বব ডিলান : নগরবাউলের কথকতা

সুধীর চক্রবর্তী

‘The music department is housed in a

building which is pure poetry.’

এমন একটি সুবচন সামনে রেখে আমরা বব ডিলানের প্রসঙ্গে সরাসরি ঢুকে যেতে পারি। কেননা সারাজীবন ধরে বিতর্কিত এবং নানা বিরোধী তির বর্ষণে বিড়ম্বিত এই আমাদের কালের উজ্জ্বল শিল্পী তথা নগরবাউল বব সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ পেলেন বেশ প্রত্যন্ত বয়সে। সঙ্গে সঙ্গে একদল গর্জে উঠল, ‘কেন? গান কি সাহিত্য?’ ‘গানের আর সাহিত্যের অভিমুখ ও উদ্দেশ্য কি এক?’ তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, ‘সাহিত্যে কি টান পড়িয়াছে?’

১৯৪২ সালে যখন এই দরবেশি গায়ক জন্মগ্রহণ করেন, তখন জন্মেই দেখেন ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি – পার্ল হারবারে বোমাবর্ষণ চলছে। সারা
পৃথিবী সন্ত্রস্ত ও মানবজীবনের মূল্যবোধ বিষয়ে শঙ্কিত। কোথাও কোনো শান্তি-কল্যাণ নেই। ববের যৌবনে দেশ আচ্ছন্ন ও প্রতিবাদী হয়ে উঠছে আমেরিকার আক্রমণে সংগ্রামশীল ভিয়েতনাম যুদ্ধে আর উত্তাল হচ্ছে সিভিল রাইটস আন্দোলনে। চূড়ান্ত লোকক্ষয় আর অস্ত্রের সদম্ভ সেন্সর। ভবিষ্যতে এই যুদ্ধত্রস্ত যুবক গায়ক লিখবেন যুদ্ধবাজদের প্রচ্ছন্ন কেরামতিকে বিদ্রূপ করে।

Come you masters of war

You that build the big guns

You that build the death planes

You that build all the bombs

You that hide behind walls

You that hide behind desks

I just want you to know

I can see through your masks

You that never done nothin’

But build to destroy

You play with my world

Like it’s your little toy

…        …      …

You fasten all the triggers

For the others to fire

Then you set back and watch.

When the death count gets higher.

এই বিদ্রূপের আড়ালে আছে বেদনার উৎস এবং সন্তপ্ত মানবতার অসহায়তা, যার শরিক তিনি।

বিশ্বের যত ডিলান-সমঝদার আছেন তাঁদের মতে, মানুষটি স্বভাবে প্রতিবাদী আর প্রতি-সংস্কৃতির ভক্ত। এই কাউন্টার কালচার ব্যাপারটি গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে স্রষ্টা ও বুদ্ধিজীবীদের এক সমন্বিত উদ্ভাবন, তবে আলাদা আলাদা মঞ্চ থেকে। কেননা তাঁদের কেউ কবি, কেউ গায়ক, কেউবা চলচ্চিত্র নির্মাতা। সবাই কোনো না কোনো প্রথা বা প্রচল ভাঙতে চাইলেন। পিট সিগার, জোন বায়েজ, জন লেনন আর বব ডিলান যেমন বিশেষ প্রয়াসে গান রচনায় ও গায়নে। এঁদের মধ্যে এলভিস প্রিসলের মুগ্ধ ভক্ত ডিলান শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ালেন সবচেয়ে জনাদৃত মুখ – পেলেন রাশি রাশি পুরস্কার। সে-ব্যাপারটায় তাঁকে সমসাময়িক কারো কারো বক্র শানিত মন্তব্য হজম করতে হয়েছে, বন্ধু বিচ্ছেদ ঘটেছে। তবে তো তিনি Rolling Stone-এর প্রতীক, তাই নিরঞ্জন ও নির্বিকার। কোনোরকম উসকানি বা মশকরার শ্যাওলা তাঁর পবিত্র মূর্তিকে মলিন করতে পারে না। ঘাতসহ চরিত্র। তাই লেখেন স্পষ্ট সাবলীলতায়, I don’t think when I write. I just react and put it down on paper… what comes out in my music is a call to action। এই সপ্রতিভ স্বীকারোক্তি আর ধারণার স্বচ্ছতা তাঁর গানের মূল চরিত্র। তবে তিনি সংগীতকার নন। অর্থাৎ কথা, সুর ও গায়নের ত্রিবেণিসংগম তাঁর গানে ঘটেনি। যেমন ঘটেছে, ধরা যাক রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, দিলীপকুমার রায় বা নজরুলের ক্ষেত্রে। এঁদের রচিত প্রত্যেক গানের নিজস্ব ভাবের আভায় বিশেষ ভাবনায় সুরের সৃজন ঘটেছে। একে বলা হয় ‘সুরস্বাতন্ত্র্য’। বিদেশের ফোক বা রক গানে এই বিশেষ সুরস্বাতন্ত্র্য নির্মাণের কোনো দাবি বা প্রয়োজনীয়তা থাকে না। তার content বা বলার কথাটারই জোর বেশি। সেজন্যই সিগার, লেনন, বায়েজ বা ডিলানের গানে musical value আর aesthetic value-র চেয়ে content value তথা তাৎক্ষণিক দেশকাল মানবতাস্পর্শী তীক্ষ্ন বক্তব্য প্রাধান্য পেয়েছে, পেয়ে থাকে।

এই content-এর দিক থেকে ভাবলে বোঝা যাবে, ডিলানের গানে আছে এক ক্ষণবাদের দর্শন আর আমূল ঔদাসীন্য। যার ফলে তিনি অনায়াসে বলেন, ‘Let me forget about today until tomorrow।’ এ তো খুব সরল প্রতীতির অনুভব নয়। বুঝতে হবে এ এক নির্বিকার অথচ সমবাদী মনের ক্রিয়া, যাতে বস্তু বা সময়চিহ্নের আসক্তি নেই। যে-কণ্ঠ উচ্চারণ করতে পারে,

How does it feel

How does it feel

To be without home

Like a complete unknown

Like a rolling stone?

যে-জীবনে পতনশীলতা অনিবার্য অথচ যে-জীবনে স্মৃতিটুকু কিছুতেই পিছু হাঁটে না। সেখানে নিজেকে ভাবা যায় নিঃসঙ্গের সমলগ্ন ঔদাস্যে।

বর্ণ সংকটের দেশ আমেরিকায় বব ডিলান কিন্তু যথেষ্ট সমাদর পেয়েছেন। সিভিল রাইটস মুভমেন্টে এবং ভিয়েতনামের ওপর মার্কিন আগ্রাসনে গানে গানে বিরুদ্ধতা করে এবং এমনকি মিছিলে প্রতিবাদী অংশ নিয়েও তিনি শাসকের প্রতিরোধ পাননি। তাঁর মতো বিচারশীল ও সমালোচক শিল্পী রাশিয়ায় জন্মালে নির্ঘাত বহিষ্কৃত হতেন দেশ থেকে কিংবা স্বাভিমানে ত্যাগ করতে হতো স্বদেশ। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে তা হয়নি। বরং তিনি একাধিকবার গ্র্যামি পুরস্কার ও নানা রাষ্ট্রীয় তারিফদারি পেয়েছেন। বারাক ওবামার নির্বাচনী অভিযানে তিনি অংশ নেন তাঁর সমর্থনে। ফলে ২০১২ সালের মে মাসে প্রতিপত্তিসম্পন্ন রাষ্ট্রপ্রধান বারাক ওবামা তাঁকে অর্পণ করেন আমেরিকার ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম’। এতদিনে অবশ্য ডিলান অনেক সিত্মমিত ও তাঁর অগ্নিঅক্ষরে লেখা প্রতিবাদী গান থেমে এসেছে। প্রশ্ন করেছেন অনেকে যে, কেন তাঁকে রাষ্ট্র এত আনুকূল্য দিলো। জবাবে অনেকে বোঝালেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিপত্তির এ একরকম কূটনীতিগত উদারতা।
আধিপত্য-আনুগত্যের চেনা হেজিমনিতে এ-ও এক কৌশল। তবে ডিলানের গান বক্রতায় ও কটাক্ষে বাস্তবকে কখনো বর্জন করেনি। কী করে আমরা ভুলব তাঁর গানের দুটি তীক্ষ্ন বাচন। যথা –

  1. Even the President of the United States

Sometimes must have to      stand naked

  1. If my thought-dreams could be seen

They’d probably put my      head in a guillotine.

এটা আশ্চর্য এক স্ববিরোধ যে, মানুষ হিসেবে বব উচ্চাভিলাষী কিন্তু সম্মানগ্রহণ ও নানা পারিতোষিক প্রাপ্তির গণজ্ঞাপনী উৎসবে সদা সংকুচিত থেকে গেছেন বরাবর। গ্র্যামি পুরস্কার, অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড, প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল, গোল্ডেন গেস্নাব খেতাব সবই তিনি গ্রহণ করেছেন তবে প্রতিভাষণে কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বাক্যহারা হয়ে পড়েন। একবার তো স্বভাব সংকোচে অনারারি ডক্টরেট না নিয়ে কোথায় কেটে পড়লেন কেউ জানল না। রাষ্ট্রপ্রধানের হাত থেকে যুদ্ধ চলাকালে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড নিতে গিয়ে সবাইকে হতবাক করে যুদ্ধবাজবিরোধী গান ‘Master’s of Wars’ গেয়ে উঠলেন। ২০০০ সালে বব ‘অস্কার পুরস্কার’ স্বহসেত্ম নেননি। তথ্য থেকে আরো জানা যাচ্ছে, ২০১৫ সালে ‘মিউজিকেয়ার পারসন’ নামে তারিফযোগ্য পুরস্কার গ্রহণের সমাবেশে দাঁড়িয়ে কর্তৃপক্ষকেই তিনি দু-কথা শুনিয়ে দেন। আর নোবেল প্রাইজের ব্যাপারটা এখন সবাই জানেন। আসলে বব ডিলান ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট কেনেডি হত্যার পর থেকে সরে আসেন তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা থেকে। তাঁর গানের অনুরাগীরা লক্ষ করেছেন ষাটের দশকে লেখা তাঁর ‘বেস্নায়িং উইন্ড’-বর্গের ঝাঁঝালো গান ক্রমশ শান্ত শমিত হয়ে এসেছে। গান পরিবেশনার ক্ষেত্রেও ফোক ইনস্ট্রুমেন্ট আর হারমোনিকার বদলে এনেছেন ইলেকট্রিক গিটারের তীব্র স্বর। তাঁর গানও ফোক থেকে রকে প্রবেশ করতে চাইছে। মানুষটি চিরকালই চঞ্চল স্বভাবের। আর অপ্রত্যাশিত আচরণের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, unpredictable।

বব ডিলানের ব্যক্তিগত খেয়ালখেলা আর স্ববিরোধী আচরণ বুঝতে হলে তাঁর জীবনকথা খানিকটা জানা থাকা দরকার। জীবনযাপনের প্রক্রিয়ায় সব মানুষের মধ্যে থাকে তার শৈশব তথা গড়ে ওঠার নিজস্ব বাতাবরণ আর পরিবারগত নানা সংস্কার। প্রথমেই জেনে নেওয়া চাই যে তাঁর বব ডিলান নামটি স্বনির্বাচিত। কেউ কেউ তাঁকে যখন বলবেন প্রিয় কবি ডিলান টমাসের নামের ছাপ তাঁর নামে সাঙ্গীকৃত করার জন্যই তাঁর নির্বাচক ‘বব ডিলান’ নাম, তবে তিনি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করবেন। বাপ-মা তাঁর নাম রেখেছিলেন রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান। তাঁর জন্ম ২৪ মে ১৯৪১ সালে আমেরিকার মিনেসোটার ডেলুথে। তাঁর ছোটভাইও ওখানে জন্মান পাঁচ বছর পরে। বাবার সঙ্গে মতাদর্শে খিটিমিটি বেধে থাকত, কারণ বাবা চাইতেন ছেলে হোক লেখাপড়া শেখা ক্যারিয়ারিস্ট। অথচ ছেলে সবসময় মজে আছে এলভিস প্রিসলের গানে। খানিকটা স্বেচ্ছাচারী আর আত্মপরায়ণ কিশোরটি নামের গোড়ার ওই রবার্ট অ্যালেন ছেঁটে আগেই বানিয়ে নিয়েছিলেন সংক্ষিপ্ত প্রথম নাম বব। পরে তার সঙ্গে জিমারম্যান পালটে করে নেন ডিলান। জিমারম্যান শব্দে তাঁর ইহুদি পরম্পরা প্রকাশ পেত, সেটা তাঁর ঘোর অপছন্দ। মা আর দিদিমা ববকে সবরকম প্রশ্রয় দিতেন। কিন্তু ওই মিনেসোটার প্রচ- ঠান্ডার কাঁপন আর সেখানকার আশপাশের পরিবেশ ববের একেবারে সহ্য হচ্ছিল না। তাই চলে এলেন মিনিয়াপোলিশে। ১৯৫৯ সালে ভর্তি হলেন সেখানকার মিনেসোটা ইউনিভার্সিটিতে। আগে থেকেই পছন্দ করতেন রক অ্যান্ড রোল, এবার মিনিয়াপোলিশে এসে স্বাদ পেলেন আমেরিকান লোকসংগীতের এবং চকিতে সিদ্ধান্ত করে নিলেন এই ফোক বা লোকসংগীতই হবে তাঁর একান্ত চর্চার বিষয় এবং ফোক ফর্মেই গান বাঁধবেন। তাকে সবার সামনে জনপ্রিয় করে তুলবেন। বব জানতেন, লোকসংগীতের মঞ্চ রূপায়ণে খুব একটা বাজনা-বাদ্যির সমারোহ লাগে না। একটা সাধারণ গিটার আর হারমোনিকাই যথেষ্ট। আসলে গানের সুরের ভেতরে ডিলান চাইছিলেন একটা ফিউশন বা মিশ্রণ। রকের আদলে ফোকের অভিবর্তনা।

এবারে হলো গায়ক-গীতিকারের ঠিকানা বদল। চলে এলেন ১৯৬১ সালে নিউইয়র্কে। প্রথমেই তো পাবলিক কনসার্টে সুযোগ-মঞ্চ পাওয়া যায় না। বব তাই তাঁর গায়ন শুরু করলেন কফিহাউসে। তাঁর গায়ক প্রতিমার একটা নিজস্বতা ছিল। পরনে থাকত জিনসের প্যান্ট, শ্রমিকদের মতো শার্ট, মাথায় একটা টুপি। শার্টের কলার উঁচু করা। নিউইয়র্কের পথে দুরন্তবেগে মোটরসাইকেল চালাতে বেজায় ভালোবাসতেন। তখন থেকেই তিনি যৌবশক্তির আইকন – উদ্দাম, বেপরোয়া, আপগরজি গানের নির্মাতা। লেননের মতো প্রগাঢ় সুরেলা কণ্ঠ ছিল না, জোন বায়েজের মতো আত্মনিষ্ঠ গায়নের জাদু ছিল না, পল রোবসনের মতো অমন বিপুল জনাদরও ছিল না। তবে উত্তাল সংগীতের সেই রাজনীতি প্রমত্ত দিনগুলো ববকে এগিয়ে দিলো। একদিকে জনসমুদ্রে জোয়ার তুলছেন প্রতিবাদী নেতা মার্টিন লুথার কিং। পিট সিগার গাইছেন সেই তাঁর বিখ্যাত প্রশ্নাকুল গান ‘where have all the flowers gone?’ সমগ্র মার্কিন যৌবন সেই সংকল্পের গান গাইছে, গান তো নয়, এক দৃপ্তশপথ ‘we shall overcome someday।’ এই সংক্ষুব্ধ ও গভীর পটে মঞ্চে পা রাখলেন বব ডিলান।

এইখানে এসে আমরা একটু গানের জাদু তথা গানতত্ত্বের কথা সেরে নেব। সবাই জানেন যে, গান গাওয়া হলো একরকম প্রবল জনাদৃত পারফরমিং আর্ট। এর সার্বিক উন্মোচনে, সৃজনে ও প্রচারে এবং অবশ্যই শোনা ও ক্রয়যোগ্যতায় জনতার একটা বড় ভূমিকা থাকে। এ তো খুব সহজ কথা যে, শ্রোতা না থাকলে গায়ক বা গান গজাবে কোথা থেকে? ‘একাকী গায়কের নহে তো গান’ বচনটি সহজবোধ্য কিন্তু ‘মিলিতে হবে দুইজনে’ তত্ত্বটি এদেশের গানের ক্ষেত্রে সত্যি যদি বা হয়, ইঙ্গ-মার্কিন শ্রোতাদের সমাজে একাকী গায়কের একক শ্রোতার বাস্তবতা টিকবে না, কেননা সেখানে অগণিত শ্রোতা থাকা চাই এবং রেকর্ড ক্রেতা থাকা চাই লাখ লাখ। তবে জনমানসে স্থায়ী প্রতিষ্ঠা পাবেন একজন পল রোবসন বা জন লেনন আর আমাদের এখনকার আলোচ্য জোন বায়েজ ও বব ডিলান। লাখ লাখ মানুষের জনসমুদ্রের শীর্ষে ও তুঙ্গে কণ্ঠে কণ্ঠে থাকবে গান, যা দেশকালের বিক্ষোভ প্রতিবাদ প্রতিরোধের ভাষায় লেখা – শান্তি ও মানবতার সপক্ষে ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে উচ্চকিত হবে। বর্ণবৈষম্য আর জাতিবৈষম্য যে দেশে সবচেয়ে জ্বলন্ত প্রশ্নের মতো, সেই সাদা চামড়া-কালো চামড়া বিভাজনের চিরকালের অমীমাংসিত ভূমিখ- আমেরিকার রোবসন আর তাঁর ভাবশিষ্য বেলাফন্তে উঠে আসেন প্রতিবাদের গান রচনা করে। মশালের মতো সেসব গানের অগ্নিউজ্জীবনী শক্তি ছড়িয়ে পড়ে ভক্তদের অগণিত কণ্ঠে। তখন আর তা নান্দনিক চরিত্রের ‘সংগীতশিল্প’ থাকে না – হয়ে ওঠে হাতিয়ার আর বজ্রবিদ্যুৎ জ্বালাময় উদ্গিরণ। তখন বোঝা যায় সেই প্রগাঢ় সুবচন যে, ‘art is not a pleasure trip, it is a battle।’ এই লড়াই সব দেশে হয় না। বিশেষ এক জনসমাজের গানের ক্রুদ্ধ পরম্পরা থাকা চাই, চাই গানের প্রখর ব্যক্তিত্ব। তাই দেখি ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গানের শস্ত্র তৈরি হয় আগ্রাসী দেশ আমেরিকাতেই। সেটা মার্কিন বিবেকের একটা উদাহরণীয় বিষয় হয়ে ওঠে, যা সারাবিশ্বের সমর্থন পায়। চীন দেশের তিয়ানানমেনের প্রাঙ্গণে নির্বিচার গুলিবর্ষণের নিন্দা করে জোন বায়েজ গেয়ে উঠতে পারেন –

But it seems that the Spring this year in Beijing

Came just before the Fall

There was no Summer at all

In Tiananmen Square

China… China.

লক্ষ করতে হবে এ-তথ্যও যে, খোদ চীনদেশে কিন্তু সেই গুলিবর্ষণের বিরুদ্ধে কোনো গান জেগে ওঠেনি। উঠলেও আমরা তা শুনতে পাইনি – কেননা সে-দেশে তো গানের তেমন পরম্পরা নেই, সৃজনের স্পষ্ট অভিমুখ নেই, লাখ লাখ শ্রোতা নেই এবং সে-দেশের গানের বাণী তো আন্তর্জাতিক বহুল প্রচারিত ইংরেজি ভাষা নয়। কাজেই মানবতার দায়ে সেই মানব সংরক্ততার গান রচনা করে দেশ কাঁপিয়ে গাইতে হয় একজন মননশীল বিবেকী মার্কিন কন্যাকে। সাবাস।

ফোক, পপ, রক, বস্নুজ থেকে শুরু করে ক্যালিপ্সো ও অন্যান্য নানা বর্গের গান নিয়ে ইঙ্গ-মার্কিন গায়ক-গীতিকাররা বিশ শতকের চলিস্নশের দশক থেকে একটানা দু-চার দশক শ্রোতাদের মধ্যে যে বিপুল উন্মাদনা আর প্রত্যাশা জাগিয়েছিলেন তার প্রতিফলন ঘটেছিল বেশ কটি অ্যালবাম ও গানের ব্যাপক বিপণন ও জনসমাবেশে আছড়ে পড়া গান পরিবেশনের প্রচ- উদ্দীপনায়। এমন জনবিস্ফোরণঘটিত আবেগ ও উৎসাহের কয়েকটি খুচরো নমুনা এখানে পেশ করা হচ্ছে ব্যাপারটা বোঝাতে, যা শুধু সবচেয়ে বিখ্যাত গায়ক-গীতিকারদের ক্ষেত্রে ঘটে গেছে। এ-তথ্য তালিকায় মাইনর বা অনতিখ্যাতদের কথা থাকছে না। গোড়াতেই কবুল করে নিতে হবে যে, যত বিখ্যাত পারফরমারের কথা আমরা জানি, তাঁদের গানের জগতে প্রথম ভীরু পদক্ষেপ ঘটে ছোট ছোট সমাবেশে, কফিহাউসে, বারে বা কলেজে। পরে ক্রমে ক্রমে তাঁদের নাম ও গানের জনপ্রিয়তা সারা আমেরিকা এবং ইংল্যান্ডের তরুণ সমাজে দাবানলের মতো বিসত্মৃত হয়ে পড়ে। উদাহরণত এখানে একটা রোমাঞ্চকর খবর দেওয়া যেতে পারে, যার থেকে জানা যায় – As a musician, Dylon has sold more than 100 million records, making him one of the best selling artists of all time.

অঙ্কটা সোজা নয়। এক মিলিয়ন মানে যদি হয় দশ লাখ তবে একশ মিলিয়ন মানে কত? বাপ রে, থাক সে-হিসাব। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, এত মানুষ পাগলের মতো ওসব দেশে কেন গান শোনে ও কেনে? সে-প্রশ্নের জবাব আপাতত বন্ধ রেখে বব ডিলান (জন্ম ১৯৪১) ও সমবয়সী জোন বায়েজের (জন্ম ১৯৪১) আগে নগরবাউলের ঐতিহ্যে আসবে জন লেননের নাম (১৯৪০-৮০)। প্রথম দুজন আমেরিকান, তৃতীয় জন ইংরেজ। এঁদের সবারই পূর্বসূরি হিসেবে আসবে তিনটি নাম – পল রোবসন (১৮৯৮-১৯৭৬), উডি গাথরি (১৯১২-৬৭) এবং পিট সিগার (১৯১৯-২০১৪)। এঁদের মধ্যে রোবসনের গানে বারবার এসেছে বহুরকমের রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা ও দমনপীড়ন। উডি গাথরির ছিল লোকগানের বিপুল সঞ্চয় ও অধিকার এবং তাঁর লক্ষ্য ছিল লোকসংগীতের পুনরুজ্জীবন। ডিলান ছিলেন তাঁর প্রত্যক্ষ ভাবশিষ্য ও অনুকারক। পিট সিগারের ছিল স্বাভাবিক নেতৃত্বদানের স্বতন্ত্র চারিত্র্যমূর্তি এবং অবিসংবাদিত অগাধ জনসংযোগ। সমগ্র ষাটের দশক এই তিনজন নগরবাউলের গানে ও উদ্দীপনার ক্ষোভে প্রতিবাদে ও প্রতিরোধে জেগে ওঠে মার্কিন যুবসমাজ। তাঁদের মধ্যে একজন উন্মত্ত অনুরাগী সরাসরি গুলিবিদ্ধ করে জন লেননকে স্তব্ধ করে দেয়। জনাদরের শীর্ষে থেকে মাত্র চলিস্নশ বছরে লেনন বিদায় নেন। সেই হত্যা খুবই রহস্যময়। কেউ কেউ মনে করেন যে, রাষ্ট্রশক্তি হয়তো কৌশলে তাঁর কণ্ঠরোধ করেছিল। ভিয়েতনামে আমেরিকার আগ্রাসনের ব্যাপারে লেনন প্রতিবাদী গান লেখেন : ‘Give Peace A Chance’ – ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত অ্যালবাম থেকে এই গানটি প্রচারিত হয়ে সারাবিশ্বের শান্তিকামী গানপাগলদের মন্ত্রমুগ্ধ করে দেয়। ঘটনা আরো আছে। ১৯৬৯ সালের ১৫ নভেম্বর পাঁচ লাখ প্রতিবাদীর নেতৃত্ব দিয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিপক্ষে পিট সিগার মিছিল করেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল লেননের সেই বিখ্যাত ‘গিভ পিস আ চান্স’ গানটি। পিট সিগার অন্যভাবেও গেয়ে জনপ্রিয় করেন ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ গানটি, যা সিভিল রাইটস মুভমেন্টের বাণীবহ।

এই পৃথিবী-বিখ্যাত ‘We shall overcome’ গানটি এক অবাক করা জনশিল্প। সমগ্র পৃথিবীতে সচেতন সমাজ-সংগ্রামীদের কাছে এই গান যেন শপথমন্ত্রের মতো পবিত্র ও উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী। এমনকি আমাদের বাংলা ভাষাতেও ‘আমরা করব জয় নিশ্চয়’ বা হিন্দি ভাষায় ‘হম হোঙ্গে কামিয়াব একদিন’ এমন স্বচ্ছ রূপান্তরে মূল সুরে গানটি কতজন কতবার যে গেয়েছেন সভা-সমিতি-সমাবেশে, জনতার মুখরিত সখ্যে, হাতে হাত রেখে! অথচ মূল গানটি ছিল ১৮৩০ সালে লেখা Gospal Hymn-এর আদলে, অর্থাৎ ধর্মানুষঙ্গে চার্চের চত্বরে তৈরি। মূল গানের বাণীতে ছিল :

I’ll overcome I’ll overcome

I’ll overcome some day

If my Jesus wills. I do believe

I’ll overcome some day.

গানের এই আদি বাণীরূপ প্রকাশিত হয় ১৯৪২ সালে এবং ১৯৫৪-তে কপিরাইট নেওয়া হয় এক আফ্রিকান-আমেরিকান ব্যাপটিস্ট কয়ারের নামে – সেই কয়ারের পরিচালক ছিলেন লুইস স্রপসায়ার। কেউ কেউ মনে করেন, আফ্রিকান-আমেরিকান কম্পোজার বেভারেল চার্লস টিন্ডল গানটির গীতিকার। ক্রমে ক্রমে চার্চের ধর্মীয় আওতা আর যিশুর মহিমা ত্যাগ করে, ভাষাগত পরিবর্তন নিয়ে, গানটি হয়ে ওঠে প্রতিবাদ ও শপথের কোরাস। জড়িয়ে ওঠে আমেরিকার সিভিল রাইটস মুভমেন্টের ভাষ্যে।
সংগীত-পরিচালক সিলভিয়া হর্টল অনেককে সেই মানবিক সংগ্রামের ভাষ্যরূপে গানটি শেখান। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন পিট সিগার। সেই সিগার ও আরো অনেকে (যেমন বব ডিলান) ১৯৬০ সাল বরাবর গানটি নানা উৎসবে, জমায়েতে ও কনসার্টে গেয়ে তুমুলভাবে ছড়িয়ে দেন। যার একটা নমুনা পাই এই তথ্যে যে, ১৯৬৩ সালের আগস্টে জোন বায়েজ (তখন তাঁর বয়স মাত্র বাইশ বছর) তিন লাখ ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত জনসংঘ নিয়ে নাগরিক মিছিল নিয়ে হাঁটেন We shalll overcome গান গেয়ে। শুধু তাই নয়, তথ্যে জানা যায়, ১৯৬৮ সালের ৩১ মার্চ প্রখ্যাত মার্কিন জননেতা ও মানবদরদি ব্যক্তিত্ব মার্টিন লুথার কিং তাঁর জীবনের শেষ ভাষণে দৃপ্তস্বরে এই ভুবনজোড়া আসনপাতা গানখানি থেকে অনেকটা অংশ পড়ে শোনান। এসব যুগান্তকারী ঘটনার সঙ্গে একটা গানের প্রোজ্জ্বল সংযোগ আর বক্তব্য-গভীর ব্যবহার থেকে ভারতীয় বা বাঙালি হিসেবে আমাদের এই বিস্ময় ও খেদ জাগে যে, হায়, আমাদের জীবনে এমন কোনো অগ্নিলীলার সঞ্জীবনী ভরা গান এখনো কেউ রচনা করতে পারেননি। কেননা, সত্যি সত্যিই এ-কথা মান্য যে, রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, আমাদের গান হলো ‘নির্জন একেকের’ আর ওদের গান হলো ‘সজন লোকালয়ের’। বহুজনের ক্ষোভ, কান্না, হতাশা আর স্বপ্নের বাণী ওদেশের গীতিকার-গায়করা সহজেই লিখতে পারেন খানিকটা বিদ্রূপের ঢংয়ে –

We are born in a prison

Raised in a prison

Sent to a prison called school.

পাঠক লক্ষ করেছেন যে, বব ডিলানের প্রসঙ্গ সঠিকভাবে উপস্থাপন করার জন্য তাঁর পারিপার্শ্বিক দেশকাল, সাংগীতিক পরিবেশ, বিপুলসংখ্যক সমঝদার শ্রোতার সমাবেশ আর উন্মাদনা এসব কথা এসে যাচ্ছে। আসছে ববের সমসময়ের এমনকি একসঙ্গে অংশ নেওয়া গায়ক-গীতিকারদের কথা – কেননা এই অভূতপূর্ব গানের উৎসার ও আবেগ তো ভুঁইফোড় নয়, তাতে আছে পূর্বজ গায়কদেরও পরম্পরা। রোবসন-উডি গাথরি-লেননদের কথা না জানলে তো ডিলানকে সম্পূর্ণভাবে বোঝা যাবে না। তিনি যেন অবিরাম ঢেউ-খেলানো এক বিরাট সমুদ্রের অংশ, যার লহরি অনাদ্যন্ত। বিশেষ করে মনে রাখতে হবে তাঁদের সময়কার বিশ্বপরিস্থিতির অস্থিতাবস্থা, আগ্রাসন, সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ-পরিকল্পনা, রাষ্ট্রীয় প্রতাপের বলদর্পী নির্লজ্জতা এবং তার পাশে সংকল্পদৃঢ় প্রতিবাদ, শান্তির জন্য আকুলতা, প্রতিবাদী মিছিল ও গণভিত্তিক চেতনা উন্মোচনের বিদ্রোহী গানের সমুদ্যত লাখ লাখ কণ্ঠও সত্য। ঘটনাচক্রে গত শতাব্দীর আমেরিকা এমন এক আবেগ-থরোথরো সময়ের কেন্দ্রে পৌঁছেছিল, পঞ্চাশ থেকে ষাটের দশকে, যে-গানের মোহন বেণু বর্জন করে গায়কদের এগিয়ে আসতে হয়েছিল প্রকাশ্য মঞ্চে ও মিছিলে। ফুল খেলার দিনকে পেছনে ফেলে, গানের বিনোদন ভূমিকা অগ্রাহ্য করে গায়ক-গীতিকারদের ঘোষণা করতে হয়েছিল তাঁদের অবস্থানগত বিশ্বাসের ভিত্তি। জনতার অগণিত সুশৃঙ্খল সমাবেশে যে বৈদ্যুতিক শিহরণ গায়কদের চমকে দিয়েছিল তার অভিজ্ঞতা তাঁরা ব্যক্ত করেছেন। এসব গান চিহ্নিত হয়েছিল ‘Song with a purpose’ বলে। এঁদের বিশ্বাস যেমন ধ্রম্নব ছিল যে, ‘We shall overcome some day’ তেমনই বুকের গভীরে এই প্রত্যয় ছিল যে, ‘A guiter can beat a gun’।

এখানে মনে রাখতে হবে যে, যে-জোন বায়েজ পরবর্তীকালে মঞ্চে উঠে বহু ডিলান রচনাকে প্রাণস্পর্শ আবেগে এবং তার যথেষ্ট প্রবল কণ্ঠে গেয়ে জনপ্রিয় করেছিলেন তাঁর কিছু ব্যক্তিগত জবানি রয়ে গেছে। যখন বায়েজ নিতান্ত তরুণী বয়সী, অচেনা, অজানা, তখনো যাঁর বিপুলসংখ্যক শ্রোতার সামনে, তাঁদের তরঙ্গিত আগ্নেয় উপস্থিতির সমাবেশে গান গাওয়ার আশ্চর্য ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ঘটেনি, তখন পিট সিগারের গান তাঁকে প্রথম সেই আস্বাদ দেয়। তিনি কবুল করেছেন : ‘It’s like they gave me a vaccine and it worked’। তিনি তাঁর সাংগীতিক জীবনে প্রথম বড় অনুষ্ঠানের ডাক পান ১৯৫৯ সালে, যখন বব গিবসন নিউফোর্ট ফেস্টিভ্যালে বায়েজকে মঞ্চে ডেকে নেন। বায়েজ জানিয়েছেন,

I walked on stage and it looked like the largest gathering of people on earth…

I felt as if I’d been invited to my own execution.

জোন বায়েজের এ-ধরনের গান পরিবেশনার প্রাঞ্জল অভিজ্ঞতা পরে যথেষ্ট কাজে লাগে, তখন তিনি ক্রমে জড়িয়ে পড়েন বব ডিলানের সঙ্গে, তাঁর সঙ্গে গাইলেন এবং হৃদয় দিয়ে ফেললেন।

বব ডিলানের প্রসঙ্গে এবারে আমরা সানুপুঙক্ষ সন্ধানী চোখ নিয়ে প্রবেশ করতে পারি তাঁর বেস্ট সেলার গান ‘Like a rolling stone’ কথাগুলো যেন সমগ্র জীবনবেদ তাঁর। স্বভাবে বিবিক্তি ধরনের এবং আচরণে নির্লিপ্ত তিনি। কোনো কিছুই তাঁকে বরাবরের জন্য টেনে রাখতে পারেনি। নারীসম্পর্কও নয়। না হলে তাঁর সঙ্গে জোন বায়েজের বছর কয়েকের ঘন সান্নিধ্য, গানের বাঁধন, শেষপর্যন্ত টেকে না কেন? অনিকেত স্বভাব তাঁর নির্বাস চেতনার। অথচ একটু যদি ববের স্বভাবে থাকত জীবনাসক্তি আর ভোগবাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার কিংবা যশের আকাঙক্ষা, তবে পৃথিবী পেত এক চিরকালীন গানের জুটি – বব ডিলান আর জোন বায়েজ। একসময়ে তাঁদের একজনকে বলা হতো ‘কিং অব ফোক’, আরেকজনকে ‘কুইন অব ফোক’ – একত্রে ‘রয়াল কাপল’। কিন্তু ডিলান সে-সম্পর্ক স্থায়ী করতে চাননি। ১৯৬১ সালে দুজনের আলাপ – ১৯৬৫ সালে বিচ্ছেদ। সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত এতটাই তিক্ত হয়ে যায় যে, জোনের সঙ্গে এক মঞ্চে উঠতে চাননি বব। তাঁরা যেন ঠিক করে নিয়েছিলেন, ‘আমরা দুজন স্বর্গখেলনা গড়িব না ধরণীতে।’ বব সম্পর্কে তথ্যচিত্রের নাম যখন ডোন্ট লুক ব্যাক, তখন বোঝা যায় জীবনের সবকিছু ফেরে না।

শুধু তাই নয়, কেবল জোনের সঙ্গে সম্পর্কের আড়াআড়ি নয় – ডিলান যেন উদাসীন এক পর্যটক। তাই নিজেকে র্যাঁবোর মতো নিমজ্জিত রাখতেন এই চিমত্মায় যে, ‘I is someone else’ – আমি যেন অন্য একজন। তাঁর চলচ্চিত্রায়িত জীবনীর নাম যে রাখা হয়েছে I am not there সেটাও ভারি দ্যোতক। পতনশীল দ্রম্নত ধাবমান প্রস্তরখণ্ডের মতো তাঁর উদ্ভ্রান্ত জীবন কিন্তু দিশাহীন নয়। সমকাল আর রুগ্ণ মানবতার সঙ্গে নিজের জীবনকে তিনি বরাবরের জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল যে, হিটলার, চার্চিল, মুসোলিনি, রুজভেল্ট সবাই অমানব এবং ঘাতক। বর্বরতা এদের রক্তগত। তবে তাঁর বংশধারায় কিছুটা তুরস্কের রক্ত ছিল বলে, অনেকে মনে করেন, ববের পক্ষপাত ছিল সাদা চামড়ার চেয়ে কালো চামড়ার দিকে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, সেটাই কি তাঁর বারাক ওবামাপ্রীতির কারণ? প্রশ্নকারীদের
জিজ্ঞাসা এই যে, ওবামাও কি মার্কিন আধিপত্যবাদের অংশ নন? আসলে ববের মনন ও চিন্তন একটু অন্যধারার এবং সমাধানহীন দ্বৈতে আক্রান্ত তাঁর সৃজনসত্তা অসহায়ভাবে উচ্চারণ করেছে –

Well, I’m looking for some answers

But I don’t know who to ask

সেসঙ্গে মনে করেন,

But I’m walking and wondering

And my poor feet don’t ever stop.

কতটা পথ পেরোলে তবে এ রহস্য জানা যায় তার মীমাংসা আজো হলো না তাঁর – কিন্তু তাই বলে পর্যটনে ক্ষান্তি নেই – ক্লান্ত তবু ক্লান্তিহীন বব। শুধু মনে হয় তাঁর – যে-রাস্তা ধরে তাঁর পথচলা সেটাই যে মৃত। ক্লান্ত তাঁর দুটি পা, মগজ ধ্বস্ত, আকাশে শুধু মেঘের সজল বিলাপ। মার্লে হেগার্ডের বাঁধা সেই গানের কথা তাঁর বেশ পছন্দ। যাতে বলা হয়েছে, ‘I am on the run, the highway is my home’।

তাঁর আগের ও পরের নামকরা গায়ক-গীতিকারদের সঙ্গে বব ডিলানের পার্থক্য এইখানে যে, তিনি গান রচনা ও গান গাওয়ার পাশে চর্চা করে গেছেন অন্য দুই তাৎপর্যগভীর কলাশিল্পের। তাই তাঁকে আখ্যা দেওয়া হয়েছে Artist and writer বলে। জানা যাচ্ছে,

Since 1994, Dylon has published six books of drawings & paintings and his works has been exhibited in major art galleries.

এর সঙ্গে মনে রাখতে হবে, ২০০৮ সালে যখন তাঁকে পুলিৎজার প্রাইজ দেওয়া হয় তখন তাঁর মনোনয়নে কর্তৃপক্ষ উলেস্নখ করেন, এই পুরস্কার ববকে দেওয়া হলো, ‘for his profound impact on popular music and American culture, marked by logical compositions of extraordinary poetic power.’

তাঁর লিরিক লাবণ্যের স্বীকৃতি এবং বিশেষ করে কবিত্ব শক্তির সম্পর্কে স্বতন্ত্র সম্ভ্রমবোধ, এখানেই বব ডিলান সর্বোচ্চ অভিনন্দন পেয়ে গেলেন। ললিত কলাশিল্পের নানা মুখশ্রী চর্চা করে শেষ পর্যন্ত তাঁর সিদ্ধি ও বিশ্বমানের সৃজনপ্রতিভা যে তাঁর গানে ফুটে উঠল, প্রধানত গানের লিরিকাল বুনোটে, তার কারণ বব ডিলানের সংসর্গ ঘটেছিল তাঁর সমকালের ব্যতিক্রমী স্বরের কবিদের সঙ্গে। তাঁর গানের বাণীবয়নে ওয়াল্ট হুইটম্যানের সাবলীল free versa-এর ব্যবহারিক প্রয়োগের কথা মনে রেখেও ভাবতে পারা যায় বিশেষত অ্যালেন গিনসবার্গ আর র্যাঁবোর সংরাগের প্রসঙ্গ। তবে সেসব ছাপিয়ে জেগে থাকে ডিলানের আত্মবিশ্বাসের স্বাধীন ঘোষণা যে, তিনি আর মানুষের জন্য লেখেন না… লিখতে চান মনের গভীর থেকে। তিনি কোনো আন্দোলনে যেমন নেই, তেমনই বিমুখ প্রাতিষ্ঠানিকতার। তিনি খানিকটা পরিহাসের সুরে গেয়েছেন –

Come writers and critics Who prophesize with your pen

And keep your eyes wide

The chance won’t come again.

বললেন, পৃথিবীতে এই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ সময়। এসো মুক্ত করো মুক্ত করো সব বন্ধন, ছিন্ন করো মুখোশ। কেউ কেউ ডিলানের গানের মধ্যে কাহিনির ছাপ দেখেছেন। কিন্তু ডিলানদের কোনো বাঁধা ছক বা প্যাটার্নের মধ্যে মানানসই লাগে না। অন্যদের প্রশ্নের উত্তরে ডিলান কখনো যদি বা বলেন, ‘Song and Dance man’ (অর্থাৎ আমুদে নাচগানের মানুষ), পরক্ষণে বলে বসেন, আমি হলাম ষাট দশকের ত্রম্নবাদুর। অর্থাৎ গানের ছলে আমি এখন ব্যাখ্যাতা। বোঝাই যাচ্ছে এ হলো সময়ের ব্যাখ্যান। ত্রম্নবাদুরের কবিতার স্বরূপ তো সেটাই। সেরকম একটা মর্মভেদী কৌতুকের গানে ডিলান বলেছিলেন –

When the second world war came to an end

We forgave the Germans. And we are friends.

Though they murdered six millions.

এই হলো তাঁর দুষ্টু-মিষ্টি ত্রম্নবাদুরপনা।

ডিলান নিজেকে কখনো একক প্রতিভা, ‘আপনাতে আপনি বিকশি’ এমন ভাবেননি। তাঁর গীতিপ্রবণতা, তাঁর নির্মাণ ও সৃষ্টিতে সর্বদাই যেমন পূর্বজদের প্রতি আনুগত্য ও স্বীকৃতি ছিল, তেমনই ছিল পারিপার্শ্বিককে আত্তীকরণের আততি। আসলে যে-সময়ে তাঁর পূর্ণাঙ্গ আবির্ভাব ঘটে, প্রত্যয় ও পরিপূর্ণ প্রস্ত্ততি নিয়ে সেই সময় অর্থাৎ ষাটের দশকের আমেরিকার গানের পরিসর টগবগ করে ফুটছে নতুন কিছু উন্মোচনের আবেগে। অনেক স্রষ্টা ভাবছিলেন, লোকসংগীতের তো প্রবল ধারণশক্তি, তাই সেই আদলে ভরে দেওয়া যায় না কি রাজনৈতিক মতামত? তখনকার সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় রক এন রোলের প্রচলিত চিৎকৃত আদলে সব কথা যেন ধরা যাচ্ছিল না। অন্তত বব ডিলানের ভেতরে বুভুক্ষু এক নতুন বার্তা পরিবেশনে মনে হচ্ছিল ‘চিত্ত পিপাসিত রে/ গীতসুধার তরে।’ সেই গীত হবে রকের মর্যাদা বজায় রেখেও লোকগীতির বনিয়াদে। তিনি স্পষ্টত বুঝতে পারলেন যে, পিট সিগার আর উডি গাথরির গানে রয়েছে বেশকিছু কমেন্ট আর নতুন ভাবনা, যেমন তিনি একান্ত আবেগে খুঁজছিলেন উৎপীড়িত হতমান অসহায় মানুষের মর্মজ্বালা গানে কী করে ভরে দেওয়া যায় এমন স্বপ্নে যে,

Imagine there’s no countries

It isn’t hard to do

Nothing to kill or die or

And no religion too.

Imagine all the people

Living in peace.

বাস্তবত কঠিন, কিন্তু গীতিকাররা তো কল্পনাবাদী, তাঁরা ভাবতেই পারেন সেই পৃথিবীর ভবিষ্য ছবি যেখানে কারোর কোনো ঐশ্বর্যের দেমাক নেই, নেই কারোর লোভ কিংবা ক্ষুধা, সবার সম্পর্ক যেন ভাই ভাইয়ের মতো। সবাই সবকিছু ভাগ করে নিয়েছে। এমন গান তো ১৯৪০ সালেরও আগে লেখা।

ডিলান শুনতে পেলেন যুবসমাজের আর্তকান্না আর আত্মশোচনা কিছু কিছু গানে। তিনি এমন গান শুনলেন, যেখানে পরম অভিমানে কেউ গাইছে,

There is my generation sitting

Silently in the corners.

My generation does not dare to sing

My generation is afraid of the      daylight

My generation celebrates night.

এমন পেচকধর্মী লুকানো মুখের যাপন থেকে চাই মুক্তি এখন কোনো নতুন গানের ভোরে। সেই স্বপ্ন ও সংলাপ নিয়ে এসে দাঁড়ালেন গিটার হাতে বব ডিলান। কিন্তু আরম্ভেরও তো আরম্ভ থাকে। তাঁর গানের জীবনের সলতে পাকানোর প্রস্ত্ততিপর্বে প্রধান দুই ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শ আলাদা করে বলতে হবে। একজন উডি পাথরি ও আর একজন সুজি রোটালো। প্রথমজন প্রবীণ গায়ক, দ্বিতীয়জন ভাবুক নবীনা। একজন পুরুষ আর একজন নারী যেন ডিলানের দীপালোকে গানের আলো জ্বেলে দিলো। উডি গাথরি (১৯১২-৬৭) ছিলেন ববের চেয়ে ২৯ বছরের বড়। খানিকটা যেন তাঁর ‘ফাদার ফিগার’। উডির জীবনসাধনা ছিল লোকগানের ছাঁচে ফেলে নতুন দিনের গান গাওয়া। সেই গান গেয়েই ডিলানের শুরু। উডি গাথরি মার্কিন গানের আধুনিকতার স্থপতিবিশেষ, যদিও জীবনে তাঁর সম্মাননা ও প্রার্থিত পারিতোষিক জোটেনি। কিন্তু বব তাঁর পাশে থাকতে দ্বিধা করেননি। রাষ্ট্রের কাছে উডি বিশেষ আনুকূল্য পাননি, অসুস্থ হয়ে তাঁর আশ্রয় জুটেছিল নিউ জার্সির মরিস টাউনে গেস্টোন হাসপাতালে। হাসপাতালটা ভুতুড়েগোছের, মধ্যযুগের দুর্গের মতো রহস্যময়। সেখানে যেন পরিত্যক্ত এক সাধারণ রোগীর মতো ধুঁকতেন উডি। কিন্তু পোর্ট অথরিটি থেকে দেড় ঘণ্টার বাসযাত্রা সাঙ্গ করে প্রায়ই ডিলান অসুস্থ অগ্রজের কাছে যেতেন খাড়া হেঁটে আধমাইল পেরিয়ে পাহাড়ের মাথায় গড়া হাসপাতালে। সঙ্গে নিয়ে যেতেন গাথরির প্রিয় সিগারেট র‌্যালে। শুধু তাই নয়, উডিকে চাঙ্গা রাখার জন্য যত প্রভূত গান শোনাতেন, যেসব গান উডিরই রচনা। ববের মনে হতো হাসপাতাল তো নয়, ওটা যেন একটা পাগলা গারদ, যার বাসিন্দারা অনেকে ছিল অর্ধোন্মাদ। ডিলানের মনে কষ্ট হতো এই ভেবে যে, তাঁর পূর্বজ এক মহান গায়ক কত অযত্ন আর অবহেলার মধ্যে পড়ে আছেন। দেশের কারো সে-ব্যাপারে কি কোনো দায় নেই? অবশ্য শেষরক্ষা হলো না। নিতান্ত অবজ্ঞাত থেকে উডি গাথরি ১৯৬৭ সালে সেখানেই প্রয়াত হলেন। সবাই মানেন যে, বব ডিলানের মধ্যে মহৎ সৃষ্টির বীজ জারিত হয়েছিল উডির গান শুনে ও চর্চা করে। লোকসংগীতেই যে ভবিষ্যতের নতুন রক গানের ভিত্তি হতে পারে তা প্রথম বুঝেছিলেন উডি – বব ডিলান সেই ধারণাকে পুষ্পবন্ত করে তোলেন।

গানের ফর্মের দিক থেকে অনেক ইঙ্গিত পান ডিলান তাঁর অগ্রজ গায়কের কাছে, তবে গানের কনটেন্ট বা স্টেটমেন্ট বিষয়ে তাঁর প্রকৃত ধারণা গড়ে ওঠে যে-মেয়েটির সান্নিধ্যে ও উপদেশনায়, তাঁর নাম সুজি রোটালো। তাঁদের দুজনের আলাপ ও অনুরাগের সূচনা ১৯৬১ সালে নিউইয়র্কের একটা ক্যাফেতে। ডিলান তখন কুড়ি আর সুজি সতেরো। সুজির বাবা ছিলেন প্রত্যয়বান কমিউনিস্ট। সুজি নিজেও প্রগতি-ভাবুক। সে গোপনে যোগাযোগ রাখত কংগ্রেস অব রেসিয়াল ইকুয়ালিটি সংস্থার সঙ্গে। সে-সময় ডিলান এসব বিপস্নবী পন্থা আর জাতিবর্ণ-চেতনা সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানতেন না। সুজি তাঁকে ক্রমে ক্রমে দীক্ষেত করেন বের্ট্রল্ড ব্রেখ্ট্ আর আর্তুর র্যাঁবোর লেখালেখি পড়ানোয় এবং তাঁদের মননজগতের স্বাদ নিতে। ববের গান-লেখায়, পরে এদের ভাবনার বিচ্ছুরণ ঘটে।

সুজিকে কেউ কেউ ববের প্রণয়িনী বলেছেন, তবে মনে হয় তাঁদের সম্পর্কটা ছিল মূলত বৌদ্ধিক। ১৯৬১-৬৩ সালে এঁরা দুজনে কাছাকাছি ছিলেন। বামপন্থী চেতনার সুজির কার্যক্রম ও জীবনচর্চা আবর্তিত হতো সিভিল রাইটস আন্দোলনের উত্তেজনায়। অথচ বব ডিলান স্বভাবত ছিলেন আত্মমগ্ন ও নির্বিকার। তবে ডিলান তাঁর আত্মজীবনীতে স্বীকার করেছেন যে, সুজি তাঁর সৃজনের অন্তর্গত একটা স্পষ্ট অভিমুখ গড়ে দিয়েছেন।

ডিলান তাঁর সংগীতজীবনে এমন অনেক ঘটনাকেন্দ্রিক গান লিখে জনগণমন হরণ করেন তাতে খানিকটা কাহিনির আভাস আছে – যেন ব্যালাডের মতো। সে-ধরনের গানের সৃষ্টিকথা বলার আগে মনে করিয়ে দিতে চাই এই তথ্য যে, গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সারা আমেরিকা উত্তাল হয়ে উঠেছিল আফ্রিকান-আমেরিকান (যাদের আমরা ভুল করে বলতাম ‘নিগ্রো’) কালো মানুষদের স্বাধিকারের সংগ্রামে। শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের যত বিশেষ সুযোগ, বনেদি হালচাল ও উন্নাসিকতার বিরুদ্ধে কৃষ্ণকায়দের দাবি নিয়ে মার্টিন লুথার কিংয়ের নেতৃত্বে যে-দুর্দমনীয় সিভিল রাইটস মুভমেন্ট সংগঠিত হয় তাতে সামনে আসে অনেক অনাচার, সামাজিক অসাম্য, এমনকি হত্যার প্রসঙ্গ। যেমন ধরা যাক, ১৯৫৫ সালে ঘটে যাওয়া দুটি অবমাননাকর ঘটনার কথা। প্রথম ব্যাপারটা ঘটে যখন ১৫ বছরের কালো চামড়ার এক কিশোর নিতান্ত বয়সোচিত অপরিণত বুদ্ধির ঝোঁকে এক শ্বেতাঙ্গিনী কিশোরীকে দেখে হঠাৎ শিস দিয়ে বসে। এ তো নিতান্ত সাধারণ ব্যাপার। কিশোরটির নাম এমেট টিল, তার অপরাধ সে কৃষ্ণাঙ্গ। তাই কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের স্বাধিকার আন্দোলনের নেত্রী রোজা পার্কসকে কেন্দ্র করে। সে-সময়ে মার্কিন দেশের দস্ত্তর ছিল, বাসে কোনো শ্বেতাঙ্গ যাত্রীকে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখলে সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গ যাত্রীর সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে বসতে দিতে হয়। রোজা পার্কস তা মান্য করেননি বলে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। শাসকের নির্দেশের অবাধ্যতা করা যে ভয়ংকর অমার্জনীয় অপরাধ।

ডিলানের বান্ধবী সুজি রোটালো তাঁকে বলেন সিভিল রাইটস আন্দোলনের জন্য একটি প্রতিবাদী গান লিখে দিতে। তা শুনে আবেগে অনুপ্রাণিত হয়ে ডিলান তাঁর গানের বিষয় রূপে বেছে নিলেন এমেট টিলের নিষ্ঠুর হত্যাকা–র অমানবিক দিক এবং লিখলেন তাঁর অবিস্মরণীয় সেই গান, যার নাম ‘The Death of Emmett Till’। গানটি এখানে অনেকটাই উদ্ধার করব। যথা –

’T was down in Mississippi no so long ago

When a young boy from Chicago Town stepped through a southern door.

This boys dreadful tragedy. I can still remember well

The colour of his skin was black and his name was Emmett Till.

 

Some men they dragged him to a barn and there they beat him up.

They said they had a reason, but I can’t remember

what they tortured him and did some evils things too evil to repeat.

There are screaming sounds inside the barn.

There was laughing sounds out on street.

 

Then they rolled his body down a gulf amidst a bloody red rain

And they throw him in the waters wide to cease his screaming pain.

The reason that they killed him there and I’m sure it ain’t no lie

was just.

এই তাঁর বিখ্যাত গানটি বেশ দীর্ঘ, অর্থাৎ সংযত মধুর লিরিক নয়। গানে তাঁর ভরা থাকে একটা সংক্ষুব্ধ মুখ। এ-ধরনের তাঁর দীর্ঘ গানগুলো যথেষ্ট সাড়া ফেলেছিল। যেমন – ‘She’s no good’, ‘I don’t believe you’, ‘New Morning’, ‘Days of 49’। তবে বব ডিলানের সবচেয়ে নামকরা বহুজনবশিত গানদুটি হলো ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত ‘The Freewheeling Bob dylon’ অ্যালবামের অন্তর্গত ‘Blowin in the wind’ এবং ২০০৬ সালে প্রকাশিত অ্যালবাম ‘Modern Times’-এর অন্তর্গত ‘Like a Rolling Stone’। এ দুটি গান শুনে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত সমঝদার তারিফ করেছেন এবং কেউ কেউ বলেছেন, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সময়ভাষ্য। তাঁকে যখন নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলো তখন আলাদা করে নির্বাচকদের মন্তব্য ছিল এই যে, ‘আমেরিকার মহান গানের পরম্পরায় কবিতার মাধুর্য যোগ করেছেন বলে তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।’ এই প্রাপ্তি ডিলানকে অভিভূত করে, আপস্নুত করে দেয়। তবে তাঁর স্বভাবসংগত পলাতক প্রবণতায় জানিয়ে দেন যে, পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি থাকতে পারবেন না।

তবে জনপ্রিয়তার বিচারে, অসামান্য নির্মাণ-কুশলতায় ভরা গান ‘বেস্নায়িং ইন দ্য উইন্ড’ রচনা করে সর্বকালের শ্রেষ্ঠতার শিরোপা ডিলান পেয়ে গেছেন। একজন বলেছেন, এটি পৃথিবীর গানের ইতিহাসে সবচেয়ে জনাদৃত গান। ১৯৬৩ সালে এটি রেকর্ডে বেরোয়। ১৯৯৪ সালে গানটি পায় ‘গ্র্যামি হল অফ ফেম’। অন্য এক সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০০৪ সালে একটি পত্রিকার বিচারে বিশ্বের পাঁচ কোটি বিশিষ্ট গানের মধ্যে এই গানের অবস্থান চৌদ্দতম।

তবে মানতে হবে ডিলান কোনো একক গায়ক-গীতিকার নন। তাঁর সময় তাঁকে দিয়ে কথা বলিয়ে নিয়েছে, যাতে অনুসৃত হয়ে আছে রোবসন থেকে লেনন পর্যন্ত বহু নগরবাউলের সাধনার নির্যাস। তাঁর গানের পাশে পাশে এসে পড়ে আরো অনেকের গান। বেলাফন্তে তো বটেই, তার সঙ্গে উচ্চারিত হবে বব মর্লি (‘Get up, stand up, stand up for your right’), জিম মরিসন ও লিওনার্ড কোহেনের নাম, যিনি যুদ্ধ ও শান্তি-কপোতের চিত্রকল্প গেঁথে লিখেছেন :

Don’t dwell on what has passed away

or what is yet to be

Ah! The wars they will be forget again

The holy dove

She will be caught again.

সমসাময়িকদের লেখা গানের সঙ্গে ডিলানের গান মিলিয়ে পড়লে বোঝা যায় তাঁর ব্যক্তিত্বের অভিনবত্ব এবং চিমত্মার নিজকীয়তা। সেই আত্মস্বর গঠনে যে-সময়কার সাহিত্যের নবতরঙ্গ, চলচ্চিত্রের আভাঁ গার্দ ধারা এবং সমকালীন কবিদের রচনাপাঠ ডিলানকে উদ্বুদ্ধ করে। বিশেষ করে ১৯৬৩ সালে ববের সঙ্গে গিন্স্বার্গের ঘনিষ্ঠতা তাঁকে অনেক ক্ষুদ্র সংস্কারবদ্ধতা থেকে মুক্ত করে। সে-সঙ্গে জ্যাক কেরুয়াকের মুক্তভাবনার কবিতা তাঁকে নতুন দিশা দেয়। ব্রেখ্ট আর র্যাঁবোর অন্তর্জগৎ তাঁকে আগেই টেনেছিল। তবে তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরে গিন্স্বার্গের কবিতা। গিন্স্বার্গ তাঁর অনেকটাই বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন এবং তাঁর মধ্যে ছিল এক তীব্র আগ্নেয় প্রতিভা। সমাজ, সংসার, শিষ্টতা, শালীনতা সম্পর্কে ও যৌনতার বোধে গিন্স্বার্গ ছিলেন একজন বেপরোয়া ও যথেচ্ছাচারী। নিজেকে সমকামী ঘোষণা করতে তাঁর দ্বিধা ছিল না। তবে আত্মবদ্ধ চরিত্রের মগ্ন উদাসীন বব ডিলান গিন্স্বার্গকে এড়িয়ে গেছেন। অবশ্য ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত গিন্স্বার্গের লেখা হার্ডল কাব্যটি ববের কবিভাষায় ও ভাবনায় নতুন চেতনা আনে। তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক এতটাই গুণগ্রাহিতাপূর্ণ ছিল যে, অনেকবার তাঁরা দুজন একমঞ্চে গান গেয়েছেন, পরস্পরের টানে। যদিও শেষ পর্যন্ত বব ছিন্ন করে বেরিয়ে আসেন গিন্সের মোহপাশ। তাঁর চরিত্রই হলো জলে নামব, জল ছিটাব, জল তো ছোঁব না-গোছের। স্বভাবনির্লিপ্ত শিল্পী তিনি। বৃহত্তর মানবভবিতব্য নিয়ে সবসময় ভাবিত তিনি। শিল্পের কোনো প্রসন্ন মুখ তিনি খোঁজেননি। তাঁর অন্বেষা ছিল বিশাল বন্ধনমুক্ত উদার মানবতা। প্রতিবাদই তো সব কথা নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আমেরিকার তরুণ সম্প্রদায় অনেকটাই ত্রস্ত হয়ে পড়ে বিট্দের ছন্নছাড়া ভাঙনবাদী যথেচ্ছ জীবনযাপনের নেশায়। এই বিট্ সম্প্রদায় লোকসংস্কৃতি বা লোকসংগীত সম্পর্কে একেবারেই উৎসাহী ছিল না। শিকড়ের প্রতি ততটা টান ছিল না তাদের। বরং খুব বেশি অনুরাগী ছিল তারা জ্যাজের। কাজে কাজেই সেই বিট্দের সংস্পর্শ ডিলান বরাবর উপেক্ষা করে গেছেন। গিন্স্বার্গের চিমত্মাধারা তাঁকে নাড়া দিলেও মর্মমূলে চিরচিহ্ন আঁকতে পারেনি।

আসলে বব ডিলান ছিলেন বাউল স্বভাবের – তাই বৈরাগ্যবাদী সন্ন্যাসী নন। ভেতরে ভেতরে সংসারীপনার দায় অস্বীকার করতে চাননি। দুবার বিবাহ, দুটি সমত্মান কিন্তু বিবিক্ত মেজাজের। অনেকেই লক্ষ করেছেন, সত্তরের দশকের পর ক্রমশ ডিলানের গানে প্রতিবাদের আঁচ কমে আসছে। ততদিনে দেশকালও তো বেশ বদলে গেছে। ঘটে গেছে তাঁর একটা সাংঘাতিক পথদুর্ঘটনা, মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পাড়ে যান। পুরো এক বছর সাত মাস কোনো অনুষ্ঠান করতে পারেননি। অবশেষে অনুরাগীদের সব সংশয় আর আশংকা ব্যর্থ করে বব ডিলান আবার অ্যালবাম বের করলেন ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে তিনখানি। শেষটির নাম ‘সেলফ পোর্ট্রেট’।

সঠিক হিসাবে বব ডিলান এখন ৭৭ বছরে পৌঁছেছেন। ৭৫ বছরে পেয়েছেন বিশ্বশ্রেষ্ঠ নোবেল পুরস্কার, সাহিত্যের জন্য – যা নিয়ে প–তরা দুভাগ হয়ে গেছেন। বিতর্ক তাঁকে কখনো ত্যাগ করেনি। এখন সম্ভবত থাকেন ক্যালিফোর্নিয়ার মালিয়ুতে। কেউ কেউ জাঁ লুক গঁদারের চলচ্চিত্রের সঙ্গে ডিলানের গানের অনুষঙ্গ টানেন। এ-কথা সত্যি যে, গঁদার তাঁর ফিল্মে ডিলানের গান প্রয়োগ করেছেন। ফরাসি ফিল্মেও এসেছে তাঁর গান। আশ্চর্য নয় যে, এ-সময়ের নিরীক্ষামূলক বাংলা গানে এসে গেছে ডিলানের গানের ভাবচ্ছায়া। সে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের গানেই হোক বা সুমন ও রূপমের গানেই হোক। কখনো তা সরাসরি, কখনো তা প্রচ্ছন্ন হয়ে।

এখন খানিকটা শ্রান্ত ও শমতাপ্রাপ্ত ডিলান-প্রতিভা নতুন কোনো গানের ঝড় তুলবেন এমন কেউ ভাবেন না, তবে তাঁর নোবেল স্বীকৃতি ডিলানের গানকে সাহিত্যমূল্যে কতটা গ্রহণযোগ্য করবে জানি না। অবশ্য সারাবিশ্বের বিশ্ববিদ্যা প্রাঙ্গণের খবর যদিও আমরা জানতে পারি না, তবে গর্বের কথা যে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের বিএ ক্লাসে ডিলানের তিনটি গান সিলেবাসভুক্ত। অর্থাৎ শুধু টেক্সট নয়, গান রচনার উৎসবার্তা, প্রতিবাদী স্বরও সেখানে জানানো হচ্ছে বিশ্বতোমুখী জ্ঞানতত্ত্বের পাঠে। এমএ ক্লাসের ইংরেজি পাঠক্রমে ‘Poetics and Politics of Rock Music’ প্রসঙ্গ চর্চায় ডিলানের সমগ্র সংগীতচর্চা পড়ানো হয়। প্রকারান্তরে সেটাও তো তাঁর গানের কবিতার ভাষ্য।

কিন্তু শেষ বিচারে ডিলানকে ও তাঁর সৃষ্টিকে Urban Folk পর্যায়ে ফেলে বিচার করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে – যা পরিবেশিত হওয়ার পদ্ধতি একক কণ্ঠে (ব্যান্ড গান নয়) যন্ত্রবাদ্য নিয়ে বা ইলেকট্রিক গিটার সহযোগে। বলা হয়েছে, ‘Urban folk was extremely political – the songs had basic politics and direct, angry lyrics।’ তাই বলে কেউ যেন সাবেক কালের folk ধারণা নিয়ে ভেবে না বসেন যে, ডিলানের গানের জঁর সেই
অজ্ঞাত রচয়িতার বা community composition-এর সর্বকণ্ঠের উপযোগী লোকগীতি। এতে ব্যক্তিত্বে নিজস্ব নির্মাণ প্রক্রিয়া এবং ডিলানের পরিবর্তমান মনের ইতিহাস ধরা আছে। সবাই বুঝবেন বেস্নায়িং উইন্ড আর রোলিং স্টোন একই মানুষের লেখা, কিন্তু একই মানসপ্রক্রিয়ার নয়।

সবশেষে বলা দরকার, আমরা folk বা লোক বলতে যা বুঝি, অর্থাৎ কৃষিনির্ভর গ্রামিক উদ্ভাসন আর ডিলানদের folk এক নয়। লোক শব্দের তাৎপর্য বিষয়ে প্রথম প্রশ্ন ওঠে রাশিয়ায়, ষাটের দশকে সেই প্রশ্ন ওঠে আমেরিকায়। রুশরা folk অর্থে লোক না বলে বলতে চাইলেন Narod, যার মানে জনগণ। জার্মানিতে ব্রেখ্ট প্রস্তাব দেন জার্মান Volk (লোক) না বলে বলা হোক Bevolkerung অর্থাৎ population। এই ব্যাপক দ্যোতনার বব ডিলান হলেন জনসাধারণের মুখপাত্র। অজ্ঞাত, অবজ্ঞাত, গ্রামনিবাসী সরল হৃদয় লোকগীতিকার তিনি হতে চাননি। তাঁর বয়ান সব অর্থে জনতাকে ঘিরে। যার শীর্ষে তাঁর নিজস্ব অনুভবের উৎসার। নগরজীবন তাঁর ভিত্তি, নাগরিকরাই তাঁর লক্ষ্য। সেই অর্থেও তিনি ফোক-রিভাইভালিস্ট। r

Leave a Reply

%d bloggers like this: