বহুমাত্রিক শিল্পী

লেখক:

শরীফ আতিক-উজ-জামান
গত ২০ মে চিরবিদায় নিলেন এদেশের আরেকজন খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ, যাঁর বহুমাত্রিক নির্মাণে ঋদ্ধ হয়েছে এদেশের চিত্রকলার জগৎ। এই চলে যাওয়াকে হয়তো অকালপ্রয়াণ বলা যাবে না, বরং পরিণত বয়সেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তারপরও একজন মহান শিল্পীর এ-মৃত্যু শুধু শারীরিক নয়, এ-মৃত্যু সৃষ্টিশীলতারও বটে। তাই তাঁর চলে যাওয়া দেশ ও জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। এদেশের অনেক খ্যাতিমান চিত্রশিল্পীর মতো সফিউদ্দীনের শিল্পশিক্ষা কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুলে। দেশবিভাগ-পূর্ব বাংলায় তখন ওই একটাই ছিল স্বীকৃত শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তখনকার দিনে মুসলিম পরিবারের সন্তানদের শিল্পকলা অধ্যয়নের ক্ষেত্রে সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা ছিল প্রবল; কিন্তু সফিউদ্দীনের ভবানীপুরের একান্নবর্তী পরিবার অতিরক্ষণশীল ছিল না। তাঁর এক বোন সংগীতে পারদর্শী ছিলেন এবং তিনি নিজে সেতার বাজানো শিখতেন। তবে সংগীতের প্রশ্নে আপত্তি না থাকলেও শিল্পকলা শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিবারের কোনো কোনো সদস্যের যথেষ্ট আপত্তি ছিল। ১৯৩৬ সালে যখন তিনি আর্ট স্কুলে ভর্তি হলেন তখন সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন বলে বিবেচিত ভাস্কর্য বিভাগে কাজ করতে চাইলেন। কিন্তু তাঁর এ-সিদ্ধান্তে পরিবারের কয়েক সদস্যের মাঝে পরিষ্কার অসন্তোষ দেখা গেল। সফিউদ্দীন মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন। এ-সময়ে তাঁর মা পাশে এসে দাঁড়ান, কারণ সফিউদ্দীনের পিতৃবিয়োগ হয় মাত্র ছয় বছর বয়সে। ১৯২২ সালের ২৩ জুন জন্মের মাত্র দুবছরের মাথায় তাঁর সাব-রেজিস্ট্রার পিতা মতিনউদ্দীন আহমেদ চাকরি থেকে অবসরে যান এবং এর চার বছর পর ১৯২৮ সালে পরলোকগমন করেন। এই পুরোটা সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শে হাওয়া বদলের জন্য তাঁকে একবার পুরীর সমুদ্রসৈকতে, আরেকবার পুরুলিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশে নিয়ে যাওয়া হয়; কিন্তু তাতেও কোনো সুফল মেলেনি। ফলে পিতৃহীন সফিউদ্দীনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেওয়ার জন্য মা ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। মায়ের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা সত্ত্বেও আর্ট স্কুলে তাঁর লেখাপড়া সুষ্ঠুভাবে চলতে পারেনি আর্থিক দৈন্যের কারণে। এখানে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাঁকে পরিবারের জন্য কিছু উপার্জন করতে হতো। ফলে মন লাগিয়ে লেখাপড়া করা তাঁর জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এ-সময় তাঁর মাঝে যথেষ্ট আস্থাহীনতা পরিলক্ষিত হয়। মা ছাড়া তখন আর যে-লোকটি তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি তাঁর শিক্ষক আবদুল মঈন। তাঁর ছিল শিল্পকলা-বিষয়ক বইয়ের এক দুর্লভ সংগ্রহ। প্রিয় শিক্ষকের লাইব্রেরি ব্যবহারের অবাধ সুযোগ পেয়ে সফিউদ্দীন তাঁর হারানো আস্থা ফিরে পেতে থাকেন। ড্রাফটসম্যান হয়ে যেনতেন একটা চাকরিলাভের যে-আশা তিনি মনে মনে পোষণ করতেন, তাকে ঝেড়ে ফেলে নতুন করে শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে লাগলেন। নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করলেন। আর্ট স্কুলে এর মধ্যেই প্রথম বর্ষ পার করেছেন। দ্বিতীয় বর্ষে খুঁজে পাওয়া গেল সম্পূর্ণ নতুন এক সফিউদ্দীনকে। স্কেচবুক আর বন্ধু নরেনকে নিয়ে ছুটতে লাগলেন গঙ্গার ধারে, খিদিরপুর ডকে, শিয়ালদহ রেলওয়ে স্টেশনের কাছে ছবি অাঁকতে, ছুটতে লাগলেন কাঁকুরগাছিতে শিক্ষক প্রহ্লাদ কর্মকারের স্টুডিওতে। আবার কখনো মুরলি ধর টালী, সত্যেন ঘোষাল কিংবা আদিনাথ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে গ্রামে ছুটলেন আউটডোর করতে। কিন্তু সফিউদ্দীনের এই নব-উদ্যমে আবার জোরেশোরে একটা ঝটকা লাগল, যখন মাত্র ২৪ বছর বয়সে আবদুল মঈন টাইফয়েডে ভুগে মৃত্যুবরণ করলেন। তাঁর অকালমৃত্যু সফিউদ্দীনকে আরো একবার শূন্য করে দিলো। কিন্তু শিল্পসৃষ্টি আর নবপ্রাণ সৃষ্টির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। নিত্যনতুন সৃষ্টির প্রাণস্পর্শে তিনি আবার জেগে উঠলেন।
আর্ট স্কুলের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁকে শুধু শিল্পী হিসেবে প্রস্ত্তত করেছিল তা-ই নয়, শিল্প ও নন্দনতত্ত্বের জ্ঞানেও সমৃদ্ধ করেছিল। যে-কোনো শিল্পীই তাঁর আপন শৈলী খুঁজে পাওয়ার আগে প্রাতিষ্ঠানিক শৈলীর প্রতি অনুগত থাকেন। সফিউদ্দীনও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। সেইসঙ্গে অবন ঠাকুরের বেঙ্গল স্কুল অব আর্টের শৈলীর প্রভাব পড়েছিল তাঁর ওপর। কিন্তু দ্রুত তিনি সে-প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন। প্রাসঙ্গিক হবে উল্লেখ করা যে, শিল্পমাধ্যম হিসেবে তেলরং, জলরং আর স্কেচই নয়, প্রিন্ট মেকিংয়ের একাধিক পদ্ধতিতে তিনি যথেষ্ট দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। এনগ্রেভিং, এচিং, অ্যাকুয়াটিন্ট ও উডকাটে তিনি অত্যন্ত দক্ষ ও সাবলীল ছিলেন।
আর্ট স্কুলে দ্বিতীয় বর্ষে ১৯৩৭ সালে তিনি প্রায়ই দুমকায় যেতেন ছবি অাঁকতে। সাঁওতালদের মৃত্তিকালগ্ন জীবন তাঁকে টানত। একেবারে প্রকৃতির কোলে, প্রকৃতির স্নেহে তারা লালিত-পালিত। তাদের নিয়ে অাঁকা তাঁর স্কেচগুলো যথেষ্ট প্রশংসা লাভ করেছিল। ‘শালবন’, ‘বনপথ’, ‘ময়ূরাক্ষীর কাছে’, ‘সাঁওতাল নারী’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ছবি। অবতক্ষণ পদ্ধতিতে ড্রাই পয়েন্টে করা ‘শালবন’ তাঁর একটি অসাধারণ ছবি। বিশাল উঁচু শালগাছগুলো নিবিড়ভাবে সন্নিবিষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ফাঁক দিয়ে দূরে দিগ্বলয় নজরে পড়ছে। একটি কালো রেখার দ্বারা তাকে বোঝানো হয়েছে। গাছের ফাঁকে ফাঁকে পায়েচলা পথ ধরে মহিষ বা গরু চরাতে নিয়ে যাচ্ছে সাঁওতাল বালক। মাথায় পাতা দিয়ে তৈরি গোল ছাতা। ছবির বিষয়গত বিশেষত্ব হলো নজরকাড়া প্রকৃতি, সাঁওতালদের সহজ-সরল জীবন আর শৈলীগত বিশেষত্ব হলো এর আলো-ছায়ার কাজ। মেঠোপথে গাছের ছায়া পড়েছে, অগ্রসরমান পশুর ছায়াও সে-গাছের সঙ্গে মিশেছে। অসাধারণ দক্ষতায় ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে। পরিপ্রেক্ষিত নির্মাণেও কুশলতার ছাপ পরিদৃষ্ট।
‘বনপথ’ ছবিটাও সাঁওতাল জীবনের দৈনন্দিন চিত্র। পাশাপাশি অবস্থিত দুটি মোটা গাছের গুঁড়ির অংশ পরিদৃষ্ট হচ্ছে, আর তার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ঘোড়ায় চড়ে ছাতা মাথায় দিয়ে উদোমগায়ে একজন কোথাও যাচ্ছে। ঘোড়ার পিঠে আরো কয়েক রকমের মালপত্র চাপানো। পাশে একটি কুকুর হেঁটে চলেছে, দূরে মায়ের পিছু পিছু উলঙ্গ সাঁওতাল বালক, পেছনে বাকে করে মাল নিয়ে হেঁটে চলেছে সমর্থ সাঁওতাল যুবক। আটপৌরে সাঁওতাল জীবন, আলো-ছায়ার বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে অসাধারণ দক্ষতায়। উডকাটে ১৯ x ৯ সেন্টিমিটারের আরেকটি দারুণ ছবি ‘বাড়ির পথে’। ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যার রেশ ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে, গাঁয়ের পথে। সারি সারি দন্ডায়মান তালগাছের ওপর গভীর হয়ে পড়েছে সে-ছায়া। মেঠোপথ বেয়ে বাড়ি ফিরে চলেছে মহিষের দল, তার একটির পিঠের ওপর বসে আছে এক বালক, সবশেষে ছাতা মাথায় চলেছে আরেকজন। সন্ধ্যার সময় ছাতার প্রয়োজনীয়তা না থাকলেও পাতার তৈরি ছাতা বন্ধ করে রাখার উপায় নেই। তাই কাঁধের ওপর রেখেই বয়ে নিতে হয়। আলোছায়া ও পরিপ্রেক্ষিত নির্মাণে পরিমিতিবোধ রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে একটি অসাধারণ কম্পোজিশন।
১৯৪৭-এর দেশবিভাগ অজস্র মানুষের মতো সফিউদ্দীনের জীবনেও এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা। দাঙ্গার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁর। তাঁদের ভবানীপুরের বাড়ির পাশে ঘটে যাওয়া এক দাঙ্গা দেখে তিনি ভয়ে পালিয়ে পার্কসার্কাসে এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নেন। তখন তাঁর কতিপয় আত্মীয় দেশত্যাগ করে পূর্ববাংলায় চলে আসেন। সফিউদ্দীন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। আর্ট স্কুলের শিক্ষকতার চাকরি, শিল্পী হিসেবে অর্জিত সম্মান, সুধীমহলে পরিচিতি – এসব ছেড়ে ঠিকানার খোঁজে সম্পূর্ণ অজানা-অচেনার উদ্দেশে পা বাড়ানো খুব সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। সফিউদ্দীনকে সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। একপর্যায়ে তিনি ঢাকা চলে এলেন। কলকাতার চাকরিতে অপশন দিয়ে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে শিল্পশিক্ষক হিসেবে যোগদান করলেন। পরে জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে একত্রে আর্ট ইনস্টিটিউশন গড়ে তোলার কাজে লেগে যান। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, দেশবিভাগ নিয়ে সফিউদ্দীনের কোনো উল্লেখযোগ্য ছবি নেই, বরং ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলন, ’৫৪ সালের বন্যা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে তিনি বিমূর্তধারার ছবি এঁকেছেন। ৫০ x ৩৭ সেন্টিমিটারে অ্যাকুয়াটিন্টে করা ‘নেমে যাওয়া বান’ বা ৫০ x ২৫ সেন্টিমিটারে মিশ্র মাধ্যমে করা ‘জলের নিনাদ’ নামক বিমূর্ত ছবি দুটির উল্লেখ করা যায়। প্রথম ছবিটিতে শস্যদানার মতো উপরিতলে (Granular Surface) অবতক্ষণের মাধ্যমে সৃষ্টি করা জ্যামিতিক কম্পোজিশন। কালো জলের মাঝে সাদা নৌকা। রঙের বুনটে দক্ষতা সহজেই মন কাড়ে। ছায়াসম্পাতের বিষয়টি তো আছেই।
‘মাছধরার সময়’ শিরোনামে তাঁর একাধিক ছবি দেখতে পাই, যার একটি বিমূর্তধারার কাজ। অজস্র সরু ও মোটা জ্যামিতিক রেখায় জালের অস্তিত্ব বোঝানো হয়েছে, তার ফাঁকে ফাঁকে মাছ। কম্পোজিশনের ক্ষেত্রে মিশ্র মাধ্যমে করা ‘জলের নিনাদে’র সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। অন্য ছবিটাও কিউবিক আদলে, তবে সেখানে একটি ফিগার আছে জাল ফেলার ভঙ্গিতে। তার শরীরের গড়নও জ্যামিতিক আদলে গড়া। ‘১৯৫১-এর দিকে তাঁর ছবিতে দেখা দিলো জ্যামিতি, ফিগর ভেঙে দিলেন, তাদের শারীর সংস্থানের নানা কোণ তাঁকে আমন্ত্রণ জানাল, দৃশ্যমান বাস্তব শরীর ভেঙে কাঠামো গড়ে তুললেন, রঙে আনলেন গাঢ়তা।’১ মাছধরা ও জাল বিষয়ে তাঁর একাধিক ছবি আছে দেখতে পাই। ‘মাছধরার সময়’, ‘ক্রুদ্ধ মৎস্য’, ‘নীল জাল’, ‘মাছধরার জাল’ ইত্যাদি। মাছ ও জাল তাঁর কাছে কোনো বিশেষ প্রতীকী অর্থ বহন করে বোধহয়। এমনিতে মাছের অনেক প্রতীক আছে। পোস্ট-অ্যাপোস্টোলিক যুগে মাছকে খ্রিষ্ট বৈশিষ্ট্যের প্রতীক মনে করা হতো। প্রাচীন রোমের ভূগর্ভস্থ সমাধিক্ষেত্রের গায়ে হামেশাই মাছের ছবি অাঁকা থাকত। মাছ বা Fish-এর গ্রিক প্রতিশব্দ হলো Ichthus, যার প্রতিটি অক্ষর এক একটি শব্দকে উপস্থাপন করে : I (Iesous – Jesus), ch (christos – christ), th (theos – of God), u (huios – son), s (soter – saviour), যা একসঙ্গে করলে দাঁড়ায়, I believe that Jesus Christ is the son of God and my saviour. ডারউইনের সঙ্গে মাছের প্রতীক জড়িত। মাছের ছবির সঙ্গে ছোট ছোট পা যুক্ত করা হয়েছে যার অর্থ দাঁড়ায়, বিবর্তনের মাধ্যমে মাছ পায়েচলা প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু সফিউদ্দীনের মাছ উৎসর্গ, জীবন ও দ্রোহের প্রতীক। জালে আটকাপড়া মাছ তার জীবনের বিনিময়ে পুষ্টি জোগাচ্ছে, আর তা বিক্রি করে জেলে পাচ্ছে তার জীবন ধারণের রসদ। তবে ‘অ্যাংরি ফিশ’ দ্রোহের প্রতীক। মানুষের অবদমিত ক্রোধের প্রতীকী প্রকাশ। কিন্তু এ-প্রসঙ্গে শিল্পী রফিক হোসেন আবার সম্পূর্ণ অন্য কথা বলেন :
জাল ও মাছগুলো জেলেদের জীবনের প্রতীকী উপস্থাপনা নয় বা কোনো তথ্যপ্রকাশ করে না বা বাণী বহন করে না। বিষয় একটি ভিত্তি মাত্র। এগুলো আসলে নকশার উপাদান ও উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে প্যাটার্ন সৃষ্টির অলঙ্কার হিসেবে।২
যামিনী রায়, কামরুল হাসান এবং জয়নুল আবেদিনসহ অনেকেই লোকজ ফর্ম নিয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু সফিউদ্দীন সরাসরি লোকজ ফর্ম গ্রহণ করেননি, তবে লোকজ জীবনের মূল সুর বা মূল উপজীব্য (motif) গ্রহণ করেছেন, আর তা চিত্রায়ণে পাশ্চাত্য ফর্ম গ্রহণ করেছেন। মূল গঠন ভেঙে ফেলে কিউবিক গড়নে বিষয়কে রূপ দিতে চেয়েছেন। এ-প্রসঙ্গে মইনুদ্দীন খালেদ মন্তব্য করেছেন :
সফিউদ্দীন আহমেদের কাজে ফর্ম পরিণামে যে জ্যামিতিক শুদ্ধতা পেয়েছে এবং এই সূত্রে যে স্নিগ্ধতা এসেছে তাঁর কাজে তাতে করে লোকশিল্পের আত্মীয়তা হারিয়েছে। আপাতদৃষ্টে দ্বিমাত্রিক পরিমার্জনার কারণে সফিউদ্দীনের কোনো কোনো কাজ লোকশিল্পের রীতির অনুগামী বলে মনে হয়।৩
তাঁর ‘গুণটানা’ একটি অসাধারণ বিমূর্ত চিত্র। এনগ্রেভিংয়ে করা ছবিটিতে মনে হয় যেন একটি রেখাই কোথাও না ভেঙে অজস্র হিজিবিজি টানের মাধ্যমে গুণটানা মাঝি দুজনের আদল নিয়েছে। রেখাটি কোথাও সরু আবার কোথাও মোটা হয়ে মাঝিদের দেহরেখা (contour) ফুটিয়ে তুলেছে। বাদি রং নীল, বিবাদি রং সবুজ, আর সম্বাদি হিসেবে লাল, কালো, হলুদ ও সাদা ব্যবহার করে সামঞ্জস্য আনা হয়েছে। বাঁ-পাশের ওপরের দিকে একটু জায়গা ছেড়ে দেওয়ায় আকাশের অস্তিত্ব সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। মাঝখানে হলদে চাঁদ। রঙের সর্বজনীন অর্থের পাশাপাশি আঞ্চলিক এমনকি ব্যক্তিগত অর্থও রয়েছে। ধীমান দাশগুপ্ত তাঁর রঙ বইয়ে রঙের যে প্রতীকী অর্থ তুলে ধরেছেন সেখানে হালকা নীল রোমান্টিকতা ও অসীমতার প্রতীক, লাল প্রেম, হলুদ প্রজ্ঞা, সাদা শুভ্রতা ইত্যাদি। এই তেলরংটিতে বর্ণের ঐক্য ও মজবুত টেক্সচারের কারণে রাতের সজীব রোমান্টিক আবহ ফুটে উঠেছে। ‘জ্যামিতিকতা তাঁর ছাপচিত্র ও তৈলচিত্র দুয়ের গুণ। তাঁর চিত্রে ছন্দ আসছে প্রাচ্য ঘরানা থেকে। এমনকি জ্যামিতিকতার মধ্য দিয়ে যে-টেনশন সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে আছে লোকশিল্পসুলভ সহজ ও প্রাকৃত ছন্দ, যে-ছন্দ জীবনের চলমান গতির সঙ্গে সহজানুগ।’৪
সফিউদ্দীনের আরেকটি বিখ্যাত কাজ ‘একাত্তরের স্মরণে’। তাম্রতক্ষণে ২০ x ৩২ সেন্টিমিটারের কাজটিতে দেখতে পাই নানা আকৃতির অজস্র চোখ। কোনো চোখে প্রকাশ পাচ্ছে ক্রোধ, কোনো চোখে বিহবলতা, কোনো চোখে হতাশা, কোনোটিতে বিস্ফোরণ, আবার কোনোটিতে অশ্রুবিন্দু। ধারণা করি, নারী, পুরুষ, শিশু, যোদ্ধা – সব ধরনের মানুষের চোখের সমাবেশ ঘটেছে এখানে। ছবিটিতে শুধু মানুষের মিশ্র অনুভূতিই নয়, একটি বিক্ষুব্ধ সময়কে ধরে রাখার প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়, যে-সময়টাতে বাঙালি লড়ছিল স্বাধীনতার জন্য। চোখেরও নানা প্রতীকী অর্থ আছে। অনেক সংস্কৃতিতে চোখকে বিবেকের জানালা মনে করা হয়। খোলা চোখ সচেতনতা ও জেগে ওঠার প্রতীক। চোখ সম্পর্কিত একটি সর্বজনীন প্রবাদ হলো, চোখ বিবেকের আরশি। চোখ আমাদের জ্ঞান দেয়, অভিজ্ঞতা দেয়, পাশাপাশি চোখের মাধ্যমে আমাদের ভেতরের অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়। আমাদের আবেগ ও ভাবনা ভাষা লাভ করে। ‘তিনি বস্ত্তর ভেতরের বিন্যাসকে বিশেষ সতর্কতায় আমাদের চোখের কাছে প্রদর্শন করেন। রহস্যের ব্যাকরণ উন্মোচন করেন তিনি স্নিগ্ধ গ্রাফিক্সে। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রেখার বুনট, জাল, জালিকা, রেখার বৃত্তচাপের মতো প্রসারণ, সব মিলিয়ে নানা বাদ্যযন্ত্রের অর্কেস্ট্রেশন যেন তাঁর শিল্প।’৫ গ্রিক ও রোমান জাহাজগুলো সবসময় চোখ প্রতীক ব্যবহার করে এ-বিশ্বাস থেকে যে, কোনোপ্রকার কুদৃষ্টি থেকে এই চোখ জাহাজকে রক্ষা করবে। সফিউদ্দীনের এ-চোখ জাগ্রত বাঙালির চোখও হতে পারে। চোখ নিয়ে তিনি আরো ছবি এঁকেছেন। ভাষা-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে চোখ নিয়ে ’২১শের স্মরণে’ তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। একটি মানুষের অবয়ব, যার চোখে ফুটে উঠেছে বিজয়ের অভিব্যক্তি। এই বিজয় মানুষের বিজয়, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অর্জিত বিজয়। অনেক জড়জীবন কিংবা স্টাডিতেও এই চোখ প্রতীক দেখতে পাই। অ্যাকুয়াটিন্টে করা সূর্যমুখী ফুল চোখের আকার নিচ্ছে। কী বোঝাতে চান শিল্পী? সুন্দর চোখ মেলে তাকাচ্ছে, দেখছে বিপুলা পৃথিবী?
সফিউদ্দীন জীবনঘনিষ্ঠ শিল্পী। তাঁর কাজে মানুষ, প্রকৃতি, প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে সম্পর্ক, ব্যক্তিগত অনুভূতি, সময়, রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ, প্রান্তিক মানুষের জীবন ইত্যাদি বিষয়বস্ত্ত হিসেবে এসেছে। বর্ণ প্রক্ষেপণে সনাতন ও প্রচলিত প্রতীকী অর্থের সঙ্গে তাঁর নিজস্ব অনুভূতির সম্মিলন দেখতে পাওয়া যায়। এ-প্রসঙ্গে চিত্রশিল্পী মতলুব আলীর মন্তব্য উল্লেখযোগ্য :
তাঁর কাজের বিশেষ লক্ষণীয় উপজীব্য বিষয় বাংলার নিসর্গ-প্রকৃতি, সেই প্রেক্ষিতে পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতাসহ মানুষ। অনস্বীকার্য যে, বাস্তবানুগ অভিজ্ঞতালব্ধ জীবনবাদি ধ্যান-ধারণার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর শিল্পায়নে যদিও প্রয়োগশৈলী ও আঙ্গিকের দিক থেকে তা ছিল প্রধানত বিমূর্ত ও প্রতীকী ধারার নিকটবর্তী।৬
তীব্র উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার তিনি সবসময়ই এড়িয়ে চলেছেন। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে গাঢ়, চাপা রংই তাঁর চিত্রে বাদি ও বিবাদি রঙের ভূমিকা গ্রহণ করে। ঐকতান সৃষ্টির জন্য সম্বাদি হিসেবে উজ্জ্বল রঙের শরণ নেন তিনি। ছায়াসম্পাতে পরিমিতিবোধের পরিচয় পাওয়া যায়, বুনটে দক্ষতার ছাপ সুস্পষ্ট। সবকিছুর ভারসাম্য তাঁর ছবিকে অনন্যতা দান করেছে। লোকোমোটিফ নিয়েছেন; কিন্তু পাশ্চাত্য ফর্মকে আশ্রয় করে তাকে নির্মাণ করেছেন। দৃষ্টিনির্ভর সরল উপস্থাপনা এড়িয়ে যে-প্রতীক নির্মাণ করেছেন তা তাঁর ছবিকে নতুন ব্যঞ্জনা দান করে। ‘চিত্রে বিষয়ের খবরদারি কমিয়ে আঙ্গিককে গুরুত্বপূর্ণরূপে বিবেচনার বিংশ শতাব্দীয় শিল্পদর্শনকে এদেশের শিল্পধারায় রোপণ করার কাজে পথিকৃৎদের অন্যতম সফিউদ্দীন আহমেদ, এ-কথাটি আমরা উচ্চকণ্ঠে কখনো বলিনি।’৭ ছাপাই কাজের একাধিক মাধ্যমে তাঁর দক্ষতা বিস্ময়কর। রং, তুলি, পেনসিল, প্যাস্টেল ইত্যাদি মাধ্যম অপেক্ষা এচিং, অ্যাকুয়াটিন্ট ইত্যাদি পরিশ্রম ও সময়সাপেক্ষ মাধ্যম। কিন্তু একজন পারফেকশনিস্ট সফিউদ্দীন সেসব কাজে সাবলীলতা ও দক্ষতা অর্জন করেছেন কঠোর অধ্যবসায় ও শৃঙ্খলানুবর্তিতার মাধ্যমে।
সফিউদ্দীন অত্যন্ত গোছালো স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কাপড়-চোপড়ে ধোপদুরস্ত থাকতে পছন্দ করতেন। শিল্পীরা যেমন একটু এলোমেলো খামখেয়ালি হয়ে থাকেন, তিনি তেমন ছিলেন না। প্রচন্ড নিষ্ঠা ও একাগ্রতা তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু নিজের ছবির প্রদর্শনী করার ব্যাপারে তাঁর এত অনীহা ছিল কেন, সে-বিষয়টির ঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তাঁর মতো শিল্পীর ছবি দেখার সুযোগ শুধু দর্শক নয়, উত্তর প্রজন্মের শিল্পীদের জন্যও বিরল এক অভিজ্ঞতা; কিন্তু সেখানে তিনি সবাইকে বঞ্চিতই করেছেন। দীর্ঘ এই শিল্পীজীবনে মাত্র দুটি প্রদর্শনী তাঁর মতো উঁচুমাপের শিল্পীর ক্ষেত্রে ঠিক মানানসই নয়। তিনি কি চাইতেন শিল্পবোধহীন মানুষ যেন তাঁর ছবি না দেখেন? হতে পারে। তাঁর পুত্র আহমেদ নাজির জানাচ্ছেন –
ছবি অাঁকা তাঁর কাছে ছিল ধ্যানের মতো, নিজের ছবিকে তিনি নিজের সন্তানের মতো মনে করতেন। তাই ছবি কেনার জন্য পকেটভর্তি টাকা নিয়ে এসেও বহুজনকে ফিরে যেতে হয়েছে তাঁর ঘর থেকে। শুধু তাই নয়, নগদ টাকায় ছবি কিনতে আগ্রহী ওই লোকগুলোকে তিনি ছবি দেখতে পর্যন্ত দেননি। তাই বলে আবার অভদ্রের মতো তড়িয়েও দেননি কাউকে। ছবি কিনতে আসা ওইসব লোকজনকে অন্তত এক কাপ চা দিয়ে আপ্যায়িত করতেন।৮
যাঁরা বেশিমাত্রায় বাণিজ্যিক চিন্তা করেন না তাঁরাই এভাবে ভাবতে পারেন। নিজের একান্ত ভালোবাসার এই নান্দনিক চর্চাকে অবাধে বিকিয়ে অঢেল উপার্জনের পথে তিনি যাননি। তাঁর ছবি যার-তার ঘরের শোভাবর্ধন করুক তা তিনি চাননি। এটা শিল্পী হিসেবে তাঁর অনন্যসাধারণ এক বৈশিষ্ট্য। নিরন্তর সাধনার মাধ্যমে নিজের সৃষ্টিকে নতুন নতুন মাত্রা দানের প্রচেষ্টায় নিমগ্ন ছিলেন এই নিভৃতচারী শিল্পী। নীরবে সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি আমাদের ভরিয়ে দিয়েছেন; কোনো হই-হুল্লোড় নেই, বাগাড়ম্বর নেই, দেখানেপনাও নেই। আত্মনিমগ্নতা এই শিল্পীর বিরাট এক বৈশিষ্ট্য। এ সম্পর্কে তাকির হোসেন তাঁর একটি ইংরেজি নিবন্ধে বলছেন :
Well known for his soft-spoken, well-mannered personality, Saifuddin led the life of a recluse, far away from the material world and clamor that accompany fame for which he never hankered after. I have never seen him at any social and cultural gatherings or fashionable parties. He preferred to work at home, listening to music and reading. He liked the company of those who were close to him in temperament, although some of them differed with him in terms of tastes and viewpoints.৯
তাঁর প্রয়াণ আমাদের শিল্পের জন্য বিরাট এক ক্ষতি।

তথ্যসূত্র

১. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, চিত্রশিল্প বাংলাদেশের, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, জুলাই ১৯৭৪, পৃ ৪৯।
২. রফিক হোসেন, বাংলাদেশের শিল্প-আন্দোলনের ইতিহাস, ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ, ঢাকা, আগস্ট ২০০৭, পৃ ১৭২।
৩. মইনুদ্দীন খালেদ, ‘পঞ্চাশের দশক আধুনিকতার বিবিধার্থ’, কালি ও কলম, ঢাকা, এপ্রিল ২০০৮, পৃ ১৭।
৪. বুলবন ওসমান, ‘বাংলাদেশের চারুকলার এক স্তম্ভের তিরোধান’, শিলালিপি, কালের কণ্ঠ, ২৫ মে, ২০১২, পৃ ১২।
৫. মইনুদ্দীন খালেদ, ‘পঞ্চাশের দশক আধুনিকতার বিবিধার্থ’, কালি ও কলম, ঢাকা, এপ্রিল ২০০৮, পৃ ২০।
৬. মতলুব আলী, ‘শিল্পী সফিউদ্দীন : প্রকৃতি ও জীবনবাস্তবের প্রতীকী রূপকার’, সংবাদ সাময়িকী, সংবাদ, ঢাকা, ২৪ মে, ২০১২, পৃ ১৭।
৭. আবুল মনসুর, ‘দৃশ্যকলার সন্ধিক্ষণ; সফিউদ্দিনের গুরুত্ব’, শিল্প ও শিল্পী, প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, নভেম্বর ২০১১, পৃ ১০।
৮. আহমেদ নাজির, থামার সূত্রটা জানা ছিল শিল্পগুরু সফিউদ্দিন আহমেদের।
৯. Takir Hussain, ‘Safiuddin Ahmed : A Purist Artist’, Dhaka Courier, vol 28, Issue 46, June 1, 2012. 