বিকল্প উন্নয়নধারা

লেখক:

হায়দার আলী খান
আগামী দিনের বাংলাদেশ

নজরুল ইসলাম

প্রথমা প্রকাশন
ঢাকা, ২০১২

৫৩০ টাকা

অঙ্গুলিমেয় কয়েকটি বই বাদ দিলে বস্তুনিষ্ঠ, শ্রেণিবিশ্লেষণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল এবং তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। নজরুল ইসলামের আগামী দিনের বাংলাদেশ বইটি এক্ষেত্রে একটি বিরাট ব্যতিক্রম। তত্ত্ব ও তথ্যের দ্বান্দ্বিক সমাহার এবং বস্তুঘনিষ্ঠ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এ-বইয়ের লেখক বাংলাদেশের গতানুগতিক উন্নয়ন-সমস্যার বিশ্লেষণকে নিদারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। একদেশদর্শিতা ও উন্মার্গগামিতার বদলে গতিশীল সমাজের অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বগুলোকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার কৃতিত্ব এ-বইটির বিশ্লেষণের।
মোট সাতটি অধ্যায়ে বিভক্ত বইটিতে বিশ্লেষণ অগ্রসর হয়েছে ধাপে ধাপে। প্রথম চারটি পরিচ্ছেদে রাজনৈতিক অর্থনীতির বিশ্লেষণের পদ্ধতিগত সমস্যাগুলো এবং মার্কসীয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদের ব্যবহারযোগ্যতা সম্পর্কে কয়েকটি পরস্পরসম্পৃক্ত গভীর আলোচনার সমাবেশ ঘটেছে। কিন্তু প্রথম অধ্যায় – ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি বনাম ‘অর্থনীতি’ বাদে বাকি তিনটি অধ্যায়েই প্রাসঙ্গিকতা রক্ষা করা হয়েছে। যেমন, দ্বিতীয় অধ্যায় –  ‘পুঁজিবাদের পৌনঃপুনিক সংকট ও বাংলাদেশ’ – বিশ্ব পুঁজিবাদের সংকটময় পুনরুৎপাদন সমস্যাবলির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বিশেষ অবস্থানটিকে দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছে। এ গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়টিতে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বিবর্তনের প্রশ্নটিকে দেখার চেষ্টা করেছে। এ অধ্যায়ের শিরোনাম ‘ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদ ও বাংলাদেশ’। এ অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন বিষয়কে ততোটা স্পষ্টভাবে বর্ণনা না করা হলেও এর অভ্যন্তরে রয়েছে মার্কস-লেনিন থেকে শুরু করে আলথুসার-বালিবার-হিন্ডেস ও হার্স্ট, কোসাম্বি, ডব, সুইজি, আলাভি, ফ্রাঙ্ক, আমিন, লোহিয়া এবং অন্য অনেক তাত্ত্বিকের মতবাদের বিশদ সমালোচনা। সে-সমালোচনার ভিত্তিতে ঔপনিবেশিক অর্থনীতির দ্বৈত চরিত্র এবং এর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাসহ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের সম্ভাবনা – এসব কিছুকেও পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
এ অধ্যায়ের অন্তর্গত ‘ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদ ও বাংলাদেশ’ অংশটি (১৯৪ থেকে ২০৬ পৃষ্ঠা) অন্তত এ-পাঠকের মতে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক সংকটের ঐতিহাসিক বিবর্তনের সবচেয়ে ভালো সংক্ষিপ্ত বিবরণ। এ অধ্যায় থেকেই পাঠক একলাফে সরাসরি পঞ্চম পরিচ্ছেদে (‘ভূমি সংস্কার ও গ্রামের রূপান্তর’) চলে যেতে পারেন। তবে চতুর্থ অধ্যায়টি (‘বাংলাদেশে সামাজিক পরিবর্তন ও সামাজিক বিজ্ঞানচর্চা’) পদ্ধতিগত আলোচনায় সমৃদ্ধ। এটি বিজ্ঞানমনস্ক ও বিশ্লেষণধর্মী পাঠকের জন্য একটি উপরি পাওয়া।
শেষের তিন অধ্যায়েই লেখক বাংলাদেশের অর্থনীতির রূপরেখা এবং আমাদের আর্থ-সামাজিক ভবিষ্যতের বিশদ আলোচনা করেছেন। স্বল্প পরিসরের আমার এ-আলোচনায় শুধু ষষ্ঠ ও সপ্তম অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোই অতি সংক্ষেপে উল্লেখ করব।
রাজনীতির ক্ষেত্রে (‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সমস্যা ও সমাধান’) লেখক দুটি প্রস্তাব রেখেছেন। প্রথমত, সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে চার বছরে কমিয়ে আনা। দ্বিতীয়ত, আনুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচন-পদ্ধতির প্রবর্তন। ইউরোপীয় এবং অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে দ্বিতীয় প্রস্তাবটির তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক গ্রহণযোগ্যতা আছে বলে মনে হয়। শুধু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়গুলোর বিশদ আলোচনা ও বিতর্ক আশু প্রয়োজনীয়। প্রথম প্রস্তাবটির কার্যকারিতা বাস্তবে কতটা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা চলে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে এক বছর কম সময়ের শাসনরীতি খুব ফলপ্রসূ হবে বলে মনে হয় না।
শেষ অধ্যায়টি সবচেয়ে মূল্যবান। লেখক যে-চারটি উন্নয়ন-সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন – ধনী অভিমুখিতা, শহর অভিমুখিতা, পরনির্ভরতা ও ব্যক্তিস্বার্থের প্রাধান্য – তা খুবই যথাযথ। তবে এর তলবর্তী কারণগুলো আরো বিশদ ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তলিয়ে দেখার চ্যালেঞ্জটাও পাঠকের ওপরই বর্তায়। লেখকের মতে, গতানুগতিক ধারার বিপরীতে বিকল্প উন্নয়নধারার বৈশিষ্ট্য হবে গণঅভিমুখিনতা, গ্রাম অভিমুখিনতা, আত্মনির্ভরতা ও সমষ্টি-স্বার্থের প্রাধান্য। এরপর গ্রাম, কৃষি, শিল্পায়ন থেকে শুরু করে প্রশাসন-শিক্ষা-স্বাস্থ্য প্রভৃতি বেশ কয়েকটি বিষয়ে লেখকের আলোচনা এই চতুর্মুখী বিকল্প উন্নয়নধারাকে কিছুটা স্পষ্টতা দান করে।
এই অধ্যায়টির একটি বিশেষত্ব হচ্ছে, রাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতির গুরুত্বকেও সামনে নিয়ে আসা। রাজনৈতিক অর্থনীতি ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়নের সমস্যাবলি বোঝা যেমন অসম্ভব, তেমনি সমর্থ গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব ছাড়া গণমুখী বিকল্প উন্নয়নও সর্বাঙ্গীণ অর্থে সম্ভবপর নয়। কাজেই এ-গ্রন্থের আরেকটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাংলাদেশের নাগরিকদের সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক নাগরিকত্ব অর্জনের সংগ্রামে লিপ্ত হওয়া। সবদিক দিয়ে বিবেচনা করলে আগামী দিনের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের ভেতর যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির প্রেরণা কাজ করেছিল, তারই আরো পরিণত, সুশৃঙ্খল, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বিশ্লেষণ। সুতরাং বাংলাদেশের মুক্তিসন্ধানী চিন্তাশীল ব্যক্তির জন্য এ-বই অবশ্যপাঠ্য।

১ thought on “বিকল্প উন্নয়নধারা