বানিয়াশান্তার মেয়ে l স্বকৃত নোমান l পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স l ঢাকা, ২০২০ l ৩০০ টাকা

সময়কে যারা পাশ কাটিয়ে যান না তারা মাত্রই জানেন স্বকৃত নোমানকে। তাঁর সমকালীন চিন্তা ও ভাবনার সঙ্গেও পাঠক এরই মধ্যে পরিচিত। কী রাজনীতি, কি সমাজনীতি, কি অর্থনীতি, কি বিশ্বপরিস্থিতি, কি সাম্প্রদায়িক ও অসাম্প্রদায়িক, কি চলমান বাস্তবতা – সব দিকেই সমান চোখ রেখে তা নিংড়ে রচনা করেন কথাশিল্প। ইতিহাসও তাঁর বিশেষ পছন্দের। সংস্কার ও কুসংস্কারে যাপিত নিত্যনৈমিত্তিকতাকেও তিনি খণ্ডিত করেন তাঁর শাণিত প্রশ্নে, কথায়। তেমনই একটি বানিয়াশান্তার মেয়ে। স্বকৃত নোমানের গল্পগ্রন্থ।

গ্রন্থের প্রতিটি গল্পে প্রত্যাহিক জীবনের ঊর্ধ্বস্তর থেকে নিম্নস্তর পর্যন্ত যে বিশ্বাস-অবিশ্বাস, আস্থা-অনাস্থা, বিভ্রাট-বিচ্যুতি, স্বার্থের নোংরা পুঁজ ও সংস্কারের কালো আলো গেঁথে রয়েছে অভেদ্যভাবে তারই জ্বলন্ত সাক্ষী নির্বাচিত বাক্যের আদলে উল্লিখিত। গল্পগুলোর বলনে কুয়াশা নেই, ঘোর আছে। রহস্য নেই, কৌশল আছে। গোঁড়ামি নেই, যুক্তি আছে। মিথ্যা কল্পনার আশ্রয়ও নেই। সত্য উজ্জ্বল। এক এক করে পড়তে গিয়ে প্রতিটি গল্প পাঠশেষে স্থির হয়ে বসে থাকতে হয়েছে কিছুক্ষণ। একটি গল্পে মনে হয়, এটা তো এই তো সেদিন ঘটে গেল, এই গল্পটা তো আমিও জানি। অন্য গল্পে মনে হয়েছে, এটা কী করে সম্ভব? আরেক গল্পে মানবিক ও মনুষ্যত্বের এক জ্বলজ্বলে দৃষ্টান্ত পরিলক্ষিত। কোনো গল্পে ভেসে উঠেছে মুখের ওপর  ঠেসে  রাখা  মুখোশের  ছবি।  পরেই  আবার  কৃষ্ণতায় ডুবে থাকা অন্ধবিশ্বাসী একদল মানুষকে দেখি। শেষের গল্পে মন চমকে ওঠে, আত্মলাভের লোভে মানুষ কী না করতে পারে! তুচ্ছ কারণে তথ্যবিভ্রাট ঘটিয়ে ঘটানো যায় বৃহৎ অঘটন, তাও বিস্ময় জাগায়। নিষিদ্ধপল্লি থেকে ভাগ্যের মোচড়ে একজন নিষিদ্ধ নারী কী করে প্রবেশ করে সংসারজীবনে, টেনে তোলে ভুল পথে পিছলেপড়া এক তরুণের জীবন, সেও ভাবনার ঘণ্টায় টোকা দেয়।

বানিয়াশান্তার মেয়ে গ্রন্থের একটি গল্পও আমাদের চারপাশ-বিবর্জিত নয়। আমাদের ছাড়িয়ে নয়। আমি, আমাদের ভেতরে যে রিপু, আমাদের নিয়ন্ত্রণে যে পরিবেশ, পরিস্থিতি, সর্বোপরি যে আমরা, আমাদের ঘিরে আমাদের বসবাস তারই চালচিত্র গল্প-আকারে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, বিচক্ষণতা, শিল্পশৈলিতায় উপস্থাপিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন  নামে। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত গ্রন্থিত গল্পগুলো যদি একসঙ্গে জোড়া দেওয়া হয় তবে পাওয়া যায় প্রবহমান সমাজ-সংস্কৃতির চিত্রপট, একটি সমাজব্যবস্থার মন-মানসিকতা। সূক্ষ্মদর্শী যারা  তারা  পাঠশেষে  এক  বাক্যে  আঁকতে  পারবেন  চলমান  তথা বাস্তব প্রেক্ষাপট।

স্বকৃত নোমানের লেখায় এমনিতেও অতিভাব, বক্তব্যের প্যাঁচ, বাক্যের ধোঁয়াশা, ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দীর্ঘায়িত করে পৃষ্ঠা বাড়ানোর কুটিলতা নেই। এ-গ্রন্থের গল্পগুলোতেও সেই বৈশিষ্ট্য বজায় রয়েছে। ভাষা ঝরঝরে, মেদহীন; বর্ণনা সরাসরি। সম্পর্কের যূথবদ্ধতা ঘনিষ্ঠ। স্থূলতার ভার নেই একটুও। লুকিয়ে-ছাপিয়ে ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ সংশয়তা নেই, যা গল্পগুলোকে দিয়েছে ভিন্ন ও নিজস্ব রূপ।

স্বকৃত নোমানের গল্প বাস্তব পৃষ্ঠা থেকে চেঁছে-ছেনে তোলা সত্যাংকন। পাঠান্তে বোঝা যায় এ তাঁর পরিশ্রম ও একাগ্র চিন্তালব্ধ ফসল। এও বোঝা যায়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা তাঁর স্বভাবে। প্রতিবারই তিনি ভাঙতে চান গল্পশিল্পের পূর্বগড়ন, তৈরি করতে চান অগ্রসর কাঠামো। বানিয়াশান্তার মেয়ে গ্রন্থেও এর ভিন্নতা চোখে পড়ে না। তাই একটি গল্পকাঠামোর সঙ্গে অন্য গল্পকাঠামোর মিল পাওয়া যায় না সহজে। পাঠে অভিভূত হতে হয় প্রতিটি গল্পে, প্রতিবার। এখানে অধিকাংশ গল্পেই তিনি মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চেষ্টা করেছেন মানুষেরই স্বরূপ। ফুটিয়ে তুলেছেন চমকপ্রদ আবহ। ‘চরজনম’, ‘বগি নাম্বার ৮৩০৫’, ‘একটি শ্রুত গল্প’, ‘কালাপীর’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘২০১৯’, ‘হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন’, ‘রাহাদ, একজন বাঙালি’, ‘সুখ’, ‘কাদাজলের আগুন’, ‘ফিকির’, ‘শুকলাল ডোম’, ‘জীবন’, ‘বানিয়াশান্তার মেয়ে’ – গ্রন্থস্থ গল্পের তালিকা। এই চোদ্দোটি গল্পে যেমন চোদ্দোটি প্রেক্ষাপট হয়ে একটি প্রচল বাস্তবতার মুখ দেখা যায় তেমনি গল্পগুলোর বাঁকে একজন স্বকৃত নোমানকেও দেখা যায় – স্বতন্ত্র আঙ্গিকে হাঁটা এক সমাজচিন্তক হিসেবে; যে স্বকৃত নোমান চিরায়ত জেলের জালে ছেঁকে সবসময় তুলে আনতে সচেষ্ট হোন মুখোশের আবডালে মুখের প্রকৃত মুখ। যে-মুখ আমাদের চেনায়, জানায়, বোঝায় প্রগাঢ় জীবন। গল্প যদি হয় ‘জীবন ও যাপনের ছায়া আর সাহিত্যের অমৃত দ্রাক্ষা-রস’ তবে স্বকৃত নোমান তার পুরোটাই আঁকতে পেরেছেন, ঢালতে পেরেছেন উদ্ধৃত চৌদ্দটি গল্পে। দেখাতেও পেরেছেন নিজের সিদ্ধহস্তের নিপুণতা, যে-ছোঁয়ায় গল্পগুলো হয়ে উঠেছে জ্বলজ্বলে, জীবন্ত, জীবনঘনিষ্ঠ। সুখপাঠ্য এই গল্পগ্রন্থটির জন্য রইল শুভকামনা।

Leave a Reply