ব্রাত্য জীবনের কুলীন কথাকার

লেখক:

শফি আহমেদ
অদ্বৈত মল্লবর্মণ
ব্রাত্য জীবনের ব্রাত্য কথাকার
বিমল চক্রবর্তী
অক্ষর পাবলিকেশনস্
ঢাকা, ২০১২
৪০০ টাকা

বিগত দশক-দুই জুড়ে সাহিত্য ও শিল্পঙ্গনের মহারথীদের জন্ম-মৃত্যু শতবর্ষ বা সার্ধশতবার্ষিকী পালনের আয়োজন-সংস্কৃতি বিশেষভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, টিএস এলিয়ট, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, হেনরিক ইবসেন, অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গ, বুদ্ধদেব বসু প্রমুখ কতজনের নামই তো উল্লেখ করা যাবে, শুধু চিহ্নায়নের জন্যে এঁদের স্মরণ করলাম, কুষ্টি-ঠিকুজি নিয়ে বসলে তালিকাটা ক্রমান্বয়ে বড় হতে থাকবে। এরই মধ্যে আবার ২০১০ থেকে সমাগত ২০১৩-কে অন্তর্ভুক্ত করে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি নিয়ে আমাদের স্মারণিক বুদ্ধিজীবিতার একটা ধারাপ্রবাহ লক্ষ করা যাবে। এই অনন্য গীতিসঞ্চয়ন প্রথমে বাংলায় প্রকাশিত হলো, তারপর সমাত্মীয় অন্যান্য নীতিগ্রন্থের অন্য কয়েকটি এর সঙ্গে সংযোজিত হলো, তার অনুবাদ হলো ইংরেজি ভাষায়, বিলেত শহরের উচ্চমার্গীয় সারস্বত মহলে তা নিয়ে ভাবনার আন্দোলন, সুইডিশ অ্যাকাডেমির বিবেচনার জন্য বহুমুখী তৎপর ও সুপারিশ এবং ১৯১৩ সালে ওই গীতিসমূহের নিবিড়, গভীর ও অন্তরতর ভাবদর্শনের জন্য নোবেল পুরস্কার বিভূষণ ইত্যাকার তথ্যঐতিহাসিক গতিপথ অনুসরণ করে আমরা মুখ্যত বাঙালিরা এবং সাধারণভাবে রবীন্দ্রভক্তবৃন্দ বেশ উত্তাপময় গীতাঞ্জলিমুখর চারটি বছর উদযাপন করে যাচ্ছি। কালজয়ী ইংরেজ নাট্যকার শেক্সপিয়রের অনুরাগীরা এই একবিংশ শতকে নানান ব্যাখ্যা-বিতর্কে তাঁর অমর দুই নাটক – হ্যামলেট এবং ম্যাকবেথ প্রকাশনার চারশো বছর স্মরণ করেছেন।
আমার এমন একটা  প্রায় আনুষ্ঠানিক ভূমিকার নেপথ্যে কাজ করেছে একটি বিশেষ ও ব্যতিক্রম গ্রন্থের প্রকাশনা। বইটি প্রকাশিত হয়েছে আমাদের প্রতিবেশী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা থেকে। ওই শহরের খ্যাতনামা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অক্ষর পাবলিকেশনস্ সম্প্রতি আলোচ্য এ-বইটি প্রকাশ করেছে, যার শিরোনামটা বেশ দীর্ঘ এবং তা প্রায় এক অপরিহার্য কারণে। বইটির নাম  অদ্বৈত মল্লবর্মণ ব্রাত্য জীবনের ব্রাত্য কথাকার। লেখকের নাম বিমল চক্রবর্তী, যদিও এখানে খানিক অস্পষ্টতা আছে। সে-কথা এই আলোচনার শেষের দিকে বিচার করা যাবে। প্রকাশক এবং লেখক উভয়েই এই বইয়ের কথারম্ভের প্রাক্-ভাষ্যে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আগামী ২০১৪ সালে এই বড়মাপের অপিচ নাতি আলোচিত অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্মশতবর্ষ। সে-আয়োজনের শুরুর ঘণ্টা হয়তো, তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বাজতে আরম্ভ করবে ২০১৩ সাল থেকেই। লেখক বিমল চক্রবর্তী এবং প্রকাশক শুভব্রত দেব সবার আগে তাঁদের নৈবেদ্য উপস্থাপন করলেন, আমাদের একটু উসকে দিলেন।
উত্তর-পূর্ব ভারতের বাংলা লেখালেখি সম্বন্ধে যাঁরা ওয়াকিবহাল তাঁরা বিমল চক্রবর্তীকে একজন প্রথম সারির কবি হিসেবেই চেনেন। সেই তাঁর মধ্যে যে অদ্বৈত মল্লবর্মণের সাহিত্য ও জীবনকথা এবং জীবনযাপন বিষয়ে গভীর অনুরাগ ও  অনুসন্ধিৎসা রয়েছে, তার পরিচয় পেয়ে সবারই ভালো লাগবে বলে আমাদের বিশ্বাস। শুধু তথ্যগত দিক দিয়ে বিবেচনা করলে, বাংলা সাহিত্যের যে ভৌগোলিক  ঠিকানাকে অসীমান্তিক বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি আমরা, অদ্বৈত মল্লবর্মণ তাঁর সবচেয়ে বিশিষ্ট প্রতিনিধি। বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটা গ্রামে জন্ম নেওয়া এবং এখানকারই বিদ্যালয়ে পড়–য়া একজন মানুষ বাস্তব জীবনের চাহিদার যৌক্তিক কারণে কলকাতায় অভিবাসী জীবন যাপন করেছেন। আবার সেই কালে আমাদের এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া তো ত্রিপুরার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অদ্বৈত মল্লবর্মণ জন্মভূমির অপরূপ বর্ণনা দিয়েছেন, ভূমিপুত্র হিসেবে, ‘চরণে কুসুমমালা পরি’ হস্তে পূর্ণ শস্য-আশীর্বাদ,/ চরণমঞ্জরী নবজীবনের উঠুক ঝংকার/ জাগায়ে দে বাঁচিবার সাধ’। এমন করেই অদ্বৈত মল্লবর্মণ বাংলা সাহিত্যের প্রধান তিন ভুবনকে সংগ্রথিত করেছেন ভৌগোলিক, চেতনাগত ও ভাষিক ত্রিবেণীসঙ্গমে।
বিমল চক্রবর্তীর নির্বাচিত গ্রন্থের শিরোনাম অনুসরণে আমি অদ্বৈত মল্লবর্মণকে কথাকার হিসেবে ‘কুলীন’ বলে প্রত্যয়ন করেছি। কিন্তু গ্রন্থাকারের শিরোনামকে আমি সুচিন্তিত বলেই বিবেচনা করি। শব্দার্থের ঝোঁকটা পাঠক হিসেবে কোন জায়গায় একটু বেশি দেবো, তার ওপর নির্ভর করে অর্থবহনের সাংকেতিকতা। তাই কোনো কোনো মনোযোগী ও অনুরাগী পাঠক এ-কথা বলতেই পারেন যে, অদ্বৈত মল্লবর্মণ তিতাস পারের ধীবরজীবনের কথাকার হিসেবে ব্রাত্য মানুষের উপাখ্যান রচনা করেছেন, কিন্তু তাঁর রচনা এমনই  গুণমণ্ডিত ও অসাধারণ যে, লেখক হিসেবে তিনি খুবই উঁচু একটি আসনের দাবিদার, তাই ‘কথাকার’ হিসেবে তিনি তো কীর্তিমান। সুতরাং তাঁর নামের সামনে ‘ব্রাত্য’ বিশেষণের যোগ  মানানসই নয় এবং তা প্রাপ্য স্বীকৃতির পক্ষে হানিকর। অমন একটা যুক্তির বিপরীতে একেবারেই যে বলার কিছু নেই, তা নয়, যদিও আমিও কুলীন শব্দের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ব্রাত্যর বিপক্ষেই অবস্থান গ্রহণ করেছি। খুবই নৈর্ব্যক্তিকভাবে যদি এই সহজ প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে চাই যে, আমাদের পাঠকদের (ওপরে উল্লিখিত তিন ভুবনকে সম্মিলিত করেই বলছি) সিংহভাগ কি অদ্বৈত মল্লবর্মণকে চেনেন? এই বাংলাদেশে কজন তার নাম জানেন, কজন তাঁর নাম শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতে বা লিখতে পারেন। বাংলা সাহিত্যের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার্থী ছাড়া কতজন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি তিতাস একটি নদীর নাম পড়েছেন বা কতজন জানেন যে, আরেক ব্রাত্য জীবনের চলচ্চিত্র রূপকার ঋত্বিক ঘটক ওই নামেই এক অসামান্য ছায়াছবি বানিয়েছেন? বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের সমাপনী পর্বে শিক্ষার্থীদের তিতাস একটি নদীর নাম পড়তে হয়। শিক্ষকদের অথবা সহায়ক গ্রন্থের কল্যাণে তারা লিখে নেয়, এটি বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রে এক অনবদ্য সৃষ্টি। অথবা অনন্ত, সুবল বা বাসন্তী চরিত্রায়ণে সামাজিক বাস্তবতা ‘কি রূপে ফুটিয়া উঠিয়াছে’ এমন প্রশ্নের উত্তর লেখার জন্য পাঠক-শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেওয়ার আগের সন্ধ্যায় নিজেকে প্রস্তুত করে। অথবা অনেকেই শুধু ঋত্বিক ঘটক-পরিচালিত ছবিটা দেখেই সাহিত্যপাঠের দায় মোচন করেন। অদ্বৈত মল্লবর্মণ যে এই একটি উপন্যাস ছাড়াও আরো উপন্যাস, কিছু ছোটগল্প বা কবিতা রচনা করেছিলেন, সে-বিষয়ে খোঁজখবর রাখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন, এমন সাহিত্যরসিকের সংখ্যা  মুষ্টিমেয়।
স্বভাবতই মনে পড়ে যায় ইংরেজ উপন্যাসকার এমিলি ব্রন্টির কথা। বলতে গেলে, Wuthering Heights নামে গণ্য রচিত একমাত্র কিন্তু অনন্য এই উপন্যাসের জন্য তিনি ইংরেজি কথাসাহিত্যে অক্ষয় স্থান দখল করে নিয়েছেন। তাঁকে সহ্য না করে ইংরেজি উপন্যাস সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করা যায় না। অনেকেই  অবহিত নন যে, এমিলি চমৎকার এবং সুখপাঠ্য বেশকিছু রোমান্টিক কবিতা লিখেছিলেন। কিন্তু ইংরেজি উপন্যাসের পাঠকরা সবাই তাঁকে এমিলি নামে চেনেন। অন্য কোনো উপন্যাস বা গল্প বা কবিতার কথা উল্লেখ না করলেও তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের রচয়িতা তাঁর একটি কর্মের জন্যই বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসনের দাবিদার। কিন্তু কজন এ-কথাটাই বা জানি অথবা এমিলির মতো শুধু অদ্বৈত বললে কি সহজেই তাঁকে শনাক্ত করতে পারব? বোধহয় না, অথচ বঙ্কিম থেকে হুমায়ূন পর্যন্ত কত লেখককেই তো  অমন নামের  প্রথম অংশ দিয়ে চিনে নিতে পারি। তাই অদ্বৈতকে বিমল চক্রবর্তী যখন ‘ব্রাত্য’ কথাকার নামে নির্দেশ করেন, তা আর তেমন অযৌক্তিক ঠেকে না।
এ-জন্যই আগরতলার এ-প্রকাশনাটিকে সমাদর জানাতে আমি একটুও কার্পণ্য করব না। প্রকৃতপক্ষে এ-বইটি অদ্বৈত মল্লবর্মণের প্রতি আমাদের ক্রমিক অনাদর ও উপেক্ষার প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আবার একই সঙ্গে শততম জন্মবর্ষের দোরগোড়ায় তাঁর বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার যে-উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন লেখক ও প্রকাশক, আশা করি তার কিছু সুফল দেখতে পাওয়া যাবে অদূরভবিষ্যতে। প্রাজ্ঞ পাঠকবৃন্দ তাঁর বইটির বিভিন্ন খুঁত বা অসম্পূর্ণতার বিষয় আবিষ্কার করতে পারেন। কিন্তু তাঁর মাধ্যমে অদ্বৈত মল্লবর্মণের সাহিত্যচর্চার বিষয়ে বাড়তি কিছু উৎসাহও তো সৃষ্টি হবে। প্রথমেই সলজ্জভাবে এ-কথা স্বীকার করতে হবে যে, বাংলাসাহিত্যের দুই প্রধান প্রসূতিকেন্দ্র ঢাকা অথবা কলকাতা নয়, এই লেখকের রচনা, জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটা বড় আয়তনের তথ্যসন্ধানী ও ব্যাপকতামুখী এ-গ্রন্থটি প্রকাশিত হলো, ছোট শহর, অপেক্ষাকৃত হ্রস্বউজ্জ্বল আগরতলা থেকে। প্রকাশনা জগতের বর্ণিল বৈচিত্র্যের ইতিকথায় আগরতলাকে স্বভাবতই কিছুটা নি®প্রভ এবং সেদিক থেকে ‘ব্রাত্য’ মনে হয়। এই আগরতলাতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল অদ্বৈত মল্লবর্মণ উৎসব। তার মধ্যে দৃষ্টিগ্রাহ্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও ছিল। তাই এ-লেখকের জীবন ও লেখা বিষয়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক সংযোজনযোগে যে বড় আয়তনের একটা প্রকাশনার দেখা পেলাম আগরতলা থেকে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।
বিমল চক্রবর্তী-বিরচিত এই গ্রন্থের সূচিপত্র অত্যন্ত বিস্তৃত। পূর্ণ দুই পৃষ্ঠাব্যাপী এ-সূচিপত্র দেখলে বোঝা যায়, গ্রন্থকার কোনো একটি সুনির্দিষ্ট ছকের মধ্যে বইটির বিষয়াবলিকে বাঁধতে চাননি। তিনি যেমন অদ্বৈত মল্লবর্মণের জীবনকথার বিষয়-আশয় পাঠকদের জানাতে চেয়েছেন, তেমনি তাঁর বিভিন্ন সাহিত্যকর্মের সঙ্গে পরিচিতি ঘটাতে চেয়েছেন, তাঁর সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে মূল্যায়নও এ-গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। লেখকের পরিকল্পনার মধ্যে নির্দিষ্টতা বা সংগঠিত চিন্তার প্রকাশ তেমনভাবে সমাপ্ত করা যাবে না। সূচিপত্রের মধ্যে তার প্রতিফলন পাওয়া যাবে। কোনো অধ্যায়ই তেমন দীর্ঘ নয়, তাই গবেষণার গভীরতা ও ব্যাপ্তি নিয়ে কিছু সংশয় থেকে যায়। একটি ছোট অধ্যায় আছে, যার শিরোনাম ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণের কথাসাহিত্যে ব্রাত্যসমাজ।’ এটি একটি মূল্যায়নসূচক কিন্তু খুবই মিতকলেবর অধ্যায়, অবশ্যই বিষয়টি আরো নিবিড় অধ্যয়ন ও দ্বান্দ্বিক পাঠ দাবি করে। কিন্তু বিমল চক্রবর্তী জন্মশতবর্ষ সামনে রেখে বিবিধ বিষয়ে পাঠকদের অবহিত করতে চেয়েছেন। বইজুড়ে তাঁর অধ্যবসায় ও শ্রমশীলতার প্রচুর সাক্ষ্য পাওয়া যাবে।
অদ্বৈত মল্লবর্মণ সম্পর্কে তিনি তাঁর সাধ্যের মধ্যে সম্ভবপর সব সূত্র থেকে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহে অক্লান্ত ছিলেন। তাই তিনি তিতাসের প্রান্তবর্তী জীবনের চিত্রকরের সাহিত্য বিষয়েই শুধু আলোচনা বা আলোকপাত করেননি,  ওই লেখকের বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত বা খ্যাতিমান সাহিত্য-সমালোচকের ইতিবাচক মতামত উদ্ধৃত করতে বিশেষভাবে উৎসাহিত বোধ করেছেন। অদ্বৈত মল্লবর্মণকে স্মরণ করে একটি কবিতাকে তিনি অন্তঃস্থিত করেছেন তিতাসকে নিয়ে  লেখা অনেক কবিতার সঙ্গে। এর মাধ্যমে লেখক অদ্বৈত ও নদী তিতাস অবিভাজ্য ও সমার্থক হয়ে উঠেছে। সেসব কবির মধ্যে আছেন – শঙ্খ ঘোষ, আল মাহমুদ, সানাউল হক, দিলীপ দাস এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের আরো বেশ কয়েকজন কবি। আগে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করেছি, তিতাস একটি নদীর নাম অবলম্বনে খ্যাতিমান চলচ্চিত্র-পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের ছায়াছবি নির্মাণের কথা। এ বইটির বিরাট অংশ জুড়ে আছে এ-চলচ্চিত্র বিষয়ক নানা তথ্য, সংবাদকণিকা; অধুনালুপ্ত ঢাকার চিত্রালী নামের সিনেমা সাপ্তাহিকীর পর্যালোচনাও আছে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত ঋত্বিকমঙ্গল গ্রন্থের প্রচ্ছদচিত্র আছে। স্বভাবতই ঋত্বিকের বানানো ওই ছবি নিয়ে ভিন্নমুখী এবং বিপরীতমুখী বহু ভাষ্য আছে। বিমল চক্রবর্তী অনুসন্ধান করতে গিয়ে যা পেয়েছেন তার সবটাই সন্নিবেশিত করেছেন। আগে যে একটি বিশেষ অধ্যায়ের কথা উল্লেখ করেছি, যা নিয়ে আলাদা একটা গবেষণাগ্রন্থ রচিত হতে পারে, তেমনি ওই অসাধারণ কাহিনির চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়েও পৃথক একটি তথ্যসমৃদ্ধ বই লেখা যেতে পারে। ঋত্বিক নিজে মন্তব্য করছেন, ‘তিতাস কলকাতায় এলে খুশি হবো’ অথবা ‘আমি ছাড়া তিতাস হতো না’। আবার সমালোচকরা বলছেন, ‘ঋত্বিক ঘটক অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাসকে আঁকতে পারেননি।’ একজন বড় বেশি ঠোঁটকাটা দর্শক-সমালোচক লাগামহীন নিন্দা করেছেন। বোঝা যায়, তিনি কতটা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। সঠিক কিনা সে দায় তো গ্রন্থকারের নয়। আবার ঢাকার ধ্র“পদী সাময়িকীতে প্রকাশিত  সুকদেব বসুর অসাধারণ ও দীর্ঘ মূল্যায়ন গ্রন্থিত হয়েছে।
তবু যা হোক, ঋত্বিক ঘটককে দেড় হাতের মধ্যে পাইনি, পেলে নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করতাম, মহাশয়, এ কী অকল্যাণ করিলেন। ইহারা রংবাজ হইতে পারে, কিন্তু অবুঝ মন ইহাদের। কোথায় দুটি-চারিটি প্রেম ভালবাসার কথা শুনাইয়া সান্ত্বনা দিবেন – মন কেমন করা গীত শুনাইবেন, আড়ি ভাব দেখাইয়া অতঃপর সুখে শান্তিতে বসবাস দেখাইবেন, তাহা নয় মাতালের মত অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করিয়া তুমুল কাণ্ড বাঁধাইয়া বিকট একটা চড় কষাইয়া দিলেন, এখনো যাহার জ্বালা আপনাকে অপবাদ দিতেছে। কিন্তু তাঁর ভাগ্য ভালো বলতে হবে। ছবিটি সামগ্রিকভাবে ‘শেষ’ করার আগেই তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় কলকাতায় চলে যেতে হয়েছে। আপাতত কিছুটা সুস্থ হলেও অচিরেই তার ঢাকা আসার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই এবং ভবিষ্যতেও যে আসবেনই, সে-ব্যাপারে নিশ্চিত করে বলা যায় না।
সুকদেব বসুর রচনার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করলাম। ১৪ পৃষ্ঠাব্যাপী এই চলচ্চিত্র-সমালোচনা পুনঃপাঠ করতে গিয়ে আমিও বিশেষভাবে স্মৃতিকাতর বোধ করেছি। সত্যজিৎ রায়সহ আরো কয়েক দুনিয়াজোড়া খ্যাতির অধিকারী চিত্র-পরিচালক, বিখ্যাত সব ছবি, চিত্রশিল্পীদের উল্লেখসহ এমন সমালোচনা সত্যিই দুর্লভ। এমন আরো অনেকের রচনা বিমল চক্রবর্তীর গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এখানেই পাঠকদের মনে একটা অনভিপ্রেত ও বিচিত্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম হয়। এত জনের কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, বিভিন্ন জনের বিভিন্ন লেখা নেওয়া হয়েছে। মোট ৪২৪ পৃষ্ঠার এই  বিপুলায়তন গ্রন্থের ১৯ থেকে ১৫৫ পৃষ্ঠা পর্যন্ত প্রাথমিক অংশে বিমল চক্রবর্তীর নিজের ভাবনা ও মূল্যায়ন প্রতিফলিত হয়েছে। তার মধ্যেও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শান্তনু কায়সার পর্যন্ত অনেকের মন্তব্যের দীর্ঘ-নীতিদীর্ঘ উদ্ধৃতি আছে। সেটা নিশ্চয়ই নির্দোষ। কিন্তু তারপর থেকে যা আছে তা অন্যদের রচনা, কবিতা, সমালোচনা, সংবাদ, প্রতিবেদন প্রভৃতি।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের চিঠিপত্রের অন্তর্ভুক্তি প্রশংসাই, কিন্তু ৯০ পৃষ্ঠাব্যাপী তিতাস একটি নদীর নামের শ্যামল ঘোষকৃত পালা রূপান্তর তো আলাদা ক্রোড়পত্র হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
গ্রন্থটিকে নিয়ে পাঠকদের মনের মধ্যে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে। গ্রন্থকারের নিজের রচিত অংশ ছাড়া আরো যা যা আছে, তা সংকলন ও সম্পাদনার বিষয়াবলি। এজন্য এই প্রকাশনাকে যদি দুই ভাগে বিভক্ত করা হতো তা পাঠকের কাছে অনেক যুক্তিযুক্ত মনে হতো। সেক্ষেত্রে সম্পাদনার একটি রীতি ও কাঠামো বিন্যাস তৈরি করা অপরিহার্য। অদ্বৈত মল্লবর্মণের জীবনকথা বর্ণনার আরো ব্যক্তি বিশেষভাবে প্রত্যাশিত। গ্রন্থটির প্রথম বাক্যেই অদ্বৈতের জন্মকথার অবতারণা করতে গিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একটি আপাতত কারণের উল্লেখ সাধারণভাবেই প্রক্ষিপ্ত মনে হয়। তাঁর গ্রামের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বর্ণনার বিশেষ কার্পণ্য লক্ষ করা যায়। লেখক তথ্য সংগ্রহে যতটা মনোযোগী, বিশ্লেষণে তদানুরূপ দক্ষতার ছাপ রাখতে পারেননি। প্রাথমিক অধ্যায়গুলোর মধ্যে বিমল চক্রবর্তীর ভাবনা এবং বিন্যাস একটা যুক্তিযুক্ত পথরেখা অনুসরণ করেছে। অত্যন্ত স্বল্পপরিসরের হলেও জীবনকথার পরপরই তিনি অদ্বৈত মল্লবর্মণকে কবি, ছোট গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। পরবর্তী বিভিন্ন অধ্যায়ে গ্রন্থকার অদ্বৈত মল্লবর্মণের অনুবাদ বিষয়ে তথ্য ও মূল্যায়ন পেশ করলেও অনুবাদক হিসেবে ছোট আলাদা কোনো অধ্যায় সন্নিবেশিত করেননি। জীবনতৃষা নামের অনুবাদগ্রন্থ বিষয়ে একটি খুবই ছোট অধ্যায় আছে। এই গ্রন্থটি হলো আরভিং স্টোনের পৃথিবীব্যাপী জনপ্রিয় Lust for Life উপন্যাসের বাংলা ভাষান্তর। তথ্য হিসেবে পাওয়া  যাচ্ছে, প্রখ্যাত দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশনা,  সাগরময় ঘোষের অনুরোধ, মাঝে মাঝে মূল ঃবীঃ বাদ দেওয়া তপোধীর ভট্টাচার্য এবং শান্তনু কায়সারের অভিমত ইত্যাদি। কিন্তু এ-বইটি সম্বন্ধে অনুবাদ তত্ত্বের দিক থেকে অথবা অনুবাদকের শৈলী বিষয়ে কোনো বিশ্লেষণ নেই। বিমল চক্রবর্তীই আমাদের জানাচ্ছেন, অদ্বৈত Walt Whitman- এর কবিতা অনুবাদ করেছিলেন। একটি  আরবি কবিতা অনুবাদ বিষয়ে আমরা জানতে পারি। রাঙামাটি উপন্যাসে দু-একটি  অনুবাদ কবিতার কথা জানিয়েছেন তিনি। অনুবাদ নিয়ে একটি আলাদা ও বিশ্লেষণী অধ্যায় খুবই মানানসই হতো।
অদ্বৈত মল্লবর্মণ ব্রাত্য জীবনের ব্রাত্য কথাকার গ্রন্থটি আমাদের ইতিবাচকভাবে উৎসাহী ও অনুসন্ধানী করে তোলে। অদ্বৈত যে  কবি-প্রতিভার অধিকারী ছিলেন, সে-কথা আমাদের অনেকেরই অজানা। আজ থেকে প্রায় ৮০ বছর আগে (১৩৪২) তাঁর রচিত কবিতা তাঁর কাব্যগুণের সপক্ষে সাক্ষ্য দেয়।
‘আমার তিমিরাচ্ছন্ন ব্যথা-দুঃখঘেরা/ ভাগ্যাকাশ পটে প্রসারিয়া/ পূর্ণিমার সুবিমল  জ্যোৎস্নারাশি/ মাগো, আয় মা নিকটে/ আয় মা ত্রিপুরালক্ষ্মী,/ স্বপ্ন বুলায়ে দে চোখে, জাগা মা হরষ;/ উঠুক     আনন্দ হাসি ব্যথাম্লান মুখগুলো হতে/ পেয়ে তব স্নেেহর পরশ।’
বিমল চক্রবর্তী এমন মন্তব্য করছেন যে, কবি হিসেবে অদ্বৈত কাজী নজরুল ইসলাম, কামিনী ভট্টাচার্য এবং অজয় ভট্টাচার্য দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। কিন্তু গ্রন্থকার তার সপক্ষে কোনো দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেননি। এসব কারণেই বারবার প্রত্যাশা অপূর্ণ থেকে যায়। গ্রন্থকার দুটি অত্যন্ত মূল্যবান প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন দুটি আলাদা অধ্যায়ে। একটির  কথা আগে উল্লেখ করেছি, ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণের কথাসাহিত্যে ব্রাত্যসমাজ’। এই অধ্যায় স্বভাবতই তুলনামূলক ব্যাখ্যা, বিতর্ক ও তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ দাবি করে। কিন্তু গ্রন্থকার কোনো বিস্তারিত আলোচনার মধ্যে প্রবেশ করতে আগ্রহী হননি। সাহিত্য-সমালোচনার বিচারে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ‘নদীকেন্দ্রিক আখ্যান এবং তিতাস’ (একটি নদীর নাম)। এটি বেশ দীর্ঘ একটি অধ্যায়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের অমর উপন্যাসের কাহিনির কিছু কিছু সারসংক্ষেপ আছে; গুণী বেশ কয়েকজন সাহিত্যপণ্ডিতের মূল্যায়ন সন্নিবেশিত হয়েছে, অনেক বিখ্যাত উপন্যাসে নদীর ভূমিকা ও ঔপন্যাসিকদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভাসা-ভাসা মন্তব্য আছে। এ-অধ্যায়ের যা উপজীব্য, তা দিয়ে বেশ কয়েকটি পিএইচ-ডি অভিসন্দর্ভ রচনা করা যায়। তাই একটি অধ্যায় থেকে অনেক বেশি প্রত্যাশা করা অনুচিত। সমরেশ বসুর গঙ্গা, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি, কেরালার প্রখ্যাত মালয়ালম ভাষার ঔপন্যাসিক শিবশংকর পিল্লাইয়ের চিংড়ি এবং মিখাইল শলোকভের মহাকাব্যিক উপন্যাস And quiet Flows the Don গ্রন্থনিচয়ের প্রাসঙ্গিক; কিন্তু বীতচিন্তন উল্লেখ আছে। তবে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালিন্দী, হুমায়ুন কবিরের নদী ও নারী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র কাঁদো নদী কাঁদো এবং দেবেশ রায়ের তিস্তাপারের বৃত্তান্তর মতো অসাধারণ কাহিনির উল্লেখ না থাকা মননশীল পাঠকের জন্য পীড়াদায়ক।
বিমল চক্রবর্তীর আগ্রহ ও নিষ্ঠার প্রশংসা করতেই হবে, কিন্তু  বোধহয় গ্রন্থটি দ্বিতীয় কোনো উপযুক্ত ব্যক্তির দ্বারা সম্পাদিত হওয়া উচিত ছিল। শলোকভের উপন্যাসের নামের Quiet শব্দটি একাধিকবার Quite হিসেবে ছাপা হয়েছে। তাছাড়া উপন্যাসটির নামের আরম্ভ হয়েছে And শব্দ দিয়ে, যা গ্রন্থটির নামকরণের অর্থকে মহত্তর ও প্রসারিত করে। এমন খুঁত প্রায় অমার্জনীয়। এছাড়াও সমগ্র গ্রন্থটিতে অসংখ্য মুদ্রণপ্রমাদ রয়ে গেছে, যার পরিণতিতে এমনকি অদ্বৈত মল্লবর্মণের দুটি আলাদা জন্মতারিখ উল্লিখিত হয়েছে। অনেক বাক্যই বেশ প্রক্ষিপ্ত। এ-কথা বিভিন্ন উদ্ধৃতির বেলায়ও প্রযোজ্য। মুদ্রণপ্রমাদ বইটির অনেকখানি মূল্যহানি ঘটিয়েছে। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের সময় গ্রন্থকার স্বয়ং ও প্রকাশক এ-বিষয়ে যথোচিত যতœবান হবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা।
এমনসব ত্র“টি ছাপিয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণ ব্রাত্য জীবনের ব্রাত্য কথাকার গ্রন্থটি আবশ্যিকভাবেই আমাদের সাধুবাদ দাবি করে। বাংলাসাহিত্যের এই স্বল্পপ্রজ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিমান লেখকের সমাগত জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ করে আমাদের যে অনেক কাজের সম্প্রসারিত পরিধি রয়েছে, সে-বিষয়ে গ্রন্থটি আমাদের ব্যাপকভাবে সচেতন করে তোলে। তাছাড়া ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিবিধ তথ্যের একটি বিশেষ ভাণ্ডার হিসেবে এ-বইটি বিবেচিত হবে। অদ্বৈত মল্লবর্মণের রচনাপঞ্জি আমাদের জন্য এক বড় প্রাপ্তি। রচনার সঙ্গে সূত্র ও প্রকাশকাল উল্লিখিত থাকায় গবেষকদের জন্য তা খুবই সহায়ক। কয়েকটি চিঠিও এ-গ্রন্থের বিশেষ সম্পদ। অত্যন্ত মূল্যবান একটি সহায়ক গ্রন্থের তালিকা আছে। এ থেকে লেখকের শ্রমশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। প্রাসঙ্গিক বহু ছবির প্রতিচিত্রায়ণ বইটিকে সমৃদ্ধ করেছে। তাছাড়া বিশদ আলোচনা না থাকলেও প্রসঙ্গের অবতারণা, যেমন ব্রাত্যজীবন, তৎকালীন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বামপন্থী আদর্শ প্রভৃতি বিষয়ে অজস্র ভাবনার খোরাক পাওয়া যায়। কাইয়ুম চৌধুরীর সুশোভন প্রচ্ছদ গ্রন্থটির অসীমান্তিক চরিত্রকে সংহত করেছে এবং পুষ্পল দেবের দৃষ্টিনন্দন ও অর্থবহ অলংকরণ বইটির সংগ্রাহক মূল্যবর্ধনে যথেষ্ট অবদান রেখেছে।