বুনো স্ট্রবেরি : বার্গম্যান চলচ্চিত্রের প্রবেশদ্বার

লেখক: চণ্ডী মুখোপাধ্যায়

নিঃসঙ্গতাই বার্গম্যানের সঙ্গী। অন্তত চলচ্চিত্রকার বার্গম্যানের। বিশ্বাস নয়, জ্ঞান। এটাই তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রার প্রধানতম মোটিফ। সমস্ত পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসকে তিনি পরীক্ষা করে দেখতে চান। আর সেজন্যেই যেন তাঁর সিনেমা-ভাবনা। সিনেমা নামক মাধ্যমটির প্রতি টান তাঁর ছোটবেলাতেই। স্মৃতিচারণে তিনি লেখেন, ‘ওপরে যে প্রজেক্টর থেকে আলো পর্দায় এসে পড়ছে সেটার প্রতি আমার ছিল অসম্ভব আকর্ষণ। যে-লোকটা ওটা চালাচ্ছে তাকে আমার ঈর্ষা হতো। বুঝি ব্যাপারটা পরশ্রীকাতরতা। তখন আমি দিদার বাড়িতে থাকি। চার্চে একদিন ক্যাসল সিনেমার এক প্রজেক্টর অপারেটরের সঙ্গে আলাপ হলো। বেশ বন্ধুত্বও। এরপর দিদার অনুমতি নিয়ে মাঝেমধ্যে ক্যাসল সিনেমায় যেতাম। বয়স্ক বন্ধুর সৌজন্যে প্রজেক্টর রুমে দাঁড়িয়ে সিনেমা দেখতাম। পয়সা লাগত না।’ তাঁর স্মৃতিগ্রন্থ বা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের নাম ম্যাজিক লণ্ঠন। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত এই আত্মজীবনী লেখেন। তাঁর বয়স তখন ঊনসত্তর। বড় পর্দা থেকে সরে এসে টিভির জন্যে চলচ্চিত্র করেন। আর থিয়েটারে আজীবন। প্রিয় নাট্যকার অগাস্ট স্ট্রিনবার্গ। তাঁর নাটকভাবনা থেকে আরোহিত অনেক শিক্ষাই তিনি প্রয়োগ করেন আবার সিনেমায়। তিনি স্বীকার করেন, সারাজীবন তাঁর সঙ্গে স্ট্রিনবার্গ। এই নাট্যকারের প্রতি কখনো অনুরক্ত, কখনো-বা বিরক্ত। সিনেমা তাঁর প্রেমিকা আর থিয়েটার তাঁর স্ত্রী। জীবনের প্রথম সিনেমা দেখা ব্ল্যাক বিউটি। স্টকহোমের এক সিনেমায়। এই ছ-বছর বয়সের স্মৃতি মনে ছিল তাঁর, ‘আগুনের দৃশ্যটা মনে আছে। দারুণ উত্তেজনা হয়েছিল। বইটাও কিনে ফেলি।’

বার্গম্যান একশ। জন্মশতবর্ষ। আর সে-সূত্রে আরেকবার বার্গম্যান সমীপে ফিরে যাওয়া। হয়তো নিঃসঙ্গতা, মৃত্যু এবং স্বপ্নকে আরেকবার ছুঁয়ে দেখা বা ধর্মের বাস্তবতাকে যাচিয়ে দেখে নেওয়া। এসব নিয়েই তো তিনি। যাঁর কাছে শেষাবধি জীবন ও মানবধর্মই শেষ কথা। তাঁর সিনেমা সূত্রকে বুঝতে হলে ছুঁতে হবে তাঁর স্মৃতিকে। আর এ-প্রসঙ্গে সবচেয়ে সাহায্য পেতে পারি তাঁর ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ চলচ্চিত্র থেকে। চলচ্চিত্রের মধ্যেই রয়েছে এক নস্টালজিয়া, বার্গম্যানের নিজস্ব স্মৃতিসরণিতে যাত্রা। জার্নি বা যাত্রাই তো এই চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় বিষয়। বার্গম্যান স্বয়ং এই চলচ্চিত্রটিতে কী দারুণ নৈর্ব্যক্তিকভাবে নিজের স্মৃতির কাছে পৌঁছে যান। চলচ্চিত্রটির অনেক অংশই আত্মজৈবনিক, যাকে অবশ্য প্রতীকের আবরণে আড়াল রাখেন তিনি। কিন্তু আত্মজৈবনিক উপাদানকে চিহ্নিত করতে অসুবিধা হয় না দর্শকদের। ঠিকমতো ভাবলে, বার্গম্যানের সিনেমারাজ্যে প্রবেশের গেটওয়ে হলো ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ। ১৯৫৭ সালে নির্মিত এ-চলচ্চিত্রের আগে-পরে অনেক চলচ্চিত্রই করেছেন তিনি। তাঁর চলচ্চিত্রের সংখ্যা সত্তরোর্ধ্ব। তবু তিনি কিন্তু চলচ্চিত্রকে তাঁর স্ত্রীর মর্যাদা দেন না। স্ত্রীর মর্যাদা পায় তাঁর চিরসংগ্রামী সঙ্গিনী থিয়েটার। সারাজীবনে একশ সত্তরটির বেশি নাট্য পরিচালনা করেন তিনি। চলচ্চিত্র ছেড়ে শেষ জীবনে তাঁর আশ্রয় নাটকেই। তাঁর সম্পর্কে একটা অভিযোগ অনেক

সময়েই ওঠে যে, তাঁর চলচ্চিত্র সময় সময় অনেক নাটকগন্ধী, সময় সময় নির্দিষ্ট এক লোকেশন-নির্ভর বা যাকে বলা যেতে পারে চেম্বার ড্রামা। কিন্তু এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করলে দেখা যাবে উলটোটাই বরং সত্যি। নাটক নয়, চলচ্চিত্রে তিনি জন্ম দিয়েছেন এক নতুন ভাষা, যা তাঁর একান্ত নিজস্ব, পাশাপাশি আন্তর্জাতিকও।

এবং অবশ্যই বার্গম্যানীয়। ফরাসি নবতরঙ্গ চলচ্চিত্রের কালাপাহাড় পরিচালক জঁ লুক গোদার যাঁকে চিহ্নিত করেন ব্যার্গনামারা বলে। গোদার বার্গম্যান সম্পর্কে লেখেন, ‘কার্যক্ষেত্রে ইঙ্গমার বার্গম্যানের চলচ্চিত্র তাৎক্ষণিক ও সাম্প্রতিক। তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্রই এখনকার এক যোদ্ধা বা অভিনেতার প্রতিফলন, কালের স্থায়িত্বের প্রতিটি অংশকে ছিঁড়ে ফেলায় যা ঘনীভূত। প্রুস্তের চেয়ে ভঙ্গিমার চেয়ে ক্ষমতাবান। প্রুস্ত ভঙ্গিমার সঙ্গে রুশো এবং জয়েসকে যোগ করলে যে অতীত উদ্ভূত তাৎক্ষণিকতা নির্মাণ হয় অনেকটা সেরকম। বার্গম্যানের চলচ্চিত্র এক সেকেন্ডের একেক চব্বিশাংশ সময়ে জন্মায় এবং তা প্রসারিত হয় দেড় ঘণ্টা ধরে। এটি যেন চোখের দুটি মণির মধ্যেকার জগৎ, যেন দুবার হৃদস্পন্দনের মধ্যেকার দুঃখ, করতালির জন্যে প্রসারিত দুটি হাতের মধ্যেকার আনন্দ।’ গোদার এভাবেই বার্গম্যানের অতীতমুখিনতার মধ্যে বর্তমানকে খুঁজে পান। ১৯৫৮ সালে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে যখন ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ সেরা চলচ্চিত্রের ‘স্বর্ণ ভল্লুক’ পায় তখন সেখানে পরিচালক নয়, সাংবাদিক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গোদার। তাঁর পত্রিকাকে এক টেলিগ্রামে এই খবর তিনি জানান। টেলিগ্রামে তিনি লেখেন, ÔGolden Bear Wild Strawberries proves Ingmar greatest stop script fantastic about flash conscience Victor Sjöström dazzled beauty Bibi Andersson stop multiply Heidegger by Giraudoux get Bergman stop.Õ

দেখা যায় গোদার হাইদেগারের প্রসঙ্গ আনছেন। কেন হাইদেগার। তবে কি এই চলচ্চিত্রের সময়ের দোলাচল দেখে গোদারের মনে পড়ে যাচ্ছে হাইদেগারের টাইম অ্যান্ড বিয়িংয়ের কথা? নবতরঙ্গের আরেক পরিচালক ফ্রাসোয়া তরুফো অবশ্য বার্গম্যানকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। তিনি মনে করেন, ‘আমরা যেসব করার স্বপ্ন দেখি তা সমস্তই করে ফেলেছেন বার্গম্যান। তিনি সিনেমা লেখেন যেমন একজন লেখক উপন্যাস লেখেন। কলমের বদলে বার্গম্যান ব্যবহার করেন ক্যামেরা।’

বার্গম্যান কিন্তু নিজের চলচ্চিত্র করা প্রসঙ্গে অন্য কথা বলেন, ‘আমি ছবি করি কারুর না কারুর কাজে লাগবে বলে। এই মুহূর্তের জন্যেই আমার ছবি তৈরি হয়। আমার ছবি আর কিছুই না, এটা একটা টেবিল, খাবার জল, একটা ফুল, কিংবা একটা ল্যাম্পের মতো। কারো না কারো, কোনো না কোনো কাজে লাগছেই। ছবি করেই তো অন্য মানুষের সঙ্গে আমার যোগাযোগ তৈরি হয়। ছবি করে তাদের দিয়ে আমি বলি, এটা ব্যবহার করুন, এর থেকে দরকারমতো নিয়ে বাকিটা ছুড়ে ফেলে দিন। আমি আবার ফিরব, আরো নতুন কিছু তৈরি করব। এটা যদি ভালো না হয় তাতে কিছু যায়-আসে না, পরেরটা ভালো করব।’ বার্গম্যান তাঁর চলচ্চিত্র-নির্মাণপদ্ধতিকে যোগাযোগের সূত্র হিসেবেই ভাবছেন। কার সঙ্গে যোগাযোগ? শুধুই কি দর্শকের সঙ্গে? নাকি ঈশ্বরের সঙ্গে? অথবা নিজের সঙ্গে? বার্গম্যানের বর্তমান আসলে অতীত-উদ্ভূত বর্তমান। এসব ভাবনা এবং কৌতূহল নিয়ে বার্গম্যানজগতে ঢোকার জন্যে অবশ্যই বুনো স্ট্রবেরি (ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ) শুরুর পথ। বার্গম্যানের আগে পরের চলচ্চিত্রগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্যেই এই চলচ্চিত্রটির একান্ত পাঠ। ১৯৪৫ থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনা শুরু করলেও আন্তর্জাতিক স্তরে তাঁর নাম উঠে আসে ১৯৫৫-র পরে। পরপর চারটি চলচ্চিত্র – স্মাইল অব অ্যা সামার নাইট, দ্য সেভেন্থ সিল, দ্য ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ এবং দ্য ম্যাজিশিয়ান তাঁকে খ্যাতির শিখরে নিয়ে যায়। প্রথম দুটি চলচ্চিত্র পরপর যথাক্রমে ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ পুরস্কার পায়। আর ১৯৫৮ সালে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পায় বুনো স্ট্রবেরি। বার্গম্যানের শিল্পীজীবন পূর্ণতা পায় এই চলচ্চিত্রে। পৃথিবীর সেরা দশ চলচ্চিত্রের তালিকায় বারবার উঠে এসেছে এই চলচ্চিত্রটি। এই চলচ্চিত্র কতটা আত্মজৈবনিক সে-প্রশ্ন উঠতে পারে; কিন্তু অন্যভাবে ভাবলে এই চলচ্চিত্র বৃহত্তর অর্থে যে-কোনো শিল্পীরই শৈল্পিকজীবন। আর সেই সূত্র ধরেই চলচ্চিত্রটি হয়ে ওঠে চিরায়ত। বুনো স্ট্রবেরি চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় থিম অবশ্যই আত্মানুসন্ধান। এই চলচ্চিত্রের নায়ক আইজ্যাক বর্গ একজন

অতিপ্রতিষ্ঠিত ডাক্তার। তিনি সমাজে শুধু ডাক্তার নন, একজন উচ্চস্তরের বুদ্ধিজীবী হিসেবেও চিহ্নিত। তাঁর জীবনের বিশেষ ২৪ ঘণ্টা নিয়েই চলচ্চিত্র। দিনটা তাঁর কাছে অবশ্যই বিশেষ। কেননা, দূরের এক বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে এক সম্মানীয় পুরস্কার দিচ্ছে। সেই পুরস্কার গ্রহণ করতেই বর্গ যাচ্ছেন সেখানে। ঠিক করেছেন বিমানে নয়, যাবেন গাড়িতে। এই জার্নি বা যাত্রা নিয়েই চলচ্চিত্র, যা ক্রমশ আর নিছক জার্নির মধ্যে আটকে থাকে না। হয়ে ওঠে আত্ম-আবিষ্কারের এক পথ। যেখানে ক্রমশই এই জার্নি বর্গের কাছে হয়ে ওঠে নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বাইরে সত্য উন্মোচনের এক পথ। বিশেষ সম্মান লাভের আগের রাতে পথের মধ্যে নিজের অতীতকে নির্মোহভাবে পরীক্ষা করেন তিনি। স্বপ্ন ও স্মৃতির মধ্যে।

 

দুই

আটাত্তর বছরের আইজ্যাক বর্গ চলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় নগরী লুন্ডেতে; যেখানে তাঁকে দেওয়া হবে এক বিশেষ সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি। নিজেই গাড়ি চালিয়ে চলেছেন তিনি। সঙ্গে তাঁর পুত্রবধূ ম্যারিয়েন। পুত্রবধূর বর্গের প্রতি তেমন শ্রদ্ধা নেই। সে বর্গকে মনে করে এক আত্মকেন্দ্রিক বুড়ো। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। এই জার্নি বা যাত্রার মধ্যেই ম্যারিয়েন আইজ্যাককে বলে, ‘আপনি ভয়ানক স্বার্থপর। নিজের ছাড়া অন্যের কারুর ব্যাপারে আপনার কোনো চিন্তা নেই। আর এই স্বার্থপর চেহারা ঢাকা দেওয়ার জন্যেই আপনি মুখে এত বিনয়ী, যা দেখে মনে হয় আপনি দারুণ মানবতাবাদী। কিন্তু যারা আপনাকে কাছ থেকে দেখেছে তারা জানে আপনি আসলে কী।’ পুত্রবধূর মুখে এই অভিযোগ শুনে বিস্মিত বর্গ। পুত্রবধূ এ-কথাও জানায় যে, বর্গের পুত্র ঠিক তাঁর মতোই হয়েছে। এসব কথাবার্তায় আনন্দযাত্রার মধ্যে এক অ্যান্টি-ক্লাইমেক্স তৈরি হয়। জার্নিটা আর নিছক পুরস্কার গ্রহণের জার্নি থাকে না। হয়ে ওঠে আত্ম-আবিষ্কারের এক জার্নি। শুরুতে তিনি আবার শৈশবে ফিরে যেতে চান। ম্যারিয়েনকে তিনি দেখাতে চান ছোটবেলার স্মৃতি। আইজ্যাকের বয়ানেই বলা যাক, ‘এখন আমরা বার্চ গাছে ঘেরা হলুদ বাড়িটা দেখতে পাচ্ছি। সমুদ্রের দিকে মুখ করে বাড়িটা যেন ঘুমোচ্ছে। আমি জীবনের কুড়িটা বছরের প্রতিটি গ্রীষ্ম এখানে কাটিয়েছি। যাই এখন একটু স্ট্রবেরির বাগানটায় ঘুরে আসি।’ খুব স্বাভাবিকভাবেই ম্যারিয়েনের এসবে কোনো আগ্রহ নেই। বর্গ একাই যান। আর এখানে শুরু হয় অতীত-ভ্রমণ। স্বপ্ন আর বাস্তব একাকার হয়ে যায়। শুরু হয় আইজ্যাকের স্মৃতির জার্নি : ‘বাড়ির দিকে যেতে যেতে বুনো স্ট্রবেরি ভর্তি জায়গাটা খুঁজে পেলাম। শৈশবের প্রিয় জায়গাটাকে ফিরে পেলাম। কেমন করে শুরু হয়েছিল জানি না, কিন্তু স্বপ্নের ছবির মতো সবকিছু আবার আমার সামনে ফিরে এলো। দেখলাম আমার জ্যাঠতুতো বোন (যে আবার তাঁর প্রেমিকাও) সারা স্ট্রবেরি কুড়োচ্ছে। … তারপর একটা ছেলে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এলো। সিগফ্রিড, আমার ভাইকে আমি চিনতে পারলাম। অনেক সুখ-দুঃখের সময় আমরা একসঙ্গে কাটিয়েছি। ও খুব কম বয়সে পায়লিটিসে মারা যায়।’ বাস্তবের এক জার্নির মধ্যে এভাবেই শুরু হয় আরেক জার্নি – শৈশবের দিকে যাত্রা, যার অনেকটাই স্বপ্নতাড়িত। এটি অবশ্য দ্বিতীয় স্বপ্ন। চলচ্চিত্রের প্রায় শুরুই আরেকটি স্বপ্নদৃশ্যে। মূলত চব্বিশ ঘণ্টার এক টানা ভ্রমণ এবং চারটি স্বপ্নের ওপরই চলচ্চিত্রটি দাঁড়িয়ে আছে। দ্বিতীয় স্বপ্নটি হারিয়ে যাওয়া ব্যর্থ প্রেমের, প্রথমটি কিন্তু মৃত্যুর। এই স্বপ্নদৃশ্যটাকে চলচ্চিত্রের উপক্রমণিকা বলা যেতে পারে। মেডিসিনের এমেরিটাস অধ্যাপক বর্গ তাঁর আত্মপরিচয় দেওয়ার পরই এই স্বপ্নদৃশ্যে ঢুকে পড়েন। বর্গ জনশূন্য এক শহরের মধ্য দিয়ে চলেছেন। তিনি এসে পড়েন এক দোকানের সামনে। সাইনবোর্ডে এক কাঁটাহীন ঘড়ি আর কাচভাঙা চশমার ছবি। নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বর্গ দেখেন সেখানেও কাঁটা নেই। একজন মানুষকে দেখতে পেয়ে তিনি এগিয়ে কথা বলতে যান; কিন্তু কাছে যেতেই সারা গায়ে দুর্গন্ধময় মানুষটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মানুষটির কোনো মুখ নেই। হঠাৎ একটা ঘোড়ার গাড়ি ছুটে এসে ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা মারে। গাড়ি থেকে রাস্তায় পড়ে একটা কফিন। বর্গ দেখেন কফিনের ভেতর তাঁরই মরদেহ।

প্রথম স্বপ্নে বর্গ প্রত্যক্ষ করেন মৃত্যুকে। মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া বার্গম্যানের প্রিয় বিষয়। আর বার্গম্যানের চলচ্চিত্রটিতে মৃত্যুর প্রসঙ্গ বুঝতে হলে অবশ্যই প্রবেশিকা হিসেবে বেছে নিতে হবে এই বুনো স্ট্রবেরিজকেই। ছিয়াত্তর বছরের প্রফেসর যখন নিজেই নিজের মৃত্যু দর্শন করেন তখন চলচ্চিত্রটির ফিলোসফি কোনদিকে যাবে, দর্শক তা আন্দাজ করার চেষ্টা করলেও তা যে শেষ অবধি মেলে, এমন নয়। এখানেই বার্গম্যানের মুন্শিয়ানা। কেননা দ্বিতীয় স্বপ্নেই তিনি চলে আসেন বর্গের আত্মীয়-পরিম-লে। অতীতের প্রেমের টানাপড়েনে। যদিও সেখানে তিনি নিঃসঙ্গই। এই নিঃসঙ্গতাও তাঁর বিষয়। সারা নামের প্রেমে ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। এই দূর-ভ্রমণে সারাই আবার অন্যরূপে ফিরে আসে। এই জার্নিতে তাঁদের গাড়িতে লিফট নেয় সারা নামে এক মেয়ে। সঙ্গে তার দুই বান্ধব – ভিক্টর ও আন্ডার্স। সারা ভিক্টরের বাগদত্তা। সেই পুরনো দিনই যেন ফিরে এসেছে। বর্গের প্রেমিকা সারারও তো ছিল দুই বান্ধব। বর্গেরই বাগদত্তা ছিল সে; কিন্তু শেষ অবধি বিয়ে করে অন্য বান্ধব সিগফ্রিডকে। সেই অতীত যেন আবার ফিরে এলো। এখানে বার্গম্যান এখনকার সারার ভূমিকায় অভিনয় করান সেই অতীতের সারাকেই। ফলে এক বহুমাত্রিক অভিঘাত তৈরি হয়। বর্গ বর্তমান সারার দুই বন্ধুর মধ্যে একজনের সঙ্গে অনুভব করেন আত্মনৈকট্য। দূর-ভ্রমণে আইজ্যাকের ভ্রমণসঙ্গী হয় চারজন – পুত্রবধূ ম্যারিয়েন, সারা ও তার দুই বন্ধু। পথে আরেক আলমান দম্পতি তাদের গাড়িতে যাত্রায় শামিল হয়। এদের ব্যবহার ও কথাবার্তার মধ্যে বর্গ বারবার তাঁর অতীতকে আবিষ্কার করতে থাকেন। এরই মধ্যে ছিয়ানব্বই বছরের মায়ের কাছে গিয়ে পৌঁছান তিনি। মায়ের নানা অভিযোগ। এরই মধ্যে প্রপৌত্রকে উপহার দেওয়ার জন্য তিনি বর্গের বাবার একটি ঘড়ি বের করেন, যার কোনো কাঁটা নেই। ম্যারিয়েনকে নিয়ে বর্গ পালান সেখান থেকে। গাড়িতে ফিরে দেখেন ঈশ্বরকে নিয়ে দুই বন্ধুর তর্কাতর্কি হাতাহাতির পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা ক্লান্ত।

আর এখানেই আসে তৃতীয় স্বপ্ন। আবার স্ট্রবেরি গাছ। বর্গ আর অতীতের সারা। সারা বলে, সে সিগফ্রিডকে বিয়ে করেছে এবং সারা আরো বলে, বর্গ অধ্যাপক হতে পারে; কিন্তু আদতে সে মহামূর্খ। এদিকে সিগফ্রিডের ছেলে কেঁদে ওঠে। বর্গ দেখে তাঁর ডাক্তারি পরীক্ষার আয়োজন হয়েছে। পরীক্ষা করবে আলমান। সে তাকে একটা উন্মুক্ত জায়গায় নিয়ে যায়। সেখানে এসে হাজির বর্গের বউ কারিন। আবার সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। ব্যভিচারিণী কারিন তার সামনেই তার প্রেমিককে বলে, বর্গ একজন হৃদয়হীন হিমশীতল মানুষ। হঠাৎ সবাই কোথায় ভ্যানিশ! সে আর আলমান। সে আলমানকে জিজ্ঞেস করল, পরীক্ষায়

অকৃতকার্য হওয়ার শাস্তি কী? আলমানের উত্তর, ‘নিঃসঙ্গতা।’

বার্গম্যানের অধিকাংশ চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় রহস্যময়তা নিঃসঙ্গতা। যে নিঃসঙ্গতা থেকেই উঠে আসে আত্মানুসন্ধান। পাপ ও পুণ্যের কথাও জড়িয়ে যায়। ঈশ্বরের অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ক্রমশই তাঁর চলচ্চিত্রের নায়করা চিনতে পারে নিজের আত্মমগ্নতা ও স্বার্থপরতাকে। যেমন ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ চলচ্চিত্রে বর্গ অনুভব করেন যে, জীবনের আদি নীতিটাই তিনি কখনো গ্রহণ করেননি। সেই আদি নীতিটা হলো, মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাস। বরং উলটোটাই অর্জন করে এসেছেন সারাজীবন। স্বার্থপর মানুষের মতো নিজের প্রেমিকার প্রতি থেকেছেন উদাসীন, এমনকি নিজের স্ত্রীকে তীব্র যন্ত্রণা দিয়েছেন, ফলে অকালমৃত্যু হয়েছে তাঁর স্ত্রীর। আর সম্মান-ভ্রমণে কিছু স্বপ্ন-দর্শনের পর তিনি উপলব্ধি করেন এতদিন ধরে কী রকম অন্যায় তিনি করে এসেছেন। এই উপলব্ধি বা অনুশোচনা থেকেই মানবিক উত্তরণ ঘটে প্রফেসর বর্গের। হয়তোবা বার্গম্যানেরও। কেননা তিনি নিজেই বলেন, ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ করার পরই তাঁর মুক্তি ঘটে। বার্গম্যানের ছিল অসুখী শৈশব। তিনি নিজের সম্পর্কে বলেন, ‘আমি ছিলাম বাবা-মায়ের অনাহূত সন্তান। কেননা বাবা-মায়ের বৈবাহিক সম্পর্কটা ছিল নরকসম। বাবার যথেষ্ট সন্দেহ ছিল আমি তাঁর সন্তান কি না?’ নিজের পিতা-মাতা সম্পর্কে এই যে ধারণা ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ চলচ্চিত্র করার পর সে-ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন বার্গম্যান। তিনি জানান, ‘এই ছবি শেষ করার পর আমার বাবা-মা সম্পর্কে ধারণাটা পালটে যায়। তাঁরা আমার কাছে অনেক মানবিক হয়ে ওঠেন। তাঁদের প্রতি ঘৃণাভাবটা আমার মধ্যে আর থাকে না।’ বুনো স্ট্রবেরির অধ্যাপক বর্গের জীবনে চলচ্চিত্রের শেষে এরকম এক উত্তরণ ঘটে। এভাবেই বর্গ এবং বার্গম্যান যেন একই অস্তিত্বের এপিঠ-ওপিঠ হয়ে ওঠেন।

 

তিন

অসুখী শৈশব প্রসঙ্গটা চলচ্চিত্রটিতেও সরাসরি আসে। প্রসঙ্গটা তোলে বর্গের ছেলের বউ ম্যারিয়েন। সন্তানসম্ভবা ম্যারিয়েন জানায়, বর্গের ছেলে ইভাল্ড চায় না তাদের ছেলে পৃথিবীর মুখ দেখুক। ইভাল্ডও তার অসুখী শৈশবের যুক্তি দেখায়। সে বলে, সে হলো এক নরকসম বিবাহের সন্তান। তার বাবা সঠিক জানেন না সে তার সন্তান কি না। ম্যারিয়েন মনে করে, বর্গের প্রতিরূপ হলো ইভাল্ড। এই অভিযোগ অস্বীকার করতে পারেন না বর্গ। যদিও সম্মানজ্ঞাপক অনুষ্ঠান খুব সফলভাবেই অনুষ্ঠিত হয়। তারপরই চতুর্থ এবং শেষ স্বপ্নটা দেখেন বর্গ। আবার সেই স্ট্রবেরি গাছ। সারা এবং তাঁর সব আত্মীয়। সারা জানায়, সে বর্গকে ভালোবাসে।

অধ্যাপক বর্গের ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য তিনি বেছে নেন নির্বাক যুগের এক ধ্রুপদী পরিচালক ভিক্টর সিস্ট্রমকে। অধ্যাপক আইজ্যাকের চরিত্রটা কেমন, সেই সম্পর্কে পরিচালক বার্গম্যান তাঁর ডায়েরিতে লিখছেন, অন্ধকারকে ভেদ করতে পারে তার চাহনি। তিনি সবসময়ই বয়ে চলেছেন অতীত থেকে উঠে আসা নানা

প্রশ্ন-উত্তরের শব। আর সে-সূত্রেই তিনি সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ। সম্মান অভিজ্ঞান নেওয়ার ভ্রমণযাত্রায় তিনি শেষ অবধি এই উপলব্ধিতে পৌঁছান যে, তিনি যদি আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা ত্যাগ না করেন তবে তাঁর আত্মার মৃত্যু হবে।

এই হলেন প্রফেসর বর্গ। তাঁর পুত্রবধূ ম্যারিয়েনের ভাষায়, ‘এক আত্মকেন্দ্রিক বুড়ো। সামাজিক সম্মানের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যে এক আত্মিক সংকটের মধ্যে অতীত ভ্রমণ করে। ঈশ্বরবিহীন এক নিঃসঙ্গতা। এখানে মানবিকতাই প্রধান। বার্গম্যানের বয়ানে এই মানবিকতাকে দেখতে পাই। তিনি বলেন, আমার সবসময় মনে হয় পৃথিবী যেন ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা অশুভের সঙ্গে সমঝোতা করে ক্রমশই নিজেকে অযোগ্য প্রমাণিত করছে। সমাজব্যবস্থার বাহিরে ও ভেতরে সর্বত্রই ব্যর্থতা। কিন্তু দুঃখের বিষয় এটাই যে, এই অবস্থা বদলাবার মতো কোনো ইচ্ছা বা চেষ্টা আমাদের মধ্যে নেই। আমি আর কোনো কল্যাণের চিহ্ন কোথাও খুঁজে পাই না। বিপ্লবের স্বপ্নও শেষ। শুধু কীটসম এক পৃথিবী অপেক্ষায় আছে কবে আমাদের আত্মকেন্দ্রিক অস্তিত্ব ধুয়ে-মুছে যাবে।’

এই আত্মকেন্দ্রিক অস্তিত্বের চলচ্চিত্রটিই বুনো স্ট্রবেরি, যা অন্য অর্থে বার্গম্যানের চলচ্চিত্রের জগতের প্রবেশিকা। বার্গম্যান নিজেই জানান, ‘এই চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য লেখার সময় আমি নিজেকে আমার বাবার জায়গায় স্থাপন করি।’ বার্গম্যানের বর্গ তাঁর পিতারই প্রতিরূপ হয়ে ওঠেন। নিজের আত্মজীবনীতে বার্গম্যান বারবার উল্লেখ করেন ছোটবেলার তাঁর সেই দুর্বিষহ দিনগুলোর কথা। বাবা-মার পরস্পরের মধ্যে নিত্য মারামারি-ঝগড়া। সেসব স্মৃতি তাঁকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেরিয়েছে। চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রভাব ফেলেছে তাঁর অসুখী শৈশব।

স্বপ্ন বার্গম্যানের নানা চলচ্চিত্রেই ছড়িয়ে আছে। চলচ্চিত্রে স্বপ্ন-ভাবনায় বিপ্লব এনেছেন তিনি। বার্গম্যান বলেন, ‘সিনেমায় আমি যেসব স্বপ্নদৃশ্য ব্যবহার করেছি তার অনেকগুলোই আমি নিজে স্বপ্নে দেখেছি। এই স্বপ্নগুলো সেদিক থেকে বাস্তবই।’ বার্গম্যানের চলচ্চিত্রটির স্বপ্ন মানেই জীবনের রহস্যময়তা। আর সেই রহস্যময়তায় নারী এক প্রধান ভূমিকা নেয়। শুধু

নারী-পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা নয়। বরং তাঁদের এই সম্পর্ক সূত্রের মধ্যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও অনুপস্থিত প্রসঙ্গকেও যাচাই করতে চান। আসলে শেষ অবধি সবটাই হয়ে ওঠে তাঁর আত্মবিশ্লেষণ। তাই জন্মের একশ বছর পরেও তিনি সদা আধুনিক। তাঁর চলচ্চিত্রের বিষয় সমসাময়িক। ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ চলচ্চিত্রে বিবি অ্যান্ডারসন হয়েছেন সারা। একবার তিনি প্রফেসর বর্গের প্রেমিকা, পরে আরেক ভূমিকায় তিনিই বর্গের পুত্রবধূ। দুই ভিন্ন চরিত্র। অভিনেত্রী একই। এটাও বার্গম্যানের নারীর রহস্যময়তা নির্মাণে এক মৌলিক দৃষ্টিকোণ। আর এই একবিংশ শতাব্দীর শুরুর সময়, বার্গম্যান একশতে, ঈশ্বরের প্রবেশ-প্রস্থানের অমোঘ সময়ে বার্গম্যান সমীপে ঋণী হওয়ার বিগিনারস গাইড হলো ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ। বুনো স্ট্রবেরি আমাদের মধ্যে পুনঃস্থাপন করতে পারে বিশ্বাস, যা এখন একান্ত কাম্য। অবশ্যই বুনো স্ট্রবেরির শেষ কথা মানবিকতা, যা বার্গম্যান নিয়ে আসেন পরস্পর দুই আপাত বিপরীত স্তরে – স্বপ্ন ও বাস্তবে। যাকে আশ্চর্য এক দক্ষতায় বার্গম্যান মেলান তাঁর চলচ্চিত্রে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: