চলে গেলেন আলী আনোয়ার

লেখক:

হাসান ফেরদৌস

তাঁর যাবার সময় হয়েছে, এ-কথা তিনি বিলক্ষণ টের পেয়েছিলেন। মনে মনে পূর্ণ প্রস্তুতিও ছিল। বিদেশে নয়, দেশের মাটিতে মৃত্যু হোক, এই ছিল তাঁর ইচ্ছা। ছেলেমেয়েদের সে-কথা জানিয়েছিলেন। স্ত্রী হোসনে আরাকেও পইপই করে সে-কথা বলেছিলেন। রোগশয্যায় আর এক মুহূর্ত থাকতেও তাঁর মনে চাইছিল না।
সেই দেশে ফিরলেন বটে, কিন্তু লাশ হয়ে।
সোমবার, ৩ মার্চ, নিউইয়র্কে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অধ্যাপক আলী আনোয়ার। সেদিন ছিল তার ৮০তম জন্মদিন। দীর্ঘদিন থেকেই দুরারোগ্য লিভার সিরোসিসে ভুগছিলেন। গত ছয় মাস কার্যত একবার হাসপাতাল, একবার ঘর অথবা নিরাময় কেন্দ্র, এই করে তাঁর দিন গেছে। লিভারের কার্যক্ষমতা অনেক আগে থেকেই বিকল হয়ে আসছিল। শেষ এক সপ্তাহ একদম কিছুই মুখে দিতে পারেননি। শুধু ইন্টারভেনাস পদ্ধতিতে বিন্দু বিন্দু জল খাইয়ে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল।
মৃত্যুর চার-পাঁচ দিন আগে তাঁকে সচেতন অবস্থায় শেষবারের মতো দেখি। দেখে চিনতে পারলেন, কাছে ডেকে কিছু একটা বলতেও চাইলেন। স্ত্রীকে চোখের ইশারায় বললেন, ‘এদের চা খেতে দিয়েছ তো?’ অতিথি কাউকে দেখলেই যে আলী আনোয়ার কিছু একটা খাওয়ার কথা বলবেন, সে-কথা ভাবির আগে থেকেই জানা। ফলে বিস্কুট, খোরমা ও বাদামের ব্যবস্থা ছিল। তাঁকে দেখানোর জন্য কিছু একটা খাওয়ার ভান করতে হলো। রাত করে ফেরার সময় হাত তুললেন বিদায় জানাতে, মুখে বুঝিবা ক্লান্ত স্মিত হাসি।
‘পারফেক্ট জেন্টলম্যান’ বলতে যা বোঝায়, আনোয়ার ভাই তা-ই ছিলেন। মিতভাষী, নিজে বলার চাইতে অন্যের কথা শুনতে ভালোবাসতেন। আজীবন অধ্যাপনা করেছেন ইংরেজি সাহিত্যের, ১৯৬২ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত Ñ একটানা ৪১ বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজি তথা বিশ্বসাহিত্য, বিশেষ করে নাটক নিয়ে, তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল প্রশ্নাতীত। ইবসেনের জীবনী ও সাহিত্যের ওপর তাঁর  সুবিশাল গবেষণাগ্রন্থ, ইবসেন, সে-পাণ্ডিত্যের প্রমাণ। এই বইয়ের জন্য ২০০৬ সালে বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কারও পেয়েছিলেন। অথচ এই মানুষটির সারাজীবনের সাধনা ছিল রবীন্দ্রনাথ। সাধক ও ঋষি রবীন্দ্রনাথ নন, মানুষ ও প্রেমিক রবীন্দ্রনাথ, তাঁকে বোঝার ও জানার এক দুর্মর সাধনায় মেতেছিলেন। হাসপাতালে, মৃত্যুর সঙ্গে যখন তাঁর চূড়ান্ত লড়াই, তখনো রবীন্দ্রনাথকে পাশে রেখেছিলেন। বই পড়তে ভালোবাসতেন, অথচ বুকের ওপর বই ধরে রাখার শক্তি নেই। কিন্তু মাথার কাছে গীতবিতানটি তাঁর চাই-ই চাই। কখনো সে বইয়ের পাতা উলটে দেখেছেন, কোনো গানের কলি মনে পড়লে তার সুর ভেজেছেন।
আনোয়ার ভাই রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে চান জেনে রানু, আমার স্ত্রী, তাকে একটি ছোট টেপ-রেকর্ডার দিয়ে এসেছিল। সন্জীদা খাতুনের গলায় গাওয়া গান, ‘নাই রস নাই’, আধো ঘুমে আধো জাগরণে, বারবার শুনেছেন।
ষাটের দশকে বাংলাদেশে মুক্তবুদ্ধিচর্চার যে-আন্দোলন গড়ে ওঠে – যে-আন্দোলনের আলোকে স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের নির্মিতি – আলী আনোয়ার তার একজন নিরলস কর্মী। এই আন্দোলনের একটি প্রধান কর্মকাণ্ড ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে। সঙ্গে পেয়েছিলেন সমমনা কয়েকজন অসাধারণ বুদ্ধিজীবী – অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক, সনৎকুমার সাহা, গোলাম মুরশিদ ও নাজিম মাহমুদ। রাজধানীর বাইরে হওয়ায় সেসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমরা সবাই তেমন পরিচিত ছিলাম না, কিন্তু তাঁদের প্রভাব অস্বীকার করা অসম্ভব ছিল। ঢাকার বাইরে হওয়ায় অবশ্য একটা সুবিধাও হয়েছিল। তাঁদের কথায় ও কাজে দলীয় রাজনীতির প্রভাব ছিল না। সুবিধাভোগের বিলি-বণ্টনেও তাদের কেউ টেনে নামাতে পারেনি। মনে-প্রাণে বাঙালি ছিলেন, রবীন্দ্রনাথের প্রতি আকর্ষণ সে-কারণে। একই কারণে বিদ্যাসাগরকেও বাঙালির সার্বিক উত্তরাধিকার বলে বিশ্বাস করতেন। ১৯৭০-এ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদ্যাসাগরের সার্ধশতজন্মবার্ষিকী উপলক্ষে যে বিশাল উদ্যাপনযজ্ঞের আয়োজন হয়, তার অন্যতম কুশীলব ছিলেন আলী আনোয়ার। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ধর্মনিরপেক্ষতা নামে একটি গ্রন্থ তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। ১৯৭৩-এ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বাংলাদেশের আত্মার স্বরূপ আবিষ্কারের লক্ষ্যে যে আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়, এই গ্রন্থ ছিল তার মূল উপস্থাপনা ও বিতর্কের বুদ্ধিদীপ্ত এক সংকলন।
আলী আনোয়ার তাঁর রাজশাহীর সতীর্থদের মতোই প্রবল রাজনীতিমনস্ক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ তাঁর ভাবনা ও বিশ্বাসের কেন্দ্রে প্রথিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি গভীর আনুগত্য থেকে তাঁর ভাবনা-চিন্তায় যে স্বচ্ছতা ও নৈয়ায়িক নিষ্ঠার সৃষ্টি হয়, তার প্রতিফলন মেলে সাহিত্য-সংস্কৃতি নানা ভাবনা এই নামের প্রবন্ধ সংকলনে। গত ২০-২৫ বছরে তাঁর লিখিত মুখ্য প্রবন্ধসমূহের এই সংকলন আনোয়ার ভাইয়ের মৃত্যুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ঢাকার বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়। সম্পাদক বন্ধু আবুল হাসনাত ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে কিছুটা তাড়াহুড়োর মধ্যেই বইটি ছেপে বের করতে সমর্থ হন। মাত্র একটি কপি তাঁর হাতে এসেছিল, ভীষণ খুশি হয়েছিলেন সেই বই হাতে পেয়ে।
এই বইতে আছে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্য নিয়ে তাঁর ভাবনার কথা। আলী আনোয়ারের পঠন পাঠনের ব্যপ্তি ছিল ঈর্ষণীয়। সেজন্য তিনি শ্রদ্ধার আসন অর্জন করেছিলেন।
জীবনের শেষ এক-দেড় দশক কাটিয়েছেন আমেরিকায়। চিকিৎসার সুবিধা হবে ভেবেই প্রবাসে আগমন, কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি এই সময়ে। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে, বিশেষত তাঁর চিত্রকলা বিষয়ে, একাধিক মূল্যবান প্রবন্ধ লিখে শেষ করেন প্রবাসেই। নেরুদার জীবন ও কবিতা নিয়ে বই, পাবলো নেরুদা : প্রেমে ও সংগ্রামে, সেটিও এই প্রবাসে বসেই লেখা। কবি নন, অথচ মনে-প্রাণে কবি, নেরুদার অনুবাদে সে-কথার প্রমাণ মেলে। দেহ ধীর হয়ে এলেও মন চাইত দেশের নানা কর্মযোগে নিজেকে যুক্ত রাখতে। কিছুটা সুস্থ বোধ করলেই দেশে ফিরে গেছেন। প্রবাসী বাঙালিদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও নিজেকে সংযুক্ত রাখতে বরাবর উৎসাহী ছিলেন আনোয়ার ভাই।
২ মার্চ রাতে-দুপুরে যখন শেষবারের মতো দেখি, আনোয়ার ভাই তখন কোমায়। ঢাকা থেকে মফিদুল হক এসেছিলেন, তিনিও সঙ্গে ছিলেন। জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এক ভিন্ন জগৎ থাকে, সেখানে না-ঘুম, না-জাগরণ। হোসনে আরা ভাবি কাছে গিয়ে কানে কানে বললেন, ‘দেখো, কারা এসেছে।’ মেয়ে সুস্মি এক ফোঁটা পানি দিয়ে তাঁর ঠোঁট ভিজিয়ে দিলো। আনোয়ার ভাইয়ের চোখের তারা বুঝিবা একবার কেঁপে উঠল, মনে হলো নিঃশব্দে আমাদের সম্ভাষণ জানালেন।
তখন কি জানি, তাঁর সঙ্গে সেই হবে শেষ দেখা।
৪ মার্চ ২০১৪, নিউইয়র্ক