মনোরম মনোগাথায় কবি বেলাল চৌধুরী

লেখক: শাম্স হক

বেলাল চৌধুরীর মতো এত উঁচুমাপের মানুষ সম্পর্কে কোনো কিছু বলতে বা লিখতে যাওয়া আমার মতো নগণ্য মানুষের নিছক ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়, তথাপিও একটি আকুতি নিয়ে আমি দাঁড়াতে চাই। এ-কথা ঠিক যে, আমি বয়সে পরিণত তবে লেখালেখির জগতে নিতান্তই ‘অয়েলক্লথের’ ওপর গড়াগড়ি যাওয়া একটা শিশু। শিশুর দোলনার উপরিভাগে লাল-হলুদ রঙের দোলায়িত কাগজের ফুলটি দেখে তার মধ্যে যে আবেগ, উচ্ছ্বাস এবং দাপাদাপি পরিলক্ষিত হয়, আমার দৃষ্টিতে কবি বেলাল চৌধুরী সেই দেদীপ্যমান উজ্জ্বল তারা, যা মধ্যাকাশ থেকে তীব্রগতিতে দিগন্তে মিলিয়ে গেছে। হোক সে আমার কাছে খুবই স্বল্পকালীন সময়ের পরিচিত, তবু আমার মনের আকাশে দাগকাটা একটি মানুষ। একটি তারকা কবি বেলাল চৌধুরী। সে-মানুষটির স্মৃতি আমার কাছে আমৃত্যু জাগরূক হয়ে

থাকবে।

চার-পাঁচ বছর ধরে প্রায় প্রতিদিনই পেশাগত কাজ শেষ করে সন্ধ্যার দিকে কবি ও প্রকৌশলী খোরশেদ বাহারের সেগুনবাগিচার ডিয়েন কোম্পানি লিমিটেড অফিসে হাজির হতাম। সেখানে দেখা হতো দেশের নামকরা বেশকিছু কবি, সাহিত্যিক, স্থপতি, প্রকৌশলীর সঙ্গে; তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন, প্রয়াত কবি রফিক আজাদ, কখনো কখনো কবি হাবীবুল্লাহ্ সিরাজী, কবি শিহাব সরকার, প্রয়াত ভাস্কর আবদুল্লাহ খালিদ প্রমুখ। আড্ডা জমত রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি থেকে শুরু করে রাজা-উজির মারা, মায় একে অপরের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক কথার সুড়সুড়িও আমাদের বাক্-মেলায় স্থান পেত।

এমনই একদিন সন্ধ্যায় কবি খোরশেদ বাহারের অফিসে ঢুকে একটা নতুন মুখ চোখে পড়ল, সত্তরোর্ধ্ব বয়স। কাঁচা-পাকা চুল। বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি। চেহারাটা এই বয়সেও এতটা নায়কোচিত খুব কম মানুষেরই দেখা যায়। হাত উঁচিয়ে যথারীতি শব্দহীন সালাম দিলাম। একটা হাসির রেশ মুখে নিয়ে মাথা নেড়ে সালামের উত্তর দিলেন। তিনিই কবি বেলাল চৌধুরী। সেই আমার প্রথম দেখা। খুব বেশি হলে বছর তিন-চার আগে। একটা চেয়ার টেনে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছি তার আগেই আমাদের রবিদা, অর্থাৎ কবি রবিউল হুসাইন স্বভাবসুলভভাবেই আমাকে বল্লেন, ‘আসুন। আসুন! অভিনন্দন! অভিনন্দন!’ বলে তাঁর পাশের একটা চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করলেন। কী কারণে অভিনন্দন তা আমি জানি, তবে সেটা খুব উল্লেখযোগ্য নয়; এখানে উল্লেখ্যও নয়। যা-হোক, রবিদা কবি বেলাল চৌধুরীর সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বলল্লেন, ‘ও মাঝেমধ্যে লেখেটেখে, পেশায় আইনজীবী। সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস করে।’ কবি বেলাল চৌধুরী ডান হাতটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন, বলল্লেন, ‘আমি বেলাল।’ পরের জিজ্ঞাসা, ‘আপনার দেশ কোথায়?’ বললাম, ‘স্যার, আমি যশোর জেলার মানুষ, বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলার অন্তর্গত।’ আরো বললাম, ‘স্যার, আমাকে আপনি নয়, তুমি বলবেন।’ প্রত্যুত্তরে তিনি আমাকে বল্লেন, ‘আমি স্যার নই, আমি বেলালভাই।’ সেই থেকে বেলালভাই নামেই সম্বোধন করতাম।

সেদিনের সেই স্বল্প আলাপেই বুঝলাম, বেলাল চৌধুরী এত উঁচুমাপের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আত্মম্ভরিতা বিন্দুমাত্র তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি ছিলেন স্বল্পভাষী। শ্রবণে বিশ্বাসী এবং আগ্রহী। কথা শুনতেন, বলতেন কম। তিনি কখনো পরনিন্দা করতেন না।

বেশ কিছুদিন পর বেলালভাইয়ের সঙ্গে আবার একদিন কবি খোরশেদ বাহারের অফিসে দেখা। সেই চিরাচরিতভাবে কাঁধে একটা ঝোলানো ব্যাগ। ঘরে ঢুকে সবাইকে লক্ষ করে মৃদু হাসলেন। বসলেন একটা চেয়ারে। বলল্লেন, ‘কাল কলকাতা যাচ্ছি। খোরশেদ আপনার দুটো লেখা দেন।’ আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেমন আছেন?’ বললাম, ‘জি, ভালো আছি।’ ‘আপনিও দুটি কবিতা দেন।’ রবিদা সঙ্গে সঙ্গে বল্লেন, ‘হ্যাঁ, ওই যে ফেলানির ওপর লেখা ওটা, আর যে-কোনো একটা কবিতা দেন।’ আমি আমার ‘স্বাধীনতার খোঁজে’ এবং ‘একটা শার্টের আত্মকাহিনী’ কবিতা দুটি দিলাম। আনন্দে অভিভূত হলাম, আশ্চর্যও হলাম এই ভেবে যে, আমার মতো নগণ্য এক লেখকের কবিতাও কবি বেলাল চৌধুরী চেয়ে নিলেন। পরে জেনেছি এবং বুঝেছি, নবীন কবি-লেখকদের প্রণোদনা জোগানোর ব্যাপারে কবি বেলাল চৌধুরীর জুড়ি মেলা ভার।

এ-ব্যাপারে আমার একটা অভিব্যক্তির কথা না জানিয়ে পারছি না। তা হলো, কবির মৃত্যুর পর জাতীয় কবিতা পরিষদ-আয়োজিত কবি বেলাল চৌধুরীর স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠানে ৩ মে, ২০১৮ তারিখে জাতীয় জাদুঘরে উপস্থিত ছিলাম। ওই অনুষ্ঠানের মঞ্চের পেছনে যে-ব্যানারটি টানানো ছিল তাতে ছিল কবির একটা মুখচ্ছবির ‘প্রোফাইল ভিউ’। যাঁরা অনুষ্ঠানে ছিলেন তাঁদের অনেকেরই হয়তো মনে পড়ছে। এই মুখাবয়বটিই বোধ করি বলে দেয় কবি বেলাল চৌধুরী কী এবং তিনি কতটা অভিভাবকত্বপরায়ণ। ঝুলন্ত পক্ব কেশের নিচে বলিরেখা-অঙ্কিত প্রশস্ত ললাট, যা দেখলেই বোঝা যায় যে, বিদগ্ধ প্রাজ্ঞচিত মানুষেরই মুখ। আর তাঁর আনত চোখদুটি যেন ছোটদের খুঁজে ফিরছে, যাদের টেনে ওপরে তুলতে হবে। সেজন্যেই তিনি নবীন লেখকদের উৎসাহিত করতেন। এটা ছিল তাঁর হৃদয়-উৎসারিত প্রয়াস। আরো একটি কাহিনির কথা বেলাল চৌধুরী-সম্পর্কে না বললেই­ নয়, যদিও সেটা আমার কবির ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কবি রবিউল হুসাইনের কাছ থেকে শোনা। ঘটনাটি হলো, বাংলাদেশের বেশ কয়েজজন কবি পশ্চিম বাংলা যাচ্ছেন কবিতা উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য। বাসটি যখন ফারাক্কা বাঁধের ওপর, তখন দেখা গেল বাংলাদেশের দিকটা পানিশূন্য আর অপর প্রান্তে ভারতের দিকটাতে থইথই পানি। কবি রবিউল হুসাইন এবং অন্যরা বিষয়টি কবি বেলাল চৌধুরীর গোচরীভূত করলে কবি বেলাল চৌধুরী মুখ উঁচু করে আদিগন্ত দৃষ্টি দিয়ে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে বলল্লেন, ‘মা গঙ্গা শেষ অবধি তুমিও প্রতিবন্ধী হয়ে গেলে!’ কথাগুলো শুনে আমি স্তম্ভিত হলাম! অনেকক্ষণ মুখ দিয়ে কথা সরেনি। ভাবলাম, কী অপূর্ব প্রকাশ কবি বেলাল চৌধুরীর। কত গভীরতাপূর্ণ। কত না তাঁর প্রকৃতিবাৎসল্য। কী বেদনামথিত রসিকতা!

খুব ছোটবেলা থেকে কবি বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পাকিস্তান আমলে একবার কবিকে জেলে নেওয়া হয়। তখন তাঁর অল্প বয়স। বঙ্গবন্ধুও ওই জেলে ছিলেন। বেলাল চৌধুরীকে দেখে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এই বাচ্চা ছেলেটিকেও পাকিস্তানিরা এতো ভয় পায়।’ যা হোক, সেই যে বেলালভাই কলকাতা গেলেন, তারপর দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে আমাদের দেখা হয়নি। একদিন জানলাম কবি ভারতে থাকা অবস্থায় কোমরের ব্যথাজনিত কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং দিল্লিতে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এর কয়েক মাস পর কবি দেশে ফিরলে তাঁর বাসায় আমি, কবি রবিউল হুসাইন এবং খোরশেদ বাহার দেখা করতে গেলাম। কবির জ্যেষ্ঠপুত্র প্রতীক আমাদের বসার ঘরে বসতে দিলেন। ঘরটি চমৎকার অগোছালো। সারাঘরকে পুস্তকরাজি দখল করে বসেছে। বইয়ের র‌্যাক তো বটেই, সোফার ওপর, মেঝেয় এবং বিভিন্ন স্থানে শুধু বই আর বই। বইগুলোর দিকে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছি আর ভাবছি কিছুক্ষণ পরই আমাদের রোগীর ঘরে নিয়ে যাবে। কিন্তু একি! কবি নিজেই হাঁটতে হাঁটতে বেডরুম থেকে ড্রয়িংরুম পর্যন্ত চলে এলেন। মুখে সেই হাসির রেশ। চোখে-মুখে কোনো রোগক্লিষ্টতার ছায়া নেই, তবে দুর্বলতা আছে। দেখে খুবই ভালো লাগল, অনেকক্ষণ ধরে কথাবার্তা হলো; বিশেষত রবিদার সঙ্গে। এরপর আমরা চা-নাশতা খেয়ে সেদিনের মতো বিদায় নিলাম। এরপরও কয়েকবার কবির বাসায় গিয়েছি। শুনলাম, বাসায় বসে এই সময়টাতে বেশকিছু লেখালেখিও করেছেন। মাঝেমধ্যে ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজনে গাড়ি পাঠানোর জন্য খোরশেদ বাহারকে বেলালভাই টেলিফোন করতেন। ওই সময় দু-একটা কথাবার্তা হতো, বিশেষত রবিদা এবং খোরশেদ বাহারের সঙ্গে।

ক্রমান্বয়ে কবির অসুস্থতার মাত্রা বাড়তে লাগল। প্রায়শই আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে ভর্তি থাকতেন, আবার বাসায় নেওয়া হতো। যতদূর মনে পড়ে, ২০ এপ্রিল, ২০১৮ খোরশেদ বাহার আমাকে টেলিফোনে জানালেন, বেলালভাই ‘লাইফ সাপোর্টে’ আছেন, তখন আমি যশোরের পথে। তার মাত্র কয়েকদিন পরই আমি যশোরে থাকাকালে ২৪ এপ্রিল, ২০১৮ টেলিভিশনে দেখলাম কবি বেলাল চৌধুরী আর নেই।

চলে যাওয়া এই মানুষটির সুদীর্ঘ আশি বছরের এক বিচিত্র ও বর্ণাঢ্য জীবন।

বাউন্ডুলেপনায় কবি বেলাল চৌধুরী বাংলার আরেক দুঃখী নজরুল। তিনি ‘হাওয়ায় হাওয়ায় নিরুদ্দেশ’ হয়েছেন আবার ‘সাত সাগরের ফেনায় ফেনায়’ নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছেন। লেখালেখি, সাংবাদিকতা, পত্রিকা সম্পাদনা, কুমিরের চাষ, পাহাড় বন জঙ্গলে ঘোরাঘুরি, মাছ ধরা, সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়া – কী করেননি তিনি! বাংলার ফুল-পাখি, কাদামাটি, সবুজ প্রকৃতির রং – সবকিছুর নির্যাস তিনি নিয়েছেন প্রাণভরে। বিশ্ব তথা এই উপমহাদেশের বেশকিছু কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সখ্য ও বন্ধুত্ব ছিল। শক্তি চট্টোপ্যাধায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কবিতা সিংহ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, গুন্টার গ্রাস, অমর্ত্য সেন, আবু সায়ীদ আইয়ুব দম্পতি আরো খ্যাতিমান কত মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল ওঠাবসা। তিনি লিখেছেন অসংখ্য লেখা, কবিতা, গদ্য, ভ্রমণকাহিনি, শিশুতোষ, তরজমা – সবকিছুতেই তিনি বিচক্ষণতার ছাপ রেখেছেন। পুরস্কৃতও হয়েছেন বহুবার, রাষ্ট্রীয় একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ নানা পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। অথচ বিশাল এই মানুষটি ছিলেন একেবারেই শিশুর মতো সরল, স্থূল চিন্তাসম্পন্ন মানুষের মতো। আত্মকেন্দ্রিকতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। ঔদার্য ছিল তাঁর চরিত্রের অলংকার। তিনি ছিলেন এপার আর ওপার বাংলার সেতু।

ফারাক্কা বিচ্ছিন্ন করেছে গঙ্গার প্রবাহ আর বেলাল চৌধুরী এপার বাংলার সঙ্গে ওপার বাংলার সাংস্কৃতিক চিন্তার প্রবাহকে বহমান করে রেখে গেছেন। বেলাল চৌধুরীরা মরেন না। ঢোলাঢালা শার্ট-পরিহিত কাঁধে ঝুলন্ত কাপড়ের ব্যাগটা নিয়ে তিনি থপ্থপ্ করে আজো হেঁটে চলেছেন এক বিশ্ব মানবিক মেলবন্ধনের চূড়ার দিকে। তাঁর আত্মা শান্তিতে থাকুক।

Leave a Reply

%d bloggers like this: