মরণ্যা চররে ‘গল্প’ : ভিন্ন বাস্তব, ভিন্ন বয়ন

লেখক: তপোধীর ভট্টার্চায

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সব্যসাচী লেখক কুমার অজিত দত্ত মজলিশ সংলাপ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায়, ২০১৬ সালে, মরণ্যা চরের ইতিকথা নামে উপন্যাসটি লিখেছিলেন। ২০১৯ সালে কিছু সংশোধন ও সংযোজনের পরে ছিয়াশি পৃষ্ঠার উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে গুয়াহাটির ‘স্বরের আড়ালে শ্রুতি প্রকাশনী’। ‘লেখক নিবেদন’ শীর্ষক বয়ানে জানিয়েছেন : ‘ছাত্রাবস্থায় ইতিহাস ও সমাজতন্ত্র অধ্যয়নের মাধ্যমে অসমের চর-জীবন সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা অর্জন করলেও এই প্রসঙ্গটিকে লেখার বিষয় হিসেবে ভাবার অবকাশ পাইনি তখন। কিন্তু এই সেদিনের গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত নামি বাংলা ছোট-পত্রিকা ‘নাইনথ কলাম’-এর ‘চর’ সংখ্যাটি এ-বিষয়টিকে নিয়ে আমায় নিবিড়ভাবে ভাবার অবকাশ এনে দেয়। উজ্জীবিত করে তোলে। যেন একটি পরিত্যক্ত ফাইল খুলে যায়। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সংখ্যাটি পড়ার পর ভেতর থেকে যেন একটা দারুণ ইচ্ছে জাগে, চর-জীবন নিয়ে আরও কিছু জানার কিছু লেখার। এই বিষয়ে আরও বইপত্র ঘাঁটলাম। দূর গাঁয়ের (কামরূপ ও গোয়ালপাড়া জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের দুধনৈ, ধুপধরা, ভালুকডুবি ইত্যাদি) হাটবারের দিন হাটে গিয়ে বিভিন্ন চর থেকে আসা ব্যাপারীদের সঙ্গে আলাপ জমালাম, জানলাম ওদের অতীত ইতিহাসের কথা, দুঃখ-কষ্টের কথা, গার্হস্থ্যজীবনের কথা, শোষণের কথা, সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক উত্থান-পতনের কথা। … এভাবেই ওদের মুখ থেকে শুনে এবং বইপত্র পড়ে ব্রহ্মপুত্র নদের চরজীবন নিয়ে একটা নিটোল রূপরেখা আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল।’
কুমার অজিত দত্ত এভাবেই তাঁর উপন্যাসের নেপথ্য-মহল সম্পর্কে অবহিত করে তোলেন আমাদের।
নিঃসন্দেহে কথাবস্তুকে তিনি এমন একটি বাস্তব পরিসরে গেথে নিতে চেয়েছেন যা ব্রহ্মপুত্র-উপত্যকার বিশিষ্ট এক অন্তেবাসী জনগোষ্ঠীর সংগ্রামখোচিত জীবনকথাকে রূপ দেবে। এই চরবাসী মানুষের (ঔপন্যাসিকের বাচনে ‘চরুয়া’) অস্তিত্ব যে-ধরনের ছায়াচ্ছন্ন ধূসরতায় গ্রথিত, বাংলা সাহিত্যের সাধারণ পড়–য়াদের কাছে তা পুরোপুরি অপরিচিত। বাঙালি পাঠকেরা পদ্মা নদীর মাঝি বা তিতাস একটি নদীর নাম পড়েছেন; নিম্নবর্গীয় জীবনের নিরালোক কী চমৎকার দ্বিবাচনিকতায় আধারিত আখ্যান হয়ে উঠতে পারে, এই শিল্পসত্য দেখেছেন তাঁরা। কেউ কেউ হয়তো ইলিশমারির চর বা গহীন গাঙও পড়েছেন। সেই পাঠ-অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি, বাংলা উপন্যাসের ভূগোল কতটা বিস্তৃত। সেই মানচিত্রে যে এখনো রয়ে গেছে অনাবিষ্কৃত পরিসর, কুমার অজিত দত্ত যেন প্রমাণ করতে চেয়েছেন তা। প্রাগুক্ত ‘নিবেদন’ অংশে তিনি আরো জানিয়েছেন, তাঁর বয়ান হলো – ‘বাস্তব ও কল্পনার রসায়ন। ‘মরণ্যা চরের ইতিকথা’। বলে রাখি ‘মরণ্যা’ নামে কোনো চর নেই। কাল্পনিক।’

দুই
এ-কথা হয়তো বা না-লিখলেও চলত। কেননা, সমস্ত সৃজনশীল বয়ানই ‘বাস্তব ও কল্পনার রসায়নে’র ফল। ‘কবি তব মনোভূমি রামের জনমভূমি অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো’ – এই রবীন্দ্র-সুভাষিত তো সব সৃষ্টির সারাৎসার। গাঁওদিয়া ও কেতুপুর নামে সত্যি কোনো গ্রাম বাস্তবে আছে কিনা, এ-প্রশ্ন আমরা করি না। জানতে চাই না হোসেন মিয়ার ময়না দ্বীপ কোথায় আছে। কিংবা কোথায় গেলে পাওয়া যাবে শমী-কুসুম-সৈনদিদি-বিন্দু-কুবের-কপিলা-মালাদের। তেমনি মরণ্যা নামে চর কোথাও না থাকলে ক্ষতি কী? কুমার অজিত দত্তের কল্পনা তার হদিস পেয়েছে, এইটুকু জানাই যথেষ্ট। কেননা শেক্সপিয়রের A Midsummer NightÕs Dream- এর সূত্রেই জেনেছি স্রষ্টার মন Ôgives to airy nothing/ A local habitation and a name!Õ তো মরণ্যা চর এবং তার বাসিন্দারা থাকে অধিকতর বাস্তবে। তাদের জীবন নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধের জীবন, প্রান্তিকায়িত ব্রাত্যজনের অনুভূতি দিয়ে তাদের মনোলোক লেখক গড়ে তুলেছেন। যে-ভাষায় ওরা কথা বলে তাও কুমার অজিতের নিজস্ব নির্মিতি। এ-প্রসঙ্গে ‘নিবেদন’ অংশে জানানো হয়েছে :
‘এ-উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্রের (চরুয়া অর্থাৎ চরবাসী) মুখের ভাষা কখনো মইমনসিঙিয়া, কখনো অসমিয়া মিশ্রিত মইমনসিঙিয়া। মইমনসিঙিয়া উপভাষাটির প্রয়োগে চেষ্টার ত্রুটি রাখিনি। এই উপভাষাটির প্রস্বর বা উচ্চারণ অত্যন্ত দেহাতি।’
কুমার অজিত দত্তের ঔপন্যাসিক বয়ানে ভাষাতত্ত্বের তত্ত্বভিত্তি কতটা রয়েছে, আপাতত মুলতুবি থাক ও-প্রসঙ্গ। এটুকুই শুধু লেখা যেতে পারে, ইতিহাস-ভূগোল-অর্থনীতি-সংস্কৃতি, সমাজতত্ত্বমূলক চিন্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে উপন্যাসে ব্যবহৃত ভাষা। আসামের অনাবাদি অঞ্চল চাষ করার জন্য ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শক্তি পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে মুসলমান কৃষকদের পুনর্বাসন দিয়েছিল ব্রহ্মপুত্র-উপত্যকার বিস্তীর্ণ ভূভাগে। সরকারি উৎসাহে এরা পাড়ি দিয়েছিল নতুন বসতি গড়ে তোলার জন্যে। সঙ্গে নিয়ে এসেছিল তাদের মুখের ভাষা। তাকে লোকভাষা বলতে পারি কিংবা উপভাষার অন্তর্বর্তী বিভাষা। যাই বলি, ভাষাতত্ত্বসম্মত বাচনিক বৈশিষ্ট্যগুলি মনে না রাখলেই নয়। সমাজের নিচুতলার এই বাসিন্দারা যখন চরাঞ্চলের শরিক হয়ে উঠলেন, তাদের ব্যবহৃত ভাষায় শ্রমসাধ্য ক্রিয়া ও অভিজ্ঞতার বিপুল অভিঘাত প্রকট হয়ে উঠল। আর, সংলগ্ন অঞ্চলের প্রধান ভাষা অসমিয়ার সঙ্গেও তাদের আদান-প্রদান হয়ে উঠল অনিবার্য। কুমার অজিত সাধারণভাবে এ-কথাটি মনে রেখেছেন; তবে যে-বাক্যকাঠামো গড়ে তুলেছেন এবং তাতে যে প্রস্বরের হদিস পেয়েছেন এ-বিষয়ে গভীর আলোচনা প্রয়োজন। এই নিবন্ধকারের এ-বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই বলে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে চাইছি।
যেহেতু কুমার অজিত দত্ত বাংলাভাষার গদ্যকার, তাঁর রচনাবিশ্বে আবহমান বাঙালিসত্তার চেতনাবাহিত ভাষাবোধই সক্রিয়। তাতে রয়েছে কিছু অনস্বীকার্য দ্বৈততার উপলব্ধিও। যেমন প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক, নাগরিক ও গ্রামীণ, কেন্দ্র-সংশ্লিষ্ট ও প্রান্তিকায়িত, বিশিষ্ট ও অবিশিষ্ট। প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবাই যে এই বিভাজনকে জল-অচল বলে মনে করেন, এমন হয়তো নয়। কোথাও কম, কোথাও বেশি মাত্রায় হলেও এসব ভিন্ন পরিসরের মধ্যেও বিনিময় হয়। বাক্-ব্যবহারে, বিশেষত বিশেষ্য-বিশেষণ-ক্রিয়াপদের বিচিত্র ব্যবহারে নতুন একটি কাঠামোর আভাস পাওয়া যায়। কুমার অজিত চরবাসীদের ব্রাত্যজীবনকথাকে ব্যক্ত করার জন্যে শ্রমজীবী মানুষের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জীবনবোধের বৃত্তান্ত উপস্থাপিত করেছেন প্রাগুক্ত ওই দ্বৈততাকে স্বীকৃতি জানিয়ে। তবে তাঁর নির্মিত বাক্ধারায় ভাষাতাত্ত্বিক বৈধতা যদি কোনো পাঠকের প্রধান বিবেচ্য হয়, সেইসঙ্গে তার শিল্পসংবিদগত বৈধতার প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। আসল কথা হলো, মরণ্যা চরের ইতিকথা কেবল পাঠ করলে হয় না, পাঠোদ্ধারও করতে হয়। লক্ষ করতে হয়, বিবৃত বয়ানে অর্থের নির্দিষ্টতা কতখানি, কতটাই বা তার সংযোগ তৈরির দ্রুততা ও সামর্থ্য।

তিন
একটা কাজ কুমার অজিত দত্ত করতে পেরেছেন। আমাদের ভাষায় নিতান্ত অপাঙ্ক্তেয় ব্রাত্যজনদের আখ্যানমালায় আরেকটি ছোট, নেহাতই ছোট, পরিসরের সন্ধান দিয়েছেন। পদ্মা নদীর মাঝি বা তিতাস একটি নদীর নামের তুলনায় (কিংবা ইলিশমারির চর বা চরকাশেম) তাঁর মরণ্যা চরের ইতিকথা কতটা শিল্পপরিসরের দাবিদার, এই প্রশ্নও জরুরি নয়। এমনকি, উপন্যাসের বহুতল সৌধ পেয়েছি কিনা, তার বদলে ভাবতে পারি, আখ্যানের কোনো নতুন ধরনের খোঁজ দিতে পেরেছেন কিনা কুমার অজিত। চরবাসীর অপর পরিসর বিশ্বাস্যভাবে উপস্থাপিত কিনা, এইটেই প্রশ্ন। নিজেদের অগোচরেই আমরা যে এলিটিস্ট অবস্থানের প্রতিষ্ঠা চাই, আমাদের সেই সামগ্রিক মর্যাদার অনুরণন না পেলে মরণ্যা চরের কথকতায় কি বহুকাল-লালিত আকাক্সক্ষার বিপর্যয় দেখতে পাই? কথা হলো, আখ্যানের এই উপস্থাপনায় জাফর-আলম-সুফি-লুৎফা-সোনাভাবি প্রমুখ নামের আড়ালে যাদের দেখতে পাই, তারা সবাই মানব-অস্তিত্বের অপভ্রংশ যেন। কোনোরকমে বেঁচে থাকার জন্যে এরা প্রতিমুহূর্তে যে-যুদ্ধ চালিয়ে যায় সেই উপাত্ত দিয়ে কোনো মহাকাব্য তৈরি সম্ভব নয়। সেরকম অভিপ্রায়ও অবশ্য কুমার অজিতের ছিল না। নিরন্ধ্র শোষণের ইতিবৃত্ত শুধুই ঘোর কালো রঙে এঁকেছেন লেখক, তা কিন্তু নয়; মাঝে মাঝে অন্য আরো রঙের ঝিলিকও পাই। এসব ছায়াচ্ছন্ন মানুষের ভাঙা জীবনেও রাষ্ট্রীয় পীড়নের অভাব নেই। রাষ্ট্রযন্ত্র উপস্থিত পুলিশের বেশে নির্বাচনী আলেয়া এবং বিদেশি তাড়ানোর অজুহাতে। নূরুল মহালদার সর্বাত্মক পীড়ন ও শোষণের দানবিক শক্তির প্রতিনিধি। লুৎফাকে দখল করার জন্যে তার লুব্ধতা হয়তো অপ্রত্যাশিত নয়; তবে জাফরের ভূমিকা কি বয়ানের যৌক্তিক পারম্পর্যকে লঙ্ঘন করেনি? পাঠকের আরো কিছু ধন্দ তৈরি হয় যা নিরসনের জন্য যথেষ্ট পরিসর লেখক জোগান দেননি।
চরবাসীর যে-বাস্তব কুমার অজিতের অন্বিষ্ট, তাতে মধ্যবিত্তবর্গের মূল্যবোধ অবান্তর। আরোপিত কোনো মাপকাঠি দিয়ে চরজীবনকে ব্যাখ্যা না করাই ভালো। বয়ানের যে নতুন ধরন, জলের বুকে চর জেগে ওঠার মতো, প্রকট হয়েছে তাতে অপরতার পরিসর যাবতীয় আস্তিত্বিক বিচ্ছুরণসহ উপস্থিত। কোনো বড় সুখ বা বড় দুঃখ তাদের জীবনে প্রাসঙ্গিক নয়; একমাত্র ব্যতিক্রম উলফৎ। নিরন্ধ্র অন্ধকারের মধ্যে সে আলোর খবর নিয়ে আসে। অবহেলা আর শিক্ষা সম্পর্কে সে নৈতিকতার পাঠ দিয়ে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চায় যে, এই সমাজে সবসময় অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধাচরণ করতে হয়। উলফৎ বিএ পাশ করে তার জন্মভূমি মরণ্যা চরে ফিরে এসেছে জন্মভূমির উন্নতি ও গরিবের সেবা করার জন্যে। এই বয়ানের সাধারণ পরিবেশের তুলনায় তার এসব কথাবার্তা পুরোপুরি বেমানান মনে হতে পারে। বিশেষত সে যখন লুৎফার কাছে রবীন্দ্রনাথের নাম করে। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’ গানটির লোক-সংস্করণ শুনতে পাই উলফতের বাচনে। চরের ছেলেমেয়েদের সে লেখাপড়া শেখাতে চায়। লুৎফাও তার সংস্পর্শে এসে হঠাৎই যেন সীমাতিযায়ী হয়ে ওঠে : ‘আফনে খালি এই মরণ্যা চরের মুক্তির রাস্তা খুইল্যা দিতে যে কামগুলা কত্তে হইব হেগুলা করেন, এগুলা ছাড়াও আফনের তো লিহাফড়ার শ্যাষ নাই, হেগুলাও করেন, নিচ্চিন্তে করেন, কইতাছি তো আমি আফনের লগে আছি।’ (পৃ ৩৬)
লুৎফার মুখে ‘মরণ্যা চরের মুক্তির রাস্তা’ কতটা বাস্তবোচিত, এই খটকা কিন্তু এড়ানো যায় না। তবে কুমার অজিত যেহেতু দেখাতে চান যে, অবিমিশ্র অন্ধকার কোনো সমাজেই নেই, তাই কুঁজো উলফতের মতো আলোর রাখাল চরবাসীর মধ্যে দেখা দেয়। তাদের সচেতন করে তুলতে চায় বছরের পর বছর চলে আসা বঞ্চনা সম্পর্কে। যত অভিযোগ ও প্রতিবাদ তাদের মনের অতলে জমা হয়ে আছে অথচ প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না – সেই সবকিছুকেই উলফৎ বাঙ্ময় করে তুলতে চায়। নূরুল মহালদার ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা কতভাবে তাদের শোষণ করছে, এ-বিষয়ে পাঠ দেয় উলফৎ। সরকারি উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত চরবাসী ট্যাক্স দেয়, ভোট দেয় কিন্তু ‘মাইনসের লাহান বাইচ্যা থাহনের হক’ (পৃ ৪৩) পায় না – নিশ্চেতন চরবাসীদের জাগানোর জন্যে ‘উলফৎ যেন গভীর আকাশের মেঘের আড়াল থেকে’ (তদেব) সেই সত্য ঘোষণা করে। শোষিত ভাঙা মানুষেরা দিশপুর-দিল্লি চেনে না, নিজেদের অধিকার কী তাও বোঝে না। এদের কাছেই উলফৎ বার্তা বয়ে আনে প্রতিরোধের, উত্তরণের : ‘সমমান ফাইতে অইলে একজুট হইয়া লড়তে হইব, লয়ত আমরা যে আন্ধারে আছি হেই আন্ধারেই থাকাম, আমরার মাইয়াগোরেও পেত্যেক দিন হেগ হাতে ধর্ষিতা অইতে অইব …।’ (পৃ ৪৪)

চার
যে-কথা আগেই লিখেছি, সবচেয়ে নিচুতলার, বাস্তবে উপভাষাভাষী বাসিন্দারা ঠিক এভাবে হয়তো কথা বলে না। কুমার অজিতের পরিকল্পিত উপন্যাসীকরণ প্রক্রিয়ায় কুশীলবদের বাস্তব অবস্থানেই বাস্তবাতিযায়ী স্থিতি তৈরি হয় এবং সেই সূত্রে তাদের ভাষাও হয়ে ওঠে বিশেষ নির্মিতি। উলফৎ ও লুৎফা লেখকের মনের মাধুরী দিয়ে তৈরি বলেই কথোপকথনে ভিন্ন মাত্রার দ্যোতনা ফুটে ওঠে। সেই জন্যে সোনাভাবির বিহ্বল উচ্চারণও মানিয়ে যায় : ‘তুমি আদমি না খোদা।’ (পৃ ৪৩) তা সত্ত্বেও, বাস্তবের অকাট্য গ-ি সম্পর্কিত সচেতনতা সর্বত্র বজায় রয়েছে কিনা, এই সংশয় এড়ানো যায় না। উলফৎ যে ‘ধর্ষিতা’ শব্দটি ব্যবহার করেছে, চরবাসীর বোধের নিরিখে তা কি সংগত? তেমনই এই কথাগুলি লক্ষ করা যাক : ‘আমরা অইলাম গিয়া দুখিয়া মানুষ, সারা বছর ধইর‌্যাই হেরা আমরারে অবজ্ঞা, অবহেলা করে, কেবল ওই ভুট আইলেই আমরারে মনত ফরে, এই কালচার হাটাইতে অইব, বুজাইয়া দিতে অইব আমরা দুখিয়া মানুষ হইলেও আমরার নিজাববিয়াকে একটা আদচ্ছ আছে …।’ (পৃ ৪২) ভূতদের সন্তুষ্ট করে ব্রহ্মপুত্রের কাতলা মাছ ধরতে হয়, যাদের কুসংস্কার এই পর্যায়ের এবং যাদের দৈনন্দিন বাস্তবে আদিম পর্যায়ের শোষণ ও অত্যাচার দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত, ‘অবজ্ঞা’, ‘অবহেলা’, ‘কালচার’, ‘আদচ্ছ’, ‘রণকৌশল’ প্রভৃতি শব্দ কি তাদের জন্য দুর্বোধ্য গ্রিক নয়? আগেই লিখেছি, উপভাষা-মিশ্রিত যে-লোকভাষা গড়ে তুলেছেন কুমার অজিত, তা এই বয়ানের জন্যেই বিশেষভাবে পরিকল্পিত। বাংলার উপভাষায় অসমিয়া শব্দ বা ক্রিয়াপদের মিশ্রণে কোনো ভাষাতত্ত্বগত সমস্যা দেখা দিয়েছে কিনা এই জিজ্ঞাসাও মুলতুবি থাকুক। এছাড়া কিছু সংযোগজনিত সমস্যাও রয়েছে। যেমন উলফতের এই উক্তি কি তার চরবাসী শ্রোতাদের কাছে খুব সুবোধ্য হতে পেরেছে … ‘এইভাবে যদি হগ্গল চরুয়া এই টেকনিকটা অ্যাফলাই করে তো নয়া হিস্টোরি মানে ইতিহাস অইব।’ (পৃ ৪১)
অল্পপরিসরেই কুমার অজিত গ্রীষ্ম-বর্ষার বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্রের প্রলয়ংকর বন্যায় চর ডুবে যাওয়ার বিবরণও খুব চিত্তাকর্ষক। এই চরজীবনেই জমির ও সোনাভাবি, লুৎফা ও তার কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে আকবরের জীবনযাপন চলতে থাকে নিজস্ব ছন্দে কিংবা ছন্দহীনতায়। স্বল্পপরিসরে কুমার অজিত ঋতুবর্ণনায় দক্ষতা প্রকাশ করেছেন। চরবাসীর স্বপ্নহীন জীবনে স্বপ্ন দেখতে শেখায় যদিও উলফৎ, প্রতিরোধের এই সূত্রধারকে মহালদারের গুন্ডার হাতে প্রাণ দিতে হয়।
ফতেমা-গুলাফকইনা-আকবর-আমিনাদের মতো ভাঙা-মানুষদের কেন্দ্র করে সময় বয়ে যেতে থাকে। উলফতের মক্তবে মালোগ্রামের চাষি ও জেলেদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে। মরণ্যা চরে নতুন দিনের বার্তা বয়ে আনার জন্য এই চেষ্টারও শত্রু ওই নূরুল মহালদার। পুলিশের সঙ্গে তার যোগসাজশ অটুট থাকে বলে লুৎফার ডেরায় হামলা চালিয়ে যায় জাফরের সাহায্যে।
এ-ধরনের বয়ানে কোনো প্রথাসিদ্ধ উপসংহার থাকতে পারে না, যেহেতু জীবনের চলমানতাই শেষ কথা। তারই মধ্যে নূরুল মহালদারের সঙ্গে চরবাসীর সংঘর্ষ হয়। উলফতের মৃত্যুর পরে বয়ান আমাদের পৌঁছে দেয় সাম্প্রতিক বিদেশি বিতাড়নের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে। যেন উলফতের উত্তরসূরি হয়ে আকবর চরবাসীকে বোঝাতে চায় : ‘না বন্ধুরা, বিদেশি কথাটা কুনো বুতের নাম না ফেতিœরও নাম না। এই নামডা একটা অফমানর নাম।’ (পৃ ৮৯)
কথাগুলিকে আরো কিছুটা বিশদ করে আকবর। তবে কুমার অজিত সম্ভবত তাঁর বয়ানকে প্রাপ্য পরিসর দেননি। পাঠকের প্রত্যাশা তাই খানিকটা অপূর্ণই থেকে যায়। মরণ্যা চরের আবহমান বৃত্তান্তকে অতিসাম্প্রতিক বিদেশি বিতাড়নের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস যুক্ত করায় বয়ানের উপস্থাপনায় যে-সম্ভাবনা আভাসিত হয়েছিল, তার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী হলে ভালো হতো। কেননা বাংলার উপভাষায় কথা বলে এবং তাদের প্রব্রজনের উৎসভূমি অখ- ভারতের অপরিহার্য অংশ ময়মনসিংহ – তাকেই অপরাধ বলে গণ্য করছে যুক্তিহীন আধিপত্যবাদ। উলফতের লড়াই আকবর কতটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে লুৎফা-গুলাফকইনা-মমিন-জমিরেরা, ইচ্ছাপূরণ না করেও উপন্যাসীকরণ প্রক্রিয়ার নিজস্ব পদ্ধতিতে তার ইশারা যদি দিতেন কুমার অজিত, ভালো হতো নাকি?

Leave a Reply

%d bloggers like this: