায় হাই পাওয়ার। কাঁচা-পাকা চুল। পায়ে রবার পলিথিনের চটি। খানসামার মতো খাটো পাজামা এবং হাফহাতা ছোট ঝুলের পাঞ্জাবি। এবং পদাতিক। মেসে ফিরে লুঙ্গি-গেঞ্জি। ফিরতে ফিরতে রাত্রি আটটা। কাগজের ঠোঙায় সামান্য মুড়ি-চানাচুর।

আমরা ঢাকার এই গলিতে এক প্রাচীন মেসের বাসিন্দা। আলমসাহেব মালিক। নাম বদলে এখন গেস্ট হাউস। আগে আমরা বোর্ডার ছিলাম। এখন আলমসাহেবের ভাষায় পেয়িং গেস্ট। তিনি সকালে আসেন। রাত্রি নটায় নিজস্ব ফ্ল্যাটে ফিরে যান। নিচে চৌবাচ্চা, বাথরুম এবং একপাশে কিচেন। নিচেরই একটি ঘরে ডাইনিং। সারাবাড়িতে মোট আটটি কামরা। একটিতে আলমসাহেবের দপ্তর। বাকি সব গেস্টরুম। তবু মোট ছয় কামরার চবিবশজনই পুরনো অভ্যেস এবং পরম্পরায় একে মেস বলে থাকি।

প্রতি তক্তপোষের মাথার দিকে কিছুটা ফাঁকা জায়গা। সেখানে কারো আলমারি, শেলফ, র‌্যাক বা টেবল নিজের টাকায় কেনা। কোনো বোর্ডার চলে গেলে, সস্তায় কেনা। যেমন সিরাজুল তক্তপোষে বসে মাথার পাশের টেবল টেনে ছাত্রদের খাতা দেখে। তাহের ভালো চাকরি করে। তার ট্যাবল এবং আয়না লাগানো আলমারি। সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকেই চুল ঠিক করে। অঞ্জনের মাথার দিকে নাইলনের দড়ি টাঙানো। সেখানে পরিধেয় ঝোলানো। পাশের ফাঁকা অংশে ইটের ওপর তক্তা পাতা। সেখানে বইয়ের পিরামিড। পড়াশোনা তক্তপোষে। প্রতি কামরায় ঝুলে কালো হয়ে যাওয়া দুটি সিলিং ফ্যান। দেয়ালে তিনটি টিউব। কারো রেডিও, ট্র্যানসিস্টর। তাহেরের ছোট টিভি এবং রঙিন। কেউ গান শোনে, কেউ টিভি দেখে, আবার কখনো বা তাস খেলে। অঞ্জন বই পড়ে। আর এই পড়া নিয়েই সেদিন তুমুল হট্টগোল। বিরক্তি এবং কলহ। আলোটা নেভান না মশাই। কটা বাজে দেখছেন?

আলো তো সবই নেভানো, শান্তভাবে বলে অঞ্জন।

আপনার ট্যাবল ল্যাম্পটা।

আর মাত্র দেড় পৃষ্ঠা।

সময় যায়। ঝগড়া-চিৎকার তীব্র হয়। সিরাজুল উঠে ল্যাম্পের প্লাগ খুলে দেয়। তাহের চোখের ওপর থেকে রুমাল সরায়। এবং পরের বুধবার মেসের নিয়ম অনুযায়ী আলমসাহেবের দপ্তরে সবাই উপস্থিত। এবং আমিও। সিরাজুল শুরু করে, আপনি আগাম ফেরায়া নেন, অথচ গেস্টদের অসুবিধার খবর রাখেন না।

আলমসাহেব থমকে যান। আপনারা না জানালে অসুবিধা বুঝব কেমন করে।

রাত্রে বিশ্রাম আর দুমুঠো খাবারের জন্যে বোর্ডিংয়ে থাকা, তাহের বলতে চায়…

এটা বোর্ডিং না। গেস্ট হাউস।

দুইটা কথার একই অর্থ। বেশ গেস্ট হাউস, কিন্তু বিশ্রামের ব্যাঘাত…

হঠাৎ ব্যাঘাত কেন?

রাত্রে ঘুমোতে না পারলে কীসের বিশ্রাম। সিরাজুলের অভিযোগ।

কে ঘুমাইতে না করে?

আরে মশায়, রাত দুটোয় আলো জ্বালিয়ে রাখলে…

কে? ওহ্ অঞ্জন!

কীসের এতো পড়া! এই যে সিরাজুলদা স্কুলে পড়ান। তাকেও এতো পড়তে দেখি না।

সিরাজুলের অবজ্ঞা, বানান করে পড়ে মনে হয়। মগজে কিছু ঢোকে বলে মনে হয় না।

অঞ্জন আস্তে বলে, আপনারা গান শোনেন, টিভি দেখেন, তিনজন তাস খেলতে খেলতে ঝগড়া করেন, আমি তো বিরক্ত হই না। মগজ জ্ঞান এসব প্রসঙ্গ না তোলাই ভালো।

তেড়ে আসে তাহের, সিরাজুলদার চেয়ে আপনি বেশি বোঝেন?

আমি তো এমন দাবি করিনি। উনি অনেক বেশি বোঝেন নিশ্চয়ই। তবে এক ছাত্রের খাতায় ওনাকেও ভুল লিখতে দেখেছি।

সিরাজুল চিৎকার করে, ভুল লিখেছি? আমি?

তেমন কিছু নয়। হোমারের জন্মস্থান আয়োনিয়া লিখেছেন।

হ্যাঁ, তাই তো।

না, তা নয়। গ্রিসের সাতটি শহরকে ঘিরে তাঁর জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক আছে। এবং জন্মসালও ৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নয়। তাঁর জন্মের তারিখ আজো নিরূপিত হয়নি অভ্রান্তভাবে। এমনকি ওডেসি যে তাঁরই রচনা, নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। সমস্তই অনুমানভিত্তিক।

সিরাজুল গুটিয়ে যায়। এই তথ্য আমার জানা নেই। আমি ইংলিশ ভার্সন পড়েছি। র্যুর সম্পাদনা।

এই র্যু কে জানেন? অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির দায়িত্বে ভারতের বোম্বাইতে এসেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কিছুকাল সৈনিকের চাকরি করেছেন।

সিরাজুলের অহমিকা চুপসে যায়, আমার স্কুলের দেরি হচ্ছে, বলে বেরিয়ে যায়।

 

ইদানীং অঞ্জনের সঙ্গে দেখা হয় না। মেসে থাকলেও, সে চিলেকোঠার ছোট খুপরিতে উঠে গেছে। একদিন দেখতে গেলাম। হাতে একটা মলাটছেঁড়া বই। আমাকে দেখে সরে বসে। মাথার ওপরের দিকে একটা ঘুলঘুলির মতো জানালা। সিলিংয়ে ঝোলানো বিবর্ণ দুই ব্লেডের পাখা। দেয়ালে বাল্ব। তক্তার ওপর বইয়ের পাহাড়। পাশে বসে বলি, নতুন কী পড়লে অঞ্জন?

ঠিক বলতে পারব না।

হাতে বই। অথচ বলতে পারবে না!

এটার নাম কলকাতার হাট হদ্দ। ১৮৬৪-তে ছাপা। লেখকের নাম নেই। পুরনো দিনের কলকাতাকে জীবন্ত দেখতে পাই। বেনামে কালীপ্রসন্ন সিংহের লেখা মনে হয়।

কিন্তু এই আলো-হাওয়াহীন ঘরে তুমি তো অসুস্থ হয়ে পড়বে।

আলো আসে তো। হাওয়াও পাই।

কিছুদিন বাইরে যাও। দেশগ্রামে যাও জানি। সেখানে তো তেমন কেউ নেই শুনেছি। দূরে কোনো আত্মীয়ের বাড়ি? সুন্দরবন বা চাটগাঁও যেতে পারো। এক রাত্রের পথ।

ওই টাকায় পনেরোটা বই কেনা যাবে। দেশ-বিদেশের অনেক বই আছে। ওতেই আমার ঘোরাফেরা।

এই কারণেই হয়তো ওকে পোকা বলে। এবং কিপ্টা।

সে এখন তোফা আছে। অনেক রাত পর্যন্ত পড়ে। ঝগড়া-ক্যাচাল নেই। যখন ইচ্ছা ঘুমোয়। ইচ্ছেমতো ফেরে। বই কেনে। আমরাও নিয়মিত অফিস যাই। বৃহস্পতিবার সারা সপ্তাহের কেনাকাটা ব্যাগে ঠুসে রাখি। অফিস থেকেই ছুটির পর লঞ্চ ধরে কুতুবদিয়া। সেখানে বাবা-মা, পোলাপান। আবার শনিবার ভোরে রওনা। এগারোটায় সোজা অফিস। সন্ধ্যায় মেস… না না, গেস্ট হাউসে ফেরা। এই আবর্তে জীবনের অনেক বছর ক্ষয় হয়। বুড়ো হই।

সেদিন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সময় থমকে দাঁড়াতে হলো। আলমসাহেবের দপ্তরে ভিড়। দুজন পুলিশকে দেখতে পাই। কৌতূহলের তাগিদে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখি, সিরাজুল। সে বলছে, কার ভেতর কী লুকিয়ে আছে আলম সাহেব, আপনি জানবেন কেমন করে। এমন হতেই পারে। নয়তো কারো পক্ষে এতো বই কেনা সম্ভব!

সবই তো ছিঁড়া। পোকায় কাটা।

পুরনো বলে তার দাম নেই?

পুলিশের অফিসার বলে, রেয়ার বুকসের দোকান থিকাই এ-অভিযোগ।

প্রসঙ্গ যখন পুরনো বই, নিশ্চয়ই অঞ্জনকে নিয়ে গোলমাল। আমার আগ্রহ বাড়ে। জানতে চাই।

অফিসার বলে, পরশু রাতে এক বিখ্যাত পুরানা বইয়ের দোকানের শাটার ভেঙে চুরি। ফুটপাতের স্টলেও কিছু বই পাওয়া গেছে। সেই স্টলের হকার বলছে যে, এই মেসবাড়ির বাবুকে দুইখান বিক্রি করছে। তারই তদন্তে আমরা।

প্রতিবাদ জানাই, বই পুরনো হলেও সব বই চোরাই নয়।

হকার এই মেসের কথাই বলছে।

হ্যাঁ, ও-ই তো বই কেনে। কী করে কে জানে!

অফিসার আমার দিকে তাকায়, চলেন। আপনাকে থানায় যেতে হবে। সেখানে যা বলার বলবেন।

সিরাজুল তাহের কাদিররা বলে, না না, ইনি নন। যে কেনে, সে এখনো ফেরেনি।

সঙ্গের কনস্টেবলটি বলে, তাইলে তো ফেরার হইছে!

আলমসাহেব বলে, সে বিগত দশ বছর থিকা বই কিনে। পড়াই তার অভ্যাস। এখনই আসার সময়।

অফিসার গম্ভীর। তাইলে তো গভীর চক্রান্ত। বিনা লাইসেন্সে কারবার করে। তাও চুরাই মাল। অথচ আমাদের নাকের আগায়।

সে বই বিক্রি করে না। দৃঢ় মত জানাই।

তাহের আমাকে শোধরানোর চেষ্টা করে, এভাবে আপনে বলতে পারেন না। আমি ওকে বই নিয়ে মাঝে মাঝে বেরোতেও দেখছি।

সিরাজুল কাদের ইসমাইলরা বলে, আমিও।

অঞ্জন ফেরে। হাতে পুরনো বই। কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে এগোয়। সিরাজুল অফিসারকে বলে, ওই তো আপনের আসামি।

আমিই অঞ্জনকে ডাক দিই। তুমি সম্প্রতি বাংলাবাজারের ফুটপাত থেকে কোনো বই কিনেছ?

কোন দোকান থেকে কখন কোন বই কিনি, মনে নেই।

সব পুরানা, অফিসারের জিজ্ঞাসা।

হ্যাঁ, পুরনো। কেন!

রবার স্ট্যাম্প আছে?

থাকতে পারে।

আমরা দেখতে চাই।

ওপরে আসুন, বলে সে ওপরে উঠতে থাকে। পেছনে পুলিশ। সিরাজুলের দলবল। আমি আলমসাহেবকে সঙ্গে নিয়ে চলি।

অঞ্জনের ঘরের দরজায় কোনো তালা নেই। দড়ির ফাঁস বাঁধা। অফিসার অবাক। বলেন, চুরি হয় না।

আমাদের বোর্ডাররা কেউ চোর নয়। তাছাড়া নেওয়ার মতো আছেই বা কী! তাই দরকার হয় না।

অফিসার নিজের প্রশ্নে কিছুটা বিব্রত। অঞ্জন দড়ির ফাঁস খোলে। অন্ধকার ঘর। ভ্যাপসা গন্ধ। আলো-পাখার সুইচ অন করে অঞ্জন। বিছানাময় ছড়ানো বই। মাথার দিকের তাকের ওপর বইয়ের অরণ্য। অফিসার বলে, করছেন কী মশাই। এই ছাইভস্ম এখন হাতড়াতে হবে! কনস্টেবলকে আদেশ দেয়, রবার স্ট্যাম্পমারা বই আলাদা করো।

কনস্টেবল তালকানা। পাতা উলটে, মলাট খুলে, স্ট্যাম্প খোঁজে। জঞ্জাল সরানোর মতো নিচ থেকে ওপরে তুলে পাহাড় জমায়। মলাট খসে পড়ে। ছেঁড়া পাতা হাওয়ায় ওড়ে। কাতর চোখে অঞ্জন তাকিয়ে থাকে। কারো কোনো প্রতিবাদ নেই দেখে, আহত হয়।

সিরাজুলের দলের মন্তব্যে উপাচার : সব লটে কেনা, এত বই আসে দেখি নাই, ইংরাজি বইও আছে দেখি…

অফিসার ইংরাজি নামের রবার স্ট্যাম্প লাগানো এগারোখানা বই বেছে নেন। কোথাও বোধোদয় লাইব্রেরি, হারবার্ট কলিন্স, ম্যাসাচুসেটস ইউনিভার্সিটি, হামিদ অ্যান্ড শেফার্ডস, শহীদনগর পাঠাগার, জিন্না লাইব্রেরি ইত্যাদি। লিস্টটা সিরাজুলের হাতে দিয়ে বলেন, এগুলো আমি সিজ করলাম। আপনে উইটনেস।

না না। আমি ব্যস্ত মানুষ। কোর্ট-কাছারি করার সময় নাই। এই এনার সই নেন, বলে কাগজটা আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়।

আমি সই করে, বই কবে ফেরত পাব জানতে চাই।

কেস মিটলে থানা থিকা ইনট্যাক্ট ফেরত পাবেন। দড়ি দিয়ে বই বেঁধে, অঞ্জনকে বলে, আপনি চলেন আমাদের সঙ্গে।

কোথায়, জিজ্ঞাসা করি আমি।

থানায়।

কেন?

বড় সাহেবের হুকুম।

চোরাই বই না থাকলেও?

অ্যারেস্ট তো করি নাই। বড়সাহেবের সঙ্গে কথা বলবেন। আপনেও আসতে পারেন।

থানা থেকে ফিরিয়ে আনা গেলেও কোর্ট-কাছারি এড়ানো যায়নি। বছর তিনেকের টানাপড়েন। সাংসদ-বিধায়ক, উকিল-মহুরি, হাজিরা সত্ত্বেও শেষ রক্ষা হলো না। দুটি বই যে চোরাই মালের অন্যতম, সন্দেহাতীত এবং স্বীকারোক্তিতে প্রমাণিত। চোরের অপরাধ কবুল, ফুটপাতের দোকানদারের শনাক্তকরণ এবং অঞ্জনের নিরপরাধ অজ্ঞানতায় বই সংগ্রহ ইত্যাদি তথ্যে পাঁচ মাসের কারাদন্ড।

নানা ব্যস্ততা, বাড়ির তাগিদ অথবা অনাগ্রহের আলস্যে অঞ্জনের আর খবর নেওয়া হয়নি। তৃতীয় মাসের মাঝামাঝি আবার গেলাম দেখা করতে। অঞ্জনের কোনো বিমর্ষতা নেই। বলে, আপনি কেন কষ্ট করে আসেন। এখানে কোনো অসুবিধা নেই। জেলর সাহেবকে বই চাইলে পড়তে দেন। সারারাত আলো জ্বলে। কেউ বিরক্ত করে না। অনেক রাত পর্যন্ত বই পড়ি। বেশির ভাগ নূতন। এই কটা মাস একটু পড়াশোনা করে নিই…

আমি স্তম্ভিত। জেলখানা বা ঘুপচি ঘর, পোকাদের কোনো অসুবিধে নেই।