বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে

সৈয়দ শামসুল হক

এই পৃথিবীতে আর আকাশ দেখিনি আমি এত অবনত –
ঘুমন্ত শিশুর মুখে যেন চুমো খাবে পিতা নামিয়েছে মুখ;
প্রান্তর এতটা বড় যেন মাতৃশরীরের ঘ্রাণলাগা শাড়ি;
আদিকবি পয়ারের মতো অন্ত্যমিল নদী এত শান্তস্বর;
এতই সজল মাটি কৃষকের পিঠ যেন ঘামে ভিজে আছে;
যদিও বৃষ্টির কাল নয় তবু গাছ এত ধোয়ানো সবুজ;
দেখিনি এমন করে পাখিদের কাছে ব্যর্থ ব্যাধের ধনুক –
মানুষের কাঁধটিকে বৃক্ষ জেনে বসে তারা এত স্বাভাবিক;

এ কেমন? – এমনও কি ভিটে হয় কারো এই পৃথিবীতে যার
বাড়ির গভীরে আছে সকলের বাড়িঘর এতখানি নিয়ে;
এভাবে ওলান থেকে অবিরল দুধ ঝরে পড়ে যায় – এত
শব্দ কোনো গ্রামে আমি কোনো বিবরণে আর কখনো পাইনি;
কোথাও দেখিনি আর একটি পল্লীতে এত অপেক্ষায় আছে
রাখালের মতো তার গ্রীবা তুলে মানুষের স্বপ্নের সময়।
এখানে এসেছি যেন পথই টেনে নিয়ে এল এই পল্লীটিতে।

সকল পথের পথ পল্লীটির দিকে অবিরাম ঘুরে গেছে –
গিয়েছিল – একদা যখন এই পল্লীটির কালো মাটি থেকে
একটি নতুন শিশু উঠে এসেছিল, আর এই পল্লীটিরই
পাশ দিয়ে মাটির দুধের মতো বহে যাওয়া নদীটিতে নেয়ে
ক্রমে বড় হয়েছিল আর চেতনার কামারশালায় বসে
মানুষের হাতুড়ি নেহাই লোহা প্রযুক্তির পাঠ নিয়েছিল,
সকল পল্লীকে তার আপনার পল্লী করেছিল। সেই তাঁরই
টগবগে দীর্ঘদেহ ছিল, মানুষ দেখেছে – দেখেছিল তাঁকে –
বাংলার বদ্বীপব্যাপী কঙ্কালের মিছিলের পুরোভাগে, তাঁকে
দেখেছিল চৈত্রের অগ্নিতে তারা, আষাঢ়ের বর্ষণের কালে,
মাঘের শীতার্ত রাতে এবং ফাল্গুন ফুল যখন ঝরেছে,
যখন শুকিয়ে গেছে পদ্মা, আর যখন সে বিশাল হয়েছে,
যখন ষাঁড়ের ক্ষুর দেবে গেছে, আর মাটি রক্তে ভিজে গেছে,
যখন সময়, আর ঘরে ঘরে দুর্গ তৈরি শুরু হয়ে গেছে।
এখানে এসেছি যেন পথই টেনে নিয়ে এল এই পল্লীটিতে।

টেনে নেবে পথ; যদিও অনেকে আজ পথটিকে ভুলে গেছে,
যদিও এইতো দেখি, কন্টিকারী ফেলে ফেলে পথটিকে কেউ
পথিকের জন্যে বড় দুর্গম করেছে, এবং যদিও জানি
কেউ কেউ আমাদের পথের সম্বল সব খাদ্যপাত্রগুলো
মলভা-রূপে আজ ব্যবহার করে; বিষ্ঠায় পতিত হবে
অচিরে তারাই; আমি করতল থেকে খুঁটে খাব; সঙ্গ দেবে
আমাদেরই পথের কবিতা; আমাদের প্রধান কবিকে যারা
একদিন হত্যা করে তাঁর জন্মপল্লীটিতে মাটিচাপা দেয় –
কতটুকু জানে তারা, কত ব্যর্থ? – জেগে ছিল তাঁর দুটি হাত,

মাটির গভীর থেকে আজো সেই হাত – পরণকথার মতো –
স্মৃতির ভেতর থেকে উচ্চারণমালা, নদীর গভীর থেকে
নৌকোর গলুই; পথিকের পদতল কাঁটায় রক্তাক্ত যদি,
সেই রক্তে শোধ হোক তাঁর কাছে ঋণ; মানব প্রসিদ্ধ কৃষি
খুব ধীরে কাজ করছে; পাখিরা নির্ভয়; আর আমিও পৌঁছেছি;
আমারই ভেতর-শস্য টেনে নিয়ে এল আজ আমারই বাড়িতে।

পুনর্মুদ্রণ : বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতা
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর
আগস্ট ২০১৬

Leave a Reply

%d bloggers like this: