বাছেত মিয়ার দ্বিতীয় পর্বের জীবনযাপন

লেখক: মোস্তফা তারিকুল আহসান

বাছেত মিয়া তার স্ত্রী বিষয়ে বারবার যে-সংকটে পড়ে তা নিয়ে গ্রামের কতিপয় লোকের গভীর আগ্রহ থাকলেও এ-বিষয়ে তার নিজের কোনো আগ্রহ আছে বলে কেউ কখনো জানতে পারেনি; বস্তুত সে ঠান্ডা মেজাজের চুপচাপ মানুষ এবং তার নিজের সংকট নিয়ে অন্যরা যা ভাবে সেও তা ভাবে বলে মনে হয় না। ঘোনা গ্রামের মল্লাপাড়ার শেষ মাথায় যেখানে বাছেতের জরাজীর্ণ প্রাগৈতিহাসিক বাড়ি সেখানে কদাচিৎ মানুষের আগমন ঘটে। গ্রামের রাস্তাঘাটের যে-বিস্তার সেদিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, কোনো রাস্তাই বাছেতের বাড়ির পেছন বা সামনে দিয়ে যায়নি। আবার যে-রাস্তাটা তার বাড়ির প্রায় আধা কিলোমিটার দক্ষিণ দিয়ে একটা বাঁক নিয়ে মৃগীডাঙ্গার দিকে গেছে, সেখানে থেকে বাছেত মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত মানুষজনের ঘন ঘন আসা-যাওয়ার কোনো সুযোগ ঘটে না। কাজে কাজেই, একটা জংলা ভুতুড়ে চিকন হাঁটাপথ তার বাড়ির দিকে রাস্তা থেকে নেমে গেছে। এ-তল্লাটে আর কারো বাড়িঘর না থাকার কারণেই পথঘাটের এই দশা সেটা ব্যাখ্যা না করলেও বোঝা যায়। তো নিরাক নিঝুম বাড়িতে বাছেত মিয়া একা একা থাকে প্রায়শ। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর বোনটার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বাছেত মিয়া আবার একা থাকে; ততদিনে পারু তাকে রেখে চলে গেছে। আবার তার সংসার কখনো স্থায়ী হয়নি, কাজেই একা থাকাই তার নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাবার আমলের টালি দিয়ে ছাওয়া চওড়া দোচালা লম্বাটে ধরনের বাড়িটার পেছনে একটা ছনের রান্নাঘর; উঠোনের শেষ মাথায় আরো একটা লম্বা দোচালা ছনের ঘর, যার কাঠামোটুকু বেঁচে আছে, চালে কোনো ছন বা খড় নেই। দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় একটা বিশীর্ণ তালগাছ, তাতে বাবুইপাখির বাসার জন্য গ্রামে বেশ চঞ্চলতা আছে। ডান পাশে একটা খানা, কোনোভাবেই তাকে পুকুরের মর্যাদা দেওয়া যাবে না। মাটির দেয়ালে তার কোন স্ত্রী কবে গোবরের থাবড়া দিয়ে শুকনো জ্বালানি করতে দিয়েছিল তা মনে করা দুষ্কর, তবে সেই গোবরের প্রায় বৃত্তাকার  অনেক দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে। হতে পারে প্রথম স্ত্রী পারু বা দ্বিতীয় স্ত্রী খাদিজা এটা করেছিল, তবে জরিনা বা হাজেরা নয়। এর প্রাচীনত্ব দেখে সেটা অনুমান করা যুক্তিসংগত মনে হয়। ঘরের সামনের অংশে একটা টানা হাতেœ আর হাতেœয় ওঠার জন্য ডোয়া আছে। বেশ উঁচু ঘর বলতে হবে। এই ঘরে বাবা-মা মারা যাওয়ার আগেই বাছেত মিয়া তার প্রথম স্ত্রী পারুকে নিয়ে ওঠে। তখন বোন সখিনা ভাইয়ের বিয়েতে বেশ হইচই করে। পাড়ার লোকজন আসে প্রচুর। বাবা জহিরুদ্দিন ছেলের বিয়েতে বেশ খরচ করে। শখানেক লোককে বিয়েতে খাওয়ানো হয়। তবে গ্রামের মানুষজন এসব কথা খুব মনে একটা রাখেনি। পারুর সঙ্গে তার সংসার খুব বেশিদিন চলে না, অনিবার্যকারণবশত তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তা নিয়েও মানুষের খুব একটা আগ্রহ নেই। বস্তুত বাছেত মিয়াকে নিয়ে কোনোদিন কারো তেমন আগ্রহ ছিল না। সে কোথায় যায়, কী করে, কবে বিয়ে করে, কবে বউ তালাক দেয়, বা বউ রাগ করে বাড়ি থেকে চলে যায়, এই নিয়ে কেউ ভাবে না। ভাবার হয়তো যুক্তিসঙ্গত কারণ কেউ খুঁজে পায় না।

তবে তার সর্বশেষ বউ হাজেরা যেদিন বাড়ি থেকে নিষ্ক্রান্ত হয় সেদিনের পর থেকে বাছেত মিয়া আবার গ্রামের কতিপয় লোকজনের আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। হাজেরা গ্রামের মেম্বার বশিরুলকে প্রথমত নানা অঙ্গভঙ্গি করে বাছেত মিয়ার নামে অভিযোগ করে। বশিরুল বাছেত মিয়ার বিষয়ে কোনো কথা শুনতে চায় না, সে গ্রামের সিনিয়র মেম্বার; সেই সুবাদেই কি না বলা যাবে না, সে হাজেরাকে পাত্তা দেয় না। সে বলে, যাও, যাও, তুমাদের মাগি মিনসের বিপার তুমরা বোজোগে, আমাগের সাতে কতি আসপানা। আমি ক্যাং করে জানব যে তুমি সপ কতা সত্যি কতিচ?

হাজেরা কোমরের শাড়ি গোছায়, নিচের শাড়ি উঁচু করে প্রায় হাঁটুর কাছে তোলে, আঁচল বাতাসে ওড়ায় আর বাপের দেওয়া একমাত্র অলংকার নথখানা নাচিয়ে বলে, ও তুমাদের কাছে আমি মিত্যি কতা কতি আইচি, না? মনে করিলাম, তুমি মেম্বর মানুষ, তুমি একটা বিচের আচার করবা, ও বাবা, বিচের বুদ্ধি সব গাঢ়ির মদ্যি ঢুকায়ে বসি আচ তা তো আমি আর জানি নে, ঠিক আছে, আমি ওই শয়তানকে ছাড়ব না, শালার মিনসে, আমার সাতে চালাকি, আরে হারামজাদা, খাতি দিবিনে, পরতি দিবিনে, তালি বে করলি ক্যান, তোর মজা আমি দেখাতিচি, আমি থানায় যাতিছি।

হাজেরার চিকন পাতলা বেশ ফর্সা শরীরে ইন্ডিয়ার সস্তা ছাপা শাড়িতে খুব আব্রু হয় না, তার ওপর তার নর্দন-কুর্দনে, রাগ গালাগালিতে জামাকাপড় ঠিক থাকে না। সে আবার হাপাতে থাকে। বশিরুলও রেগে যায়, সে তীক্ষèভাবে তাকায় হাজেরার দিকে, সেই চোখের তীব্র চাহনি হাজেরার বস্ত্রাবরণ ভেদ করে অন্য কিছু দেখে কি না  বলা যায় না। তবে ভাদ্রের তালপাকা গরমে, বাতাসহীন তরুণ দুপুরে তার মাথার ঘিলু টগবগ করে ফোটে। সে ছুটে গিয়ে উঠোনের কোনায় সজনের ডাল ভেঙে ফেলে, পাঁচুনির মতো বানিয়ে ডান হাত বাগিয়ে ছুটে যায় হাজেরার দিকে; তার মুখের অনলবর্ষী ভাষা, চিৎকারে তার বউ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে, ছুটে আসে আশপাশের লোকজন।

লাইলির মা, মজনু, হারু চোর, রজবের বাপসহ বাছেত মিয়ার সহপাঠী খাদেমও আসে। বিড়াল-কুকুরও কয়েকটা জুটে যায়। বিশেষত যে-কুকুরটা সারাদিন একটা খেকিকুকুরের পেছনে প্রচুর সময় দেয়, সারাদিন ডেটিং করে, আশ্বিন বা কার্তিক মাসের অপেক্ষায় খেকিকে সময় দেয়, তাকে প্রস্তুত করে তোলে, সেও সঙ্গী ছেড়ে চলে আসে আর লেজ নাড়াতে থাকে বশিরুলের কা-কারখানা দেখে। মোরগ-মুরগি ঝটপট করে ডানা ঝাপটায় আর মরা পেয়ারা গাছের ডালে গিয়ে বসে। তবে, বশিরুল মূলত মারার অভিনয় করে, মারে না, মুখটাই অস্ত্র হিসেবে চালায়; ছুটে ছুটে যায় আর তাকে অশ্লীল কথা বলার প্রতিশোধ নিতে অশ্লীলতা নিয়ে নিজের সমস্ত প্রতিভা কাজে লাগায়; শুরু হয়ে যায় মহা খিস্তিখেউড়পর্ব। মহিলাদের ঝগড়া বিষয়ে গ্রামের সবচেয়ে যার খ্যাতি সেই লাইলির মা বশিরুলের গালিগালাজ শুনে থ মেরে যায়, তার বিস্ময়কর হাঁ-করা মুখে মাছি যাওয়ার উপক্রম হয়। কার্যত বশিরুলকে কেউ থামাতে চায় না বা পারে না বা থামাতে ভুলে যায়। বশিরুল মাটিতে সজনের ডাল জোরে ঘা দিলে ডাল সহ্যক্ষমতা হারিয়ে দ্বিখ-িত হয়ে যায়। তবে মুখ চলে ঠিকমতো; আরে গাঢ় মারানি, গাঢ় মারাবার জায়গা পাও না, যাও থানায় যাও, তুমার জন্যি সব তুমার হে মারার জন্যি বসি আছে।

লাইলির মা গ্রামের মহিলামহলের সবচেয়ে বেশি খবর রাখে, এই করেই তার দিন কাটে। ছেলের বউ আসার পর তার আরো বাগাত হয়েছে; কোনো কাজকাম নেই, সারাদিন পাড়ায় পাড়ায় টোটো করে ঘুরে বেড়ায়, আর এর কথা ওকে লাগিয়ে ঝগড়া-ফ্যাসাদ বাধায়। এখানে ঝগড়া যেহেতু আগে থেকে লেগেই আছে তাই সে কোনো কাজ খুঁজে পায় না, কী করে? কী বা বলে? সে হাজেরার মুখের দিকে তাকায়, তাকে পড়ার চেষ্টা করে। খাদেম একদিক দিয়ে তার ভাশুরমতো হয়, সেদিকে সে খুব ভাবে না। সে হাজেরাকে বলে, তা, হাজেরা, তোর তো বে হলো কয়েক মাস, এরই মদ্যি গ-গোল পাকালি। আর পাকাবি যখন তখন বে করলি ক্যান? বাছেত মিয়ার তো বউ টেকে না সে তো জানা কতা, তাই জেনেই তো আসলি, তা একটু সহ্য-ধর্য কর। চেতে উঠিস ক্যান। সে মূলত হাজেরাকে আরো উত্তপ্ত করতে চেয়েছিল, তবে তার কথায় হাজেরা উত্তেজিত হলো না, তবে আসর গরম থাকলো আগের মতো।

তার উপদেশমূলক শান্ত কথাবার্তা শুনে সবাই অবাক হয়ে যায়। মজনু অবাক হয়, হারু চোর অবাক হয়ে যায়। খাদেম এগিয়ে এসে বশিরুলের কাছ থেকে দ্বিখণ্ডিত সজনরে ডালের লাঠি নিয়ে নেয়। তার বুকের কাছের ওপর বাঁ-হাত রেখে ওকে অন্যদিকে সরিয়ে নিতে চেষ্টা করে। সে বাধা দেয় না। তবে সে চিৎকার করে বলে, মাগির কত বড় আস্পর্দা দেখিচিস, আমাকে গালি দেয়; ওরে আমি ফেড়ি ফ্যালাবোনি। খাদেম ওকে থামায়। তাকে দহলিজ ঘরে বসিয়ে রেখে আসে।

হারু চোর, মজনু হাজেরার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। সে খানিকটা ঠান্ডা এখন। জামগাছের তলায় একটু ছায়া থাকলেও গরম কম লাগে না মোটে। হাজেরাকে লাইলির মা যে তত্ত্ব-উপদেশ দিয়েছিল সেদিকে হাজেরা মনে হয় কোনো কান দেয়নি, না হলে সে তো কোনো কথার জবাব না দিয়ে থাকতে পারে না, করোর মুখের দিকে তাকিয়ে সে চোপা বন্ধ করবে সে ধাতের মেয়ে সে নয়। সে আরো দুটো মিনসের ঘর করে বা ঘর ভেঙে বাছেত মিয়ার সঙ্গে নিকেতে বসেছিল। তো লাইলির মা নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার সুযোগ না পেয়ে বেচাইন হয়ে পড়ে। সে আগের পক্ষের স্বামীকে নাকানি-চুবানি খাইয়ে পরের স্বামীর ঘর করতে এসে তাকে ভালোভাবে তার নাগালে আনতে পেরেছে। পাড়ায় তার একটা ভালো সুনাম আছে। তার কোনো প্রমাণ সে আজ দিতে পারে না বলে অস্থির হয়ে পড়ে। সে এতক্ষণে অনেক চিন্তা করে একটা মোক্ষম প্রশ্ন ছুড়ে দেয় হাজেরার দিকে : তালি তুমি, আজকি কেন এত চটি গেলি, তুমার সাথে বাছেত মিয়া কী ব্যাভার করলো যে, তুমি পাড়ায় বেরুই পড়লে? তুমার কী এমন হলো যে, তুমাকে থানায় যাতি হবে? অন্য কোনো বিপার নেই তো? হাজেরা খানিকটা ভাবে কী বলেবে তা নিয়ে। বিয়ের ছয়-সাত মাসের মধ্যে তার এই অবস্থার জন্য সে নিজেকে দায়ী করে না, তবু সংসার ভাঙলে সব দোষ পড়বে বউয়ের ঘাড়ে – এই সমাজের নিয়ম, কাজেই সে সাবধানে এগোতে চায়, তবে পারে না। চারদিকে অনেক লোকজন; এদের সামনে ইনিয়েবিনিয়ে কথা বলার চেয়ে থানায় গিয়ে একবার বললেই বাছেত মিয়া জব্দ হবে। তবে লাইলির মা তার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে উত্তর পাওয়ার জন্য এবং তার চোখে পবিত্র জ্বালাময়ী ক্রোধ, তার ধারণা, হাজেরা অন্যায়ভাবে বাছেত মিয়ার নামে নালিশ করেছে।

খাদেম বশিরুলকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেও বশিরুলের বউ সেখানেই ছিল। সেও লাইলির মার মতো রণমূর্তি ধারণ করে হাজেরার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। আর পোলাপানেরা, যারা গালাগালি-চিৎকার শুনে পুষ্টিলাভ করছিল, তারা চলে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখায় না, বরং গভীর আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অন্য দর্শকেরা অর্থাৎ মজনু হারু চোর যথারীতি সমস্ত ঘটনাক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। তারা কোনো মন্তব্য করে না। রজবের বাপ বয়স্ক হলেও ঘটনার সঙ্গে জড়িত হতে চায় না। সে বাছেত মিয়ার বাপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিল, তাদের বাড়িতে নিয়মিত যেত। বাছেত মিয়া সম্পর্কে সে ভালো করে জানে। প্রথম যখন বাছেত মিয়ার বিয়ে হয়, যুদ্ধের আগে তখন রজবের বাপ বিয়েতে ছিল নানান কাজে। সে-বিয়ে কয়েক বছর টেকে। একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছিল বাছেত মিয়ার। অল্প বয়সে নিউমোনিয়া হয়ে মেয়েটা মারা গেল। পারু খুব সুন্দরী ছিল। বাছেত মিয়ার এই সংসার খুব আনন্দের ছিল বলে সবাই মনে করে। রজবের বাপেরও তাই মনে হয়। যুদ্ধশেষে বাছেত মিয়া বাড়ি ফিরে আর পারুকে পায়নি। পারু  নিরুদ্দেশ হয়েছিল, বাপের বাড়িতে তাকে পাওয়া যায়নি। গ্রামে জোর গুজব ছিল, রাজাকার আলতাপ তাকে কৌশলে বৈকারি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। ক্যাম্পে তো রাজাকার আলতাপ অনেক মেয়েছেলেকে নিয়ে গেছে, তবে পারুকে নিয়ে গিয়েছিল কি না তা কেউ জোর করে বলতে পারে না। পারুর শ্বশুর-শাশুড়ি বা একমাত্র ননদ রমিছা কেউ এ-সম্পর্কে কিছু বলতে পারে না। কখন সে গেল, কোথায় গেল, কার সঙ্গে গেল, কবে গেল! একদিন সকালে কাকের তীব্র চিৎকারে রমিছার ঘুম ভাঙলে সে চোখ ডলতে ডলতে ভাবির ঘরের দিকে যায় ভাবিকে ডাকার জন্য। অন্যদিন ভাবির সঙ্গে ঘুমায়। কাল সে কী মনে করে ঘুমায়নি। সে দেখে ভাবির ঘর ফাঁকা। এত সকালে পায়খানায় যাওয়ার কথা নয়। সেই থেকে পারু নেই। পারু সে-সময় মেয়ে ও স্বামী হারানোয় গভীরভাবে শোকাহত ছিল। তার মানসিক অবস্থারও অবনতি ঘটেছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার, ন্যালাভোলা বোকাসোকা স্থির বাছেত মিয়া সহপাঠী হান্নানের সঙ্গে একরকম বিনা বাক্যব্যয়ে এ-সময় যুদ্ধে চলে যায়। হান্নানকে বোঝাতে হয়নি। বোকা বাছেত মিয়া কীভাবে যেন বিষয়টার তাৎপর্য বুঝতে পেরেছিল। যুদ্ধে যাওয়ার সময় বাবা খুব কান্নাকাটি করলেও যুদ্ধে যেতে তাকে নিষেধ করেনি। মা প্রচ- বাধা দিয়েছিল, তবে স্বামীর বিপক্ষে যাওয়ার সাহস তার ছিল না। পারুকে বাছেত মিয়া সব বলেছিল গুছিয়ে, সে তখন মেয়ে হারিয়ে দিশেহারা। স্বামীর মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল ফ্যালফ্যাল করে, মুখে কিছু বলেনি। তবে তার দুচোখের কোনায় অশ্রুকণা জ্বলেছিল উজ্জ্বল হয়ে। আর রাতের আঁধারে যাওয়ার সময় রমিছা ঘুমিয়ে ছিল, তাকে কেউ বলেনি। তার ঘুমও ভাঙেনি। বাছেত মিয়া তাকে কখনো বলেছিল কি না জানা যায় না। তবে সে পরে সব জানতে পারে, নানা মানুষের কথাবার্তা থেকে।

হাজেরা রজবের বাপকেও সমীহ করে না, সে লাইলির মা ও বশিরুলের বউয়ের সামনে ক্ষিপ্রভাবে তার কথা বলতে গিয়ে ডান পা উঁচু করে মাটিতে ঢেঁকিতে পাড় দেওয়ার মতো জোরে লাথি মারে। কার উদ্দেশে মারে বোঝা মুশকিল। তবে সে হিসাবমতো লাইলির মার উদ্দেশে এই কাজ করে; তার ওপরে তার রাগ বেশি হয়, যদিও বশিরুল মেম্বার তাকে বেশি গালাগাল করেছে। সে বলে, শোন, তুমার ভাতারের বিপার তুমি বোজ, আমার ভাতারের বিপার আমাকে বুজতি দেও; দিনের পর দিন হারামজাদা একই নাটক করে। আমি অনেক সহ্য করেছি আর করবো না, তুমরা কেউ আমার বিচের করবা না, হারামজাদারে শিক্ষে দিবে না সেডা আমি খুব ভালো করেই জানি। তাই আমি থানায় যাবো। শয়তান। রাতে যা রান্না করি কোন ফাঁকে সব খেয়ি-দেয়ি হাঁড়ি উপুড় করে রেখি একদিকে হাঁটা শুরু করে; আমি পানি-টানি খেয়ি শুয়ে থাকি। আর রান্না করতে ইচ্ছে করে না। সকালে  উঠে আলু দিয়ে ডাল দিয়ে মেলা করি খিচুড়ি রান্না করি। মিনসে কোন ফাঁকে আবার সব খেয়ি-দেয়ি এক খাপলা থু দিয়ে হাঁড়ি উপুড় করি রাখে। আমি হয়তো কাঠ খুঁজতে গিছি, মিনসে এই ফাঁকে সব সাবাড় করে দিয়ে চলি গেল। আল্লার প্রায় সপ দিনে এই কাম করে। আমি যে ওকে বঁটি দিয়ে খুন করে ফেলিনি এই তো ওর কপাল। কিসের মুক্তিফৌজ, আমি এইসব চিনি, ওরা কপালে দুঃখু আছে আমি কলাম। এই পর্যন্ত বলে সে থামে। লাইলির মা, বশিরুলের বউ উভয়ই টাসকি খায় তার কথা শুনে। তারা তো ভাতারের ঘর করে। এরকম ভাতারের কথা তো তারা বাপের জনমে শোনেনি। তারা তো এরকম কোনো গল্প তার মুখে আশা করেনি। সব খাবার ফাঁকতালে খেয়ি স্বামী সটকে পড়ে এডা আবার কী রকম ভাতার?

হারুচোর হাজেরার মুখের দিকে তখনো হাঁ-করে তাকিয়ে থাকে। তার চুরির  বিদ্যা তাকে বিন্দুমাত্র সাহায্য করে না বলে সে বেশ হতাশ হয়। ততক্ষণে খাদেম ফিরে এসে হাজেরার সব বৃত্তান্ত শুনে ফেলে। মজনু বা হারুচোর এখনো পর্যন্ত কোনো কথা বলার চেষ্টা করেনি। আসলে তারা ঘটনার আকস্মিকতায় থানু হয়ে যায়। কোনো ক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে না। মজনু তো প্রচুর কথা বলে, তাকে তো কেউ কেউ বকাউল্লাও বলে। আর হারু চোর হলেও গ্রামে তার একটা গ্রহণযোগ্যতা আছে। প্রথমত, সে গ্রামে চুরি করে না। দ্বিতীয়ত, সে যেহেতু ভালো চোর সেহেতু তার সুবাদে গ্রামে কোনো চোর আসে না। তৃতীয়ত, সে কারো সঙ্গে কোনো ঝামেলায় যায় না। তার বউ কদু মাঝে মাঝে কারো সঙ্গে লাগলে হারু চোর তাকে ফিরিয়ে আনে। আর শেষ পর্যন্ত বলা যায়, চুরি সে করে তবে চুরি করে বাড়ি বা জমি করতে পারেনি। খাওয়া-পরাটা ওই বিদ্যা দিয়ে চলে যায়। তাকে নিয়ে কোনো সালিশ-বিচারও গ্রামে করতে হয় না। তাকে একবার বশিরুল  বলেছিল সে কেন চুরি করে, সে তো অন্য কাজ করতে পারে। তার উত্তরে চুরির পক্ষে সে যে দার্শনিক যুক্তি দেখিয়েছিল তাতে মনে করা খুবই স্বাভাবিক যে, চুরি করা তেমন মন্দ কাজ নয়। সে যেহেতু ধরা খায়নি আজ পর্যন্ত কাজে কাজেই তাকে নিয়ে কারো কোনো দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। ভাগ্য ভালো সে বলেনি যে, চুরি করা মহৎ কাজ। তো মজনু বা হারু চোর ফলত কেউ কোনো কথা বলে না। লাইলির মা সাময়িকভাবে অবসর নেয়। শুরু করে খাদেম। সত্য বললে বলতে হবে সে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সে বশিরুল রে জায়গামতো বসিয়ে রেখে এসেছিল। তবে হাজেরা যা বলল, এই অভাবনীয় গল্পটা; সে আগে কখনো শোনেনি। সে বাছেত মিয়াকে চেনে, জানে, যদিও তার সঙ্গে দেখা হয় কালেভদ্রে। তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে হাজেরার বর্ণনা। বাছেত মিয়াকে সে বাল্যকাল থেকে চেনে। গোঁয়ার টাইপের, খানিকটা ভোঁতা: সাত কথায় রা নেই। সব ঠিক আছে, তাই বলে বউকে এভাবে অভিনব কায়দায় না খাইয়ে রেখে তার লাভ কী? কী উদ্দেশ্যে সে এরকম করে? পারু নিরুদ্দেশ হওয়ার পর সে আরো তিনটে বিয়ে করল, কোনোটাই টিকলো না, এক বছরও পূর্ণ হয়নি কোনো বিয়ের। তাহলে তার দ্বিতীয় স্ত্রী খাদিজা, তৃতীয় স্ত্রী জরিনার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার কারণ কি একই? সে অনেককিছু অনুমান করতে থাকে মনে মনে, তবে কী করবে ভেবে পায় না। হারুচোর এই প্রথম হাজেরাকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা, কাহি, তুমরা একসাথে খাওনা কোনো দিন? একসাথে ভাত খালি তো বাছেত কাহা একা একা সব ভাত সাবাড় করতে পারে না। আমি আর কদু তো তিন বেলা একসাথে খাই। হাজেরা ওর কথা শোনে কিনা বোঝা যায় না। তবে কোনো উত্তর দেয় না। রজবের বাপ খাদেমকে বলে, শোন, বেলা বেড়ি যাতিছে, তুই একটা ব্যবস্থা কর। তুই কাউকে দিয়ে বাছেতকে খবর দে। দেখ হান্নানের সাতে মাঠে থাকতি পারে। না হলিপর এই বিটি যুদি থানায় যায় সত্যি সত্যি তা হলি কেলেংকারি হবে, বাছেত জেল খাটপি।

বশিরুল মেম্বার রজবের বাপের কথা শোনে। সে কখন এসে জামগাছ তলায় দাঁড়িয়েছে তারা খেয়াল করেনি। সে অবশ্য এখনো কোনো কথা বলেনি। খাদেম তার লুঙ্গির কোচা থেকে বর্ণহীন নোকিয়া এগারশো মোবাইল বের করে হান্নানকে ফোন করে। কীসব কথাবার্তা হয় তা সবাই মালুম করতে পারে না। তবে তার শান্ত-শিষ্ট স্থির হাবভাব দেখে মনে হয় যে, তার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। সে হাজেরাকে বলে, একটু সবুর করো, হান্নান আসতিছে, বাছেতও আসপার পারে, তুমার খানায় যাওয়া লাগবি না। দেখি একটা মিটমাট করা যায় কিনা। বশিরুলের বউ আর ছেলে মিলে গোটা কয়েক প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে আসে। গাছ থেকে বাতাবিলেবু পেড়ে ছিলে থালায় করে সবাইকে দেয়। হারু চোর ও মজনু সবার আগে খাওয়া শুরু করে। রজবের বাপকে দিতে বলে বশিরুল। সে বলে, না থাক। আমার খিদে নেই। খাদেম বলে, হাজেরা, তুমি খাও, তুমি তো রাত থেকে না খেয়ি আছ। কার্যত কেউ লেবু খায় না। বশিরুলের বউ জানে, বশিরুল জানে, ওদের ছেলেও জানে, এই লেবু দেখতে খুব সুন্দর হলেও কোনো স্বাদ নেই। খাওয়ার সময় মনে হবে আপনি শুকনো বিচুলি চাবাতিছেন। হাজেরা জানে কিনা বোঝা যায় না। তারা এই অখাদ্য জিনিস দিয়ে মেহমানদারি কেন করে তা তাদের ছেলের মাথায় আসে না। তারাও হয়তো না বুঝে করেছে অথবা শয়তানি করে করেছে। লাইলির মা হাজেরাকে বলে, খাও হাজেরা। দুপুর হতি গেল, একটু মুখে দেও। তিন থালা লেবু একটা চওড়া চেয়ারে রাখা, হাজেরা সেদিকে আরো একবার তাকায় তবে মুখে দেওয়ার চেষ্টা করে না। হারুচোর আর মজনু খেতে থাকে, তাদের খাওয়া দেখে খেকিকুকুরের পেছনে ব্যস্ত থাকা কুকুরটা লেজ নাড়ায়, মুখ নাড়ায়। সে বুঝতে পারে, এটা খাবার জিনিস, তবে তাকে দেওয়া হবে কি না এবং দিলেও সে খেতে পারবে কি না তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ করে।

দুপুরের রোদ জামগাছের ডালপালা ভেদ করে মাথার ওপর প্রচ-ভাবে গরমের দাহ ছড়ায়, কোনো মেঘের লক্ষণ নেই, বৃষ্টি তো ভুলে গেছে এ-অঞ্চলকে। ভাদ্র মাস পড়া অবধি এক ফোঁটা বৃষ্টি নেই। মাঝেমধ্যে মেঘ হয়, তবে ওই পর্যন্তই। এখন কেউ কেউ বর্ষার ধানে ডিপ মেশিন থেকে পানি দিচ্ছে। তা সে যাই হোক, সবাই কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেল। তারা অপেক্ষা করে, নাকি কোনো কথা জোগান দিতে পারে না, তা বলা যায় না। হাজেরা চুপচাপ থাকতে পারে না, লাইলির মা পারে না, তবু তারা চুপচাপ থাকে। হয়তো অপেক্ষায় থাকে বাছেত মিয়া বা হান্নানের জন্য। রজবের বাপ সামান্য লেবু নিয়ে মুখে দিয়ে চাবিয়ে আবার মাটিতে ফেলে দেয়। সে তখন হাজেরাকে বলে, শোনো হাজেরা, বিয়ের প্রথম প্রথমও কি বাছেত মিয়া এই কাম করতো, নাকি একটু পরে শুরু করিছে? আর তুমার সাতে অন্যসব কি ঠিকঠাক আছে, নাকি সেখানেও গ-গোল? রজবের বাপ মুরব্বি মানুষ। তাকে সে আগে সমীহ করে কথা বলেনি, তবে এবার সে মাথায় কাপড় তুলে সম্মান জানায়; না, চাচা, প্রথমদিকে ও ভালোই ছিল। মানুষটা সারাদিন তো বাড়ি থাকে না, মাঠেঘাটে কাজ করে, বাড়িতে দুজন মানুষ, খুব অভাব তো নেই। আমি তো মনে করিছিলাম আল্লা এবার আমার কপালে বোদয় এট্টু সুক দিছে। কিন্তুক, পরে দেকলাম, না কপালে আমার সুক নেই। আমি অনেক সহ্য করিচি, প্রায়ই আমি না খেয়ি থাকি। সে বাড়ি এসে একবার জিগ্যেসও করে না। আর তার বয়স তো কম না, তার কাছে এট্টু ভালো ব্যাভার তো চাতি পারি, না কি? তুমরা আমাকে কতি পারো, সে কি তার আগের বউদের সাতে এই রকম করতো কিনা? বিয়ের সময় ঘটক জব্বর আমাকে এসব কতা কয়নি। তুমরা কি কিছু জানো? যুদি এডা তার রোগ হয় তালিপর আমার কিছু করার নেই, আমি আর চেষ্টা করবো না, থানায়ও যাবো না, ভাইয়ের কাছে ফিরে যাবো। যুদি ভাই আমারে রাখে, সেখানেই সারাজীবন থাকপো। তার দুই চোখ দিয়ে অঝোরধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, সে আঁচল দিয়ে চোখ মোছে, তবে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার কারণে তার চোখের অশ্রু সহজে বন্ধ হয় না।

কিছুক্ষণ পরে হান্নান আসে। আর তার পিছে পিছে বাছেত মিয়াকেও আস্তে আস্তে হেঁটে আসতে দেখা যায়। বাবা জহিরুদ্দিনের মতো দোহারা চেহারা বাছেত মিয়ার। বাবার চেয়ে আরো দুইঞ্চি বেশি উঁচু সে, অর্থাৎ ছয় ফুট দুই। দেখে মনে হবে পেটানো শরীর। চর্বি নেই এক ফোঁটা। তবে চুল পাতলা। কালো তবে উজ্জ্বল শ্যামলা বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে। দুটো চোখ কেমন যেন স্থির, খুব কম পলক পড়ে। বোন রমিছার সঙ্গে ওর চেহারার খুব মিল। দুই ভাইবোনের মধ্যে খুব ভাব ছিল। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে সে বোনকে বিয়ে দিয়েছিল। ততদিনেও সে পারুর শোক সামলাতে পারেনি। বছরতিনেক পর সে খাদিজাকে বিয়ে করে। সে বিয়ে টেকেনি। হান্নান তাকে পরে বিয়ে দেয় জরিনার সঙ্গে। জরিনা ছিল সাত-আট মাস। তারও বছর দুই পরে বিয়ে হয় হাজেরার সঙ্গে। তখনো হান্নান জড়িত ছিল। বন্ধুর সমস্যা সে হয়তো জানতো। তবে তাকে সুখী দেখা তার ইচ্ছে ছিল। লক্ষ করলে দেখা যাবে বা ইতিহাস বলে, একমাত্র পারুকে বিয়ে করার সময় তার নিজের ইচ্ছেটা ভালো করে বোঝা যায়। তখন সে আঠারো-উনিশ বছরের যুবক। বাবা হাউস করে ছেলের বিয়ে দিয়েছিল বাড়িতে বউ আনবে বলে। বাছেত মিয়ার মা মরিয়ম বিবিও বউ বউ করেছে স্বামীর কাছে। ক্লাস নাইনে পড়া ছেলের বিয়ে দেওয়ার সময় কেউ কেউ আপত্তি করলেও জহিরুদ্দিন কারো কথায় কান দেয়নি। তার যুক্তি ছিল, ও নাইনে পড়লেও ওর বিয়ের বয়স হয়েছে। কারণ ও দেরি করে স্কুলে গিয়েছিল, আর একবার দুবার প্রমোশন জোটেনি কপালে। আঠারো-উনিশ বছরে তখন বিয়ে হওয়া খুব অস্বাভাবিক ছিল না। বাছেত মিয়া কম কথা বলে সে তো সবার জানা আর সে কিছুটা গোবেচারা টাইপের। মাঠে বাপের সঙ্গে কাজ করতো, স্কুলেও যেত।

হান্নান এসে বশিরুল মেম্বারতে ডাকে; রজবের বাপ বসেছিল প্লাস্টিকের চেয়ারে। অন্য সবাই ছিল। শুধু খেকিকুকুরের পেছনে লেপ্টে থাকা কুকুরটা সবার হাবভাব দেখে কেটে পড়েছিল। হান্নান চেয়ারে বসে না। ততক্ষণে বাছেত মিয়া লেবু গাছের তলায় এসে দাঁড়িয়েছে। হান্নান তাকে ইশারা করলে সে তার কাছে এসে দাঁড়ায়। হান্নান সবার দিকে একবার তাকিয়ে নিজের অবস্থান সম্পর্কে একটা ইঙ্গিত করে। সে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল বলেই নয়, সে আগে থেকেই সবার কাছে সম্মানিত তার কাজকর্মের জন্য। গ্রামের একমাত্র হাইস্কুলে সে মাস্টারি করে। যুদ্ধের পর আইএ পাশ করেছিল। বাছেত মিয়া আর লেখাপড়া করেনি। চাইলে সেও আইএ পাশ দিয়ে বা না দিয়েও মাস্টারি করতে পারত। তার বিষয়ে সে কী বুঝত জানা যায়নি।

হান্নান সবার উদ্দেশে বলে, আমি আমার দোস্তের সাতে আসার পথে আলাপ-আলোচনা করিচি। আমি জানতি পারলাম হাজেরা অভিযোগ করিচে, গালিগালাচ করিচে, থানায় যাতি চায়িচে। সপ ঠিক আছে। আমার দোস্ত সব ভাত একা খেয়ি ফেলে আর বউ না খেয়ি থাকে, এই তো অপরাধ, আমার জানামতে আর কোনো দোষ তার নেই। সে-কথা কম বলে, তুমরা সব জানো, তবে সে যা করে খুব ভালো করেই করে, মিথ্যে বলে না। তুমাদের মনে রাখা দরকার সে খুব বড় মুক্তিযোদ্ধা। দেশের জন্যি সে যা করিছে আমি নিজেও তা পারিনি। সব অপারেশনে সে সবার আগে আগে যেত। সে আমাদের অফিসিয়ালি কমান্ডার না হলেও সে-ই কমান্ডারের কাজ করতো। আমরা যখন দেশের ট্রেনিং শেষ করে ইন্ডিয়া গেলাম, সেই ট্রেনিং আমাদের হলো বিয়াল্লিশ দিন। অস্ত্র ট্রেনিংয়ে ও ফার্স্ট হয়। সব অস্ত্র চালাতে পারতো। এসএলআর, এলএমজি, থ্রিনটথ্রি রাইফেল, এমনকি সব ধরনের এক্সপ্লোসিভ সে খুব সহজে চার্জ করতে পারতো। ক্যাম্পে টিক্কা খান, ইয়াহিয়া খান আর ভুট্টোর বড় ছবি টাঙানো থাকতো। আমাদের বলতো, টিক্কা খানের নাভিতে গুলি করো, ইয়াহিয়া খানের বাঁ চোখে গুলি করো বা ভুট্টোর ডান হাতে গুলি করো। আমরা পারতাম না। চাঁদমারিতে সবাই ফেল মারতাম। তবে বাছেতের লক্ষ ছিল অসাধারণ। সে একেবারে জায়গামতো গুলি লাগাতে পারতো। তার সাহস আর উদ্যম দেখে আমরা সবাই অবাক হয়েছি, মূর্তিনালা ক্যাম্পের পাঞ্জাবি মেজর তাকে সেরা ফাইটার বলেছিল। সে আমাদের সাতে না থাকলিপরে আমরা কোনো অপারেশনে সাকসেসফুল হতি পারতাম না।

সে একটু থামে; সবার মুখের দিকে একবার তাকায়। সবাই হাঁ-করে শোনে তার কথা। সূর্য মাথার ওপরে টগবগ করে ফুটছে। রজবের বাপ হান্নানের দিকে বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। হাজেরার দিকে তাকিয়ে দেখে সেও তাকিয়ে আছে; মুখটা তার বিবর্ণ। রজবের বাপ বলে, তোরা কত বছর হলো যুদ্ধ থেকে ফিরলি এসব কথা তো কখনো কসনি। সে এত বড় যোদ্ধা আমরা তো জানি নে, চুপচাপ ছেলেটা হাঁটাচলা করে, ক্ষেতে কামকাজ করে। আমার মনে হয় পারু চলি যাবার পর ও আর ঠিক নেই। হান্নান বলে, এসব কখনো বলিনি মানে বলার দরকারটা কি? দেশের জন্যি আমরা যুদ্ধ করবো সেটাই তো স্বাভাবিক ছিল। না হলিপর কে যুদ্ধ করবে। যুবকরাই তো যুদ্ধ করবে। তবে হ্যাঁ, সবার সাহস থাকে না প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধে যেতে। তার কথা শেষ না হতেই হারু চোর বলে, কাঁহা, আমার জেবনের বড় কষ্ট কি জানো, আমি সে-সময় যুবক হয়েও যুদ্ধে যেতে পারিনি; আমি গেলিপর ঠিকই ভালো করতাম। অন্য সময় হলে হয়তো সবাই হাসতো, তবে এখন হাসে না। তবে হান্নান বলে, তুই যুবক ছিলি নাকি? তবে তুই গেলি ভালো করতি, চুরিচামারির সুযোগ তো কম ছিল না। হারু চোর ওর মুখের দিকে মুখ গোমড়া করে তাকিয়ে থাকে।

এতক্ষণ পর বশিরুল মেম্বার কথা শুরু করে। সে বলে, হান্নান কাঁহা, তুমি যহন আইচ, এর একটা বিহিত করো। বাছেত ভাইকে নিয়ে আমি সালিশ বিচার করতি পারবো না। সে আমার মুরব্বি লোক। হাজেরাকে আমি কিছু কতা কইচি, সেটাও বোদয় উচিত হয়নি। তুমি একটা ফায়সালা করো। আর ভালো কতা, এই যে বউকে ভাত-তরকারি খেতে না দিয়ে নিজে সব খেয়ি ফেলে এই সমিস্যাডা কতদিনের? আমরা তো আগে কখনো জানতি পারিনি। হান্নান কোনো উত্তর দেওয়ার আগে লাইলির মা বলে, আমার মনে কয় সমিস্যাডা পুরনো। আগের দুডো বউও ওই জন্যি চলি গেচে। লাইলির মা কথা বলার পরে বাছেত মিয়ার দিকে তাকায়, সে স্থির চোখে দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখ দেখে কিছু বোঝা যায় না। তবে তাকে নিয়ে যে সবাই সালিশ বিচার করছে এটা সে পছন্দ করছে না, সেটা আন্দাজ করা যায়। সে কারো দিকে তাকায় না, হাজেরার দিকেও না। লাইলির মা কথা শেষ করতে পারে না, আরো কিছু সে বলতে চেয়েছিল। হান্নান বলে, তুমরা সবাই চুপ করো। তুমরা বাছেত মিয়াকে নিয়ে কোনো কতা বলো না। আমার দোস্তের বিপারডা আমি দেকতিচি।

সে তখন হাজেরাকে ইশারা করে কাছে ডাকে। হাজেরা কাছে এলে বলে, তুমাকে সে খাওয়া ছাড়া অন্য কোনো কষ্ট দেয়? না অন্য সব ঠিক আছে? সে প্রথমত কিছু বলতে চায় না। সকাল থেকে স্বামীর নামে অভিযোগ করলেও এখন তার কথা বলতে ইচ্ছে করে না। হান্নানভাই ও বাছেত মিয়ার সামনে সে যেন কথা হারিয়ে ফেলে। হান্নান তাকে আবার খানিকটা উত্তেজিত কণ্ঠে বলে, উত্তর দাও না কেন? সে তখন ধীরে ধীরে বলে, না, ওই বিপারডা ছাড়া আর সব ঠিক আছে।

প্রচ- গরমের মধ্যে মেঘের আনাগোনাতে গরমের তীব্রতা আরো বাড়তে থাকে। উঁচু একটা আম গাছে ‘গিরস্তের খোকা হোক’ পাখি কয়েকবার ডেকে গেল। বৃষ্টির আকাক্সক্ষা নিয়ে সবাই যেন অপেক্ষা করে, বৃষ্টি আসার সকল লক্ষণ দেখা গেলেও বৃষ্টি আসে না। হান্নান বাছেত মিয়ার দিকে ইশারা করে বলে, বউকে নিয়ে বাড়ি যাও বাছেত। তুমার নামে কোনো অভিযোগ এলে আমার খারাপ লাগে। তুমি দেশের জন্য এত বড় ত্যাগ করলে আর সংসারের জন্যি কিছু করতে পারবা না? পারবা আশা করি।

বাছেত মিয়া তার বাড়ির দিকে অপরিসর জংলাপথ ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে। হাজেরা সবার দিকে একবার তাকিয়ে তাকে অনুসরণ করে। সবাই তাদের গৃহাভিমুখ যাত্রার দিকে তাকিয়ে থাকে। লাইলির মা তার প্রশ্নের উত্তর পায় না। রজবের বাপ, মজনু, হারু চোর, বশিরুল মেম্বার বা স্বয়ং হান্নানও নিশ্চিত হতে পারে না যে, বাছেত মিয়া তার এই অস্বাভাবিক কর্ম বন্ধ করবে কিনা। তবে তারা অবাক হয়ে লক্ষ করে যে, অবশেষে বৃষ্টি শুরু হয়েছে এবং লম্বা বাছেত মিয়ার মাথা বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য হাজেরা তার শাড়ির আঁচল উঁচু করে ধরছে। সে ঠিক মাথাটাকে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে পারে না।

তারা দুজন বহুদিনের কাক্সিক্ষত বৃষ্টির ভেতর ভিজতে ভিজতে বাড়ির দিকে যেতে থাকে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: