বব ডিলানের কবিতা

লেখক:

অনুবাদ : সৈয়দ শামসুল হক
পথিকের দুঃস্বপ্ন অথবা মনোয়ারার স্বপ্ন
অথবা ফিদেল কাস্ত্রোকে অভিবাদন
কতকাল থেকে কতদিন থেকে
চলেই চলেছি আমি।
এখন অনেক রাত হয়ে গেছে
এখানে একটু থামি।

ওই দ্যাখা যায় জানালায় আলো,
হঠাৎ খামারবাড়ি।
কতকাল ঘুম হয়নি আমার –
দরোজায় কড়া নাড়ি।

দরোজাটা খুলে বেরিয়ে যে আসে
হাতে তার রামদা’!
মারমুখো তার ভঙ্গিটি আর
আমার আমতা আমতা।

রামদা’ ঠেকিয়ে আমার বুকে সে
বলে ভয়ানক স্বরে,
‘বাছাধন, আমি কোথাও তোমাকে
দেখেছি যে মনে পড়ে।

তুমি রাজনীতি কর মনে হয়,
বাম দিকে যেন ঝোঁক।’
ঢোঁক গিলে আমি বলি তাড়াতাড়ি,
‘ভুল করছেন লোক!

আমি তো পথিক, আমার এছাড়া
পরিচয় কিছু নেই।
শুধু এ রাতের আশ্রয় চাই –
আগমন হেতু এই।’

দুচোখ নাচিয়ে উঁকি দেয় মেয়ে,
মনোয়ারা তার নাম।
যেন সিনেমার পর্দায় আমি
চম্পাকে দেখলাম।
তার দিকে চোখ রেখে আমি তার
বাবাকে তোয়াজ করি –
‘এত সুন্দর আপনার বাড়ি!
মরে যাই! মরি, মরি!’

বাবা বলে, ‘থামো, তুমি তো পথিক!
বাড়ির তুমি কী জান!’
বললাম, ‘আমি কবিতাই লিখি,
সুরে বসালে তা গানও।

আমার নখের নিচে যে ময়লা
কসম দিচ্ছি তার – ’
দেখলাম যেন মনটি নরোম
হয়ে এল এইবার।

‘মনে হয় তুমি ক্লান্ত ভীষণ –
ঠিক আছে এসো ঘরে।’
কিন্তু এ কথা বলতেই হয়
ধূর্তামি ছিল স্বরে।
‘বিছানাটি পাবে ঘুমোবার, তবে
এই শর্তেই শুধু –
বিছানাই পাবে, চেয়ে বসবে না
তামাকের সাথে দুদু।’

ইশারাটি খুব আবছা তো নয় –
সরে যায় মনোয়ারা।
‘সকালে উঠবে, গাইটি দোয়াবে –
বিছানার এই ভাড়া।’

শুয়ে পড়তে না পড়তেই ঘুম
ভেঙে এল দুই চোখে।
আমি কতকাল ঘুমোতে পারিনি
নিহত দিনের শোকে।
হঠাৎ কী হলো? ঘরে কেউ এল?
চেয়ে দেখি মনোয়ারা।
অমাবস্যার রজনীতে যেন
খসেপড়া এক তারা।

‘পথিক, তুমি কি গোসল করবে?
সারা গায়ে কী যে ধুলো!’
হেসে বললাম, ‘ধুলো বলছ কী!
বন্ধু যে ওইগুলো।’

‘ধুলো বুঝি হয় বন্ধু কখনো?’
মনোয়ারা হেসে ওঠে।
আমি তো চাঁদের উদয় দেখেছি
কতবার কত ঠোঁটে।

এ জীবন জানি অমাবস্যার
একটানা এক রাত।
কোনোদিন যদি দিন আসে তবে
হতে পারে সাক্ষাৎ।

বেদনার মতো লাল দানাগুলো
ফেটে ফেটে পড়ে যায়।
নিঃশ্বাস ফেলে পাশ ফিরে আমি
ডুবে যাই বিছানায়।

ভোর হয়ে যায়। মনে পড়ে যায়
গাই দুইতে যে হবে!
বাবা বলে, ‘আরে, অদ্ভুত এ তো!
কথা কে রেখেছে কবে!’
নিশ্চয় এটি বদ্ধ পাগল!
ভাগ্যে খ্যাপেনি রাতে!
বললাম আমি, ‘এখনো অনেক
খবর রয়েছে হাতে।’

‘কী রকম শুনি?’ প্রশ্ন বাবার –
মুখখানা হাসি হাসি।
‘যেমন ধরুন – ফিদেল কাস্ত্রো
তাকে বড় ভালোবাসি।’

বলেই আমি তো বিদ্যুৎবেগে
সরে যাই, দেখি বাবা
কাস্ত্রোর নাম হতে না হতেই
তুলছে বিশাল থাবা।

থাবা মানে থাবা! বাঘের সে থাবা!
সরে গেছি এক পাশে।
নেমে আসে থাবা, ভাঙে আলমারি,
মনোয়ারা খুব হাসে।

‘হারামির হাড়! পথিক সেজেছ!
কমুনিস্ট তুমি শালা।
পৈতৃক প্রাণ খোয়াতে না হলে
ব্যাটা এক্ষুনি পালা।’

পালা মানে পালা! চোখের পলকে
হাজার মিটার পার।
দৌড়বাজিতে আমার চেয়ে কে
বাহাদুর খেলোয়াড়!

বহুদূর থেকে ভাঙচুর শুনি –
ভাঙে জানালার কাচ।
মড়মড় করে ভেঙে পড়ে যায়
খামারবাড়ির গাছ।

মনোয়ারা ডাকে চিৎকার করে –
‘ফিরে এসো, উন্মাদ।’
অমাবস্যার দীর্ঘ রজনী।
ফিরবে যে কবে চাঁদ?
আমি ফিরব না এইটুকু জানি
মাড়াব না ওই পাড়া।
গার্মেন্টসের চাকরিতে আছে
আজকাল মনোয়ারা।

এখনো বাবার থাবাটি শক্ত,
রামদায়ে বড় ধার।
ধড় থেকে মাথা আলাদা করবে
দেখা পেলে একবার।

লোকে বলে তাকে – ‘রাগ হবে সে তো
আমাদেরও রাগ হয়।
দাড়ি থাকলেও ফিদেল কাস্ত্রো
মুসলমান তো নয়!

তবে ওই কবি, ওই যে পথিক –
ওরা আরো ভয়ানক।
হাতে যে কলম দেখছ ওদের –
আসলে বাঘের নখ।’

এখনো সে আছে ভয়ানক রেগে
খামারবাড়িতে একা –
পৃথিবীতে কত খামারবাড়িতে
পাবে তুমি তার দ্যাখ্যা।

তোমাকে তাড়িয়ে পথে যে নামায়
কোটি কোটি হয় তারা।
তোমার জন্যে একটিই বাড়ি –
একটিই মনোয়ারা।

তোমার জন্যে একটিই চাওয়া –
কবিতা একটি এই :
কথা বলবার স্বাধীনতা, তার
কোনো বিকল্প নেই ॥
অবশ্য কবিতায় ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব বাংলার মানুষের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ও একাত্তরের উত্তাল মার্চে রাজনৈতিক দ্রোহ শিল্পরূপ হয়ে ধরা দেয় ক্রমেই। এরই ধারাবাহিকতা লক্ষ করি ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত খেলারাম খেলে যা উপন্যাসেও। আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলনে বাঙালির রাজনৈতিক মুহূর্ত এবং স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষার জগৎটাকে সচেতনভাবেই তুলে আনেন তিনি এ-উপন্যাসে।
আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরীর মূল্যায়ন এক্ষেত্রে উল্লেখ করছি, ‘পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার আন্দোলন ছিল একটি প্রকৃত গণআন্দোলন, যা শুরুতেই জনচিত্তে শিকড় গেড়েছে। এই সত্যটি ছয় দফার আন্দোলন চলাকালে আমরা অনেকে বুঝতে পারিনি। সৈয়দ হকের কলমে এই সত্যটি সকলের আগে উঠে এসেছিল। তাঁর খেলারাম খেলে যা একটি বিতর্কিত এবং বহুলপঠিত উপন্যাস। সমালোচকেরা কেউ-কেউ এই উপন্যাসের শ্লীলতা সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু এই উপন্যাসটি পড়ার সময় আমি বিস্মিত হয়ে লক্ষ করেছি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের ছয় দফার আন্দোলন যখন রাজপথে চলেছে, তখন তা একই সময়ে সৈয়দ হকের খেলারাম খেলে যা উপন্যাসেও উঠে এসেছে। সাহিত্য ও রাজনীতির এমন তাৎক্ষণিক ঘনিষ্ঠতা আমাদের সাহিত্যে একটি বিরল ঘটনা। অথচ সৈয়দ হক কখনো রাজনীতি করেননি। কিন্তু তাঁর সাহিত্যে একটি বড় রাজনৈতিক জোয়ার আমাদের সকলের আগে ধরা পড়েছে।’
ব্যক্তির যে স্বপ্ন ও কল্পনা পঞ্চাশের দশকের কাব্যভাবনায় ও কাব্যদর্শনে সূচিত হয়েছিল তা ষাটের দশকের মধ্যভাগ থেকে আর ব্যক্তিগত থাকেনি। সমষ্টির দেশপ্রেমের স্বপ্নে এবং একটি জাতির বাস্তবসত্যের মুখোমুখি যখন হন তখন কবি সৈয়দ শামসুল হক। অর্থাৎ কবির ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক জীবন ও রাজনৈতিক জীবনের পর্যায়স্তরে জায়গা করে নেয়।
জাতীয় চেতনার জাগরণ ঘটে আমাদের ভাষা-আন্দোলনকে ঘিরে। তারপর তা ক্রমেই বিকশিত হয় ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে, ’৬২-এর শিক্ষা-আন্দোলনে, ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলনে ও ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে। জাতীয় চেতনার জাগরণে সৈয়দ হক নিজেকেও জাগিয়ে তুলেছিলেন।
সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সাফল্য একদিকে পাকিস্তানি সামরিক শাসককে হিংস্র থেকে হিংস্রতর করে তোলে, অন্যদিকে ক্ষমতালোভী নিপীড়নকারী শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মুক্তির লক্ষ্যে স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয় বাঙালি জনতা।
একাত্তরের মার্চের প্রথম থেকেই অসহযোগ আন্দোলনে পাকিস্তানবিরোধী আপসহীন সংগ্রামের অব্যাহত ধারা মুক্তিসংগ্রামের পথকে প্রশস্ত করে। আর এই যে স্বাধীনতা সংগ্রামী জনতার উত্থান, এর প্রেক্ষাপট সূচিত করে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীরই ক্ষমতার লোভ, স্বার্থান্ধতা।
৩ মার্চের নির্ধারিত তারিখে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ১ মার্চ আকস্মিক স্থগিত ঘোষণার সঙ্গে-সঙ্গে পূর্ব বাংলায় সে-ঘোষণার প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারা পূর্ব বাংলায় অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। মুহূর্তেই সহিংস হয়ে ওঠে এদেশের মুক্তিকামী মানুষ।
দেশ যে মা হয়ে দেশের সংগ্রামী জনতাকে ইতিবাচক জীবনের লক্ষ্যে চেতনাদীপ্ত করতে পারে তার উদাহরণ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত কাল পরেই বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
উত্তাল মার্চের শুরু থেকেই এই দেশ মায়ের ছায়া দিয়ে পুনরায় কঠিন লড়াইয়ে দায়বদ্ধ হওয়ার এবং জেগে ওঠার জন্য আহ্বান জানায়। মার্চের সে-সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণতায় সংগ্রামী জীবনের সঙ্গে একীভূত হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্ফুরণ এভাবেই ঘটতে থাকে একাত্তরের মার্চ থেকে। বলা যায়, সংগ্রামী জনতার বাঁকবদলের কালপর্ব সূচিত হয় সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে।
মোট কথা, একাত্তরের মার্চের শুরুতেই বাঙালির সর্বশ্রেণির, পেশার মানুষের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের চেতনায় নানাবিধ আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিত্রশিল্পীও তাঁদের লেখায় ও অঙ্কনে সে-পটভূমির বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটান।
একাত্তরের মার্চের শুরু থেকেই ক্ষমতালোভী শাসকশ্রেণির যে-নিপীড়ন শুরু হয়েছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে এদেশের প্রতিবাদী ও সংগ্রামী মানুষের আত্মচৈতন্যের যে-উদ্বোধন ঘটেছিল তা সাহিত্যেও প্রতিভাত হয়েছিল। কবি সৈয়দ শামসুল হক উত্তাল মার্চের সময়ের উপলব্ধি থেকে বাঙালির জাগরণ, আত্মশক্তি ও আত্মপ্রত্যয়কে কবিতার উচ্চারণে তুলে ধরেন ‘পহেলা মার্চ ১৯৭১’-এ। কবির উচ্চারণ ধ্বনিত হয় এভাবে,
দ্যাখো, আমি নিরস্ত্র। কিন্তু
আমার আছে সেই অস্ত্র যা নিঃশেষিত হয় না,
প্রতি ব্যবহারে তীক্ষè থেকে তীক্ষèতর হয়ে ওঠে
আমার প্রাণ।
আমার তো একটাই প্রাণ নয়, কোটি কোটি প্রাণ।
… … …
মায়ের গর্ভে আমি তিলে তিলে তার রক্ত দিয়ে নির্মিত;
তার প্রাণ-বিদ্যুতে স্পন্দিত আমার হৃদয়;
তার দুঃসহ শোক থেকে উত্থিত আমার শরীর।
মা, তোমারই জন্যে আজ আমি
প্রত্যর্পণ করছি আমার রক্ত, আমার প্রাণ,
যেন শোকের শেষে
আবার তুমি কোটি কোটি সন্তানের মা হতে পারো ॥
এই কবিতাটি একাত্তরের মার্চে দৈনিক পাকিস্তানের সম্পাদকীয় পাতায় ছাপা হয়েছিল। পাকিস্তানের শাসকশ্রেণি তাদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে এদেশের মানুষের মুক্তি ও স্বপ্নকে ব্যর্থ করে দিতে চেয়েছিল। শুধু তাই নয়, এদেশের সংগ্রামী মানুষকে ভীত ও সন্ত্রস্ত করে তুলবার জন্য ‘অপারেশন সার্চ লাইটে’র মাধ্যমে ২৫ মার্চ রাতে ঢাকাসহ সারা দেশে গণহত্যা শুরু করে।
সংগ্রামী মানুষকে সাধারণ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে কুৎসিত রূপ ধারণ করে। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী কিন্তু তখন বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে নিজের দেশের মাটির প্রতি গভীর টান উপলব্ধি করে। সাধারণ জনতাও। কবি-সাহিত্যিক শিল্পীবৃন্দও। সৈয়দ হক লেখেন, ‘একাত্তরের পঁচিশে মার্চের অসমাপ্ত কবিতা’। কবির এ-কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক ধ্বংস হওয়া শহর, গ্রামের মানুষের সাজানো সংসার এবং বাঙালির জাতীয় জীবনের অনিশ্চয়তার চলচিত্র –
স্বর্গীয় ফলের মতো
ঈশ্বরের রাজপথ রক্তে ভেসে যায়।
প্রান্তরে পাহাড়ে
মানুষের সাজানো সংসারে
গ্রামে গ্রামে লোকালয়ে বন্দরে শস্যের গালিচায়
ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়ে তুমুল দুঃখের কষড় –
সদ্যকাটা গাছ।
… … …
বায়ান্নোয় বাষট্টিতে উনিশশো ঊনসত্তরে একাত্তরে
অবিরাম কুঠারের ধ্বনি। ঠক ঠক ঠক ঠক
বাংলার দক্ষিণে বামে রাত্রি দিন