চারশো বছরেও অধিক সময় আগে বেলাই বিলের আশেপাশে কোনো গ্রামের অস্তিত্ব ছিল না। খরস্রোতা চেলাই নদীর কারণে বিলটিও খরস্রোতা স্রোতস্বিনীরূপে বিরাজমান ছিল। কথিত আছে – ভাওয়ালের  ওই সময়ের ভূস্বামী ঘটেশ্বর ঘোষ ৮০টি খাল কেটে চেলাই নদীর জল নিঃশেষ করে ফেলেন। তারপরই এটি প্রকাণ্ড বিলে পরিণত হয়। বিশাল এই বিলটির কোনো কোনো স্থানে প্রায় সারাবছরই পানি থাকে, তবে বর্ষায় করে থইথই। এ-সময় বিলের চারপাশে মাছ ধরার জন্য ডাঙ্গি খনন করে স্থানীয়রা। আর শুষ্ক মৌসুমে বিলটি হয়ে ওঠে এক ফসলি জমি। গাজীপুর জেলা শহর থেকে পূর্বদিকে বর্তমানে বিলটির ১৫-২০ কিলোমিটার এলাকায় বিস্তীর্ণ হলেও আগে আরো বড় ছিল। বাড়িয়া, কামারিয়া, পাকুরিয়া, কেশরিতা, নরুণ, পুনসহী, জাঙ্গালিয়া, বক্তারপুর, ব্রাহ্মণগাঁও, বামচিনি গ্রামগুলোকে ঘিরে  রেখেছে এই বেলাই বিল। ১৯৭১ সালের ১৪ মে, শুক্রবার দুপুরে বেলাইয়ের জল লালে লাল হয়ে যায়। হঠাৎ করেই হিন্দু-অধ্যুষিত বাড়িয়া এলাকায় আক্রমণ করে পাকিস্তানি হানাদাররা। মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মিশনে বাড়িয়া এলাকার শত শত নারী-পুরুষ-শিশুকে গুলি ও ব্রাশফায়ারে হত্যা করে তারা। বেলাই বিলের জলে কচুরিপানার মতো ভাসতে থাকে মানুষের বীভৎস দেহ। শেয়াল-কুকুরে খেয়ে ফেলে কারো কারো লাশ! দাউদাউ করে পুড়তে থাকা বিধ্বস্ত বাড়িয়ার বাতাসে তখন কেবলই লাশের গন্ধ! রক্তে লাল হয়ে যায় বেলাইয়ের জল। স্বাধীনতার এতকাল পরও বাড়িয়া গণহত্যায় কতজন শহীদ হয়েছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বাড়িয়া গণহত্যায় শহীদ হওয়া ১৫১ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন। অথচ স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রে ঠাঁই হয়নি বিস্মৃত সেইসব শহিদের। বাড়িয়া এলাকায় সেদিন কী ঘটেছিল, কীভাবে ঘটেছিল, কেমন বীভৎস দৃশ্য ছিল ওই এলাকার? আজকের লেখায় সেসব কথাই বর্ণনা করব। 

এক

গাজীপুরের রাজবাড়ি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পূর্বদিকে অবস্থিত বাড়িয়া এলাকাটি ১৯৭১ সালের ১৪ মে মাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে বাড়িয়ার শত শত বাড়িঘর। তিনদিকে বেলাই বিল পরিবেষ্টিত বাড়িয়ায় নির্বিচারে চালানো হয় গণহত্যা। বিল সাঁতরে কিংবা নৌকায় চড়ে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন তারা। পাকিস্তানি বাহিনীর এই হত্যা-শিকারের তালিকা দীর্ঘতর। তবে অনুসন্ধানে শখানেক নারী-পুরুষ-শিশুর তালিকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়ছে।

সেদিন ছিল জুমাবার। জুমার নামাজের আজান হয়ে গেছে মসজিদে। গৃহবধূরা দুপুরে রান্না বসিয়েছেন চুলোয়। বেলাই বিলের দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ের গ্রাম বাড়িয়া। দেখতে অনেকটা ছবির মতো। ঘন সবুজে আচ্ছাদিত বাড়িয়া গ্রামে মূলত হিন্দুদের বসতিই বেশি। হিন্দুঅধ্যুষিত গ্রামের মানুষজনের মূল পেশা কৃষি। চারদিকে যুদ্ধ চলছে। খবর আসছে। ঢাকায় গিয়ে ফিরে আসেননি কেউ কেউ। শহিদ হয়েছেন; কিন্তু পরিবারের লোকজন প্রিয় মানুষটির ফেরার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছেন। ১৩৭৮ বঙ্গাব্দের ২৯ বৈশাখের ঘটনা এটি। আগেই বলেছি, দিনটি ছিল শুক্রবার। মুসলিম পরিবারের কর্তাদের কেউ কেউ দূরের মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে গেছেন। এরই মধ্যে ঘটে যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নৃশংসতম এই গণহত্যা। দুপুর ১টার ঠিক আগমুহূর্তে বাড়িয়া গ্রামে প্রবেশ করে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুই শতাধিক সদস্য। কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে তারা। গ্রামের কোনো মানুষই প্রস্তুত ছিলেন না তখন। আচমকা শুরু হয় গুলি আর ব্রাশফায়ার। চারদিকে গুলির শব্দ। ভয়ে কাঁপতে থাকেন মানুষগুলো। চলতে থাকে হত্যা না করার গগনবিদারী আর্তনাদ। কিন্তু কোনো বিনয়ই পাকিস্তানি বাহিনীর কানে পৌঁছেনি সেদিন। গুলি আর ব্রাশফায়ারের শব্দ শুনে নারী-পুরুষ আর শিশুরা আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে যেতে থাকেন বেলাই বিলের পাড়ের জয়রাম বেড়, বড় কয়ের, বক্তারপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে। অসংখ্য মানুষ সাঁতরে ও নৌকায় চড়ে বিল পাড়ি দিতে পারলেও হতভাগ্য অন্তত দুশো মানুষ আত্মরক্ষা করতে পারেননি। পাকিস্তানি পশুদের হাতে শহিদ হন তারা। এ-সময় বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে এ-গ্রামে আশ্রয় নেওয়া আরো ৫২ জনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। হত্যা করা হয় বহিরাগত এই মানুষগুলোকেও। শহিদদের রক্তে লাল হয়ে যায় বেলাই বিলের জল। শেয়াল-কুকুর কিংবা কাক-শকুনের খাদ্য হয় লাশগুলো। তাদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি বর্বররা। প্রতিটি বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। লুটপাট করে স্থানীয় রাজাকাররা। কেউ কেউ আবার আশ্রয় নেন পার্শ¦বর্তী নাগরী মিশন ও  সেন্ট নিকোলাস স্কুল প্রাঙ্গণে। কারো কারো ঠাঁই হয় লালমাটিয়া মিশনে।

ওইদিন এই হত্যা মিশন চলে মাত্র চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার শরণার্থী এসে নাগরী মিশন ও  সেন্ট নিকোলাস স্কুল প্রাঙ্গণে ঠাঁই নেন। সেই মিশনে আসে মরদেহ। গুলিবিদ্ধ হয়ে আসেন অসংখ্য মানুষ। লাশগুলো নাগরী কবরস্থানে সমাধিস্থ করার পর আহতদের ছাত্রদের বোর্ডিংয়ে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বাগদী গ্রামের ডা. বার্নাড রোজারিও এবং পাঞ্জোরা কনভেন্টের নার্স সিস্টার ডলোরেস তাদের চিকিৎসা দেন। রাঙামাটিয়া মিশনের দৃশ্যও একই রকমের ছিল। এ-মিশনের মূল নাম স্যাকরেড হার্ট চার্চ। ১৯২৪ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭১ সালে এই চার্চের দায়িত্বে ছিলেন একজন ফাদার। মিশনটি গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার রাঙামাটিয়া গ্রামে অবস্থিত। বাড়িয়া গ্রামে পাকিস্তানি হানাদাররা নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালালে হাজার হাজার অসহায় মানুষ বিল পার হয়ে রাঙামাটিয়া মিশনে আশ্রয় নেন। পরবর্তী সময়ে ২৬ নভেম্বর রাঙামাটিয়া গ্রামেও হত্যাযজ্ঞ চালায় হানাদাররা। আগুন দিয়ে বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। 

সেই গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ভাওয়াল বাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক যতীন্দ্র চন্দ্র দাস বলেন, ‘জয়দেবপুরের শ্রীনিবাস ভৌমিকের কাছে গ্রামের নিহতদের একটি তালিকা ছিল। তিনি বঙ্গবন্ধুর আমলে রিলিফ কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন। সেখানে ১৫১ জন শহিদের তালিকা দেখেছিলাম।’  অথচ স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রে ঠাঁই হয়নি বিস্মৃত সেইসব শহীদের। তবে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের তৈরি করা শখানেক  শহিদের একটি নামের তালিকা ধরে দীর্ঘ এই লেখার কাজ এগিয়ে গেছে। বাড়িয়া গ্রামে একটি স্মৃতিস্তম্ভও নির্মাণ করা হয়নি। স্থানীয়দের জোর দাবির মুখে শহিদদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাথায়। 

দুই

বানু চন্দ্র শীলের চুল থেকে পানি ঝরছে। ক্লান্ত শরীর। গায়ের সঙ্গে মিশে আছে ভেজা শার্ট। লুঙ্গি চুঁইয়ে পানি পড়ছে মাটিতে। বেলাই বিলের উত্তর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী তরু বালা শীলের প্রাণ ভিক্ষা দেওয়ার জন্য পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে হাত জোড় করে প্রার্থনা করছিলেন বানু চন্দ্র শীল। তাঁর এই হাতজোড় করা প্রার্থনা বর্বরদের কানে পৌঁছেনি। ইচ্ছে করলে বানু শীল নিজেকে বাঁচাতে পারতেন; কিন্তু জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে অবশেষে বানু চন্দ্র শীল মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করেন। তবে তিনি একা নন, সঙ্গে মা, বাবা, স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ে। একই সঙ্গে তারা ছয়জন শহিদ হন পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে। সেই ঘটনার বর্ণনা দিতে  গিয়ে বারবার কেঁদে উঠছিলেন প্রাণে-বেঁচে-যাওয়া বয়সের ভারে ন্যুব্জ বানু শীলের বড় বোন নিলু রাণী শীল।

ঝিঁঝি পোকার প্রভাতি আর্তনাদের শব্দে মানদা সুন্দরীর ঘুম ভেঙে যায়। ১৪ মে ভোরে বিছানা ছেড়ে ওঠেন তিনি। স্বামী হরেন্দ্র চন্দ্র শীল বিছানায় শুয়েই থাকেন। দেশের খোঁজখবর নিয়ে একটু দেরিতে ঘুমাতে যান রাতে। বাড়িতে একটি রেডিও ছিল। সেই রেডিওতেই দেশের খবরাখবর রাখতেন হরেন্দ্র চন্দ্র শীল। তাঁর ডাকনাম বুইদ্যা চন্দ্র শীল। গ্রামে মাতব্বরি করতেন, রাজনীতির খোঁজখবর রাখতেন। সমাজসচেতন ছিলেন বলেই এলাকার মানুষ হরেন্দ্র চন্দ্র শীলকে বুইদ্যা চন্দ্র শীল বলে ডাকতেন। বুইদ্যা মানে হচ্ছে ভালো বোঝেন এমন। স্বামীকে বিছানায় রেখে স্নান সেরে মানদা সুন্দরী বাড়ির উঠানের তুলসীতলায় জল ছিটিয়ে প্রভাতি প্রার্থনায় মগ্ন হন। দেশের অবস্থা ভালো নয়। কারো মায়ের বুক যেন খালি না হয় তার জন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করেন। তাঁর মেয়ে নিলু রানী শীল বলেন, ‘প্রার্থনা সেরে মা সকালের নাস্তা তৈরি করেন। বাবা-ভাইবোনসহ পরিবারের সকলকে নাস্তা খেতে দেন। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে তখনো আলোচনা হয়। আমি বাবার বাড়িতেই থাকি। স্বামী সর্বমোহন শীল ও তিন ছেলেকে নিয়ে আমার সংসার। একই বাড়িতে আমাদের বসবাস।’ 

সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। বাড়ির পাশে বাড়িয়া স্কুলমাঠে হইচই করে খেলছে ছেলেরা। মানদা সুন্দরী আবার দুপুরের রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমন সময় হঠাৎ উত্তর দিক থেকে বিকট একটা শব্দ ভেসে আসে। নিলু শীল বলেন, ‘মা তো ভয় পেয়ে গেলেন। আমিও প্রচণ্ড ভয় পেলাম। বাড়ির বাইরে থাকা আমার তিন ছেলে দৌড়ে বাড়িতে আসে। ভাই বানু শীল পাশের বাজার থেকে বাড়ি ফিরে আসে।’ চারদিকে তখন বলাবলি শুরু হয়েছে – দ্রুত পালাতে হবে। পাকিস্তানি মিলিটারিরা গ্রামে ঢুকে পড়েছে। ব্রাশফায়ার করছে। গুলি করে মানুষ মেরে ফেলছে। বাড়ির যে ঘর যে অবস্থায় ছিল ওই অবস্থায় রেখেই হরেন্দ্র চন্দ্র শীল সকলকে বের হতে বললেন। বেলাই বিলের ওপারে জয়রামবেড় গ্রামে আশ্রয় নেবেন। কোনো দেরি নয়। হরেন্দ্র চন্দ্র শীল চললেন আগে, পেছনে ছুটলেন তার স্ত্রী মানদা সুন্দরী, ছেলে বানু শীল, তার স্ত্রী তরু বালা, মেয়ে দিপালী, ছেলে বেণু শীল, হরেন্দ্র শীলের মেয়ে নিলু রানী শীল ও তার তিন ছেলেসহ পরিবারের অন্যরা। পাঁচ বছরের দিপালীকে বানু ও  তিন বছরের বেণু শীলকে কোলে নিয়ে ছুটলেন তরু বালা। যাওয়ার সময় বারবার তারা বাড়ির দিকে ফিরে তাকান। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। বাড়িয়া গ্রামের নারী-পুরুষ ও শিশুরা দলবেঁধে ছুটছেন বেলাই বিলের নৌকাঘাটে। শীলপাড়ার লোকজনও পিছিয়ে নেই। দৌড়ে তারা ঘাটে গিয়ে পৌঁছান। 

হঠাৎ করেই সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। বিলের বেশির ভাগ জায়গায়ই কচুরিপানায় ঢাকা ছিল। পানি কোথাও নাভি পর্যন্ত, কোথাও বুক, কোথাও আবার হাঁটু পর্যন্ত। ঘাটে বেশ কয়েকটি ডিঙি নৌকা বাঁধা ছিল। বানু চন্দ্র শীল বেছে একটি নৌকা কাছে আনেন। উদ্দেশ্য হলো, তাঁর পরিবারের সকল সদস্যকে তুলে ওপারে নিয়ে যাওয়া; কিন্তু পরিবারের লোকজন নৌকায় ওঠার আগেই ভরে যায় লোকে। ওপারে যাওয়ার জন্য তখন ঘাট লোকে লোকারণ্য। পরিবারের সদস্যদের বিলের পাড়ে রেখেই অন্যদের নিয়ে দ্রুত ওপারে চলে যান বানু শীল। এ-সময় বাড়িয়া গ্রাম থেকে একের পর এক গুলির শব্দ ভেসে আসছে। দাউদাউ করে বাড়িঘর পুড়ছে। দূর থেকে সে-দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। বানু ফিরে আসেন ঘাটে। এবারো তার পরিবারের কেউ নৌকায় উঠতে পারেননি। গ্রামের পরিচিত-অপরিচত লোকজনে ভরে যায় ছোট্ট নৌকাটি। আবার  নৌকা নিয়ে ওপারে যান তিনি। এবার ফিরে এসে দেখেন বোন নিলু শীল তাঁর তিন সন্তান সুবোধ চন্দ্র শীল, সুবল চন্দ্র শীল ও সুভাস চন্দ্র শীলকে নিয়ে সাঁতরে বিল পার হয়েছেন। পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন মা মানদা সুন্দরী, বাবা হরেন্দ্র শীল, স্ত্রী তরু বালা, পুত্র বেণু শীল ও কন্যা দিপালী রানী শীল। অন্যরা জানলেও স্ত্রী তরু বালা সাঁতার জানেন না। এভাবে পরপর সাতবার নৌকা নিয়ে বানু শীল বেলাই বিলের দক্ষিণ পাড়ে যান লোকজন নিয়ে। এবার ক্লান্ত বানু যখন তাঁর পরিবারের সদস্যদের তুলে নেওয়ার জন্য দ্রুত ঘাটের দিকে আসছেন, তখন বিলের মাঝামাঝি এসে ঘাটের দিকে তাকিয়ে দেখেন পাকিস্তানি সেনারা ঘাটে পৌঁছে গেছে। নিলু রানী শীল বলেন, ‘বানু ইচ্ছে করলে মাঝপথ থেকেই ঘুরে যেতে পারত। নিজে অন্তত বাঁচতে পারত; কিন্তু বানু সেটা না করে দূর থেকেই চিৎকার করতে করতে ঘাটে আসে।’ এরই মধ্যে মা, বাবা, স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে বর্বররা। ভেজা শরীরে পাড়ে এসে পাকিস্তানি মিলিটারিদের হাত জোড় করে অনুরোধ করেন কাউকে হত্যা না করার জন্য। স্ত্রীসহ সকলের জীবন ভিক্ষা চান বানু। তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের কর্ণকুহরে বানু শীলের অনুরোধ পৌঁছেনি। এক পর্যায়ে মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে বানুকেও দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়। বানুর লুঙ্গি থেকে তখন চুইয়ে চুইয়ে জল ঝরছিল। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রায় ৯০ বছর বয়সী নিলু রানী শীল কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, বিলের ওপার থেকে এপার দেখা যাচ্ছিল। তাদের যে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে সেটা স্পষ্ট তিনি দেখেছেন। একপর্যায়ে ব্রাশফায়ার করা হয় এই ছয়জনকে। সঙ্গে সঙ্গে হাড়-মাংস ঝাঁঝরা হয়ে যায়। সবুজ ঘাসের ওপর পড়ে ছটফট করতে করতে ছয়জনই মারা যান। নিলু বলেন, ‘ গ্রামবাসীর জীবন বাঁচাতে গিয়ে আমার ভাইটি নিজেকেই বাঁচাতে পারেনি। বাঁচাতে পারেনি তার কলিজার দুই টুকরোকে। মা-বাবা ও স্ত্রীসহ একই স্থানে প্রাণ হারান বানু।’ এই ছয়জনের দেহের তাজা রক্ত গড়িয়ে বেলাই বিলের জলের সঙ্গে মিশে যায়। নিথর দেহগুলো পড়ে থাকে বিলের পাড়ে। নিলু রানী শীলের ছেলে সুবোধ শীল বলেন, মায়ের সঙ্গে সাঁতরে বিল পার হয়ে ভাগ্যক্রমে তারা বেঁচে গেছেন। মামা বানু শীল মরে প্রমাণ করেছেন তিনি পরিবারকে কত ভালোবাসতেন। জীবনের মায়া ত্যাগ করে পরিবারটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু পারেননি। তাঁর মহানুভবতায় অন্তত ৭০ জন নারী-পুরুষ ও শিশু সেদিন নৌকায় বিল পার হয়েছেন। ইচ্ছে করলে পরিবারকে তিনি পার করতে পারতেন প্রথমেই; কিন্তু সেটা তিনি করেননি।

সুবোধ শীল বলেন, ‘বিলের ওপার থেকে দেখছিলাম বাড়িয়ার বাড়িঘর দাউদাউ করে জ্বলছে। বিকেল ৪টার দিকে একবার দমকা হওয়া বয়ে যায়। এরপর অঝোরে বৃষ্টি। লাশগুলো পাড়েই পড়ে আছে। বৃষ্টিতে ভিজছে। দেহের সঙ্গে জমাট বেঁধে থাকা রক্ত বৃষ্টির পানির সঙ্গে বিলে মিশে যায়। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।’

সুবোধ শীলের ভাই সুবল চন্দ্র শীল বলেন, লাশের কাছে আসার জন্য বারবার তারা চেষ্টা করেন; কিন্তু আসতে পারেননি। তখনো প্রচণ্ড ভয় কাজ করে ভেতরে। এরই ফাঁকে শহিদদের সঙ্গে থাকা টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে যায় একদল অমানুষ, এলাকার রাজাকার। রাত গভীর হয়ে আসে। একপর্যায়ে তাঁরা কৌশলে নাগরী মিশন ও  সেন্ট নিকোলাস স্কুল প্রাঙ্গণে চলে যান এবং সেখানেই আশ্রয় নেন। লাশগুলো পড়ে থাকে সেখানেই। গ্রামে ফিরলে মেরে ফেলা হবে বলে অপপ্রচার চালাতে থাকে রাজাকাররা। এই হত্যাযজ্ঞ পরিচালনাশেষে ওই রাতেই পাকিস্তানি বাহিনী বাড়িয়া এলাকা ত্যাগ করে। এর তিনদিন পর নাগরী মিশন ও  সেন্ট নিকোলাস স্কুল থেকে সেই নৌকাঘাটে আসেন নিলু রানী ও তাঁর তিন সন্তান। এসে দেখেন, শেয়াল-কুকুরে খেয়ে ফেলেছে লাশগুলো। ওপরে শকুন উড়ছে। দেহের আর কিছুই বোঝা যায় না। শুধু কিছু হাড় পড়ে আছে। সবুজ ঘাসগুলো ধূসর হয়ে গেছে। মা-বাবা, ভাইসহ এই ছয়জনকে হারিয়ে নিলু রানী শীল একটা সময় পাগলের মতো হয়ে যান। চোখের জল শুকিয়ে যায়। চোখের জমিন ঝাপসা হয়ে গেছে যদিও কিন্তু সেই দিনের দুঃসহ স্মৃতি আজো তাঁকে তাড়া করে। ভেতরের ক্ষত শুকায়নি ৫০ বছরেও। 

তিন

‘মুণ্ডুহীন বালিকার কুকুরে খাওয়া বীভৎস শরীর/ ভেসে ওঠে  চোখের ভেতরে – আমি ঘুমুতে পারি না, ঘুমুতে পারি না …।’ রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ কবিতার এই লাইন দুটি যেন ধার করে নিয়েই বাবুল চন্দ্র দে বললেন, ‘আমার সহোদর দুই বোনের লাশও নদীতে পানার মতো ভেসে ছিল। কুকুরে খেয়ে ফেলে, শেয়ালে খেয়ে ফেলে।’ মুণ্ডুহীন দুই বোনের সেই বীভৎস শরীর আজো ভেসে ওঠে তাঁর চোখের সামনে। তিনি ঘুমোতে পারেন না।

বুলু রাণী দে ও ফুলু রাণী দে নামে পিঠাপিঠি দুই বোন ছিলেন। অবণী কান্ত দে-র মেয়ে তারা। গাজীপুরের বাড়িয়ার শীলপাড়া এলাকায় ছিল তাঁদের বাস। বিয়ের কথাবার্তা চূড়ান্ত। বুলু রাণী দে-র সপ্তাহখানেক পরই বিয়ে পিঁড়িতে বসার কথা। বাড়িতে প্রস্তুতিও চলছিল। আত্মীয়স্বজনকে নিমন্ত্রণ জানানো শুরু হয়েছে আরো আগে; কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! দেখতে পরীর মতো চঞ্চলা পিঠাপিঠি এই দুই বোন পাকিস্তানি পশুদের ঘৃণ্য লালসার শিকার হন। সবুজ শ্যামল সুনিবিড় বাড়িয়ার শীলপাড়া থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টায় ব্যর্থ হন বুলু রাণী ও ফুলু রাণী। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে প্রাণ হারানো অবন্তী কান্ত দে-র কলিজার টুকরো  পালিয়ে গ্রাম ছাড়ার সময় পাকিস্তানি বাহিনী তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করে। ব্রাশফায়ারে হত্যার আগে জানোয়ারের দল সম্ভ্রম বিনষ্টও করে বুলু আর ফুলুর। ঘটনার চারদিন পর বেলাই বিলের জলে পাওয়া যায় তাঁদের বীভৎস দেহ। শরীরের মাংস খেয়ে ফেলেছে শেয়াল-কুকুরে, চেনা যায় না। ভাই বাবুল দে দুর্বিষহ সেই বেদনা বয়ে চলেছেন এখনো।  

বাড়িয়া গ্রামটি কয়েকটি মহল্লায় বিভক্ত। অবনী কান্ত দে বাড়িয়া গ্রামের শীলপাড়ায় বাস করতেন। তাঁর আদি ভিটা নরসিংদীর শিবপুরে। তিনি পেশায় ছিলেন স্বর্ণকার। স্ত্রী বীণা রাণী দে আর পাঁচ সন্তানকে নিয়ে বেশ সুখেই ছিলেন। অভাব ছিল সংসারে; কিন্তু অশান্তি ছিল না। পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিন মেয়ে আর দুই ছেলে। মেয়ে বুলু রাণী দে ও ফুলু রাণী দে স্থানীয় বাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম ও নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। অন্য তিনজন হলেন – দুলু রাণী দে, বাবুল চন্দ্র দে ও কাবুল চন্দ্র দে। হঠাৎ করেই ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায় এই পরিবারটির ওপর দিয়ে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের ঘটনা। এর দুদিন আগে ২৩ মার্চ, মঙ্গলবার, সকালে অবনী কান্ত দে ব্যবসায়িক কাজে ঢাকায় যান, তাঁতিবাজার এলাকায়। যাওয়ার সময় বারবার স্ত্রী বীণা রাণীকে বলে যান সন্তানদের দিকে খেয়াল রাখার জন্য। দেশের অবস্থা ভালো নয়। বিশেষ করে বুলু রাণী আর ফুলু রাণীর প্রতি। দুদিন পরই তিনি ফিরে আসবেন – স্ত্রীকে বলে যান সে-কথাও; কিন্তু অবনী কান্ত দে কথা রাখেননি। তিনি ফিরে আসেননি। ফিরে আসতে পারেননি। অবনী কান্ত দে তাঁর এক আত্মীয়র বাসায় রাত কাটান। তিনি সমাজসচেতন মানুষ। দেশের সব খবরাখবর রাখেন। ঢাকার অবস্থা তখন ভয়াবহ। বাড়ি ফেরার জন্য অবনী কান্ত ছটফট করতে থাকেন। স্ত্রী-ছেলেমেয়ের জন্য দুশ্চিন্তা গ্রাস করে তাঁকে। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার জন্য বের হন তিনি। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সেনাবাহিনী ও সামরিক সরঞ্জামাদি এসে পৌঁছার পরপরই ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় কোনো ঘোষণা ছাড়াই কাউকে না জানিয়ে ইয়াহিয়া-ভুট্টো ঢাকা ত্যাগ করেন। ঢাকা ত্যাগের আগে ইয়াহিয়া খান ঢাকাসহ পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানোর আদেশ সেনাবাহিনীকে দিয়ে যান। শুরু হয় বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ। সমস্ত হিংস্রতা ও নারকীয় উন্মত্ততা নিয়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী। অবনী কান্ত দে ঢাকায় এদিনই শহিদ হন। নরপশুরা তাঁকে হত্যার পর রাস্তায় ফেলে রাখে। চরম দুশ্চিন্তায় পরিবার। পরদিন পরিবার খবর পেল, অবনীকে হত্যা করা হয়েছে; কিন্তু কোনোভাবেই তাঁর স্ত্রী-সন্তান সে-কথা বিশ্বাস করতে পারেননি। পরদিন প্রতিবেশী রেবতি মোহন ভৌমিক বাড়িতে খবর নিয়ে আসেন অবনী দে বর্বরদের সেই নারকীয়তার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন। রেবতি মোহন ভৌমিকও সে-সময় ঢাকায় ছিলেন। কৌশলে তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন। দিন যায়, রাত যায় – স্ত্রী বীণা রাণী দে স্বামীর প্রতীক্ষায় পথের দিকে চেয়ে থাকেন। ছেলেমেয়েরা বিশ্বাস করলেও স্ত্রী বীণা রাণীকে বিশ্বাসই করানো যায়নি। তাঁর বিশ্বাস ছিল – স্বামী অবনী মারা যাননি। ছেলে বাবুল চন্দ্র দে বলেন, ‘প্রতিদিনই মা পথের দিকে চেয়ে থাকতেন। বাবা ফিরে আসবেনই – এমন বিশ্বাস তিনি খুব যত্ন করে লালন করছিলেন। মা প্রায় সময় বলতেন – তোর বাবা কথা দিয়া গেছে, সে ফিরা আইবোই।’ মাঝে মাঝে গভীর রাতে হঠাৎ দরজা খুলতেন। ঘুম থেকে জেগে উঠে বলতেন, ‘ওই যে তোর বাপে আইছে! তাড়াতাড়ি দরজা খোল। দরজা খুলতে দেরি অইলে আবার রাগ কইরা চাইল্যা যাইবো।’ পরবর্তী সময় পরিবারের লোকজন ঢাকায় গিয়ে অবনী দে-র লাশ খুঁজে ফিরেছেন। কিন্তু পাননি।

বীণা দে-র দিন-রাত কাটতে থাকে ওভাবেই। সারাদেশে যুদ্ধ চলছে। এরই মধ্যে নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া বুলু রাণী দে-র বিয়ের প্রস্তাব আসে। কাশিমপুর এলাকায় এক যুবকের সঙ্গে তাঁর বিয়ের দিনক্ষণও চূড়ান্ত হয়। বাড়িতে বিয়ের আয়োজন, স্বজনদের নিমন্ত্রণের কাজও চলে। বাবাকে ছাড়া বিয়ে – এটা বুলু মানতেই পারছিলেন না। বিয়ের কথাবার্তা পাকাপোক্ত হওয়ার পর থেকেই মনমরা হয়ে বসে থাকতেন তিনি। ১৯৭১ সালের ১৪ মে, শুক্রবারের ঘটনা। মা-ভাইবোনেরা একসঙ্গে বসে সকালের নাস্তা করেন। দুপুর হওয়ার আগেই হঠাৎ করে পাকিস্তানি মিলিটারি ঢুকে পড়ে বাড়িয়া গ্রামে। লোকজন তখন পালাতে শুরু করে। জীবন বাঁচাতে বেলাই বিলের ওপারে যাচ্ছেন কেউ, কেউ আবার পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটছেন নাগরী মিশন বা রাঙামাটিয়া মিশনের দিকে। অভিভাবকহীন পরিবারটিও কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে ওই আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বীণা রাণী দে-র ছেলে বাবুল চন্দ্র দে বলেন, ‘মা, ভাই আর বোন দুলু রাণীকে নিয়ে আমি বাড়ি থেকে বের হলাম। নাগরী মিশনে গিয়ে আমরা আশ্রয় নেব। আমরা বের হওয়ার আগেই নাগরী মিশনে যাওয়ার জন্য বের হয় বুলু আর ফুলু। মা তখন অসুস্থ। বাবার চিন্তায় মায়ের শরীর শুকিয়ে গেছে। চোখে জলও নেই। একপর্যায়ে আমরা মিশনে গিয়ে পৌঁছিই। আমরা নিশ্চিত ছিলাম, বুলু আর ফুলু মিশনেই আছে। লোকে লোকারণ্য মিশন প্রাঙ্গণ। পুরো মিশন এলাকা খুঁজে কোথাও তাদের পাওয়া গেল না; কিন্তু সে-খবর মাকে দেওয়া হয়নি। মা বারবার জানতে চেয়েছেন বুলু আর ফুলুর কথা। মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তাঁকে রাখা হয়। দুই বোনকে খুঁজতে খুঁজতে রাত কেটে যায়।’ পরদিন খবর পেলেন – বুলু আর ফুলু মিশনে আসার সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছেন। তাঁদের সম্ভ্রমহানি করার পর গুলি করে হত্যা করেছে নরপশুরা। বাবুল চন্দ্র এ-খবর পাওয়ার পর পুরো এলাকায় তাঁদের লাশ খুঁজে ফেরেন; কিন্তু কোথাও পাচ্ছিলেন না আদরের দু-বোনের লাশ। বেলাই বিলের পাড়ে তখন লাশের সারি। স্বজনরা খুঁজছেন প্রিয়জনের মরদেহ। স্থানীয় রাজাকাররা অপপ্রচার চালাতে থাকে, হিন্দুরা বাড়িতে ফিরলেই তাদের মেরে ফেলা হবে। ফলে বাবুলদের মধ্যে ভয় আরো প্রকট আকার ধারণ করে। ওদিকে তাঁদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। জামাকাপড়, আসবাবপত্র, ধান-চাল যা ছিল সব পুড়ে ছাই। স্বর্ণালংকার আর নগদ টাকা যা ছিল বাড়িতে সব লুট হয়ে যায়। এ অবস্থায়ই বাড়ি ফিরে যান তাঁরা।  ঘটনার চারদিন পর কে একজন এসে খবর দেয় – বেলাই বিলের পাড়ে অর্ধেক জলে অর্ধেক শুকনোয় দুই তরুণীর লাশ পড়ে আছে। খাবলে খাচ্ছে শেয়াল-কুকুর। ভাগ বসিয়েছে শকুন আর কাকের দলও। খবর পেয়ে বাবুল ও তাঁর ভাই কাবুল সেখানে গিয়ে দেখেন তাঁদের হতভাগ্য  দু-বোনের  লাশ পড়ে আছে। চেনার উপায় নেই; কিন্তু লাশ নিয়ে দাহ বা সমাধিস্থ করার কোনো  জো ছিল না। শরীরে মাংস নেই। কী বীভৎস! কুকুরে খাওয়া, শেয়ালে খাওয়া এই লাশ নিয়ে তাঁরা কোথায় রাখবেন? কী করবেন? কীভাবে নেবেন? কোনো দিশা খুঁজে পেলেন না।

শেষ পর্যন্ত বেলাইয়ের পাড়েই পড়ে থাকে বুলু আর ফুলুর হাড়-মাংস। বাবুলদের বাড়িটা তখন ধ্বংসস্তূপ! কিছুই নেই। সব অঙ্গার। ঘুরে দাঁড়ানোরও কোনো পথ খুঁজে পেলেন না তাঁরা। অবশেষে এক কাপড়ে মা, ভাই আর বেঁচে থাকা একমাত্র বোন দুলু রাণীকে নিয়ে ভারতে পালিয়ে যান বাবুল চন্দ্র। সেই করুণ সময়ের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে কাঁধে থাকা গামছা দিয়ে বারবার চোখ মুছছিলেন অসহায় মানুষটি। 

চার

‘তুমি আসবে ব’লে বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভুর বাস্তুভিটার ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করল একটা কুকুর/ তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা/ অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতা মাতার লাশের ওপর।’ কবি শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ কবিতার এই পঙ্ক্তি মনে পড়লো সত্যরঞ্জন দাস ওরফে শীতু মালী হত্যার আদ্যোপান্ত জানতে গিয়ে। দোচালা টিনের ঘর। মাটির দেয়াল। ঘরের ভেতর তেমন কিছুই ছিল না। কিছু চিঠিপত্র, কাঁথা-বালিশ আর হাঁড়ি-পাতিল ছিল ঘরটির ভেতর। দোচালা এ-ঘরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনারা। সত্যরঞ্জন দাস একটি কুকুর পালতেন। প্রভুভক্ত কুকুরটি পোড়া ঘরের ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করছিল। কুকুরটি কি জানতো তার প্রভু সত্যরঞ্জন দাসকে পাকিস্তানিরা গুলি করে হত্যা করেছে? সে কি জানতো প্রভুর কোলে থাকা শিশু পার্বতী রানী দাস পানির নিচে তলিয়ে গেছে? বাড়িয়ার শীলপাড়া এলাকায় জীর্ণ একটি কুটিরে বসবাস করতেন সত্যরঞ্জন মালী। বাড়িয়া ডাকঘরের রানার ছিলেন তিনি। সামান্য কৃষিকাজ আর ডাকঘর থেকে যা আসত তা দিয়েই চলত ছোট্ট সাজানো-গোছানো সংসার। পাঁচ বছরের ছেলে গৌরাঙ্গ চন্দ্র দাস শয্যাগত। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পুরো শরীর অবশ হয়ে গেছে। বাড়ির উঠানে পাটের বস্তা দিয়ে তৈরি করা টয়লেট পর্যন্তÍও যেতে পারেন না গৌরাঙ্গ। নিরুপায় হয়ে ঘরের সামনেই সারতে হচ্ছে প্রাকৃতিক কাজ। দিনটি ছিল শুক্রবার। ছুটির দিন। ১৪ মে, ১৯৭১। ডাকঘরে যেতে হয়নি সত্যরঞ্জন মালীকে। টুকটাক কাজ ছিল, সেগুলো সেরে ছেলের শয্যাপাশে বসে আছেন। স্ত্রী আরতি রানী দাস প্রতিবেশীর বাড়িতে গেছেন আতব চাল আনার জন্য। নরম করে ছেলেকে ভাত রান্না করে দেবেন। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত গৌরাঙ্গের পেটে তখনো কোনো ওষুধ কিংবা স্যালাইন পড়েনি। বিকেলে বাড়িয়া বাজার থেকে (তখন নাম ছিল সোনাহাট বাজার) ছেলের জন্য ওষুধ আনার কথা। আতব চাল নিয়ে কেবল বাড়ি ফিরেছেন আরতি রানী। এমন সময় সত্য মালীর বড় ভাই শনিরাম দাস চিৎকার করতে করতে বাড়িতে ঢোকেন। আরতি রানী বুঝতে পারছিলেন না, শনিরাম দাস কী বলছেন। সত্যরঞ্জনও ছিলেন ছেলের দিকে মনোযোগী। একটু পরেই শনিরাম তার পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। বের হতে হতে বলছিলেন, ‘তোরা তাড়াতাড়ি বাইর অইয়া আয়। মিলিটারিরা আইয়া পড়ছে। গুলি করতাছে। ঘরবাড়ি জ্বালাইয়া দিতাছে।’ আরতি রানী দাস আতব চালের পাতিল বারান্দায় রেখে ছয় মাসের শিশু পার্বতীকে কোলে নিয়ে বেলাইয়ের দিকে যেতে থাকলেন। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত গৌরাঙ্গও তখন বারান্দাঘেঁষে পায়খানা করছিলেন। প্রাকৃতিক কাজ অসমাপ্ত রেখেই মায়ের সঙ্গে বের হলেন তিনি। মায়ের হাত ধরে যেতে থাকলেন বিলের দিকে। কিন্তু সত্যরঞ্জন দাস বের হলেন না। বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য রয়ে গেলেন। বিশেষ করে ঘরের ভেতর যে ডাকঘরের কিছু চিঠিপত্র ছিল সেগুলোর জন্য বের হলেন না। ঘর থেকে বের হয়ে সত্যরঞ্জন দাস স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের যাওয়ার দৃশ্য দেখছিলেন। বেলাই বিলটা বাড়ির একদম পাশেই।  পূর্বদিকে। তাঁরা বিলের পাড়ে পৌঁছে গেছেন। এমন সময় উত্তর দিক থেকে পরপর কয়েকটি গুলির শব্দ শুনতে পান। আশেপাশের কোনো বাড়িতেই কোনো বাড়িতেই মানুষ নেই। সকলেই আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে গেছেন, কেউ কেউ যাওয়ার পথে। সত্য দাস আর স্থির থাকতে পারলেন না। দোচালা ঘরটি ওভাবেই ফেলে রেখে দৌড়ে বিলের দিকে যেতে থাকলেন। আরতির নাম ধরে জোরে জোরে ডাকছেন;  কিন্তু স্বামীর ডাক আরতি শুনতেই পেলেন না। দৌড়ের গতি আরো বাড়িয়ে দিলেন। ততক্ষণে আরতি রানী দাস ছেলে গৌরাঙ্গ ও মেয়ে পার্বতীকে নিয়ে জলে নেমে পড়েছেন। বাম হাত দিয়ে পার্বতীকে কোলে ধরে রেখেছেন আর পিঠে উঠিয়েছেন পুত্র গৌরাঙ্গকে। জলে নেমে একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখেন স্বামী সত্যরঞ্জন দাস দৌড়ে আসছেন। আরতি রানী দাস বলেন, ‘গৌরাঙ্গের বাপরে আইতে দেইখ্যা বুকে আমার সাহস বাইড়া গেল। এ সময় বেলাইয়ের পাড়ের বিভিন্ন জায়গায় লাশ পড়ে থাকতে দেহি। লাশগুলা দেইখ্যা ডরাইয়া যাই। একটু পরপর গুলির শব্দ ভাইস্যা আইতেছিল।’ অল্প সময়ের ব্যবধানে সত্যরঞ্জন দাস স্ত্রী আর পুত্র-কন্যার কাছে এসে পৌঁছেন। এসময় একটা ডিঙি নৌকা খুব দ্রুত তাদের সামনে দিয়ে চলে যায়। মাঝিকে বারবার বলার পরও তাদের সে নৌকায় তোলেনি। 

এবার গৌরাঙ্গকে কোলে নিলেন আরতি দাস আর কন্যাকে নিলেন সত্যরঞ্জন। শুরু করলেন সাঁতার। পাশাপাশি সাঁতার কাটতে কাটতে বেলাই বিলের  কিছুদূর চলে গেলেন তাঁরা। জয়রামবেড় গ্রামে যাবেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর বিল পার হয়ে ওই গ্রামে যাওয়া হলো না। একটি নৌকায় চড়ে মিলিটারিরা গুলি করতে করতে সামনের দিকে আসতে থাকে। সত্যরঞ্জন দাসকে লক্ষ করে একটি গুলি ছোড়ে পাকিস্তানি নরঘাতকরা। সত্যরঞ্জনের বাম কোলে ছিল পার্বতী। গুলিটা তার ডান পাশের কানের কাছে এসে লাগে। আরতি রানী বলেন, ‘গুলি সামনের দিক দিয়া ঢুইক্যা পেছন দিয়া বাইর অইয়া যায়। লগে লগে মায়াডারে লইয়া সত্যরঞ্জন ডুইব্যা যায় বেলাইয়ের জলে। গৌরাঙ্গ তখন আমার কোলেই। ভাগ্য ভালো দেইখ্যা মায়াডার গায়ে গুলি লাগে নাই।’ চোখের সামনে কন্যা আর গুলিবিদ্ধ স্বামীকে ডুবে যেতে দেখলেন। একপর্যায়ে অল্প পানিতে ছেলেকে দাঁড় করিয়ে পানিতে ডুব দিলেন আরতি দাস। পেয়ে গেলেন স্বামীর গুলিবিদ্ধ দেহ। পানি থেকে টেনে সত্যরঞ্জনকে ডাঙায় নিয়ে এলেন। শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। পরনের শাড়ি খুলে ক্ষত জায়গায় বেঁধে শুধু ছায়া-ব্লাউজ পরা অবস্থায় আবার নেমে পড়লেন জলে। এবার খুঁজতে থাকলেন কন্যাকে। পেয়েও গেলেন। সময়ের ব্যবধান খুব বেশি নয়।  

গৌরাঙ্গ চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমি তো তখন খুব ছোট। তবু ঝাপসা মনে আছে সেই স্মৃতি। তবে মায়ের কাছে সেই ইতিহাস বহুবার শুনেছি। ডাঙায় তুলে আনলেন পার্বতীকে। মা ভেবেছিলেন আমার বোনটি মারা গেছেন। কিন্তু ভাগ্যগুণে পার্বতী বেঁচে যান।  বাবার দেহ থেকে রক্ত ঝরছে। সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে সেই রক্ত আবার গড়িয়ে মিশে যাচ্ছে বেলাইয়ের জলে।’ তখনো সত্যরঞ্জন দাস বেঁচে আছেন। বিলের পাড়ঘেঁষে এ-সময় হরিপদ শীল নৌকা নিয়ে ভাটির দিকে যাচ্ছিলেন। আরতি কাঁদতে কাঁদতে হরিপদকে ডাকলেন। নৌকা নিয়ে কাছে এলেন হরিপদ। নৌকায় তুললেন রক্তাক্ত সত্য দাসকে। বাবার পাশেই শুইয়ে দিলেন পার্বতীকে। নৌকা কিছুদূর যাওয়ার পর পার্বতী চিৎকার দিয়ে উঠলেন। কিন্তু সত্য দাস আর চোখের পাতা খুললেন না। তাদের নিয়ে যাওয়া হলো রাঙামাটিয়া মিশনে। মিশনটির মূল নাম স্যাকরেড হার্ট চার্চ। বাড়িয়া গ্রামে পাকিস্তানি হানাদাররা নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর হাজার হাজার অসহায় মানুষ বিল পার হয়ে রাঙামাটিয়া মিশনে আশ্রয় নেন। ২৬ নভেম্বর রাঙামাটিয়া গ্রাামেও হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানিরা। আগুন দিয়ে বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এই রাঙামাটিয়া মিশনে চিকিৎসা দেওয়া হয় সত্য দাসকে। আপ্রাণ চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি তাঁকে। পরদিন সকালে সত্যরঞ্জন দাস মারা যান। কন্যা পার্বতী সুস্থ হয়ে ওঠেন। পরে সেখানেই সত্য দাসের মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়। এরপর তাঁরা চলে যান ইছাপোড়া গ্রামে মামাবাড়িতে। মামা নারায়ণচন্দ্র দাসের আশ্রয়ে থেকে বহুদিন পর বাড়িতে ফিরে আসেন। গৌরাঙ্গ চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমাদের ঘরটা পাকিস্তানিরা জ্বালিয়ে দেয়। সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বাবার পালিত কুকুরটা বহুদিন ওই ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে ঘেউ ঘেউ করেছে। আর্তনাদ করেছে।’ 

পাঁচ

গুলিবিদ্ধ সাহেরার ডান স্তন তখনো নয় মাসের রক্তাক্ত শিশু বাকের ভূঁইয়ার মুখে। পাকিস্তানি নরপশুদের গুলিতে বুক ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া সাহেরা খাতুন দুহাতে ছেলে বাকেরকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। তার নিথর দেহের অর্ধেক পড়ে আছে জলে – অর্ধেক ডাঙায়। মায়ের স্তন মুখে বাকেরের শরীর থেকে তখনো ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরছে। সাহেরা ও শিশুপুত্রের শরীরের রক্ত মিশে যাচ্ছে বিলের জলে। 

দুই গজ দূরে সাত বছরের ওয়াদুদ ভূঁইয়া ও দশ বছরের ওয়ারেজ ভূঁইয়ার গুলিবিদ্ধ দেহ আস্তে আস্তে বেলাইয়ের তলদেশে গিয়ে স্থির হয়। অল্প দূরেই কচুরিপানায় শরীর ঢেকে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া সাহেরার মেয়ে হামিদা খাতুন। তাঁর কোলে চার বছরের বোন মমতাজ। বর্বরদের গুলিতে মা ও তিন ভাই ছটফট করতে করতে হামিদার চোখের সামনেই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন। চার বছরের বোন মমতাজকে কোলে নিয়ে কচুরিপানায় শরীর ঢেকে থাকা হামিদাকে পাকিস্তানি সেনারা প্রথমে দেখেনি। পরে এক নরঘাতকের চোখ পড়ে হামিদার চোখে। দেরি নয়, সঙ্গে সঙ্গে গুলি। গুলিটি হামিদার শরীরে না লেগে  কোলে থাকা বোন মমতাজের বুকে লেগে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। আহা রে! দেখতে পুতুলের মতো মমতাজের দেহ থেকে মুহূর্তের মধ্যেই বেরিয়ে যায় প্রাণটি। আহত হন হামিদা। গাজীপুর শহর থেকে ১০ কিলোমিটার পূর্বদিকে বাড়িয়া গ্রামের বেলাই বিলপাড়ের ঘটনা এটিও। দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৪ মে, শুক্রবার, দুপুর বেলা। চোখের সামনে মা, তিন ভাই ও বোনের করুণ মৃত্যুর সেই দৃশ্য আজো স্থির হয়ে আছে হামিদার চোখে। 

‘ক্যাঙ্গারু তার শাবক নিয়ে যেমন করে বিপদ পেরোয়’ সাহেরা খাতুনও ঠিক তেমনি করে তার ছয় শিশুসন্তানকে নিয়ে প্রাণে বাঁচার জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। বাড়ির উঠানে তৈরি করা চুলায় রান্না বসিয়েছিলেন তিনি। হঠাৎ করেই বাড়িয়া গ্রামে পাকিস্তানি সেনারা ঢুকে পড়ে। গুলির শব্দ তাঁর কানে ভেসে আসতে থাকে। চুলা থেকে ভাত নামিয়ে কেবল বেলাই বিল থেকে ধরে আনা চিংড়ি মাছ দিয়ে ডাঁটা রান্না বসিয়েছেন। এমন সময় ঘরের ভেতর শুইয়ে রাখা নয় মাসের শিশু বাকের ভূঁইয়া ক্ষুধার যন্ত্রণায় কেঁদে ওঠে। বড় মেয়ে হামিদাকে চুলার সামনে বসিয়ে দ্রুত শিশুপুত্রকে দুধ খাওয়ানোর জন্য ঘরে যান সাহেরা খাতুন। বাকেরের ক্ষুধা নিবারণ হওয়ার আগেই বাড়ির পাশে হইচই শুনতে পান তিনি। অল্পক্ষণ পর বাড়ির খুব কাছে গুলির একটি শব্দ শুনতে পান তিনি। তাঁর স্বামী মুহাম্মদ আলী ভূঁইয়া মসজিদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ছেলেমেয়েরা গুলির শব্দ শুনে চিৎকার করে ওঠেন। ভয়ে কাঁপতে থাকেন। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া হামিদা খাতুন বলেন, ‘বাবা তখন মা ও আমাগো শান্ত করোনের লাইগা চেষ্টা করেন। বলেন, তোমরা বাড়িতে থাইকো – আমি দেইখ্যা আইতাছি কী হইছে। এই কথা কইয়া বাবা বাইর অইয়া  যান। সময়  যতই যাইতাছে – ডর ততোই পাল্লা দিয়া বাড়তাছে। চারদিক দিয়া খালি গুলির শব্দ। মানুষজন বেলাই বিলের দিকে দল ধইরা যাইতাছে।’ স্বামীর প্রতীক্ষা থেকে ধৈর্যহারা হয়ে যান স্ত্রী সাহেরা খাতুন। শরীরে কাঁপুনি। মাটির ঘরের দরজা-জানালা খোলা। এ অবস্থায় বাড়ি ফেলে রেখে বেলাই বিল পার হয়ে বর্বরদের হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছিলেন তিনি। বাঁচাতে চেয়েছিলেন গর্ভজাত সন্তানদের; কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। একপর্যায়ে ছয় ছেলেমেয়েকে নিয়ে বেলাই বিলের দিকে যেতে থাকেন তিনি। সাহেরার কোলে নয় মাসের পুত্র বাকের ভূঁইয়া আর হামিদার কোলে ৪ বছরের বোন মমতাজ। পুত্র মতিউর রহমান, ওয়ারেজ ও ওয়াদুদ হাঁটছেন মায়ের পেছন পেছন। বেলাই বিলের পাড়ে অসংখ্য মানুষ। ছোট ছোট নৌকায় কেউ কেউ পরিবার নিয়ে পার হচ্ছেন। কেউ সাঁতরে। নিরাশায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল সাহেরার। আদরের ছেলেমেয়েরা তার সঙ্গেই। জীবনমৃত্যুর মাঝখানে হেঁটে চলা সাহেরা বারবার পেছন ফিরে নিজের হাতে গড়া বাড়িটি দেখছিলেন। বেলাই বিলের পাড়ে গিয়ে দেখতে পান একদল মানুষ হেঁটে তাদের দিকেই আসছে। হাতে বন্দুক। গায়ের রং ফর্সা। প্রত্যেকের উচ্চতা ছয় ফুট বা তারও বেশি। 

বেলাই বিল থেকে পানি নিয়ে নানা রকম সবজি চাষ করার জন্য স্থানীয়রা উঁচু করে একটি ড্রেন নির্মাণ করেছিলেন। সেই ড্রেন দিয়ে বেলাইয়ের পানি সেচে ক্ষেতে নেওয়া হয়। দিশেহারা সাহেরা উঁচু সেই ড্রেনের একপাশে ছেলেমেয়েকে নিয়ে লুকিয়ে পড়েন। শিশু বাকেরকে আঁচল দিয়ে ঢেকে রাখেন। এ-সময় বাকের কান্না শুরু করে। স্তন মুখে দিয়ে বাকেরের কান্না থামান সাহেরা খাতুন। পাশেই ছেলে ওয়ারেস ও ওয়াদুদ। বড় ছেলে মতিউর রহমান হাঁটতে হাঁটতে একটু সামনের দিকে চলে যান। আর কন্যা হামিদা বোন মমতাজকে কোলে নিয়ে পানিতে নেমে পড়েন। একপর্যায়ে কচুরিপানা মাথায় দিয়ে শুধু নাক আর মুখ বের করে লুকিয়ে পড়েন তিনি। নরম তুলতুলে দেহের শিশু মমতাজ তখনো হামিদার কোলে। হামিদা খাতুন বলেন, ‘মুরগির বাচ্চার মতো আমরা তখন কাঁপতে থাকি। পাকিস্তানি মিলিটারিরা আমাগোর এক্কেবারে কাছে আইয়া পড়ে। তাগোর কোনো কথাই মা বোঝতে পারতেছিল না। মা শুধু তাগোরে কইলো আমরা মুসলমান। আমার ভাইয়েগো ন্যাংটা কইরা মা মিলিটারি গো খৎনা দেখায় মুসলমান হিসেবে পরমান করার লাইগা।’ এতেও নরপশুদের হৃদয় গলেনি। প্রথমে সাহেরা খাতুনকে গুলি করে। পরপর তিনটা গুলি করার পর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সাহেরা খাতুন। স্তনের বোঁটায় তখনো বাকেরের মুখ। এবার আরো একটি গুলি করে বাকেরের শরীরে। সাহেরাকে গুলি করার আগে তিনি খুব অনুরোধ করেছিলেন তার মাসুম বাচ্চাগুলোকে না মারার জন্য। হামিদার ভাষায়, ‘মা কইতেছিল – তোমরা আমারে মাইরা ফালাও, তাতে আপত্তি নাই। আমার এই অবুঝ শিশুগুলারে মাইরো না। অনেক অনুনয়-বিনয় করছিল।’ কিন্তু রক্তপিপাসুরা কি সাহেরা খাতুনের কথা বুঝতে পেরেছিল? বুঝলে তো এই অবুঝ শিশুগুলোকে হত্যা করার কথা নয়। হামিদা বলেন, ‘মা আর ভাই বাকেরের রক্তাক্ত দেহের অর্ধেক পানিতে অর্ধেক শুকনায়। এবার দুই ভাই ওয়ারেস ও ওয়াদুদকে গুলি করে ঘাতকরা। আমার ভাই দুইডা বাঁচার জন্য খুব চেষ্টা করছিল। কিন্তু ওরা শেষ পর্যন্ত বাঁচায় নাই। দুই ভাইয়েরই বুকে লাগে গুলি। পিঠ দিয়া গুলি বাইর অইয়া যায়। রক্ত ঝরতে ঝরতে নিস্তেজ দেহ দুটি বেলাইয়ের জলে তলিয়ে যায়।’  

মা ও তিন ভাইয়ের চার-পাঁচ গজ দূরে কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে থাকা হামিদা ও তার বোনকে প্রথমে দেখেনি ঘাতকরা। হামিদার বুকটা তখন খাঁ খাঁ করছিল। চোখের সামনে তাজা চারটি প্রাণ কেড়ে নেওয়ার দৃশ্য এখনো তার চোখে ভাসে। হামিদা তখন বাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েন। নির্ধারিত বয়সের আরো দু-এক বছর পরে স্কুলে ভর্তি হন। সে হিসাবে হামিদার বয়স তখন বারো-তেরো বছর। দুপুর গড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। এই হত্যা মিশন শেষ করে পাকিস্তানিরা চলে যেতে থাকে। এ-সময় একজন  মিলিটারি পেছন ফিরে তাকায়। হঠাৎ করেই কচুরিপানার নিচে লুকিয়ে থাকা হামিদার চোখে চোখ পড়ে সেই ঘাতকের। এবার তাকে  লক্ষ করে গুলি ছোড়ে; কিন্তু গুলিটি তার শরীরে লাগেনি। কোলে থাকা মমতাজের বুকের বাম দিকে লাগে। স্রোতের মতো রক্ত বের হতে থাকে নিষ্পাপ শিশুর শরীর থেকে। হামিদা সেই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে তাঁকে সুস্থ করে তোলা হয়। আবার শুরু করেন সেই নির্মম ঘটনার বর্ণনা। তিনি বলেন, ‘ভাই এতকাল পর খেজুর কাঁটা দিয়া দুঃখগুইলা-কষ্টগুইল্যা তাজা করতে আইছো ক্যান? সেই কথা মনে অইলে আর থাকতাম পারি না। বুকের ভিতরে কিমন কিমন করে ভাই।’

হামিদার চোখে আবার জল। নীরব থাকলেন কিছু সময়। এবার বলে উঠলেন, ‘মমতাজ শুধু একটি শব্দই উচ্চারণ করছিল ‘আপ্পা’।’ তারপর আর কোনো সাড়াশব্দ পাননি হামিদা। মমতাজ তখনো ভালোভাবে কথা বলতে শেখেনি। হামিদাকে আপ্পা ডাকতেন। নিষ্পাপ এই শিশুর রক্তে সেখানকার পানি লাল হয়ে যায়। পাশে তো মা ও আরো তিন ভাইবোনের লাশ পড়েই আছে। তাদের দেহ থেকে তাজা রক্ত বেরিয়ে গেছে। সব রক্তের একই মোহনা। একই জায়গায় পড়েছে। মমতাজকে গুলি করে পাকিস্তানিরা দ্রুত চলে যায়। বেঁচে যাওয়া হামিদার সামনে মা, তিন ভাই আর  কোলে বোনের লাশ! আহা সময়! হামিদার চোখে শুধুই অন্ধকার তখন।  

সন্ধ্যা নেমে এলো। এরই মাঝে একবার বৃষ্টিও আসে। সঙ্গে দমকা হাওয়া। সেদিন ছিল বৈশাখ মাসের ২৯ তারিখ। হামিদা তাঁর বোন মমতাজের মরদেহ মায়ের বুকের কাছে রাখলেন। কচুরিপানা তুলে এনে মৃত বোনের মাথার নিচে দিলেন। পাশেই স্তন মুখে বাকেরের মরদেহ। দুই ভাই পানির নিচে। এখন কী করবেন হামিদা? কোথায় যাবেন? কার কাছে যাবেন? কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। শরীরে তখন আর ভয় নেই। সবহারা হামিদার বুকে অসীম সাহস। কাঁদতেও যেন ভুলে গেছেন। হেঁটে একটু দূরে চলে যাওয়ার কারণে পাকিস্তানিদের এই হত্যাযজ্ঞ থেকে প্রাণে বেঁচে যান মতিউর রহমান ভূঁইয়া। হঠাৎ করেই পশ্চিম দিক থেকে ‘মা, ও মা গো’ বলে  কে যেন ডাকছেন শুনতে পেলেন হামিদা; কিন্তু বুঝতে পারলেন না কার ডাক এটা। একটু এগিয়ে গেলেন। ততক্ষণে অন্ধকার নেমে এসেছে। নিজের শরীরই দেখা যায় না। হামিদা জোরে বললেন, ‘ক্যাডা?’ ততক্ষণে কাছাকাছি চলে এসেছেন মতিউর রহমান। বললেন, ‘ আমি মতি।’ দুই ভাইবোন একসঙ্গে। মতিউর জানতে চাইলেন, ‘মা কোথায়? ওয়ারেস, ওয়াদুদ, বাকের? মমতাজকে কার কাছে দিছো?’ হামিদা কথা বলতে পারছিলেন না। জবাব দেওয়ার সাহস নেই। কী বলবেন ভাইকে? চোখে জলও নেই। কান্নার ভাষা দিয়ে বোঝাতেও অক্ষম হামিদা। দুই ভাইবোন তাঁদের আদি ভিটা বড় কয়ের গ্রামে যাওয়ার জন্য হাঁটতে থাকলেন। লাশগুলো ওখানেই পড়ে রইলো। একপর্যায়ে মতিউর রহমান বললেন, ‘ওগোর কি মাইরা ফালানো অইছে?’ মাথা নেড়ে নির্বাক হামিদা জবাব দিলেন। ‘কই রাখছে তাগোর লাশ! কই আমার মা! ভাইয়েরা! মমতাজ!’ এভাবে হামিদাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে লাগলেন মতিউর। একপর্যায়ে হামিদা হাতের ইশারায় দেখালেন সেই জায়গাটি। বললেন, ‘মাসহ ওগো সবাইরে মাইরা ফালাইছে।’ তখন আর শরীর চলছিল না হামিদার। মতিউর হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। কিন্তু সাহস পেলেন না সেই জায়গায় যাওয়ার। ভয়। কোন দিক দিয়ে যেন গুলি করে পাকিস্তানিরা। বিল সাঁতরে দুই ভাইবোন অনেক কষ্ট করে দাদার ভিটায় গিয়ে উঠলেন।

ওদিকে বাবা মুহাম্মদ আলী ভূঁইয়ার   কোনো খবর নেই। খবর রাখার কোনো সুযোগও ছিল না।  তিনি কি বেঁচে আছেন নাকি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে এভাবেই শহিদ হয়েছেন? কোনো খবরই নেই তাঁদের কাছে।  হামিদা ও মতি দাদার ভিটায় যাওয়ার পর স্বজনদের কাছে ঘটনা খুলে বলেন। তারপর কী যে এক দৃশ্যের অবতারণা হয়! বাতাস ভারি হয়ে ওঠে কান্নায়। এ-দৃশ্যের কথা বর্ণনা করতে পারলেন না হামিদা। জুমার নামাজ আদায় করার জন্য মসজিদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মুহাম্মদ আলী ভূঁইয়া – সে-কথা আগেই বলেছি। পাকিস্তানি বাহিনীর গতিবিধি দেখার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে  তিনি দেখেন তারা খুব কাছে চলে এসেছে। এ-সময় পাকিস্তানিদের আনাগোনা টের পেয়ে বাড়ির পাশের একটি গভীর গর্তে লুকিয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু স্ত্রী-সন্তানদের চিন্তায় গর্তের ভেতর বারবার ঘেমে উঠছিলেন মুহাম্মদ আলী। অস্থির হয়ে পড়ছিলেন। বাড়িয়া গ্রামে তাঁর নতুন বসতি। আদি ভিটা পার্শ্ববর্তী বড় কয়ের গ্রামে। পাটের ব্যবসা ছিল তাঁর। ১৯৫৬ সালে স্থানীয় হরি মোহন মন্ডল গংয়ের কাছ থেকে বাড়িয়ার শীলপাড়ায় কিছু জমি কিনে বসতি স্থাপন করেন মুহাম্মদ আলী। মাটির দেয়াল আর টিনের ছাউনির ঘর। তিনদিকেই হিন্দুদের বসতি। দক্ষিণ দিকে বেলাই বিল আর মাঝখানে তাঁর বাড়ি। বড় একটি সংসার। মমতাজকে সবচেয়ে বেশি আদর করতেন মুহাম্মদ আলী। মমতাজের মধ্যে মায়ের প্রকৃতি খুঁজে পেতেন তিনি।

দাদার ভিটায় কান্নাকাটি করতে করতে রাত শেষ হয়ে যায় তাঁদের। পরদিন, অর্থাৎ শনিবারের ঘটনা। হামিদা আর মতিউর রহমান স্বজনদের নিয়ে এলেন বেলাই বিলের সেই জায়গায়। যেখানে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় পড়েছিল সাহেরা খাতুন ও তাঁর চার সন্তানের লাশ। লাশগুলো অনেকটা ফ্যাকাসে হয়ে  গিয়েছিল। শকুন আর কাক উড়ছিল আকাশে। তবে তখনো লাশের গন্ধ শেয়াল আর কুকুরের নাকে যায়নি। মায়ের বুকের ওপরেই ছিল বাকেরের লাশ। মুখখানি  মায়ের স্তনের বোঁটায়। দুহাত আঁকড়ানো। মায়ের ডান পাশে যেভাবে মমতাজকে শুইয়ে  রেখে এসেছিলেন হামিদা সেখানেই ছিল। বিলের জলে ভাসছিল ওয়াদুদের মরদেহ। কিন্তু ওয়ারেসের লাশ খুঁজে পাওয়া গেল না। স্বজনরা বড় কয়ের গ্রামে নিয়ে গেলেন তিনজনের মরদেহ। পৃথক কবর খনন করে জানাজাশেষে দাফন করা হয় তাঁদের। পুরো এলাকায় তখনো থমথমে অবস্থা। জানাজায় লোকের সংখ্যাও তেমন হয়নি। এর তিনদিন পর শহীদ ওয়ারেসের লাশ ঘটনাস্থল থেকে খানিকটা দূরে ভেসে ওঠে। গলিত লাশ। সেটাও উদ্ধার করে নিয়ে স্বজনরা সমাহিত করেন। 

বাড়িয়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। হাহাকার চারদিকে। লাশের গন্ধ পুরো গ্রামে। সে এক বীভৎস দৃশ্য। আপনজন হারিয়ে কেউ কেউ পাগলপ্রায়। আপনজনকে কবরস্থ করে বিধ্বস্ত বাড়িয়া গ্রামেই ফিরে আসেন হামিদা ও ভাই মতিউর। বাড়ি ফিরে দেখেন তখনো তাঁদের ঘরে থাকা ধানের ডোল থেকে থেকে ধোঁয়া উড়ছে। ঘরের ভেতর ডোলভর্তি ধান ছিল। একশ মণেরও বেশি ধান। পাকিস্তানি নরপশুরা বাড়িটি পুড়িয়ে দেয়। ওই বাড়িতেই ফিরে আসেন দুই ভাইবোন। অনিশ্চয়তার ধূসর পথে আবার হাঁটতে থাকেন তাঁরা। জীবনযুদ্ধ – বেঁচে থাকার যুদ্ধ। মুহাম্মদ আলী অনেকটা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। বেঁচে থাকা দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে আবার শুরু করেন জীবনের পথ চলা। পরবর্তী সময়ে তিনি একটি বিয়েও করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী আমিরজান বিবি বলেন, অসহ্য যন্ত্রণায় তাঁর বাকি জীবন কাটে। প্রায় সময় একাকী বসে বসে ‘মমতা মমতা’ বলে ডাকাডাকি করতেন। বলতেন – ‘আমার মমতা কই? ওরে আইন্যা দে!’ কষ্টের একটা পাহাড় গড়ে ওঠে মুহাম্মদ আলীর বুকে। এই কষ্টের ভার তিনি আর বইতে পারছিলেন না। অবশেষে ১৯৮৭ সালে মারা যান। হামিদা বেঁচে আছেন এখনো।

Leave a Reply