বাজ

লেখক:

সৈয়দ মনজুরুল  ইসলাম
Syed Monjurul Islam
Syed Monjurul Islam

আয়াজের বাবা যখন পা রাখেন আটিরচরে, যমুনা খুব দয়ালু ছিল বড় এই চরটার প্রতি। প্রতি বছর এর আয়তন বাড়ত; চরের মানুষ কিছু ধান, কলাই বাদাম ফলিয়ে গরু চরিয়ে বেশ চালিয়ে দিত দিনকাল। রাজাপুর থেকে নৌকায় ঘণ্টাখানেক লাগত আটিরচরে পৌঁছাতে। তারপরও ব্যবসায়ীরা দলবেঁধে আসত। আয়াজের বাবা বলতেন আয়াজকে, এই বছর সাতেক আগেও, নদী আমাদের পায়ের নিচে মাটি দিয়েছে আমাদের পেটের খাবার আর পরনের কাপড়ের ব্যবস্থা করেছে, শুধু আমাদের পড়াশোনাটা শেখাতে পারেনি। তখনো তার আশা, হয়তো সেদিকটাও দেখবে নদী। আয়াজের বাবার জমি ধরে হাঁটলে চরের একপাশ থেকে আরেক পাশ পর্যন্ত চলে যাওয়া যেত। তিনি নিজের পরিচয় দিতেন খামারি হিসেবে। একসময় বেশ পয়সা ছিল তার হাতে, ছেলেকে বেলকুচি পাঠাতে পারতেন পড়াশোনা শিখতে। কিন্তু আটিরচর ছেড়ে ছেলে কোথাও যাবে, চার মেয়ের পর জন্মানো একমাত্র ছেলে, এরকম ভাবাটাও ছিল তার জন্য অসম্ভব। আয়াজের বাবা তাই বিকল্প কাজটিই করলেন, একটা স্কুল খুলে বসলেন আটিরচরে। বেলকুচি থেকে শেখ রমিজুদ্দিনকে নিয়ে এলেন স্কুলের হেডমাস্টার করে। রমিজুদ্দিনকে কিছু জমিও দেওয়া হলো, চরের উত্তর দিকে, যেদিকে ভাঙনটা বেশি Ñ যখন ভাঙন হয়। সেজন্যে জমির জন্য তেমন কারো দৌড় নেই সেদিকে।
কিছুদিন স্কুলটা ভালোই চলল, কিন্তু একদিন রমিজুদ্দিনকে, এক শরতের জ্যোৎøা রাতে, চাঁদে পেয়ে বসল। তিনি মাঝরাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েছিলেন। বাইরে ফকফকা সাদা জ্যোৎøা, চরের বালিতে সে জ্যোৎøা আছড়ে পড়ছে আর কুচিকুচি হয়ে উড়ছে, যেন এক অদৃশ্য ধুনুরী জ্যোৎøার তুলা ওড়াচ্ছে। রমিজুদ্দিন দেখলেন যমুনার  নীল-কালো বিস্তারের গা ঘেঁষে কাশবনের ধারে ধারে চিকচিক বালি এক অদ্ভুত বিছানা পেতে রেখেছে, যে-বিছানায় শুয়ে পড়লে এখন কোনো দলছুট পরী এসে মিলবে তার সঙ্গে। বালির বিছানায় শুয়ে তিনি চোখটা মেলে রাখলেন চাঁদের দিকে। চাঁদ থেকে পরি নামছে এবং রমিজুদ্দিন শরীরের নিচের অংশে শিহরণ অনুভব করছেন। রাতটা গভীর এবং হিম-হিম, কিন্তু তার ভেতরে আগুন। সেই আগুনে তিনি পুড়লেন। অনেকক্ষণ।
পরের দিন আয়াজের বাবা শুনলেন, রমিজুদ্দিন হঠাৎ কথা বলা বন্ধ করেছেন। স্কুলে যাননি, শুধু চরের বালিতে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, আর আপনমনে হাসছেন, অথবা বিষণœ চোখে যমুনার দিকে তাকিয়ে থাকছেন। দুদিন পর তিনি আরো শুনলেন রমিজুদ্দিন সারারাত চরের বালিতে হাঁটেন। কেউ পিছু নিলে রেগে যান, অথবা তাকে জিজ্ঞেস করেন, চাঁদটা কোথায়?
রমিজুদ্দিনের আগে থেকেই তিন ছেলেমেয়ে ছিল, আরো একটা মেয়ে হয়েছিল আটিরচরে। সেই মেয়েটির নাম তিনি বইটই ঘেঁটে রেখেছিলেন  সামারা।  সামারা থেকে সাত বছর বড় ভাইটার নাম ছিল জসীম। তাদের বড় যে দুজন, তাদের এ-গল্পের জন্য প্রয়োজন নেই, যেহেতু তাদের তিনি চৌহালীতে নানাবাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আটিরচরে আসার আগে, সেখানে একটা স্কুলে অন্তত পড়তে পারবে, সে-কথা ভেবে। আমাদের মনে হয়, তিনি যে একটা স্কুল চালাতে অপারগ হবেন, চাঁদের হাতে ধরা পড়বেন,   বাস্তব-অবাস্তবের বিভ্রমে পড়ে ইহকালটাকে একটা তরমুজের মতো ফালি ফালি করে কেটে ফেলবেন, সে-বিষয়টা তিনি আগেই জানতেন। তা না হলে নিজে যেখানে শিক্ষক দুই সন্তানের শিক্ষা নিয়ে এমনকি শঙ্কা থাকতে পারে যে, এক হাতে চোখ মুছতে মুছতে অন্য হাতে নানাবাড়ির দিকে তাদের ঠেলে দেবেন?
আয়াজ আলির বাবা যে স্কুল দিয়েছিলেন তার শুধু প্রধান শিক্ষক নন, একমাত্র শিক্ষকও ছিলেন রমিজুদ্দিন। তাঁর ছেলে জসীম আর আয়াজ পড়ত সেই স্কুলে। কিন্তু একটা বছরও বেচারাদের পড়া হলো না, চাঁদের শিকার হলেন রমিজুদ্দিন, আর স্কুলটাও গেল বন্ধ হয়ে। তারপর আয়াজের বাবা চেষ্টা করেছেন শিক্ষক জোগাড় করতে। কিন্তু চেনা পৃথিবী থেকে এতটা দূরে এই হারানো চরে কে আসবে শিক্ষার বাতি হাতে নিয়ে?
সাত বছর আগেও আয়াজের বাবা ভাবতেন, যমুনা তো নদী নয়, যেন দাইমা, অথবা দাইমা থেকেও বেশি। জন্ম দিচ্ছে, যতœ দিচ্ছে, আশ্রয় দিচ্ছে। যেদিন তার ছোট ভাইটি নৌকা নিয়ে শখের মাছ মারতে গিয়ে যমুনার চোরাস্রোতে হারিয়ে গেল, তখনো তিনি নদীর প্রতি রুষ্ট হতে পারেননি। তার বাবা কুচবিহার থেকে ভাগ্যের খোঁজে এসে নানান জায়গা হয়ে আটিরচরে পায়ের নিচে মাটি পেয়েছিলেন। তারপর সেই মাটি সোনাও ফলাল। ভাইটা তলিয়ে গেলে তিনি কিছুদিন অভিমান করে ছিলেন নদীটার ওপর, কিন্তু রাগ করতে পারেননি।
কিন্তু ভাইয়ের শোকটা এক বছরেও পুরনো হয়নি, যমুনার মেজাজ হঠাৎ বদলাতে থাকল। আয়াজের বাবা অবাক হয়ে অনেক ভাবলেন, কী হলো নদীটার হঠাৎ, কেন এমন আচরণ Ñ কিন্তু কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না। চরের যে উত্তরে ভাঙন হতো, সে উত্তরে নতুন জমি লাগল, কিন্তু অদ্ভুত এক মেজাজি আক্রমণ সে করে বসল চরের কোমর বরাবর। এক ভাদ্রে সারাদিন সারারাত তিনি শুধু হুসহাস করে মাটি মিশে যেতে শুনলেন যমুনার স্রোতে। এগারোদিন পর হঠাৎ থেমে গেল যমুনার রাগ। কী কারণে সে রেগেছিল, কে জানে। কিন্তু ফল হলো এই, কোমর বরাবর চরটা বেশ সরু হয়ে গেল। আয়াজের বাবার মনে পড়ল দুর্ধর্ষ মাছশিকারি যতীনের যেরকম আজগুবি এক রোগে মোটা পেটটা শুকিয়ে যেতে যেতে কোমরটা একটা ছোট ছেলের কোমরের মতো হয়ে গিয়েছিল এবং যা বুকের পাঁজরের, ঘাড়ের, মাথার আর হাতের ভার সইতে না পেরে একদিন ভেতরের দিকে গুটিয়ে গিয়েছিল, এবং যতীন পড়ে যেতে যেতে ভেবেছিল ‘এ কোন রাগী বাঘা মাছের সঙ্গে যুদ্ধ ঘটিয়ে আমিই শিকার হয়ে গেলাম?’ Ñ চরটাও সেরকম কোমর রোগা হয়ে ধুঁকতে থাকল।
যমুনা একসময় চোখ ফিরিয়ে নিল আটিরচর থেকে। অথবা যেন চরটার জন্মে দোষ ছিল, এখন বিষ খাইয়ে একে মেরে ফেলতে চাইছেন চরটির দাইমা। যে দক্ষিণে শেষ বড় ভাঙন কবে হয়েছে আয়াজের বাবাকে একটু কষ্ট করে তা স্মরণ করতে হয়, সেই দক্ষিণের একটা পুরো অংশ তিন-চারদিনে হাওয়া হয়ে গেল। সেই সঙ্গে হাওয়া হয়ে গেল দুই পরিবারের প্রায় চার আনা মানুষ। আয়াজের বাবা জানতেন, যমুনা কোনো কারণে রেগেছে। যতীন বলত, দেবতারা রাগলে কী আচরণ করবেন তা মানুষ কোনোদিন আন্দাজ করতে পারবে না। যমুনার রাগ দেখে আয়াজের বাবা ভাবলেন, এই নদীকে আমি কি চিনি? এই কি সেই নদী, তার গান আমার মায়ের পেটের ভেতর পৌঁছে দিয়ে আমাকে কাঁপাত, যখন উজানে আরেকটা চরে থাকতেন আয়াজের বাবা, তার অসুখে ভোগা জনমদুঃখী মায়ের সঙ্গে। এরকম ভাবনা একটা শুরু হলে আরেকটাতে, তারপর আরেকটাতে পৌঁছাতে সময় লাগে না। তার এরকম সুতোয় বাঁধা ভাবনার শেষটা ছিল, যমুনা কি চায় আমি সবাইকে নিয়ে আমার বাবার মতো বেরিয়ে পড়ি? পায়ের তলায় আরেকটা স্থিরমাটির আশায়? যমুনার ওপর তার অভিমান তীব্র হচ্ছিল, ক্ষোভও হচ্ছিল। সেই অভিমান ও ক্ষোভকে তীব্রতর করে যমুনা একদিন তার জমি ধরে টান দিলো।
এক ভাদ্র থেকে আরেক শ্রাবণ, তারপর ভাদ্র। দেখা গেল আয়াজের খামারি বাবা যমুনার বুকে তলিয়ে যাওয়া এবং শূন্যতার একটা চাদরে জড়িয়ে থাকা অজমির দিকে তাকিয়ে বলছেন, আমার আর যতীনের মধ্যে এখন তফাৎ কী? তারপর তিনি বুকে হাত রাখলেন, এবং যতীনের পা দুখানির মতো তার দুটি পাও আর জগতের ভার সইতে চাইল না।
শেখ রমিজুদ্দিন আয়াজের বাবার কবরের ব্যবস্থা করেছিলেন, জানাজাও তিনি নিজে পড়িয়েছিলেন। আয়াজকে সান্ত্বনাও দিয়েছিলেন। বাড়ি ফিরে তিনি মেয়ে  সামারাকে বলেছিলেন, আর কোথায় যমুনা হাত লাগাবে, বল তো মা?
আয়াজের বাবা মারা গিয়েছিলেন যে-বিকেলে, সে-বিকেলটা ছিল মেঘে ছাওয়া। সে-রাতে চাঁদ ছিল না, বস্তুত চাঁদ ছিল তার আধামাসি নির্বাসনে। চাঁদের একরম নির্বাসন-রাতে, এবং দিনে, অবাক, রমিজুদ্দিন সাহেব স্মৃতি ফিরে পান, কিছুটা প্রকৃতিস্থ হন। এবং মেয়ে  সামারার সঙ্গে বাস্তব-অবাস্তবের যে-দ্বন্দ্ব তাকে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে সেই চাঁদে পাওয়া রাতের পর থেকে তার একটা হিসাব মেলাতে চেষ্টা করেন।  সামারার বয়স বারো, কিন্তু হিসাবটা সে কেন জানি বেশ বোঝে। চাঁদের মৌসুমে যখন রমিজুদ্দিনের মাথাটা আলুথালু হয়, সামারাকে চিনতেও অনেক সময় তিনি ভুল করেন, সামারা তাকে কঠিন কিছু প্রশ্ন করে, অদ্ভুত কিছু দৃশ্য সাজায় তার সামনে, যেগুলো তাকে আরো আউলা করে। চাঁদের নিশ্বাসটা এখন পড়ছে না রমিজুদ্দিনের গায়ে তাই তিনি মেয়েকে খুব উদগ্রীব হয়ে প্রশ্নটা করলেন। সামারা বাড়ির উঠান ঝাড়– দিচ্ছিল। বাবার জন্য সে কাজ থামায়নি। এখন কাজ থামিয়ে সে বলল, যমুনা আপাতত আর হাত লাগাবে না, বাবা। যমুনার হাত এখন অন্যদিকে যাবে।
রমিজুদ্দিন অবাক হলেন, আবার হলেনও না। মেয়ের এই গুণটি তিনি যেদিন প্রথম আবিষ্কার করেন, খুবই অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু নিজের মাথার ঠিক নেই তার, এ নিয়ে যে ভাববেন, তাও তো সম্ভব নয়। হঠাৎ কখন টান পড়ে মাথার কোনো গোপন শিরায়, আর চেনা পৃথিবীটা লাটিমের মতো ঘুরতে থাকে। তারপর সব বদলে যায়। কোনটা কী বস্তু, তিনি ঠাহর করতে পারেন না। ঘরের সঙ্গে বাইরের জগৎটা আলাদা করতে পারেন না।  মানুষের চোখকে ভাবেন অন্যলোকের জানালা, যেন অন্যলোক দেখছে তাকে, নিবিষ্টভাবে। তিনি দুহাতে মুখ ঢাকেন।
তুমি আরেকবার আয়াজ ভাইর বাসায় যাও বাবা, সামারা বলল।
কেন?
রক্ত।
শেখ রমিজুদ্দিনের মাথা ঘুরে গেল। তিনি উঠে একটা দৌড় দিলেন। রক্ত? কার রক্ত? রমিজুদ্দিনের পেছন পেছন চরের কিছু মানুষ দৌড়াল। তারা খুশি হয়েছে, চাঁদহীন পনেরোদিনেও মানুষটির মাথায় তাহলে চাঁদ হানা দিয়েছে!
আয়াজের বাবা টিনের চাল দিয়ে দুটি বাড়ি করেছিলেন, সম্পন্ন খামারিরা যেমন করে। সেই চাল যখন নতুন ছিল দিনের বেলায় যমুনার অনেক দূর থেকে তা দেখা যেত, সূর্যের আলো এমন তেজে ফিরিয়ে দিত চালটা যেন নিজেই সে সূর্য, অথবা সূর্যের প্রতিদ্বন্দ্বী। সেই তেজটা অবশ্য আর নেই। জল-হাওয়ায় বাদামি হয়েছে, জং ধরেছে কোথাও কোথাও। সেই দুই বাড়ির একটির দাওয়ায় দাঁড়িয়ে আয়াজকে জড়িয়ে ধরে কাঁপছেন তার মা, আর উঠানভর্তি  লাঠি-বল্লম হাতে কিছু মানুষ। রমিজুদ্দিন চিনলেন। জমিতে চাষ দেওয়ার জন্য এদের চরে এনেছিলেন আয়াজের বাবা। জমি দিয়েছেন, ধানও দিতেন, মাঝেমধ্যে টাকাও দিতেন। কিন্তু আয়াজের বাবা মারা যেতে না যেতেই, তার কবরে ঘাস গজানোর আগেই, তারা এসে জানাচ্ছে, সব জমি এখন তাদের, যেহেতু আয়াজের বাবার কাছে তাদের অনেক পাওনা জমেছে। রমিজুদ্দিনের মাথাটা হঠাৎ পরিষ্কার হয়ে গেল। তিনি বুঝলেন, এই দশ-বারোজন মানুষ বীভৎস হয়ে উঠলে উঠানে আয়াজের মায়েরও রক্ত ঝরবে। ‘সব বানানো’ বলছে আয়াজ, ‘একটা পয়সাও পাওনা নেই, মা।’ কিন্তু আয়াজের কথাগুলি তার মাকে সান্ত্বনা দিলো না। তার ভয় বাড়িয়ে দিলো বরং। আরো বাড়িয়ে দিলো কাছা মেরে লুঙ্গি পরা উদোম গায়ে দাঁড়ানো নেতার আওয়াজ, তার গর্জন। সে-সময় দিলো আয়াজের মাকে, এক বেলা কি আধা বেলা, এবং গর্জনেই জানাল, না হলে বাড়িতে আগুন দেবে। আয়াজের মা? গলাটা মিহি, চরকায় যে-সুতা কাটেন তিনি মিহি কাপড় বোনার জন্য, অবসর সময়ে, তার থেকেও মিহি। তিনি বলার চেষ্টা করলেন, জমিই তো নাই বাবারা, জমি যা আছে এই কয়জনে মিলে টেনেটুনে হয়তো দিন চলে যাবে। কিন্তু চরের মানুষের গর্জন বলে কথা। সেই গর্জনে যমুনাও একটুক্ষণের জন্য থমকে যায়।
রমিজুদ্দিন পেছনে তাকালেন। জনাদশেক মানুষ তার সঙ্গে এসেছে, আর এসেছে একপাল ছেলেমেয়ে। তিনি মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, এটা অন্যায়। এটা হতে দেওয়া যায় না।
চরের মানুষের স্থায়ী ঠিকানা বিশেষ করে এই যমুনায়, কখনো চর হয় না। তারপরও চরের মানুষ দেখল, বাইরে থেকে আসা কিছু মানুষ তাদেরই একজনকে চরছাড়া করতে চাইছে। যে-মানুষটি বিপদে-আপদে তাদের পাশে দাঁড়াতো, তাদের জন্য একটা স্কুলও যে খুলেছিল, তার বিষাদছোঁয়া পরিবারকে পাঠিয়ে দিতে যাচ্ছে যমুনা পেরিয়ে অন্য কোনো ঠিকানায়। তাদের ক্রোধ হলো, তারা ফিসফাস করে ছেলেমেয়েগুলিকে কিছু বলল। ছেলেমেয়েগুলো এবার দৌড় লাগালো। বাইরে থেকে আসা মানুষগুলোর গর্জন কিছুটা কমেছে, তারা বুঝতে পেরেছে ঘরে আগুন লাগানোটা মুলতবি রাখতে হবে, হয়তো আয়াজের বাবার জমিতে ভাগ বসানোটাও। একটা ছোট দেয়ালের মতো দাঁড়ানো মানুষগুলো তাদের দেখছে, কোনো কিছুর জন্য প্রতীক্ষা করছে। দেয়ালটা বড় হতে কতক্ষণ? উঠানে দাঁড়ানো লোকগুলি কী করবে, ঠিক ভেবে পাচ্ছে না। কিন্তু হাতে লাঠি আছে, দু-একটি বল্লম আছে। তারা গর্জন থামালো, কিন্তু অবস্থান বদল করল না।
রক্ত! রমিজুদ্দিন চোখ বন্ধ করে দেখলেন, লোকগুলোর সামনে উঠানের অনেকটা জুড়ে রক্ত। তার মাথার শিরায় একটা টান পড়ল। তিনি মাটিতে বসে পড়লেন। পেছনের দেয়ালটা এগিয়ে এসে তাকে ঘিরে দাঁড়াল। রমিজুদ্দিন চোখ বন্ধ করতে করতে দেখলেন, রোদে পোড়া লাঠি-বল্লম হাতে মানুষগুলো তাকিয়ে তার দিকে, তাদের চোখের পেছন থেকে ধোঁয়া উড়ছে। তিনি আরো দেখলেন, চরের ওপরের দিক থেকে আরো একটা দেয়াল এগিয়ে আসছে। এ দেয়ালটা বড়। দেয়ালের ওপরে বর্শার ফলা। সেই ফলায় জ্বলছে সূর্যের আগুন।

দুই
আয়াজের মনে পড়ে, রমিজুদ্দিনকে কোলে তুলে কিছু মানুষ তার বাড়িতে রেখে ফিরে আসার সময় সামারা তার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল। সামারার হাসিটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলে। সামারার চোখ দুটিও। যেন তার ভেতরটা দেখছে সে-দুই চোখ। একবার কাশবনের আড়ালে শুয়ে সে নিজের জগতে থাকা পৌরুষের সঙ্গে খেলা করছিল। বালিতে পড়ছিল ফিনকি দেওয়া পৌরুষ। সেই ফিনকি দেওয়া উত্তেজনার বাষ্প তার চোখে, কিন্তু তা ভেদ করে সে হঠাৎ সামারার হাসি দেখেছিল, চোখ দুটি দেখেছিল। সেই নিস্তব্ধ দুপুরে আয়াজের মনে হয়েছিল, এরপর সারাজীবন সামারার সামনে বস্ত্রহীন হয়েই থাকবে সে। আজো সামারা হেসেছে। এবং আয়াজ দৌড়ে বাড়ি ফিরেছে।

তিন
আয়াজ দৌড়াচ্ছে, এবং দৌড়াতে দৌড়াতে সে পার হয়ে গেল পাঁচটি বছর। যেমন সিনেমাতে হয়, যেমন একবার দেখেছিলাম, বাবা কেন কাঠগড়ায় ছবিতে, এক স্কুলের বালক মহানগরীর রাস্তা ধরে দৌড়াচ্ছে একটা পুলিশের গাড়ির পেছন পেছন, যে-গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তার বাবাকে, এক মিথ্যা অভিযোগে এবং দৌড়াতে দৌড়াতে সে হাইকোর্টের সামনে এসে থামল, দেখা গেল তিনি তরুণ বয়সী এক ব্যারিস্টার, নায়করাজ রাজ্জাক, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বাবার জন্য লড়তে যাচ্ছেন, ফাইল হাতে দৌড়াচ্ছেন, আর ঘড়ি দেখছেন, যেহেতু বিচারপতি মহোদয়ের এজলাসে ঢোকার সময় হয়ে গেছে। আয়াজ অবশ্য কোথাও গেল না, শুধু যেখানে এসে থামল সেখানে একটা বড় ভাঙন যমুনার একটা পোকা খাওয়া দাঁতের মতো তাকিয়ে আছে, এবং জানান দিচ্ছে, ওই নষ্ট দাঁতটির মতো এ-জায়গাটারও আয়ু শেষ হওয়ার একটা অপেক্ষা মাত্র বাকি। গত কদিনে যমুনা পাক খেয়ে খেয়ে গেছে চরটার ধার দিয়ে, এবং প্রতিবার খুবলে খেয়েছে এর শরীর। জসীম আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল ভাঙনের সামনে, আয়াজকে দেখে সে ক্লান্ত একটু হাসল। সামারা বলেছে, আয়ু শেষ আটিরচরের, সে জানাল।
সামারা যদি বলে, তবে তাই, আয়াজ বলল।
ভাঙনের পাশে সাবধানে বসল দুজন। তাদের বসায় ক্লান্তি, কথায় ক্লান্তি। ক্লান্তিটা আয়াজের বেশি। সামারাকে যে বুঝতে পারে না। সামারার থেকে সে যা চায়, তা পাওয়ার সম্ভাবনাটা তার হারিয়েই যাচ্ছে।
‘কাল আসার কথা’, জসীম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল। আয়াজ চুপ করে রইল। সে জানে কে আসবে, কারা আসবে। সামারা বলেছে জসীমকে, তাকে দেখতে আসবে একজন, সঙ্গে আরো তিনজন। এই একজনকে পছন্দ হবে সামারারও, কিন্তু এই পছন্দ হওয়াটাতে ভেতর থেকে সে সায় পাচ্ছে না।
আয়াজ লোকটাকে চেনে। আটিরচরের স্বর্ণযুগ কবেই শেষ হয়েছে। এখন ধান, মাষকলাই, বাদাম আর আলুর সুদিন নেই। এখন চরে মানুষও কমেছে। আটিরচর বুড়ো হয়ে শরীরের অর্ধেকটা যেন হারিয়েছে। দূরে নতুন চর জেগেছে, নৌকার চর, ছোট ছনিয়ার চর, আমিনুদ্দিনের চর। ওইসব চরে চলে গেছে অনেক মানুষ। তারপরও মাষকলাইটা মন্দ হয় না, বাদামটাও। এখন মসলাও ফলায় কেউ কেউ। যে-লোকটা আসবে বলে তাকে জানিয়েছে সামারা, সে বেলকুচির মজিদ মহাজনের ছেলে। উঁচু লম্বা তার শরীর, আয়াজের মতো কালোও নয়। মুখটাতে হাসি লেগে থাকে, যেন খুব আমোদ পায় সে যমুনার ঢেউ ভেঙে রোদে ছাতা মেলে শ্যালো নৌকায় বসে হাওয়া খেতে খেতে আটিরচরে নামতে। সেই হাসি সে ধরে রাখে মালবোঝাই হওয়া, টাকা গুনে চরের মানুষের হাতে দেওয়া, ঝোলা থেকে গুড়মুড়ি বের করে খাওয়া আর ফিরে যাওয়ার জন্য নৌকায় চরে বসা পর্যন্ত। সেই হাসি তার মনের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল যেদিন সে সামারাকে দেখে। সে আজ সাত মাস হলো, আয়াজের হিসাব আছে। এবং মনের ভেতর ঢুকে   সে-হাসির রংটা একটু রাঙা হয়েছে, তাতে আলো জমেছে এবং কাচভাঙার শব্দের মতো একটা টুংটাংও জুড়ে বসেছে। সামারা এসেছিল জসীমের হয়ে, জসীমের জায়গায়। মাথায় ঘোমটা ছিল, শাড়িতে শরীর জড়ানো ছিল। জসীম আসতে পারেনি জ্বর নিয়ে বিছানায় শুয়েছিল বলে। দুটো কামলা মাথায় টুকরি নিয়ে এসেছিল, টুকরিভর্তি বাদাম মহাজনের ছেলে একটু লাজুক চোখে দেখছিল সামারাকে। সামারা কিছুক্ষণ তীক্ষè চোখে লোকটাকে দেখেছিল, তারপর বলেছিল, আজ তাড়াতাড়ি চলে যান।
কেন? লোকটা আশ্চর্য হয়ে বলেছিল।
তাড়াতাড়ি চলে যান, বলে টাকাটা নিয়ে সামারা হাঁটা দিয়েছিল। লোকটা তাড়াতাড়ি যায়নি। সামারাকে সে আবিষ্কার করেছে সবেমাত্র, সেই আবিষ্কারের ঘোর আর আনন্দ তার যেন চিরসঙ্গী হয়ে গিয়েছিল। সে অনেকক্ষণ চরের ঘাটে বসে তাকিয়ে দেখেছে, যে-পথটা দিয়ে সামারা চলে গেছে, সে-পথের দিকে। সামারা ফিরে আসেনি। লোকটারও সাহস হয়নি সামারার সন্ধানে বেরোতে। শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে, কিন্তু মুখের হাসিটা ধরে রেখে, সে নৌকায় চরে বসেছিল।
লোকটার জন্য নিশ্চয় মহাজনের পূর্বপুরুষদের দোয়া ছিল। একটা ঝড় হয়েছিল। নৌকাটা উলটেপালটে কীভাবে যেন একসময় সোজাও হয়েছিল। মাঝি একদিকে, সে একদিকে, কিন্তু শক্ত করে নিজেকে যেন বেঁধেই রেখেছিল নৌকার সঙ্গে। আরেকটা চরে কোনোরকমে নৌকাটা ঠেলাঠুলা দিয়ে নিতে পেরেছিল মাঝি। মাঝি বাঁচল, লোকটা বাঁচল। কিন্তু নৌকাতে রাখা টুকরিগুলি একটাও বাঁচল না। প্রবল হতাশার মধ্যেও লোকটা এই মনে করে হাসল যে, ছিপছিপে শরীরের আর জ্বলতে থাকা চোখের মেয়েটির বাদাম দিয়ে আজ বিকালের চা খেয়েছে যমুনা, যেমন তার মা খেতেন। বেলকুচিতে কতজন মা চা খেতেন, লোকটি ভাবে; কিন্তু হিসাব নিতে পারে না। মাকে যে জিজ্ঞেস করবে, তারও উপায় নেই। এক বিকালে তিনি হারিয়ে গেছেন।
লোকটির চোখে মায়ের ছবিটা ভেসে উঠল। কিন্তু সে সভয়ে দেখল, সেই ছবিটা মুছে দিয়ে ওই ছিপছিপে শরীরের মেয়েটির ছবিটা যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল।

চার
আটিরচর তো ঢাকা নয় যে একটা মেয়ে সতেরো বছর বয়স পর্যন্ত বিয়ে না করে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে, না হয় নাচ-গান শিখবে। আটিরচরে একটা সমাজ আছে, যে-সমাজ এক বৃষ্টির রাতে শেখ রমিজুদ্দিন পাকাপাকি অন্যলোকে চলে যাওয়ার পর ভেবে দেখেছে, রমিজুদ্দিনের পনেরো বছরের মেয়েটির বিয়ে না হলে সমাজের কোথাও যেন কিছু ভেঙে পড়বে অথবা একটা কাঁটার মতো সমাজের গায়ে তা বিঁধবে। আটিরচরে পাত্র যে ছিল না, তা নয়, কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়াল মেয়েটি নিজে। তাকে মানুষ সাধারণ আর দশটা মেয়ের কাতারে ফেলতে পারত না। চেষ্টা যতই করুক। একটা সাধারণ মেয়ে কি আকাশের দিকে একবার চোখ রেখে বলে দিতে পারে একটা তুফান কখন কোন দিক দিয়ে আসবে? অথবা, কোন রাতে চরের কোন অন্ধকারে নির্জনতা ভেঙে চলবে অন্যলোকের আনাগোনা এবং সে-রাতে ঘর থেকে বের হলে পোয়াতি মায়েরা পেটের সন্তান নিয়ে ঘরে ফিরতে নাও পারে? অথবা, কার কপালে আলো পড়তে যাচ্ছে সুদিনের? এক সুপাত্র পাওয়াও গিয়েছিল, আটিরচরের ছেলে, ভাগ্যের সন্ধানে কামারখন্দে গিয়ে দোকান দিয়ে অবস্থা ফিরিয়েছে। কিন্তু ছেলেটাকে দেখেই যদি সামারা বলে, ‘আগুন’ এবং তার সঙ্গে আসা মুরব্বিদেরও তাড়া দেয় ওই একই কথা বলে, তাহলে নিশ্চয় তার মাথার সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন সে তুলতেই পারে। কিন্তু ফিরে গিয়ে ছেলেটি যখন দেখে কামারখন্দ বাজারে আগুন লেগে তার দোকানটি একটা ছাইয়ের গাদায় রূপ নিয়েছে, তাহলে মাথা খারাপের সঙ্গে পিশাচী অভিধাটি তো মেয়েটির জুটতেই পারে। নাকি? না, সামারা ঢাকার মেয়ে নয়, ঢাকা সম্বন্ধে কোনো ধারণাই তার নেই, বস্তুত। কিন্তু এরপর আরো দুটি বছর পার হলেও বিয়ের আসনে তার বসা হয়নি। জসীম দুঃখ করে বলে, বোনটাকে কোনো সুপাত্রের হাতে তুলে দেওয়ার সৌভাগ্য তার ইহজীবনে হবে না। মানুষ তাকে এড়িয়ে চলে, ভয় পায়। এরকম মেয়ের বিয়ে হওয়াটা, আটিরচরের মতো বদ্ধ সমাজে কঠিন, অসম্ভব না হলেও।
আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন, অসম্ভব কেন হবে, যেখানে আয়াজ রয়েছে এবং আয়াজের মনেও সামারার জন্য একটা কোমল জায়গা তৈরি হয়ে রয়েছে সেই কবে থেকে। আয়াজ যখন যেত জসীমের বাড়িতে, সামারা মুখে হাসি নিয়ে এসে দাঁড়াত। রমিজুদ্দিন মারা যাবার সময় দিয়ে আয়াজের যাতায়াতটা বেশি ছিল। তার জন্য আয়াজের মা প্রায়ই এটা-সেটা রেঁধে পাঠাতেন, সেসব পৌঁছে দিতে, বাড়ির টুকটাক কাজ করে দিতে। ততদিনে সামারার সামনে তার নিজেকে আর বিবস্ত্র মনে হতো না Ñ সেই চর দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে কয়েকটা বছরের খোলস ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে সে যখন বড় হলো, দেখল আগের লজ্জাটা আর নেই। তার জায়গায় বরঞ্চ একটা মিহি লোভ জন্মেছে Ñ সে-লোভ সামারাকে তার শরীরের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার। সামারা সেটা টের পেয়েছিল কি না কে জানে, কিন্তু আয়াজের সামনে শরীরটা অল্প অল্প সেও মেলে দিতে শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু একদিন নিজেই সে একটা কঠিন সীমারেখা এঁকে দিলো দুজনের মধ্যিখানে। মাঠে বাদাম তুলতে গিয়ে এক হঠাৎ তুফানের দিনে সামারার কী মনে হয়েছে কে জানে, সে পরদিন আয়াজকে দেখে বলল, তফাৎ থাকবে। বাজ। সামারা এরকমই কথা বলে, যখন তার চোখে অন্যলোক অথবা অন্যলোকের কোনো গোপন ছবি ধরা পড়ে। আয়াজ অবশ্য ঘাবড়ে যায়নি, অন্যরা হলে যেমন যেত। সামারার হাতটা টেনে নিজের বুকের ওপর ধরেছে একদিন এবং কিছুক্ষণ ঘরের পেছনের কেয়াবনের অন্ধকারে নিজের শরীরে চেপে ধরেছে সামারার শরীর। একটা কোলাহল যে শুধু তার শরীরে নয়, সামারার শরীরেও জাগছিল, সেটি টের পেতে পেতেই সে দেখল, শাড়ির আঁচলটা বুকের ওপর টেনে দ্রুত সরে গেল সামারা। তার নিশ্বাস পড়ছে ঘন এবং ভেজা, এবং এর মধ্য দিয়েই সে বলল আয়াজকে, সে দেখেছে, তাদের মিলনের অন্তে আছে বাজ। যদি তারা একত্র হয়, বাজ পড়ে ছাই হয়ে যাবে আয়াজ। কথাটা সে বলল শীতল একটি বিশ্বাস থেকে এবং আশ্চর্য, তার নিশ্বাসের পরস স্পর্শও সেই বিশ্বাসের কাছে শীতল হতে থাকল।
চরের মানুষ আয়াজ, সে জানে বাজ কত ভয়ংকর। সে আরো জানে সামারার কথাগুলো বাজ থেকেও কত ভয়ংকর। একটা ছুরির মতো কথাগুলো তাকে কাটছে, কিন্তু সেই ছুরিকে অস্বীকার করবে, এমন সাহস কি তার আছে?
আয়াজ ভাবে, শরীরে শরীর না হয় না-ই লাগল, বিয়ের রংটা না হয় না-ই মাখা হলো দুজনের গায়ে, একটা সম্পর্ক গাঢ় হতে না হতে বাজের আগুনে পুড়ে শেষ হওয়ার আগে বরং এভাবেই থাকুক না, অসম্পর্কের একটা ঘরে, যেখানে সম্পর্ককে নতুন করে ব্যাখ্যা করবে তারা দুজন, প্রতিদিন। সামারা তাকে বলল, তুমি ওইখানটায় থাকো, আমি এইখানটায়, ধরে নাও আমি একটা চরে, তুমি আরেকটাতে, মাঝখানে যমুনা বয়ে যায় একটা তর্জনী উঁচিয়ে। সমস্যা নেই তো।
সমস্যা নেই নিশ্চয়, কারণ এরপর আয়াজেরও কেন জানি শরীর শীতল হয়েছে। কষ্ট বেড়েছে, কিন্তু আনন্দটাই তো কম নয়। প্রতিদিন দেখছে সামারাকে, কথাও বলছে, হাসছে সামারা, এক-আধবার হাতে হাতও রাখছে। সবচেয়ে বড় কথা, সে আছে। যমুনাকে মাঝখানে রেখে পড়ে থাকা দুই চরের মতো।
কিন্তু আয়াজ জানে, চরের নাম যেহেতু সামারা. এর আয়ু দীর্ঘদিনের নয়। সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, ভাবে জীবনটা এত কঠিন কেন, এত অল্পদিনের কেন?
আপনারা ঠিকই বুঝেছেন, সামারার জন্য যদি একটাও সুপাত্র থেকে থাকে ইহজগতে, সে আমাদের আয়াজ। এরকম দুই মানুষ একখানে হলে কী রসায়নের উৎপত্তি হয়, তাও আপনারা জানেন। একটা আগুন জ্বলের এবং জ্বলতে থাকে, যে-আগুনে শিখা আছে, ধোঁয়া নেই। জসীমও সেটি বোঝে। জসীমকে জিজ্ঞেস করুন। তার সবচেয়ে বড় দীর্ঘশ্বাসটি জমা আছে বোনটির জন্য, তার পরেরটা আয়াজের জন্য এবং তৃতীয়টা দুজনের জন্য।

পাঁচ
বেলকুচির মহাজনের নৌকা আবার ভিড়ল আটিরচরের ঘাটে। তবে আজ সে-নৌকা সওদা কিনতে আসেনি, আজ এসেছে জসীমের সঙ্গে, জসীমের মা এবং খালাখালুর সঙ্গে পাকাপাকি কথা বলতে। সকালে একটা লোক এসে জানান দিয়ে গেছে, মহাজনের নৌকা আসবে দুপুরে। জসীমের ইচ্ছা হয়েছিল মাকে জানিয়ে দেয়, মহাজনের ছেলেকে সে ফিরিয়ে দেবে, কিন্তু মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে তার সিদ্ধান্ত বদল করতে হলো। শুধু তাই নয়, একটুখানি সওদাপাতি করতে হলো বাবুল মিয়ার দোকান থেকে। ঘরের উঠানে ঘুরে বেড়ানো দুটো মুরগিকে ধরতে হলো, ছিপ নৌকা বেয়ে মাছ মেরে আনতে হলো। সকালের তিনটা ঘণ্টা অনাবশ্যক খরচ হলো জসীমের। কিন্তু মাছ মারতে যাওয়ার আগে আয়াজকে পেয়ে সে কথাটা বলেছে তাকে।
জসীমের গলার চাপা ক্ষোভে আয়াজ ঘরভাঙনের শব্দ শুনতে পেল। এই ভাঙন তার বুকের পাঁজর ধরে টান দিয়েছে। তার মনে হলো, যেন একটা গভীর খাদে তার হৃৎপিণ্ড তলিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে এর আর উদ্ধার মিলবে না।
চরের বাতাস তেতে উঠছে। বালি উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এই উত্তাপ গায়ে মেখে ঘরের পথ ধরতে চেয়েছিল আয়াজ। তার প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আজ একটা নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়বে সে, মাইলখানেক ভাটিতে ছোট ছনিয়ার চরে গিয়ে দিনটা কাটিয়ে  দেবে। জেলেরা টং বানিয়েছে বছর পাঁচেকের এই ছোট চরটাতে, চাইলে একটা টংঘরে শুয়ে থাকবে সারাদিন। বাড়ির কিছুটা পথও গিয়েছিল সে, কিন্তু হঠাৎ আকাশ-কাঁপিয়ে একটা শব্দ হলো। বাজ? ত্বরিত তাকালো আয়াজ। না, একটা হেলিকপ্টার। বেশ নিচু দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ এই আকাশ কাঁপানো যন্ত্রপাখিটার দিয়ে তাকিয়ে থাকল সে। উড়তে উড়তে সেটি অনেক দূরে নদীর আড়াআড়ি আকাশে একটা শূন্য হয়ে মিলিয়ে গেল। আর তখনই যেন, আকাশের কড়া আলো আর ধূসর নীল থেকে একটা বিজলি ফলার মতো চিন্তা এসে তার চোখ বরাবর আঘাত করল। তার চোখ বন্ধ হয়ে গেল। এবং বন্ধ চোখের ভেতরে হঠাৎ যেন একটা বায়োস্কোপ শুরু হলো, বায়োস্কোপটা তাকে আর সামারাকে নিয়ে। সামারা তার শরীরে শরীর মেলে শুয়ে আছে, কাশবনের ওই আড়ালটাতে, যে-আড়ালে চোখ ফেলে মুখে হাসি নিয়ে তার পৌরুষের জাগা আর ফিনকি দিয়ে বালিতে চিহ্ন রাখার ছবিটা দেখছিল সামারা, সেই কতকাল আগে। বাজখাওয়া মানুষের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আয়াজ ভাবল, বাজের আঘাতটা তো তার ওপরই পড়বে। সামারার ওপর নয় Ñ এরকমই তো বলেছে সামারা, সে-ই পুড়ে ছাই হবে, সামারা নয়। তাহলে? তাহলে কিসের ভয়? সামারা চলে যাওয়া আর তার বাজ খেয়ে ছাইয়ের স্তূপ হয়ে পড়ে থাকার মধ্যে তফাৎটা কী?

ছয়
মহাজনের নৌকা বারোটার কিছু আগেই এসে ঘাটে নামল। মহাজনের ছেলেটির একটুও দেরি সহ্য হচ্ছিল না। মহাজন একটু পা টেনে হাঁটেন, ভুঁড়িটাও সম্পদশালী। ছেলে বলল বাবাকে, হাতে পায়ে খিল ধরেছে বাবা, একটু হেঁটে পায়ে শক্তি আনি?
মহাজন হাসল, যা, তুই রওনা দে, আমরা আসছি।
ছেলে টাট্টু ঘোড়ার মতো পা ঠুকে ছুটল।
কিছুদূর গিয়ে যেখানে বালির রাস্তাটা একটা ছোট ডোবার পাশ দিয়ে হোগলার ঝোপ ডানে রেখে কিছু নিচু গাছপালার আড়াল ধরে সামারার বাড়ির দিকে যায় এবং যেতে যেতে এক চিলতে ঘাসে ঢাকা মাঠে ক্ষাণিকক্ষণ জিরায়। ঠিক সেখানে একটা ওলটানো নৌকার ওপর হাত ধরাধরি করে সে বসে থাকতে দেখল ছিপছিপে শরীরের মেয়েটাকে। এক যুবকের সঙ্গে। মহাজনের ছেলে হঠাৎ চলা থামিয়ে তাকাল, দুচোখ কচলালো, দেখতে চেষ্টা করল মেয়েটা কি সত্যি ছিপছিপে শরীরের জ্বলজ্বলে চোখের সেই মেয়ে। একবার দেখেই তার সন্দেহ রইল না। কিন্তু এই মেয়েটি যদি সেই মেয়েটি হয়, তাহলে সঙ্গের ছেলেটি সে নয় কেন?
সে নয় যে ছেলেটি, সে হঠাৎ একটা টান দিয়ে মেয়েটিকে কোলে ফেলল। তারপর তার মাথার পেছনে একটা হাত দিয়ে ছিপছিপে শরীরের এবং উজ্জ্বল চোখের মেয়েটির মুখ তার মুখের সামনে এনে তার দুই ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। এবং আশ্চর্য, হাসতে থাকা মেয়েটি ছেলেটার দুই ঠোঁটে নিজের হাসিটা মুছে জ্বলজ্বলে চোখ দুটি বন্ধ করে ঘন নিশ্বাস নিতে থাকল।
যেন, সে নয় যে ছেলেটি, সে তাকে এক জীবনের সুখ এক মুহূর্তে বিলিয়ে দিচ্ছে।
মহাজনের সঙ্গের দুই লোক একটু দূর থেকে দেখল, মহাজনের ছেলে হাঁটু গেড়ে একচিলতে ঘাসি জমিতে বসে আছে, যেন তার মাথায় বাজ পড়েছে একটু আগে। যে তাকিয়ে আছে একটা ওলটানো নৌকার দিকে, যেন নৌকাটাও পুড়েছে সেই বাজে, আর তার কোথাও যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
তার খোলা এবং তিরতির করে কাঁপতে থাকা সাদা চোখের দিকে তাকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে মহাজন জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে, বাপজান?