বৃষ্টিনরোম রেলপথে

লেখক:

সৈয়দ শামসুল হক

রাত খুব বেশি নয়, বড়জোর সাড়ে ৮টা, এ-সময় আকাশভরে তারা থাকবার কথা, কী গোল একটা চাঁদে প্রান্তর ধবধবে আলোয় ভেসে যাবার কথা, কিন্তু দুপুর থেকে ঘন মেঘ। রংপুর থেকে জলেশ্বরী পর্যন্ত আকাশটা থমথমে হয়ে আছে। মাঝে মাঝে ঝড়ো হাওয়া দিচ্ছে আর ছিপছিপিয়ে বৃষ্টি পড়ছে।

আমরা বৃষ্টিমাথায় ট্রেনে উঠেছি রংপুরে। এখন বাড়ির প্রায় কাছে এসে ট্রেন আটকে থমকে আছি কোথায় কে জানে। কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, ট্রেনের ভেতরেও। এ-লাইনে বাতি ছাড়াই ট্রেন চলে। না-বাতিতে আমাদের কোনো অসুবিধা হয় না।

আমাদের জীবনটাই তো অন্ধকার। বিজলির আলো বড় বিলাস। কুপির আলোই উজালা আমাদের জন্যে। জীবন কেন অন্ধকার? আমরা জীবিকার এখনো কোনো উপায় দেখি না। আমাদের বয়স পার হয়ে যায়, সংসার রচনার উপায় নাই, জোগাড় নাই। আমাদের জীবনে প্রেম নাই। আধকোশা নদীতে এখন আষাঢ়কালের উন্মাদ প্লাবনও আর নাই। আমরা প্রতিদিনের ভেতরে বহে যাই যেন নদীর বুকে মরা কাঠ। কিন্তু সত্যি কাঠ তো আর নই! পচা কাঠেও সবুজ শ্যাওলা ধরে। আমরা কয়েক বন্ধু হুল্লোড় করে মাঝে মাঝেই রংপুর যাই সিনেমা দেখতে।

জলেশ্বরী থেকে সকাল ১০টার ট্রেনে দুপুরবেলা ২টায় রংপুর, ৩টায় লক্ষ্মী সিনেমায় দুপুরের শো, সন্ধ্যা ৭টায় ট্রেন ধরে তিস্তা হয়ে জলেশ্বরী। অনেকদিন পরে আজ একটা সিনেমা দেখে আমরা সেই ফিরতি ট্রেনে।

ভোরে দিনটি ছিল উজ্জ্বল ও মেঘহীন। আমরা সিনেমা দেখাকালেই কখন আকাশজুড়ে কালো মেঘ রাজার হাতির পালের মতো নেমেছিল, এখন অঝোর বৃষ্টি। বৃষ্টি যদিও ধরে যায় তিস্তা নদী পার হতে না হতেই, হাওয়া এখনো ভিজে-ভিজে হয়ে আছে।

জংশন থেকে চার ইস্টিশান পরে এগারো মাইলের শেষ মাথায় জলেশ্বরী। আমরা শুনেছি ব্রিটিশ আমলে এখানে ট্রেন চালু করবার কথা যখন পাকা হয়, তখন প্রথম মহাযুদ্ধ কেবল শেষ হয়েছে, সরকারের টাকায় টান, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পুরনো সড়কের ওপরেই লাইনটা বসাতে হয়। তবেই ট্রেনের এই হাল, চলে থেমে থেমে, ঢিকঢিকিয়ে, বর্ষার দিনে অঝোর বৃষ্টিতে নরোম হয়ে পড়া মাটির গতিক বুঝে বুঝে।

জলেশ্বরীর ট্রেনটা আজ চলতে চলতে সিঙ্গারদাবড়ি ছাড়িয়ে রাজারহাট পার হয়ে নবগ্রাম ইস্টিশান ধরবে কী তার আগেই থেমে যায়। রাস্তাটা বোধহয় বৃষ্টিনরোম হয়ে গেছে, এতটাই যে আর চলা যাচ্ছে না। না, তাও বা কেন? আমরা তো দেখেছি বৃষ্টিনরোম রেলপথে গাড়ি একেবারে থেমে থাকে না, ঢিকঢিকিয়ে চলেই চলে। তাহলে কী হলো? আজ থামলো কেন?

ভোঁ বাজায় ড্রাইভার। অন্ধকারটার বুকে যেন গাছের গুঁড়ি আঘাত করে। আমরা মনে করে উঠি সমুখে বুঝি ঘুমটিঘর একটা, ঘুমটিওয়ালাকে ডাকা হচ্ছে কোনো আপদ কারণে। বুঝি না। অনুমানে কুলায় না। আমাদের মনের মধ্যে দুপুরে দেখা সিনেমাটার ছবি এখনো চলছে। আমরা নায়কের বুকে নায়িকার ঢলে পড়ে গান গাওয়াটি ঘুরে-ঘুরে দেখি আর নিঃশ্বাস ফেলি।

অচিরে ট্রেনের বাইরে দু-একজন মানুষের স্বর আমাদের কানে পশে। আমরা জানালা দিয়ে মাথা বের করি। ঘন ছায়ার মতো কয়েকটা লোক হেঁটে যাচ্ছে ট্রেনের সমুখের দিকে। তাদের একজনের হাতে গোল লণ্ঠন। লণ্ঠনটা চলার তালে সামনে-পেছনে দুলছে। আমরা তাকে গার্ড সাহেব বলে শনাক্ত করি। পাশে দু-একজন যারা, যাত্রীই বুঝি। জানালা দিয়ে মাথাটা আমরা ঠেলে বের করে যতদূর দেখা যায় দেখি। গার্ড সাহেব আর তার সঙ্গীরা হাঁটতে-হাঁটতে অন্ধকারের গভীর গহবরে পড়ে যায়। আর তাদের দেখা যায় না। আর তারা ফিরেও আসে না।

আমরা চঞ্চল হয়ে পড়ি, কিন্তু ট্রেন থেকে নামি না। আমাদের এই বগিতে অনেক মানুষ, তবে কেউ দাঁড়িয়ে নাই, সকলেই বসার জায়গা পেয়েছে। অনেক মানুষ মানে কত আর মানুষ? এ-লাইনে যাত্রী বেশি নাই। বগির মানুষ সবাইকে আমরা ভালো করে দেখি নাই। তিস্তায় যখন ট্রেন আসে তখনই রাত, তিস্তায় বাতি নাই, ট্রেনে বাতি নাই, যাত্রীরা যে আমাদের বগিতে ওঠে, তাদেরও ছায়া ভিন্ন শরীর আমরা দেখি নাই।

আমরা থুমো হয়ে বসে থাকি বগির ভেতরে, কাঠের বেঞ্চের ওপরে, অন্ধকারে, শব্দ নাই, আলো নাই, বাইরে বুঝি খাল, সেই খালের কাদায় কি পানিতে একটা ব্যাঙ ডেকে চলে কট্কট্-কট্কট্, আর ঝোপঝাড় থেকে উঠতে থাকে ঝিঁঝি পোকার ডাক, দুই মিলে রাতটিকে আরো ঘন করে তোলে, তেপান্তরে আমাদের অকস্মাৎ থমকে পড়াটিকে ভয়ের রঙে মাখাতে থাকে। আমরা ঈষৎ ভীত হয়েই পড়ি।

বগির আর সকলের মনে ভীতিটা উঠে পড়ে কি, মনে হয় না, তাদের আমরা মৃদুস্বরে গল্প করতে শুনি, তাদের দু-একটা-দু-একটা করে শব্দ ছিটকে এসে আমাদের পাশে জোনাকির মতো উড়তে থাকে। আমরা ভেবে পাই না, এদের মনে কি তবে আতঙ্ক নাই? ট্রেনের এমন থেমে পড়ায় কি উদ্বেগ নাই?

মানুষ তবে এখন উদ্বেগ আর আতঙ্ক সওয়াই হয়ে পড়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এখন প্রায় বারোটা বছর পার, শীতের কনকনে খুনি হাওয়ার ছুরি ধারে মুখ ফালাফালা হয়ে যেতে-যেতে একসময় আর সাড়ই থাকে না, এও বুঝি তেমনই।

অচিরে আরো একটা শব্দ আমরা পাই। ঝিরঝির পানির শব্দ। না, বৃষ্টির নয়। পানি বইছে। তিরতির করে বইছে। যেন আমাদের ওপরে জননীর কুলকুল স্বর এসে পৌঁছোচ্ছে, শিশুকে যেন ঘুম পাড়াতে। কিন্তু না, কতক্ষণ আর নরোম সেই শব্দ, সেই ঘুমপাড়ানির গান, তিরতির শব্দটা ক্রমে পরিণত হতে থাকে গর্জনে। কিংবা খলখল হাসিতে। পানিই যেন অট্টহাসি করছে।

আমরা জানালা দিয়ে মাথাটা আবার ঠেলে বের করে ঘটনা কী বুঝে উঠতে চেষ্টা করি। একজনকে থপথপ পায়ে আসতে দেখি। বৃষ্টিতে সব কাদা হয়ে আছে। ট্রেনের পরেই নাবাল জমি, তার উঁচুতে ট্রেনের গা-ঘেঁষে একফালি পথ, লোকটা এঞ্জিনের দিক থেকে আসছে। আমরা হাঁক দিয়ে তাকে জিগ্যেস করি, গাড়ি আটকাইলে ক্যান? লোকটির পায়ে-পায়ে প্যাচপেচে কাদার শব্দ উঠছে, সে বলে, পুল ভাঙি গেইছে। – কন কি!! আমাদের বগির ভেতরে আর্ত একটা রব ওঠে। লোকটি বলতে-বলতে ট্রেনের পেছন পানে যায়, পুলের বা দোষ কী! যা বিষ্টি!

আমরা গাড়ি থেকে নেমে পুলের হাল সরেজমিনে তদারক করতে যাই। আমাদের মতো আরো অনেকেই নেমে পড়েছে দেখতে পাই। আমরা ট্রেনের এঞ্জিনের দিকে হাঁটতে থাকি। অচিরে অকুস্থলে পৌঁছোই। এঞ্জিনের সার্চলাইটে ভেসে আছে ট্রেনের সমুখ পথ। দেখা যাচ্ছে খালটা। ছোট্ট একটা খাল, হাত তিন-চার চওড়া, তার ওপরে টানা কাঠের পাটি পেতে রেললাইন। না, পুলটা ভাঙে নাই। তবে দুপাড়ের মাটি নরোম হয়ে খসে খসে পড়ছে পানির তোড়ে। খালে তুমুল বেগে পানি ছুটছে। যেন অট্টহাসি করছে।

চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে গার্ড সাহেব, আর পাশের লোকটি বুঝি ড্রাইভারই হবে। তাদের ঘিরে কয়েকজন যাত্রী। আমরাও ভিড়ে যাই তাদের সঙ্গে। শুনতে পাই, লোক পাঠানো হয়েছে পাথর আনতে। পাথর ফেলে পুলের দুপাড়ের মাটি শক্ত না করলে ট্রেন গেলেই পাটি ভেঙে পড়বে। তখন ট্রেন ঠিকই জলেশ্বরী পর্যন্ত যেতে পারবে, কিন্তু ফিরতি যাত্রায় এ-খালের পাড়ে এসে থমকে যাবে।

এমনও কথা ওঠে, ট্রেন এখান থেকে জলেশ্বরী আর যাবে না আজ, যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে তিস্তায় ফিরে যাবে। তৎক্ষণাৎ শোর ওঠে – না, না, তা কী হয়? এগুলা কোন কথা কন!! রাইতের বেলা ধুন্দুমার এই ভূতের শ্মশানে হামাক নামেয়া যাইবেন!

আমরা জিগ্যেস করি, পাথরের কথা যে বলা হলো, এ তল্লাটে পাথর কোথায়? তখন এঞ্জিনের ড্রাইভার উত্তর দেয় আঙুল তুলে ঘোর অন্ধকার পশ্চিমের দিকে দেখিয়ে, বলে, একেবারে কাছেই মুক্তিযুদ্ধে শহীদের স্মরণে একটা আকাশছোঁয়া মিনার তোলার কাজ শুরু হয়েছে, তার ভিতের জন্যে নুড়িপাথর আনা হয়েছে। ড্রাইভার জানায়, মাত্রই এক সপ্তাহ আগে এখানে তাকে ট্রেন অনির্ধারিত থামিয়ে মালগাড়ির ভ্যান থেকে নুড়ির চালান নামিয়ে দিতে হয়।

কিন্তু পাথর আনবে কে? কারা গেছে? কতক্ষণে এসে পৌঁছুবে? গার্ডসাহেব সংক্ষেপে উত্তর দেয়, লোক গেছে। আমরা নিশ্চিন্ত হই শুনে। আমাদের দেশটা এমন যে দরকারের সময় লোক মাটি ফুঁড়ে উঠে আসে। এমন নিশীথ অন্ধকার আর তেপান্তরের মাঠে লোক কোথায় পাওয়া গেল, এমন কোনো প্রশ্নই নয়।

আমরা ফিরে আসি আমাদের বগিতে। আমাদের দেখেই যাত্রীরা জানতে চায় সংবাদ। আমরাও তাদের সংবাদ জানাই। অপেক্ষা করতে হবে। কখন ট্রেন চলবে তার ঠিক নাই। নুড়িপাথরের অপেক্ষা চলছে। মুহূর্তের মধ্যে হতাশার গনগনে গুঞ্জন ওঠে যাত্রীদের ভেতরে। আমরা তাদের আশ্বস্ত করে বলি, ভয় নাই, চিন্তার কিছু নাই, কাছেই মুক্তিযুদ্ধের মিনার উঠছে। মন্ত্রের মতো কাজ হয় এতে। গুঞ্জনটা পলকেই থেমে যায়।

আমরা একটু অবাকই হই – রেলপথের জন্যে নুড়ি চাই আর মিনার উঠছে মুক্তিযুদ্ধের, এ দুয়ের ভেতরে সম্পর্কটা কী, যাত্রীরা কেউ জানতেও চাইলো না। কিন্তু আশার আলো ঠিকই দেখলো! এরকম যদি দেশের আর দশটা ব্যাপারে হতো! তবে কীই-না হতে পারতো।

আমরা ট্রেন ভুলে যাই, বাড়ি ভুলে যাই, এত রাতে বাড়ি ফিরে ভাত পাবো কিনা ভুলে যাই, রেলপথের পানির হঠাৎ তোড় ভুলে যাই। কিছুই আর আমাদের তাড়না করে না। আমরা আমাদের দিন কাল জন্ম আর সময়ব্যাপী গভীর একটা খেদের হাতে আমাদের হৃদয়কে ছেড়ে দিয়ে, অন্ধকার বগির ভেতরে, কাঠের বেঞ্চে ছারপোকাদের চলাচল ব্যাহত করে, কী তাদের ক্রুদ্ধ করেই, কামড় দিতে উত্তেজিত করে, হাঁটুর ভেতরে মাথা গুঁজে বসে থাকি।

রাত বাড়ে। নির্মীয়মাণ মিনার থেকে পাথরের নুড়ি আসে কি আসে নাই, খালের পানির তোড় কমেছে কি কমে নাই, যাত্রীরা তন্দ্রায় ঢুলে পড়েছে কি পড়ে নাই, আমরা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিংবা ঘুমোই নাই। ঘুম আর জাগরণের মধ্যে জগৎ দোলনায় দোল খাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা বাক্য আমাদের কানে আসে – আহ্ হা! বড়টা না, সাইজাটা না, ছুডোটাও না, হাজি সায়েবের ওই মাইজ্যা মাইয়াটারই দিলে যা একটু রহম ছিল!

আমরা জেগে উঠি। চমকেই উঠি বুঝি বা। আমাদের নির্ণয় হয় যাত্রীরা নিজেদের ভেতরে গল্পে যে এতক্ষণ ডুবে আছে, তাদেরই কেউ বাক্যটি উচ্চারণ করে। দীর্ঘ একটা গল্পের শেষে, একটা বাস্তব বিবরণেরই অন্তিমে, বক্তার ওই উপসংহারটি দীর্ঘশ্বাসসহ উঁচু স্বরে উচ্চারিত হয়। গল্পের আর কোনো কথা নয়, কেবল ওই শেষ কথাটিই আমাদের কানে তাই পশে।

বক্তার মুখ আমরা দেখতে পাই না, শ্রোতাদেরও কাউকে নয়, সবাই আমরা অন্ধকারে। জেগে উঠে ওই বাক্যটিই কেবল যে শুনতে পাই তাও নয়, বৃষ্টিরও শব্দ পাই। আবার বৃষ্টি পড়ছে। এই বৃষ্টিতে মিনার থেকে পাথরের নুড়ি কে আনবে কখন আনবে – আমাদের চিন্তাতেই আর থাকে না। আমাদের পুরো জলেশ্বরী এলাকার কত গ্রামগঞ্জহাট আমরা চষে বেরিয়েছি – আমরা তন্নতন্ন করে স্মৃতির স্তূপের ভেতরে এক হাজি সাহেবকে খুঁজতে থাকি, যার মেজো মেয়ের প্রাণে কিছু করুণা ছিল, দয়ামায়া ছিল।

না, পাই না। এমন কোনো হাজি আমাদের মনে পড়ে না, যার চার মেয়ে। তবে কি এরা ভিনদেশের কোনো হাজির কথা বলেছে? কী হয়েছিল সেই হাজির? এমন কোন কঠিন ঘটনায় তাকে পড়তে হয়েছিল যে, তার দরকার হয়ে পড়েছিল কারো – যে দয়া তাকে করবে, মায়া দিয়ে তাকে উদ্ধার করবে?

এটাও আমাদের কাঁদিয়ে তোলে – আহ্ হা! নিজের সন্তান – বড় মেয়ে-ছোট মেয়ে-সেজো মেয়ে, সবাই তাদের বাবার বিরুদ্ধে ছিল? শুধু ওই মেজো মেয়েটাই, ওই একজনাই? আমাদের চোখ ভিজে আসে। আমাদের একজন বলে, মনে নাই? বঙ্গবন্ধু খুন হওয়ার পরে জলেশ্বরীতে কাঁইও কান্দে নাই, ক্যাবল একঝন ছাড়া? সেই যুবকটির কথা আমাদের মনে পড়ে। হাজি সাহেবের মেজো মেয়েটির মুখ আমরা যে যার মতো মনের ভেতরে এঁকে লই।

হঠাৎ উচ্চৈঃস্বরে কেঁদে ওঠে কেউ। না, এ বগিতে নয়, বাইরে কোথাও, কি অন্য কোনো বগি থেকে কান্নাটা রাতের অন্ধকার আর আমাদের স্তব্ধতাকে আছড়ে দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এ কান্না রমণীর কি পুরুষের? কান্নার শব্দ শুনে নারী-পুরুষ চট করে ঠাহর করা যায় না, আশ্চর্য এই যে, হাসির শব্দে তা পারা যায়। সংকেতের কি পরিহাসই বটে!

আমরা এখন হাসির ভেতরে আদৌ নেই, রংপুরে দেখা সিনেমাটাও আমরা কখন ভুলে গেছি, আর আমাদের ভেতরটাও এখন বেশ করুণ সজল, আমরা কান্নাটাকে ঠাহর করতে থাকি। আমরা কেউ কেউ নেমেও পড়ি বগি থেকে। কান্না ক্রমেই আকাশ-বাতাস ছাপিয়ে ওঠে। এমন কান্না কেবল কোনো মৃত্যু ঘটনাই আমাদের দিতে পারে। বিলাপের সেই কান্নায় হাজি সাহেবের ঘটনা কথকদের স্বরও ডুবে যায়, তারা নিশ্চুপ হয়ে যায়। পৃথিবীর প্রতিটি বিলাপই শিকড়ে এক, একই মৃত্যু – তা শরীরেরই কি হৃদয়রেই বা – এই সত্য তারা দেখে ওঠে হয়তো।

যারা ঘটনা জানতে নেমে গিয়েছিল তারা ফিরে আসে বগিতে। বগির হ্যান্ডেল ধরে লাফিয়ে ভেতরে উঠতে গিয়ে কোথাও ব্যথা পেয়ে, কি পা মচকেই তারা বেদনার আর্তশব্দ করে ওঠে কি যে সংবাদ তারা বহন করে আনে তারই কারণে কিনা, কিংবা দুই-ই। তারা জানায়, একটা লাশ! ঢাকায় মিছিল হয়, গুলি হয়, মারা যায়। যুয়ান ব্যাটার লাশ। বাপ-চাচা আর বন্ধুরা নিয়া যাইচ্ছে দ্যাশের মাটিতে মাটি দিতে।

কান্দে কাঁই? আর কাঁই! বাপ কান্দে ভাই কান্দে চাচা কান্দে বন্ধু কান্দে। মাটি দিতে বিলম্ব হয়া যায় বলিয়া কান্দে। দ্যাশে শকুনেরই রাজত্ব দেখিয়া কান্দে। কান্দন দেখিয়া চোখের পানি না ধরি রাখা যায়, অচিন আর সকলেও কান্দে। ডুকরি-ডুকরি কান্দে। দেখি আসিলোম।

আমরা বুকের ভেতরে হা-হা শুনে উঠি, শোকের নয়, বিলাপের নয়, সত্যের, এই সত্যের যে মানুষ এখনো কাঁদে, বন্ধু এখনো কাঁদে, অচিন মানুষও মানুষের জন্যে কাঁদে।

ঠিক তখনই ওঠে সুরের লহর, ট্রেনের বিপরীত দিক থেকে হঠাৎ শোনা যায় গান। কে একজন গাইতে গাইতে মাঠ ভেঙে আসছে – ও মোর কালারে কালা! এই অন্ধকার রাতে, এই বৃষ্টির বর্ষণে, এই অজানা প্রান্তরে কে গায়? সে কি পানিতে ভেজে নাই? গোক্ষুর সাপের ভয়ে পথ চলা ছাড়ে নাই? কোথা থেকে আসছে, কোথায় বা যাচ্ছে সে?

আমরাই কি জানি কোথায় আমরা যাচ্ছি? গায়কটিও বোধহয় জানে না। গান গাইতে-গাইতে সে পুরো ট্রেনটার পাশ দিয়ে হাঁটে, হাঁটতে-হাঁটতে ট্রেনের গায়ে থাপড় মারতে মারতে তাল ঠোকে, আবার ফিরে হাঁটে এ-মাথা থেকে ও-মাথা। ও মোর কালারে কালা!

তারপর বৃষ্টি আর বৃষ্টি। অঝোর বৃষ্টি। নূহ নবীর চল্লিশ দিনের বৃষ্টির মতো ভুবন ডোবানো বৃষ্টি শুরু হয়। গান ডুবে যায়, কান্না ডুবে যায়, স্বর ডুবে যায়, অপেক্ষাও ডুবে যায় মানুষ সকলের। তারপর নড়ে ওঠে ভুবন। নড়ে ওঠে ট্রেন। ট্রেন চলতে শুরু করে।

ট্রেনের ভোঁ বাজতে থাকে ঘনঘন। আমরা কল্পনা করে উঠি, এই যে ভোঁ – হাজি সাহেবের সেই মেজো মেয়েটার জন্যে – বেটি, তোর বেহেশত নসিব হোক। সেই লাশটার জন্যে বলছে – শকুনের দিন চলে যাক। আর রেলপথের পুলটাকে বলছে, ভেঙে পড়ার ভয় থাকলেও তোমারই ওপর দিয়ে এই দ্যাখো আমি যাচ্ছি।