বাংলাদেশে ব্রেখ্ট চর্চা : আলোচনা, পর্যালোচনা এবং অপূর্ণতা

প্রথম কথা

ব্রের্টল্ট ব্রেখ্ট (Eugen Berthold Friedrich Brecht, 1898-1956) নাম নিয়ে একটি আশ্চর্যরকমের বিভ্রান্তিতে আমরা আছি। অবশ্য বিদেশি যে-কোনো ভাষার যে-কোনো নাম নিয়েই আমরা বিভ্রান্তিতে পড়ি। তার প্রথম কারণ ভিনদেশি ব্যক্তি বা স্থানের নামের ক্ষেত্রে পত্রিকাগুলি এক এক নামের এক এক অক্ষর সহযোগে শব্দ তৈরি করে পত্রিকায় ছাপায়; দ্বিতীয় কারণ, লেখক-গবেষকগণও তাঁদের রচিত প্রবন্ধ-নিবন্ধ বা গবেষণাপত্রে ব্যক্তিত্বদের নামের বানান এক এক রকম লিখে থাকেন। ব্রের্টল্ট ব্রেখ্টের ওপর লিখতে গিয়ে তাঁর নামের বানান-বহর দেখে আমি সত্যিকার অর্থেই হতভম্ব হয়ে গেছি। নির্দিষ্ট লেখক-গবেষকদের নাম উল্লেখ না করে এ পর্যন্ত ব্রের্টল্ট ব্রেখ্টের নামের বানান তাঁদের বিভিন্ন লেখাতে যতগুলি পেয়েছি, তা উল্লেখ করছি – ‘বের্টোল্ট ব্রেখ্ট’, ‘বের্টোল্ট ব্রেখ্ট্’, ‘বের্টোল্ট ব্রেখট্’, ‘বের্ট্রোল্ট ব্রেখট’, ‘বের্টোল্ট ব্রেশট’, ‘ব্রের্টোলট ব্রেখট’, ‘বেটোল্ট্ ব্রেখ্ট’, ‘বের্টল্ট ব্রেখ্ট’, ‘বের্টল্ট ব্রেখ্ট্’, ‘বেরটল্ট ব্রেখট’, ‘বেরটল্ট ব্রেখশট’, ‘ব্রেটল্ট ব্রেখট’, ‘বেট্রল ব্রেখট’, ‘ব্রের্টল্ট ব্রেশট’, ‘বের্টল্ট ব্রেশট’, ‘বের্টল্ট ব্রেশ্ট’, ‘ব্রেটল্ট ব্রেশট’, ‘বার্টল্ড ব্রেশট’, ‘বার্টোল্ট ব্রেশট’, ‘বেট্রল ব্রেষ্ট’, ‘ব্যেরথল ব্রেখষ্ট’, ‘ব্রেষ্ট’, ‘ব্যার্ট ব্রেষ্ট’। আপাতত ২৩টি। মাথা ঝিম মেরে যাওয়ার মতো অবস্থা। বিষয়টিকে অতীব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে, অনেকটা দিশেহারা অবস্থায় আমার এ-লেখায় ব্রের্টল্ট ব্রেখ্ট নামটিই ব্যবহার করেছি।

দুই

বাংলাদেশে মঞ্চনাটকের পাণ্ডুলিপির বেশ অভাব – সে যেমনই হোক, মৌলিক, নাট্যরূপ বা অনুবাদ-রূপান্তর। এখানে দলীয় ভিত্তিতে নাট্যকার তৈরি হয় বা নাটক রচিত হয়। নাট্যকারগণ প্রথমেই তাঁর নিজ দলকে পাণ্ডুলিপি সরবরাহ করেন। কেবল বিশেষ অনুরোধেই নাট্যকারগণ অন্য দলের জন্য নাটক লেখেন। এ-পর্যায়ে খ্যাতিমান নাট্যকারদের পাণ্ডুলিপি পাওয়া বেশ কঠিন। খ্যাতিমান নাট্যকারগণ তাঁদের দলীয় মঞ্চায়ন-পরবর্তী অন্য নাট্যদলগুলি যদি পাণ্ডুলিপির আকাক্সক্ষা পোষণ করে, তবেই পছন্দমতো দলে পাণ্ডুলিপি সরবরাহ করেন। অর্থাৎ আমাদের
এ-ভূখণ্ডে মৌলিক নাটকের একটি হাহাকার চিরন্তনরূপেই বিরাজমান। এক্ষেত্রে অনেকটা বাধ্য হয়েই
কখনো-সখনো দলীয় নেতৃবৃন্দ-নির্দেশকগণ অনুবাদ, রূপান্তর বা ভাবানুবাদ নাটকে সমর্পিত হন। বাংলাদেশে নাট্য অনুবাদকও যে খুব বেশি আছেন, তা-ও নয়। ফলে সংকটের সমাধান কখনোই হয় না। এ-পর্যায়ে নাটকের মানের প্রশ্ন-অপ্রশ্নকে বিতাড়িত করেই বলতে হয়, বর্তমান বাংলাদেশে মৌলিক নাটকের তীব্র অভাব। ১৯৭১ সাল পরবর্তী বাংলাদেশে মৌলিক নাট্যকারদের একটি প্রবল জাগরণ দেখা যায়। মমতাজউদদীন আহমদ, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল্লাহ আল-মামুন, মামুনুর রশীদ, সেলিম আল দীন, এস এম সোলায়মান, মান্নান হীরা প্রমুখ নাট্যকার নিয়মিতই মৌলিক নাটক লিখেছেন। বর্তমানে এঁদের একজন ছাড়া বাকি সবাই প্রয়াত। ফলে মৌলিক নাটকের সংকট এখন আরো তীব্র।

বিচ্ছিন্নভাবে বিদেশি নাটকের অনুবাদ রূপান্তর ভাবানুবাদ অনেকেই করেছেন, করছেন। ধারাবাহিকভাবে কবীর চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী, আবদুল হক, সাঈদ আহমেদ, ফতেহ লোহানী, বজলুল করীম, আবু শাহরিয়ার পূর্ব পাকিস্তান আমলে অনুবাদ নাটকে বিশেষ অবদান রেখেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে কবীর চৌধুরী, জিয়া হায়দার, মমতাজউদদীন আহমদ, আবু শাহরিয়ার, আবদার রশীদ, সৈয়দ শামসুল হক, আসাদুজ্জামান নূর, আবদুস সেলিম, রবিউল আলম, খায়রুল আলম সবুজ, তারিক আনাম খানসহ আরো অনেকের অনুবাদকর্মের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় অনুবাদ নাটক মঞ্চায়নের একটি বিশেষ ক্ষেত্র গড়ে ওঠে। এর মধ্যে কবীর চৌধুরী, জিয়া হায়দার, মমতাজউদদীন আহমদ, আবু শাহরিয়ার, আবদার রশীদ, সৈয়দ শামসুল হক পরলোকগত। বর্তমান সময়ে নাট্যানুবাদে ধারাবাহিকভাবে আছেন আবদুস সেলিম এবং কিছুটা রবিউল আলম। মঞ্চসফল অনুবাদক আসাদুজ্জামান নূর সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয়। খায়রুল আলম সবুজ মাঝেমধ্যে, তারিক আনাম খান নিজ দলের জন্য। তরুণেরা আছেন এবং যাচ্ছেন। অর্থাৎ অনুবাদকের সংখ্যাও সীমিত হয়ে আসছে। মৌলিক নাটকের অভাব, পুরনো নাটকে অনাগ্রহ, রবীন্দ্রনাটক বা কালজয়ী বাংলা নাটক মঞ্চায়নের পুনরাবৃত্তি এবং অনুবাদ নাটকের স্বল্পতার কারণে অনেকটা বাধ্য হয়েই নিজস্ব দলের জন্য নাটক লেখায় মনোনিবেশ করেন অনেকে। সেখানে সামান্য কিছু নাটক কালের মহাস্রোতে টিকে যায়। অল্পকিছু নবীন নাট্যকারের মৌলিক বা অনুবাদ নাটক আলোচনার দাবি রাখে। তবে তাঁরাও বেশিদিন টিকতে পারেন না। জীবনসংগ্রামের যৌক্তিক-অযৌক্তিক যুদ্ধের ঘূর্ণিপাকে অল্পদিনেই তাঁরা খেই হারিয়ে ফেলেন বা অনাগ্রহী হয়ে পড়েন। এছাড়াও আছে অনাকাক্সিক্ষত দলীয় বিবাদ-বিভেদ। তারপরও নাটক-মঞ্চায়নের প্রবল তৃষ্ণা থেকেই মৌলিক নাটক রচনা, গল্প-উপন্যাসের নাট্যরূপ, বিদেশি নাটক অনুবাদ, ভাবানুবাদ, রূপান্তরের একটা মঞ্চায়ন-স্রোত খুব ধীরে হলেও বইছে। নিচে ব্রেখ্টের মঞ্চায়নকৃত নাট্য অনুবাদ এবং অনুবাদক সংক্রান্ত একটি খতিয়ান তুলে ধরা হলো।

স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭১ থেকে বাংলাদেশে ব্রেখ্টের নাটক অনুবাদ বা রূপান্তর পরবর্তী মঞ্চস্থ হয়েছে – ধারাবাহিকভাবে কবীর চৌধুরী (অনুবাদ – জননী সাহসিকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কর্তৃক মঞ্চস্থ), আলী যাকের (রূপান্তর – সৎ মানুষের খোঁজে), আসাদুজ্জামান নূর (অনুবাদ – সৎ মানুষের খোঁজে, লোক সমান লোক; রূপান্তর – দেওয়ান গাজীর কিসসা, মোহনগরী), আবদুস সেলিম (অনুবাদ – গ্যালিলিও, হিম্মতী মা, গোলা মাথা চোখা মাথা, নিশি ভোরের ঢাক; শেষেরটি মঞ্চস্থ হয়নি), কামালউদ্দিন নীলু (রূপান্তর – তিন পয়সার পালা), অমিত চন্দ (রূপান্তর – রাইফেল), শাহমান মৈশান (অনুবাদ – সিদ্ধান্ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কর্তৃক মঞ্চস্থ), তাহমিনা আহমেদ (রূপান্তর – ধূর্ত উই), মুজিবুর রহমান দিলু (রূপান্তর – জনতার রঙ্গশালা), মামুন হক (অনুবাদ – সিচুয়ানের সুকন্যা)। এবং ভারতীয় অনুবাদক অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিন পয়সার পালা; উৎপল দত্তের সমাধান, হিম্মতী বাঈ; রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তের বিধি ও ব্যতিক্রম/ ব্যতিক্রম, চক সার্কেল; অশোক মুখ্যোপাধ্যায়ের হাতে হ্যারিকেন/ হাতে হারিকেন, নাজির বিচার/ বিচার; বাদল সরকারের গণ্ডি; চিত্তরঞ্জন ঘোষ ও বাসবী রায়ের মা; নীলকণ্ঠ সেনগুপ্তের জুলিয়াস সিজারের শেষ সাতদিন এবং জ্যোতি রায়ের আইন। বড্ড দুর্বল
মঞ্চায়ন-খতিয়ান। এর মধ্যে সৎ মানুষের খোঁজে, দেওয়ান গাজীর কিসসা, মোহনগরী, গ্যালিলিও, হিম্মতী মাসহ ব্রেখ্টের পাঁচটি নাটক ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ মঞ্চস্থ করেছে।

তিন

স্বাধীনতাপূর্ব তৎকালীন পূর্ব বাংলায় ত্রৈমাসিক পূর্বমেঘ (জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও মুস্তফা নূরউল ইসলাম, রাজশাহী,

১৯৬০-১৯৭১) সাময়িকীর পঞ্চম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যায় ব্রের্টল্ট ব্রেখ্টের ‘ম্যাকবেথ ও এপিক থিয়েটার’ লেখাটি অনুবাদ করেন উমর হাবিব। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ব্রেখ্টবিষয়ক প্রকাশিত এই একটি লেখাই পাওয়া যায়।

স্বাধীনতার পরপর বাংলাদেশে ব্রেখ্ট নিয়ে কথা বলা-লেখা বা প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার সূত্রপাত কখন হয়েছে, তার সঠিক হদিস নেই। বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত প্রথম নাট্যপত্রিকা রামেন্দু মজুমদার-সম্পাদিত থিয়েটার ত্রৈমাসিকের ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায় সর্বপ্রথম ব্রেখ্টবিষয়ক দুটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। একটি অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়-লিখিত ‘ব্রেখ্টের সঙ্গে পরিচয়ের আদিপর্ব’, অন্যটি সুখরঞ্জন চক্রবর্তী-লিখিত ‘নাট্যকার ব্যেরথল ব্রেখস্ট ও তাঁর সাহসিকা জননী’। তবে এ-দুটিই ওপার বাংলার। ১৯৭৪ সালে জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় বর্ষ, প্রথম সংখ্যায় বাংলাদেশ থেকে থিয়েটার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম প্রবন্ধটি লেখেন এপার বাংলার মফিদুল হক। তাঁর লিখিত প্রবন্ধের শিরোনাম ‘বার্লিনে : ব্রেশট থিয়েটার’। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এটিই বাংলাদেশ থেকে কোনো লেখক কর্তৃক ব্রেখ্টবিষয়ক প্রথম প্রকাশিত নীলমণি।

১৯৭৮ সালে চট্টগ্রাম থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ওভারসিজ ইন্টারন্যাশন্যাল থেকে অধ্যাপক আবদুস সেলিম-অনূদিত গ্যালিলিও নাটকের অনুবাদকৃত বই বাংলাদেশে প্রথম প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য, ওভারসিজ ইন্টারন্যাশন্যাল কোনো প্রকাশনা সংস্থা নয়। এর আগে কোনো অনুবাদ-গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, তেমন তথ্যও নেই।

ঢাকার অনার্য পাবলিকেশন্স থেকে ২০২২ সালে ড. আরিফ হায়দারের ঢাকার মঞ্চে ব্রেখটের নাটক শিরোনামে একটি ছোট্ট গবেষণা-পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। ছোট হলেও এমন গ্রন্থ এবারই প্রথম। ভিন্ন তিনটি প্রকরণভিত্তিক ব্রেখ্টবিষয়ক প্রবন্ধ বা অনুবাদ-গ্রন্থ বা গবেষণা-গ্রন্থ বাংলাদেশে প্রথম প্রকাশিত হওয়ার বহর দেখে বোঝা গেল, বাংলাদেশে কাগজে-কলমে ব্রেখ্ট-প্রকাশনার স্তর বেশ দুর্বল।

তবে ব্যক্তি পর্যায়ে বা সাংস্কৃতিক চর্চায় ব্রেখ্ট সম্পর্কিত আলোচনা বা পর্যালোচনার যে একটি উন্মেষরূপ ১৯৭৫ বা তার আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিল, তার উল্লেখ পাই নাট্যকার সেলিম আল দীনের নাটকবিষয়ক একটি প্রতিবেদন থেকে। সেলিম আল দীন ১৯৭৪ সালের মে মাসে চিত্রালীতে আবদুল্লাহ আল-মামুনের রচনা-নির্দেশনায় মঞ্চায়িত ‘থিয়েটার’ নাট্যগোষ্ঠী-প্রযোজিত নাটক সুবচন নির্বাসনে নাটক নিয়ে ‘থিয়েটার নিবেদিত সুবচন নির্বাসনে ও কতিপয় ধারণা’ শিরোনামে একটি পর্যালোচনা লেখেন। লেখাটি পুনঃমুদ্রিত হয় রামেন্দু মজুমদার-সম্পাদিত থিয়েটার পত্রিকার অক্টোবর ১৯৮৩ সংখ্যায় (দশম বর্ষ, তৃতীয়-চতুর্থ সংখ্যা)। নাটকটি সম্পর্কে আলোচনার একপর্যায়ে সেলিম আল দীন লেখেন – ‘নাটকটিতে ব্রেশটীয় রীতির মিশ্রণ দেখা যায়। সরাসরি দর্শককে মঞ্চ থেকে প্রভাবিত করার যে প্রয়াস এ নাটকে দেখা যায় তা খুবই ফলপ্রসূ। মোহাম্মদ জাকারিয়ার ভেতরে একজন শক্তিমান অভিনেতার সম্ভাবনা লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু বিষয়বস্তু থেকে তিনি নিজেকে আলিয়েনেট করতে সক্ষম হলে তাঁর অভিনয় আরও সুন্দর হতো। অর্থাৎ বৃদ্ধ পিতার চরিত্রে তিনি নিজেকে অতিমাত্রায় সম্পৃক্ত করে ফেলেছেন।’ উল্লিখিত পর্যালোচনা থেকে ধারণা করতে পারি, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ব্রেখ্ট সম্পর্কিত সীমিত নাট্যালোচনা ধীরে হলেও শুরু হয়েছিল। তবে ’৭০-এর মাঝামাঝিতেই মঞ্চে ব্রেখ্টীয় তত্ত্বনির্ভর প্রয়োগবিধি অনুসরণে মঞ্চপ্রযোজনা বেশ দাপট দেখাতে শুরু করে। এ প্রসঙ্গে খ্যাতিমান অনুবাদক অধ্যাপক কবীর চৌধুরীও সহমত পোষণ করেছেন – ‘স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের নবনাট্য চর্চায় ব্রেখ্টের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এ প্রভাব যেমন তাঁর কয়েকটি রূপান্তরিত নাটকের সফল মঞ্চায়নের মধ্যে, তেমনি আমাদের একাধিক মৌলিক নাটকের রচনা ও উপস্থাপন আঙ্গিকের মধ্যেও ধরা পড়ে।’

মঞ্চে ব্রেখ্ট চর্চা

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে ব্রের্টল্ট ব্রেখ্টের সামষ্টিক পরিচয়যাত্রা শুরু মূলত মঞ্চনাটক প্রযোজনার মধ্য দিয়ে। তার আগে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানকালে বা ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার পূর্ববঙ্গে ব্রেখ্টের কোনো নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে – এমন তথ্য নেই। স্বাধীন বাংলাদেশের মঞ্চে ব্রেখ্টের প্রথম পরিচয় তুলে ধরে ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ (১৯৬৮)। নাগরিক ১৯৭৫ (১৯৭৬) সালে সৎ মানুষের খোঁজে (মূল : ব্রের্টল্ট ব্রেখ্টের Good Woman of Szechwan অবলম্বনে – অনুবাদ : আসাদুজ্জামান নূর, রূপান্তর ও নির্দেশনা : আলী যাকের) নাটকটি ঢাকার মঞ্চে নিয়ে আসে। সৎ মানুষের খোঁজে নাটকটির মঞ্চপ্রযোজনার মাধ্যমেই বাংলাদেশের নাট্যকর্মী এবং দর্শকদের সঙ্গে ব্রের্টল্ট ব্রেখ্টের প্রথম পরিচয়। সৎ মানুষের খোঁজে নাটকটির দ্বিতীয় মঞ্চায়ন ১৯৭৮ সালে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘চারণিক’-এর প্রযোজনায় মলয় ভৌমিকের নির্দেশনায় সম্পন্ন হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজশাহীর ‘সমকাল নাট্যচক্র’ মনোয়ারুল করিম তুহিনের নির্দেশনায় ১৯৯৩ সালের মে মাসে মঞ্চস্থ করে। একই নাটক সিচুয়ানের সুকন্যা শিরোনামে মামুন হকের অনুবাদে সম্রাট প্রামাণিকের নির্দেশনায় ২০১৯ সালে ‘থিয়েট্রন ঢাকা.বিডি’ মঞ্চস্থ করে।

দেওয়ান গাজীর কিসসা : মূল – Mr Puntila and His Man Matti নাটকটি ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ আসাদুজ্জামান নূরের রূপান্তর ও নির্দেশনায় ১৯৭৭ সালে; ‘দিনাজপুর নাট্য সমিতি’ শাহজাহান ঝণ্টুর নির্দেশনায়

১৯৮৭-৮৮ সালে; চুয়াডাঙ্গার ‘অরিন্দম সাংস্কৃতিক সংগঠন’ ১৯৮৯ সালে মো. আলাউদ্দিনের নির্দেশনায়; জাহিদ রিপনের নির্দেশনায় ‘ফরিদপুর থিয়েটার’ ১৯৯৩ সালে; কুমিল্লার ‘জনান্তিক নাট্য সম্প্রদায়’ মুকসুদ আলী মজুমদারের নির্দেশনায় ১৯৯৬ সালে;১০ ‘গোবিন্দগঞ্জ থিয়েটার’ ১৯৯৭ সালে; ‘অমৃত থিয়েটার’ (জামালপুর) ১৯৯৭ সালে মুক্তা আহমেদের নির্দেশনায়; ১৯৯৮ সালে ‘শাপলা নাট্যগোষ্ঠী’ ঠাকুরগাঁও খোদা বকশ ডাবলুর নির্দেশনায়; ২০১০ সালে তৌফিক হাসান ময়নার নির্দেশনায় ‘বগুড়া থিয়েটার’ মঞ্চস্থ করে এবং ‘দিনাজপুর নাট্য সমিতি’ নাটকটি মঞ্চস্থ করে। সব দলই অনুসরণ করেছে আসাদুজ্জামান নূরের রূপান্তরিত পাণ্ডুলিপি।

সিনোরা কারারস রাইফেল : মূল – Señora Carrar’s Rifles অবলম্বনে রাইফেল নাটকটি অমিত চন্দের রূপান্তর ও নির্দেশনায় ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রামের ‘অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়’১১; ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রামের ‘শহীদনগর থিয়েটার’ মোস্তফা কামাল যাত্রার নির্দেশনায়১২; ২০১১ সালে ঢাকার ‘শব্দ নাট্যচর্চা কেন্দ্র’ খোরশেদুল আলমের নির্দেশনায়১৩ এবং বরিশালের ‘শব্দাবলী গ্রুপ থিয়েটার’ সৈয়দ দুলালের নির্দেশনায় ১৯৯৩ সালে মঞ্চস্থ করে।১৪ একই নাটক রাইফেল শিরোনামে আশিকুর রহমানের নির্দেশনায় ‘পালাকার’, ঢাকা ২০০৮ সালে১৫ মঞ্চস্থ করে।

মোহনগরী : মূল – The Rise and Fall of the City of Mahagonny অবলম্বনে – রূপান্তর ও নির্দেশনা : আসাদুজ্জামান নূর। প্রযোজনা : ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’, ঢাকা। প্রথম মঞ্চায়ন : ১৯৮২। মঞ্চনাটক।১৬ হিম্মতী বাঈ : মূল – Mother Courage and Her Children অবলম্বনে – রূপান্তর : উৎপল দত্ত। নির্দেশনা : মীর মুজতবা আলী। প্রযোজনা : ‘খেয়ালী গ্রুপ থিয়েটার’, বরিশাল। প্রথম মঞ্চায়ন : ১৯৮২। মঞ্চনাটক।১৭ নাটকটি হিম্মতি মা শিরোনামে আবদুস সেলিমের অনুবাদে এবং আতাউর রহমানের নির্দেশনায় ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’, ঢাকা প্রথম মঞ্চায়ন করে ১৯৯৫ সালে।১৮

তিন পয়সার পালা : মূল – Three Penny Opera অবলম্বনে – রূপান্তর ও নির্দেশনা : কামালউদ্দিন নীলু। প্রযোজনা : ‘বহুবচন’, ঢাকা। প্রথম মঞ্চায়ন : ১৯৮৩।১৯ একই নাটক অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রূপান্তরে আলী আনোয়ারের নির্দেশনায় ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’, রাজশাহী প্রথম মঞ্চায়ন করে ১৯৭৮ সালে।২০ নাটকটি জনতার রঙ্গশালা শিরোনামে মুজিবুর রহমান দিলুর রূপান্তর ও জামালউদ্দিন হোসেনের নির্দেশনায় ‘নাগরিক নাট্যাঙ্গন’ ১৯৯৬ সালে মঞ্চস্থ করে। এই নাটকটি পরবর্তীকালে ড. ইনামুল হকের নির্দেশনায় ‘নাগরিক নাট্যাঙ্গন বাংলাদেশ’ মঞ্চস্থ করে।

মা : মূল – ম্যক্সিম গোর্কির The Mother অবলম্বনে – ব্রের্টল্ট ব্রেখটের মা – অনুবাদ : চিত্তরঞ্জন ঘোষ ও বাসবী রায়। নির্দেশনা : কামালউদ্দিন নীলু। প্রযোজনা : ‘পদাতিক নাট্য সংসদ’, ঢাকা। প্রথম মঞ্চায়ন : ১৯৮৪। মঞ্চনাটক।২১

অবিরাম পাউরুটি ভক্ষণ : ম্যাক্সিম গোর্কির ছোটগল্প অবলম্বনে – ব্রের্টল্ট ব্রেখ্টের নাট্যরূপে নাটকটি রফিউর রাব্বীর নির্দেশনায় ‘উদীচী’ নারায়ণগঞ্জ ১৯৮৪ সালে মঞ্চস্থ করে।২২

ব্যতিক্রম : মূল – The Exception and the Rule অবলম্বনে – অনুবাদ : রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত। নির্দেশনা : কামালউদ্দিন নীলু। প্রযোজনা : ‘থিয়েটার ’৭৩’, চট্টগ্রাম। প্রথম মঞ্চায়ন : ১৯৮৫ (১৯৮৬)। মঞ্চনাটক। একই নাটক বিধি ও ব্যতিক্রম শিরোনামে লিয়াকত আলী লাকীর নির্দেশনায় লোক নাট্যদল ১৯৮৯ সালে মঞ্চস্থ করে।২৩

সমাধান : মূল – The Measures Taken নাটকটি উৎপল দত্তের অনুবাদে ১৯৮৫ সালে সৈয়দ জামিল আহমেদের নির্দেশনায় চট্টগ্রামের ‘তির্যক’ মঞ্চে আনে।২৪ একই অনুবাদ ২০১৯ সালে নাটোরের ‘ইঙ্গিত থিয়েটার’ বিভাস রায়ের নির্দেশনায় মঞ্চে নিয়ে আাসে।২৫

গ্যালিলিও : মূল – Life of Galileo অবলম্বনে – অনুবাদ : আবদুস সেলিম। নির্দেশনা : আতাউর রহমান। প্রযোজনা : নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, ঢাকা। প্রথম মঞ্চায়ন : ১৯৮৬। মঞ্চনাটক।২৬

চক সার্কেল : মূল – The Caucasian Chalk Circle; রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তের রূপান্তরে ম. হামিদের নির্দেশনায় ১৯৮৬ সালে ‘নাট্যচক্র’ ঢাকার মঞ্চে নিয়ে আসে।২৭ একই নাটক গণ্ডী শিরোনামে বাদল সরকারের রূপান্তরে ‘জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার’ আলী মাহমুদের নির্দেশনায় ১৯৯৫ সালে কর্মশালা প্রযোজনা হিসেবে মঞ্চস্থ করে।

জুলিয়াস সিজারের শেষ সাতদিন : মূল : ব্রের্টল্ট ব্রেখ্টের একটি ক্ষুদ্র কাহিনি থেকে অনুপ্রাণিত। কাহিনি সংগ্রহের অন্যান্য অবলম্বন – প্লুটার্ক, শেক্সপিয়র এবং এফআর কাওয়েল। নাটক : নীলকণ্ঠ সেনগুপ্ত। নির্দেশনা : শান্তনু বিশ্বাস। প্রযোজনা : ‘কালপুরুষ নাট্য সম্প্রদায়’, চট্টগ্রাম। প্রথম মঞ্চায়ন : ১৯৮৮। মঞ্চনাটক।২৮

ধূর্ত উই : মূল – The Resistible Rise of Arturo Ui অবলম্বনে – রূপান্তর : তাহমিনা আহমেদ। নির্দেশনা : ক্লস ক্যুসেনবার্গ। প্রযোজনা : ‘ঢাকা থিয়েটার’, ঢাকা। প্রথম মঞ্চায়ন : ১৯৮৯। মঞ্চনাটক।২৯

লোক সমান লোক : মূল – Man Equals Man অবলম্বনে – অনুবাদ : আসাদুজ্জামান নূর। নির্দেশনা : ফ্রিৎস্ বেনেভিৎস্। প্রযোজনা : ‘ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট’, বাংলাদেশ কেন্দ্র। প্রথম মঞ্চায়ন : ১৯৯৩। মঞ্চনাটক।৩০

বিচার : মূল : Short Play In Search of Justice অবলম্বনে – অনুবাদ : অশোক মুখোপাধ্যায়। নির্দেশনা : বিক্রম চৌধুরী। প্রযোজনা : ‘কথক নাট্য সম্প্রদায়’, চট্টগ্রাম। প্রথম মঞ্চায়ন : ১৯৯৬। মঞ্চনাটক।৩১ একই নাটক নাজির বিচার (রূপান্তর : আব্দুল্লাহ আল মামুন, নির্দেশনা : রুডা নির্দেশনা দল, পথনাটক) শিরোনামে ১৯৯৮ সালে ‘রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ড্রামা অ্যাসোসিয়েশন’ (রুডা) রাজশাহীতে মঞ্চস্থ করে।৩২

দেওয়ালের লিখন : মূল : ব্রের্টল্ট ব্রেখট। নির্দেশনা : আতিকুর রহমান। প্রযোজনা : ‘উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী’ (কেন্দ্রীয় সংসদ, ঢাকা)। প্রথম মঞ্চায়ন : ১৯৯৭। পথনাটক।৩৩

হাতে হারিকেন : মূল – Short Play Driving out the Devil অবলম্বনে – রূপান্তর : অশোক মুখোপাধ্যায়। নির্দেশনা : মাসুদ পারভেজ। প্রযোজনা : ‘নাট্যধারা’, ঢাকা। প্রথম মঞ্চায়ন : ১৯৯৯। পথনাটক।৩৪ 

গোলমাথা চোখামাথা : মূল – Round Heads and Pointed Heads অবলম্বনে – রূপান্তর : আবদুস সেলিম। নির্দেশনা : ড. ইস্রাফিল শাহিন। প্রযোজনা : ‘নাগরিক নাট্যাঙ্গন’, ঢাকা। প্রথম মঞ্চায়ন : ২০০২। মঞ্চনাটক।৩৫

আইন : মূল – The Exception and the Rule অবলম্বনে – অনুবাদ : জ্যোতি রায়। নির্দেশনা : শফিক রহমান। প্রযোজনা : ‘ভাস্কর নাট্যদল’, ঢাকা। প্রথম মঞ্চায়ন : ২০০৫। মঞ্চনাটক।৩৬

প্রসঙ্গ : ব্রেখ্ট নির্দেশনা

বাংলাদেশে প্রথম প্রযোজিত ব্রেখ্টের নাটক সৎ মানুষের খোঁজে কতখানি ব্রেখ্টীয় আদর্শ বা তত্ত্বের গভীরে থেকে মঞ্চায়ন হয়েছে? আদর্শ এবং তত্ত্ব কতখানি উপেক্ষিত হয়েছে, কতখানি সমন্বিত হয়েছে? তা জানতে গিয়ে আমি ব্রেখ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন এমন কয়েকজন নির্দেশকের সুভ্যেনির-কথা তুলে ধরলাম। শুরুতেই সৎ মানুষের খোঁজে নাটকের নির্দেশক আলী যাকেরের কথা উল্লেখ করছি – ‘এই নাটকের নির্মাণে আমি ব্রেশটের ‘সেৎযুয়ানে’ যে সমস্ত লিখিত নির্দেশ রয়েছে তার বাইরে ব্রেশটের দর্শন থেকে কিছু কিছু উপাদান নাটকটি রূপান্তরের সময় এবং নাটকের মহড়া চলার সময় বা নির্দেশনার সময় অন্তর্ভুক্ত করি।’৩৭ দেওয়ান গাজীর কিসসা নাটকের নির্দেশক আসাদুজ্জামান নূরের কথা- ‘[…] নাগরিক প্রযোজিত বের্টল্ট ব্রেশট-এর পূর্ববর্তী নাটক সৎ মানুষের খোঁজে-র মতই এ নাটকেও নৃত্য ও সঙ্গীতাংশ সংযোজিত হয়েছে মূল নাটক অনুসরণে এবং এপিক নাটকের চরিত্রানুযায়ী। এতে আমাদের কোনো মৌলিক ‘জ্যাঠামী’ নেই।’৩৮ গ্যালিলিও নাটকের নির্দেশক আতাউর রহমানের কথা – ‘মহান নাট্যকার ও নাট্য নির্দেশক বের্টল্ট ব্রেশট্-এর নাট্য দর্শন ও প্রয়োগ কৌশল নাগরিককে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। তাঁর নাটকে বিদ্ধৃত সমাজ সচেতনতা, ডায়ালেকটিস (দ্বান্দ্বিকতা), শ্রেণী সত্যতা, বিশ^জনীনতা এবং সর্বোপরি অপূর্ব শিল্পবোধ আমাদের আলোড়িত করে।’৩৯ বাংলাদেশের তিনজন প্রথিতযশা বিদগ্ধ নাট্যজন. যাঁরা ব্রেখ্টের নাটক বাংলাদেশে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সফল ভূমিকা পালন করেছেন – রূপান্তর, অনুবাদ, নির্দেশনা এবং প্রযোজনার মধ্য দিয়ে; তাঁদের কথার মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হলো ব্রেখ্টের নাট্য নির্দেশনায় ব্রেখ্টীয় নাট্যতত্ত্বের প্রতি তাঁদের বিশ^স্ততা এবং অনুসরণের সামাজিক-রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা। এবারে স্বাধীনতা-পরবর্তী দ্বিতীয় প্রজন্মের মা নাটকের নির্দেশক কামালউদ্দিন নীলুর কথা – ‘ব্রেখটের দি মাদার নাটকটি একটি ভাববাদ বিরোধী বস্তুবাদী, অ-আরিস্তোতলীয় নাটক। এ নাটক কখনই আরিস্তোতলীয় নাটকের মতো দর্শককে নিষ্ক্রিয় একাত্ম হতে সাহায্য করে না। […] পৃথিবীকে বদলানোর উদ্দেশ্যে যে বিশেষ বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন, দর্শককে তাই শেখানোর জন্যে এ-নাটকের প্রচেষ্টা থাকবে যাতে শুরুতেই দর্শক প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারে।’৪০ উল্লিখিত নির্দেশকগণের কথা থেকে বোঝা যায়, তাঁরা প্রত্যেকেই ব্রেখ্টের তাত্ত্বিক রীতির প্রতি ছিলেন নমনীয় এবং এর অনুসারী। নির্দেশনায় আদর্শকেও তাঁরা মঞ্চে প্রয়োগ করেছেন, তবে ভিন্ন আদলে। যদিও ব্রেখ্টের মার্কসীয় আদর্শ ব্যক্তিজীবনে ধারণ করার বিষয়ে তাঁরা কেউ-কেউ প্রশ্নাতীত নন, তবুও উল্লিখিত নির্দেশকগণ ব্রেখ্ট নির্দেশনায় ছিলেন অতীব সফল। দুজন বিদেশি নির্দেশক ছিলেন – ক্লস ক্যুসেনবার্গ এবং ফ্রিৎস্ বেনেভিৎস্। ক্লস ক্যুসেনবার্গ ‘ঢাকা থিয়েটারে’র হয়ে ধূর্ত উই এবং ফ্রিৎস্ বেনেভিৎস্ ‘আইটিআই’-এর হয়ে লোক সমান লোক নির্দেশনা দিয়েছেন।

ব্রেখ্ট নির্দেশনায় তাত্ত্বিক-আদর্শিক ঐক্য-অনৈক্য

ব্রেখ্টের নাটকে এপিক থিয়েটার বা অ্যালিয়েনেশন পদ্ধতির প্রয়োগচর্চায় বাংলাদেশের নাট্যনির্দেশকগণ মঞ্চে প্রথম নিবিষ্ট হন সৎ মানুষের খোঁজে (১৯৭৫/ ১৯৭৬) নাটকের মধ্য দিয়ে। নাটকটি নাট্যমহলে আলোচিত হয়, এ-নাটক দর্শনে ব্রেখ্টের প্রতি দর্শকের আগ্রহ তৈরি হয়। ব্রেখ্ট সম্পর্কে নাট্যকর্মীদের অনুসন্ধিৎসু মন এই প্রথম বিস্তৃত হয়। সৎ মানুষের খোঁজে নাটক মঞ্চায়ন-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে দেওয়ান গাজীর কিসসা, মা, সমাধান, তিন পয়সার পালা, হিম্মতি মা, ব্যতিক্রম, গ্যালিলিও, লোক সমান লোকসহ বেশ কিছু সমৃদ্ধ প্রযোজনা দর্শক-সমালোচক-গবেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। এ-পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ব্রেখ্টের ২০টি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। ৪৩টি দল একই নাট্যশিরোনামে বা কখনো ভিন্ন নামে নাটকগুলি মঞ্চস্থ করেছে। এর মধ্যে খোলাচোখে নয়টি প্রযোজনাই কেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল, কেন এই ব্যতিক্রম, দায় কার কতটুকু, কতটুকু ব্রেখ্টীয় রীতিনীতি মেনে দর্শক-আনুকূল্য পেয়েছিল – এমনতর ঐক্য-অনৈক্যের পক্ষে-বিপক্ষে দাঁড়িয়ে প্রযোজনার সার্থকতা, গলদ অথবা ব্যর্থতার কারণ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে সময়কাল বিবেচনায় নিয়ে একটি প্রেক্ষিত-নির্ণয়ের চেষ্টা করা যেতেই পারে।

আমি ব্রেখ্টের দেওয়ান গাজীর কিসসা, গ্যালিলিও, মা, তিন পয়সার পালা, ব্যতিক্রম, বিধি ও ব্যতিক্রম, ধূর্ত উই, লোক সমান লোক, চক সার্কল, হিম্মতি মা, রাইফেল, গোলমাথা চোখামাথা, সমাধান, জনতার রঙ্গশালা, সিচুয়ানের সুকন্যা দেখেছি। যদিও এ কয়েকটি দেখার ওপর ভিত্তি করে উল্লিখিত আলোচনা-সমালোচনা বিষয়ক কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া অতীব দুরূহ, তবু ব্যক্তি-পর্যালোচনায় আমাদের তৎকালীন প্রগতিশীল সাংস্পর্শিক চিন্তাচেতনার রূপ-অরূপের প্রকরণটুকু তুলে ধরছি এবং স্পষ্ট করেই বলছি – বাংলাদেশে অর্থাৎ গত শতাব্দীর আশির দশক পর্যন্ত ব্রেখ্ট নাট্যদর্শনে দর্শক হিসেবে আমরা নাট্যকর্মীগণ ব্রেখ্টীয় রীতির তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারিনি। সাবলীলভাবেই আর আর দর্শকদের মতোই ছিলাম আমরা দর্শক। ব্রেখ্ট নাটকের মধ্য দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের বিষয়ে যা বলতে চান তা আমাদের নাট্যচর্চায় আমাদের দেশের নাট্যকারদের অন্যান্য মৌলিক নাটক দেখার সূত্রে জানা এবং বোঝার সাধারণ সমান্তরালেই ছিল। অর্থাৎ ব্রেখ্ট নাটকের মধ্য দিয়ে সমাজের ক্ষতগুলিকে যেভাবে স্পষ্ট করেছেন এবং ক্ষত সৃষ্টিকারীদের স্বরূপ দেখিয়েছেন; তা বাংলাদেশের আরো বহু মৌলিক নাটকেই আমরা তা দেখেছি। এই জানা এবং বোঝার ক্ষেত্রে আমরা সাধারণ নাট্যকর্মীগণ (বিশেষ করে যারা পরবর্তীকালে ব্রেখ্ট প্রযোজনায় যুক্ত হয়েছি) একটি বড় ভুল করে ফেলেছি। তা হলো, আমরা ব্রেখ্টকে অন্যান্য সমাজ বিপ্লবভিত্তিক আমাদের মৌলিক নাটকের উদ্দেশ্য এবং আদর্শের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছিলাম। কারণ ব্রেখ্ট বোঝার ক্ষেত্রে ব্রেখ্ট সম্পর্কিত তাত্ত্বিক এবং আদর্শিক ধারণাটি তৎকালীন সময়ে আমাদের কাছে ছিল একেবারেই অস্পষ্ট। ব্রেখ্টের নাট্যতত্ত্বের গভীরে যাওয়ার মতো কোনো প্রশিক্ষণ তখন আমাদের নাট্যকর্মীদের ছিল না। যদিও রাজনৈতিকভাবে তখন আমরা বহু নাট্যকর্মীই ছিলাম বামচিন্তার অনুসারী।

১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতায় তৎকালীন মহাপরিচালক মুস্তফা মনোয়ারের আগ্রহে আলেক্সান্ডার স্টিলমার্কের তত্ত্বাবধানে সর্বপ্রথম বাংলাদেশে ব্রেখ্টবিষয়ক একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রথম ব্রেখ্টকে আমরা চোখ মেলে দেখলাম এবং ধীরে ধীরে ব্রেখ্ট বোঝা ও জানার ক্ষেত্রে আমাদের বোধের পরিবর্তন ঘটতে শুরু করল এবং তদ্পূর্বকালে মঞ্চায়িত ব্রেখ্টের নাটকগুলি স্মৃতির ঝাঁপি থেকে বের করে মূল্যায়ন করতে শুরু করি এবং গল্পে-আড্ডায় আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসি। এ পর্যায়ে ব্রেখ্টীয় ধারণা এবং চেতনার পার্থক্য কিছুটা হলেও বুঝতে শুরু করি। জটিলই মনে হলো। কারণ আমাদের বাংলাদেশের নির্দেশকগণ কোনো নির্দেশনারীতি মেনে নাটক নির্দেশনা দিতেন – তেমন কোনো ধারণাই আমাদের ছিল না। আমরা বেড়ে উঠেছি সনাতন ঘরানার উঠান থেকে। বাংলাদেশ ভূখণ্ডে নাট্যনির্দেশনায় এমন রেজিমেন্টাল তাত্ত্বিক দিকটি আমাদের চিন্তাতে কখনোই ছিল না। দীর্ঘ সময়ের প্রচলিত ধারা থেকে বের হয়ে ব্যাকরণনির্ভর নাট্যনির্দেশনার সামান্য প্রস্তুতি নিয়ে পরবর্তীকালে কিছু তরুণ ব্রেখ্ট প্রযোজনায় নির্দেশক হিসেবে নিজেদের সমর্পিত করতে শুরু করল, ফলাফল – ব্রেখ্ট নির্দেশনায় তারা তেমন সফল হতে পারল না। এ পর্যায়ে ব্রেখ্ট বোঝার ক্ষেত্রে গড়মিলটা তাহলে কোথায় ছিল? আদর্শিক নাকি তাত্ত্বিক প্রয়োগে সমন্বয়ের ঘাটতি বা বোঝার ঘাটতি! ব্রেখ্ট নাট্য-প্রযোজনায় তত্ত্ব এবং আদর্শ দুটি একই পথের যাত্রী হলেও ‘ধারণ’ (গ্রহণ) এবং ‘ধরনে’র (বোঝা) ক্ষেত্রে দুটি ক্রিয়ার অবস্থান ভিন্নমুখী। ব্রেখ্ট এই দুটি গতিপথের সার্থক সমন্বয় ঘটিয়েছেন, তবে তাঁর প্রাথমিক দৃষ্টিমুখ ছিল তীব্রভাবে মার্কসবাদী আদর্শমুখী অর্থাৎ ধারণ। আদর্শমুখিন এমন বিস্তার কিন্তু রাজনৈতিক স্থিরতা বা অস্থিরতা (যেভাবেই বলা হোক না কেন), রাজনৈতিক মৌলিক্যুলের কেন্দ্রাতিনুগেই অবস্থান করে। সেক্ষেত্রে যিনি মার্কসীয় আদর্শ এবং সমাজকে সঠিক বিশ্লেষণ করে নাট্যপ্রয়োগে নিমিত্ত হবেন, সম্ভবত তিনিই মূল মঞ্চউৎপাদনে সার্থকতা লাভ করবেন, নচেৎ বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনাই বেশি। অন্তত ব্রেখ্ট গবেষকদের তাই ধারণা। তবে আমার ব্যক্তিমতে ব্রেখ্ট নির্দেশনায় নির্দেশককে মার্কসিস্ট হতে হবে – এমন কোনো কথা নেই; কারণ বাংলাদেশে ব্রেখ্ট নির্দেশনায় সফল যাঁরা হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন ছাড়া আর কেউই মার্কসিস্ট নন। বিশ্বদরবারে বহু স্থানে ব্রেখট মঞ্চায়ন হচ্ছে ননমার্কসিস্ট নাট্যজন দ্বারা। তাঁরা সফলও হয়েছেন। তাহলে বাংলাদেশের তরুণগণ ব্যর্থ হলেন কেন? বোঝার ঘাটতি? নাকি একটি দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিভ্রমণের সঙ্গে তরুণদের সাংঘর্ষিক মতপার্থক্যের বিরতিহীন অবসাদ।

বিষয়টিকে আরো একটু বিস্তৃত করা যেতে পারে – ব্রেখ্ট কিছুতেই তাঁর রীতির সঙ্গে ভিন্ন-সমন্বয় করে নাটক প্রস্তুত হোক তা মেনে নিতেন না। তিনি তাঁর রীতির হুবহু প্রয়োগ দেখতে চাইতেন। চাইতেন একজন নাট্যকর্মীর ব্যক্তিজীবনে শ্রেণিসংগ্রামভিত্তিক আদর্শগত চিন্তা এবং চর্চারও প্রতিফলন। অর্থাৎ সম্পূর্ণ মার্কসিস্ট রাজনৈতিক চিন্তার বলয়ে থেকে ব্রেখ্ট চর্চার ক্রমবিস্তারই ছিল ব্রেখ্টের দর্শন (প্রাজন্মিক বিস্তারে এ কি সকল সময়ে সম্ভব?)। সোজা কথা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হোক কিন্তু নাটকে আদর্শের বিচ্যুতি এবং তাত্ত্বিক প্রয়োগের ঘাটতি তাঁর পছন্দ ছিল না। সেই বিস্তারে ’৭০ এবং ’৮০-র দশকের চেতনার সঙ্গে পরবর্তী বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক চিন্তার সাংঘর্ষিক পর্যায় ছিল বেশ অস্থির। তাহলে এটিই কী মূল কারণ?

এ-সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাম চিন্তাধারার ব্যাপক ধস আতঙ্কিত করে তোলে সাম্যবাদী ঘরানার নাট্যকর্মীদের, যারা ব্রেখ্ট, জ্যঁ পল সার্ত্রে বা বার্নার্ড শ’কে পছন্দ করত। একালে বাম চিন্তাধারার নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদদের দলে দলে পুঁজিবাদী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একাট্টা হয়ে যাওয়া আতঙ্কিত করে তোলে তরুণ প্রজন্মকে। এরই ধারাবাহিকতায় কমিউনিস্ট পার্টিগুলি ত্রিধা-বহুধাবিভক্ত হয়ে মার্কসীয় চিন্তার অসারতাই প্রমাণ করতে শুরু করে তৎকালীন বাংলাদেশে। সমগ্র বিশ^ও এই অসারতার গোলকে বাঁধা পড়ে। ১৯১৭ সালের বিপ্লবের প্রায় ৭০ বছর পর, কমিউনিজম সোভিয়েত ইউনিয়নে (টুকরো-পরবর্তী বর্তমান নাম রাশিয়া) ভেঙে পড়ে। সমগ্র বিশে^ কমিউনিজমের পতাকা অস্তমিত হতে শুরু করে। এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে তরুণ প্রজন্মের সাম্যবাদী চিন্তার ক্ষেত্রে। কমিউনিস্ট চিন্তাধারায় বিশ্বাসী ব্রেখ্টের নাট্য মঞ্চায়নে এর প্রভাবও ছিল অপরিসীম। অর্থাৎ প্রজন্মভিত্তিক দ্বিতীয় বা তৃতীয় ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, ভোগ এবং বোধের অসামঞ্জস্যের পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি, আরো পরে ভার্চুয়াল মিডিয়ার ডামাডোল; নবীন নাট্যকর্মীদের চেতনমূলে পরিবর্তনের অকল্পনীয় ঢেউ তোলে। এমন পরিবর্তনের জোয়ারে রাজনৈতিকভাবে হতাশাগ্রস্ত তরুণ প্রজন্মের নির্দেশনায় ব্রেখ্টীয় নীতি-
রীতি-তত্ত্ববিষয়ক কঠিন-শৃঙ্খল ধারণ করার বাধ্যবাধকতা ছিল যেমন জোরজবরদস্তির শামিল, তেমনি তরুণ প্রজন্মগণও বামচিন্তাকে নিয়ে ছিল প্রচণ্ড হতাশাগ্রস্ত। ফলে ব্রেখ্টচর্চায় আদর্শিক বিষয়টি তাদের কাছে ছিল ব্যক্তিমতাদর্শের প্রতি অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ। এ-পর্যায়ে ব্রেখ্টের নাট্য-প্রযোজনায় ব্যর্থতা মেধাবী তরুণদের আগ্রহকে নিষ্প্রভ করে তোলে, আর সাম্যবাদী চেতনার তরুণ প্রজন্ম তো তারও আগে থেকেই বিচ্ছিন্ন। ফলাফল – আমরা ব্রেখ্টকে আর পূর্বেকার সফল প্রযোজনাগুলির সমান্তরালে খুঁজে পাইনি। এভাবে ব্রেখ্টের প্রতি তরুণদের আগ্রহও হয়ে ওঠে নিভু নিভু। সমালোচক-আলোচক অংশুমান ভৌমিকেরও সরল প্রশ্ন – ‘আজকাল বামপন্থায় আমাদের আস্থা কমেছে বলেই কি ব্রেখশটে আমাদের মতি নেই?’৪১ দু-পাড়ের মোদ্দাকথা এটিই। তিনি আরো এক পা বাড়িয়ে বলেছেন – ‘[…] আজ ব্রেখশট আমাদের আশেপাশে নেই বললেই চলে। কেন নেই? সহজ উত্তর। এই মুহূর্তে কোনও কমিউনিস্ট পার্টি এ রাজ্যের (পশ্চিমবঙ্গ) নিয়ন্ত্রণে নেই।’৪২ এ তো ওপারের কথা। বাস্তবতা হলো, এপারেও তাই। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, নাট্যচিন্তায় প্রবল পুঁজিবাদী দাপটই কী এর জন্য দায়ী! নাকি রেজিমেন্টাল প্রেসারে তরুণ প্রজন্ম খেই হারিয়ে ফেলেছিল; নাকি ব্রেখ্টীয় শৈল্পিক বোধ প্রয়োগে জানার খামতি! বিষয়টি কী সম্পূর্ণরূপে আদর্শিক-উপেক্ষা, নাকি তাত্ত্বিক ভীতির জটিলতার কারণে। নাকি তৎকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা। না কী সবকটিরই গোলমেলে মিশ্রণ। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পরই তৈরি হয়ে গিয়েছিল বা তৈরি করা হয়েছিল। তাহলে পরবর্তী প্রশ্ন আসে, ’৭০ দশকের সফল ব্রেখ্ট-নির্দেশকগণ কোন জাদুবলে সফলতা লাভ করেছিলেন।

এ-পর্যায়ে পূর্বেকার সফল ব্রেখ্ট-প্রযোজনা বা নির্দেশনা মূল্যায়নে আমার ব্যাখ্যা – সফল এই প্রযোজনাগুলির নির্দেশকগণ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং চেতনাপ্রসূত যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের দগদগে ক্ষত এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পের সঙ্গে ব্রেখ্টের নাটকের মনস্তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক সহমিল তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন বিস্তর; এই সহমিল তৎকালীন সময়ে যুদ্ধফেরত প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিচর্চাকারীদের কাছে ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তাঁদের নির্দেশনায় নাটকের মূল সুরটুকু মূলত ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা-আশ্রিত একটি নতুন সাম্যবাদী গণমুখী আদর্শ, অন্যদিকে ব্রেখ্ট তাঁদের কাছে ছিলেন অথবা তাঁরা ব্রেখ্টকে দেখছিলেন একটি বৈশি^ক রাজনীতির প্রেক্ষাপটনির্ভর সাম্যবাদী সামাজিক-আদর্শিক স্তম্ভরূপে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে যেহেতু তাঁদের বোঝাপড়া চমৎকার, সেহেতু আদর্শিকভাবে মার্কসীয় চেতনার সঙ্গে তাঁরা সরাসরি যুক্ত না হয়েও মঞ্চপ্রয়োগে এই দুটি বিশ^াসকে সমন্বয় করেই শামিল হয়েছেন মঞ্চনির্দেশনায়। এবং এ-দুটির সফল সম্মিলন ঘটিয়েই তাঁরা সফল হয়েছেন। পাশাপাশি নির্দেশনায় ব্রেখ্টের তত্ত্ব প্রয়োগেও তাঁরা সাফল্য দেখিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাঁরা বঙ্গীয় লোকরীতির সঙ্গে ব্রেখ্টীয় তাত্ত্বিকরীতির সমন্বয় ঘটিয়েই নাটক উপস্থাপন করেছেন। তাঁরা নাটক নির্দেশনা দিয়েছেন ব্রেখ্টের প্রয়োগরীতি স্মরণে রেখে, কিন্তু নির্দেশনায় তাঁরা মিশ্রপদ্ধতিই ব্যবহার করেছেন অর্থাৎ সফল এই প্রযোজনাগুলিতে নির্দেশকগণ ব্রেখ্টীয় আদর্শিক এবং তাত্ত্বিকরীতি প্রয়োগে মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য এবং আদর্শকেই বিচক্ষণতার সঙ্গে সমন্বয় করেছেন, পাশে ছিল শক্তভাবে বঙ্গীয় লোকরীতির মধ্যযুগীয় দর্পণ।

ব্যক্তি এবং দল কর্তৃক চর্চারীতির ভাষ্য :

সাম্য-বৈষম্য এবং বিরুদ্ধতা

মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির বা চেতনার অভ্যন্তরে থেকেই ব্রেখ্ট মঞ্চায়ন আবশ্যিক বলে সম্মতি দিয়েছেন খ্যাতিমান অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক, নাট্যদার্শনিক উৎপল দত্ত। তাঁর মতে, একটি রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকেই ব্রেখ্ট চর্চিত হওয়া উচিত। কারণ ব্রেখ্ট নাটকের মধ্য দিয়ে সমাজ বদলের উপায়গুলিকে দর্শকদের মধ্যে উসকে দিতেন। আর এই রাজনৈতিক বিশ^াস আসতে হবে সমাজের উপেক্ষিত অথচ উৎপাদনে সরাসরি অংশগ্রহণকারী অর্থাৎ যারা শ্রমিক মজুর কৃষক আছেন, তাঁদের অধিকারকে মূল লক্ষ্য করে এবং তাঁদের সংগ্রামকে বিশ্লেষণ করে। উৎপল দত্ত খোলাখুলিভাবে বলেছেন – ‘আসলে ব্রেখ্ট্ যিনি প্রযোজনা করবেন তাঁকে আগে মার্কসবাদ লেনিনবাদে দীক্ষিত ও রপ্ত হতে হবে। ব্রেখ্ট্ নিজেই শুধু মার্কসবাদী নন, তাঁর মতে মার্কসবাদী না হলে আজকে আর নাট্যকর্মী হওয়া যায় না। তিনি আরো বলেন, শ্রেণি-সংগ্রামে প্রত্যক্ষ অংশ না নিলে অভিনেতা হওয়া যায় না। ফর্ম-ফর্ম চিৎকারে ব্রেখ্ট্কে ধাওয়া করলে আদপেই সে ফর্ম করায়ত্ত হবে না কারুর। ব্রেখ্ট্ একজন বিপ্লবী নাট্যকার।’৪৩ আর্তুরো উই নাটকের নির্দেশক শেখর চট্টোপাধ্যায়েরও একই কথা – ‘শোষণ আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে যদি সত্যিকার ঘৃণা না থাকে, তবে ব্রেখ্ট করা উচিত নয়।’৪৪ উল্লেখ্য, ব্রেখ্টের প্রথম যৌবনে জার্মানির অস্থিতিশীলতা এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির গভীর সংকট ব্রেখ্টকে মার্কসীয় চেতনায় গভীরভাবে নিমজ্জিত করে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব ব্রেখ্টকে নতুন চিন্তার খোরাক দেয়। তিনি প্রথম খড়্গহস্ত হয়ে ওঠেন নাৎসিবাদী নাট্যকার Hanns Johst-র দ্য লোনলি (১৯১৭) নাটকের ওপর। এর প্রতিবাদেই তাঁর প্রথম নাটক ১৯১৮ সালে রচিত হয়। অর্থাৎ কৈশোরক্রান্তিকালেই ব্রেখ্ট বিশ্বাস করতেন – ‘[…] স্বদেশ এবং বিশ্বের যাবতীয় সমস্যা সমাধানের অন্যতম চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে সাম্যবাদের মধ্যে।’৪৫ মূলত রুশ বিপ্লবই ব্রেখ্টকে সাম্যবাদী জীবনবোধের সান্নিধ্যে নিয়ে যায়। তাঁর রচিত নাটকের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় মানুষের ন্যায্য অধিকার, জালিমের উৎখাত, মেহনতি মানুষের সংগ্রাম। এসময় ‘কম্যুনিস্ট আদর্শ তাঁর অনুভূতিকে ব্যক্তিনিরপেক্ষ ও তাঁর শিল্পধারণাকে মানবিক রূপ দান করে।’৪৬

সুতরাং উৎপল দত্তের ভাষ্য অনুযায়ী বলতেই হয়, ব্রেখ্টচর্চা উপমহাদেশে ভুল পদক্ষেপে চর্চিত। তাঁর মতে, নাট্যচর্চায় রত নাট্যজন বা নাট্যকর্মী-নির্দেশকগণ তাঁদের জীবনবোধের সঙ্গে ব্রেখ্টকে শেষ পর্যন্ত তুল্যমূল্য করেননি। নাটক রাজনীতিবিচ্ছিন্ন কোনো প্ল্যাটফর্ম নয়। উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে বিশ্বাসী মার্কসীয় দলগুলি শতধাবিভক্ত। ভুল নেতৃত্ব এবং ভোগের ক্রমবর্ধমান হারিকিরিতে আক্রান্ত রাজনৈতিক দল এবং মানুষ। ফলে নিষ্ক্রিয় এবং নিষ্ক্রান্ত হয়েছে সব ধরনের রাজনৈতিক সাম্যবাদী আদর্শ। উৎপল দত্তের সারকথা, তত্ত্ব আর আদর্শ এক কথা নয়। প্রথমে আদর্শকে গ্রহণ করতে হবে, তার পরে তত্ত্ব। ব্রেখ্ট-অনুবাদক অধ্যাপক আবদুস সেলিমও তাই মনে করেন – ‘ব্রেখ্ট এক বিরাট শিল্পী এবং তাঁকে শুধুমাত্র একটি সীমিত তত্ত্বের প্রবর্তক হিসেবে বিবেচনা করা ভুল ও অন্যায়।’৪৭ অর্থাৎ ব্রেখ্টীয় তত্ত্ব গ্রহণ করার পূর্বেই মার্কসীয় আদর্শকে ধারণ করা অপরিহার্য বলেই তাঁরা রায় দিয়েছেন।

উল্লিখিত নাট্যজনদের কথার সারাংশ, ব্রেখ্ট একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী এবং চর্চাকারী নাট্যজন ও তাত্ত্বিক কর্তৃক চর্চার দাবি রাখে। যেহেতু দল ব্যক্তি দ্বারাই চর্চিত হয়; সেহেতু দলের সকল নাট্যকর্মীরও একই রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকেই নাটকে যুক্ত হওয়া উচিত। তবে বাংলাদেশে যে কটি দল ব্রেখ্ট মঞ্চায়ন করেছে তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসটুকু অন্তত মার্কসবাদী চর্চায় নিমজ্জিত নয়। এখানে যাঁরা নাট্যচর্চায় নিবেদিত তাঁদের কয়েকটি দল মাত্র মার্কসবাদী এবং মাওবাদী তত্ত্বে অনুপ্রাণিত। ‘উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী’ (১৯৬৮), ‘আরণ্যক নাট্যদল’ (১৯৭২), ‘নাট্যফৌজ’ (১৯৭৫), ‘বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র্র’ (১৯৭৮), ‘অবলোকন’ (১৯৮৪), ‘গণনাট্য কেন্দ্র’ (১৯৯০), ‘গণশিল্পী দল’ (১৯৯০/৯১), ‘গণছায়া’ (১৯৯৩)সহ মাত্র কিছু সংগঠন মার্কসবাদী-মাওবাদী তত্ত্বে বিশ্বাস করে নাট্যচর্চায় নিবেদিত হয়েছে, হয়েছিল। এর মধ্যে গণমানুষের অধিকারভিত্তিক সাংস্কৃতিক চর্চায় উদীচী এবং আরণ্যক নাট্যদলই এখন পর্যন্ত তাদের মঞ্চচর্চা চালিয়ে যাচ্ছে। এ-দলগুলির মূল কাণ্ডারি মার্কসীয় ধারণায় বিশ্বাসী রাজনৈতিকভাবে, কখনো কখনো কেউ কেউ মাওবাদী হিসেবেও সমাজে আলোচিত ছিলেন। তবে এবং একমাত্র ‘উদীচী’ ব্যতীত অন্য দলগুলির নাট্য-প্রযোজনার তালিকায় ব্রের্টল্ট ব্রেখ্টের নাটক নেই। ব্যক্তি পর্যায়ে আসাদুজ্জামান নূরই একমাত্র মার্কসবাদী নাট্যকর্মী যিনি ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ থেকে ব্রেখ্টের নাটক অনুবাদ-রূপান্তর এবং নির্দেশনা দিয়েছেন।

তাহলে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে উল্লিখিত আলোচনা সারাংশে উত্তরটুকু কী এমন হতে পারে যে, নবীন নাট্যকর্মীরা একট যৌক্তিক ভীতি থেকেই পরবর্তী পর্যায়ে ব্রেখ্টের পথে হাঁটেননি। তাঁরা ব্রেখ্টকে অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই দূরে সরিয়ে রেখেছেন শ্রেণিসংগ্রামভিত্তিক জটিল এবং সংগ্রামমুখর সমাজবাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিত ও এর বর্তমান হালচালকে পরখ করে। এর সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিত্র-বিচিত্রতা, মার্কসবাদী মেরুকরণের পতন-অধঃপতন ও ব্রেখ্ট নির্দেশনার কঠিন অনুশাসনও তাঁদের আগ্রহকে অনাগ্রহে পরিণত করেছে। তরুণ মঞ্চচিন্তক অংশুমান ভৌমিক সেকালের ভাবনাকে দূরে রেখে একালে বসে প্রশ্ন রেখেছেন – ‘শিল্পী কমিউনিস্ট না হলে, কুশীলব মার্কসবাদে আস্থাশীল না হলে কি সত্যিই ব্রেখশট থেকে এত দূরে সরে যেতে হয়?৪৮

শিল্পে এবং সংগ্রামে শেষ বলে কিছুই নেই তাহলে শ্রেণিসংগ্রামে যুক্ত না থাকলে ব্রেখ্টচর্চা করা যাবে না! বিশ্ব নাট্যাঙ্গনের প্রখর বামভাবনার অনুসারী ইউজিন ও’নীল, বার্নাড শ, জ্যঁ পল সার্ত্রে, এডওয়ার্ড অ্যালবির অবস্থাও কী ব্রেখ্টের মতো হবে! বা হয়েছে? আমার মনে হয়, ব্রেখ্ট প্রযোজনায় অন্তর্ভুক্ত হোক নাট্যদলগুলি, তরুণ প্রজন্ম যুক্ত হোক নাট্য-নির্দেশনায়। এবং নাটক থেকে উৎসারিত পরবর্তী চিন্তার জগৎ নাট্যকর্মীরাই ঠিক করে নিক। আদর্শ বা তত্ত্বকে নির্ভেজাল ধর্মগ্রন্থ না ভেবে সামাজিক বাস্তবতাকে তুলনামূলক বিচার-বিবেচনায় রেখে ব্রেখ্টের নাটক উপস্থাপন করুক। এপিক থিয়েটার বা অ্যালিয়েনেশন তত্ত্বের ব্যতিক্রম বিচারে নতুন উদ্ভাবন হোক। সফলতা আসুক বা না আসুক ব্রেখ্ট চর্চা অব্যাহত থাকুক। প্রখ্যাত নির্দেশক বিভাস চক্রবর্তীকে ব্রেখ্টের দুটি নাটক নাজির বিচার ও পাঁচু ও মাসি নির্দেশনা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাঁর উত্তরে তিনি বলেছিলেন – ‘নাটক দুটি যে সময়কার লেখা, তখন ব্রেখ্টের বিশেষ প্রযোজনা-রীতি চালু হয়নি। তাই নির্ভয়ে এই নাটকগুলি নিয়ে কাজ করা যাবে, কেতাবি পণ্ডিতদের কোপানলে পড়তে হবে না। এসব ভাবনা কাজ করেছিল।’৪৯ বিভাস চক্রবর্তীর কথা টেনে বলছি – কোপানল থেকে রক্ষা পাক তরুণ প্রজন্ম, ব্রেখ্ট পুনরুজ্জীবিত হোক।

তথ্যসূত্র

১              ইসরাইল খান, বাংলা সাময়িকপত্র পাকিস্তান পর্ব, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৪, পৃ ৩৯০-৯১।

২              সেলিম আল দীন, ‘থিয়েটার নিবেদিত সুবচন নির্বাসনে ও কতিপয় ধারণা’, থিয়েটার, রামেন্দু মজুমদার (সম্পাদক), দশম বর্ষ, তৃতীয়-চতুর্থ সংখ্যা, অক্টোবর ১৯৮৩, পৃ ২১৪।

৩             কবীর চৌধুরী, ‘ব্রেখট ও তাঁর গ্যালিলিও’, গ্যালিলিও, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, ঢাকা, ১৯৮৬, সুভ্যেনির।

৪              আতাউর রহমান, ‘মিলনের তীর্থে দাঁড়িয়ে নাগরিক’, নাগরিক নাট্যোৎসব, এসএম আখতার (আহ্বায়ক, প্রকাশনা উপ-পরিষদ), নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, ১৯৯০, সুভ্যেনির।

৫              মলয় ভৌমিক (তথ্য প্রেরণকারী), ২২শে আগস্ট ২০২৪, হোয়াটসঅ্যাপ।

৬             শিমুল সিদ্দিকী (তথ্য প্রেরণকারী), ২৮শে ডিসেম্বর ২০২৪, হোয়াটসআপ।

৭              দৈনিক প্রথম আলো, ৩০শে জুলাই ২০১৯।

৮              ‘উৎসব সূচি’, নাগরিক নাট্যোৎসব, জিয়াউল হাসান কিসলু (আহ্বায়ক, প্রকাশনা উপ-পরিষদ), নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, ২০০৩, সুভ্যেনির।

৯              কাজলরেখা, জাহিদ রিপন (নির্দেশক), ফরিদপুর থিয়েটারের কার্যক্রম, ফরিদপুর থিয়েটার, ১৯৯৫, সুভ্যেনির।

১০           দেওয়ান গাজীর কিসসা, মুকসুদ আলী মজুমদার (নির্দেশক), জনান্তিক নাট্য সম্প্রদায়, কুমিল্লা, ২০২৪ ও সেলফোন-বশীরুল আনোয়ার বশীর ২০২৫।

১১            অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়, ৪৫ পেরিয়ে, শিশির দত্ত

(গ্রন্থ সম্পাদক), অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়, চট্টগ্রাম,

 ২০২০, পৃ ৫৩।

১২            রাইফেল, মোস্তফা কামাল যাত্রা (নির্দেশক), স্মৃতি তর্পণ : শহীদনগর থিয়েটার, শহীদনগর থিয়েটার, চট্টগ্রাম, ১৯৯৭, সুভ্যেনির।

১৩           ‘সীমানা পেরিয়ে শততম মঞ্চায়নে’ রওশন জান্নাত রুশনী (সম্পাদক), শব্দ নাট্যচর্চা কেন্দ্র, ঢাকা, ২০১৬, সুভ্যেনির।

১৪            ড. আশিস গোস্বামী (সম্পাদক), শব্দাবলী স্টুডিও থিয়েটার কথা, শব্দাবলী স্টুডিও থিয়েটার, বরিশাল, ২০১৮, পৃ ৬৭।

১৫            ‘পালাকার ল্যাবঅ্যাক্ট/ স্টুডিও থিয়েটার প্রযোজনা’, প্রযোজনা তালিকা, শামীম সাগর (তথ্য প্রেরণকারী), পালাকার, ঢাকা, ২০২০, পালাকার প্যাড।

১৬           ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, ঢাকা’, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার নির্দেশিকা, ম. হামিদ ও অন্যান্য (সম্পাদক), বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ২০০৫, পৃ ২, অভিধান।

১৭            হিম্মতী বাঈ, মীর মুজতবা আলী (নির্দেশক), মিন্টু বসু ও অন্যান্য (প্রকাশনা সম্পাদক), খেয়ালী গ্রুপ থিয়েটার, বরিশাল, ২০০১, পৃ ২৫।

১৮           হিম্মতি মা, আতাউর রহমান (নির্দেশক), নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, ঢাকা, ১৯৯৫, সুভ্যেনির।

১৯            মঞ্চায়নের গৌরবোজ্জ্বল ২৫ বছর উপলক্ষে প্রযোজনা ১৯, বহুবচন, ১৯৯৭, ফোল্ডার।

২০           মলয় ভৌমিক (তথ্য প্রেরণকারী), ২২শে আগস্ট ২০২৪, হোয়াটসঅ্যাপ।

২১            ‘সৈয়দ বদরুদ্দীন হোসাইন স্মৃতি নাট্যোৎসব ও স্মারক সম্মাননা ২০১৭’, পদাতিক নাট্য সংসদ, টিএসসি, ঢাকা, ২০১৭, পৃ ২৭, সুভ্যেনির।

২২           রফিউর রাব্বি, উদীচী নারায়ণগঞ্জের কথা, উদীচী বিপ্লবী ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার, কামাল লোহানী ও অন্যান্য (সম্পাদক), উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ, ঢাকা, ২০১৯,

পৃ ৩২৭।

২৩           বিধি ও ব্যতিক্রম, লিয়াকত আলী লাকী (নির্দেশক), লোক নাট্যদল, ঢাকা, সুভ্যেনির।

২৪            সমাধান, সৈয়দ জামিল আহমেদ (নির্দেশক), তির্যক, চট্টগ্রাম, সুভ্যেনির।

২৫           সমাধান, বিভাস রায় (নির্দেশক), ইংগিত থিয়েটার, নাটোর, ২০১৯, ইংগিত থিয়েটার, নাটোর, ফেইসবুক।

২৬           গ্যালিলিও, আতাউর রহমান (নির্দেশক), ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’, ঢাকা, মনসুর আহমেদ (স্মরণিকা সম্পাদক), ১৯৮৬, সুভ্যেনির।

২৭            চক সার্কেল, ম. হামিদ (নির্দেশক), নাট্যচক্র, ঢাকা, নাট্যচক্রের ৩৩ বছর, চঞ্চল সাহা অপু (সুভ্যেনির সম্পাদক), ২০০৫, সুভ্যেনির।

২৮           জুলিয়াস সিজারের শেষ সাতদিন, শান্তনু বিশ^াস, কালপুরুষ নাট্য সম্প্রদায়, চট্টগ্রাম, ১৯৮৮, লিফলেট।

২৯           ধূর্ত উই, ক্লস ক্যুসেনবার্গ (নির্দেশক), রেজাউল হায়দার ও অন্যান্য (প্রকাশনা), ঢাকা থিয়েটার, ঢাকা, ১৯৮৯, সুভ্যেনির।

৩০           লোক সমান লোক, ফ্রিৎজ বেনেভিৎজ (নির্দেশক), ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ কেন্দ্র, ঢাকা, ১৯৯৩, সুভ্যেনির।

৩১           বিচার, বিক্রম চৌধুরী (নির্দেশক), কথক নাট্য সম্প্রদায়, চট্টগ্রাম, ১৯৯৬, ফোল্ডার।

৩২           নাজির বিচার, রুডা নির্দেশনা দল (নির্দেশক), রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ড্রামা অ্যাসোসিয়েশন (রুডা), রাজশাহী, তথ্যসরবরাকারী সোহেল রানা (সাবেক সাধারণ সম্পাদক)।

৩৩           অমিত রঞ্জন দে, নাটক ও সংগ্রামে উদীচী, উদীচী বিপ্লবী ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার, কামাল লোহানী ও অন্যান্য (সম্পাদক), উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ, ঢাকা, ২০১৯,

পৃ ১৭৯।

৩৪           হাতে হারিকেন, মাসুদ পারভেজ (নির্দেশক), নাট্যধারা, ঢাকা, সুভ্যেনির।

৩৫           ‘নাগরিক নাট্যাঙ্গন নাট্য উৎসব ২০০৫’, মাহমুদুল ইসলাম সেলিম (সুভ্যেনির সম্পাদক), নাগরিক নাট্যাঙ্গন, ঢাকা, ২০০৫।

৩৬           আইন, শফিক রহমান (নির্দেশক), ভাস্কর নাট্যদল, ঢাকা, ২০০৫, ফোল্ডার।

৩৭           আলী যাকের, ‘বাকি ইতিহাস থেকে খাট্টা তামাশা, আমার নাটক; প্রয়োগ ভাবনা’, দক্ষিণ এশীয় নাট্যোৎসব, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, ঢাকা, ১৯৯৭, সুভ্যেনির।

৩৮           আসাদুজ্জামান নূর, ‘নির্দেশকের কথা’, দেওয়ান গাজীর কিসসা, দক্ষিণ এশীয় নাট্যোৎসব, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, ঢাকা, ১৯৯৭, সুভ্যেনির।

৩৯           আতাউর রহমান, ‘নির্দেশকের কথা’, গ্যালিলিও, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, ঢাকা, ১৯৮৬, সুভ্যেনির।

৪০           কামালউদ্দিন নীলু, ‘নির্দেশক’, মা, পদাতিক নাট্য সংসদ, ঢাকা, ১৯৮৪, সুভ্যেনির।

৪১            অংশুমান ভৌমিক, জরুরি থিয়েটার, জব্বর মাস্টর, বেলঘরিয়া অভিমুখ, ২০১৯, পৃ ৬৩।

৪২            অংশুমান ভৌমিক, জরুরি থিয়েটার, জব্বর মাস্টর, বেলঘরিয়া অভিমুখ, ২০১৯, পৃ ৬৩।

৪৩           উৎপল দত্ত, ‘ব্রেখ্ট্ : বিপ্লবের সহযোদ্ধা’, থিয়েটার, রামেন্দু মজুমদার (সম্পাদক), ঢাকা, ষষ্ঠ বর্ষ, প্রথম সংখ্যা, এপ্রিল ১৯৭৮, পৃ ১০৫।

৪৪            আশিস গোস্বামী (সম্পাদক), থিয়েটার বুলেটিন, বের্টল্ট ব্রেখট বিশেষ সংখ্যা, অনুপমা প্রকাশনী, কলকাতা, ২০২৪, পৃ ৩১।

৪৫            কবীর চৌধুরী, ‘ব্রেখট ও তাঁর গ্যালিলিও’, গ্যালিলিও, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, ১৯৮৬, সুভ্যেনির।

৪৬           আরিফ হায়দার, ‘ঢাকার মঞ্চে ব্রেখটের নাটক’, অনার্য, ঢাকা, ২০২২, পৃ ২১।

৪৭            আবদুস সেলিম (অনুবাদক), প্রথম সংস্করণের ভূমিকা, কবিতা : ব্রেটল্ট ব্রেখট, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা, ২০২২।

৪৮           অংশুমান ভৌমিক, জরুরি থিয়েটার, জব্বর মাস্টর, বেলঘরিয়া অভিমুখ, ২০১৯, পৃ ৭৯।

৪৯           আশিস গোস্বামী (সম্পাদক), থিয়েটার বুলেটিন, বের্টল্ট ব্রেখট বিশেষ সংখ্যা, অনুপমা প্রকাশনী, কলকাতা, ২০২৪, পৃ ৩১।