বৃহৎ বিশ্বে রবীন্দ্র-পদচিহ্ন

লেখক: মার্টিন কেম্পশেন

অনুবাদ : জয়কৃষ্ণ কয়াল

গত বছর গিয়েছিলাম স্কটল্যান্ডে, বিউট আইলের (Isle of Bute) উপকূল বরাবর এক বন্ধুর সঙ্গে সাইকেল চেপে ঘুরছিলাম। তখন ঢুকে পড়েছিলাম রাস্তা-লাগোয়া যেসব প্রাসাদোপম বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, তার একটার বাগানে। রঙের বৈচিত্র্যে ভরভরন্ত সে একটা বিশাল বাগান। ফুলের ঝোপ, গাছগাছালি আর আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে রুচিসম্মতভাবে সাজানো। বাগানের মাঝখানে দেখলাম একটা ফার্ন হাউজ, ক্রান্তীয় অঞ্চলের ফার্নসম্ভারে সমৃদ্ধ। ফুলের জমিতে এক জায়গায় খাড়া করা কবিতা উৎকীর্ণ ছোট একটা প্রস্তরফলক। দেখে অবাক লাগল, কবিতাটা জার্মান ভাষায় : ÔNarren hasten/ Dumme warten/ Kluge gehen in den GartenÕ নিচে কবির নাম দেওয়া আছে ÔR. T.Õ, স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে। নামটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। কবিতাটার ইংরেজি তর্জমা দাঁড়ায় : ÔFools make haste/ the stupid wait/ the wise go into the garden ।’ (মূর্খেরা সংকোচ করে/ নির্বোধেরা অপেক্ষা করে/ বিজ্ঞেরা বাগানের ভিতরে ঢোকে)।

একটু ভেবে দেখা যাক এই সামান্য আবিষ্কারটির তাৎপর্য বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে কী হতে পারে। আমরা আছি স্কটল্যান্ড দ্বীপে, আচমকা একটা বাগানে ঢুকে রবীন্দ্রনাথের একটা জার্মান কবিতা পড়লাম। তাঁর নামটা দেওয়া শুধু আদ্যাক্ষরে। প্রথমত, বাগানে আসা কজন অতিথি জার্মান জানবেন? দ্বিতীয়ত, সেই অল্পদের মধ্যে কতজন কবির নামটা শনাক্ত করতে পারবেন? তা সত্ত্বেও তা আছে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা জার্মান অনুবাদে স্কটল্যান্ডের উদ্যানভূমিতে খাড়া করে রাখা হয়েছে।

বাগান এবং তার পুরো চৌহদ্দি যেহেতু সুপরিকল্পিত, কোথাও কোনো অসংগতি প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি, ভাবতে বাধ্য হলাম যে, এই ছোট্ট প্রস্তরফলকটিরও নিজস্ব তাৎপর্য আছে। জার্মান ভাষ্যটির কোনো প্রামাণ্য উৎস মিলবে বলে মনে হয় না। রবীন্দ্রনাথের আদিপর্বে কোনো জার্মান অনুবাদে এটা দেখিনি। এমনকি, ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কারের পর কবি নিজে ইংরেজিতে যে অসংখ্য অনুবাদ করেছিলেন, তার মধ্যেও এর ইংরেজি ভাষ্য আমি খুঁজে পাইনি। ওই বছর থেকে শুরু করে পরের বছরগুলোয় রবীন্দ্রনাথের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ আন্তর্জাতিক বইবাজারে আসতে শুরু করে।

জার্মান এই ত্রিপদীটি বহুবার আমি উদ্ধৃত হতে দেখেছি ক্যালেন্ডারে, পোস্টকার্ডে, বইয়ে, অনেক প্রকাশ্য স্থানে, যেমন এই বাগানে এবং আরো সব বিস্ময়কর জায়গায়। সোজাসাপটা ইংরেজি অনুবাদের যে-চেষ্টা ওপরে করেছি : ÔFools make haste/ the stupid wait/ the wise go into the gardenÕ, তাতে আসল মানেটা এসেছে। কিন্তু কবিতা হিসেবে তা খটমটে আর নিষ্প্রাণ। জার্মান ভাষ্যটি কিন্তু একেবারে ঠিকঠাক। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় চরণে অন্ত্যমিল। প্রথমে দুটো ছোট চরণ, তারপর একটা অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ, ওজনদার চরণ, বলা যায় মোক্ষম চরণ punch line)। জার্মান বিশেষ নাম ÔDummeÕ এবং ÔKlugeÕ- এর ইংরেজি ভাষান্তর সম্ভব শুধু বিশেষণকে নাম বিশেষণে রূপান্তর করে : Ôthe stupidÕ, Ôthe wise’. ইংরেজিতে এ-ধরনের প্রয়োগ অসিদ্ধ। কিছুটা মেরামত করা যেতে পারে Ôwise men’ লিখে। কিন্তু Ôthe stupidÕ -এর কী হবে…?

তিন লাইনের এ-কবিতাটা নিয়ে এত কথা বললাম একটা কথা বলার জন্য : রবীন্দ্রনাথের ভাবনার কক্ষপথ, সে-কবিতাতে ব্যক্ত হোক বা যুক্তিবদ্ধ ভাষায় প্রবন্ধ বা বক্তৃতাতেই প্রকাশিত হোক, কিছুটা উচ্চাতীত স্তরে (Meta-level) পৌঁছে গেছে। তা যেন ভাষা ও ভূগোলের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে চায়। তাঁর নোবেল সম্মাননার একশ বছর পরে কিছু প্রতীক বা বচন তথা কিছু মৌলিক ধারণা রবীন্দ্রনাথের নামে চলছে। সেগুলো রবীন্দ্রনাথের বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে, প্রামাণ্য উৎস থাক বা না থাক। তাঁর রচনাবলিতে কোনো উদ্ধৃতি যাচাই করা সম্ভব না হলে ধরে নেওয়া হচ্ছে তা ‘রাবীন্দ্রিক’।

 

বাংলামূল নতুন ভাষান্তর

দ্বিতীয় একটা প্রসঙ্গে আসা যাক, বিষয়টা উলটো মনে হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বব্যাপী সংবর্ধনায় আমরা এখন এক ছকভাঙা পরিবর্তনের মুখোমুখি। এই পরিবর্তন এসেছে মূল বাংলা থেকে নতুন ভাষান্তরের ফলে, বিশেষ করে তাঁর কবিতার। মূল বাংলা থেকে তুলনীয় মানের, অর্থাৎ ভাষাগতভাবে শুদ্ধ আর একই সঙ্গে সাহিত্যমানে উপযুক্ত, অনুবাদের ফলে রবীন্দ্র-সংবর্ধনার ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে, ইতোমধ্যে তার কিছু প্রমাণ মিলেছে। ধরা যাক রবীন্দ্রনাথের কবিতার দিকদর্শী ইংরেজি অনুবাদ উইলিয়াম রাদিচের (William Radice) ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : নির্বাচিত কবিতা’র (Rabindranath Tagore : ÔSelected Poems’, Penguin 1985) কথা। বইটির ব্রিটিশ ও ভারতীয় উভয় সংস্করণের অনেকগুলো পুনর্মুদ্রণ হয়েছে। মূল বাংলা থেকে উইলিয়াম রাদিচে বিশুদ্ধ ইংরেজি কবিতা নির্মাণ করেছেন। যথাসম্ভব মূলের নৈকট্য বজায় রেখে, ছন্দ ও অন্ত্যমিলসহ তিনি কবিতাগুলোর কাব্যায়ন ঘটিয়েছেন। যেসব ইঙ্গিত বা অর্থস্তর তিনি অনুবাদে ধরতে পারেননি, শেষের টীকায় তা ব্যাখ্যা করেছেন।

এ বইটি মানুষের যে-পরিমাণ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তা রবীন্দ্র-কবিতার অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের, কম উপযুক্ত অন্য কোনো ইংরেজি অনুবাদ পায়নি। একাধিক অনুবাদগ্রন্থ আছে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে এবং কানাডাতেও। কিন্তু মানুষের মনোযোগ গেছে মোটে আর দুটো অনুরূপ প্রামাণ্য অনুবাদ প্রয়াসের দিকে। কেতকী কুশারী ডাইসনের যেতে নাহি দিব (I Won’t Let You Go) আর সুকান্ত চৌধুরী-সম্পাদিত তাঁর অক্সফোর্ড রবীন্দ্র-অনুবাদমালার নির্বাচিত কবিতা (Selected Poems)।

উইলিয়াম রাদিচের অনুবাদ কবিতার দ্বিতীয় প্রাপ্তি, কবিতা থেকে তা দৃশ্যশিল্পের বিভিন্ন শাখায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর অনূদিত কাহিনি-কবিতা ‘দেবতার গ্রাস’ (ÔSnatched by the GodsÕ) নিয়ে পাশ্চাত্যরীতির পালাগান তৈরি করেছেন ভারতীয় সংগীতকার পরম বীর। প্রধানত ইউরোপীয় শিল্পী-সমন্বয়ে তা মঞ্চস্থ হয়েছে আমস্টারডাম, মিউনিখ, লন্ডন, গ্লাসগো, এডিনবরা, ভিয়েনা, অ্যান্টওয়ার্প, রৌয়েন এবং রোটেরডামে। পালার ভাষ্য লিখেছেন উইলিয়াম রাদিচে নিজে এবং তা ইংরেজি, ডাচ ও জার্মান ভাষায় পুস্তিকাকারে দেওয়া হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের এই পালাটির প্রযোজনা করেছেন ইউরোপের নেতৃস্থানীয় সংগীতকার হান্স ওয়ের্নার হেঞ্জে (Hans Werner Henze)। বাংলা কাহিনি-কবিতাটির যদি উপযুক্ত ইংরেজি অনুবাদ না থাকত তাহলে এত বড় একটা ঘটনা সম্ভব হতো না। ভালো অনুবাদ অন্য সৃজনমূলক ক্ষেত্রেও উৎসাহিত করতে পারে। সত্যি বলতে কী, আমরা ভুলেই যাই যে, তা অনুবাদ।

আর একটা উদাহরণ রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী প্রেমের কবিতা ‘অনন্ত প্রেমে’র অসাধারণ ইংরেজি তর্জমা। বিগত কয়েক দশকে চার-পাঁচবার এটির সংগীতালেখ্য পরিবেশিত হয়েছে। অনুবাদক উইলিয়াম রাদিচে আমাকে জানিয়েছেন, কবিতার এই সাংগীতিক রূপটি বিভিন্ন ইংরেজিভাষী অঞ্চলে যথেষ্ট সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহৃত হচ্ছে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা উপলক্ষে : বিয়ের সময় আর মৃত্যুবাসরে।

বিভিন্ন নান্দনিক অভিব্যক্তির সীমানা-অতিক্রমী রবীন্দ্র-কবিতার এই বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটতে চলেছে আমার অনুবাদ করা কয়েকটা কবিতার ক্ষেত্রেও। আগামী ৪ অক্টোবর জার্মানির ম্যুনস্টেরে দেখা যাবে রবীন্দ্রনাথের চারটি প্রেমের কবিতার সংগীতালেখ্যর উদ্বোধনী উপস্থাপনা। স্ত্রীকণ্ঠের পরিবর্তে তাতে সেলো আর পিয়ানোসহযোগে সুর সংযোজন করেছেন একালের এক জার্মান সুরকার মাথিয়াস বনিচ্চ (Matthias Bonitz)। নতুন গানগুলোর মধ্যে আছে আমার অনূদিত ‘অনন্ত প্রেম’।

রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই তাঁর গানের মঞ্চ উপস্থাপন হয়েছে নৃত্যের মাধ্যমে। রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যের কথা বলছি না, সেগুলো বহুবিচিত্র গানের সমন্বয়ে পরিবেশিত। কবির বড়দাদার নাতবউ শ্রীমতী ঠাকুরকে কবি উৎসাহিত করেছেন নাচের মাধ্যমে তাঁর গান বা কবিতার অন্তর্নিহিত ভাব ব্যক্ত করতে। এই অনুশীলনের চল শান্তিনিকেতনে এখন বিরল। কিন্তু যুগপৎ নাচ ও গানের এই অনুষ্ঠান আমি ইংল্যান্ডে দেখেছি। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে নৃত্যশিল্পী এবং  নৃত্যপরিচালক, বিখ্যাত শংকর পরিবারের তনুশ্রী শংকর, তাঁর দলের পুরুষ ও মহিলা শিল্পীদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘শিশু’ কবিতার অপূর্ব নৃত্যরূপ পরিবেশন করেছেন কলকাতার ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন্সের প্রেক্ষামঞ্চে। বিখ্যাত ‘আভে মারিয়া’ গানটিকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন আবহসংগীত হিসেবে। দেহবিভঙ্গের মাধ্যমে তাঁর নৃত্যশিল্পীদের তিনি ক্রমান্বয়ে সঞ্চালিত করেছেন সান্নিধ্য ও মিলন এবং বিরহ ও বিচ্ছিন্নতায়। তাতে কবিতার ব্যঞ্জনায় একটা নতুন দ্যোতনা সৃষ্টি হয়েছে। যে-শক্তি স্বর্গীয় শিশুর জন্ম সূচিত করে, এই সেই মহাজাগতিক সৃজনশক্তির বন্দনা।

 

রঙ্গমঞ্চ : পরীক্ষা-নিরীক্ষার খেলাঘর

আন্তঃসাংস্কৃতিক তথা অন্তর্মাধ্যম ক্রিয়াকর্মের পক্ষে রঙ্গমঞ্চই সম্ভবত সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র। এটি নমনীয়, স্বতঃস্ফূর্ত, এমনকি অসীম সম্ভাবনাময় একটা শিল্পশৈলী। একমাত্র নাটকই পারে পরীক্ষামূলকভাবে অন্য প্রায় সমস্ত শিল্পমাধ্যমকে অঙ্গীভূত করতে, পারে সফল করে তুলতে। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যগুলো উল্লেখযোগ্য। ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মাঝের দিনগুলোয় বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের সৃজনমূলক সংমিশ্রণ একটা বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল। অংশত সরকারি অর্থানুকূল্যে সে-সময় অসংখ্য আন্তঃসাংস্কৃতিক এবং আন্তঃভাষিক নাটক রূপায়িত হয়েছে ভারত তথা বহির্বিশ্বে। দু-দশক আগে, সেই তখনই রঙ্গমঞ্চ পরীক্ষা-নিরীক্ষার খেলাঘর হয়ে উঠেছিল। কাহিনি-কবিতানির্ভর পরম বীরের দেবতার গ্রাস পালার কথা আগে বলেছি। আর একটা উদাহরণ আমার করা রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর নাটকের জার্মান অনুবাদ। জনৈক জার্মান পরিচালক জার্মান কলাকুশলীদের নিয়ে নাটকটি সুইজারল্যান্ডে মঞ্চস্থ করেছিলেন। কিছুটা ছকভাঙা এ-প্রযোজনা এবং সেই কারণে রীতিগতভাবে ‘অভারতীয়’। কোনো মঞ্চোপকরণ ছিল না বললেই চলে। অভিনেতাদের চলাফেরা বাঁধা ছিল প্রতীকী কিছু শরীরী মুদ্রায়। অন্যভাবে বললে, স্বর্গীয় দূতের বয়ে আনা মৃত্যুতে শান্তি পেল যে অসুস্থ কিশোর অমল, তার কাহিনি বিশ্বজনীন করে তুলেছে এ-প্রযোজনা। পরে কলকাতার ম্যাক্সম্যুলার ভবন বাঙালি কলাকুশলীদের নিয়ে বাংলায় ডাকঘর রূপায়ণের জন্য এক জার্মান পরিচালককে আমন্ত্রণ করেন। তা এমনই সাফল্য লাভ করে যে, একশ দুবার নাটকটির অভিনয় হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহরের বস্তিশিশুরা ডাকঘর মঞ্চস্থ করেছিল। নাটক পরিচালনা করেছিলেন একটি অনাথ আশ্রমের মালিক ইয়ানুস করচ্চাক। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নাটকটির মাধ্যমে তাঁর অনাথ আশ্রমের শিশুদের বন্দিশিবিরে মৃত্যুবরণের জন্য প্রস্তুত করা। একইভাবে আমার জার্মান অনুবাদ মঞ্চস্থ করেছে সুইজারল্যান্ডের একটি প্রতিবন্ধী স্কুলের শিশুরা। কয়েক শিশু অভিনয় করেছে হুইলচেয়ারে বসে। পরে আমার অনুবাদটি পুতুলনাচের পালা হিসেবে ব্যবহার করেছে তদানীন্তন পূর্ব জার্মানির মাগডেবুর্গ মিউনিসিপ্যাল থিয়েটার। দেখা যাচ্ছে, এ এমন একটা নাটক, যা বিভিন্ন সামাজিক প্রতিবেশে চলছে, অভিনয়ের বিভিন্ন আঙ্গিকে রূপ নিচ্ছে এবং তা বহুবিধ তাৎপর্য ধারণ করছে। আমরা প্রত্যক্ষ করছি, সারাবিশ্বে সবচেয়ে সফলভাবে অভিনন্দিত হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের কীর্তি।

 

শব্দের ক্ষমতা

সাধারণ একটা বাক্যবন্ধ, ছোট্ট একটা কবিতা কারো জীবন বদলে দিতে পারে। কয়েক বছর আগে জার্মানির একটা মনোরোগ চিকিৎসাকেন্দ্রের একজন নৈশপ্রহরী আমাকে তাই লিখেছিলেন। ইবুকি, যে-নামে তিনি তাঁর পরিচয় দিয়েছিলেন, জানিয়েছিলেন যে, একাধিক সংকটে তাঁর জীবন বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছিল। তিনি বেঁচে গেলেন দুটো জিনিসের জন্য : সংগীত – ইবুকি গিটার বাজাতেন এবং তাঁর রোগীদের তা শোনাতেন এবং রবীন্দ্রনাথের একটা ছোট্ট কবিতা, যা তাঁর মর্মে জেগে থেকে তাঁকে বাঁচায় মদদ দিয়েছে। রূপক হিসেবে তিনি কবিতাটা নিজের জীবনের ঘটনার সঙ্গে মেলাতে পেরেছেন এবং তাতে মুক্তির প্রত্যয় খুঁজে পেয়েছেন।

আধুনিক চেতনাতেও রবীন্দ্রনাথ কতটা সক্রিয় তার আর একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। কয়েক মাস আগে আমেরিকার এক তরুণ ইহুদি লেখিকার কাছ থেকে একটা চিঠি পেয়েছি। তিনি জানিয়েছেন, জার্মান ইহুদি আলেক্স আরনসনকে নিয়ে আমার লেখা নিবন্ধটি তিনি পড়েছেন। নাৎসি জার্মানি থেকে উৎখাত হয়ে আরনসন এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে। লেখিকা আলেক্স আরনসনের আত্মজীবনীও পড়েছেন। এই উভয় উৎস তিনি ব্যবহার করেছেন তাঁর সম্ভাব্য সুন্দর (The Beautiful Possible, New Yark 2016) উপন্যাসে। আলেক্স আরনসনের মতো একই পথপরিক্রমা করেছেন উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র ওয়ালটার। তিনি নাৎসি জার্মানি থেকে পালিয়ে শান্তিনিকেতন আশ্রমে এসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর্যন্ত কাটিয়েছেন।

অ্যামি গোটলিবের (অসু এড়ঃঃষরবন) শক্তিশালী তথা রুদ্ধশ্বাস উপন্যাসটি রবীন্দ্র-রচনার উল্লেখে পরিপূর্ণ – মানুষ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর অসংখ্য কবিতা ও সুবচন তাঁর কাছে যেভাবে প্রতিভাত, সেইভাবে। এসব উদ্ধৃতি আর রচনা গ্রন্থিত হয়েছে একালের এক ইহুদি পরিবারের কাহিনিসূত্রে, আমেরিকার পূর্ব উপকূলে পরিবারটি অস্তিত্বরক্ষার জন্য লড়াই করছিল। এই পরিবেশেও রবীন্দ্রনাথ প্রামাণ্য জায়গা করে নিয়েছেন।

আবারো বলব, ভারতের জাতীয় কবির এই বিশ্বব্যাপ্ত খ্যাতি নির্ভর করছে বাংলামূল উপযুক্ত অনুবাদের ওপর। ইমরে বাঙ্ঘার (Imre Bangha) সঙ্গে সম্পাদিত আমাদের ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর : বিশ্ব সংবর্ধনার শতবর্ষ’ (Rabindranath Tagore : One Hunndred years of Global Reception, New Delhi 2014) বইটির অন্যতম বিস্ময়কর একটা পর্যবেক্ষণ হলো, কয়েকটি দেশ বা ভাষাবলয়, আজ যদিও তা মুষ্টিমেয়, কীভাবে বাংলা থেকে রবীন্দ্রনাথের রচনা অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছে, বিশেষ করে তাঁর কবিতা। ২০১০-১৪ সাল পর্যন্ত সারাবিশ্বে রবীন্দ্রনাথের ওপর আলোচনাচক্র, বক্তৃতা ও প্রদর্শনী চলেছে। ভারতে তথা বাইরের দেশের মুখ্য শহরগুলোয় রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। এসব কর্মসূচির উদ্যোক্তা এবং অর্থের জোগানদার ছিল ভারত সরকারের বিভিন্ন দফতর। উপলক্ষ কবির ১৫০তম জন্মবার্ষিক উদ্যাপন আর তাঁর নোবেল পুরস্কার ও গীতাঞ্জলি প্রকাশের স্মরণোৎসব।

এটা পরিষ্কার যে, সারাবিশ্বের পাঠক-চৈতন্যের ওপর এ-ঘটনাবলির প্রভাব পরিমাপ করা সহজ নয়। অবশ্যই তা বহুলাংশে অদৃশ্য বা অব্যক্ত থেকে যাবে। পরিমাণ নির্ধারণের দরকারও নেই। কোনো জাতীয় কবিকে নিয়ে এই যে ব্যাপক এবং স্মরণীয় জনসংযোগের অনুশীলন, তার মূল্যায়ন বা ‘ফল’ নিয়ে ভাবার সময় হয়তো এখনো আসেনি। কিছু মাপকাঠি তবু অবশ্যই আছে, তা নিয়ে অনুসন্ধান করা যেতে পারে, অনুসন্ধান করা উচিত। তেমন একটা মাপকাঠি হবে : বাংলা রচনা থেকে নতুন অনুবাদে কতগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে? পৃথিবীর যেখানে যেখানে বাংলা শেখানো সম্ভব, সেখানে কি তা শেখার ধুম লেগেছে? কোথায়

কোথায় প্রকৃত উদ্ভাবনীমূলক কাজকর্ম বা অনুষ্ঠান হয়েছে, সেগুলোর প্রকৃতি ঠিক কেমন? সেসব কাজের কোনো তথ্য (দৃশ্য বা শ্রাব্য বিবরণী) আছে কি না?

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, জার্মানিতে, স্টুটগার্টের কাছে মারবাকে জার্মান সাহিত্যচর্চার মূল কেন্দ্র, জার্মান সাহিত্যবিষয়ক সংরক্ষণাগারে (Deutsches Literaturarchiv) এই প্রথম আমরা রবীন্দ্রনাথের ওপর আলোচনাচক্রের ব্যবস্থা করতে পেরেছি। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে জার্মান ভাষায় আলোচনা এই প্রথম। রবীন্দ্রনাথের রচনার চারজন অনুবাদক অংশ নিয়েছিলেন তাতে। দুদিনের এই আলোচনাচক্রে প্রথমদিন সন্ধ্যায় স্টুটগার্ট সংগীত আকাদেমির একদল ছাত্র উপস্থাপন করেছিল একটি সংগীতালেখ্য, রবীন্দ্রনাথের রচনা ব্যবহার করে আলেখ্যটি রচনা করেছিলেন ইউরোপীয় সুরকারেরা। রবীন্দ্রনাথের রচনাংশ নেওয়া হয়েছিল পুরনো জার্মান অনুবাদ থেকে, তা সত্ত্বেও এসব রচনার অধিকাংশই কয়েক দশক কোনো অনুষ্ঠানে সত্যিই পেশ করা হয়নি। সুতরাং লেখাগুলো সত্যি সত্যিই নতুন আবিষ্কার বলা চলে।

ভারতের কোনো গবেষণা সংস্থা যদি ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং এশিয়া থেকে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এসব ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সংগ্রহ করে এবং তা একসঙ্গে একটা বইয়ে প্রকাশ করে, তাহলে সত্যিই একটা গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কাজ হবে।

যে-উৎসাহ আর উদ্দেশ্য নিয়ে বিশ্বব্যাপী এই রবীন্দ্র-আবাহন, তা স্পষ্টতর দিশা পাবে এবং একই সঙ্গে তা দিশা দেবে ভবিষ্যতের কোনো উদ্যোগের।

Leave a Reply

%d bloggers like this: