বাঙালি সংস্কৃতির যুগলদূত

লেখক:

জয়নাল হোসেন
বিশ্বে বাংলাদেশ আজ আর অচেনা-অজানা কোনো দেশের নাম নয়। বাংলাদেশের ষোলো কোটি মানুষের অনেকের বিচরণ আজ বিশ্বের সর্বত্র। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-শ্রমের মাধ্যমে বাঙালিদের অবদান বিশ্বের দেশে দেশে আজ আলোচিত ও স্বীকৃত। বিপন্ন মানবতাকে স্বস্তিতে রাখার আর দেশে দেশে কাঙ্ক্ষিত শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাঙালিদের অবদান খোদ জাতিসংঘেরও স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে চেনে শান্তির পারাবতের আবাসস্থল হিসেবে। বাংলাদেশের মহান একুশে আজ বিশ্বে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে সমহিমায় সমুজ্জ্বল। বাংলার কৃষ্টি-কালচার বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার সময় এসেছে আজ। বাঙালিদের কেউ কেউ সাধ্যমতো সে-চেষ্টা চালিয়েও যাচ্ছেন। তবে বহির্বিশ্বে বাঙালিদের আশার আলোর মশাল ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন সংস্কৃতির এক যুগলদূত – যার একজন বাঙালি আর অন্যজন বিশ্বনাগরিক। বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে তাঁরা তাঁদের লেখনী এবং ইন্টারকালচারাল ফোরামের কার্যক্রমকে অবলম্বন করেছেন। আশার কথা, দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে নিরলস প্রয়াসের মাধ্যমে Intercultural Forum- এর ব্যানারে বাংলা ভাষার ইতিহাস ও বাঙালিদের ঐতিহ্যকে তাঁরা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার সফল প্রয়াস অব্যাহত রেখেছেন। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের এ মহান যুগলদূত হচ্ছেন অধ্যাপক ড. আনোয়ার দিল ও অধ্যাপিকা ড. আফিয়া দিল।
পাঞ্জাবের জলন্ধরে ১৯২৮ সালে ড. আনোয়ার দিলের জন্ম। তিনি বেড়ে উঠেছেন পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অ্যাবোটাবাদ শহরে। তিনি শিক্ষালাভ করেছেন লাহোর সরকারি কলেজ ও পেশোয়ার ইসলামিয়া কলেজে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ইউনিভার্সিটি ও ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন। পাকিস্তানের সরকারি ডেরাগাজী খান কলেজ, সরকারি শাহীওয়াল কলেজ এবং লাহোর সরকারি কলেজে তিনি দীর্ঘ ষোলো বছর ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে ছাত্রদের পড়িয়েছেন। পশ্চিম পাকিস্তানের শিক্ষা সম্প্রসারণ সেন্টারে ভাষা-বিশেষজ্ঞ হিসেবে অধ্যাপনা করেছেন। তিনি পরে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং ১৯৭৩ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোর ইউনাইটেড স্টেটস ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (পরে যার নামকরণ হয়েছিল অ্যালিয়েন্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি) ভাষাতত্ত্ব বিভাগে অধ্যাপনা করেন। তিনি ইউনাইটেড স্টেটস ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ২০০৩ সাল থেকে প্রফেসর এমেরিটাস হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ইংরেজি ভাষায় তাঁর প্রণীত পুস্তকের মধ্যে Humans and Universe (1983); On the Earth Together (1994); Norman borlaug on World Hunger (1997); Science, Education and Development (2002); Toward Eradicating Hunger and Poverty (2003); Intercultural Education (2004); Toward a Hunger free World (2004); Science for Peace and Progress (2008) অন্যতম। তাঁর একক প্রণীত ও যৌথভাবে সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা পঁয়তাল্লিশটি, যার মধ্যে উনিশটি পুস্তকই ভাষাবিজ্ঞান আর জাতীয় উন্নয়নের ওপর এবং এই সিরিজের বইগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি একজন দক্ষ ক্যালিগ্রাফি বিশেষজ্ঞ এবং তাঁর সৃজনকৃত চমৎকার ক্যালিগ্রাফিক চিত্রগুলো বিশ্বের শিল্প-সমঝদার ব্যক্তিদের আগ্রহের সঙ্গে সংগ্রহের বস্ত্ত হিসেবে গুরুত্ব পেয়ে আসছে।
আর ড. আফিয়া খাতুনের জন্ম বৃহত্তর ঢাকার বর্তমান নরসিংদী জেলায়। ঢাকার ইডেন গার্লস হাই স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক এবং ইডেন গার্লস কলেজ থেকে আইএ পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও ১৯৪৬ সালে মাস্টার্স করেন। ইউনিভার্সিটি অব নিউজিল্যান্ড থেকে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা লাভ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজি ও ব্যবহারিক ভাষাতত্ত্বে (অ্যাপ্লায়েড লিঙ্গুয়িস্টিকস) মাস্টার্স করেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ভাষাবিজ্ঞানের (লিঙ্গুয়িস্টিক) ওপর গবেষণা করে তিনি পিএইচ ডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৫৪ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত ইডেন গার্লস কলেজে অধ্যাপনা করেন। তিনি ভাষা-বিশেষজ্ঞ হিসেবে ১৯৬১ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা সম্প্রসারণ সেন্টারে অধ্যাপনা করেন এবং লাহোরে পশ্চিম পাকিস্তান শিক্ষা সম্প্রসারণ সেন্টারে ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি, কলাম্বিয়া ও সান দিয়েগো বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি ভাষাতত্ত্ব পড়িয়েছেন। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার ইউনাইটেড স্টেটস ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে লিঙ্গুয়িস্টিকস, উইমেন স্টাডিজ এবং লিডারশিপ স্টাডিজের ওপর ১৯৭৩ সাল থেকে অধ্যাপনা করে আসছেন। ২০০৩ সাল থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অ্যালিয়েন্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে প্রফেসর এমেরিটাস হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তাঁর প্রণীত ও প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অনেক। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে নিউজিল্যান্ডের পত্র, ক্যারোলিন প্র্যাটের আই লার্ন ফ্রম চিলড্রেন গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ, যে দেশ মনে পড়ে এবং হেলেন কেলারের মাই টিচার গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ অন্যতম। তিনি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর তরঙ্গভঙ্গ (১৯৬৪) নাটকের The Breakers শিরোনামে ইংরেজি অনুবাদ করেছেন। তাঁর প্রণীত ইংরেজি গ্রন্থের মধ্যে English Loanwords in Bengali; Bengali Baby Talk (with Charles A. Ferguson); The Sociolinguistic Variable(s) in Bengali : A sound change in progress; Diglossia in Bangla : A Study of shifts in the Verbal Repertoire of the education classes in Dhaka, Bangladesh; Bengali Language Movement and Creation of Bangladesh (Co-author with Dr. Anwar Dil, 2011); Two Traditions of the Bengali Language (Cambridge, 1991); Bengali Nursery Rhymes (2010) অন্যতম। অধিকন্তু শিক্ষানুরাগী অধ্যাপিকা ড. আফিয়া দিল তাঁর শিক্ষক পিতার এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-প্রতিষ্ঠা, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার কাজেও সময়ে সময়ে উৎসাহ নিয়ে অবদান রেখে চলেছেন।
পাঞ্জাবের জলন্ধরের সন্তান ড. আনোয়ার দিলের সঙ্গে সে সময়কার কর্মক্ষেত্র যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে ১৯৬০ সালে ড. আফিয়া খাতুনের পরিচয় ঘটে। ড. আনোয়ার দিলের সঙ্গে ১৯৬১ সালের মার্চে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তারপর থেকে উন্নত সংস্কৃতি-মানসিকতায় সমৃদ্ধ এই দম্পতি ‘ইন্টারকালচারাল ফোরামে’ কাজ করা আরম্ভ করেন। ড. আনোয়ার দিল পাঞ্জাবি, উর্দু, পশতু, ফার্সি ও ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী এবং মুক্তমনের অমায়িক মানুষ। ড. আফিয়া খাতুনের সঙ্গে বিয়ের পর তিনি বাংলা ভাষাকে বেশি করে ভালোবাসতে শুরু করেন। পাকিস্তানি নাগরিক ড. আনোয়ার দিল বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিক্ষা-সংস্কৃতির সঙ্গে অনুসন্ধিৎসুভাবে পরিচিত হন। ড. আফিয়া দিলও ভাষাবিজ্ঞানী। উভয়ে নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন আর একের পর এক তথ্যসমৃদ্ধ ও মূল্যবান পুস্তক ইংরেজি ভাষায় লিখে বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতিকে বহির্বিশ্বে প্রচার করে চলেছেন। ড. আনোয়ার দিল ও ড. আফিয়া দিলের যৌথভাবে ইংরেজি ভাষায় প্রণীত পুস্তকের মধ্যে Intercultural Studies Series-এর বাংলাদেশ চ্যাপ্টারে এ-যাবৎ তাঁদের মোট আটটি মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
ড. আফিয়া দিল প্রণীত Bengali Nursery Rhymes (2010) শিশুবিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের উদ্দেশে প্রণীত।
শিশুবিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের জন্য শিশু-ভোলানো ছড়ার বই প্রণয়নের জন্য ড. আফিয়া দিল তিন দশক ধরে পরিশ্রম করে বিশ্বের বিদেশি ভাষাভাষী ও বাংলা ভাষার প্রখ্যাত ছড়াকার এবং কবিদের রচিত মূল্যবান শিশুতোষ পুস্তক পড়েছেন এবং প্রচুর শিশু-ভোলানো মূল্যবান ছড়া সংগ্রহ করেছেন। বাংলাদেশের শিশুদের উন্নত মানসিকতায় গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে তিনি তাদের কাঙ্ক্ষিত পুস্তকে সন্নিবেশ করার জন্য ছড়া নির্বাচনে যথেষ্ট সুবিবেচনা ও পরিচ্ছন্ন মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। হালনাগাদ করা তাঁর ছড়াসংগ্রহ থেকে বাছাই করে ইংরেজি ভাষায় দেশে ও দেশের বাইরের শিশুবিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের উদ্দেশে শিশু-ভোলানো চমৎকার ছড়ার এই পুস্তক Bengali Nursery Rhymes নামে প্রণয়ন করেছেন। বিদেশ ও বাংলাদেশের শিশুদের পিতামাতা বা অভিভাবকরা তাঁদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া সন্তানদের আনন্দের সঙ্গে ছড়া ও কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে উন্নত মানসিকতায় গড়ে তোলার উপযুক্ত উপকরণ এই পুস্তকে পাবেন।
ড. আনোয়ার দিল কর্তৃক প্রণীত গ্রন্থ Bangladesh: An Intercultural Mosaic (2010)। বাংলাদেশের কতিপয় মনীষীর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে বইটিতে মনোজ্ঞ আলোচনা করা হয়েছে। গভীর উৎসাহ এবং অসীম অনুসন্ধিৎসা নিয়ে বাংলাদেশের বরেণ্য মনীষীদের সম্পর্কে যারা জানতে আগ্রহী তাদের জন্য ড. আনোয়ার দিলের পরিশ্রমলব্ধ ও মেধা খাটিয়ে রচিত পুস্তকটি একটি চমৎকার উৎস হিসেবে বিবেচিত হবে। কোনো গবেষকের মধ্যে যদি সংশ্লিষ্ট মনীষী সম্পর্কে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি আর তথ্য সংগ্রহে অপরিমেয় নিষ্ঠা না থাকে তাহলে সহজলভ্য তথ্যের অভাব থাকার পরেও সচরাচর এসব পুস্তক প্রণয়নের ঝুঁকি নিতে কেউ রাজি হন না। সাবের রেজা করিম, বেগম সুফিয়া কামাল, লায়লা আর্জুমান্দ বানু, লুলু বিলকিস বানু, কাজী মোতাহার হোসেন এবং কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে মূলত এই পুস্তকে আলোচনার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও সঙ্গে সঙ্গে সমকালীন দেশ-বিদেশের অনেক মনীষীর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে আলোচনায় উঠে এসেছে যা সচরাচর পাঠকের জানার পিপাসাকে আরো তৃষ্ণাতুর করে তুলবে। গ্লিমসেস অব ওল্ড ঢাকা পুস্তকের লেখক প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সৈয়দ মোহাম্মদ তৈফুরের কন্যা লুলু বিলকিস বানু (লায়লা আর্জুমান্দ বানুর বড় বোন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আইন ক্লাসে সহপাঠী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে লুলু বিলকিস বানু আরো ছাত্রী নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির দাবি আদায়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দাবি আদায়ের উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে ভিসি ড. সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। ভিসি ড. সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন ছিলেন লুলু বিলকিস বানুর আত্মীয় ও পরিচিত। লুলু বিলকিস বানুকে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আসতে দেখে ভিসি ড. সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন ক্ষেপে যান এবং তার বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ তৈফুরের নিকট কৈফিয়ত চাইবেন বলে জানালে লুলু বলেন, সে এখানে যে এসেছে তা তার বাবা জানেন (যদিও জানেন না)। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে লুলু বিলকিস বানু ভিসি সাহেবের কক্ষের দরজার সামনে দাবি না মানা পর্যন্ত ফ্লোরে বসে থাকেন। দাবি আদায় হলেও বঙ্গবন্ধুসহ তাদের সকলকে ভিসি প্রদত্ত শাস্তি ভোগ করতে হয়েছিল। অনেকে জরিমানা পরিশোধ করে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করলেও বঙ্গবন্ধু জরিমানা দিতে অস্বীকার করায় তাঁর আর ল’ পাশ হয়নি। বাংলাদেশের এসব মনীষী সম্পর্কে দেশের বাইরের মানুষকে বিদেশি তথা ইংরেজি ভাষায় অবহিত করার উদ্দেশ্যে একজন অবাঙালি তথা পাকিস্তানি (বিশ্বনাগরিক) হয়েও ড. আনোয়ার দিলের মহতী উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।
ড. আনোয়ার দিল ও ড. আফিয়া দিল প্রণীত Bengali Language Movement and Creation of Bangladesh (2011) পুস্তকটি বাংলাদেশের ভাষা-আন্দোলনের পটভূমি, বিস্তৃতভাবে গড়ে ওঠা এবং সফল সমাপ্তির ইতিহাস এক বিশাল গৌরবময় ক্যানভাসের ওপর চিরদীপ্যমান। বাংলাদেশের ইতিহাসে ভাষা-আন্দোলন নিঃসন্দেহে একটি যুগান্ত সৃষ্টিকারী ঘটনা। স্বভাবতই আগামী প্রজন্মের জানার আগ্রহ থাকবে, ভারত বিভক্তির মাধ্যমে ১৯৪৭ সালে কেন পাকিস্তানের তথা পূর্ব পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল আর ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের অবলুপ্তি ঘটিয়ে কেন বাঙালিদের বহুল কাঙ্ক্ষিত আবাসভূমি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল? ড. আনোয়ার দিল ও ড. আফিয়া দিল উভয়েই ভাষাবিজ্ঞানের পন্ডিত। তাঁরা ১৯৬১ সাল থেকে বাংলা, ইংরেজি, উর্দু ও অন্যান্য ভাষায় রচিত পুস্তক ও নানা সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ২০০০ সালে পন্ডিত ব্যক্তিদের এবং লাইব্রেরিতে পাঠের জন্য ছোট পরিসরে পাকিস্তানের লাহোর থেকে সীমিত কপির একটি সংকলন প্রকাশ করেছিলেন। এটি একটি মৌলিক ও চমৎকার কাজ হিসেবে সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। বর্ধিত কলেবরে এবং আরো বিশদ বিবরণে ২০১১ সালে সংকলনটি বাংলাদেশ থেকে অ্যাডর্ন পাবলিকেশন প্রকাশ করেছে। এই সংকলনে পূর্ববঙ্গের ১৯০৫ সালের প্রথম বিভক্তি এবং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পূর্ববঙ্গের তথা পূর্ব পাকিস্তানের সৃষ্টি এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী চল্লিশ বছরে দেশ ও জাতির অগ্রগতির পর্যালোচনাও আলোচনায় স্থান পেয়েছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলের জাতীয় নেতাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা ও বিবৃতি এই সংকলনে অন্তর্ভুক্তির ফলে বাংলাদেশ সংকলনটির গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
ড. আনোয়ার দিল প্রণীত Bangladesh: An Intercultural Panorama (2011) পুস্তকে ১৯৬১ সাল থেকে Intercultural Studies Series সংকলন করেছেন। তাঁর Contributions to Bangladesh Studies Volume X-এ তিনি বাংলাদেশের বিশিষ্ট কয়েকজন ভাষাবিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক ও বিদগ্ধ ব্যক্তির জীবন ও কর্মের নানা দিক অন্তর্ভুক্ত করে এই পুস্তক প্রণয়ন করেছেন। তাঁদের মধ্যে এই পুস্তকের আলোচনায় স্থান পেয়েছেন শিক্ষাবিদ ও ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, শিল্পী মুর্তজা বশীর, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, কবি ও সামরিক অফিসার আবদুল কাইয়ুম প্রমুখ। এই পুস্তকে ড. আনোয়ার দিলের আলোচনায় শিক্ষা ও রাজনীতি ছাপিয়ে আন্তঃসংস্কৃতির আলোচনাই প্রাধান্য পেয়েছে। এই পুস্তকে আলোচিত বিদগ্ধ ব্যক্তিদের সম্পর্কে আগ্রহী পাঠকের আরো গভীরভাবে জানার সুযোগ রয়েছে।
ড. আনোয়ার দিল প্রণীত Bangladesh: An Intercultural Memoir (2011) পুস্তকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, ড. সৈয়দা ফাতেমা সাদেক, ড. আবদুস সাদেক, ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, ড. সৈয়দ আলী আহসান, ড. সৈয়দ আলী আশরাফ প্রমুখ গুণী ব্যক্তি ও তাঁদের কর্ম সম্পর্কে তিনি আলোচনা করেছেন। ১৯৬০ সাল অর্থাৎ সাবেক পূর্ব পাকিস্তান আমল থেকেই আলোচিত এই ছয় মনীষীর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে ড. আনোয়ার দিলের জানাশোনা ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সে-সুবাদে তিনি তাঁদের জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনার অবকাশ পেয়েছেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের শিল্পকর্ম সে-সময়ে সর্বমহলে বেশ আলোচিত ও প্রশংসিত হয়েছিল। কঠিন সংগ্রামের মাধ্যমে পাদপ্রদীপে উঠে এসেছেন ড. সৈয়দা ফাতেমা সাদেক। এ-পুস্তকে আলোচিত মেধাবীমুখ ড. আবদুস সাদেক, ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, ড. সৈয়দ আলী আহসান, ড. সৈয়দ আলী আশরাফ প্রমুখ নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠালাভ করে দেশ ও জাতির উন্নয়ন এবং অগ্রগতির জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে অমর হয়ে আছেন। তাঁদের কর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরো অনেক মনীষীর নাম উঠে এসেছে যাঁদের বিষয়ে ড. আনোয়ার দিলের আলোচনায় পাঠক লাভবান হবেন।
ড. আনোয়ার দিল-প্রণীত Living with Integrity: Saber Reza Karim of Bangladesh (2011) পুস্তকে আলোচিত সাবের রেজা করিম ছিলেন ড. আনোয়ার দিলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সাবের রেজা করিম ছিলেন একজন ব্রিলিয়ান্ট সিএসপি অফিসার। তাঁর পিতা এ কে বজলুল করিম কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে এমএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন সিভিল সার্ভেন্ট। তিনি বাংলা, ইংরেজি ছাড়াও ফার্সি, আরবি ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। এ কে বজলুল করিমের পিতা আবু রশিদ ছিলেন ইন্সপেক্টর অব স্কুলস। স্বভাবে তিনি ছিলেন মুঘল ঐতিহ্যের ধারক। তিনি বাংলা ব্যতীত আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃত ভাষা জানতেন। তাঁর শিক্ষা, কওমের সঙ্গে সংহতি ও সহমর্মিতা আর দরবেশি চরিত্রের জন্যে তিনি সুনামের অধিকারী ছিলেন। আরবি ভাষায় মোনাজাত না করে বাংলা ভাষায় করায় সে-সময়কার মোল্লাদের এক অংশ তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষেপে যায়। স্বনামধন্য ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বিখ্যাত উপন্যাস লালসালু আবু রশিদকে অমর করে রেখেছে।
১৯৫৬ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের ডেরাগাজী খান জেলার ডেপুটি কমিশনার ইফতিখার আহমদ আদানি ড. আনোয়ার দিলের সঙ্গে মেধাবী সিএসপি অফিসার সাবের রেজা করিমকে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সে থেকে ভদ্র, মার্জিত ও সংস্কৃতমনা সাবের রেজা করিম ছিলেন ড. আনোয়ার দিলের বন্ধু ও সুহৃদ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত সাবের রেজা করিম দেশ-বিদেশে সুনামের সঙ্গে চাকরি করেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে ফিরে ১৯৭২ সালে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাকরিতে যোগদান করেন। তিনি রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চাকরি থেকে অবসরগ্রহণের পর তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় নানা প্রতিষ্ঠানের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে তাঁর মৃত্যুর পর দেশের অনেক জ্ঞানী-গুণীর বিবৃতিতে সাবের রেজা করিমের প্রতি সর্বমহলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। ড. আনোয়ার দিলের এই পুস্তকে বিবৃতিগুলো সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ করায় বইটি আরো সমৃদ্ধ হয়েছে এবং সাবের রেজা করিমের প্রতি ড. আনোয়ার দিলের অকৃত্রিম বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।
ড. আনোয়ার দিল Bangladesh: An Intercultural Collage (2012) পুস্তকটিতে প্রফেসর শহীদ সোহরাওয়ার্দী, ড. আকতার হামিদ খান, ড. আহমেদ হাসান দানী, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্, আববাসউদ্দিন আহমদ এবং ড. শায়েস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামউল্লাহ প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি স্যার জাহিদ সোহরাওয়ার্দীর ছেলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী (১৮৯০-১৯৬৫) ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন আর্টসের অধ্যাপক, আর্টিস্ট, কবি ও লেখক। তিনি রানী বাগেশ্বরীর অধ্যাপক ছিলেন। ড. আকতার হামিদ খান ছিলেন আইসিএস অফিসার। কুমিল্লায় সমবায় আন্দোলন গড়ে তুলে এশিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করেন। কৃষকদের প্রিয় আকতার হামিদ খান আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করে আইসিএস অফিসার হয়ে নানা স্থানে চাকরি করেন। কুমিল্লায় পাকিস্তান আমলে তিনি ছিলেন জেলা প্রশাসক, পরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ, সবশেষে পল্লী উন্নয়ন একাডেমী প্রতিষ্ঠা করে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ড. আহমেদ হাসান দানী (১৯২০-২০০৯) ছিলেন কাশ্মিরি অরিজিন, সেন্ট্রাল ইন্ডিয়ার রায়পুরে তাঁর জন্ম। তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেন। প্রখ্যাত এই স্কলার ১৯৪৭ সালের দিকে ভারত থেকে ঢাকায় চলে আসেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ড. আহমেদ হাসান দানী প্রত্নতত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর কাজ করে স্মরণীয় হয়ে আছেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-৭১) সাংবাদিক, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ রচিত লালসালু (১৯৪৮) উপন্যাসটি তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। কুচবিহারের সন্তান আববাসউদ্দিন আহমদ (১৯০১-৫৯) ছিলেন পল্লীগীতির সম্রাট ও কিংবদন্তি গায়ক। পল্লীগীতির সম্রাট আববাসউদ্দিন আহমদ তাঁর কণ্ঠের গানের জন্য অমর হয়ে রয়েছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলমান ভাইস চ্যান্সেলর স্যার ডা. হাসান সোহরাওয়ার্দীর কন্যা ড. শায়েস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামুল্লাহ (১৯১৫-২০০০) লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ ডি করেন। আইসিএস অফিসার মোহাম্মদ ইকরামুল্লাহর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ড. শায়েস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামুল্লাহ উর্দু ও ইংরেজি ভাষার লেখিকা ছিলেন। ইংরেজি ভাষায় তাঁর রচিত বিখ্যাত পুস্তক From Purdah to Parliament (১৯৬৩) সর্বমহলে প্রশংসা লাভ করে। তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি জিন্নাহ ও ফাতেমা জিন্নাহর সঙ্গে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন। তিনি ১৯৪১ সাল থেকে মুসলিম লীগের ছাত্রী ফেডারেশনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৪৫ সালে ভারতের Constituent Assembly-র সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর স্বামী আইসিএস অফিসার মোহাম্মদ ইকরামুল্লাহ পাকিস্তানের প্রথম পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন। কুমিল্লা জেলার থোল্লার (মুরাদনগর) প্রখ্যাত জমিদার মীর আশরাফ আলী খানের উত্তর পুরুষ ড. সৈয়দ সাইয়ুদ হোসেন (১৮৮৮-১৯৪৯) ছিলেন ড. শায়েস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামুল্লাহর মামা। সে-সময়ে মুম্বাই ক্রনিকল পত্রিকার কিংবদন্তি সম্পাদক ছিলেন বি.জি. হরনিম্যান। বি.জি. হরনিম্যানের সম্পাদনায় প্রকাশিত মুম্বাই ক্রনিকল পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক হিসেবে ১৯১৬ সালে যোগদান করে ড. সৈয়দ সাইয়ুদ হোসেন তাঁর কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। এলাহাবাদ থেকে প্রকাশিত পন্ডিত মতিলাল নেহ্রুর মালিকানায় প্রথম প্রকাশিত দৈনিক দি ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকায় ১৯১৯ সালে সম্পাদক পদে যোগদান করেন। সে-সময়ে পন্ডিত জওয়াহেরলাল নেহ্রুর বোন বিজয় লক্ষ্মী পন্ডিতের সঙ্গে তাঁর প্রেম হয়। তাঁরা প্রেম করে বিয়ে করায় ভারতব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি ছাড়াও সাম্প্রদায়িক জটিলতার সৃষ্টি হয়। মহাত্মা গান্ধীর হস্তক্ষেপে অবশেষে জটিলতার নিরসন হয়। তারপর ১৯২০ সালে ড. সৈয়দ সাইয়ুদ হোসেন খিলাফত আন্দোলনের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে লন্ডন চলে যান। রণজিৎ সীতারামের সঙ্গে ১৯২১ সালে বিজয় লক্ষ্মী পন্ডিতের আবার বিয়ে হয়। ড. সৈয়দ সাইয়ুদ হোসেন লন্ডনে নানা সমাবেশে স্বাধীনতার সপক্ষে বক্তব্য দিতে থাকেন। লন্ডনে অবস্থান করে কংগ্রেসের পত্রিকা সম্পাদনা করেন। সেখান থেকে তিনি চলে যান যুক্তরাষ্ট্র। স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকাকালে যুক্তরাষ্ট্রে তিনি ছিলেন ‘বহির্বিশ্বে ভারতের স্বাধীনতার কণ্ঠস্বর’। সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি দশ বছর ‘ওরিয়েন্টাল সিভিলাইজেশন’ পড়িয়েছেন। ড. সৈয়দ সাইয়ুদ হোসেন ছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের শ্যালক ও ফরিদপুরের নবাব আবদুল লতিফ খান বাহাদুরের পৌত্র। ১৯২০ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে শুধু ১৯৩৭ সালে স্বল্পসময়ের জন্য একবার ভারতে এসেছিলেন। পন্ডিত বিজয় লক্ষ্মীর স্বামী রণজিৎ সীতারাম ১৯৪৪ সালে মারা যান। ১৯৪৫ সালে বিজয় লক্ষ্মী পন্ডিত ও ড. সৈয়দ সাইয়ুদ হোসেনকে যুক্তরাষ্ট্রে একসঙ্গে চলাফেরা করতে অনেকেই দেখেছেন বলে জানা যায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওয়াহেরলাল নেহ্রু ড. সৈয়দ সাইয়ুদ হোসেনকে ১৯৪৭ সালে মিশরে ভারতের প্রথম রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেছিলেন। ১৯৪৯ সালে জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগাদেশ পাওয়ার পরপরই তিনি কায়রোয় তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর কায়রোতেই রাষ্ট্রীয় সম্মানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। মিশরের রাজধানী কায়রো শহরে তাঁর নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নামকরণ করা হয়। তাঁর ভাগ্নি ড. শায়েস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামুল্লাহ পাকিস্তানে সংসদ সদস্য ছিলেন এবং জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের নেতা ছিলেন। তিনি বিদেশে বহু প্রতিনিধি দলের নেতা ও সদস্য হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি রয়েল সোসাইট অব আর্টসের (ইউকে) সদস্য ছিলেন।
ড. আনোয়ার দিল-প্রণীত Rabindranath Tagore and Victoria Ocampo : The Creative Touch (2012) পুস্তকটি হচ্ছে ভারতের কলকাতার জোড়াসাঁকোতে ১৮৬১ সালে জন্মগ্রহণকারী একজন মানুষের সঙ্গে ১৮৯০ সালে জন্মগ্রহণকারী দুনিয়ার অপর পিঠে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনার বুয়েনেস আয়ার্সের ‘সান ইসিড্রো’ শহরতলির একজন লেখিকার শ্রদ্ধা, মমতা ও ভালোবাসার গল্প। সুন্দরী ও প্রতিভাময়ী নারী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো (১৮৯০-১৯৭৯) ছিলেন বুয়েনেস আয়াসের্র শহরতলির সান ইসিড্রোর সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী ওকাম্পো পরিবারের একজন সন্তান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর বিশ্বকবির খ্যাতি অর্জন করে সারা দুনিয়ায় ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। আর্জেন্টিনার বুয়েনেস আয়ার্সের মেয়ে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ ভাষায় অনূদিত তাঁর সাহিত্যকর্ম সংগ্রহ করে পাঠ করেন। তিনি তাঁর সাহিত্যপাঠে আনন্দ ও শান্তি লাভ করেন। তাঁর নিজের বিবাহ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে একবার আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু ‘রবীন্দ্রনাথ’ পাঠের ফলে তিনি আত্মোপলব্ধি করে সে অনাকাঙ্ক্ষিত পথ থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। তখন থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা বোধ ও ভালোবাসা জন্ম লাভ করে।
১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপান ভ্রমণে ছিলেন। সে-সময়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে পেরুর স্বাধীনতার শতবার্ষিকী উদযাপনের অনুষ্ঠানে যোগদানের তিনি আমন্ত্রণ পান। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এ উপলক্ষে পেরু ও মেক্সিকো সরকার কর্তৃক তখন এক লক্ষ ডলার দানের কথা ঘোষণা করা হয়। নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৪ সালে এস.এস. হ্যারোনা মারো (S.S. Haruna Maru) নামক জাহাজযোগে পেরুর উদ্দেশে যাত্রা করেন। কিন্তু আর্জেন্টিনা পৌঁছার পর তিনি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসক তাঁকে যাত্রাবিরতির পরামর্শ দেন। তিনি তখন রাজধানী শহর বুয়েনেস আয়ার্সের প্লাজা হোটেলে অবস্থান করেন। খবর পেয়ে এক বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দেখতে প্লাজা হোটেলে আসেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেক্রেটারি Leonard Elmhirst-এর কাছ থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থা জেনে শহরের কোলাহলপূর্ণ হোটেল থেকে ব্যক্তিগত অতিথি হিসেবে নিজের তত্ত্বাবধানে শহরতলির তাদের শান্ত, ছায়া সুনিবিড় ও মনোমুগ্ধকর বাসায় নিয়ে যত্ন করার এবং পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তার বাসায় অবস্থানের জন্য প্রস্তাব দেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর ভাষা না বুঝলেও তার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে আতিথ্য গ্রহণে রাজি হন। সান ইসিড্রো (San Isidro) গ্রামে তাদের বাড়িতে গিয়ে ভিলা ওকাম্পো (Villa Ocampo) বাড়িটি অতিথির জন্য ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি তাঁর বাবার কাছ থেকে তিনি পাননি। তারপর এক কিলোমিটার দূরে বসবাসকারী এক চাচাতো ভাইয়ের কাছে আবেদন করা হলে তার মিরালরিও (Miralrio) বাড়িটি অতিথির জন্য ছেড়ে দিতে রাজি হন। তেষট্টি বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দীর্ঘ প্রায় দুই মাস বুয়েনেস আয়ার্সে কাটিয়ে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সেবাযত্ন পেয়ে তরতাজা হয়ে যেন দ্বিতীয় যৌবন লাভ করেন। রবীন্দ্রনাথের পাশের কক্ষে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো-নিয়োজিত ফ্যানি নামে এক মহিলা সারাক্ষণ কবিগুরুর সেবাযত্নের দায়িত্ব পালন করেন। রাতের বেলা তিনি তার বাবার বাড়িতে খেয়ে কাকডাকা ভোরে প্রতিদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহচর্যে চলে আসতেন। অল্পদিনেই কবি মোটামুটি সুস্থ হয়ে ওঠেন। রবিঠাকুর ছিলেন ওকাম্পোর বাবার বয়সী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯২ সালে ‘বিজয়িনী’ চরিত্র দিয়ে চিত্রাঙ্গদা নামে একটি নাটক রচনা করেছিলেন। ভিক্টোরিয়া শব্দের বাংলা বা সংস্কৃত অর্থ বিজয়ী বা বিজয়িনী হওয়ায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে ‘বিজয়া’ বলে ডাকতেন। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো বেশ লাজুক স্বভাবের ছিলেন। বিজয়িনী অর্থ না বুঝলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা শুনে ভিক্টোরিয়া শুধু হাসতেন। উভয়ের বয়সের ব্যবধানের বিষয় লক্ষ করে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর উদ্দেশে রসিকতাচ্ছলে কবিগুরু সে-সময়ে নিজে নিজেই বলতেন, ‘তোমার হল শুরু আমার হল সারা’।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহচর্যে এসে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো তাঁর লেখালেখির মাত্রা বাড়িয়ে দেন। তিনি তাঁর সম্পাদনায় ইংরেজি ও স্প্যানিশ এই দ্বি-ভাষার সুর (Sur) নামে একটি জার্নাল প্রকাশ করেন। এটি একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিসেবেও যথেষ্ট অবদান রাখে। উভয় আমেরিকার নামিদামি অনেক লেখক-লেখিকার লেখা পুস্তক সুর (দক্ষিণ) থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করে। বিশ্বের অনেক লেখক-লেখিকা পরে তাঁর ভিলা ওকাম্পোতে এসে আড্ডা দিয়েছেন ও আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। তিনি এশিয়া-ইউরোপ-আমেরিকার লেখকদের মাঝে সেতুবন্ধ সৃষ্টি করেন। স্বৈরাচারী আর্জেন্টাইন শাসকের রোষানলের কারণে তিনি ১৯৫৩ সালে ২৬ দিন জেলে আটক ছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরুসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দের চাপে তিনি শিগগির মুক্তিলাভ করেন। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো ও তাঁর বোন অ্যাঞ্জেলিকা ওকাম্পো তাঁদের বুয়েনেস আয়ার্সের শহরতলির সান ইসিড্রো গ্রামের নিজস্ব বাড়ি ভিলা ওকাম্পোর মালিকানা ১৯৭৩ সালে বিশ্ব সংস্থা ইউনেস্কোকে দান করে দেন। আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ভারতের বিশ্বভারতীসহ বিশ্বের খ্যাতনামা অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান তাঁকে ডক্টরেট ডিগ্রি ও নানা সম্মাননায় ভূষিত করে। বিশ্বব্যক্তিত্ব, মানবতাবাদী ও নারীবাদী আর্জেন্টাইন লেখিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো ১৯৭৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে অনেক চিঠি আদান-প্রদান করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর শ্রদ্ধা-ভালোবাসার কথা, চিঠিপত্র ও সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধাদি সংকলন করে প্রণীত Rabindranath Tagore and Victoria Ocampo পুস্তকটি নিঃসন্দেহে ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আনোয়ার দিলের একটি মূল্যবান সৃষ্টিধর্মী কাজ।
বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে একক ও যৌথভাবে ইংরেজি ভাষায় প্রণীত অধ্যাপক ড. আনোয়ার দিল ও অধ্যাপিকা ড. আফিয়া দিলের আলোচিত মূল্যবান আটটি গ্রন্থই প্রকাশ করেছে ঢাকার সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অ্যাডর্ন পাবলিকেশন। 

১ thought on “বাঙালি সংস্কৃতির যুগলদূত