সাহিত্য মাসিক কালি ও কলমের বঙ্গবন্ধু

জন্মশতবর্ষ সংখ্যা বিপুলভাবে পাঠক-আদৃত হয়েছিল।  এবার  আবুল  হাসনাতের  সম্পাদনায়  বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ স্মারক শিরোনামে বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে তা গ্রন্থরূপ পেল (মার্চ, ২০২১)। কালি ও কলমের সম্পাদক প্রয়াত আবুল হাসনাতের এটি শেষ সম্পাদনাকর্ম। মিতায়তন ভূমিকায় তিনি বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম প্রসঙ্গে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন এবং এই সংকলনের অন্তর্বস্তু ও তাৎপর্য ব্যক্ত করেছেন :

আমরা এই গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর বহুমুখী রাজনৈতিক কর্মধারা, বাঙালিত্বের সাধনা, অসাম্প্রদায়িক বোধ প্রসারে অঙ্গীকার, শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন, মানবিকতা এবং নবগঠিত রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কল্যাণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজনির্মাণের জন্য যে-দিকনির্দেশনা তিনি দিয়েছিলেন সে-সম্পর্কে আলোচনায় প্রয়াসী হয়েছি।

সংকলনভুক্ত প্রবন্ধ-পঁয়ত্রিশের মধ্যে একত্রিশটি নব-লিখিত এবং পরিশিষ্টভুক্ত চারটি প্রবন্ধ সংকলিত। সংকলনের শেষাংশে আছে বঙ্গবন্ধু-প্রদত্ত নির্বাচিত সাতটি ভাষণ।

৩০৮ পৃষ্ঠার এ-সংকলনের সূচনা ঘটেছে আবুল মাল আবদুল মুহিতের ‘বাংলাদেশের গৌরব বিশ্বনেতা শেখ মুজিবুর রহমান’-এর মধ্য দিয়ে। তিনি ভারতবর্ষ ও বাংলার ঐতিহাসিক পটভূমিকায় বঙ্গবন্ধুর আবির্ভাব এবং অবদানকে চিহ্নিত করেছেন এভাবে :

প্রাগৈতিহাসিক যুগের হেমুরাভি, মধ্যযুগের জাস্টিনিয়ান এঁদের মতোই মহানায়ক ছিলেন আমাদের বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের গৌরব শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি শুধু আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন না, তিনি শুধু আমাদের সংবিধানটি প্রণয়ন করেননি, তিনি চারটি মহা-আদর্শের একটি আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা নেন। জাতীয়তাবাদ, ইহজাগতিকতা (ধর্মনিরপেক্ষতা), গণতন্ত্র এবং সামাজিক সমতা হলো এই রাষ্ট্রের ভিত্তি। (পৃ ১৮)

আবুল মাল আবদুল মুহিতের মতোই বঙ্গবন্ধুর নিবিড় সান্নিধ্যধন্য  রেহমান সোবহানের ‘বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় পরিচয়ের সৃষ্টি’ প্রবন্ধটি বিশেষ উল্লেখের দাবিদার। ছয় দফা কার্যক্রম নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন :

বঙ্গবন্ধু হিসাব কষে দেখলেন যে, শুধুমাত্র বাংলাদেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থনই ছয় দফার ভিত্তিতে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার ব্যাপারে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করতে পারবে। ভোটের মাধ্যমে অকুণ্ঠ সমর্থনের প্রমাণ পেলে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা উপলব্ধি করবে যে, মানুষের সর্বজনীন দাবি প্রত্যাখ্যান বা তা দমন করলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তিটাই টলে উঠতে পারে। বঙ্গবন্ধুর এই অনুমান পরবর্তীকালে সম্পূর্ণ সঠিক প্রমাণিত হয়। (পৃ ২৮)

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান তাঁর ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : রাজনৈতিক চিন্তাধারা’ প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে আর্থসামাজিক পরিসর আলোচনা করে, তাকে তাত্ত্বিক ঘেরাটোপে আবদ্ধ না করে এমন গূঢ় সরল সত্যে উপনীত হন :

তাঁর বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার, কিংবা অন্য তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। তিনি ঠিকই জানতেন জীবনে একটি হাসি কত অমূল্য এবং সেই অমূল্য সম্পদ অর্জন করাটা ছিল তাঁর লক্ষ্য।          (পৃ ১২৯)

আলোচ্য সংকলনের সম্পাদক আবুল হাসনাতের মতো সংকলনের দুজন বিশিষ্ট লেখক আনিসুজ্জামান এবং শামসুজ্জামান খানও ইতিমধ্যে প্রয়াত। উভয়ের প্রবন্ধদ্বয় সংকলনকে ঋদ্ধ করেছে। আনিসুজ্জামানের ‘জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে’ লেখায় সীমিত পরিসরে বঙ্গবন্ধুর মহাজীবনের সামগ্র্য উদ্ভাসিত হয়েছে আর শামসুজ্জামান খানের ‘বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের নানা উৎস ও শোষিতের গণতন্ত্রের সংগ্রাম’ প্রবন্ধে মুজিব-জীবনের প্রাথমিক-পর্বের কিছু অনালোচিত বিষয়ে  আলো ফেলা হয়েছে :

১৯৩৯-৪৩ তাঁর জীবনের এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রকৃত প্রস্তাবে মনোজগতে মাদারীপুরের যে বিপ্লবী রাজনৈতিক চেতনার ছাপ নিয়ে তিনি কলকাতায় আসেন, সেখানে একই সঙ্গে তিনটি কিছুটা পরস্পরবিরোধী ধারাকেও তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবন গঠনে সমন্বিত করতে সমর্থ হন। এই ধারাগুলো ছিল – ক. সোহরাওয়ার্দীর আধুনিক পাশ্চাত্য রাজনীতির পরিশীলিত নিয়মতান্ত্রিক ধারা; এর সঙ্গে শরৎ বসু, সোহরাওয়ার্দী, কিরণশঙ্কর রায় এবং আবুল হাশিমের অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক যুক্ত বাংলা আন্দোলনের ধারা; এবং দুই. নেতাজি সুভাষ বসু ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের রাজনীতির প্রতি গভীর আকর্ষণ; এবং তিন. রাজনীতি ও সংস্কৃতির সমন্বয়ের ক্ষেত্রে নজরুল, আবুল হাশিম ও হুমায়ুন কবিরের প্রভাব। (পৃ ৬৫)

রফিকুল ইসলামের ‘বাংলার নেতৃত্ব ও বঙ্গবন্ধু’ প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধুর বলশালী ও প্রভাবসঞ্চারী নেতৃত্বের উৎস-সন্ধান এবং একইসঙ্গে তাঁর নেতৃত্ব-স্বাতন্ত্র্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

আমাদের তিনজন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক – হাসান আজিজুল হক, আনোয়ারা সৈয়দ হক এবং সেলিনা হোসেনের প্রবন্ধত্রয় এই সংকলনের দীপ্র সংযোজন।

হাসান আজিজুল হকের লেখায় আবেগের সঙ্গে আছে জরুরি উদ্ঘাটনও :

সেতারের যে-জায়গায় আঘাত করলে সঠিক আওয়াজ উঠে আসে, বঙ্গবন্ধু করেছিলেন সে কাজ। শেখ সাহেবকে তখন দেখেছি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে। বিরাট ঝড় দেখা দিলে সবকিছু যেমন সামনে থেকে হেলে পড়ে; শেখ সাহেবের কথায় জনগণও সেভাবে হেলে পড়ল।

(‘তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ’, পৃ ৫০)

আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘বঙ্গবন্ধুর জীবনে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা রেণুর ভূমিকা’ প্রবন্ধটি ব্যতিক্রমী বিভায় বর্ণিল। তাঁর আবিষ্কার :

বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে প্রায় ৩৬ বার তাঁর স্ত্রী রেণুর কথা উল্লেখ করেছেন এবং কারাগারের রোজনামচায় উল্লেখ করেছেন প্রায় ৭০ বার। এরকম উল্লেখ বইটিকে সৌন্দর্য দিয়েছে বেশি এই কারণে যে, একজন রাজবন্দির জীবনে,  যিনি দেশের জন্য নিজেকে পুরোমাত্রায় উৎসর্গ করেছেন, জেল ও মৃত্যু যাঁর জীবনে ছায়ার মতো ঘুরপাক খেয়েছে সারাটি জীবন, তাঁর এভাবে নিজেকে দেশের জন্য উৎসর্গ করবার প্রেরণা এমনি এমনি তৈরি হয় না, যদি তাঁর পেছনে দৃঢ় একটি আদর্শ, একটি আত্মবিশ্বাস না থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, এই আত্মবিশ্বাস এবং আদর্শের পেছনে যদি না থাকেন একজন স্ত্রী এবং সেই স্ত্রীর প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা। (পৃ ৮২)

সেলিনা হোসেনের লেখাতে উঠে এসেছে নারী-পুরুষ সমতার সমাজ গড়ায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও সক্রিয়তা :

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় নারীদের মন্ত্রিত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে মুসলিম বিবাহ এবং বিবাহ রেজিস্ট্রীকরণ আইন প্রণীত হয়েছিল। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষ সমতার কথা উল্লেখ আছে।

(‘জীবনদর্শনে অমিতাভ সূর্য’, পৃ ১৪৩)

আবদুস সেলিম বঙ্গবন্ধুর পরিবেশ-প্রতিবেশ ভাবনা নিয়ে বিশদ আলোচনায় ব্রতী হয়েছেন, যা জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক করোনা মহামারির বহমান বাস্তবতার প্রেক্ষিতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বঙ্গবন্ধুর বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি পরিবেশ-বিধ্বংসী গাছের সঙ্গে কু-রাজনীতির সামঞ্জস্য উদ্ঘাটনে তাঁর মুন্সিয়ানা বর্ণনা করেছেন :

বাজে গাছগুলো আমি নিজেই তুলে ফেলি। আগাছাগুলিকে আমার বড় ভয়, এগুলি না তুললে আসল গাছগুলি ধ্বংস হয়ে যাবে। যেমন আমাদের দেশের পরগাছা রাজনীতিবিদ – যারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক তাদের ধ্বংস করে এবং করতে চেষ্টা করে। তাই পরগাছাকে আমার বড় ভয়।

সনৎকুমার সাহা ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক দীর্ঘ প্রবন্ধে মহামানবের জীবনজুড়ে মৃত্তিকার ঘ্রাণের আদিঅন্তের খোঁজ

দিয়েছেন :

‘যে আছে মাটির কাছাকাছি’, এমন এক মানুষই ছিলেন তিনি। তাদের ভেতর থেকে, তাঁর মতো অসংখ্যজনের জীবনের স্পন্দনে সাড়া দিয়ে, তাদের মনে সাড়া জাগিয়ে এক অখ্যাতজনের মতো তাঁর বেড়ে ওঠা। একসময় প্রবাদপুরুষে পরিণত হওয়া। তা তাঁকে বিচ্ছিন্ন করেনি বরং গণমানুষের জীবনভাবনায় একাত্ম হয়ে তাদের সঙ্গে অভিন্নতার যোগসূত্র রচনার স্বতঃস্ফূর্ততা নির্বিশেষ হবার বিরল বৈশিষ্ট্য তাঁকে দিয়েছে। (পৃ ৮৯)

রামেন্দু মজুমদার বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক সত্তার শেকড়সন্ধান করেছেন ১৯৪৬ সালের ঘটনাপ্রবাহের আলোকে :

১৯৪৬ সালের আগস্টে কলকাতায় যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল তাতে হিন্দু-মুসলমান বহু লোক হতাহত হয়েছিল। সে-সময় শেখ মুজিব তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাঙ্গা-উপদ্রুত এলাকা থেকে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে সাহায্য করেন। (‘অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার মূর্ত প্রতীক’, পৃ ১১৪)

‘বঙ্গবন্ধু ও ৭ই মার্চের ভাষণ : চেতনার দুই প্রতীক’ প্রবন্ধে আবুল মোমেন যথার্থই লিখেছেন :

দলমত-ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে অনুপ্রেরণার জন্য যেমন আমরা শহীদ মিনার বা স্মৃতিসৌধে যাই, বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি যেন জাতির জীবনে তেমনি সর্বজনীন একটি প্রতীক। (পৃ ১৫২)

আবুল আহসান চৌধুরীর গবেষণা-গদ্য ‘বঙ্গবন্ধু : অন্নদাশঙ্কর রায়ের স্মৃতি-অনুধ্যানে’ শীর্ষক সুদীর্ঘ গবেষণাগদ্যটি এই সংকলনকে সমৃদ্ধ করেছে। ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’ – এই কালোত্তীর্ণ ছড়াটির রচনাসূত্র বর্ণনাপূর্বক তাঁর বিশ্লেষণী ভাষ্য :

বিপন্ন বন্দি বঙ্গবন্ধুর প্রাণরক্ষায় তিনি বিচলিত হয়ে ওঠেন –  প্রবল আবেগে তখনি তিনি রচনা করেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এক অবিস্মরণীয় ছড়া – যা সমকালে ও উত্তরকালে মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে উচ্চারিত হতে থাকে – শেষে এই আট- পঙ্ক্তির ছড়া লাভ করে এক ধ্রুপদি-শিল্পের মর্যাদা-উৎকীর্ণ হয় মানুষের অন্তরে ও স্মৃতি-স্মারকের গাত্রে। (পৃ ১৯৩)

বিশ্বজিৎ ঘোষের ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথে বঙ্গবন্ধুর চির-আস্থা ও ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে :

রবীন্দ্রনাথকে বঙ্গবন্ধু ধারণ করেছেন অন্তরে, যেমন ধারণ করেছেন বাংলাদেশকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার বাংলা’ ধারণাকে  বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করেছিলেন তাঁর আরাধ্য কর্ম হিসেবে। (পৃ ২১৭)

নজরুল ইসলামের ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : জন্মশতবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি’ প্রবন্ধে নজরুল ইসলাম তাঁর স্বয়ম্ভর সমাজরাষ্ট্র গঠন-চিন্তা,  সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ‘বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু : তরুণদের স্বপ্ন’ প্রবন্ধে এখনকার তারুণ্যের ভাবনায় বঙ্গবন্ধু, মুনতাসীর মামুন  ‘বঙ্গবন্ধু ও ছাত্র-রাজনীতি : আদিপর্ব’ প্রবন্ধে তাঁর ছাত্ররাজনীতির হাতেখড়ি-অধ্যায়, আতিউর রহমান ‘মানবিক বঙ্গবন্ধুর গণমুখী উন্নয়ন ভাবনার উৎস সন্ধানে’ প্রবন্ধে তাঁর তৃণমূললগ্ন উন্নয়ন-দর্শন, ‘শেখ মুজিব : রাজনীতিক ও ব্যক্তিমানুষ’-এ আহমাদ মাযহার তাঁর দ্বিবিধ সত্তার জনযুক্ততার ঐক্য, আনিসুল হকের ‘বঙ্গবন্ধুর অন্য গুণ’-এ তাঁর বহুমাত্রিকতা, রাশিদ আসকারীর ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ লেখায় তাঁর আমৃত্যু-আজীবনের বাংলাবাদী অঙ্গীকার, পিয়াস মজিদের ‘বঙ্গবন্ধুর বয়ানে সাহিত্য ও সাহিত্যিক’ প্রবন্ধে তাঁর বইপত্রে উল্লিখিত সাহিত্যপ্রসঙ্গের বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আহাদ আদনান জাপানি চিত্রপরিচালক নাগিসা ওশিমা পরিচালিত রহমান, ফাদার অব বেঙ্গল (১৯৭২) প্রামাণ্যচিত্র সম্পর্কে আগ্রহোদ্দীপক আলোচনা করেছেন।

এই সংকলনে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রজন্মের পাঁচজন লেখকের বঙ্গবন্ধু-ভাবনা স্থান পেয়েছে – অমিয় দেব, সৌরীন ভট্টাচার্য, পবিত্র সরকার, অমর মিত্র এবং চিন্ময় গুহ।

অমিয় দেবের লেখার শেষাংশ যেন বিশ্ববাঙালিরই আত্মা-কথা :

বাংলাদেশ না হলে কি আমি ছেষট্টি বছর পরে আমার জন্মভূমি সিলেটে যেতে পারতাম – সেই সিলেট যেখানে আমার ছেলেবেলা কেটেছিল? বঙ্গবন্ধুর কাছে আমার এ ঋণ। (পৃ ৩৫)

‘শতবর্ষের তর্পণ’ নামের লেখায় অমর মিত্র এমন পরান-গহিন কথাই বলতে চেয়েছেন তাঁর ব্যক্তিগত আবেগায়নে :

আমার লেখায় ক্রমাগত বাংলাদেশ এসে যায়। এসেই যায়। সাতক্ষীরা, ধূলিহর, কপোতাক্ষকে আমি আমার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেব বলে বলেছিলাম। ফিরিয়ে দিতে চাইছি সেই মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি থেকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আমার

পিতৃপুরুষের তর্পণ হলো তাঁরই ডাকে, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম …।                (পৃ ১৬১)

পরিশিষ্টাংশে অন্তর্ভুক্ত অন্নদাশঙ্কর রায়, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, কামাল উদ্দিন হোসেন এবং সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেনের প্রবন্ধ-চতুষ্টয়ের নব-পাঠ আমাদের বঙ্গবন্ধুর কিংবদন্তিতুল্য জীবন, অসামান্য অর্জন  ও বিয়োগান্ত বিদায় নিয়ে দুর্লভ তথ্য ও প্রয়োজনীয় ভাষ্যের জোগান দেয়।

‘বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত ভাষণ’ অংশটিও বৈচিত্র্যবান। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনোত্তর ভাষণ,  প্রথম স্বাধীনতা দিবস, সমবায়, বুদ্ধিজীবীদের সভায়, জুলিও কুরি শান্তিপদক প্রাপ্তি-উত্তর, বাংলা একাডেমিতে  প্রথম জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন এবং কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে প্রদত্ত ভাষণগুচ্ছ বঙ্গবন্ধুর ভাবনা ও কর্মের নানা স্তরকে আমাদের কাছে স্পষ্ট করে।

বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষকে কেন্দ্র  করে বহু  বই প্রকাশিত হয়েছে, হচ্ছে এবং নিশ্চয়ই আরো হবে। তবে  আবুল হাসনাত-সম্পাদিত, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স-প্রকাশিত  বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ স্মারক নিঃসন্দেহে একটি ভিন্ন মাত্রাবাহী এবং সংরক্ষণযোগ্য সংকলন-রূপে গবেষক এবং সাধারণ পাঠকের কাছে আদৃত হবে।

সংকলনভুক্ত আনিসুজ্জামানের প্রবন্ধের অন্তিমাংশের উদ্ধৃতিতেই যেন এই সংকলনের মর্মসুর যথা-ভাষা পায় : যে-বাংলাদেশের মানুষকে তিনি ভালোবাসতেন, একটু বেশিই ভালোবাসতেন, তারা যে তাঁর কোনো ক্ষতি করবে, তা ভাবতে পারেননি তিনি। বিশ্বাসঘাতক কতরকম হয়! দেশদ্রোহী বাংলাভাষীরাই পাকিস্তানের প্রার্থিত কাজ সম্পন্ন করে গর্ব করে বিশ্ববাসীকে জানিয়েছে, হ্যাঁ, তারাই হত্যা করেছে তাঁকে। ইতিহাস থেকে তাঁর নাম-নিশানা মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সে-প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে। সগৌরবে নিজের আসনে আসীন তিনি, আসীন বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে। জয় হোক তাঁর।

Leave a Reply