মাছের চোখ

লেখক: ’সিদ্ধার্থ সিংহ

প্রতি বছরের মতো আজো সমসত্ম রাস্তা গিয়ে মিশেছে বনবাসী কল্যাণ আশ্রমে। শুধু তেলিঘাটা বা জামালপুর নয়, গোটা দক্ষিণ দিনাজপুরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগের দিন সন্ধের আগেই এসে হাজির হয়েছে প্রতিযোগীরা। সকাল থেকেই খেলা শুরু হওয়ার কথা। সেই খেলা দেখার জন্য শুধু উৎসাহীরাই নয়, এমনি ছেলেমেয়েরাও ভিড় করেছে।
কালী এসে তাপসকে বলল, কী রে, যাবি না?
কোথায় যাওয়ার কথা বলছে বুঝতে পেরে তাপস বলল, বাবাকে আগে খাবারটা পৌঁছে দিয়ে আসি।
কালী জানে, ওর বাবা সকাল হলেই খেতে চলে যান। এই সময় তাপস ওর বাবার জন্য নুন, লংকা, পেঁয়াজ-সমেত এক থালা পান্তা নিয়ে যায় মাঠে। কিন্তু আজ যে খেলা আছে। তাই বলল, তোর বোন আছে না? ওকে দিয়ে পাঠিয়ে দে না। তাপসের মা উঠোনের এক ধারে মাটির পাতা উনুনে ধান সেদ্ধ করছিলেন। তিনি শুনে বললেন, কোথায় যাবি রে তোরা?
কালী বলল, আশ্রমে।
– আশ্রমে? পুরো নাম বনবাসী কল্যাণ আশ্রম হলেও স্থানীয় লোকেরা ওটাকে সংক্ষেপে শুধু আশ্রমই বলে। চারিদিকে বনবাদাড় আর জঙ্গল। দশ মাইলের মধ্যে পিচের রাস্তা নেই। এখনো বিদ্যুৎ ঢোকেনি। ফোনের লাইনের কথা না হয় বাদই দিলাম। এখানে মূলত আদিবাসীরাই থাকে। তাদের জীবন-জীবিকা অত্যন্ত নিম্নমানের। ওদের স্বনির্ভর করতেই আশ্রমের লোকেরা আদিবাসী মেয়েদের নানা রকম হাতের কাজ শেখায়। বেতের কাজ, আসন বোনা, ধূপকাঠি তৈরি থেকে আচার বানানো। শেখার সময়েই ওদের কিছু কিছু হাতখরচা দেয়। আর শিখে নিজেরাই বাড়ি থেকে বানিয়ে নিয়ে এলে, সেগুলো আশ্রমই কিনে নিয়ে কলকাতায় সাপস্নাই করে। কয়েক দিন ধরে নাকি বয়স্কদের পড়াশোনাও শেখানো হচ্ছে ওখানে। কিন্তু সেসব তো শুরু হয় দুপুরের পরে। এই সময়ে ওরা আশ্রমে যাবে শুনে ওর মা ভ্রূ কোঁচকালেন।
কালী বলল, আজ খেলা আছে না …
‘খেলা’ শব্দটা ও এমন করে বলল, যেন নবান্ন, দূর্গাপুজো আর প্রতিবার শীতের শুরুতে তিন ক্রোশ দূরে বসা বারো ভূতের মেলার মতো এটাও একটা বিশাল উৎসব।
ওর মাও জানেন, এখানকার লোকদের কাছে এটা একটা উৎসব। গোটা গ্রাম তো বটেই, আশপাশের গ্রামও ভেঙে পড়ে। তাই ভাবলেন, ও তো রোজই পড়াশোনা করে। দুদিন ছাড়া ছাড়াই বাবার সঙ্গে ক্ষক্ষতের ঢেঁড়স, বেগুন, গাছের নারকেল, এটা-ওটা-সেটা পেড়ে বিক্রির জন্য হাটে নিয়ে যায়। ছেলেমানুষ, একটা দিন যদি খেলা দেখতে যেতে চায় তো যাক না … আজ না হয় মেয়েই ওর বাবার জন্য খাবার নিয়ে গেল। না হলে সে-ই যাবে এক ফাঁকে। মাঠ তো আর বেশি দূরে নয়।
কালী বলল, তাড়াতাড়ি চল। ন-টার মধ্যে ওখানে পৌঁছতে হবে কিন্তু।
– ন-টার মধ্যে কেন? খেলা তো দশটার পরে শুরু হবে শুনলাম।
– না। ওরা তো বলল, খেলা শুরু হওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে এসে প্রতিযোগীদের রিপোর্ট করতে হবে।
– সে তো যারা প্রতিযোগী, তাদের করতে হবে। আমাদের কী?
– আমাদের কী মানে? তোকে সেদিন বললাম না, তোর নামটা এবার দিয়ে দেব …
– হ্যাঁ, বলেছিলি। কিন্তু আমি তো তোকে বারণ করে দিয়েছিলাম।
– বারণ করলেই হলো? চল চল চল … তির-ধনুকটাও নিয়ে নে।
দেয়ালের পেড়েকে ঝোলানো ছিল ধনুক। আর তেলকষ্টি পড়া আদ্যিকালের আলমারিটার মাথার ওপরে খবরের কাগজ দিয়ে মোড়ানো ছিল কতগুলো তির। তাপস সেগুলো ঘর থেকে নিয়ে বেরিয়ে এলো।
কয়েক বছর আগে মা-বাবার সঙ্গে তাপস আর ওর বোন গিয়েছিল বারো ভূতের মেলায়। সেখানে ঘুরে ঘুরে ওরা নাগরদোলায় চড়েছিল। ‘ইলেকট্রিক-মেয়ে’ দেখেছিল। তার গায়ে ঠেকালেই টিউবলাইট জ্বলে উঠেছিল। ‘মানুষ-রাক্ষস’ও দেখেছিল ওরা। লোকটা সব কাঁচা কাঁচা খাচ্ছিল। কুমড়ো, লাউডাঁটা, কলাগাছ, বালিশ ছিঁড়ে তুলো, এমনকি শিশি বোতল, বাল্ব পর্যন্ত ভেঙে ভেঙে খাচ্ছিল। ওরা পরোটা-ঘুঘনি খেয়েছিল, বরফজল খেয়েছিল। ফুচকা খেয়েছিল। ঘুরে ঘুরে বাবা কিনেছিলেন তালপাতার পাখা, দা, ধামা। ওর মা কিনেছিলেন চিরুনি, কাচের ফ্রেমে বাঁধানো কালীঠাকুরের ছবি, ডালের কাঁটা। ওর বোন কিনেছিল চুলের ব্যান্ড, টিপের পাতা, নেল পলিশ। আর ও কিনেছিল তির-ধনুক।
তির-ধনুক দেখে ও আর ঠিক থাকতে পারেনি। তার কদিন আগেই দাদুর সঙ্গে ও বেলভাঙা গিয়েছিল। পিসির বাড়ি। তার কিছু দূরেই সাতদিন ধরে হচ্ছিল যাত্রা উৎসব। শেষদিনে ওর পিসেমশাই ওদের নিয়ে গিয়েছিল যাত্রা দেখাতে – রামের বনবাস।
না। টিকিট কাটতে হয়নি। প্রথম ছ-দিন কলকাতার দল করলেও শেষ দিনেরটা করছিল উৎসব কমিটির আয়োজকরা। তাদের নাকি একটি শখের যাত্রাদল আছে। সেই দলে অভিনয় করছিল পিসেমশাইয়ের এক বন্ধু। সে-ই নাকি ওদের পাশ দিয়েছিল।
রামণ্ডলক্ষ্মণের হাতে তির-ধনুক দেখে তাপসের খুব লোভ হয়েছিল। সোনার হরিণের রূপ ধরে আসা ভয়ংকর মায়াবী মারীচকে কীভাবে এক তিরে মেরে দিলো রাম। মন্ত্র পড়ে ছাড়তেই একটা তির কী রকম দশটা হয়ে গেল। যে ছুড়ল, সে চাইতেই তির একেবারে এঁকেবেঁকে গিয়ে তার লক্ষ্যে গিয়ে বিঁধল। কই, বন্দুকের গুলি তো এরকম হয় না।
তাই যাত্রা ভেঙে যাওয়ার পর যখন ওর পিসেমশাই তার সেই বন্ধুর সঙ্গে দেখা করানোর জন্য সাজঘরে নিয়ে গেল, ওর দাদুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো, ও কিন্তু তখন তার দিকে ফিরেও তাকায়নি। একপাশে দাঁড় করিয়ে রাখা তিরটাকে ঘুরে ঘুরে দেখছিল। কী সুন্দর রংচঙে। মনে হচ্ছে রংতা দিয়ে মোড়া।
এই তিরের জন্য কত কী না হয়েছে। অন্ধমুণির ছেলে বাবা-মায়ের জন্য খাবার জল আনতে গিয়ে নদীতে কলসি ডোবাতেই বগ্বগ্ করে এমন শব্দ হয়েছিল যে, দশরথ ভেবেছিলেন, কোনো হরিণ বুঝি জল খাচ্ছে। তাই শিকার করার জন্য সেটা শব্দ লক্ষ্য করে তিনি এরকমই একটি শব্দবাণ ছুড়েছিলেন। আর তাতেই ঘটেছিল মহাবিপত্তি। আর একটু হলেই লংকায় যাওয়ার জন্য রাম এই তির ছুড়েই সমুদ্র শুকিয়ে দিচ্ছিলেন আর কী! এই তির দিয়েই মাছ নয়, জলে মাছের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে মাছের চোখ বিদ্ধ করেছিলেন অর্জুন। ভাবা যায়!
তির দিয়ে কী না হয়। ভাবতে ভাবতে তিরটার কাছে চলে গিয়েছিল ও। দেখার জন্য হাতে নিতেই ড্রেস ছাড়তে যাত্রার জাম্বুবান ও পাশ থেকে রে রে করে উঠেছিল। তার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে দু-চার ধমকও দিয়েছিল সে। বলেছিল, এখানে কী করছিস রে? যা।
তির-ধনুকটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখাও হয়নি তার। তিনি বকার সঙ্গে সঙ্গে দাদুর কাছে চলে না গেলে হয়তো সাজঘর থেকে তাকে সে বেরই করে দিত। মনটা খুব খরাপ হয়ে গিয়েছিল তার। তাই বারো ভূতের মেলায় তির-ধনুকটা দেখেই ও বাবার কাছে বায়না করেছিল। ওর বাবা আর আপত্তি করেননি। ওকে একটা কিনে দিয়েছিলেন।
একটা ধনুকের সঙ্গে একটাই তির। কিন্তু ওর নাছোড়বান্দা স্বভাবের কাছে হার মেনে গিয়েছিলেন দোকানদার। শেষ পর্যন্ত বাড়তি একটা তির তিনি তাপসকে দিয়েছিলেন। সেই তির-ধনুক ওর সব সময়ের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বারবার শক্ত জায়গায় মারলে যদি তিরের মাথাটা নষ্ট হয়ে যায়, তাই গাছের কা– বেশ পুরু করে মাটির দলা লাগিয়ে ও সেটাকে তাক করে মারত। প্রথম প্রথম কাণ্ডের আশপাশ দিয়ে বেরিয়ে যেত। তারপর আসেত্ম আসেত্ম সোজা গিয়ে বিঁধতে শুরু করল কাণ্ডের গায়ে লাগানো মাটির মধ্যে। প্রথম দিকে অনেকটা জায়গা জুড়ে মাটি লাগাতে হলেও পরের দিকে আর অতটা লাগাতে হতো না। ঘুঁটের মতো একটা চাপড়া লাগিয়ে নিলেই হতো। তিরের ফলায় মাটি লেগে গেলে এক মুঠো ঘাস ছিঁড়ে খুব ভালো করে মুছে নিত। কিন্তু দুটো তিরে আর কদিন চলে। তাই নিজেই বাঁশ কেটে বানিয়ে নিয়েছিল বেশ কয়েকটা।
মারতে মারতে ওর এমন টিপ হয়ে গিয়েছিল যে, পেয়ারা পাড়তে গেলে ওর কোনো বন্ধুকেই আর গাছে উঠতে হতো না। ও চার-পাঁচটা তির ছুড়লেই একটা না একটা পেয়ারায় ঠিকই লাগত। কিন্তু লাগলেই যে পেয়ারা পড়ত তা নয়। তাই ওর বন্ধু কালীই ওকে বুদ্ধি দিয়েছিল, তিরের ফলাটা টিনের টুকরো দিয়ে মুড়ে পাথরে ঘষে ঘষে চোখা করে নিতে। ও তাই করেছিল।
তারপর থেকে সরাসরি আমে মারলে ধারালো ফলা আমের গায়ে গেঁথে সেটা পাড়ার জন্য সেই গাছেই উঠতে হতো ওকে বা ওর কোনো বন্ধুকে। তাই কে যেন ওকে বুদ্ধি দিয়েছিল, তিরের পেছন দিকে ফুটো করে অ … নে … ক … টা লম্বা নাইলনের সুতো বেঁধে নিতে। ও তাই করেছিল। তাতে আম বা পেয়ারার গায়ে তির গেঁথে গেলেও ধনুকের লেজে বাঁধা ওই সুতোর শেষ প্রান্তটা ধরে জোরে একটা হ্যাঁচটা টান দিলেই তিরসুদ্ধ আম-পেয়ারাও চলে আসত। সব সময়ই যে তিরের সঙ্গে ফলটাও আসত তা নয়, তাই ও আর ফলে মারত না। মারত, ফল ধরে রাখা বোঁটায়। ফলে ও তির চালানো মানেই নির্ঘাত ফলের পতন।
ওর ওই অব্যর্থ টিপ দেখেই কদিন আগে কালী বলেছিল, এত ভালো টিপ তোর, তুই নাম দিচ্ছিস না কেন? এবার আশ্রমে যে আর্চারি কম্পিটিশন হবে, তোর নামটা আমি দিয়ে দেব।
ও গাঁইগুঁই করলেও ওর নামটা লিখিয়ে এসেছিল কালী। সে জানে, তার বন্ধু কেমন। হয়তো মনেই নেই তার। তাই সকালেই ওকে নিতে এসেছে সে। সে-ই জোর করে ওকে নিয়ে গেল আশ্রমের মাঠে।
মাঠটা খুব বড়। তার একদিকে সার সার ঘর। ঘরগুলোতে ঢালাও বিছানা পাতা। দূর দূর থেকে আসা প্রতিযোগীরা এখানে থাকছে। ঘরের সামনে দিয়ে টানা লম্বা বারান্দা। মাথার ওপরে টিনের ছাউনি। সেখানে লোকে লোকারণ্য। তার এক কোণে চায়ের ব্যবস্থা। এই দাওয়ার সামনে দিয়েই শুরু হয়েছে মাঠ। মাঠের ওদিকে পরপর অনেকগুলো টার্গেট ফেস লাগানো। কয়েকটা কাছে। কয়েকটা দূরে। কয়েকটা আবার আরো দূরে। টার্গেট ফেসগুলো ভারী অদ্ভুত, একটার পর একটা বিভিন্ন রঙের বৃত্ত। ও বুঝতে পারছে, ওটার মাঝখানে মারতে হবে; কিন্তু অতগুলো রং কেন?
ওর প্রশ্নের উত্তর কালীরও জানা নেই। তাই আয়োজকদের একজনের কাছে তাপসকে নিয়ে গেল সে। সেই আয়োজকের পাশেই বসেছিল আমন্ত্রিত হয়ে আসা এক কোচ – রাজেন্দ্র গুইয়া। তখনো প্রতিযোগিতা শুরু হয়নি। ওর প্রশ্ন শুনে তিনি ওকে নিয়ে গেলেন মাঠের ওদিকে টাঙানো টার্গেট ফেসের কাছে। একটার পর একটা বিভিন্ন রঙের বৃত্ত। একদম মাঝখানে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে তিনি বললেন, এই দ্যাখো, এখানে এই যে হলুদ রঙের একটা বৃত্ত দেখছ, এই বৃত্তটাকে কিন্তু কালো সরু লাইন দিয়ে তিনটে ভাগে ভাগ করা আছে। প্রথম এবং দ্বিতীয় বৃত্তের যে কোনো জায়গাতেই তির মারো না কেন, লাগলেই পুরো দশ পয়েনট পাবে। তৃতীয় বৃত্তে লাগলে ন-পয়েন্ট।
তাপস বলল, তাই যদি হয়, তাহলে শুধু শুধু আলাদা একটা লাইন টেনে এই দশ পয়েন্টের হলুদ বৃত্তটাকে দু-ভাগ করা হয়েছে কেন?
উনি বললেন, এই দুটো বৃত্তের যে কোনো জায়গায় লাগলে দশ পয়েন্ট পাবে ঠিকই, কিন্তু খেলার শেষে যদি দেখা যায়, দুজন বা তিনজনের একই স্কোর, তখন দেখা হয়, কে কটা এক্স-এ মেরেছে।
– এক্স-এ মানে?
– এই দ্যাখো মাঝখানে এই যে চিহ্নটা আছে …
তাপস এতক্ষণ খেয়াল করেনি। উনি বলাতে ও দেখল, বৃত্তটার একদম মাঝখানে ছোট একটা যোগ চিহ্ন। ও কিছু বলতে যাবার আগেই তিনি বললেন, এটাকে বলে এক্স। এটাকে ঘিরে যে প্রথম হলুদ বৃত্ত, এখানে মারলে পয়েন্ট হিসেবে দশ নম্বর পেলেও এটার মূল্য কিন্তু আলাদা। একদম আলাদা। এটাকে এক্সেলেন্টও বলতে পারো।
– আর এই লালটা?
– হ্যাঁ, হলুদের পরেই যে গোলাকার লাল বৃত্তটা দেখছ, এখানে খেয়াল করে দ্যাখো, এখানে কিন্তু একটার পর একটা অনেকগুলো রঙের বৃত্ত আছে। প্রতিটি রঙের বৃত্তই কিন্তু সরু একটা কালো রেখা দিয়ে দু-ভাগে ভাগ করা আছে। তোমাকে তো আগেই বললাম, হলুদের প্রথম দুটো বৃত্তের যে কোনো জায়গায় লাগলেই দশ পয়েন্ট। তৃতীয় বৃত্তে লাগলে ন-পয়েন্ট। এর পরেই প্রথম যে লাল বৃত্তটা দেখছ, সেটায় মারলে আট পয়েন্ট, তার পরের লালটায় মারলে সাত পয়েন্ট। ঠিক এভাবেই এর পরের প্রথম নীলে লাগলে ছয় পয়েন্ট। দ্বিতীয়টায় লাগলে পাঁচ পয়েন্ট। তার পরের কালোটায় লাগলে চার এবং তিন পয়েন্ট। আর সবশেষের বৃত্ত এই সাদাটায় লাগলে দুই আর এক পয়েন্ট। প্রতিটি বৃত্তই কিন্তু আট সেন্টিমিটার করে চওড়া।
– কত পয়েন্ট হলে জিতব?
– তোমাকে এখানে পরপর ছ-টা তির মারতে হবে। যে তির যেখানে লাগবে, সেই অনুযায়ী পয়েন্ট পাবে। তারপর সেগুলো যোগ করে যার নম্বর সবচেয়ে বেশি হবে, সে-ই ট্রফি জিতবে।
– কিন্তু আমার কাছে তো অতগুলো তির নেই।
– ক-টা আছে?
– তিনটে।
– তিনটে! কোথায়?
– ওই যে, আমার বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে, ওর কাছে।
সার সার ঘরের সামনের দাওয়ায় প্রচুর ভিড় থাকলেও দূর থেকে তাপসের দেখিয়ে দেওয়া কালীকে চিনে নিতে কোনো অসুবিধে হয় না রাজেন্দ্রের। কালীর হাতের ধনুক দেখে তাপসের দিকে তাকালেন তিনি। বললেন, তুমি কি এই তির দিয়ে লড়বে নাকি?
ও বলল, হ্যাঁ। কেন?
রাজেন্দ্র থ হয়ে গেল। বাঁশের তির তো কোন ছাড়, বাতাসে বাঁক খেতে খেতে যায় দেখে অ্যালুমিনিয়ামের তিরও এখন আর কেউই প্রায় ব্যবহার করে না। অনেকদিন আগেই ব্যাকডেটেড হয়ে গেছে। আর এ কিনা এই তির দিয়ে লড়বে!
ও এখানে মূলত বিচারক হিসেবে এলেও ওর আসল উদ্দেশ্য সত্যিকারের একটা-দুটো তিরন্দাজকে খুঁজে বের করা। সেজন্য নিজে থেকেই বিভিন্ন উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় ঘুরে বেড়ায় ও। কখনো চলে যায় পুরুলিয়ায়। কখনো বাঁকুড়ায়। আর আজ এসেছে দক্ষিণ দিনাজপুরের এই তেলিঘাটায়। ও জানে, জিন একটা বড় ফ্যাক্টর। এই আদিবাসী উপজাতিদের রক্তেই মিশে আছে তির-ধনুক। তাদের যদি ঠিকমতো প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তাহলে তারা অনেক সহজেই নিজেদের একটা জায়গা করে নিতে পারবে। যেভাবে পেরেছিল লিম্বারাম, শ্যামলালেরা।
সেই কবে কোন প্রস্ত্তর যুগে শিকার করার জন্য পাইন গাছের ডাল কেটে তির-ধনুক বানাত লোকেরা। তাম্রযুগে তো ইজিপ্টের লোকেরা রীতিমতো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত তির-ধনুক। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, চৌষট্টি হাজার বছর আগে পাথরের মাথা ঘষে ঘষে তিরের ফলা বানানো হতো আফ্রিকাতে। যিশু খ্রিষ্টের জন্মেরও আট-ন হাজার বছর আগে ইউরোপের অ্যাহেনসবার্গ উপত্যকার স্টেল মুরে প্রথম ‘ডি’ আকৃতির ধনুক বানাতে শুরু করে প্যালিওলিথিক ম্যাসোলিথিকরা। এই তো সেদিন, উনিশশো চলিস্নশ সালে প্রায় পাঁচ ফুট লম্বা এই ধরনের দুটো ধনুক পাওয়া গিয়েছিল ডেনমার্কের হোমগার্ডে।
তির-ধনুক কী আজকের কথা। সেই রামায়ণ-মহাভারতের যুগ থেকে চলে আসছে। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে পরেই উইল এবং মরিস থমসনকে সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নিতে হয়। তাঁরা ছিলেন দুই ভাই। অবসরের সময় তাঁদের বনদুকগুলোও জমা দিয়ে দিতে হয়েছিল। ফলে শিকারের জন্য তাঁরা বেছে নেন তির-ধনুককেই। আর তির ছুড়তে ছুড়তে তাঁরা তির-ধনুকের এতটাই প্রেমে পড়ে যান যে, তাঁরা এটাকে খেলা হিসেবে প্রচলন করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। এই দুই ভাইয়ের সঙ্গে এসে গাঁটছড়া বাঁধেন তাঁদের এক ভৃত্যও। তিনি আবার ইংলিশ স্টাইলের তিরন্দাজি সম্পর্কে অনেক কিছু জানতেন। তাঁর কাছ থেকে সেসব শুনে মরিস একটা বই-ই লিখে ফেললেন – দ্য উইচেরি অব আর্চারি। সেটি অনেক দিন পর্যন্ত বেস্ট সেলারের জায়গাটা দখল করে রেখেছিল।
১৯৭২ সালে মিউনিখ গেমসে তিরন্দাজিকে খেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এদেশে উনিশশো তিয়াত্তর সালে তৈরি হয় আর্চারি অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া। তালিম দেওয়া শুরু হয় ১৯৭৫ সাল থেকে। পশ্চিমবাংলায় গড়ে ওঠে বরানগর আর্চারি ক্লাব আর কলকাতা আর্চারি ক্লাব। তারপর কত কী অদলবদল হয়েছে। কত আধুনিক হয়েছে তির-ধনুক। আর এ কিনা বলছে এই বাঁশের তির-ধনুক দিয়ে লড়বে!
রাজেন্দ্র ওকে মাঠ থেকে নিয়ে এলেন সার সার ঘরের শেষদিকের একটা ঘরে। সেই ঘরে পরপর রাখা আছে অনেকগুলো ধনুক। ওগুলো দেখে তাপস চমকে উঠল। এগুলো ধনুক। কোনোটার দুদিকে কী সব চাকা-টাকা লাগানো। কোনোটায় সামনে দুরবিনের মতো কী সব, তো কোনোটায় আবার মিটারের মতো ছোট্ট কী একটা লাগানো। মারবে তো তির, তার জন্য আবার এতো কী! ও কিছু বলতে যাবার আগেই রাজেন্দ্র সেখান থেকে একটি গস্নাস ফাইবারের ধনুক ওর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, তুমি যে তির-ধনুক নিয়ে এসেছ, সেটা দিয়ে এদের সঙ্গে তুমি লড়বে কী করে? তোমাকে খেলতে হবে এই তির-ধনুক নিয়ে। এদিকে এসো … বলে, ওকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে এসে বলল, ওই টার্গেট ফেস লক্ষ করে একটা তির ছোড়ো তো দেখি।
তাপস ধনুক তুলল ঠিকই, কিন্তু এরকম ধনুক এর আগে ও কখনো হাতে নেয়নি। এতে হাজার রকম ফ্যাচাং ফলে কীভাবে তির মারতে হবে ও ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না। তবু তাক করে মারতেই তিরটা টার্গেট ফেসের অনেক উঁচু দিয়ে বেরিয়ে গেল।
রাজেন্দ্র বলল, তুমি কীভাবে টিপ করেছ?
ও বলল, যেভাবে করি, সেই ভাবে।
রাজেন্দ্র বলল, এটা বাঁশের ধনুক নয় যে তিরের মাথা দিয়ে টার্গেটটাকে লক্ষ্য করে মারবে। ওভাবে মারলে হবে না। এই ধনুক ব্যবহার করার একটা কৌশল আছে। আগে ধনুকটাকে ঠিকভাবে ধরো। বলেই, তিনি নিজেই দেখিয়ে দিয়ে বললেন, হ্যান্ডেলটার এখানে আঙুল দিয়ে এইভাবে ধরো। তিরের ওপরের দিকটা অ্যারো রেস্টে রেখে এবার স্ট্রিংয়ের এই নকিং পয়েন্টে তিরের পেছনটা আটকে ছিলাটাকে টেনে, যেটাকে মারতে চাও, দুরবিনের মতো এই লাল রংয়ের সাইট পিন দিয়ে সেটাকে তাক করে তারপর ছেড়ে দাও। তবে তার আগে এই আর্ম গার্ড আর ফিঙ্গার ট্যাপটা পরে নাও।
পরা তো দূরের কথা। এর আগে এগুলো ও কোনোদিন চোখেই দেখেনি। নামও শোনেনি। মারবে তির, তার জন্য আবার এসব পরা কেন? ও জিজ্ঞেস করল, এগুলো পরতে হবে?
রাজেন্দ্র বলল, খুব জোরে ছিলাটাকে টানতে হয় তো, এগুলো না পরলে আচমকা পেশিতে লেগে যেতে পারে। আচ্ছা, নাও, চালাও দেখি …
এতোদিন ধরে তির চালাচ্ছে সে, অথচ আজকে এই নতুন ধনুকটা তুলে হাতটাকে ও ঠিকমতো স্থিরই রাখতে পারছে না। থরথর করে কাঁপছে। তবু চালিয়ে দিলো তাপস। কিন্তু ওর তির হলুদ, লাল, নীল, কালো, সাদা কোনো বৃত্তেই লাগল না। টার্গেট ফেসের অনেক দূর থেকে বেরিয়ে গেল। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ সব কটাই তাই হলো। পঞ্চমটা সাদা বৃত্তের বাইরে টার্গেট ফেসের চতুষ্কোণের একটা কোণে গিয়ে লাগল। তার পরেরটাও তাই। যারা ওর তির ছোড়া দেখছিল, তারা ওকে দেখে মুখ টিপে টিপে হাসছিল। হাসছিল বাচ্চা বাচ্চা মেয়েও। একজন তো রাজেন্দ্রকে বলেই ফেলল, আগে ধনুক ধরা শেখান স্যার, তার পরে হাতে তির দেবেন।
রাজেন্দ্র বলল, তুমি বরং নামটা তুলে নাও। এখানে কারা নাম দিয়েছে জানো?
কে নাম দিয়েছে, তা জানার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই ওর। ওর মনে হলো, যে-লোকটা নিজে থেকে এগিয়ে এসে ওর হাতে তির-ধনুক তুলে দিয়েছিলেন, তিনি যখন এ-কথা বলছেন, তখন নিশ্চয়ই ওকে হাস্যকর হওয়ার হাত থেকে বাঁচাবার জন্যই বলছেন। ওনাকে ধন্যবাদ জানানো উচিত। তবু ও মুখে কোনো কথা বলল না। ও তখন পালাতে পারলে বাঁচে। তাই রাজেন্দ্রের হাতে তির-ধনুকটা কোনো রকমে দিয়েই পাশে দাঁড়ানো কালীর দিকে তাকিয়ে ও বলল, না রে, আমার দ্বারা হবে না।
তাপসের থমথমে মুখ দেখে কালী ওকে আর প্রতিযোগিতা থেকে নাম তুলে না নেওয়ার জন্য চাপ দেয়নি। শুধু বলল, ঠিক আছে, তোকে খেলতে হবে না। চল। তবে, তার আগে কথা দে, দুপুরবেলায় তুই আমাকে অনেকগুলো আম পেড়ে দিবি!
আম পাড়া আর এমনকি! একটা তির ছুড়লেই তো একটা আম। তাই বলেছিল, ঠিক আছে পেড়ে দেবো।
দুপুরে কালী আসেনি। তাই আম পাড়তে যাওয়াও হয়নি তার। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে যখন বিকেল হওয়ার মুখে, তখন কালী এসে হাজির। ওর পীড়াপীড়িতেই কালীর সঙ্গে ও গেল লক্ষ্মীদের আমবাগানে। যেখানে অনেকগুলো আমগাছ পরপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। কালী বলল, আমি তোকে যে আমগুলি পাড়তে বলব, তুই শুধু সেগুলিই পাড়বি। অন্য আম পাড়লে কিন্তু হবে না।
ও বলল, ঠিক আছে।
তারপর কালী যে-আমটাকেই দেখিয়ে দেয়, ও সেটাকেই লক্ষ করে তির ছোড়ে। আর চোখের পলক পড়ার আগেই সেটা মাটিতে এসে পড়ে। একটা নয়, দুটো নয়, টপাটপ পড়তে লাগল একটার পর একটা আম। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক ঝুড়ির ওপরে হয়ে গেল।
কালী বললে হয়তো আরো পাড়ত। কিন্তু তার আগেই পেছনের একটা প্রকা- গাছের আড়াল থেকে রুমা ম্যাডাম বলে উঠলেন, এক্সেলেন্ট।
পেছন ফিরে তাপস দেখল, একজন ভদ্রমহিলা। যাকে ও আজ সকালেই বনবাসী কল্যাণ আশ্রমে দেখেছিল। এই প্রতিযোগিতা উপলক্ষক্ষই তিনি নাকি কলকাতা থেকে এসেছেন। তিনি ওকে বললেন, তুমি আমার সঙ্গে যাবে?
তাপস বলল, কোথায়?
উনি বললেন, কলকাতায়।
সেদিন সন্ধাতেই ওদের বাড়ি গিয়ে রুমা ম্যাডাম আর রাজেন্দ্র ওর বাবা-মাকে কী বুঝিয়েছেন, তাপস জানে না। শুধু জানে, তার বাবা-মা রাজি হয়ে গেছেন। তাই পরদিন সকালে একটা কিডস ব্যাগে কয়েকটা জামা-প্যান্ট নিয়ে ওদের সঙ্গেই কলকাতার পথে পা বাড়িয়েছিল তাপস। তাদের দুজনের সঙ্গেই নাকি খুব ভালো সম্পর্ক ক্যালকাটা আর্চারি ক্লাবের। তাপসকে সেখানে ভর্তি করে দিলেন রুমা ম্যাডাম। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন রাজেন্দ্র। ওখানে যেমন ট্রেনিং হয়, হতো। ওঁরা নিজেরা গিয়েও মাঝে মাঝে তালিম দিয়ে আসতেন।
বনবাসী কল্যাণ আশ্রমে কুড়ি কি তিরিশ মিটার দূর থেকে তির ছুড়তে হতো। এখন ও সত্তর মিটার দূর থেকে ছোড়ে। সাব জুনিয়রে এক ফিটার রাউন্ড ওকে খেলতে হবে। এক ফিটার রাউন্ড মানে সত্তর মিটার, ষাট মিটার, পঞ্চাশ মিটার আর তিরিশ মিটার দূর থেকে পরপর ছ-টা করে ছ-বার, মানে এক-একটা দূরত্ব থেকে ছত্রিশটা করে, মোট চারটি দূরত্ব থেকে একশো চুয়ালিস্নশটা তির ছুড়তে হবে।
তার বয়স যখন কুড়ি বছর পেরিয়ে যাবে, তখন সে জুনিয়র বা তারও পরে যখন সিনিয়রে যাবে, তখন তাকে তিরিশ, পঞ্চাশ, সত্তর আর নববই মিটার দূর থেকে তির ছুড়তে হবে। মেয়ে হলে অবশ্য একটা-দুটো ক্ষেত্রে দশ মিটার করে দূরত্ব কমে যেত। কিন্তু সে তো আর মেয়ে নয়। তাই সেটা ভেবে তার কোনো লাভ নেই।
এখন তার একটাই লক্ষ্য, ওই একশো চুয়ালিস্নশটা তির ছুড়ে যত বেশি নম্বর তোলা যায় সে তুলবে। ওই একশ চুয়ালিস্নশটা তির ঠিক ঠিক জায়গায় মারতে পারলে নাকি একেবারে চোদ্দোশো চলিস্নশ পয়েন্ট তোলা যায়। কয়েক দিন আগে ছত্তিশগড়ের রায়পুরে সাব-জুনিয়র ন্যাশনালে খেলতে গিয়ে কার কাছে যেন ও শুনেছিল, দু-হাজার দশের এশিয়ান গেমসে নাকি কোরিয়ার একটি ছেলে – কিম মু জিম, তেরোশো সাতাশি পয়েন্ট করেছিল। এখন অবধি ছেলেদের মধ্যে ওটাই হায়েস্ট স্কোর। তবে এখনো পর্যন্ত সর্বকালের রেকর্ড পয়েন্টের অধিকারী কিন্তু কোরিয়ার একটি মেয়ে – পার্ক সান হুম। দু-হাজার চার সালে সে করেছিল চোদ্দোশো নয়। যেটা কল্পনা করাও মুশকিল।
তবু আজকাল তাপসের মনে হচ্ছে, ওরা যদি পারে, আমি কেন পারব না? এখন তো সাই থেকে আমাকে কোরিয়ান উইন অ্যান্ড উইনের ধনুক দিয়েছে। এক লাখ টাকাতেও যা পাওয়া যাবে না। এটা দিয়ে তির ছুড়লে যেমন সোজা যায়, তেমনি ছোটেও ভীষণ জোরে। তির ছোড়ার জন্য শক্তিও লাগে কম। ঈপ্সিত লক্ষ্যেও পৌঁছানো যায় অনেক সহজে। তাছাড়া মাঝে মাঝেই ধর্মেন্দ্র তেওয়ারি, পূর্ণিমা মাহাত্যের মতো জগদ্বিখ্যাত কোচেরাও এখানে এসে আমাদের ট্রেনিং দিয়ে যাচ্ছেন। তাহলে আমরা পারব না কেন?
একেবারে জানপ্রাণ লাগিয়ে দিয়েছিল তাপস। সেই গেমসে ফাটাফাটি পয়েন্ট পেয়েছিল ও। আর সেটার জন্যই আগামী অলিম্পিকের জন্য যে বত্রিশ জন ছেলেমেয়েকে বেছে নেওয়া হয়েছে, সেই তালিকায় নাম উঠেছে ওর। পরে ও জেনেছে, নির্বাচন কমিটিতে নাকি সেই রুমা ম্যাডাম আর রাজেন্দ্রও ছিলেন।
এখন প্রতিদিন সাইতে তার দুবেলা অনুশীলন চলছে। সকালবেলায় জ্যাম বা মাখন দিয়ে ছ-পিস রুটি, এক গস্নাস দুধ, একটা কলা আর দুটো ডিম খেয়ে মাঠে চলে আসে। ন-টা থেকে বারোটা অবধি টানা প্র্যাকটিস করে। তারপর ফিরে যায় ক-হাত দূরের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। গ্যালারির নিচের একটা ঘরে কয়েকজন তিরন্দাজির সঙ্গে ও থাকে। সেখানে স্নানটান সেরে হয় মাছ, নয়তো ডিম দিয়ে ডাল ভাত তরিতরকারি খেয়ে একটু বিশ্রাম। এক গস্নাস দুধ খেয়ে ফের সাড়ে তিনটের মধ্যে মাঠে। সাড়ে পাঁচটা ছ-টা পর্যন্ত অনুশীলন। রাত হওয়ার আগেই ভাত কিংবা রুটি, হয় তরকা, নয়তো ঘুঘনি, সঙ্গে একটা ডিম, কোনো কোনো দিন অবশ্য মাংসও হয়, খেয়ে টানা ঘুম। এটা এখন সপ্তাহের ছ-দিনের রুটিন হয়ে গেছে ওর। মাঝেমধ্যেই একঘেয়েমি লাগে। তবু আর্চারি মাঠে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই ওর শরীর যেন চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
ওদের যে বত্রিশ জন অলিম্পিকের জন্য তৈরি হচ্ছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল রাহুল। তাই ওকে দেখিয়ে কদিন আগে রুমা ম্যাডাম বলেছিলেন, ওকে দ্যাখো, একটা ছেলে ক্যারাটে শিখতে শিখতে বারো বছরের মধ্যে তিরন্দাজির কোন জায়গায় পৌঁছে গেছে। ওর মতো হতে পারবে?
ওকে অন্য কারো সঙ্গে তুলনা করলে কিংবা অন্য কারো মতো হতে বললেই ওর মাথা গরম হয়ে যায়। ও তো ও-ই। ও অন্যের মতো হতে যাবে কেন? তাই একটু রেগেই গিয়েছিল ও। মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল, ও যা হয়েছে, ওর দিদির জন্য হয়েছে। মাথার ওপর ওরকম একটা দিদি থাকলে বারো বছর নয়, আমি বারো মাসে ওর জায়গায় পৌঁছে যেতাম।
রুমা ম্যাডামের হাতেই তৈরি হয়েছিল ওর দিদি দোলা ব্যানার্জি। এখন তিরন্দাজিতে এক নম্বর। ওর দোহাই দিতেই তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, ওর দিদি যে-ই হোক। কম্পিটিশনের সময় কিন্তু ওর দিদি তির ছুড়তে আসবে না। মাঠে দাঁড়িয়ে ওকেই মারতে হবে। জানবে, পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষই কোনো না কোনো কাজের জন্য জন্মায়। বেশিরভাগ লোক সারাজীবনেও জানতে পারে না, সে কীসের জন্য জন্মেছে। যদি জানতে পারত, আর সেটাতেই যদি মন-প্রাণ সঁপে দিত, তাহলে প্রত্যেকেই সফল হতো।
যার মূর্তি গড়ার কথা, সে টেবিল টেনিস খেলছে। যার নেতা হবার কথা, সে সাঁতার শিখে সময় নষ্ট করছে। শচীন তেন্ডুলকার যদি ক্রিকেট না খেলে ছবি আঁকতেন, তাহলে কি সফল হতেন? অভিনয়ে না এসে অমিতাভ বচ্চন যদি ওঁর বাবার মতো কবিতাই লিখতেন, তাহলে কি ওঁকে নিয়ে এইভাবে কেউ নাচানাচি করত? আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
আসলে নিজেকে জানতে হয়, কীসের জন্য তার জন্ম। আর সেটা জানতে পারলেই কেল্লা ফতে। আমার তো মনে হয়, রাহুলের জন্মই হয়েছে তিরন্দাজ হওয়ার জন্য। সেজন্য তাক করার সময় ও অন্য কোনো রং দেখে না। শুধু হলুদটা দ্যাখে, শুধু হলুদটা।
সেদিন ঘরে ফিরে গিয়ে সারারাত আর দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি ও। শুধু ভেবেছে, কীসের জন্য তার জন্ম। কীসের জন্য! কীসের জন্য!
অলিম্পিক গেমসের এখনো অনেকদিন বাকি। গতকাল শুতে শুতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। সকালে চোখ খুলতেই পারছিল না। তবু প্রতিদিনকার মতো ন-টা বাজার আগেই আর্চারি গ্রাউন্ডে চলে এলো ও। টার্গেট ফেসের দিকে তাকাতেই ও দেখল, কোথায় পেছনের বিশাল বিশাল সবুজ গাছপালা। কোথায় তারও পেছন থেকে উঁকি মারতে থাকা আকাশ ছুঁইছুঁই স্টেডিয়ামের গ্যালারি। কোথায় তার ওপরের আকাশ! ও কিচ্ছু দেখতে পেল না। কিচ্ছু না। সব কেমন যেন হলুদ হয়ে গেছে। আর সেই হলুদের মাঝখানে বিশাল একটা যোগ চিহ্ন। যেটাকে দেখিয়ে বনবাসী কল্যাণ আশ্রমের মাঠে রাজেন্দ্র গুইয়া তাকে বলেছিলেন, এটাকে বলে এক্স। এটাকে ঘিরে যে প্রথম হলুদ বৃত্ত, এখানে মারলে পয়েন্ট হিসেবে দশ নম্বর পেলেও এটার মূল্য কিন্তু আলাদা। একদম আলাদা। কারো সঙ্গে ড্র হয়ে গেলে তখন দেখা হয়, কে ক-টা এক্স-এ মেরেছে। এটাকে এক্সিলেন্টও বলতে পারো।
ও ক-দিন ধরেই তির মারার সময় সাদা নয়, কালো নয়, নীল নয়, লাল নয়, শুধু হলুদ দেখছিল। কিন্তু এখন এই মুহূর্তে আর হলুদও দেখছে না। হলুদের মাঝখানে যে আকাশ জোড়া যোগ চিহ্নটা জ্বলজ্বল করছে, ও কেবল সেটাই দেখছে, শুধু সেটাই। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ ওর মনে হলো, ওটা কোনো যোগ চিহ্ন নয়, ওটা একটা চোখ। মাছের চোখ। জলে যার প্রতিবিম্ব দেখে অর্জুন তির ছুড়েছিলেন, সেই চোখ।

Leave a Reply

%d bloggers like this: