বন্ধুল

লেখক:

শচীন দাশ
থমকে দাঁড়াল এসে ইরাবান।
এইমাত্রকালে, প্রভাত হয়েছে সবে নগরীর বুকে; কিন্তু নবীন সূর্যের আলো এখনো প্রসারিত হয়নি সেভাবে। বৃক্ষে বৃক্ষে এখনো কলরবরত নানা প্রকারের পক্ষী। রাজপথেও একজন-দুজন করে পথচারী। ভিস্তিওয়ালারা শূন্য ভিস্তি-কাঁধে চলেছে এক্ষণে নদীর দিকে। নদী থেকে জল এনে তারপর রাজপথ ধোয়াবে তারা। জনজীবনে জোয়ার লাগবে তারপরেই।
হাঁটতে হাঁটতে দ্যূমণির কুটিরের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল; কিন্তু পৌঁছেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়াল ইরাবান। বিস্ময়ও হলো তার।
কুটিরের দরোজা বন্ধ। অন্দরে জীবনের কোনো স্পন্দন আছে বলে মনে হচ্ছে না এখন। অথচ অদ্য প্রভাতেই দ্যূমণির যাত্রা শুরু হওয়ার কথা। পথও তো অতি কাছে নয়। অনেকটা দূর। দেবরাজ পদ্মনাভের মন্দির কি এখানে নাকি? প্রভাতে যাত্রা শুরু হলে অপরাহ্ণবেলায় পৌঁছবে নগরের প্রান্তসীমায়। অদ্য রজনী সেখানেই কোনো সরাইখানায় কাটিয়ে পর দিবসের প্রভাতবেলায় সে দেবালয়ের কাছে গিয়ে হাজির হবে। হয়ে নদী থেকে øান করে শুদ্ধ হয়ে মন্দিরে গিয়ে বালিকা উৎসর্গ করে পুজো দিয়ে পুরোহিতের হস্তে ওই বালিকাকে অর্পণ করে ফিরে আসবে। সেই মতোই তো কথাও হয়েছে গতকল্য।
গত একপক্ষকাল হলো এক দুস্থ পরিবারের কাছ থেকে বছর পনেরোর এক বালিকাকে ক্রয় করে রেখেছে দ্যূমণি; দেবতার উদ্দেশে বিনোদনের জন্য। ইরাবান জানে, সুন্দরী নারী ক্রয় করে দেবালয়ে উপহার দেওয়ার প্রচলন আছে এ-নগরীতে। দিলে দাতার পুণ্য হয়। তাছাড়া দ্যূমণির স্ত্রী অসুস্থ। পক্ষাঘাতে পঙ্গু। দ্যূমণি তাই স্থির করে রেখেছিল, দেবালয়ে সুন্দরী নারী উপঢৌকন দেবে সে। দেবতার উদ্দেশে যৌবনবতী সুন্দরী ও অক্ষমযোনি কোনো নারীকে নিবেদন করলেই নাকি ভালো হয়ে যাবে তার স্ত্রী।
কবিরাজের চিকিৎসসায় ছিল দ্যূমণির স্ত্রী। নববিবাহের মাসাধিককাল পর থেকেই কী এক কঠিন অসুখে সে শয্যাশায়ী। কী যে হয়েছিল, অনুমানও করতে পারেনি দ্যূমণি। কিন্তু চিকিৎসায় সাড়া না পাওয়ায় পুরনো চিকিৎসক পরিত্যাগ করে এক বৌদ্ধ চিকিৎসককে গৃহে নিয়ে এসেছিল। তাতেও কোনো উপকার হচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল না তার। দিনদিন ক্রমে কাশ্যপী যেন শয্যায়ই মিলিয়ে যাচ্ছিল। অবস্থা যখন গুরুতর ও কাশ্যপীর জীবনদীপ যখন মহাসংকটে, সে-সময়ে যোগাযোগ হলো এক গণৎকারের সঙ্গে। এক অপরাহ্ণে নগরের এক পথে, চিকিৎসকের কাছ থেকে ঔষুধির নানান অনুপান জেনে ফেরার সময় অনুকূলদৃষ্টিতে পড়েছিল ওই প্রখ্যাত গণৎকারের। পথিপার্শ্বে বসে সে তার গণনাকার্য চালিয়ে যাচ্ছিল। অকস্মাৎ নজরে পড়েছিল দ্যূমণিকে। দ্যূমণিকে সে কাছে আসতে বলেছিল এবং দ্যূমণি কাছে গেলে সেই গণৎকার কাশ্যপীর কথা জানতে চেয়েছিল। দ্যূমণি ভেঙে পড়েছিল তখনই। তা গণনা করে দ্যূমণিকে জানিয়েছিল, তার স্ত্রী সুস্থ হয়ে উঠবে আবার। এবং এতে কোনো সংশয়ই নেই; কিন্তু বিনিময়ে একটি বিশেষ কার্য তাকে করতে হবে।
বিশেষ কার্য? তা কী কার্য, যদি আজ্ঞা করেন –
কার্য তো একটাই। তা করতে পারবে? তবে খুবই কঠিন তোমার পক্ষে। তবু যদি পারো…
আজ্ঞে আমি পারব।
পারবে? স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে ততক্ষণে গণৎকার।
হ্যাঁ, মহাশয়। দ্যূমণির মুখের রেখা কঠিন হয়ে ওঠে। জানায়, আপনি অনুমতি করুন –
তবে শ্রবণ করো।
ভ্রƒমধ্যে দুটি রেখা ফুটে উঠেছিল গণৎকারের। গণৎকার দ্যূমণির ললাট পরীক্ষা করেছিলেন। করেই এরপর জানিয়েছিলেন, যতশিগগিরসম্ভব কোনো সুন্দরী ও অক্ষতযোনি এক নারীকে নিয়ে যেন দেবতা পদ্মনাভের মন্দিরে যায় দ্যূমণি। গিয়ে তাকে উপঢৌকন দিয়ে আসে। দিলেই তার যুবতী স্ত্রী কাশ্যপী ফের হয়ে উঠবে সুস্থ। তার সুস্থ-স্বাভাবিক যৌনজীবনেও ফিরে পাবে সে পুনর্বার। ফলে সন্তানধারণও করতে পারবে।
পারবে মহাশয়?
নিশ্চয়ই পারবে, তুমি দেখে নিও বৎস। তবে কার্যটি বড়ই কঠিন।
যত কঠিনই হোক আমি পারব।
তাহলে সত্বর যাও। সুন্দরী ও অক্ষতযোনি কোনো নারীর সন্ধান করো। নাহলে জীবন তোমার বিষময় উঠে উঠবে।
সত্যিই বিষময় উঠছিল বুঝি দ্যূমণির জীবন। দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। একে অসুস্থ নববিবাহিতা বধূ, তার ওপর নিজের দেহের ওই ভরা যৌবন।
তা অনুমান করেছিল বুঝি রুগ্ণ নবপরিণীতা স্ত্রী কাশ্যপী। বিবাহের পর মাসাধিকককাল সে স্বামীসহবাসে স্বামীকে যোগ্য সহায়তাই করেছে। এবং যৌনতার কলাকৌশলে এতটাই পারদর্শিতা দেখিয়েছিল যে, দ্যূমণি বড়ই তৃপ্ত হয়েছিল। কাশ্যপীকে নিয়ে তাই গর্বের অন্ত ছিল না তার; কিন্তু এক্ষণে সে অসুস্থ। তাই বলে নবীন যৌবনের তার স্বামী কেন নারীসঙ্গে বঞ্চিত হবে? অনুমান করেই বুঝি দু-একদিন সায়ংকালে অনেক বুঝিয়ে কাশ্যপী তাকে পাঠিয়েছিল গণিকালয়ে। তা যাবে না যাবে না করেও অবশেষে বুঝি গিয়েছিল দ্যূমণি। আর ওই ওখানেই পরিচয় ইরাবানের সঙ্গে। ক্রমে বন্ধুত্বও হয়ে যায়; কিন্তু ওই সুন্দরী কুমারীকে ক্রয় করার পর থেকে প্রায় দিন পনেরো হয়ে গেল। যেতে আর পারছে না কিছুতেই দ্যূমণি। কাশ্যপী যেন থেকে থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। শেষে তার বন্ধু ইরাবানের কুটিরে গিয়ে বলে এসেছে গতকল্যই, আর বিলম্ব করা ঠিক নয়। এক্ষণে সে যদি কাশ্যপীকে দু-তিনদিন দেখাশোনার ভার নেয়, তাহলে সে যেতে পারে ওই বালিকাকে নিয়ে। তা ভাবনায়ই পড়েছিল ইরাবান। একে যুবতী নারী ও তায় অসুস্থা। ফলে তার সবকিছু কি তার পক্ষে করা সম্ভব? তবু বন্ধুর এমন বিপদের দিনে সাড়া না দিয়ে পারেনি ইরাবান। সম্মতি জানিয়েছিল ইরাবান। জানিয়েছিল, সে আগামীকাল প্রভাতেই এসে যাবে দ্যূমণির কুটিরে। দ্যূমণি যেন প্রস্তুত থাকে। সে এলেই দ্যূমণি যেন যাত্রা শুরু করে ওই বালিকাকে নিয়ে। কথা হয়েছিল এবং সে-কথামতোই ঠিক সময়ে এসে পৌঁছেছে ইরাবান। অথচ দরোজা খোলেনি এখনো কুটিরের!
কুটিরের সামনেই একটা শাল্মলী বৃক্ষ ছিল। তাতে দ্যূমণির ঘোটকটি দাঁড়িয়েছিল। দাঁড়িয়ে ক্রমাগত সে তাড়িয়ে যাচ্ছিল তার পায়ের ওপরে বসা অসংখ্য মক্ষীকুল। সওদাগরির কাজে সুবিধার জন্য এই ঘোটকটি সম্প্রতি ক্রয় করেছিল দ্যূমণি। ইরাবান এসে সেখানেই দাঁড়িয়ে দ্যূমণিকে ডাকল।
দ্যূমণি… দ্যূমণি –
দরোজা উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল ডাকার আগেই। বোধহয় দ্যূমণি তাকে দেখে থাকবে তার গবাক্ষপথে। ইরাবানকে দেখেই সে তাকে অন্দরে প্রবেশের আমন্ত্রণ জানাল; কিন্তু দ্যূমণির মুখ শুষ্ক। আঁখির তলায়ও যেন কজ্জলের মতো কালি জমে উঠেছে।
ইরাবান চিন্তিত হলো। কী হলো আবার! কী হয়েছে তোমার দ্যূমণি?
কুটিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিল। দ্যূমণি তাকে বহির্কক্ষে বসিয়েই জানাল, না বন্ধু, আর বোধহয় কাশ্যপী সুস্থ হয়ে উঠল না –
সে কী, কেন! এমন হতাশা কেন তোমার বাক্যে?
তা কী বলব! কাল রাত্রি থেকে ভয়ংকর অসুস্থ কাশ্যপী। দ্বিতীয় প্রহরে তো জ্ঞান হারিয়েই ফেলেছিল। এক্ষণে জ্ঞান ফিরেছে, তবে অসুস্থ খুবই। ওই বালিকারও তাই রাত্রি জাগরণ ঘটেছে –
নিশ্চুপ তাকিয়েছিল ইরাবান। এই সময়েই দ্যূমণি তার হাতদুটো জড়িয়ে ধরল। ধরেই বলল, এক কাজ করবে? আমার একটা অনুরোধ রাখবে! তুমি তো আমার বন্ধু। আমার শান্তিই চাও –
কী ভাবছিল আপনমনে ইরাবান। দ্যূমণির বাক্যে চমকে উঠল।
হ্যাঁ, বলো। তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ার পর থেকে কোনোদিনই কি তোমার বাক্যে সাড়া দিইনি?
হ্যাঁ, তা দিয়েছ। আর সে-দাবি নিয়েই তো বলছি।
তবে বলো, কী বলতে চাও –
হ্যাঁ, বলি তবে। মন দিয়ে শ্রবণ করো আমার বাক্য –
দ্যূমণি বলতে থাকে। বলতে বলতেই জানায়, তুমি এই বালিকাকে নিয়ে যাও মন্দিরে। আমার হয়ে তাকে অর্পণ করে এসো মন্দিরে। আমার হয়ে তুমিই উৎসর্গ করে এসো। আর আমাদের নামে দেবতাকে অর্ঘ্য দিও বিভিন্ন উপাচারে…
আমি! বিস্ময় প্রকাশ করেছিল ইরাবান। আমি দিলে তোমার কার্যসিদ্ধি হবে?
হবে হবে ইরাবান। আমি তো তাও গণৎকারকে শুধিয়েছিলাম। একান্তই আমি যেতে না পারলে আমার প্রতিনিধি হয়ে কেউ দিলে হবে কি-না? দেবতা সন্তুষ্ট হবেন কি-না? তা তিনি সেই কৃতপ্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন।
দিয়েছিলেন? কী বলেছিলেন?
জানিয়েছিলেন, তাও হতে পারে। তোমার নামে উৎসর্গ করে দিয়ে আসতে পারে। তবে আবার জানাচ্ছি, খুবই কঠিন কার্য। বলতে গিয়েই পুনর্বার কর্তব্যটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু তুমি কখন তাকে শুধালে? ইরাবান অবাক। কল্যই তো তোমার সঙ্গে কথা হলো আমার –
না, অনুমান করে আমি সে-দিবসেই বিস্তারিত জেনে নিয়েছিলাম তার কাছ থেকে। এক্ষণে তুমি যদি রাজি হও? কাশ্যপীর যা অবস্থা, তাতে আমি যাত্রা করতে ভরসা পাই না…
হস্তদুটি ধরেই রেখেছিল। ইরাবান সম্মত না হয়ে পারল না। তবে বলল, কিন্তু ওই নারী? সে যাবে কি আমার সঙ্গে? আমি তো তার অপরিচিত।
আমিও কি তার অপরিচত নই? বাক্যালাপ করলেই কি পরিচয় হয়?
ইরাবান হতবাক। জানায়, সে কি আজি প্রায় পঞ্চদশ দিবস হয় তাকে ক্রয় করে এনেছো তুমি, এখনো তার সঙ্গে তোমার পরিচয়ই হলো না। আমি হলে তো পারতাম না ভাই। কী জানি, তাকে নিয়ে শয্যায় গিয়ে হয়তো তার সঙ্গে যৌনসঙ্গমে মেতে উঠতাম –
না না, এ কি! দ্যূমণি যেন আতঙ্কে দিশাহারা। কিয়ৎ পরিমাণ ভয় পেয়েই জানাল, দেবতার কাছে উৎসর্গের জন্য ক্রয় করা হয়েছে ওই অক্ষতযোনি নারীকে। তা কখনো ভোগ করা যায়! পাপ হবে যে! না না বন্ধু, তুমি আবার তার সঙ্গে পথিমধ্যে ভিন্ন সম্পর্ক স্থাপন করো না। তাহলে কাশ্যপী আর ভালো হয়ে উঠবে না –
ইরাবান বিব্রত। খানিকসময় দ্যূমণির মুখাবয়ব অবলোকনের পরেই জানায়, তুমি যে আমাকে অবাক করলে বন্ধু? আমি কি তাই বলেছি! বলতে চেয়েছি, তুমি কী করে এখনো তার পরিচয়ই লাভ করলে না! সত্যিই তোমার সংযম আছে বটে! তাছাড়া বলতে চেয়েছি, সে আমার অপরিচিত, কাজেই আমার সঙ্গে যাত্রায় তার অসুবিধে নেই তো?
না না, দ্যূমণি বলে, আমি তো তাকে ক্রয় করেছি দেবতাকে উৎসর্গ করব বলে। সে তো এক্ষণে আমার দাসী। সুতরাং সে কেন গমন করবে না তোমার সঙ্গে। না না, তুমি দেরি করো না বন্ধু। অনেক দূরের পথ। সে তৈরিই হয়ে আছে। বাসবী বাসবী…
ক্রমাগত উচ্চারণে দ্যূমণি একবার গৃহের অভ্যন্তরভাগে দৃষ্টি ফেরায়।
ইরাবান শুধায়, ওর নাম বুঝি বাসবী?
না, বাসবদত্তা। তবে এই কয়দিবসে কাশ্যপী তা সংক্ষেপ করে নিয়ে তাকে বাসবী বলেই সম্বোধন করে। আমিও তাই –
বলেই ইরাবানের হাতদুটো ফের আঁকড়ে ধরে নিুস্বরেই কী বলতে যায়, কিন্তু বলতে গিয়েও পারে না। আঁখিভরে তার অশ্র“ নেমে আসে।
ইরাবান তাকে সান্ত্বনা দেয়, তুমি নিশ্চিন্ত থেকো দ্যূমণি। আমি তোমার কার্য সমাপন করেই ফিরে আসব।
দ্যূমণিকে তবু নিশ্চুপ প্রত্যক্ষ করে ইরাবান ফের জানায়, না বন্ধু, তোমার কোনো আশঙ্কা নেই। বাসবীর সঙ্গে ভিন্ন কোনো সম্পর্কে আমি যাব না। আমি কি জানি না, তাতে তোমারই ক্ষতি!
দ্যূমণি আশ্বস্ত হয়। স্মিত হেসে জানায়, না না, তা তো আমি জানি। তাই হোক, তাহলে যাত্রা করো এখন। প্রাঙ্গণে আমার ঘোটকটি অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।
ঘোটক। না না, দ্যূমণি। আমি নিতান্তই সামান্য এক যুবক। ঘোটকে আমার প্রয়োজন নেই –
কেন, ঘোটকে চড়া তুমি জানো না?
খুব জানি বন্ধু।
তাহলে যাও না কেন! দ্রুত গমন করতে পারতে?
তার প্রয়োজন নেই। আমি ঠিক নিয়ে যেতে পারব ওই বালিকাকে। ঠিকমতোই মন্দিরে গিয়ে তোমার নামে উৎসর্গ করে দিতে পারব। তুমি চিন্তা করো না। ওখানকার অনেক ব্রাহ্মণ পূজারিকে আমি জানি।
জানো। তাঁদের সঙ্গে তোমার পরিচয় আছে?
ইরাবান উত্তর করে, না। তার মুখমণ্ডলে বিচিত্র এক হাসি খেলে যায়।
বাসবদত্তা বেরিয়ে এসেছিল। আর বেরোতেই তাকে নজরে পড়ায় চমকে উঠল ইরাবান। কোথাও দেখেছে সে তাকে? কোথায় দর্শন হয়েছিল এই নারীর সঙ্গে তার? এমন সুন্দর একটি মুখশ্রী, সে কি কোথাও প্রত্যক্ষ করেছিল? না করলে এমন পরিচিত মনে হবে কেন?
ইরাবান লক্ষ করল, মেয়েটি ইতোমধ্যে øান সম্পন্ন করে নিয়েছে; কিন্তু কুন্তল সিক্ত এখনো। সিক্ত চূর্ণ কুন্তলগুচ্ছ নেমে এসেছে তার ললাটের দুই প্রান্তভাগজুড়ে। এবং তা থেকে বারিবিন্দু যেন ঝরে পড়ছে এখনো। ইরাবান আরো লক্ষ করল, প্রশস্ত ললাটের নিচেই কাজলরেখার মতো দুই সরু ভ্রƒ ওই নারীর। ভ্রƒমধ্যের ঠিক নিচে থেকেই আরম্ভ আবার উন্নত নাসিকার। আঁখিপল্লব ঘন ও মেঘের মতো কালো। বন্য হরিণীর মতো টানা নেত্রযুগল যেন কী এক মায়ায় জড়ানো। গোলাপবর্ণ মুখমণ্ডলে অপূর্ব লালিত্য ও øিগ্ধতা। আজানুলম্বিত কুঞ্চিত কেশদাম। ঊর্ধাঙ্গ সুগঠিত। কুচযুগল সুগোল ও লাবণ্যময়। ক্ষীণকটি। শ্রোণীদেশ যেন কোনো কুন্তকারেরই নির্মিত কোনো কারুকার্য করা মৃত্তিকার ঘড়া। এবং সর্বোপরি তার পায়ের চলন যেন শব্দহীন। সে যে এলো, কই তা টেরও তো পেল না একবার ইরাবান! কী জানি তার চলনেও বুঝি কোনো শব্দ নেই!
নয়নযুগলে বিস্ময় নিয়েই তাকিয়েছিল, দ্যূমণির বাক্যে ইরাবানের চেতনা ফিরল।
যাও, বাসবী। সত্বর গমন করো আমার বন্ধু ইরাবানের সঙ্গে। এই আমার বন্ধু ইরাবান। তার কথা তো সামান্য আগেই বলেছি আমি তোমাকে। তার মতো বন্ধু আমার জীবনে খুব কমই এসেছে। তার ওপর তুমি নির্ভর করতে পারো। তাছাড়া তুমি তো জানো, কেন তোমাকে আমি ক্রয় করেছি। তোমাকে পদ্মনাভর মন্দিরে গিয়ে দেবতার কাছে দান করলে আমার স্ত্রী  ফের সুস্থ হয়ে উঠবে। যাও, এক্ষণে যাও তুমি ওর সঙ্গে বাসবী –
একনাগাড়ে বলে যাচ্ছিল দ্যূমণি। বাসবী সামান্য ঘাড় কাত করে তার মস্তকটি হেলাল। বলল তারপর, নিশ্চয়ই মহাশয়! আমি এখুনি যাত্রা করছি। আমার যাত্রায় আপনার পতœী নিশ্চয়ই ভালো হয়ে উঠবেন।
তাই হোক বাসবী। তোমার মঙ্গল হোক –
নিচু হয়েই দূরত্ব বজায় রেখে নতজানু হয়ে সে এক্ষণে দ্যূমণিকে প্রণাম করে। এরপর ধীরে ধীরে নিষ্ক্রান্ত হয় গৃহ থেকে।
বেরিয়েই এসেছিল বাসবী। প্রাঙ্গণে বেরিয়ে এসে একবার তার নয়নের প্রান্তভাগ দিয়ে দ্যূমণির কুটিরের দিকে তার দৃষ্টিটি রাখল। অদ্য পর্যন্ত বেশ কয়েকটি দিন এখানে সুখে-দুঃখে অতিক্রান্ত হয়েছিল তার জীবন। বাসবী সমস্ত কুটিরটি অবলোকন করল। তারপর অবনত মুখমণ্ডলে সে ইরাবানের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়াল।
চলুন মহাশয়, কোনদিকে গমন করবেন?
ইরাবানের দৃষ্টি তখনো সরেনি বাসবীর অঙ্গ থেকে। সে তখনো যেন ভাবছিল। বাসবীর কথায় তার খেয়াল হলো।
হ্যাঁ চলো। এইবেলা বেরিয়ে পড়ি।
বলতে গিয়েই আকাশের প্রান্তভাগে একবার তাকিয়ে কী নিরীক্ষণ করে ইরাবান। পরে জানায়, বৈশাখ মাস। ঊষালোক চলে গেছে। ক্রমশ রৌদ্রতাপে প্রখর হচ্ছে পৃথিবী। অবশ্য বায়ুপ্রবাহ আছে গতকল্যের মতোই। পদক্ষেপে অসুবিধে হবে না। তবু এক্ষণে বেরিয়ে পড়াই উত্তম –
বলতে বলতেই দ্যূমণির কাছ থেকে বিদায় নিল ইরাবান। নিয়েই সে এগিয়ে চলল। সঙ্গে তার বাসবী। বাসবীর কাঁখালে একটি কাপড়ের ক্ষুদ্র পুলিন্দা। তাতে তার দৈনন্দিন কয়েকটি কাপড় ও কাঁচুলি। এছাড়া সুগোল হাতজোড়া তার শূন্যই। স্থির ছন্দে দ্রুত পদক্ষেপে সে হাঁটছিল ইরাবানের পাশাপাশি। কখনো ইরাবান আগে বাসবী পরে, তাকে অনুসরণ করছে। কখনো বাসবী সম্মুখে, ইরাবান পশ্চাদগামী। কখনো বা আবার পাশাপাশি। যেন অঙ্গে অঙ্গের সংস্পর্শেই কখনো কখনো এসে যাচ্ছিল তারা।
হাঁটছিল তারা এভাবেই। ক্রমে হাঁটতে হাঁটতে একসময় প্রভাত অতিক্রান্ত হয়ে মধ্যাহ্নকাল উপস্থিত। দিবাকরও ততক্ষণে ক্রমে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে প্রখর রৌদ্রে তার উত্তাপটি মেলে ধরেছে ধরিত্রীর বুকে। এভাবে চললে অপরাহ্ণের মধ্যেই তারা পৌঁছে যাবে নগরের প্রান্তভাগে। তারপরেই এক পাহাড়ি উপত্যকা। কল্য প্রভাতেই           সে-উপত্যকাটি অতিক্রম করতে পারলে মধ্যাহ্নেই তারা উপস্থিত হতে পারবে দেবতা পদ্মনাভর মন্দিরের নগরীতে।
এতক্ষণ কথা বলেনি। একনাগাড়ে কেবল হেঁটেই যাচ্ছিল। এবং হাঁটতে হাঁটতে শুধুই অনুসরণ ও প্রতি-অনুসরণের পালা চলছিল। এক্ষণে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে যেন মায়াই হলো ইরাবানের। অনেকটা পথ অতিক্রম করে এসেছে সে। এবার বোধহয় বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন আছে। কেননা, মুখমণ্ডলে তার ক্লান্তির ছায়া। গণ্ডদেশ রক্তাভ। আঁখিযুগলও রক্তবর্ণ। কী জানি এমন উত্তাপে সে যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলেই হয়েছে আরকি! দেবতার মন্দিরে আর নিয়ে যাওয়া যাবে না তাকে। তার চেয়ে এখন বিশ্রাম নেওয়াই শ্রেয়। চারপাশে দৃষ্টি নিবন্ধ রেখে পর্যবেক্ষণ করছিল ইরাবান। এক্ষণে বলল, চলো বাসবী। ওই ছায়ার নিচে সামান্য বিশ্রাম সেরে নিই আমরা।
বিশ্রাম! বাসবী যেন দ্বিধাগ্রস্ত। জানাল, কালক্ষেপ করলে মন্দিরে যদি উত্তম সময়ে উপস্থিত হতে দেরি হয়? না, তা হবে না। কিন্তু এই দ্বিপ্রহরে আর এগোনোও যাবে না সম্মুখে। লক্ষ করেছ, প্রকৃতির কী রূদ্ররূপ। প্রখরতাপে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে। তার চেয়ে না-হয় অপরাহ্ণবেলায় ফের যাত্রা শুরু করব। রাত্রির প্রথম যাম পর্যন্ত হেঁটে যাব –
কিন্তু তা কি পারবেন! পথে শুনেছি দস্যুদল আছে।
হ্যাঁ, তা আছে। ইরাবান অবাক হয়ে যায়। আর বলতে গিয়েই বাসবীর কচি ও নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, কিন্তু তুমি এসব জানলে কী করে? তুমি এদিকে এসেছ কোনোকালে?
নিশ্চুপই হয়ে রইল বাসবদত্তা।
ইরাবান পুনর্বার বলল, তুমি তো কখনো বাহিরে যাওনি! আমার বন্ধুর কাছেই তো শ্রবণ করেছিলাম তোমার সম্পর্কে।
তা সত্যি। আপনার বন্ধু বুঝি ঠিকই বলেছেন। অদ্য দিন পনেরো তার গৃহে থেকে তার ও তার স্ত্রীর সঙ্গে তো এসব নিয়েই কথা হয়!
তবে! এ-ব্যাপারে অবহিত হলে কী প্রকারে?
হয়েছি। আমার পিতার কাছেই শ্রবণ করেছি –
তোমার পিতা খুব জ্ঞানী মানুষ। অনেক কিছু জানেন, তাই না বাসবী?
বাসবী আচমকা নিশ্চুপ হয়ে যায়। কোনো বাক্যই শোনা যায় না আর তার কাছ থেকে।
অদূরে অনুচ্চ একটি টিলার ওপর কিছু বনস্পতি ছিল সারিবন্দি হয়ে। অনেকক্ষণ থেকেই ইরাবানের গোচরে এসেছিল সেটি। এখন নেত্র নিমীলিত করে ভ্রƒ যুগলের ওপর হাত একটি রেখে প্রত্যক্ষ করল ওই সুউচ্চ বনরাজি। পিপ্পল থেকে নাগ্রোথ ও সপ্তপর্ণীর যেন মেলা বসেছে সেখানে। ইরাবান সেদিকেই এগিয়ে চলল। অগত্যা পেছনে পেছনে বাসবী।
খানিকটা পথ অতিক্রম করে একসময় গিয়ে তারা সেখানেই উঠল। কিন্তু সন্দেহ তবু গেল না ইরাবানের। কোথায় তাকে দেখেছে সে?
দুজনেই পৌঁছে গিয়েছিল। ইরাবান বলল।
বেশ ছায়া আছে এখানে বাসবী। বিশ্রামের পক্ষে উপযুক্ত স্থান। ইরাবান জানাল, মধ্যাহ্নকালটি বরং এই স্থানেই বিশ্রাম নিই। কী বলো! তারপর বেলা পড়লে না-হয় বেরিয়ে পড়ব –
বলতে গিয়েই পিপ্পলের ছায়ায় স্থান একটি নির্বাচন করে বসেই পড়ল ইরাবান। এরপর বাসবীকে বসার জন্য আহ্বান জানাল। বাসবী চারপাশে কী লক্ষ করছিল। এরপর তার কোমল পদযুগল গুটিয়ে সবুজ তৃণভূমির ওপরেই উপবেশন করল। তার উপবেশনের ভঙ্গিটি বড়োই সুন্দর। ইরাবান অপাঙ্গে দেখল তাকে। সামনে রাখল তার সেই ক্ষুদ্র পুলিন্দাটি।
সামান্য একটু সময় উভয়েই তারা নিশ্চুপ। বাসবী তার ক্ষুদ্র পুলিন্দাটির দিকেই চোখ রেখেছিল। একসময় ইরাবানই আবার  সে-প্রসঙ্গ তুলল।
কই, বললে না বাসবী?
কী? গ্রীবা বুঝি সামান্য ঘুরিয়েছিল বাসবী। ইরাবান শুধোল, আমি যে তোমাকে তোমার পিতার বিষয়ে প্রশ্ন করলাম?
নীরবই ছিল এবারে বাসবী। কিন্তু সামান্য পরেই সে তার গ্রীবা তুলল প্রান্তরের দিকে। আর তাতেই তার কেশরাশি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ল পিঠময়। প্রভাতে যা সিক্ত ছিল এতক্ষণে খররৌদ্রে তা শুকিয়ে অবিকল যেন রেশমের মতো।
ইরাবান মুগ্ধদৃষ্টিতে তা অবলোকন করল।
অনেকক্ষণ বুঝি মুগ্ধ নয়নে তাকিয়েছিল ইরাবান। কিন্তু আর বেশিক্ষণ সে তাকাতে পারল না। ক্ষণকাল পরেই সে লক্ষ করল, বাসবীর মুখমণ্ডলে কিসের এক যন্ত্রণার ছায়া। মুখমণ্ডলটি ফিরিয়ে সে বুঝি তার যন্ত্রণাকেই আড়াল করছে। ইরাবানের নজর এড়াল না তা। কিন্তু কেন? ইরাবান আর সে-প্রসঙ্গে গেল না। অনুমান করল তার পিতা ও মাতার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সে বড়ো ভেঙে পড়েছে।
থাক বাসবী, থাক তুমি বলো না। তোমাকে আর বলতে হবে না। বলতে গিয়ে তোমার বরং কষ্টই হচ্ছে। থাক, এসব এখন…
কিন্তু বাসবী সে-কথার জবাব দিলো না। আচমকা সে তার হাতদুটি তুলে তার আঁখিচাপা দিলো। ততক্ষণে সে একটু ঘুরেও গেছে বুঝি পশ্চাদভাগে। এবং ঘুরেই যেন আরো ভীষণ এক যন্ত্রণাকেই প্রশ্রয় দিচ্ছিল সে। দিয়ে, না-জানি ভাবছিল তার পিতার কথা।
বাসবী ভাবছিল। তার পিতার মতো এমন পুরুষ সে এ-জীবনে খুব কমই প্রত্যক্ষ করেছে। নিজে তো নিয়ম করে গণিকালয়ে যাবেই, উপরন্তু মাতার গর্ভকেও কখনো শূন্য রাখার কথা ভাবতে পারেনি।
বাল্যকাল থেকে তা-ই প্রত্যক্ষ করে এসেছে বাসবী প্রতি বছরই তার মাতার গর্ভ পূর্ণ। গর্ভবতী হচ্ছে সে। পিতার লক্ষ পূর্ণগর্ভ। গর্ভ কখনো শূন্য রাখা যাবে না। আর সে-গর্ভে যদি কন্যাসন্তান আসত, তাহলে আর তার আনন্দ দেখে কে! আনন্দ প্রকাশ করত পিতা। কিন্তু পুত্রসন্তান হলেই তার মুখ অন্ধকার। কৃষ্ণকালো মেঘের মতো তার মুখ ভারী হয়ে উঠত। তা সে-ভাগ্য খুব কমই হয়েছে পিতার। ওই একবারই সে একটি ভাতৃলাভ করেছিল। তাবাদে পিতার সব সন্তানই কন্যা। বাসবী তো তার মাতার পঞ্চম গর্ভের সন্তান। এর আগে তারা তিন বোন ও এক ভাই। তা বোনেরা কেউই নেই। পিতা তাদের কোথাও না কোথাও ঠিক বিক্রয় করে দিয়েছে। নয় থেকে দশ বৎসরক্রমও অতিক্রম করতে পারত না, তার আগেই কোথায় যে কে চলে যেত। মা কেবল কাঁদত আর বোবাদৃষ্টি মেলে তাকিয়ে দেখত। বাধা দেওয়ার ক্ষমতাও তার ছিল না। শুধু সে-ই কেবল বছর পনেরো কাটাতে পেরেছে গৃহে। তাও কী, এতদিন পর্যন্ত গৃহে পড়ে থাকত নাকি? মাঝে পিতা খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। পরে সুস্থ হয়েই এক গণিকালয়ে তাকে বিক্রয় করতে গিয়েছিল। কিন্তু…
বাসবী তার আঁখি খুলল বুঝি। ইরাবান তার কাঁধ থেকে কী একটা পুলিন্দা নামাচ্ছে।
বাসবী, আমার কাছে কিছু অন্নাহার আছে। ভর্জিতা চিপিটক। মুড়কি, খেজারি আর মিষ্টক। এসো, দুজনে মিলে এইই খেয়ে নিই। ক্ষুধার উদ্রেকও হয়েছে খুব –
বাসবী অপলক নয়নে দেখছিল মানুষটিকে। ভরা যৌবন শরীরে। সুগঠিত দেহ। মস্তকে একমস্তক কুঞ্চিত মেঘবরণ কেশ। গৌরবর্ণ। কিন্তু মুখমণ্ডলে যেন হাটে আসা বিদেশি সওদাগরের চিহ্ন।
নাও, বাসবদত্তা। খোলো দেখি পুলিন্দাটি?
ইরাবান চোখ রাখল বাসবীর দিকে।
এবং এই এতক্ষণেই বাসবী বুঝি তার পূর্ণদৃষ্টিটি মেলে দিয়েছে ইরাবানের দিকে। ইরাবান তা লক্ষ করল। কিন্তু কী দেখছে সে?
কী দেখছ বলো তো?
একটা প্রশ্ন আছে আমার।
শুধাও দেখি কী প্রশ্ন?
আমি কিন্তু আপনাকে চিনতে পেরেছি –
ইরাবান হেসে ফেলে। তা চিনবে না বলি কী প্রকারে! হয়তো আমার বন্ধুর কুটিরে দেখবে এরই মধ্যে, কিন্তু পরিচয় হয়নি।
না না। আপনার বন্ধুর কুটিরে নয়। আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল কিন্তু অন্যত্র।
অন্যত্র? ইরাবান আশ্চর্য হয়। তার একটা গুণ আছে, সেটা জানে ইরাবান। একবার তার সঙ্গে যার পরিচয় হয়, সে তো তাকে কখনো বিস্মৃত হয় না। অথচ এ- নারী যা বলছে…
ইরাবান বিস্ময়ে চোখ রাখে। কিন্তু আমি তো তোমাকে স্মরণে আনতে পারছি না বাসবদত্তা? নিশ্চয়ই তোমার অনুমানে কোথাও প্রমাদ ঘটেছে।
না মহাশয়। অনুমান আমার ঠিকই আছে। মনে করে দেখুন তো এক সায়াহ্নবেলার কথা। এক গণিকালয়ে এক ব্যক্তি তার কন্যাকে বিক্রয় করতে গিয়েছিল; কিন্তু কৌশল করে আপনিই তাকে বিক্রয় করতে দেননি।
আমি!
হ্যাঁ, আপনি? সেই কন্যার আঁখিতে আপনি কি কিছু দেখেছিলেন?
ইরাবান প্রথমে হকচকিত। এবং এরপরেই তার মনে পড়াতে সে চমকিত। হ্যাঁ, এমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল বটে! কিন্তু এই মেয়ে তা জানল কী করে? তাহলে কি এই সেই মেয়ে?
ইরাবান ভাবনার ঘোরে পড়ে। তাহলে কি এই মেয়েই এসেছিল কোনোদিন ওই গণিকালয়ে বিক্রীত হতে? তা আসতেই পারে! কত মেয়েই তো আসে গণিকালয়ে বিক্রয়ের জন্যে। আর ইরাবান তো দেখেছেও কত তাদের। না দেখেই বা উপায় কী! সে তো তখন ওই গণিকালয়েই থাকে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখছে তার গৃহ বা আবাস বলতে ওই গণিকালয়। সায়াহ্নকাল হলেই যেখানে রাজা থেকে মন্ত্রী, সেনাপতি থেকে নগর-কোটালের ঘোরাঘুরি। তাছাড়া শ্রেষ্ঠী থেকে ব্রাহ্মণ সবারই বুঝি আনাগোনা সেখানে। সারা রাত্রিব্যাপী চলে গণিকাঙ্গের সুধাপান। আর সুধাপানের জন্য বাহিরের দ্বাররক্ষীরা ছাড়া তাদের মতো বন্ধুলরাও থাকে সুরা থেকে মদিরা ও পান-তাম্বুলের জোগান দিতে। তা ইরাবানের সন্ধান  বুঝি একটু বেশিই পড়ত। সবারই প্রয়োজনে দিনরাত্রিই কেবল ওই ইরাবান। কেননা, সে যে-কার্যটি করে উত্তম। একবার তাকে যে যা বোঝায় তাই আনে সে যতœ করে। ফলে সারাটি রাতভরই ওই একই ডাক : কই ইরাবান কোথায় গেলি? গণিকারা খোঁজে। গণিকামাতা সন্ধান করে। এবং কাছে পেয়েই এটা আনো। ওটা আনো। এ-কক্ষে যাও। ও-কক্ষে যাও। গিয়ে দিয়ে এসো। তা যে-গণিকারা যা যা বলে তা-ই সে অমোঘ নির্দেশে পালন করে। আর না করেই বা করে কী? সমাজে সে যে অপাঙ্ক্তেয়। বন্ধুল সে। তার বাল্যকালে সে তো অত বোঝেনি। অনুমান করার ক্ষমতাও ছিল না। কিন্তু পরে টের পেয়েছে, কোনো এক নিশাকালে ভুলক্রমে কোনো এক গণিকার গর্ভে তার জন্ম। কোনো এক পুরুষ ওই গণিকাগর্ভে তার বীর্য নিক্ষেপ করেই চলে গিয়েছিল। এবং কে যে সেই গণিকা, ইরাবান নিজেও তা জানে না। জানে না, কোন গণিকা তার মাতা? আর পিতাই বা কে?
জানত না ইরাবান। তাছাড়া জানার চেষ্টাও বুঝি করেনি সে। ফলে ওই গণিকালয়ই তার একমাত্র ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিল। কখনো কখনো চোখ ঢুলে পড়ে ঘুমে। দেহ ভেঙে পড়ে ক্লান্তিতে, তবু বুঝি রেহাই নেই। আঁখি-কর্ণ উন্মুক্ত রেখেই তাকে উপবেশন করে থাকতে হয় শীতগ্রীষ্ম বারোমাস। তাই থাকত ইরাবান। এবং দিবস কাটছিল এভাবেই। দিবসের প্রথমভাগ যায় গভীর নিদ্রার কোলে ঢলে। দ্বিতীয়ভাগে কেবল দ্বিপ্রহরে একবার øান ও আহার। আহারের পর আবার নিদ্রাদেবীর কোলে আশ্রয়। উঠতে উঠতে সেই বুঝিবা সন্ধ্যা এবং সন্ধ্যা থেকেই তো ফের সেই উপবেশনে প্রতীক্ষার রাত্রি।
তা সেদিনও বুঝি উঠেছিল নিদ্রা থেকে। সায়াহ্নবেলাটি তখন পড়েছে কেবল। বারাঙ্গনা-পল্লীতে নেমে এসেছে অন্ধকার। এই সময়েই সেই মেয়ে। সঙ্গে এক দরিদ্র ও লোভাতুর পিতা। মোটা কার্ষাপণের বিনিময়ে কন্যাটিকে তার বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে নিয়ে এসেছে গণিকালয়ে।
প্রথমে তেমন লক্ষ করেনি। কিন্তু সামান্য পরেই অপাঙ্গে তাকিয়ে যা অনুভব করার উপলব্ধি করেছিল সে। এই কন্যার অমতেই পিতা তাকে বিক্রয় করে দিচ্ছে। কন্যার নয়নে তাই পিতার প্রতি তীব্র এক ঘৃণা ও ক্ষোভ।
কিন্তু ক্ষোভ থাকলে আর শোনে কে? শুনেছিল বুঝি ইরাবান। কানে এসেছিল তার সেই মেয়েরই চাপা এক ক্রন্দনধ্বনি। মুহূর্তেই কী যে হয়, গণিকামাতার কাছে গিয়ে তাকে নিুস্বরে জানিয়ে দেয়, এমত কন্যা ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে ভিন্ন এক গণিকালয়ে। এই ব্যক্তি একে আবার লুকিয়ে এনেছে এই গণিকালয়ে। এক্ষণে গণিকামাতা যদি একে ক্রয় করে, তাহলে খোঁজ পেয়ে সেই গণিকালয়ের গণিকামাতা হয়তো কোনো ঝঞ্ঝাটে জড়িয়ে ফেলবে তাকে।
বাক্যটি মিথ্যে। তবু তা বিশ্বাসই করেছিল গণিকামাতা। কেননা, সে জানত ইরাবানকে। ইরাবান সব সংবাদই রাখে। আর তার সংবাদ কখনো মিথ্যা হয় না। ইরাবানও জানাল, আর সঙ্গে সঙ্গেই গণিকামাতা ফিরিয়ে দিয়েছিল তার পিতাকে। কেবল তা-ই নয়, পরদিবস থেকেই অন্যান্য গণিকালয়েও কথাটা প্রচার করে দিয়েছিল ইরাবান, যাতে সেই ব্যক্তি আর তার সে-মেয়েকে বিক্রি না করতে পারে। তা কৃষ্ণপক্ষ থাকায় সেদিন আর মেয়েটিকে সে চিনতে পারেনি সেভাবে। তাছাড়া মুখমণ্ডলও যেন আবৃত ছিল। কাজেই ফিরেই গিয়েছিল মেয়েটি এবং ইরাবানেরই তাতে স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু ফিরেই বা হলো কী? এই কন্যা যদি সে-কন্যাই হয় তাহলে তো সেই বিক্রিই হয়ে গেল সে? অবশ্য গণিকালয়ে এলো না বটে; কিন্তু দেবদাসী তো হয়ে যাবে!
কী, স্মরণে এলো আপনার মহাশয়?
হ্যাঁ। সেদিনের ঘটনাটি স্মরণে এসেছে বটে, তবে তুমিই যে সেই কন্যা…
স্থিরদৃষ্টিতে তার আঁখিযুগল রেখেছে এবারে বাসবী। ইরাবান যেন চিনতে পারল।
কিন্তু সেই কৃষ্ণপক্ষের অমন নিশাতেই তুমি আমাকে ঠিক মনে রেখেছ?
বাসবী অন্যমনস্ক হয়ে গেল। মনে কেবল রেখেছি শুধু নয়, মানুষটিকে সেদিনই আমি ভালোবেসেছিলাম  –
ভালোবেসেছ? ইরাবান চমকে উঠল।
হ্যাঁ। গ্রীবা ঘুরিয়ে বাসবী জানায়, মনে মনে তার গলায় মাল্যও অর্পণ করেছিলাম।
সে কী? ইরাবান অস্থির হয়ে উঠল। এ কী করেছ তুমি! কার গলায় তুমি মাল্য অর্পণ করেছ?
কেন?
তুমি কি জানো সে কে?
জানি। তার কথা সবই আমি জানি। বাসবী তাকাল আবার তার পরিপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে।
না না, তুমি জানো না। তার আনুপূর্বিক কিছুই তুমি জানো না। ইরাবান যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে লাগল। বলল আবার, জানো কি সে এ-সমাজের কেউ নয়। সে এই নগরীর কেউ নয়। গণিকালয়ের আবর্জনামাত্র এবং ওই আবর্জনাতেই তার জন্ম। এসব তো তুমি জানো না। জানতেও পারো না বাসবী। কিন্তু আমি জানি –
আমিও জানি। বাসবী ঘুরে তাকাল, জানি পরের অন্নে সে পুষ্ট। পরের গৃহে লালিত সে।
না না, এইই তার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়।
ইরাবান যেন কান্নায়ই ভেঙে পড়বে। এত কান্না যে জমেছিল তার বুকে কখন! ইরাবান তার মস্তকটি বুঝি লুকোবার জায়গা পায় না আর। বাকি আরো একটি ভয়ংকর কথা যে আছে! সে-কথা তাকে জানাবে কী করে ইরাবান?
কিন্তু জানাতে হলো না। বাসবী নিজেই তাকে জানাল, কেবল তা-ই নয়… সে যে একজন বন্ধুল, তাও আমি জানি। শ্রবণ করেছি যে, কোনো এক অজানা পুরুষের দ্বারা গণিকাগর্ভেই জন্ম তার; কিন্তু কে যে তার পিতা বা কে তার মাতা…
ইরাবান যেন কেঁদেই ভাসাবে এতক্ষণে। কিন্তু কান্না যেন আসি আসি করেও তার উষ্ণ প্রস্রবণটি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে না ইরাবানের দুই নেত্রে।
কিন্তু অশ্র“ না এলেও অশ্র“র ভাষা আছে বুঝি। মুখমণ্ডলটি তাই আর তুলতেও পারল না ইরাবান।
বাসবী এগিয়ে এলো।
এবং কোনো এক সাহসেই বুঝি এক দুঃসাহসেই জন্ম হলো তার মনের গহন কন্দরে। বাসবী তার মস্তকে হাত রাখল।
এই দেখো চেয়ে। পুলিন্দা খুলেছি আমি। কই কী এনেছ দেবে না আমাকে? ক্ষুধার উদ্রেক তো আমারও হয়েছে –
দু-চারবার আরো ডাকল বাসবী। ডাকাতে এইবার বুঝি মুখ তুলল ইরাবান। দুই নেত্র তার রক্তবর্ণ। কিন্তু অশ্র“ তবু বুঝি বেরোতে চাইছে না।
নিশ্চুপই ছিল ইরাবান। বাসবী আহার ভাগ করে দিলো। নিজের জন্য সামান্যই রেখে পর্যাপ্ত পরিমাণ ইরাবানকে তুলে দিলো, কিন্তু দিলেও ইরাবান চুপ। নিশ্চুপ হয়েই সে বসে রইল।
বাসবী কী টের পেয়েছিল। জানাল, কোনো জন্মই কোনো পাপের নয় মহাশয়। আবর্জনায় পদ্মপুষ্পও বিকশিত হয়। আর তা দেবতার পুজোয়ও লাগে –
ইরাবান চমকে উঠেছিল। বাসবী জানাল, নিন আহার সমাপ্ত না করলে আমাদের যেতে দেরি হয়ে যাবে। আর দেরি হলে…
কাশ্যপীর কথা ভেবে বাসবী বুঝি উতলা হয়ে উঠল।

মধ্যাহ্ন গেল। দিবসের প্রান্তভাগে উদয় হলো অপরাহ্ণের কালটি। আর অপরাহ্ণবেলাটি পড়তেই তাড়া লাগাল বাসবী। কই চলুন মহাশয় –
পুলিন্দা গুটিয়ে নিয়ে অদূরে ঝরনা থেকে জলপান করে চামড়ার থলিতে জল ভরে নিয়েছিল বাসবী। ইরাবান উঠে দাঁড়ালে সেও তার পিছু নিল।
ক্রমে অপরাহ্ণ গেল। সায়াহ্নকালও উপস্থিত হয় বুঝি। একসময় নগরের প্রান্তভাগে পৌঁছেই একটা সরাইখানা দেখে সেই সরাইখানায় আশ্রয় নেয় তারা। দুজনে দুটি কক্ষে। পরে প্রভাতকাল উপস্থিত হলে নদীতে øান সেরে আবার রওনা হয় তারা।
এখন তাদের যাত্রা আরো পশ্চিমে। আরো খানিকটা দূরবর্তী পথে। সেদিকে গেলেই সেই মন্দির।
ইরাবান হাঁটছিল; কিন্তু মুখে কোনো বাক্য নেই। সেই যে বাক্যহারা হয়েছে সে, কাল মধ্যাহ্ন থেকে আর বুঝি বাক্যস্ফুরণ ঘটেনি তার। তাছাড়া খুবই নির্জীব হয়ে পড়েছে বুঝি। বাসবী তা লক্ষ করেছিল। করেই শুধোল, তাড়াতাড়ি করুন মহাশয়। বিলম্ব হলে আপনার বন্ধুপতœীকে বুঝি আর বাঁচানো যাবে না।
ইরাবান মুখ ঘুরিয়েছিল। হাঁটছিল আপনমনে। বাসবীর কথায় সে আঁতকে উঠল।
বাসবী বলল, বিলম্ব হলে আমাকে দেবতার কাছে উৎসর্গ করে আর লাভ কী বলুন?
ইরাবান চমকে উঠল। সে কিছু আর বলল না। উপত্যকার রাস্তায় বাসবীকে নিয়ে সে এগিয়ে গেল। কিন্তু আরো পরে কিয়ৎ পথ অতিক্রম করে সেই মন্দিরের মাথার নিশানটি দেখা গেলে ইরাবান থমকে গেল।
বাসবী এগিয়ে গিয়েছিল। ইরাবানের সাড়া না পেয়ে সে তার দৃষ্টি ফেরাল পশ্চাদভাগে।
লক্ষ করল, ইরাবান থমকে দাঁড়িয়ে। তার মুখ পাণ্ডুর। রক্তশূন্য। বাসবী পশ্চাতে ফিরল আবার।
কী হলো? মন্দির যে দেখা যায়? যাবেন না?
বাক্যটি শেষও হলো না। তার আগেই ইরাবান ভেঙে পড়ে, না। না আমি যাব না। তোমাকে আমি কিছুতেই ও-জীবনে আর যেতে দেবো না বাসবদত্তা। তুমি ফিরে চলো –
ফিরে যাব? বাসবী চমকে ওঠে। সে বড়ো আশ্চর্য হয়। শুধায়, কোথায় ফিরে যাব? আমার তো ফেরার কোনো পথ নেই। আমি যে দেবতার উৎসর্গীকৃত। আমাকে যে অর্পণ করা হয়েছে দেবতার কাছে।
না না। না, বাসবদত্তা। এখনো তো তোমাকে উৎসর্গ করা হয়নি –
মন্দিরে গিয়ে পুরোহিতের কাছে অর্পণ করা না হলেও আপনার বন্ধু তো দেবতার নিমিত্তেই আমাকে ক্রয় করেছিলেন, নাকি বলুন?
তা করেছিল, কিন্তু –
ইরাবান যেন আচমকা উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠল, দেবতা তোমাকে নেবে না বাসবী। নেবে ওইসব ভণ্ড পুরোহিত। তাদের ভোগেই লাগবে বুঝি তুমি।
তা হোক। তবু তো তাতে আপনার বন্ধুপতœী সুস্থ হয়ে উঠবে –
না, কিছুতেই না। ও-কথা সত্য নয় বাসব। দেবতা নয়, দেবতার নামে ওইসব পুরোহিতই সব… আমি তোমাকে কিছুতেই ওখানে যেতে দেবো না।
বাসবী থমকে তাকায়, ছিঃ। আপনার বন্ধু আপনার দিকে তাকিয়ে আছেন –
কিন্তু আমি তোমাকে দেবালয়ে দিয়ে এলেও কাশ্যপী সুস্থ হয়ে উঠবে না বাসবী। তার আয়ু বুঝি শেষের দিকে।
শেষের দিকে? আপনি কী করে জানলেন?
আমি জানি… জানি বাসবী।
তবু আমাকে দিয়ে আসুন আপনি। দিয়ে এসে বন্ধুর কাছে আপনি আপনার সত্য রক্ষা করুন –
না, আমি তা পারব না বাসবী –
বাসবী অবাক হয়। সামান্যক্ষণ তাকিয়ে এরপর বলে, একদিন তো যেতে দাওনি। এখনো আবার বাধা দিচ্ছ! কিন্তু কেন? আমার জন্য তোমার এত করুণা কেন?
এতক্ষণ আপনি করে সম্বোধন করে এক্ষণে বুঝি তুমিতে নেমে এসে লজ্জায় আড়ষ্ঠ হয়ে পড়েছিল বাসবী। সে মুখ নামিয়ে নিল।
ইরাবান জানাল; কিন্তু তা করুণা নয়, নিছকই কর্তব্য বাসবী।
ইরাবান আরো কিছু বলবে ভাবে। কিন্তু কিছুই আর গুছিয়ে বলতে পারে না।
একসময় সে এগিয়ে এসে বাসবীর হাত সে ধরে ফেলে। না আমি কিছুতেই তোমাকে ওই মন্দিরে তোমাকে উৎসর্গ করতে পারব না। তোমাকে আমি নিয়ে যাব –
নিয়ে যাবে! কোথায়? বিস্ময়ে বাসবীর আঁখিযুগল স্থির।
ইরাবান বলে, যে-স্থানে আমি যাব।
তারপর?
তারপর! আর জানি না।
কিন্তু জানল বাসবী। ইরাবানের দুই নয়নে সে কী প্রত্যক্ষ করেছিল। টের পেল ইরাবান তাকে ভালোবেসে ফেলেছে। ফলে বাধা আর দিলো না সে।
বাসবীকে নিয়ে তখন নিজের মতো করেই আবার এগোলো ইরাবান। পথের নিশানা ঘুরিয়ে নিল সে। বাসবীও তাকে অনুসরণ করল।
সময় যায়, সময় অতিবাহিত হয়ে যায় এভাবেই। প্রভাতকালটি ধীরে ধীরে কখন মধ্যাহ্নে উপনীত হয়। হাঁটতে হাঁটতেই একসময় বাসবী লক্ষ করে, মন্দির ছেড়ে তারা এখন অন্য এক প্রান্তে যাত্রা শুরু করেছে।
বাসবী হতবাক। পা বাড়াতে গিয়েও যেন বাড়ায় না।
কী হলো, এ-প্রান্তে কোথায়? বিস্ময়েই বাসবী তার আঁখিপাতা তোলে। ইরাবান অন্যমনস্ক। উত্তর করে, জানি না।
ইরাবান না জানলেও বাসবী বুঝি জানে। সে আবার হাঁটতে থাকে এবং কী এক আকর্ষণে সে পা বাড়ায় এক্ষণে ইরাবানের সঙ্গে নতুন এক দিগন্তে।
কিন্তু বন্ধুল জীবন ছেড়ে তাকে নিয়ে কোথায় এখন যাবে ইরাবান? উত্তর পায় না বাসবদত্তা। কিন্তু না পেলেও অনুমান করে, যেখানেই যাক জীবনে এই প্রথমই যেন একজন তাকে ভিন্ন এক পথে নিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু কোন পথে!
হাঁটতে হাঁটতেই অন্যমনস্ক হয়ে কখন ইরাবানের হাতটি ধরে ফেলেছিল। ইরাবান বুঝি টের পেয়ে গেল। অনুমানও করল কী বরতে চায় বাসবী। কিন্তু অনুমান করেও কিছু বলল না। কী বলবে, সে তো জানে সামনের পথটি অতীব কঠিন। কদর্য এক জীবন থেকে বাসবীকে সে সরিয়ে নিয়ে এসেছে। কিন্তু নতুন জীবনে তাকে পৌঁছে দিতে পারবে তো? দেবতার উদ্দেশে নিবেদিত কন্যাকে সে ছিনিয়ে নিয়ে এসেছে। যদি জানতে পেরে কেউ তাকে মেরে ফেলে?
কিন্তু কে মারবে!
ইরাবান জানে না, বন্ধুলদের মৃত্যু নেই। বন্ধুলরা কখনো মরে না। দিবস যাবে, বছর অতিক্রান্ত হবে, কালেরও পরিবর্তন ঘটবে, কিন্তু বন্ধুলরা হারাবে না। কালস্রোতে ভেসে যেতে যেতেও কোথায়ও না কোথায়ও গিয়ে ঠিক তারা বেঁচে থাকবে।