বিত্তবৈভবের জট ও জটিলতা

লেখক:

হামীম কামরুল হক

 

জীবন যখন থমকে দাঁড়ায়

আফসানা বেগম

 

সন্দেশ

ঢাকা, ২০১৪

 

১০০ টাকা

 

 

বাংলাসাহিত্যের বড় একটা অংশ জুড়ে আছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবন। এ-সাহিত্যের সবচেয়ে সফল উপন্যাসের একটি যে পথের পাঁচালী, তা তো গ্রামের একেবারেই হতদরিদ্র মানুষকে নিয়ে। এটি বিভূতিভূষণের লেখা প্রথম উপন্যাস। পরে সত্যজিৎ রায়ের হাতে সিনেমা হয়ে এর পরিচিতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। পথের পাঁচালীর কথা বলছি এজন্যে যে, শুরুতেই সেরা নৈপুণ্য ও সার্থকতার দেখা পাওয়ার সৌভাগ্য সব লেখকের জীবনে ঘটে না। এটা রীতিমতো বিরল। সব দেশেই, সব যুগেই। আমরা যে-উপন্যাসটি নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি, সেটিও এর লেখকের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। এর বিশিষ্টতা হলো, এর লেখক এখানে যে-জীবনের কথা হাজির করেছেন, সে-জীবনকে বাংলাদেশের সাহিত্যে খুব একটা বিশ্বস্ততার সঙ্গে পাওয়া যায়নি। বোধ করি কেউ খুব একটা ভরসাও পাননি এই অভিজাত জীবনকে, তাও একেবারে সমকালীন জীবনকে হাজির করার। সেদিক থেকে আফসানা বেগমের উপন্যাস জীবন যখন থমকে দাঁড়ায় আমাদের সচকিত করেছে।

গুলশান-বনানীকে বলা হয় ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকা। যদিও অভিজাত ও ধনিক শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য আছে। অর্থ হলেই ধনিক শ্রেণিতে ওঠা যায়, কিন্তু অভিজাত হতে সংস্কৃতি লাগে, রুচি, শিক্ষা, মর্যাদার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য থাকতে হয়। একটা সময় অবধি ধানমন্ডিরও সেই ছাপ ছিল, কিন্তু কালের পরিবর্তনে ধানমন্ডি সেই স্থান থেকে বোধকরি কিছুটা সরে গেছে। যদিও অনেকে মনে করেন, সত্যিকারের বনেদি লোকজনের এখনো বাস ধানমন্ডি এলাকাতেই। আফসানার উপন্যাসের ক্ষেত্র বনানী ও গুলশান – এখানে সময়ের সুখ ও অসুখের নমুনা দুই-ই প্রকট। সেই প্রকটতা প্রগাঢ় নৈকট্য পেয়েছে এ-উপন্যাসে। আমরা দেখতে পাই, এখানে হাজির করা চরিত্ররা তাদের আচার-আচরণ, ভাষা, ব্যবহার ও যৌন-নৈতিকতায় এমন এক স্তরের মানুষ, যে-জীবনের সঙ্গে মধ্যবিত্ত জীবন মেলে না।

আমরা সবাই জানি, দুটো বিষয় মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রেখেছে – ভাষা ও যৌনতা। এই দুইয়ের আদান-প্রদানই হলো আমাদের সব অগ্রগতি ও যাবতীয় সংকটের শেকড়। ফ্রয়েড যৌনতার কথা বলে গেছেন বলে নয়, বা পরে লাঁকার ‘ফ্রয়েডে ফেরো’ আহবানের জন্যও এ-কথা বলা হচ্ছে না। ভাষা ও যৌনতাকে ঘিরে এখনো অনেক রহস্য অন্ধকার রয়ে গেছে। হয়তো কখনোই দূর হবে না। আলো ফেলার চেষ্টাও থেমে নেই; কিন্তু এ দুয়ের রহস্যও অন্তহীন। তাই বলতে হচ্ছে। কারণ একেবারে সুপ্রাচীনকাল থেকে দেখি (ফ্রয়েডের বিখ্যাত গ্রন্থ সিভিলাইজেশন অ্যান্ড ইটস ডিসকনটেন্টের সূত্রে যদিও) প্রেম ও শ্রমের বণ্টন ও বিভাজনের ভেতর দিয়ে মানুষ তার সভ্যতা শুরু করেছিল। দুটো বণ্টনেই সামঞ্জস্যের অভাব দিন দিন প্রকট হয়েছে। পরবর্তীকালে শ্রমের নামে তো শোষণ চলেছেই, অন্যদিকে প্রেমের নামেও কি শোষণ হয়নি, হচ্ছে না? পার্সি ধর্মের প্রবক্তা জরাথ্রুস্টের মতবাদের দিকে তাকালে মনে হয়, ওই দুই-ই ভিন্ন এক মাত্রায় আসতে একইভাবে বিরাজ করছে। জরাথ্রুস্টের সূত্রে আমরা দেখি, মানুষের জীবন পরস্পর বিপরীতধর্মী দুই প্রবল শক্তির মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত। এর একটি হলো আলোর জগৎ, অন্যটি অন্ধকারের জগৎ। আলোর দেবতা হলো আহুর মাজদা আর অন্ধকারের দেবতা অহরমিন। মজার ব্যাপার হলো, দুজনই মূলত সহোদর। কিন্তু আহুর মাজদা থাকেন স্বর্গে, অহরমিন পাতালে। দুটি শক্তির কোনোটি কখনো অন্যটিকে চিরতরে নির্মূল করতে পারবে না। জীবনানন্দ দাশ যাকে বলেছিলেন ‘আলোর সহোদর’, সে-ই তো অন্ধকার। বৌদ্ধধর্ম মানুষের সেই আলো-অন্ধকারে নতুন আলো ফেলতে চাইল। সেখানে দেখা গেল মানুষের সব দুঃখের মূলে আছে আকাঙ্ক্ষা। বলা হলো, নির্বাণই হলো সমাধান। তাও তর্কহীন নয়। যেমন জীবনানন্দ দাশ মনে করতেন – নির্বাণ দুটো কারণে সম্ভব নয়। একটি হলো পুরুষের জন্য নারী আর নারীর জন্য পুরুষের টান, অন্যটি হলো মানুষের অচেতন মন। আমরা এখন বুঝতে পারি, একটি হলো যৌনতা, অন্যটি ভাষা। কারণ ভাষাই হলো মানুষের অচেতন (লাঁকা যেভাবে এনেছেন)। এই দুয়ের ফাঁদেই মানুষের জীবন ধরা পড়ে। আটকে যায়। আফসানা বেগম জীবন যখন থমকে দাঁড়ায় উপন্যাসে যে-মানুষদের আটকে পড়ার কাহিনি লিখেছেন, তাদের এই আটকা পড়ার বিষয়টিকে ভাষা ও যৌনতার দিক থেকে বিবেচনা করা যেতে পারে।

আমরা দেখি, এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সায়ান, তার মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে যেমন যৌনতার বিধিবদ্ধ নিয়ম না মানার জন্যই, তেমনি উপন্যাসে ধনিক শ্রেণির পার্টি হই-হুল্লোড়ের ভেতরে মিশে আছে নেশা ও যৌনতার আবেশ। বর্তমানের বিত্তবান তরুণ-তরুণীদের ইয়াবা সেবন ও বেপরোয়া মেলামেশার ফলে কী ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে তার কিছু নমুনা হাজির করেই তিনি শুধু দায়িত্ব সারেননি, তিনি প্রভাবশালী ব্যক্তির ক্ষমতার ব্যবহার ও অপব্যবহারের দিকগুলিও স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন। কারণ ভাষা ও যৌনতা তো ক্ষমতারই প্রধান দুই ভাষ্য। বিত্তবান পরিবারের ছেলেমেয়ে বলেই নানান অপরাধ করে থানায় নিয়ে যেতে না যেতেই ওপর মহল থেকে ফোন আসে, আর ছেড়ে দিতে হয় এদের। ফলে নষ্টচক্র বেড়েই চলে।

উপন্যাসে চারটি পাঁকচক্র আছে। সায়ানের নিজের বেড়ে ওঠা ও তার জীবনের নিঃসঙ্গতা, নির্লিপ্ততা; রিয়াদের ইয়াবাসহ ধরা পড়া; আরিয়ান নামের এক তরুণের ইরিনার আপত্তিকর ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার ব্ল্যাকমেইল এবং সায়ানের ঘরে ইয়াবা রেখে তাকে ফাঁসানো। ফলে এ-উপন্যাসের মূল জায়গাটি হলো অপরাধ। প্রতি ক্ষেত্রে জড়িয়ে গেছেন সিরাজুল আঙ্কেল, যিনি একদিকে বিরাট ব্যবসায়ী, অন্যদিকে যথেষ্ট প্রভাবশালীদের একজন। তবে তিনি নষ্টভ্রষ্ট কোনো লোক নন, একজন কল্যাণকামী মানুষ, ব্যতিক্রমীও। দুটি নারী চরিত্র তিন্নি ও ঝুমুর –  একজন সায়ানকে প্রবলভাবে চেয়েছিল কিন্তু পায়নি বলে প্রতিশোধ নেয় মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসিয়ে, অন্যজন এই উপন্যাসে বিত্তবান সমাজের বাইরে থাকা প্রধান চরিত্র ঝুমুর – সায়ান যার সঙ্গে একটু একটু করে জড়িয়ে গেছে। ঝুমুরের মমত্ব এবং আন্তরিকতায় সায়ান পেয়েছিল এমন এক আশ্রয়, যে-আশ্রয় সে নিজে খুঁজছিল কিন্তু কখনো তা সচেতনভাবে বুঝে উঠতে পারেনি।

সায়ানের জগৎ তার মা, মঈন আঙ্কেল ও সিরাজুল আঙ্কেলকে ঘিরে গড়ে উঠছে। সেখানে বাইরে থেকে প্রবেশ করছে ঝুমুর। সিরাজুল আঙ্কেল প্রতিবার সায়ান ও তার বন্ধুদের প্রতিটি বিপদ থেকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছেন – রিয়াদের ইয়াবা, ইরিনার ভিডিও ছেড়ে দেওয়ার বিপদ থেকে সায়ানের নিজের মিথ্যা অভিযোগে ফেঁসে যাওয়ার ঘটনায়। সায়ানের বসবাস, নিজের বাড়ি, কাজের বুয়ার  দেখাশোনায় ছোটবেলা থেকে বড় হওয়ার সময়টা ও স্মৃতিগুলি তাস বাটার মতো করে সাজিয়ে আবার ভেঙে দিয়েছেন আফসানা। ফলে সায়ানের বাবার সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক কেন ভাঙল, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে এর আভাস পেলেও প্রকৃত ঘটনাটির বর্ণনা পাই নবম পরিচ্ছেদে। তেমনি ঝুমুর কেন মফস্বল ছেড়ে ঢাকায় মামার কাছে থেকে পড়ালেখা করছে, এর কারণ জানা যায় উপন্যাসের প্রায় শেষে।

বিত্তবানের দুলাল-দুলালিদের ভিন্ন রকমের জীবনযাপন ও  ভাষা-ব্যবহারের দিকগুলো এসেছে জীবন্তভাবে। গুলশানের কার রেসিং, সায়ান ও তার বন্ধুদের অংশগ্রহণ, জন্মদিনের পার্টি ও আনন্দ-ফুর্তির নানা দিক বিত্তবান সমাজের উৎকেন্দ্রিক এবং প্রায় অর্থহীন সময় কাটানোটাকে দেখিয়ে দেয়। কারো কোনো উদ্দেশ্য নেই, স্বপ্ন নেই, যৌনতা-প্রেম ও প্রতারণা ছাড়া আর কোনো সংকট নেই। তাই সেখানে কোনো সৃষ্টিও নেই। কারণ সংকট না থাকলে সৃষ্টিও হয় না, সৃষ্টি না হলে জীবনও এগোয় না। এ-কারণেই কি জীবন সেখানে থমকে থাকে?

জীবন যখন থমকে দাঁড়ায় উপন্যাসে বাংলাদেশের বিত্তবান সমাজের সে-জায়গাটি দেখা যায়, যেখানে সময়ের স্রোতে ভেসে যাওয়াকে অজান্তেই এই শ্রেণির মানুষ মেনে নিয়েছে। সেইসঙ্গে মানবিকতার জায়গটিও দেখা যায়, যে-মানবিকতার দেখা পাই সায়ান ও সিরাজুল আঙ্কেলের ভেতর দিয়ে। সেখানে বাইরে থেকে আসা ঝুমুরও যোগ করে জীবনের সহজ-সরল বিকাশ, শহরের বাইরের নিসর্গ। ফলে এই উপন্যাসে এক জীবনের সঙ্গে অন্য জীবনের যোগটাও ঘটে। যদি মানবিকতা, প্রতিহিংসা প্রতিশোধের চেয়ে বড় না হলে জীবন থমকে দাঁড়ায়, তাই তিন্নি দোষ স্বীকার করে নেয়। সায়ান মুক্তি পায়। কিন্তু তার এ-মুক্তি শারীরিক, বাহ্যিক মুক্তির সূত্রটি হাজির করতে চেয়েছে ঝুমুর। তার জীবনের আনন্দ-বেদনার সঙ্গে ভয়ংকর স্মৃতিও আছে। তার বান্ধবী বীণা ধর্ষণের পর খুন হয়। লাশ পড়েছিল নদীর পাড়ে। ঝুমুর মানুষকে ঘৃণা করার বদলে যেখানে খুন হয়েছে সে-জায়গাটাকে ঘৃণা করতে শুরু করে। নদী আর তার সেই ছোট্ট শহরে সে আর কোনো ভরসা পায় না। তার মাও তার নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগে। ফলে তাকে বাধ্য হয়ে ঢাকা শহরে আসতে হয়। পাঠক নিশ্চয় এখানেও দেখছেন ঝুমুর তার ভাষার আড়ালেই ঢেকে রেখেছিল যে-ঘটনা, সেখানেও আছে যৌনতা – একটি ধর্ষণের কাহিনি। সে-ঘটনা প্রকাশ করা হয় উপন্যাসের শেষে। কারণ সায়ান তার ভেতরে শুদ্ধতা দেখেছিল, দেখেছিল স্বপ্ন ও সত্যের বাস। কিন্তু ঝুমুর বলে তার ঘৃণার কথা, তার নিরাপত্তাহীনতার কথা।  সেজন্যেই তার শহরে আসা। কিন্তু শহরে এসে সে কী দেখছে? ঝুমুরের মনে করে, যেভাবে সায়ানকে সে বলে, ‘কে জানে আমাকেও বীণার মতো ওইভাবে – তাই মামার কাছে চলে আসা। আমার পড়তে হবে, চাকরি পেতে হবে, মাকে আনতে হবে। আমার জীবনের বড় স্ট্রাগল তো এখনো বাকি। আর তুই, কত গোছানো একটা জীবন তোর। চাইলেই সব রেডি। এটাকে অবহেলা করিস না। কাজে লাগা। আমার কাছে তুই কীভাবে শুদ্ধ হবি? আমি নিজেই তো শুদ্ধ নই।’ কারণ ঝুমুর মনে করে তার সেই ঘৃণা, সেই নিরাপত্তাহীনতাই তাকে শুদ্ধ হতে দেয়নি। জীবন সংগ্রামের ভেতর দিয়ে, শিক্ষার ভেতর দিয়ে সে শুদ্ধ হতেই চেষ্টা করছে এখনো। ফলে ঝুমুরের জীবনটা গতিশীল, কিন্তু সায়ানের গতিশীল জীবন আসলে থমকে থাকারই নামান্তর। কারণ সে এত সুযোগের কোনোটাই কাজে লাগায়নি, লাগাচ্ছে না। তাই মনে হয় ঝুমুরের জীবনে যদি সায়ানের মতো নিরাপত্তা ও প্রাপ্তিগুলো যোগ হয়, আর সায়ানের জীবনে যদি ঝুমুরের মতো সংগ্রাম ও গতিশীলতা দেখা দেয়, তাহলেই জীবনের জটগুলো কেটে প্রকৃত গতি আসে। জীবন যখন থমকে দাঁড়ায় উপন্যাসটি আমাদের সচকিত করে। বিত্তবান জীবনের পাঁকচক্রে পড়ে থাকা মানুষেরা জীবন-সন্ধানটিকে দেখাতে পারে।