বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও জসীম উদ্দীনের পঙ্ক্তিমালা

লেখক: বিশ্বজিৎ ঘোষ

হাজার বছরের বাংলা কবিতার ধারায় কবি জসীম উদ্দীন (১৯০৩-৭৬) একটি উজ্জ্বল ও বিশিষ্ট নাম। রবীন্দ্রযুগের কবি হয়েও রবীন্দ্রপ্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে পল্লিজীবনকে অবলম্বন করে জসীম উদ্দীন নির্মাণ করেছেন স্বকীয় এক কাব্যভুবন। তাঁর সাধনায় খুলে গেছে বাংলা কবিতার নতুন এক সিংহদ্বার। বাংলা গীতিকা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে জসীম উদ্দীন আধুনিক দৃষ্টি দিয়ে চোখ ফেরালেন পল্লিজীবনের দিকে, পল্লির সহজ জীবনযাপনের দিকে, বাংলার লোকজীবনের বৃহত্তর আঙিনায় – বাংলার অবারিত গ্রামীণ জনপদে তিনি খুঁজে পেলেন তাঁর শিল্পবৃক্ষের প্রতœবীজ। বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতি আর পল্লির সাধারণ মানুষ নিয়েই গড়ে উঠেছে জসীম উদ্দীনের পঙ্ক্তিমালা। গ্রামীণ জীবনকেন্দ্রিক বিস্ময়কর এক কবিভাষায় হাজার বছরের বাংলার পল্লি নতুন প্রাণ নিয়ে জেগে উঠলো জসীম উদ্দীনের কবিতায়।
জসীম উদ্দীনের কবিতায় লোকজ উপাদান, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও আধুনিক জীবনচেতনার শিল্পিত সংশ্লেষ সাধিত হয়েছে। গ্রামের রাখাল ছেলে, একজন সোজন কি একজন রুপাই, কোনো-এক দুলী কি সাজু, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী তাঁর কবিতায় সৃষ্টি করেছে শাশ্বতের ব্যঞ্জনা – স্থানিক সীমানা ছাড়িয়ে তারা হয়ে উঠেছে চিরকালীন মানবাত্মার প্রতিভূ। তাঁর মা কিংবা পল্লিজননী আমাদের কাছে উপস্থিত হয় শাশ্বত মাতৃমূর্তিতে; ‘কবর’ কবিতার বেদনার ধারাস্রোতে সিক্ত হয় চিরায়ত মানবাত্মা। বাংলার লোকায়ত জীবন জসীম উদ্দীনের কবিতায় শতধারায় শিল্পিত হয়েছে। সৃজনক্ষমতার গুণে জসীম উদ্দীনের কবিতায় গ্রামীণ অভিজ্ঞতার ঘটেছে জন্মান্তর। গ্রামীণ জীবনে হিন্দু-মুসলমানের মিলিত স্রোতে অবগাহন করে তিনি নির্মাণ করেছেন শাশ্বত এক মাঙ্গলিক মূর্ছনা। জসীম উদ্দীনের পূর্বে, কিংবা তাঁর সমকালে জীবন অনুধ্যানে এই প্রাতিস্বিকতা আমরা অন্য কোনো কবির মধ্যে লক্ষ করিনি। বিষয়াংশ এবং ভাব-পরিম-লের দৃষ্টিকোণে, বাংলা কবিতায়, তিনি প্রকৃত অর্থেই একটি নতুন ধারার স্রষ্টা। তবে বর্তমান আলোচনায় জসীম উদ্দীনের কবিতার বিষয়স্বাতন্ত্র্য কিংবা প্রকরণ-বৈশিষ্ট্য নয়, বরং তাঁর পঙ্ক্তিমালায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে যে-বিবরণ পাই, তা ব্যাখ্যা করার প্রয়াস গৃহীত হয়েছে।

দুই
কবি জসীম উদ্দীন প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তবে জাতীয় রাজনৈতিক ঘটনাধারার সঙ্গে তিনি সর্বদাই ছিলেন সংশ্লিষ্ট। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ – প্রতিটি রাজনৈতিক অনুষঙ্গেই জসীম উদ্দীন কথা কিংবা কবিতায় তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। জসীম উদ্দীনকে পল্লিকবি হিসেবে আখ্যায়িত করে তাঁর এই সদর্থক রাজনৈতিক ভূমিকার কথা কখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় আলোচিত হয়নি। রাজনৈতিক ঘটনাধারার সঙ্গে জসীম উদ্দীনের সচেতন সংশ্লিষ্টতা নিম্নোদ্ধৃত কথা ও কবিতায় সম্যক উদ্ভাসিত।
ক. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে জসীম উদ্দীন পালন করেছেন সদর্থক ভূমিকা। আরবি বা রোমান হরফে বাংলা লেখার ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। তিনি বুঝেছিলেন হরফ পরিবর্তন আসলে বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করারই একটা হীন ষড়যন্ত্র। তাই হরফ পরিবর্তনের পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনি লেখেন এইকথা :
কবির দৃষ্টি যদি সুদূরপ্রসারী হয় তবে তারাই বলে আমি ভবিষ্যদ্বাণী করিতেছি, এ অভিযান কোনোদিনই সার্থক হইবে না। কারণ এ অভিযান মানুষের অগ্রযাত্রার অভিযান নয়। এ অভিযান একটা বিরাট জনসংখ্যাকে একটা ক্ষুদ্র জনসংখ্যার দাসে পরিণত করার অভিযান। যুগে যুগে পৃথিবীর জনগণ এই অভিযানকে ব্যর্থ করিয়া আসিয়াছে।১
বাংলা হরফ পরিবর্তনকে তিনি বাঙালি মুসলমানের জন্য ভয়ানক বিপদের আশঙ্কা মনে করে সকলকে সচেতন হতে আহ্বান জানিয়েছেন। ষড়যন্ত্রকারীদের ধ্বংস কামনা করে তিনি লিখেছেন : ‘এই অন্যায়কে পূর্ব পাকিস্তানি মুসলমানরা কিছুতেই বরদাস্ত করিবে না। কারণ ইহা শুধু হরফের সমস্যাই নয়। ইহা বাঙালি মুসলমানের বাঁচিয়া থাকার সমস্যা। হরফের পরিবর্তন হইলে বাংলা ভাষারও একটা কৃত্রিম পরিবর্তন সাধিত হইবে। সেই কৃত্রিমতার ভিতর দিয়া কোনো জাতি নিজেকে প্রকাশ করিতে পারে না। পাকিস্তানের নতুন পত্তনে বাঙালি মুসলমানের মনে যে সব উদ্দীপনার সঞ্চার হইয়াছিল তাহা মুহূর্তে ধূলিসাৎ হইয়া যাইবে।’২
ভাষা-আন্দোলনের সমর্থনে কেবল বক্তব্য নয়, সৃষ্টিশীল রচনা দিয়েও জসীম উদ্দীন তাঁর অবস্থান ঘোষণা করেছেন। বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহিদদের স্মরণে জসীম উদ্দীন রচনা করেন উজ্জ্বল এই পংক্তিমালা :
ঘুমাও ঘুমাও ভাইরা মোদের
ঘুমাও মাটির ঘরে,
তোমাদের কথা লিখিয়াছি মোরা
রক্ত আখর গড়ে।
মাতা দিয়ে তার সন্তান বলি,
লিখেছে অমর সেই কথাকলি
ভাই দেছে ভাই বৌ দেছে স্বামী
যে রক্ত-পথ ধরে …।৩
আমাদের দ্রোহী সংস্কৃতির এক চির-উজ্জ্বল উৎস শহিদ মিনার। শহিদ মিনার আসলে বাঙালির শোক আর শক্তির যুগল স্মৃতি – বাঙালির সংঘচেতনার অনাদি উৎস। জসীম উদ্দীনের পংক্তিমালায় শহিদ মিনারের দ্রোহীসত্তা ফুটে উঠেছে এভাবে : ‘যুবকেরা বুকে নিয়ে বুলেট গুলি/ পড়িল মাটির পরে/ ফোঁটায় ফোঁটায় লহুধারা/ রাজপথে বিছাইল রক্তজবা ফুল।/ শেষ নিঃশ্বাসের আগে তারা/ গেয়ে গেল রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।/ তাঁদের স্মরণে রচিত হয়েছে এই/ শহীদ মিনার/ দাঁড়িয়ে পাঁচটি স্তম্ভ আছে পাহারায়।/ পাঁচটি স্তম্ভ তো নয়/ পাঁচটি প্রদীপ্ত দ- আকাশের পানে উঠি/ যুগ-যুগান্তরে যেন ঘোষে ফরিয়াদ।’৪ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে আসে ঊনসত্তরের মহান গণ-অভ্যুত্থান – বরকত-সালামের পদাঙ্ক অনুসরণ করে শহিদ হন আসাদ-মতিউর। জসীম উদ্দীন ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের বীর শহিদদের স্মরণ করেছেন এভাবে :
মতিউর গেছে আসাদ গিয়াছে
জহিরুল গেছে আর,
রক্তজবায় সাজায়েছে তারা
চরণ যে দেশ মার,
দিকে দিগন্তে প্রাণের জোয়ার,
ঘোষিছে স’বনা অন্যায় আর
পেয়েছে জনতা গতিদুর্বার
সে রাঙা পথের পর …৫
খ. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং কবি জসীম উদ্দীন ছিলেন পরম বন্ধু – একের প্রতি অন্যের শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম। বঙ্গবন্ধুকে কবি জসীম উদ্দীন সাহিত্য-সংস্কৃতির অবিরল এক অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচনা করতেন। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি আয়োজিত বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের মূল সভাপতি হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে, জসীম উদ্দীন যে-ভাষণ দেন, সে-ভাষণেই ফুটে ওঠে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর গভীর আস্থা ও পরম আশ্বাসের কথা। বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে জসীম উদ্দীন সেদিন বলেন এইকথা :
ইতিপূর্বে এদেশের অগণ্য জনগণের নয়নমণি সাধারণ মানুষের অতীব সাধারণ নেতা বঙ্গবন্ধু ব্যক্তিগতভাবে বহু সাহিত্য-কর্মীকে ও গুণীজনকে নানাভাবে সাহায্য করিয়াছেন। দেশের গুণীব্যক্তিদের প্রতি তাঁহার সংবেদনশীল মন সর্বদাই প্রসারিত। তাঁহার মুখে অনেকবার শুনিয়াছি, ‘ওঁরা মানুষ নয়, ওঁরা দেবতা।’
ইতিপূর্বে কোন লেখক-শিল্পীদের প্রতিনিধিদল তাঁহার নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাদের অভাব-অভিযোগের কথা বলেন নাই। তাই তিনি এদিকে সম্যক দৃষ্টি দিতে পারেন নাই। আজ আপনাদের মাধ্যমে তাঁহার নিকট আমাদের অভাব-অভিযোগের কথা বলিবার সুযোগ পাইব। এর আগে তিনি লেখক ট্রাস্ট গঠন করিয়া আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হইয়াছেন।৬
সাহিত্য সম্মেলনের আগে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমন্ত্রণ জানাতে গেলে, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন : ‘আমার বন্ধু জসীম উদ্দীন ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকেও বিশেষ মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানাবেন।’৭ কবি জসীম উদ্দীন তথা সাহিত্য-শিল্পের প্রতি বঙ্গবন্ধুর পরম ভালোবাসার কথা ওই আহ্বানের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত হয়ে যায়। উত্তরকালে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‘বঙ্গ-বন্ধু’ শীর্ষক কবিতা রচনা করে বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর ভক্তি ও ভালোবাসার কথাও প্রকাশ করেছেন কবি জসীম উদ্দীন।
গ. মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ছিল কবি জসীম উদ্দীনের প্রবল সমর্থন – মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর ভালোবাসা। জসীম উদ্দীনের ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে কাব্যগ্রন্থের কবিতাবলিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কবির গভীর সমর্থনের কথা শিল্পিতা পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত অনেক কবিতা জসীম উদ্দীন সেদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে পাঠিয়ে দিতেন। রণাঙ্গনের রাইফেল নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় কবির কবিতাবলিই হয়ে উঠেছিল শাণিত অস্ত্র। তুজম্বর আলি ছদ্মনামে রচিত কবিতাবলি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ছিল প্রেরণার এক অবিরল উৎস। ভয়াবহ সেই দিনগুলোতে কাব্য সম্পর্কে জসীম উদ্দীনের ভাষ্য এখানে উদ্ধৃত করা যায় :
তুজম্বর আলি ছদ্মনামে এই কবিতাগুলি রাশিয়া, আমেরিকা ও ভারতে পাঠান হইয়াছিল। আমার মেয়ে হাস্না এর কতকগুলি ইংরাজিতে অনুবাদ করিয়া অপর নামে নিউইয়র্কে বিদ্বান সমাজে বেনামিতে পাঠ করাইয়াছে। রাশিয়াতেও কবিতাগুলি সমাদৃত হইয়াছিল। সেখানেও কিছু কিছু লেখা রুশ ভাষায় অনূদিত হইয়াছে। ভারতে এই লেখাগুলি প্রকাশিত হইলে মুলক্রাজ আনন্দ প্রমুখ বহু সাহিত্যিক ও কাব্যরসিকের সশ্রদ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সেই দুর্দিনে বাংলাদেশে আমার লেখাগুলি নকল করিয়া আমার সঙ্গে যারা বিপদের ঝুঁকি লইয়াছিল তাহাদের সকলকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।৮

  • উপর্যুক্ত ভাষ্য থেকে সহজেই অনুধাবন করা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সফলতার জন্য জসীম উদ্দীনের দুঃসাহসী উদ্যোগের কথা। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধার মতো সেদিন আটষট্টি বছর বয়সের জসীম উদ্দীন বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক কবিতা লিখে দেশে ও বিদেশে প্রচার করেছেন, ইংরেজিতে অনুবাদ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় ভয়াবহ সেই দিনগুলোতে কাব্যগ্রন্থের প্রকাশক কবি-কন্যা হাসনা জসীম উদ্দীনের ভাষ্য :
    এই কবিতাগুলো লেখার প্রায় সাথে সাথে কবি সযতনে আমার কাছে আমেরিকায় পাঠাতেন। কিছু কিছু কবিতা অনুবাদ করে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও সমাবেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের খবররূপে বিশ্ব সহানুভূতির আশায় তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। রাত জেগে জেগে স্বাধীনতার শত্রুদের বিরুদ্ধে কবিতা লিখেছেন – যে কবি সারাজীবন তাঁর লেখনীতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মায়া-মমতা ও ভালবাসার কথা লিখে স্বপ্নের জাল বুনে গেছেন – যার কবিতায় পল্লীর জীবন এক অসাধারণ রূপ ধারণ করেছিল সে-কবির জন্য যুদ্ধে বিধ্বস্ত রক্তে স্নাত দেশের কবিতা লিখতে না জানি কত কষ্ট হয়েছে। বৃদ্ধ পিতার নিরাপত্তার জন্য কত ভয় পেয়েছি। দিনের পর দিন খবর না পেয়ে চিন্তিত হয়েছি। তিনি চিঠি লিখেছেন কবিতাগুলো অনুবাদ করে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত তৈরী করতে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্য করতে। কত সময় ভয় পেয়েছি যদি কবিকে ধরে নিয়ে যায়। তবু পিতার নির্দেশ মেনে চলেছি। আজকে মনে করি তাঁদের যাঁরা কবিকে নিরাপদ স্থান দিয়েছিলেন …।৯
    মুক্তিযুদ্ধে সশরীরে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও কবি জসীম উদ্দীন সেদিন কলম হাতে যুদ্ধে নেমেছিলেন, বিশ্ব জনমত সৃষ্টির জন্য পালন করেছিলেন বিরল ভূমিকা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জসীম উদ্দীন সরকারি চাকরি করতেন। তা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কবিতা লিখতে তিনি ভয় পাননি, বিপদের ঝুঁকি নিয়েই দেশে-বিদেশে কবিতাগুলো প্রচারের ব্যবস্থা করেছেন। প্রসঙ্গত স্মরণীয় আনিসুজ্জামানের অভিমত : ‘১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের কালে কবিতা লিখে ও সশরীরে আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি নিজের কথা তুলে ধরেছিলেন। কেউ যদি বলেন, সে তো এমন সময়ে, যখন সারা দেশই উন্মাতাল ছিল, তাহলে বলব, পূর্ববাংলা থেকে হিন্দুদের বাস্তুত্যাগজনিত বেদনা নিয়ে লেখা তাঁর কবিতাগুলো স্মরণ করতে। তখন তো তিনি সরকারি কর্মে রত এবং ওই বিষয়ে লেখা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাভ করবে না, সে-সম্পর্কে তিনি অবহিত ছিলেন।’১০

তিন
বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কবি জসীম উদ্দীনের গভীর আত্মিক সম্পর্কের কথা পূর্বেই ব্যক্ত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সকল রাজনৈতিক আদর্শ ও কর্মকা- কবি নিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান – এই একটি নামের সঙ্গে কোটি কোটি বাঙালির স্বপ্ন আর মুক্তির বাসনা জড়িয়ে আছে – একথা গভীরভাবে জানতেন জসীম উদ্দীন। বঙ্গবন্ধুর নামের এই মহিমা দিয়েই শুরু হয়েছে জসীম উদ্দীনের অসামান্য কবিতা ‘বঙ্গ-বন্ধু’। বঙ্গবন্ধুকে কবি দেখেছেন অসামান্য শক্তির আধার হিসেবে :
মুজিবর রহমান!
ওই নাম যেন বিসুভিয়াসের অগ্নি-উদারী বান।
বঙ্গদেশের এ প্রান্ত হতে সকল প্রান্ত ছেয়ে
জ্বালায় জ্বলিছে মহা-কালানল ঝঞ্জা-অশনি বেয়ে।
বিগত দিনের যত অন্যায় অবিচার ভরা-মার
হৃদয়ে হৃদয়ে সঞ্চিত হয়ে সহ্যের অঙ্গার;
দিনে দিনে হয়ে বর্ধিত স্ফীত শত মজলুম বুকে,
দগ্ধিত হয়ে শত লেলিহান ছিল প্রকাশের মুখে;
তাহাই যেন বা প্রমূর্ত হয়ে জ্বলন্ত শিখা ধরি
ওই নামে আজ অশনি দাপটে ফিরিছে ধরণী ভরি।১১
শত বর্ষের শত সংগ্রাম শেষে জাতির মুক্তিসূর্য হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের ইতিকথা কবিতার স্তবকে স্তবকে নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ঔপনিবেশিক শক্তি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে যে বাধ্য হয়েছিল, সে-কথা কবি পৌরাণিক অনুষঙ্গে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন এই পঙ্ক্তিগুচ্ছে : ‘আরো একদিন ধন্য হইনু সে মহাদৃশ্য হেরি,/ দিকে দিগন্তে বাজিল যেদিন বাঙালীর জয়ভেরী।/ মহাহুংকারে কংসকারার ভাঙিয়া পাষাণ দ্বার,/ বঙ্গ-বন্ধু শেখ মুজিবেরে করিয়া আনিল বার।’ একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে কোটি কোটি বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে – কেউ প্রত্যক্ষভাবে, কেউ পরোক্ষভাবে। তাঁর ডাকে বাঙালি অসহযোগ আন্দোলনে শামিল হয়েছে সমবেতভাবে। অতীতে কোনো জাতীয়তাবাদী নেতার ডাকে সকলের এইরূপ সমবেত অংশগ্রহণ কবি লক্ষ করেননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ডাকে কবি পেয়েছেন সেই অমোঘ শক্তি, যাতে একত্র হয় সকল মানুষ :
এই বাঙলায় শুনেছি আমরা সকল করিয়া ত্যাগ,
সন্ন্যাসী বেশে দেশ-বন্ধুর শান্ত-মধুর ডাক।
শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী – জীবন করিয়া দান,
মিলাতে পারেনি প্রেম-বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান
তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর,
জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাঙলার।
তোমার হুকুমে রেল-জাহাজের চাকা যে চলেনি আর,
হাইকোর্টের বদ্ধ-দরজা খুলিবে সাধ্য কার।
[‘বঙ্গ-বন্ধু’]

  • বঙ্গবন্ধুর আকাশস্পর্শী তর্জনীর ছোঁয়ায় সমবেত বাঙালির সমুত্থিত জাগরণ উপর্যুক্ত পঙ্ক্তিমালায় নির্ভুলভাবে ফুটে উঠেছে। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের নানা অনুষঙ্গ শিল্পিতা পেয়েছে জসীম উদ্দীনের আলোচ্য কবিতায়। বঙ্গবন্ধুর প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক আদর্শ এবং অকুতোভয় চরিত্রের অনুপম প্রশস্তি গেয়েছেন কবি জসীম উদ্দীন। কবি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের মুকুটহীন প্রমূর্ত রাজা বঙ্গবন্ধু কোটি কোটি বাঙালির চিত্তলোকে চিরজাগরূক হয়ে থাকবেন : ‘বাঙলা দেশের মুকুটবিহীন তুমি প্রমূর্ত রাজ,/ প্রতি বাঙ্গালীর হৃদয়ে হৃদয়ে তোমার তক্ত-তাজ।’ কোনো ভয়-ভীতি, অত্যাচার আর কারাজীবন – কোনো কিছুই যে বঙ্গবন্ধুকে তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি, ফাঁসির মঞ্চকেও যে তিনি ভয় পাননি – সেকথাও ফুটে উঠেছে কবির শব্দমালায় : ‘রাজভয় আর কারাশৃংখল হেলায় করেছ জয়,/ ফাঁসির মঞ্চে – মহত্ত্ব তব তখনো হয়নি ক্ষয়।’ [‘বঙ্গ-বন্ধু’]
    বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক এক বাংলাদেশের – যাকে তিনি রবীন্দ্রনাথের অনুসরণে বলেছেন সোনার বাংলা। সোনার বাংলাদেশ গড়ার জন্য বঙ্গবন্ধু সারাটা জীবন সংগ্রাম করেছেন, উৎসর্গ করেছেন নিজের জীবনকে – নিজের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে জনগণের স্বার্থকেই নিজের স্বার্থ বলে জেনেছেন। এ কারণেই বাঙালির কাছে তিনি মুকুটহীন রাজা, অবিসংবাদিত নেতা – আমাদের জাতির পিতা। ‘বঙ্গ-বন্ধু’ শীর্ষক কবিতায় শেখ মুজিবুর রহমানের চারিত্রিক দৃঢ়তা, জনসম্পৃক্তি এবং মুক্তিসংগ্রামের ছবি যেমন ধরা পড়েছে, তেমনি চিত্রিত হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ। কবির ভাষ্যে :
    আরো একদিন ধন্য হইব, ধন-ধান্যেতে­­­ ভরা,
    জ্ঞানে-গরিমায় হাসিবে এদেশ সীমিত বসুন্ধরা।
    মাঠের পাত্রে ফসলেরা আসি ঋতুর বসনে শোভি,
    বরণে সুবাসে আঁকিয়া যাইবে নকশী-কাঁথার ছবি।
    মানুষে মানুষে রহিবে না ভেদ, সকলে সকলে সকলকার,
    এক সাথে ভাগ করিয়া খাইবে সম্পদ যত মার।
    পদ্মা মেঘনা যমুনা নদীর রূপালীর তার পরে,
    পরাণ ভুলানো ভাটিয়ালী সুর বাজিবে বিশ্বভরে।
    আম-কাঁঠালের ছায়ায় শীতল কুটিরগুলির তলে
    সুখ যে আসিয়া গড়াগড়ি করি খেলাইবে কুতূহলে।
    [‘বঙ্গ-বন্ধু’]
  • সন্দেহ নেই, জসীম উদ্দীন পঙ্ক্তিমালায় অঙ্কিত ছবি আসলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার অভ্রান্ত ছবি। কবি জসীম উদ্দীনের ‘বঙ্গ-বন্ধু’ কবিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কর্ম ও সাধনার এক নিপুণ সাহিত্যিক দলিল। একটি কবিতার মাধ্যমে জসীম উদ্দীন সমুদ্রপ্রতিম বিশাল আকাশপ্রতিম উদার বঙ্গবন্ধুকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। একজন নেতা কীভাবে একটা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছেন, জসীম উদ্দীনের এই কবিতা পাঠ করে তা সম্যক উপলব্ধি করা যায়। একজন পল্লির কবি জসীম উদ্দীন অবিসংবাদিত একজন রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পঙ্ক্তিমালায় যেভাবে শিল্পিত করেছেন, এককথায় তা অনন্য, অনুপমও অতুলনীয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বাঙালি হয়ে উঠেছে সাহসী – তাই ভবিষ্যতে কোনো শাসক যদি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে, তাহলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকরা যে তাকে মেনে নেবে না, এ-কথা বলতেও ভোলেননি জসীম উদ্দীন। ভবিষ্যতের বাঙালির সেই নির্ভীক রূপটা অঙ্কন করেই জসীম উদ্দীন শেষ করেছেন তাঁর বঙ্গ-বন্ধু প্রশস্তি :
    আরো একদিন ধন্য হইব চির-নির্ভীকভাবে,
    আমাদের জাতি নেতার পাগড়ি ধরিয়া জবাব চাবে,
    “কোন অধিকারে জাতির স্বার্থ করিয়াছ বিক্রয়?”
    আমাদের এদেশ হয় যেন সদা সেইরূপ নির্ভয়।
    [‘বঙ্গ-বন্ধু’]

চার
সূচনা-সূত্রেই ব্যক্ত হয়েছে যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য কবিতাকে অস্ত্র করে তুলেছিলেন জসীম উদ্দীন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মানুষ হত্যা করেছে, জ্বালিয়ে দিয়েছে ঘর-বাড়ি – সংঘটিত করেছে মানব-ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা। এই গণহত্যার বিরুদ্ধে কবি জানাচ্ছেন তীব্র ঘৃণা ও অভিসম্পাত – বিশ্ব-মানবের কাছে হানাদার বাহিনীর এই নিষ্ঠুরতা পৌঁছে দেয়ার জন্য কবি উচ্চারণ করেন এইসব যন্ত্রণাবিদ্ধ পঙ্ক্তি :
সে বাঙলা আজি বক্ষে ধরিয়া দগ্ধ গ্রামের মালা,
রহিয়া রহিয়া শিহরিয়া উঠে উগারি আগুন জ্বালা।
দস্যু সেনারা মারণ-অস্ত্রে বধি ছেলেদের তার,
সোনার বাঙলা বিস্তৃত এক শ্মশান কবরাগার।
বনে জঙ্গলে লুণ্ঠিত গৃহে কাঁদে শত নারী-নর,
কোথায় যাইয়া মিলিবে তাদের পুন আশ্রয়-ঘর!
প্লাবনের চেয়ে – মারিভয় চেয়ে শতগুণ ভয়াবহ,
নরঘাতীদের লেলিয়ে দিতেছে ইয়াহিয়া অহরহ্।
প্রতিদিন এরা নরহত্যার যে কাহিনী এঁকে যায়,
তৈমূরলং নাদির যা দেখে শিহরিত লজ্জায়।
[‘কবির নিবেদন’]
‘কবির নিবেদন’ শীর্ষক এই কবিতাটিই ‘A Poet’s Appeal’ শিরোনামে সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের নানান প্রচারমাধ্যমে মুদ্রিত হয় কিংবা হয় উচ্চারিত। অনুবাদেও উদ্ভাসিত পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতা নিষ্ঠুরতার ছবি :
Golden Bengal burns today like a flamed garland
It’s fire spread fearsome tongues all over
Soldiers of shame kill our sons
And transform golden Bengal into a graveyard
In the forest robbed men and women wail
Where will they find home and shelter
Worse than flood, worse than epedemic
Are the killers that Yeyia sends.
Everyday they depict such pictures of horror
That would send Taimurlong and Nadirshah to
shame.
[‘A Poet’s Appeal’]
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন-নির্মমতায় বিশ্ব-বিবেক জাগ্রত হচ্ছে না বলে কবি বিক্ষুব্ধ। মানবতার কাছে কবি আহ্বান জানাচ্ছেন, যেন বিশ্ব-বিবেক নিপীড়িত বাঙালির পাশে এসে দাঁড়ায়। কবি বিশ্বাস করেন, দৃঢ়ভাবে, বিশ্ব-মানবতা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, ঘোষিত হবে বাঙালির বিজয়। পরম এই আশা নিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে কবির আত্যন্তিক নিবেদন :
বিশ্ববাসীরা শোন,
মোদের কাহিনী শুনিয়া কাঁদিবে নাই কি দরদী কোন?
… … …
আজিও যাহারা বাঁচিয়া রয়েছি, আছি এই আশ্বাসে,
মানব ধর্মী ভাইরা আসিয়া দাঁড়াবে কখনো পাশে।
তোমাদের কোলে আছে ছেলেমেয়ে, শপথ তাদের লাগে,
স্বামী-পুত লয়ে সুখ-গৃহ মাঝে আছ যারা অনুরাগে;
দেশ-দেশান্তে দয়া ধর্মের শপথ মানবতার;
তোমরা আসিয়া ভাঙ এ নিঠুর এজিদের কারাগার।
প্রতি মুহূর্তে শিশু মার কোলে মরিছে বুলেট ঘায়,
প্রতি মুহূর্তে শত অসহায় দলিত দস্যু পায়।
তাদের দীর্ঘ নিশ্বাসে ভরি উড়ানু পত্রখানি,
এই আশা লয়ে তোমাদের থেকে পাব আশ্বাস-বাণী।
[‘কবির নিবেদন’]
উল্লেখ্য, এ-কবিতার রচনাকাল ২৭শে মার্চ, ১৯৭১ সাল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের অল্প সময়ের মধ্যেই কবি কলম দিয়ে তাঁর প্রতিরোধ ব্যক্ত করেছেন, উপলব্ধি করেছেন বিশ্ব-জনমত জাগ্রত করা কত জরুরি।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধর্মের নামে নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালির উপর আধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধের নয় মাসই ইয়াহিয়া বাহিনী ইসলাম ধর্মের দোহাই নিয়ে গণহত্যাকে সংখ্যাগুরু মানুষের দাবি বলে প্রচারের অপচেষ্টা চালিয়েছে। ধর্মের নামে এই ঘৃণ্য কাজকে ধিক্কার জানিয়েছেন জসীম উদ্দীন, উন্মোচন করে দিয়েছেন নরঘাতকদের মুখোশ, লিখেছেন এইকথা : ‘জালিমের গড়া আল্লা স্বয়ং শয়তান রূপ ধরি,/ পাক কোরানের অপব্যাখ্যায় বাজায়ে চলেছে তুড়ি।/ রহিয়া রহিয়া রসুলের বাণী রেডিও টেলিও হতে,/ বিকৃত হয়ে ছড়ায়ে চলেছে বিষ-বাষ্পের স্রোতে।/ নর-হন্তারা আজিকে হোয়েছে শ্রেষ্ঠ ঈমানদার,/ লুণ্ঠনকারী জালিম নিয়েছে দেশের শাসনভার।/ নগরের পর নগর পুড়িছে বাজার বিপনী আর,/ দগ্ধ পল্লী রয়ে রয়ে করে অগ্নির উদগার।’
[‘ইসলামী ভাই’]
উনিশশো একাত্তর সালে পাক হানাদার বাহিনী গোটা বাংলাদেশে নিষ্ঠুর হত্যকা- চালিয়েছে। দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে তারা বাংলাকে দগ্ধগ্রামে পরিণত করেছে। কবি আত্মগোপনে থেকে সেদিনের নির্মমতায় ক্ষুব্ধ হয়ে রচনা করেন বাংলার এই বিপন্নতার ছবি :
ঢাকার শহর হইতে সেনারা গিয়াছে আরিচার ঘাট
দুইধারে গ্রাম দগ্ধিত লিপি শিহরে করিয়া পাঠ।
পাবনার পানে গেছে একদল আর দল বগুড়ায়
রংপুর আর দিনাজপুরেতে গিয়াছে ঠাকুর গাঁয়।
গোয়ালন্দের ঘাট হ’তে গেছে খান্খানাপুরে আর,
রাজবাড়ী যেয়ে বাজার বিপণী পুড়ায়েছে একাকার।
ফরিদপুর শহর হইতে কামান গোলার ঘায়
জগবন্ধুর আশ্রমখানি দাঁড়ায়ে ভগ্নকায়।
প্রার্থনারত কয়জন সাধু পেয়েছে শহীদ বর,
চির-আশ্রয় দিয়েছে তাদের দেবতা বৈশ্যানর।
[‘কি কহিব আর’]
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলার গ্রাম-নগর গঞ্জ-বাজার সব পুড়িয়ে দিয়েছে, ধ্বংস করেছে বাঙালির সব সম্পদ। ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে কাব্যের ‘কি কহিব আর’, ‘খবর’, ‘দগ্ধ গ্রাম’, ‘ধামরাই রথ’ প্রভৃতি কবিতায় হানাদার বাহিনীর ধ্বংসের ছবি অঙ্কিত হয়েছে। জসীম উদ্দীন তাঁর নিজস্ব কবিভাষায় পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার ছবি উপস্থাপন করেছেন। এসব কবিতা অনূদিত হয়ে পশ্চিম পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে বিশ্ব-মানুষ জানতে পেরেছে হানাদারদের প্রকৃত পরিচয়। জসীম উদ্দীনের পংক্তিমালায় দগ্ধ বাংলার রূপ চিত্রিত হয়েছে এভাবে :
এইখানে ছিল কালো গ্রামখানি, আম কাঁঠালের ছায়া,
টানিয়া আনিত শীতল বাতাস কত যেন করি মায়া।
… … …
কিসে কি হইল, পশ্চিম হতে নর-ঘাতকেরা আসি,
সারা গাঁও ভরি আগুন জ্বালায়ে হাসিল অট্টহাসি।
মার কোল হতে শিশুরে কাড়িয়া কাটিল সে খান খান,
পিতার সামনে মেয়েরে কাটিয়া করিল রক্ত-স্নান।
কে কাহার তরে কাঁদিবে কোথায়; যূপকাষ্ঠের গায়,
শত সহস্র পড়িল মানুষ ভীষণ খড়গ ধায়।
[‘দগ্ধ গ্রাম’]
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালি হিন্দুদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন করেছে, ধ্বংস করেছে তাদের মন্দির-উপাসনালয়-প্রার্থনা গৃহ। এরই অংশ হিসেবে তারা পুড়িয়ে দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী ধামরাই রথ। পাক-বাহিনী চেয়েছিল ধর্মে-ধর্মে বিরোধ সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে; কিন্তু বাংলার হিন্দু-মুসলমানের মিলিত প্রতিরোধে তাদের সে-অপচেষ্টা সফল হয়নি। পাকিস্তানি বাহিনীর অপচেষ্টার সাক্ষ্য হয়ে আছে জসীম উদ্দীনের ‘ধামরাই রথ’ কবিতা, যা ইংরেজিতে অনূদিত ‘The Chariot of Dhamrai’ নামে। একটি রথ, যা ছিল বাংলার সংস্কৃতির অংশ, তার জন্য কবির বেদনাবোধ প্রকাশিত হয়েছে এভাবে :
What depth of affection evoked from his heart
That millions of people made pilgrimage to see the Chariot
And light the lamp of devotion?
The Guardians of Pakistan in the guise of false saviours
Burnt A this beautiful Chariot down to ashes.
A great consolation for generations after generations
For the work that had come from the hands of the
artist.
What barbarian destroyed the solace forever!
[‘The Chariot of Dhamrai’]
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি নারীরা ছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারের নির্মম শিকার। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য সেদিন অনেকেই পার্শ্ববর্তী ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন, পা বাড়িয়েছেন অনিশ্চিত জীবনের পথে। চিরচেনা বাস্তুভিটা প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষদের কথা কবির ভাষায় রূপলাভ করেছে অসামান্য বেদনা ও ভালোবাসায়। ‘গীতারা চলিয়া যাবে’, ‘গীতারা কোথায় যাবে’, ‘গীতারা কোথায় গেল’ কিংবা, ‘ডযবৎব রং গরহধ?’- এই চার কবিতায় জসীম উদ্দীন অসামান্য দরদ দিয়ে দেশত্যাগী মানুষের যন্ত্রণার কথা বলেছেন, তাদের জন্য বেদনায় সিক্ত হয়েছেন। কবির আবেগমথিত ভালোবাসা, মিনা-গীতাদের জন্য তাঁর অনেকান্ত ভালোবাসা ও ব্যাকুলতা নিচের উদ্ধৃতিত্রয়ে সম্যক উদ্ভাসিত :
ক. গীতারা চলিয়া যাবে ছাড়িয়া পাকিস্তান,
সেই গীতা যার অঙ্গ ঝলকে ঝলমল-মল
করিত সবার প্রাণ।
যার রঙিন মুখের শুভ্র হাসিতে
শেফালী কুসুম ছড়াইত পাছে পাছে,
নাচিত যে পথ ঝামুর ঝুমুর
নূপুরে-জড়িত তাহার পায়ের কাছে।
[‘গীতারা চলিয়া যাবে’]
খ. গীতারা কোথায় যাবে?
কোথায় যাইয়া পাবে আশ্রয় ঠাঁই।
সামনে পেছনে ডাহিনে ও বামে
তাহাদের তরে কোনো বান্ধব নাই।
মানুষ বাঘেরা ফিরিছে ঘুরিয়া প্রসারিত হিংস্র দাঁত,
যে দেবে তাদের আশ্রয়, তার
ঘর বাড়ী সব পুড়িবে অকস্মাৎ।
বনে পলাইলে বন হতে তারে খুঁজিয়া বাহিরে আনি,
নিমেষের মাঝে করে দেবে শেষ বুলেটে আঘাত হানি।
[‘গীতারা কোথায় যাবে’]
গ. Where is Mina gone?
aha — the little shiny girl like a doll
to merely look at her affection flows without bound
… … …
Their village is surrounded by the pirates
Every home burns to the ground
The little girl, to pick her up in the lap
Would only be the rational thing
Who could kill her, can any one be so cruel?
Can you crush the little bulbuli bird
With cold grasp of hands closing on her little
soft throat?
[‘Where is Mina?’]

  • উল্লেখ করা প্রয়োজন, ‘গীতারা চলিয়া যাবে’ কবিতাটি জসীম উদ্দীন রচনা করেছেন ১৯৭১ সালের ৫ই জানুয়ারি। তখনো ইয়াহিয়া খানের ষড়যন্ত্র প্রকাশ্য হয়নি, তখনো দেওয়া হয়নি বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, তখনো বঙ্গবন্ধুর ডাকে আরম্ভ হয়নি অসহযোগ আন্দোলন, তবু স্বচ্ছ রাজনৈতিক দিব্যজ্ঞানে জসীম উদ্দীন অভ্রান্তভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন মিনা-গীতাদের আসন্ন বিপন্নতা। দূরস্পর্শী কবি হিসেবে এখানেই জসীম উদ্দীনের পরম সার্থকতা।
    মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিগর্ভ কালখণ্ডে, ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে, জসীম উদ্দীন রচনা করেন ‘মুক্তি-যোদ্ধা’ নামে অসামান্য এক কবিতা। কবিতাটি ‘ঋৎববফড়স ঋরমযঃবৎ’ নামে অনূদিত হয়ে বিদেশেও ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। পাকিস্তানি ঘাতকদের অত্যাচার আর নিষ্ঠুরতায় সংক্ষুব্ধ কবি আটষট্টি বছর বয়সের সীমানা পেরিয়ে চিরতরুণ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন – হতে চেয়েছেন নির্ভীক এক মুক্তিযোদ্ধা। ‘মুক্তি-যোদ্ধা’ কবিতায় কবি একজন অসমসাহসী মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় গেরিলাযুদ্ধে রত। কবি জসীম উদ্দীন কেবল বিপন্নতার ছবি এঁকেই তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি, বরং মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তিনি বাঙালি জনগোষ্ঠীকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কবির আবেগ আর উচ্ছ্বাস বিশ্বাস আর ভালোবাসা ব্যক্ত হয় এভাবে :
    আমি একজন মুক্তি-যোদ্ধা, মৃত্যু পিছনে আগে,
    ভয়াল বিশাল নখর মেলিয়া দিবস রজনী জাগে।
    কখনো সে ধরে রেজাকার বেশ, কখনো সে খানসেনা,
    কখনো সে ধরে ধর্ম লেবাস পশ্চিম হতে কেনা।
    কখনো সে পশি ঢাকা বেতারের সংরক্ষিত ঘরে,
    ক্ষেপা কুকুরের মরণ কামড় হানিছে ক্ষিপ্ত স্বরে।

আমি চলিয়াছি চির-নির্ভীক অবহেলি সবকিছু,
নরমু-ের ঢেলা ছড়াইয়া পশ্চাৎ-পথ পিছু।
ভাঙ্গিতেছি স্কুল ভাঙ্গিতেছি সেতু স্টিমার জাহাজ লরি,
খান সৈন্যরা যেই পথে যায় আমি সে পথের অরি।
[‘মুক্তি-যোদ্ধা’]
মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে কবি জসীম উদ্দীনের মানসিক সম্পৃক্ততার দলিল ‘মুক্তি-যোদ্ধা’ কবিতা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আর তাদের এদেশীয় দোসরদের প্রতি কবি উচ্চারণ করেছেন ঘৃণা, এবং প্রত্যাশা করেছেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জীবন বাজি রেখে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে। পাকিস্তানি বাহিনীর একজন সদস্যও জীবিত থাকতে কবির সংগ্রাম শেষ হবে না। কবির এই সংক্ষুব্ধ মনের ছায়াপাত ঘটেছে নিচের চরণগুচ্ছে : ‘এ সোনার দেশের যতদিন রবে একটিও
খান-সেনা,/ ততদিন তক মোদের যাত্রা মুহূর্তে থামিবে না।/ মাঠগুলি পুনঃ ফসলে ফসলে পরিবে রঙিন বেশ,/ লক্ষ্মীর ঝাঁপি গড়ায়ে ছড়ায়ে ভরিবে সকল দেশ।/ মায়ের ছেলেরা হবে নির্ভয় সুখ-হাসি ভরা ঘরে,/ দস্যুবিহীন এদেশ আবার শোভিবে সুষমা ভরে’ (‘মুক্তি-যোদ্ধা’)। একাত্তরের প্রতিরোধ সংগ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ও
শৌর্য-বীর্যের যে পরিচয় কবি ‘মুক্তি-যোদ্ধা’ কবিতায় তুলে ধরেছেন, তাতে একজন গণমানসের কবির গভীর ভালোবাসা ও অকৃত্রিম আবেগের পরিচয় পাওয়া যায়।১২ প্রিয় জন্মভূমিকে যারা শ্মশানে পরিণত করেছে, তাদের প্রতি কবির ঘৃণা ক্ষোভ ও প্রতিহিংসা আলোচ্য কবিতায় উদ্ভাসিত। কবি যে মনে মনে মুক্তিযোদ্ধায় রূপান্তরিত হয়ে যান, খানসেনাদের হত্যা করতে তাঁর অস্ত্র যে হুংকার দিয়ে ওঠে – এসবই জসীম উদ্দীনের মুক্তিযোদ্ধায় রূপান্তরের সদর্থক উচ্ছ্বাস। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যেতে পারে ‘মুক্তি-যোদ্ধা’ কবিতায় কবির নিম্নোদ্ধৃত চরণগুচ্ছ :
আমরা চলেছি রক্ষা করিতে মা-বোনের ইজ্জত,
শত শহিদের লোহুতে জ্বালানো আমাদের হিম্মত।
ভয়াল বিশাল আঁধার রাত্রে ঘন-অরণ্য ছায়,
লুণ্ঠিত আর দগ্ধ গ্রামের অনল সমুখে ধায়।
তাহারি আলোতে চলিয়াছি পথ, মৃত্যুর তরবার,
হস্তে ধরিয়া কাটিয়া চলেছি খান-সেনা অনিবার।
[‘মুক্তি-যোদ্ধা’]
বঙ্গবন্ধুর জীবনসংগ্রাম আর মুক্তিযুদ্ধ কবি জসীম উদ্দীনকে মর্মে মর্মে রূপান্তরিত করে দেয়। ফলে পল্লির যে সহজ জীবনধারা নিয়ে ইতঃপূর্বে কাব্য রচনা করেছেন, ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে কাব্যে কবি সম্পূর্ণ নতুন রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ মানুষকে যে কীভাবে পরিবর্তিত করে দেয়, মানুষের চেতনায় কীভাবে জ্বালিয়ে দেয় প্রতিশোধের আগুন, জসীম উদ্দীনের ‘মুক্তি-যোদ্ধা’ কবিতা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

পাঁচ
কেবল কবিতা নয়, গান রচনা করেও কবি জসীম উদ্দীন মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর গানে পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসলীলার চেয়ে বেশি ঘোষিত হয়েছে প্রতিরোধচেতনা। মুক্তিযুদ্ধের আসন্ন বিজয়ে মুখর জসীম উদ্দীনের মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক গানগুলো। সংঘচেতনা আর সমুত্থিত বাঙালির জাগরণই তাঁর এসব গানের কেন্দ্রীয় ভাববস্তু। একদিকে প্রতিরোধ, অন্যদিকে আসন্ন বিজয়বার্তা এই নিয়েই জসীম উদ্দীনের মুক্তিযুদ্ধের গান। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় তাঁর গানের নিম্নোদ্ধৃত অংশদ্বয় :
ক. আকাশেতে পালাস যদি ধরব বজ্র হয়ে,
পাতালে গেলে মারব তোদের সহস্র সাপ লয়ে;
সুন্দরবনে খাড়া আছি আমরা হাজার বাঘ,
পূর্ব আকাশে জ্বলছে আগুন (তোদের) কপালে দিতে
আগ!
হায় হায় রে।
[‘গান’]
খ. হবে হবে জয় তোমাদের হবে জয়,
তোমাদের খুনে রঙিন হইয়া জনমিবে বরাভয়।
রাজ ভয় আর রাজ কারাগার,
যুগে যুগে যার খুলে দিল দ্বার;
ফাঁসির মঞ্চ ঘোষিল যাহার অমরতা অক্ষয়,
হবে হবে জয় তোমাদের হবে জয়।
[‘হবে হবে জয়’]

ছয়
বাংলা কবিতার ধারায়, সূচনা-সূত্রেই ব্যক্ত হয়েছে যে, জসীম উদ্দীন স্বয়ংস্বতন্ত্র অনুপম অদ্বিতীয় এক কবি-প্রতিভা। ধস-আক্রান্ত সময়খণ্ডে আবির্ভূত হয়েও পল্লির মানবম-লীকে আশ্রয় করে জসীম উদ্দীন রচনা করেছেন বাংলা কবিতার নতুন এক ভুবন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত ভয়াবহ এই দিনগুলিতে কাব্যগ্রন্থে জসীম উদ্দীন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিচয় নিয়ে পাঠকের সামনে হাজির হয়েছেন – ‘পল্লিকবি’র সীমানা ছাড়িয়ে এখানে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’। ভয়াবহ আক্রমণ এবং জঘন্য নিষ্ঠুরতার মুখেও কবি মুক্তিযুদ্ধে জয়ের আশা কখনো হারাননি। বক্ষ্যমাণ কাব্যগ্রন্থের সব রচনাতেই শিল্পিতা পেয়েছে স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রতি কবির পরম আশাবাদ। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় সমালোচকের এই মন্তব্য :
কবি তাঁর লেখনীকে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সহায়ক এক হাতিয়াররূপে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। তিনি একদিকে যেমন কবিতার মাধ্যমে জনতাকে শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রেরণা যুগিয়েছেন, অন্যদিকে পাকিস্তানী বর্বরতার বিরুদ্ধে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করার চেষ্টা পেয়েছেন। মানবতাবিরোধী পাকিস্তানী শাসকশক্তির কার্যকলাপের নিন্দা যেমন তিনি করেছেন, তেমনি প্রশংসাও করেছেন দেশের স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গিত-প্রাণ মুক্তিযোদ্ধাদের। সর্বাত্মক নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি মানবতার মহত্ত্বে একেবারে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেননি কখনও।১৩
বাঙালি জাতির দুর্দিনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করে জসীম উদ্দীন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যেভাবে কলম ধরেছিলেন, তা রীতিমতো দুঃসাহসের কাজ। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে জসীম উদ্দীনের এই ভূমিকার তাৎপর্য কোনো সূত্রেই অকিঞ্চিৎকর নয়। জসীম উদ্দীনের এইসব কবিতা ও গান আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যিক দলিল হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে নিরন্তর।

তথ্যসংকেত

১. জসীম উদ্দীন, প্রবন্ধসমূহ, পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা : ১৯৯০, পৃ ১০৬-০৭।
২. জসীম উদ্দীন, পূর্বোক্ত, পৃ ১০৬।
৩. জসীম উদ্দীন, ‘একুশের গান’, রক্তাক্ত মানচিত্র (সম্পাদক : আবদুল হাফিজ), পুথিপত্র, কলকাতা, ১৯৭১, পৃ ২৩।
৪. জসীম উদ্দীন, ‘যারা জান দিল’, কাফনের মিছিল, পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা : ১৯৮৮, পৃ ৩৫।
৫. জসীম উদ্দীন, ‘একুশের গান’, পূর্বোক্ত।
৬. দ্রষ্টব্য – জসীম উদ্দীন স্মারকগ্রন্থ (সম্পাদক : মনসুর মুসা), বাংলা একাডেমি, ঢাকা : ২০০৪, পৃ ৫৭৩।
৭. উদ্ধৃত, মাটি ও মানুষের কবি জসীম উদ্দীন (সম্পাদক : নাসির আলী মামুন), আদর্শ, ঢাকা : ২০১৩, পৃ ৫৯১।
৮. জসীম উদ্দীন, ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে, পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা, দ্রষ্টব্য : ‘লেখকের কথা’।
৯. জসীম উদ্দীন, ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে, পূর্বোক্ত, দ্রষ্টব্য : ‘প্রকাশিকার কথা’।
১০. আনিসুজ্জামান, ‘জসীম উদ্দীন : মানুষ ও কবি’, মাটি ও মানুষের কবি জসীম উদ্দীন, পূর্বোক্ত, পৃ ২০৮।
১১. জসীম উদ্দীন, ‘বঙ্গ-বন্ধু’, ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে, পূর্বোক্ত। বর্তমান আলোচনায় জসীম উদ্দীনের কবিতাংশসমূহ ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে কাব্যগ্রন্থের উল্লিখিত সংস্করণ থেকে উৎকলিত হয়েছে।
১২. রফিকুল ইসলাম, ‘মাটি ও মানুষের কবি জসীম উদ্দীন’, জসীম উদ্দীন : জন্মশতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ, পূর্বোক্ত, পৃ ২০২।
১৩. সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, জসীম উদ্দীন, সিটি লাইব্রেরি, ঢাকা : ১৯৭৩, পৃ ৪৫১-৫২।

Leave a Reply

%d bloggers like this: