মাধুর্যময় ও মনোগ্রাহী স্মৃতিকথা

লেখক:

আবুল হাসনাত

রেহমান সোবহানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে দূর থেকেই শ্রদ্ধা করে এসেছি। তাঁর সঙ্গে কোনোদিন আলাপ হয়নি। সুযোগ হয়েছিল দু-একবার। কিন্তু সাহসে কুলোয়নি। যে-মানুষটি দুই অর্থনীতির অন্যতম প্রবক্তা এবং শোনা যায়, ছয় দফা প্রণয়নে এবং আড়ালে থেকে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মেনিফেস্টো প্রণয়নে বৃহৎ ভূমিকা রেখেছেন অনেকের মধ্যে, তাঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য যে-প্রস্ত্ততি প্রয়োজন, তা আমার নেই। সংকোচও একটি কারণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস নির্মাণে ও আর্থনীতিক গতিপথকে আলোকাভিসারী করার জন্য এ-মানুষটি কখনো প্রচ্ছন্নে, কখনো প্রকাশ্যে যে-ভূমিকা রেখেছেন, সে-উচ্চতাই আমাকে সবসময়ে তাঁর সঙ্গে আলাপ করা থেকে নিরস্ত করেছে। তাঁর কীর্তিময় অবদান জানা সত্ত্বেও তাঁর ভুবন এবং পদচারণা সম্পূর্ণ ভিন্নতর জগতে হওয়ায় দ্বিধাও কাজ করেছে। যে-কোনো কীর্তিমান, তাঁর মতো প–ত ও বিদ্যানুরাগী মানুষের সঙ্গে আলাপ করার জন্য যে গভীরতা ও প্রজ্ঞা প্রয়োজন, তা আমার নেই। যদিও মুগ্ধ বিস্ময়ে তাঁর বক্তৃতা শুনেছি বহুবার এবং সভা-সমিতিতে অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর বিশেস্নষণ শ্রবণের সুযোগ হয়েছে। তাঁর এসব অর্জন আমাকে তাঁর সম্পর্কে কৌতূহলী করে তুলেছিল। ষাটের দশকের মধ্যপর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রদ্ধা-জাগানিয়া যে-কজন অধ্যাপককে করিডোরে হাঁটতে দেখেছি, তাঁদের মধ্যে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ বিরল এক ব্যক্তি : মুখে কৌতুক ও স্মিত হাসি, সেটুকুও সব নয়, আরো কিছু এবং আরো গভীর।

ব্যক্তিত্ব, অধ্যয়নপ্রীতি, অর্থনৈতিক নীতি-প্রণয়নে দৃষ্টিভঙ্গি, অধ্যাপনার গুণাবলি, শিক্ষার্থীদের প্রতি অপার স্নেহ, জ্ঞানী ও তর্কপ্রিয় এবং জিজ্ঞাসা-উন্মুখ শিক্ষাব্রতী তৈরিতে সর্বদা প্রয়াস রেহমান সোবহানকে বুদ্ধির দীপ্তিতে উজ্জ্বল চেতনাসম্পন্ন বুদ্ধিজীবী হিসেবে সারস্বত সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এছাড়া তাঁর নানামুখী কর্ম এ-অঞ্চলের বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম, ন্যায়ভিত্তিক  বৈষম্যহীন  ও কল্যাণকর এক সমাজনির্মাণে বিরতিহীন প্রেরণা ও প্রবর্তনা রেহমান সোবহানকে এদেশের অর্থনৈতিক পরিম-লে বিশিষ্ট তাত্ত্বিক হিসেবে পরিচিতি দান করেছে।

এ-অঞ্চলের বাঙালির শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের প্রয়াসে তিনি দীর্ঘ ছয় দশক ধরে ব্যাপৃত রয়েছেন। এই সংশ্লিষ্টতায় রেহমান সোবহান হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক-সামাজিক ইতিহাসেও সম্মাননীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর এ-অবস্থান অবহিত থাকা সত্ত্বেও তিনি সুদূর এক মানুষই ছিলেন আমাদের অনেকের কাছে।

সম্প্রতি তাঁর রচিত স্মৃতিকথা আমাদের হাতে এসেছে।  সেজ পাবলিকেশনস ইন্ডিয়া লিমিটেড দিলিস্ন থেকে বইটি প্রকাশ করেছে।  বইটির নাম Untranquil Recollections : The Years of Fulfilment। স্মৃতিকথাটি বর্ণনার গুণে এবং তথ্যে বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য দলিল হয়ে উঠেছে। বইটিতে সতেরোটি  অধ্যায় আছে। আমাদের জন্য সর্বাপেক্ষা আগ্রহসঞ্চারী পর্ব তাঁর ছেলেবেলার দার্জিলিং, যৌবনকালে কেমব্রিজ ও নবীন অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসার পূর্ব পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অর্থনীতি বিভাগই তাঁর কাছে উজ্জ্বল কর্মের এক ক্ষেত্রে পরিগণিত হয়েছিল। এ-বিভাগকে ঘিরে তাঁর ভাবনা, জিজ্ঞাসা ও কর্মের নানামুখীরূপে যে-ছবি  উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তা সত্যিকার অর্থেই তাঁর মানসগঠনে প্রভাব ফেলেছে। ২১ বছর বয়সে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগ দেন ৩০-৩২ বছর বয়সে দেশের অর্থনীতি ও ভূমিসংস্কার সম্পর্কে যে-বিশেস্নষণ করেন, তা বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে আছে। মাধুর্যময় ও মনোগ্রাহী এ-বইটির পাঠ আমাদের অভিজ্ঞতার দিগন্তকে বিসত্মৃত করে। নিরাসক্ত ভঙ্গিতে লেখা বইটি শুধু স্মৃতিই নয়, হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের বিগত সত্তর বছরের রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি। সেজন্যে এ হয়ে ওঠে এক আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতাও। কৈশোরকাল থেকে অদ্যাবধি তাঁর জীবন বর্ণাঢ্য, ঘটনাবহুল এবং সংগ্রামী চেতনায় দ্যুতিময়।

বইটি পড়ার পর একই সঙ্গে উপলব্ধি করা যায়, এ-অঞ্চলের বাঙালির বাংলাদেশ-সন্ধান এবং নির্মাণের ঐতিহাসিক তাগিদ ও গুরুত্ব। বইটির কথক প্রতিষ্ঠিত খ্যাতিসম্পন্ন একজন অর্থনীতিবিদ। কিন্তু সেটা মুখ্য নয়। অর্থনীতি প্রাধান্য বিসত্মার করেছে – এ-কথা ঠাহর করা যায় এবং নিজেকে বৃহত্তর ভুবনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেখেছেন বটে, কিন্তু এই দেখা হয়ে উঠেছে একটি জাতির উত্থানেরও কালপর্ব-প্রত্যক্ষণ। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে যখন বৃহত্তর বোধ ও বুদ্ধি দিয়ে বিশেস্নষণ করেছেন নানা ঘটনা, তা হয়ে উঠেছে দীপিত হওয়ার মতো বিষয়।

রেহমান শৈশব-কৈশোরকালের নানা অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। একই সঙ্গে পূর্ববঙ্গের বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রামের ও প্রবাহের সাক্ষী তিনি। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রবহমান ধারার সঙ্গীও বটে। আশ্চর্য এক নিরাসক্ত ভঙ্গিতে এ-স্মৃতিকথায় নিজের কথা, পরিবারের বৃহত্তম পরিম-ল, পরিবারের অভ্যন্তরের অন্তরঙ্গ দৃশ্যাবলি, অধ্যয়ন, বিদেশে অধ্যয়নকালে বন্ধুবৃত্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা, ষাটের দশকের রাজনৈতিক আবহ ও মুক্তিযুদ্ধ বর্ণনা করেছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ যে আকস্মিক হয়নি, তার জন্য এ-অঞ্চলের বাঙালিকে যে কত স্তরে ও অতলামিত্মক গভীরতা নিয়ে সংগ্রাম করতে হয়েছে, এ-গ্রন্থ পাঠে তা সহজেই বোঝা যায়।

একদিকে বুদ্ধিবাদী চেতনা অন্যদিকে সামাজিক আন্দোলন কীভাবে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হলো, লক্ষ্য অর্জন করল, গ্রন্থটিতে তার বিসত্মৃত বিবরণ আছে। স্মৃতিময় ভুবনে বিচরণ সত্ত্বেও এ-ভূখ–র রাজনৈতিক ইতিহাসের পরিচয়বহ অতি বিশ্বস্ত একটি বই হয়ে উঠেছে এটি। ভাবতে ভালো লাগে, তাঁর এ-জায়মান স্মৃতি-আলেখ্য এ-অঞ্চলের বাঙালির স্বরূপ-সন্ধানের উদ্দীপনাময় যে-ছবি তুলে ধরেছে, আমাদের জন্য তা সত্যিকার অর্থেই চেতনাময় হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্ত্ততি নিয়ে যাঁদের দ্বিধার অন্ত নেই, কখনো-সখনো তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ভূমিকা নিয়ে এবং মুক্তিযুদ্ধে বেসামরিক মানুষের অংশগ্রহণ নিয়ে যেসব মন্তব্য করা হয়, রেহমান সোবহান-লিখিত বইটি যদি তাঁরা পাঠ করেন, আশা করি অনেক বিভ্রামিত্মর নিরসন হবে।

বইটি পড়ার পর বোঝা যায়, অর্থনীতির এই তাত্ত্বিক ও দেশ-ভাবনায় আলোড়িত মানুষটি স্মৃতিসত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কেমন করে এদেশের খুবই কাছের মানুষ হয়ে উঠেছেন।  রেহমানের গ্রন্থটি নানা স্তর নিয়ে এদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক ইতিহাসের আলেখ্য হয়ে উঠছে। গ্রন্থটি পাঠ করলে প্রতীয়মান হয়, কী নিষ্ঠা ও গভীর দৃষ্টি নিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাসের বিকাশকে পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। স্মৃতিকথায় ব্যক্তি প্রাধান্য বিসত্মার করে। কিন্তু এ-গ্রন্থে রেহমানের ব্যক্তিস্বরূপ বিকাশের কথাটি দীর্ঘ এক পটভূমি নিয়ে উন্মোচিত হলেও তা আর ব্যক্তিপরিধির মধ্যে সীমিত নেই। তাঁর প্রত্যক্ষণে যেমন এ-অঞ্চলের বাঙালির শোষণ, বঞ্চনা ও সংগ্রামের কথা আছে, তেমনি কোন পরিপ্রেক্ষেতে গণতন্ত্র ও স্বাধিকারের প্রমত্ত চেতনাকে ধারণ করে বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তা বর্ণিত হয়েছে। একটি কালপর্ব, তাঁর লেখনীতে প্রাধান্য বিসত্মার করেছে। এ-সময়টি ইতিহাসের দিক থেকে তো বটেই, রাজনীতির দিক থেকেও খুবই তাৎপর্যময়। এ-অঞ্চলের জনমানসের বিকাশ, আশা-আকাঙক্ষার দিকে দৃষ্টিপাত করলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল এ-পর্ব। দ্বিজাতিতত্ত্বকে ছিন্ন করে বৃহত্তর সংগ্রামের ভেতর দিয়ে কীভাবে বাঙালি হয়ে উঠেছিল বাঙালিত্বের সাধনায় নিমগ্ন তা বর্ণিত হয়েছে এ-স্মৃতিকথায়। এ-গ্রন্থে রেহমান উজ্জ্বল হলেও সবকিছুর কেন্দ্র হয়ে আছে এইঅঞ্চলের মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্র। দেশের ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের বঞ্চনা ও অধিকার এবং সংগ্রামও উন্মোচিত হয়েছে সেই সঙ্গে।

আমাদের প্রজন্মও এই সময়ে প্রতিবাদী হয়েছে, সংগ্রাম করেছে এবং স্বাধিকারের চেতনাকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। ১৯৬২ সালের ৩১ জানুয়ারি জননেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গ্রেফতার হওয়ার পরের দিন ১ ফেব্রম্নয়ারি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক শাসনবিরোধী যে ছাত্র-আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা ষাটের দশক জুড়ে এ-অঞ্চলের বাঙালির জাতীয় চেতনাকে নানাদিক থেকে শানিত ও সঞ্জীবনী প্রেরণা দিয়েছে। এ-আন্দোলন স্বরূপের সাধনা ও বাঙালির সংস্কৃতিচর্চাকে প্রাণময় করে তুলেছিল। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা এই সময় থেকে নবীন এক গতিবেগ সৃষ্টি করে। বাঙালির সংস্কৃতির ঐতিহ্যিক প্রবাহকে ধারণ করে সংস্কৃতিচর্চা ও সাধনা নবরূপ ধারণ করেছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম ছাত্র সংগঠনের সাংস্কৃতিক শাখা বাঙালিত্বের সাধনাকে মুখ্য বিষয় করে এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। একদিকে ছিল রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলের গান ও সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা, অন্যদিকে গণজাগরণকে লক্ষ্য রেখে গণসংস্কৃতির চর্চাও প্রাণ সঞ্চার করেছিল বৃহত্তর ছাত্রসমাজের মধ্যে। এ-আন্দোলনই জাতীয় চেতনাকে ধারণ করে শিখরস্পর্শী হওয়ার প্রেরণা দিয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের পথ নির্মাণ করেছে।

এ-আন্দোলন শুরুর দু’দিন পরে আলোচিত আরেক ঘটনার ছবি পাই বইটিতে, যা ছিল সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে শিক্ষক-ছাত্রদের ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। তিনি যে-সময়টাকে তুলে ধরেছেন সেই আন্দোলন সংগ্রামের আমরাও প্রত্যক্ষদর্শী ও অংশী। এ বই আমাদের তাই আরো বেশি নাড়া দেয়। আইয়ুবের  তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনজুর কাদের চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্রদের সঙ্গে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে পুরাতন কলাভবনের বৃহৎ মিলনায়তনে আসেন। সে-বৈঠকে প্রতিবাদী ছাত্র-শিক্ষকরা পরিকল্পনা করেই সংবিধান এবং দুই অঞ্চলের বৈষম্য এবং গণতন্ত্রহীনতা নিয়ে প্রশ্ন করার প্রস্ত্ততি গ্রহণ করেন। এমন কিছু প্রশ্ন তাঁকে করা হয় যাতে আইয়ুব খানের এই মন্ত্রী বিব্রত হন। কোন প্রশ্নগুলো করা হবে পূর্বেই এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে ছাত্রদের মতবিনিময় হয়। সমবেত ছাত্ররা আইয়ুববিরোধী সেস্নাগানও দিতে থাকে। দেশপ্রেমে উব্ধুদ্ধ সাহসী এক ছাত্র জিয়াউদ্দীন মাহমুদ তাঁকে লাঞ্ছিত করারও প্রস্ত্ততি নেন। তিনি বিব্রতবোধ করলে ভাইস চ্যান্সেলর মাহমুদ হোসেন মন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনাস্থল দ্রম্নত ত্যাগ করেন। সেদিন গণতন্ত্রহীনতা এবং দুই অঞ্চলের অর্থনীতির বৈষম্য সম্পর্কে এমন কিছু প্রশ্ন করা হয়েছিল, যা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এ-অঞ্চলের শিক্ষেত মানুষের প্রথম প্রতিবাদ ছিল। প্রতিবাদের এই সূচনাই কালক্রমে বিস্ফোরণের রূপ পরিগ্রহ করে। মাত্র দুদিন আগে শুরু হয়ে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন। যে-আন্দোলন দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের হৃদয় ও মনকে মথিত করছিল এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে প্রেরণা সঞ্চার করেছিল। এ-আন্দোলনকে দমন করার জন্য ধরপাকড় শুরু হয়। ছাত্র নেতৃবৃন্দের একাংশ আত্মগোপন করেন, অনেকে গ্রেফতারও হন।

রেহমান সোবহান প্রচ্ছন্নে থেকে সহায়তা করেছেন এই ছাত্র-আন্দোলনকে। এই সময়ে গড়ে-ওঠা ছাত্র-আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ তো পেয়েছেনই, কখনো নির্ভরতাও। এই ছাত্র-আন্দোলনই বাংলাদেশ-নির্মাণে অনন্য এক ভূমিকা পালন করেছে।

রেহমান বইটির একটি অধ্যায়ে প্রতিবাদী ছাত্রদের এই আন্দোলন নিয়ে প্রাণময় ভঙ্গিতে বিসত্মৃত বর্ণনা দিয়েছেন। এ-সময়ে আমাদের প্রজন্ম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে-ওঠা ছাত্র-আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। তৎকালের বৃহত্তর ছাত্র-সংগঠনের একজন কর্মী হিসেবে আমরাও প্রত্যক্ষ করেছি নানা ঘটনা। সে ছিল এক প্রস্ত্ততি ও স্বপ্ন দেখার সময়। আইয়ুববিরোধী এই ছাত্র-আন্দোলন বৃহত্তর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে যে-ঐক্য গড়ে তুলেছিল, তা ছিল এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। রেহমান যখন এসব ঘটনা বর্ণনা করেন, তা আমাদের চোখে আরেক মাত্রা নিয়ে উন্মোচিত হয় এবং  দীপালোকের  মতো নতুন করে সে-দৃশ্যগুলো চোখে প্রতিভাত হতে থাকে।

 

দুই

রেহমান সোবহান মুক্তিযুদ্ধের বুদ্ধিবাদী চেতনাসৃষ্টির অন্যতম রূপকার। যে-কোনো সফল মুক্তিসংগ্রামের সাংস্কৃতিক এবং মননের দিক থাকে। রেহমান নানা অভিজ্ঞতা ও কর্মের মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেন এ-যুদ্ধের চেতনাসন্ধানী অন্যতম ব্যক্তি। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি অনেকের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক এবং আর্থনীতিক দিকদর্শনের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে নবীন রাষ্ট্রের আর্থনীতিক পরিকল্পনার রূপরেখা কী হওয়া প্রয়োজন সে-সম্পর্কেও আলোকপাত করেন।

জাতীয়তাবাদের অহং কখনো উচ্চকণ্ঠে চিৎকারে-চিৎকারে মানবিকতাকে পর্যুদস্ত করে, এ-আন্দোলন কোনোদিন সেদিকে অগ্রসর হয়নি। স্বরূপ-সন্ধান উপলব্ধির এবং মুক্তবুদ্ধির এক চেতনাকে প্রসারিত করে রাজনৈতিক জাগরণের সৃষ্টি করেছে।

এই গ্রন্থটি পাঠে জানা যায়, বাবা কে এফ সোবহান ছিলেন ব্রিটিশ আমলে ইম্পিরিয়াল পুলিশ সার্ভিসের বড়কর্তা। মা হাশমত আরা বেগম ছিলেন ঢাকার নবাব পরিবারের মেয়ে। তাঁর মায়ের বাবা এসেছিলেন উত্তর প্রদেশের লখনৌ থেকে। রেহমানের নানি আলমাসি বেগমের দুই ভাই খাজা নাজিমুদ্দীন ও খাজা শাহাবুদ্দীন। রেহমানের নানা আহ্সান মঞ্জিলে নবাবি আবাসনে থাকতেন। এ-পরিবার অতীতে ছিলেন ঢাকার নবাব এবং শহরের রক্ষাকর্তা। বিলাসিতা ও আভিজাত্য –  দুই অনুষঙ্গকে তাঁরা ধারণ করতেন। আহসান মঞ্জিলে রেহমানের অনেক আনন্দের সময় কেটেছে শৈশবে বেড়াতে এসে।

রেহমানের ছেলেবেলা কেটেছে কলকাতা ও দার্জিলিংয়ে। পরবর্তী শিক্ষাজীবন লাহোর ও কেমব্রিজে। কৈশোর কেটেছে কলকাতার ৫৩ ইলিয়ট রোডে, নানাবাড়িতে, এক বনেদি ও অভিজাত পরিবারে। তাঁর মা সেকালে কলকাতার অভিজাত ও এলিট মহলে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও সৌন্দর্যের সিণগ্ধতায় আকর্ষণীয় বলে বিবেচিত ছিলেন। পারিবারিক আবহ ছিল বৃত্ত ও বৈভবে পরিপূর্ণ। কলকাতার যে-বাড়িটিতে তাঁদের বসবাস ছিল, তাঁর স্মৃতিতে সে-বাড়িটি ছিল বেশ বড়। এই বাড়ির কর্তার শখ ছিল চৈনিক পোর্সিলিন সংগ্রহের। শখের বশবর্তী হয়ে তিনি অজস্র পোর্সিলিন সংগ্রহ করেন। তাঁর ধারণা ছিল তিনি পরম আগ্রহে যা সংগ্রহ করছেন তা মহামূল্যবান এবং মৌলিকত্বের দিক থেকে বৈশিষ্ট্যময় চৈনিক ঐতিহ্যবাহী। পরবর্তীকালে বিদেশে একটি নিলাম সংস্থায় বিক্রি করতে গিয়ে জানা যায়, এ পোর্সিলিন হলেও খুব প্রাচীন ও মহামূল্যবান নয়। রেহমান সোবহান পরম কৌতুক ও পরিহাসছলে এই বিষয়টিকেও গ্রন্থে উল্লেখ করেন।  কৈশোরের স্মৃতি নিয়ে পরিণত বয়সেও তিনি যে কত কাতর ছিলেন তার বর্ণনায় তা পাওয়া যায়। স্মৃতি ধমনিতে এবং প্রাণে ধারণ করে মধ্য বয়সেও এ-বাড়িটি দেখার জন্য ছুটে গেছেন তিনি কলকাতায়।

তৎকালীন অভিজাত পরিবারের রেওয়াজ অনুযায়ী রেহমানের বাড়িতে বাংলার প্রচলন ছিল না। মাতৃভাষা উর্দু। তবে বাংলা তিনি জানেন। ছেলেবেলায় একবার ঢাকায় বেড়াতে এসেছিলেন। অবশেষে তিনি নিজের ঠিকানা হিসেবে বেছে নেন এই ভূখ-কে, যুক্ত হন বাঙালির সংগ্রামের সঙ্গে, লড়েন বাঙালির অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে, যুক্ত হন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে। এ সত্যিই এক বিস্ময়! ঢাকার নবাব পরিবারের রাজনীতির বাইরে এসে এই উদারতা সত্যিই শ্রদ্ধা-উদ্রেককারী।

রেহমান সোবহান ঢাকায় যখন প্রথম স্থায়ীভাবে বাস করতে আসেন, তখন তাঁর বয়স ২১ বছর। তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘I first came to live in Dhaka in January 1957, at the age of 21. At that time, I could not speak Bangla as I had been raised in a family with little exposure to its rich culture. I could never relish Ilish, had rarely heard any Rabindra Sangeet and could not take inspiration from the poetry of either Tagore or Nazrul Islam.’

নিরাসক্তভঙ্গীতে এই কথাগুলো বলা এবং তাঁর স্বীকারোক্তি তাঁর উদার হৃদয়েরই পরিচয়বহ। এ-গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, রেহমান সোবহানকে জীবনের প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণের জন্য সাত বছর বয়সে ১৯৪২ সালে দার্জিলিংয়ে সেন্ট পলস বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করা হয়। পরিবার থেকে দূরে বোর্ডিং স্কুলের কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে সময় কাটে তাঁর। বছরে তিন মাস ছুটি থাকত সে-সময়ে। ছুটির সময়টা তিনি কলকাতায় আনন্দে কাটিয়েছেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি খুবই প্রখর, শৈশবের কলকাতা শহরের অনুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন বইয়ের এ-অধ্যায়ে।

দার্জিলিংয়ের শিক্ষাজীবন তাঁর মানসে প্রবলভাবে ছাপ ফেলে। যদিও পরবর্তীকালে লাহোরে কলেজে শিক্ষাগ্রহণ করেন এবং বহু খ্যাতিমান শিক্ষক ও বন্ধুর সান্নিধ্য পান, তবু লাহোরের শিক্ষালয় তাঁর মনন বা জীবন চেতনায় খুব বেশি ছাপ ফেলেনি।

সেন্ট পলসে অধ্যয়নকালে তাঁর ক্রীড়াপ্রীতি এবং খেলায় অংশগ্রহণের যে-ছবি পাই তা এক অর্থে ভিন্ন ভুবনের। এ-সময়ে তিনি মুষ্টিযুদ্ধ শেখেন, পিংপং খেলেন, ঘোড়ায় চড়া রপ্ত করেন; হকি ও ক্রিকেটে তাঁর অনুরাগ জন্মে এবং এ-দুটি খেলায়ও তিনি দক্ষতা অর্জন করেন। পরবর্তীকালে মুষ্টিযুদ্ধে বেশ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। কিশোর বয়সে তাঁর মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়। তাঁর নয় বছর বয়সে এ ছিল নিশ্চিত এক সংকট। এ-সংকটকে মনেপ্রাণে মেনে নিয়েই তিনি খেলাধুলায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। সেন্ট পলসই হয়ে ওঠে তখন তাঁর জন্য এক বৃহৎ ভুবন। এ-শিক্ষালয়ের নিয়মানুবর্তিতা, খেলাধুলা, অধ্যয়ন এবং পরিবেশ তাঁর জ্ঞান-অন্বেষার ভিত গড়ে দেয়। কৈশোরকালীন পারিবারিক নৈঃসঙ্গ্যে সংকট উত্তরণ বোধ করি সেন্ট পলসেই। তাঁর ব্যক্তিত্ব বিকশিত হওয়ার এ-সময়টির সংকট তিনি যেভাবে উত্তরণ করেন, তাতেই উপলব্ধি করা যায়, ছেলেবেলা থেকেই জীবন-চেতনার ক্ষেত্রে রেহমানের হৃদয় এক প্রসারতা খুঁজে পেয়েছিল।

সেন্ট পলসে নয় বছর কাটিয়ে ১৯৫১ সালে লাহোরে এইচিসন কলেজে পড়তে যান রেহমান। সে-সময় তাঁর ছোট ভাই ফারুক সোবহানকেও একই কলেজে ভর্তি করে দেওয়া হয়। বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ি নিয়ে রেহমান কোনো খেদ প্রকাশ করেননি। বরং অত্যন্ত নিরাসক্তভাবে তাঁদের ব্যক্তিত্বের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। এই  বিচ্ছিন্নতায় দুজনই আবার বিয়ে করেন। তবে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য তিনি কাউকে দোষারোপ করেননি। বরং এ দুজনের পরবর্তী দাম্পত্য জীবনের এক শ্রদ্ধামিশ্রিত ছবি তুলে ধরেছেন।

লাহোরের এচিনসন কলেজে শিক্ষা শেষ হলে তাঁর পিতা রেহমান সোবহানকে ট্যানারি ব্যবসায় অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পাঠিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। সেখানে কিছুদিন এ-ব্যবসার খুঁটিনাটি ও অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন একটি ট্যানারির সঙ্গে। কিন্তু ব্যবসা তাকে টানেনি। আসলে সেই যুবা বয়সেই তাঁর হৃদয়-মনে জ্ঞানচর্চা ও বিদ্যানুরাগের যে অনল প্রজবলিত হয়েছিল, ব্যবসা থেকে তা ছিল বহু-বহুদূরে। সেজন্যেই বোধকরি কেমব্রিজের শিক্ষাদর্শ গ্রহণ করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সেই সমাজেরই এক মেধাবী এবং নানা জিজ্ঞাসা নিয়ে মানবকল্যাণব্রতী রাজনৈতিক অর্থনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

এই স্মৃতিকথায় কেমব্রিজে অধ্যয়নের সময়টি খুবই মনোগ্রাহী ভঙ্গিতে উঠে এসেছে। তাঁর জীবনে এ-সময়টি এক চেতনাসঞ্চারী সময়। উন্নত হৃদয় জ্ঞানে, জিজ্ঞাসা-জাগানিয়া যেসব শিক্ষক পেয়েছিলেন তাঁদের কথা প্রসঙ্গ নিয়ে উঠে এসেছে। সঙ্গে এসেছে বৃহত্তর বিদ্যা অনুশীলনের পরিবেশ ও শিক্ষাদর্শ। তিনি খুব সরল ভঙ্গিতে বর্ণনা করেছেন এ-অধ্যায়টি। এই শিক্ষকম-লী অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাসে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত তো ছিলেনই এবং নানাভাবে আন্তর্জাতিক জ্ঞানভা-ারকে তাঁদের অবদান দ্বারা সমৃদ্ধ করছিলেন। এই বিদ্যায়তনে শিক্ষাগ্রহণকালে যেসব শিক্ষকের সান্নিধ্যে এসেছিলেন, তাঁরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছিলেন শ্রদ্ধেয় অর্থনীতিবিদ। তত্ত্ব ও জ্ঞানে অনেকেই আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিম-লে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অর্থনীতিবিদ, ধনবাদী – এই দুই প্রবণতা তৎকালে আলোচিত বিষয় ছিল। কেমব্রিজের শিক্ষায় দীক্ষেত হয়ে তিনি মানবকল্যাণব্রতী ধারাকে বেছে নেন। সেজন্য বোধকরি তাঁর আর্থনীতিক নীতি আলোচনায় লেখনী ও বিশেস্নষণে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের রীতি ও নীতি প্রাধান্য বিসত্মার করে। এই শিক্ষকম-লী তাঁদের ধনবিজ্ঞান শাস্ত্রের অর্জন, এবং স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে কীভাবে শিক্ষার্থীদের বিদ্যানুরাগে উজ্জীবিত এবং বুদ্ধির বিকাশে সহায়তা করতেন, তার উজ্জ্বল বর্ণনা আছে এ-গ্রন্থে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে রেহমানের বন্ধুপরিম-লও ছিল বৃহৎ। কেমব্রিজে সে-সময়ে তাঁর বন্ধু ও সহাধ্যায়ীদের মধ্যে ছিলেন অমর্ত্য সেন, মাহবুবুল হক, জগদীশ ভগবতী, মনমোহন সিংহ ও লাল জয়বর্ধন। এ-বন্ধুদের অনেকেই ভারত, পাকিসত্মান ও শ্রীলংকায় উজ্জ্বল অর্থনীতিবিদ হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এঁরা সকলেই নিজেদের

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিকাশের পথকে তাঁদের পা–ত্য-প্রজ্ঞার আলোকে উচ্চতর অবস্থানে নিয়ে গেছেন। এমনকি দেশের উচ্চতর নেতৃত্বের পদেও অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

কেমব্রিজ-অধ্যায় বর্ণনায় ঘুরেফিরে এসেছে অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনের প্রসঙ্গ। অমর্ত্যের সঙ্গে তাঁর সখ্য সে-সময়ে কত নিবিড় ছিল, এ-পর্বের বিবরণে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।  তাঁদের নানা জায়গায় ভ্রমণ, কখনো তর্ক এবং বন্ধুত্বের এক উজ্জ্বল চিত্র আমাদের সম্মুখে উদ্ঘাটিত হয়।

নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিলেন তৎকালে এমন কয়েকজন ডাকসাইটে অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষকের কথাও আছে কেমব্রিজ অধ্যায়ে। মার্কসবাদী তাত্ত্বিক মরিস ডব ছিলেন তাঁর শিক্ষক। এছাড়া অর্থনীতির নানা শাখায় যেসব শিক্ষক ব্যুৎপত্তি অর্জন করে খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন, তাঁদের নানামুখী বিশেস্নষণ তাঁর জীবনসাধনাকে সমৃদ্ধ করেছিল, সে-প্রসঙ্গটিও তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। এখানে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্র-মজলিসের সদস্য হন। কেমব্রিজ মজলিসে তর্ক ও বিশেস্নষণ থেকে রেহমান তৎকালীন পাকিসত্মানের রাজনীতি ও অর্থনীতি সম্পর্কেও ধারণা পান। এখানকার ছাত্র-মজলিসে নানা কর্মতৎপরতায় রেহমান হয়ে ওঠেন এ-সংগঠনের কেন্দ্রীয় এক ব্যক্তিত্ব। এখানে পাকিসত্মানের রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে সে-সময়ে তাঁদের মধ্যে ভাববিনিময় হতো। এই ভাববিনিময় থেকে পাকিসত্মানিরা এ-অঞ্চলের মানুষকে কীভাবে শোষিত-বঞ্চিত করছে, সে-সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা তিনি কেমব্রিজে পাঠগ্রহণকালেই উপলব্ধি করেন। সে-সময়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ধ্যান-ধারণা-প্রবণতা, উন্নয়ন ও বিকাশের ক্ষেত্রসমূহ নানাভাবে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে প্রভাব ফেলছিল। তাঁরা নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতেন। এই ভাবুক সমাজে রেহমান ছিলেন সব দিক থেকেই ব্যতিক্রমী ও নব্য চেতনাসঞ্চারী।

কেমব্রিজের শিক্ষা সমাপ্ত করে ১৯৫৭ সালে স্থায়ী বসতি করার আগ্রহ নিয়ে ঢাকায় আসেন রেহমান সোবহান। প্রথমে তিনি পূর্ব পাকিসত্মান পস্ন্যানিং বোর্ডের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করেন ও ইন্টারভিউ দেন। পরে প্রফেসর এমএন হুদার পরামর্শে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন।

রেহমানের পরিবারের সঙ্গে মুসলিম লীগের সৌহার্দ্যের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। নিকটাত্মীয় খাজা নাজিমউদ্দীন ছিলেন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী। মুসলিম লীগ দ্বিজাতিতত্ত্বকে আদর্শ করে মুসলিম-মানসকে ভ্রামিত্মর চোরাবালিতে নিক্ষেপ করেছিল। আর খাজা নাজিমুদ্দিন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বাঙালির বিকাশ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এতটুকুও মর্যাদা দেননি। বরং জিন্নাহ যখন রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে বলে ঘোষণা দেন খাজা নাজিমুদ্দিন তখন হয়ে ওঠেন সে-ঘোষণার প্রবল সমর্থক। এ-পরিবারে কখনো বাঙালি সংস্কৃতির এতটুকুও স্পর্শ ছিল না। সে-পরিবারের সমত্মান রেহমান সোবহান নানা অভিজ্ঞতা, ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে যখন হয়ে ওঠেন পরিশীলিত বাঙালি এবং বাঙালির ভূখ–নির্মাণের তাত্ত্বিক সাধক ও আপনজন, তা পরম বিস্ময়ের উদ্রেক করে বইকি। শ্রদ্ধাবনতচিত্তে রেহমানের জীবন থেকে নেওয়া এই পরিগ্রহণবোধকে অভিবাদন জানাই।

প্রসঙ্গত মনে পড়ে, ষাটের দশকের অমিত্মম বছরগুলোতে পূর্ব বাংলার শিক্ষেত বাঙালি যখন স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন ধারার কর্মে নিমগ্ন, রেহমান সোবহানের বৃহত্তর পরিবার ও আত্মজন তখন পাকিসত্মানি শাসকগোষ্ঠীকে অব্যাহতভাবে সমর্থন দিয়ে চলেছেন। আর তিনি কেমব্রিজ থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের পর ঢাকায় এসে থিতু হবার পর থেকেই বাঙালির জাতীয় চেতনা উজ্জীবনের আন্দোলনে যোগ দেন, পূর্ব বাংলার বাঙালির আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশী হন, সেই বঞ্চনা-শোষণের প্রতিবাদী কণ্ঠ হয়ে ওঠেন। এ-প্রয়াসে নানা মাত্রা সঞ্চারের জন্য রাজনৈতিক কর্মে ব্যাপৃত হন তিনি, যা আমাদের জন্য অনন্য, গভীরতাসঞ্চারী এক অভিজ্ঞতা ও অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।

তাঁর পরিবারের তরফ থেকে সুপারিশ ছিল, রেহমান যেন কোনো করপোরেট ভবনে বড় চাকরি নেন। পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনারও সুযোগ ছিল। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। বরং চলে এলেন ঢাকায়। অথচ এ-ঢাকার সঙ্গে তাঁর কোনো স্মৃতিময় বা নাড়ির সম্পর্ক ছিল না। তবু তিনি কর্মক্ষেত্র হিসেবে ঢাকাকেই বেছে নেন। এই সদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে এ-অঞ্চলের সারস্বত ও রাজনীতিতে নিয়োজিত গণতান্ত্রিক সমাজ রেহমান সোবহানকে সুহৃদ হিসেবে পেয়েছে। এই প্রাপ্তি এই অঞ্চলের মানুষের জন্য শুধু অ্যাকাডেমিক খ্যাতিতে উজ্জ্বল এক অধ্যাপককে পাওয়া নয়; তিনি অদ্যাবধি হয়ে আছেন এ-অঞ্চলের মানুষের সঙ্গী, আপনজন এবং যে-কোনো রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটে বিবেকবান এক প্রতিবাদী কণ্ঠ। একদিকে তিনি বুদ্ধিবাদী অ্যাকাডেমিক সমাজের বন্ধু ও সখা, অন্যদিকে নানা ভাবনায় আলোকিত দেশের উন্নয়নপিয়াসী এক অর্থনীতিবিদ।

গ্রন্থটিতে ১৯৪৭-উত্তর বাঙালির নানা প্রশ্নের দোলাচল, সংগ্রাম ও বিকাশের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। চলিস্নশের দশকে এই অঞ্চলের বাঙালি এক আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছিল। পরবর্তীকালে নানা অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের ভেতর দিয়ে সে-বাঙালি কেমন করে ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক এক রাষ্ট্র নির্মাণে বলীয়ান হলো, তাও বর্ণিত হয়েছে সুনিপুণভাবে। সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে ষাটের দশকের স্বাধিকার আন্দোলনের বহুমাত্রিক প্রসঙ্গ।

পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্ত শিক্ষেতমহলে যে মুক্তিবাসনার আকাঙক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল, তার এ-বিশেস্নষণ তৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। গণতন্ত্র ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, শোষণমুক্তির এই স্বপ্ন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্তর্মুখীবোধ থেকেই বাঙালির স্বাজাত্যবোধের জন্ম হয়েছিল। চলিস্নশের বোধ ও উপলব্ধি থেকে এ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চেতনা। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন ও বাষট্টির ছাত্র-আন্দোলনই এই নবীন চেতনায় যে দীপিত বিভাব সৃষ্টি করেছিল, তা পূর্ব বাংলার আপামর জনসাধারণের সংগ্রামী অভিমুখিতায় নবীন মাত্রা সৃষ্টি করে। কোনো সংকীর্ণতা বা উগ্রতা ছিল না এই জাতীয়তাবোধে।

১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগ দেওয়ার পরে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় অর্থনীতিবিদ মুশাররফ হোসেনের। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা জীবন শুরুর পর সেই যে শুরু হয়েছিল শিক্ষার্থীদের নানা বিষয়ে জ্ঞানের আলোকে তত্ত্বে ও তথ্যে উদ্দীপিত করা, তা আজো অব্যাহত আছে। এই সেই বিভাগ যেখানে সে-সময় নক্ষত্রপ্রতিম অর্থনীতিবিদদের সমাবেশ ঘটেছিল। সহকর্মী ও অগ্রজস্থানীয় অধ্যাপকদের মধ্যবর্তিতায় এবং প্রজ্ঞার বিশেস্নষণ শক্তিকে ধারণ করে নবীন অধ্যাপক হিসেবে রেহমান অচিরেই প্রতিষ্ঠা পান। গ্রন্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার অধ্যায়টি খুবই বিসত্মৃতভাবে আলোচনা করেছেন তিনি। নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে এ-পর্বটি তাঁর জীবনকে কতভাবে যে সমৃদ্ধ করেছিল এবং দেশে ও বিদেশে তিনি একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিচিতি পান ও বিদেশ ভ্রমণ করেন, তারও বর্ণনা খুবই বর্ণময়ভাবে ধরা আছে।

বিগত শতকের ষাটের দশকের প্রারম্ভে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের আকাঙক্ষা থেকে লেখালেখি শুরু করেন রেহমান সোবহান। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন এবং ভূমি সংস্কার নিয়ে তাঁর প্রবন্ধ এ-অঞ্চলে শিক্ষেত মধ্যশ্রেণির মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও পাকিসত্মানি শাসকগোষ্ঠী ও এলিট শ্রেণি তাঁর প্রত্যক্ষণ এবং বিশেস্নষণকে এতটুকুও মর্যাদা দেয়নি। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর এই মনোভাব তাঁকে এ-কর্ম থেকে বিরত করতে পারেনি। বরং তাঁর লেখনী ও আর্থনীতিক বিশেস্নষণ ক্রমে আরো অধিক পরিমাণে গভীর ও গহন হয়ে ওঠে, যা পরবর্তীকালে দিকদর্শনেও সহায়ক ভূমিকা রাখে। প্রতিকূলতা ও বিঘ্ন থাকা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখনো গৌরব হারায়নি। সেকালে সব শিক্ষকই ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ, বিদ্যানুরাগে উজ্জ্বল এবং দেশে বিরাজমান অর্থনৈতিক নীতি ও ভাবনা নিয়ে জিজ্ঞাসায় আলোড়িত।

আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করলে এদেশে রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়। ছিল না গণতন্ত্র, লেখনী, বাক ও স্বাধীনতা। আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র নামে এক অভিনব গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন। রেহমান সোবহান সেই মৌলিক গণতন্ত্রের তীব্র সমালোচনা করে একটি গবেষণাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ১৯৮৬ সালে এটি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়।

১৯৬০ সালে ব্যারিস্টারি অধ্যয়ন শেষে কামাল হোসেন ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। নবীন বয়সেই মেধা ও প্রজ্ঞার দ্বারা আইনের খুটিনাটি বিশেস্নষণে পারদর্শী হওয়ায় ঢাকায় তিনি খুব দ্রম্নত প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর অভিন্ন হৃদয় বন্ধু ও ফুপাতো ভাই কামাল হোসেনই রেহমান সোবহানকে রাজনীতির বৃহত্তর অঙ্গনে পরিচিত করান। কামাল হোসেনই  হয়ে  ওঠেন রাজনীতির ক্ষেত্রে তাঁর সহযাত্রী, বন্ধু ও পরামর্শদাতা। তৎকালে কামাল হোসেনের সান্নিধ্য তাঁর চিমত্মা ও চেতনায় ছাপ ফেলে। তাঁর সঙ্গে সমঝোতার এক প্রীতিময় সম্পর্কও গড়ে ওঠে, যা আজো অব্যাহত আছে। ষাটের দশকে কামাল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী হামিদা হোসেন যখন এ-দেশের স্বাধিকার আন্দোলন ও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য ইংরেজি সাপ্তাহিক প্রকাশ করেন, রেহমান সোবহান সে-পত্রিকায়ও লেখালেখি করেন এবং সম্পাদনায় নানা  বিষয়ে উপদেষ্টা হয়ে ওঠেন। তাঁদের কমোর্দ্যোগে ইংরেজি এ-সাপ্তাহিক স্বাধিকার চেতনার অন্যতম মুখপাত্র হয়ে ওঠে। যদিও লেখালেখি সূত্রে তিনি আলোকিত অধ্যাপক হিসেবে তখনই বিদ্বজ্জনের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হন।

ষাটের দশকের মধ্যপর্যায় থেকে নানাভাবে শাসকগোষ্ঠী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদার, মুক্তমনা ও জিজ্ঞাসায় আলোড়িত নব্য চিমত্মার উদ্ভাবক শিক্ষকম-লীকে লাঞ্ছিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে নানাভাবে। কিছুদিন আগে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক পল নিউম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ে ও বাইরে গড়ে-ওঠা গণতান্ত্রিক ছাত্র-আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য নানা তৎপরতা শুরু করেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিরোধী পূর্ব পাকিসত্মানের তৎকালীন গভর্নর মোনেম খাঁর নির্দেশে সে সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলরও গণতন্ত্র এবং সমাজের মঙ্গল আকাঙক্ষায় নিবেদিত শিক্ষকম-লীকে হেনসত্মা করার নানা অপতৎপরতা চালান। শিক্ষকদের পদোন্নতির দ্বার রুদ্ধ করা হয় এবং একই সঙ্গে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের এনএসএফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত ছাত্রসমাজকে লাঞ্ছিত করার জন্য যে-তা-ব চালায় রেহমান তা প্রত্যক্ষ করেছেন খুব কাছে থেকে। তাদের একজন সাধারণ ছাত্রদের ভয় দেখানোর জন্য গলায় সাপ ঝুলিয়ে দলের সঙ্গে ঘুরত। এমনকি হাইকোর্টে একটি মামলায় অধ্যাপক আবু মাহমুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার রায় ঘোষণার পর তাঁকে এনএসএফের গু-াবাহিনী প্রকাশ্যে প্রহার করে। রেহমান সোবহান তাঁর সহকর্মীকে এভাবে লাঞ্ছিত করায় ক্ষুব্ধ ও অপমানিত হন। তিনিই অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে নিয়ে যান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এ-ঘটনা তাঁকে এবং বৃহত্তর শিক্ষকম-লীকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করে। জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকও এতে দারুণ ব্যথিত ও মর্মাহত হন। পরাক্রমশালী এই গু-াবাহিনী শাসকগোষ্ঠীর ছত্রচ্ছায়ায় আরো মরিয়া হয়ে উঠবে – এ আশঙ্কায় অনেকেই ভগ্নমনোরথে দেশত্যাগ করেন।

সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় রেহমান সোবহানের। বঙ্গবন্ধু তাঁর বিদ্যাবত্তা ও অধ্যাপনার গুণাবলি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন।

 

সে-সময়ে সামরিক শাসক লৌহ মানব আইয়ুব খানের পূর্ব পাকিসত্মানের জনগণের কণ্ঠ রুদ্ধ করে একদিকে গণতন্ত্রহীনতা, অন্যদিকে অর্থনীতিতে চরম বৈষম্য সৃষ্টি জনগণের মনে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, যার পরিণামে ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। রেহমান সোবহানের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

১৯৫৭ সালে ঢাকায় ফেরার কিছুদিন পরে রেহমান সোবহান বেইলি রোডে থাকতেন। এ-সময়ে সাংবাদিক এসএম আলী তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ভাস্কর নভেরার সঙ্গে, সেটা ছিল ১৯৬১ সাল। নভেরার সঙ্গে এস এম আলীরও সখ্য ছিল। ১৯৬১ সালে তিনি পাকিসত্মান টাইমসে (ব্যাংকক নয়) কাজ করার জন্য করাচি চলে যান। নভেরা ছিলেন আধুনিক রুচিস্নিগ্ধ, চলন জীবনযাত্রায় সময়ের চেয়ে অগ্রসর এক নারী। সৃজন ও জীবনধারা – এই দুটি ক্ষেত্রে তাঁর পদক্ষেপ ঢাকার প্রথাবদ্ধ সমাজে যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। রেহমানের বর্ণনায় পাই এ-সময়ে তাঁর সঙ্গে নভেরার নিবিড় প্রেমছোঁয়া সখ্যের কথা। যদিও নভেরা সৃজনে নবীন মাত্রা সৃষ্টি করছেন তখন, কিন্তু কথা বলতেন খুব কম। নিয়মিত যাতায়াতের মধ্যে দিয়ে তাঁদের সখ্য খুবই নৈকট্যে পৌঁছেছিল। রেহমান সোবহানের জীবনের এ-পর্বটি ছিল খুবই রোমান্স-জাগানিয়া এক অধ্যায়। তিনি নভেরার প্রতি দুর্বল হলেও তা ‘পেস্নটোনিক’ প্রেমই হয়ে উঠেছিল। রেহমানের বর্ণনায় এই উন্মোচন আমাদের আনন্দ দেয়। প্রায়ই বেইলি রোডের বাড়িটিতে তাঁদের দেখা-সাক্ষাৎ হতো এবং রেহমান বোধকরি নানা বিষয়ে ভাবনা সঞ্চারের চেষ্টা করতেন। এ নিয়ে শহরে বেশ গুঞ্জনও চলেছিল সে-সময়ে। তবে এ আর বেশিদিন অগ্রসর হয়নি। রেহমান বিয়ে করার জন্য চলে যান করাচি। তারপর এই বন্ধুত্বে ছেদ পড়ে।

১৯৬২ সালে সালমা সোবহানকে বিয়ে করেন রেহমান। সালমা তখন সদ্য ব্যারিস্টারি পাশ করে লন্ডন থেকে করাচিতে পৌঁছেছেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন খ্যাতনামা কূটনীতিক ও আমলার কন্যা। তাঁর বাবা ও মা দুজনেই পাকিসত্মানের রাজনীতি ও কূটনীতিক মহলে ছিলেন খুবই পরিচিত ব্যক্তিত্ব। শিল্প ও সংস্কৃতিতে অনুরাগের জন্য সাংস্কৃতিক মহলেও তাঁরা শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন। সালমার মা ছিলেন পরিশীলিত উচ্চশিক্ষেত মহিলা। স্বামীর কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনকালে লন্ডনের সাংস্কৃতিক পরিম-লে উজ্জ্বল এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। পরে তিনি নিজেই মরক্কোতে পাকিসত্মানের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন।

রেহমানের এ-গ্রন্থে তাঁর বিয়ে এবং সুখী দাম্পত্যজীবনের বর্ণনার সঙ্গে স্ত্রীর সমাজ-অঙ্গীকার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কর্ম সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা পাই। একজন বিবেকবান আইনজীবী হিসেবে সালমা সোবহানের কর্ম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে তাঁর অধ্যাপনা ও সংকটকালে তার পরামর্শও যে অনেক অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ছিল, সে-কথা রেহমান শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে বলেছেন। এছাড়া সুখী দম্পতি হিসেবে তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নির্ভরতার আশ্চর্য সুন্দর এক ছবিও পাই আমরা। এ-বর্ণনায় তাঁর স্ত্রীর ব্যক্তিস্বরূপ এবং জীবন দৃষ্টিভঙ্গি, সাহিত্যে অনুরাগ, এমনকি বাংলাদেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য তাঁর সদাজাগ্রত প্রয়াসেরও চিত্র প্রতিভাত হয়ে ওঠে।

সালমা সোবহান ছিলেন আইনের অধ্যাপিকা এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, যে-প্রতিষ্ঠানটি বহু বছরের সাধনা ও পথচলার মধ্য দিয়ে হয়ে উঠছে দেশের শীর্ষ মানবাধিকার সংগঠন। দরিদ্র, অবহেলিত ও অবমানিত নারীদের আইনি সহায়তা ছাড়াও সংগঠনটি সমাজের সব স্তরের মানুষকে নিজ অধিকার সম্পর্কে সচেতন করছে। ২০০৩ সালে আকস্মিক পরলোকগমন করেন সালমা। তাঁদের দুই পুত্র এবং দুজনই উচ্চশিক্ষেত। এ-বইটিতে রেহমান তাঁদের কথাও লিখেছেন।

রেহমান দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপিকা রওনক জাহানকে। অধ্যাপক হিসেবে রওনক জাহান খ্যাতিমান। দেশ-বিদেশ থেকে প্রকাশিত তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ এ-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। তিনি বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার গুণে খ্যাতিমান হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে রেহমানের বিবাহোত্তর সৌহার্দ্যময় ভালোবাসা ও সখ্যের কথাও আছে এ-গ্রন্থে।

 

তিন

বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে পাকিসত্মানের দুই অংশের তথা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিসত্মানের অর্থনীতির মধ্যে যে-চরম বৈষম্য বিরাজ করছিল একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে তা নজরে এসেছিল রেহমান সোবহানের। পূর্ব পাকিসত্মানের পণ্য রপ্তানি থেকে যে আয় হতো তা চলে যেত পশ্চিম পাকিসত্মানের জৌলুস ও উন্নয়ন বৃদ্ধিকল্পে। অধ্যাপক রেহমান সে-সময়ে এ-বিষয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। বিভিন্ন সেমিনারেও আলোকপাত করেন এ-বিষয়ে। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার পর রাওয়ালপিন্ডিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের আলোচনার জন্য ডেকে পাঠানো হলে নূরুল ইসলাম ও নবীন রেহমান সোবহান সেখানে অর্থমন্ত্রী ও অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় পূর্ব পাকিসত্মানের প্রতি বৈষম্যের প্রসঙ্গটি দৃঢ় ভাষায় তুলে ধরেন।

১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ‘দুই অর্থনীতি’ বিষয়ে অধ্যাপক নূরুল ইসলাম ও অধ্যাপক রেহমান সোবহান একটি সেমিনারের আয়োজন করেন। অন্যান্য অর্থনীতিবিদের মধ্যে রেহমান সোবহানের প্রবন্ধটি তখন মিডিয়ার মনোযোগ কাড়ে। তাঁর বক্তব্য ও বিশেস্নষণ বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। একটি রিপোর্ট গুরুত্বের সঙ্গে পাকিসত্মান অবজারভারে প্রকাশিত হয়।

সে-সময়ে দেশে সামরিক শাসন চলছে। রাজনীতি নিষিদ্ধ, রাজনীতিবিদরা কথা বলতে পারছেন না। অর্থনীতিবিদদের এসব লেখালেখি তখন সবার মনোযোগ কেড়েছিল। বৈষম্যের প্রতিবাদ জানাতে-জানাতে এ সময়ে রেহমান সোবহান ক্রমে রাজনীতিতেও জড়িয়ে পড়েন।

রেহমানের স্ত্রী সালমার মা শায়েসত্মা ইকরামুল্লাহ খানের ভাই ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। বিয়ের পরে সালমা মামা সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করতে কয়েকবার কারাগারে গিয়েছিলেন, সঙ্গে ছিলেন রেহমান সোবহান। পরে সোহরাওয়ার্দী যখন ঢাকায় আসেন, তখন তাঁদের প্রায়ই দেখা হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় এলে বেইলি রোডে কামাল কোর্টে ড. কামাল হোসেনের পৈতৃক বাড়িতে অবস্থান করতেন। কামাল হোসেন ও রেহমান সোবহানের রাজনীতির হাতেখড়ি হয় সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে এসে। তাঁরা রাজনীতির জটিল বিষয়গুলো সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারেন এই খ্যাতিমান রাজনীতিকের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলাপচারিতায়।

এভাবেই অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান একদিকে পূর্ব পাকিসত্মানের বাঙালিদের প্রতি অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লেখালেখি যেমন করেছেন, তেমনি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার রচনায় এবং ছয় দফা প্রণয়নে অন্য কয়েকজন অর্থনীতিবিদের সঙ্গে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। অন্যদিকে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ’৬৯-৭০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ হয় তাঁর। রেহমান এভাবেই এ-অঞ্চলের মুক্তি-আকাঙক্ষার সংগ্রামে অপরিহার্য হয়ে ওঠেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিসত্মানি সেনাবাহিনী ঢাকায় গণহত্যা শুরুর পর রেহমান সোবহান দুদিন বন্ধুদের বাসায় আত্মগোপনে থেকে ২৭ মার্চ সঙ্গে অধ্যাপক আনিসুর রহমানের ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে আগরতলায় পৌঁছান ৩১ মার্চ। ওইদিনই তিনি দিলিস্নর উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে অবিলম্বে তিনি দিলিস্নতে অধ্যাপনারত অমর্ত্য সেনের সহায়তায় অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্র, পিএন ধর এবং পরে পিএন হাকসারের সঙ্গে দেখা করে ঢাকায় গণহত্যা ও নির্যাতনের বিসত্মারিত বিবরণ দেন। তাঁরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভারতের সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁদের বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে বোঝাতে সমর্থ হন। পরে দিলিস্নতে ৩ এপ্রিল রেহমান সোবহান ও আনিসুর রহমানের সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের দেখা হয়। রেহমান সোবহান দিলিস্নতে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গেও দেখা করে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। কেমব্রিজে অধ্যয়নের ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর যোগাযোগ ছিল। সে-সময়ে তিনি এ-যোগাযোগ কাজে লাগান। বাংলাদেশে যে মুক্তিযুদ্ধ চলছে এবং পাকিসত্মানি সৈন্যদের দানবীয় হত্যাযজ্ঞের ফলে লাখ-লাখ শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়ে যে মানবেতর জীবনযাপন করছে, এ-বিষয়টি তিনি বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন আন্তর্জাতিক সমাজকে উপলব্ধি করাতে সমর্থ হন। এরই মধ্যে তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারের সহায়তা লাভ করে তাঁর তৎপরতায়। পরে তাজউদ্দীন আহমদের অনুরোধে রেহমান সোবহান
আমীর-উল ইসলামের সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণা রচনায় সহায়তা করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বে জনমতগঠনে রেহমান সোবহানকে দায়িত্ব দিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ তাঁকে বিশেষ দূত নিয়োগ করে অবিলম্বে লন্ডন ও ওয়াশিংটন যাওয়ার দায়িত্ব দেন।

এদিকে তখনো স্বাধীন বাংলা সরকার গঠিত হয়নি। রেহমানের স্ত্রী-সমত্মানরা তখনো ঢাকায়। সশস্ত্র পাকিসত্মানি সৈন্যরা ২৭ মার্চ রেহমান সোবহানের বাড়িতে তাঁকে খুঁজতে অভিযান চালায়। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে রেহমান সোবহান প্রায় শূন্য হাতে – মাত্র ৩০ পাউন্ড পকেটে নিয়ে – লন্ডন ও ওয়াশিংটনের উদ্দেশে দিলিস্ন ত্যাগ করেন। পরে রেহমানের স্ত্রী-সমত্মানরা বন্ধুদের সহায়তায় প্রথমে ঢাকা থেকে করাচি, পরে জর্ডান হয়ে লন্ডন পৌঁছলে তাঁর দুশ্চিমত্মার অবসান হয়।

বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমতগঠন, বাংলাদেশের কূটনীতিকদের পাকিসত্মানের পক্ষত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধকর এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে পাকিসত্মানে অর্থসাহায্য বন্ধে জনমত তৈরি করার দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের  মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমতগঠনের এ-দায়িত্ব তিনি অত্যন্ত সাফল্য এবং নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছিলেন।

পরিশেষে একটি কথা বলতে আগ্রহী। আমরা যারা পরম আনন্দে ও অভিনিবেশ নিয়ে, প্রবল আগ্রহে স্মৃতিকথা পাঠ করে সুখীবোধ করি এবং কখনো সখনো পাবলো নেরুদা, নেলসন ম্যান্ডেলা, জন বায়াজ, দিয়াগো রিভেরা, হীরেন মুখার্জি, পরিমল গোস্বামী, তপন রায়চৌধুরী, ভবতোষ দত্ত, সমর সেন, আবুল হোসেন, আবু জাফর শামসুদ্দীন, বুদ্ধদেব বসু ও আনিসুজ্জামান লিখিত স্মৃতিতে নিমজ্জিত হয়ে ব্যক্তি ও সময়কালকে উপলদ্ধি করার চেষ্টা করি, তাদের জন্য রেহমান সোবহান লিখিত এই মায়াবী স্মৃতিটিও অবশ্যই উল্লেখিত লেখকদের রচিত গ্রন্থের মতো অমস্নান হয়ে থাকবে।

বইটির বহুল প্রচার ও বাংলায় অনুবাদ হবে – এ প্রত্যাশা করি।