মার্কসবাদী প্রতিবেশতত্ত্ব

লেখক: মুহাম্মদ হাসান ইমাম

ভূমিকা

পরিবেশ-সম্পর্কীয় মার্কসের ধারণা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে এটি স্বীকার্য যে, মার্কসীয় চিন্তায় পরিবেশ ও  প্রকৃতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসেছে। যতটুকু এসেছে তা অপর্যাপ্ত মনে হলেও তারবিচার-বিশেস্নষণ কিন্তু অনেকেই করেছেন। এখানে মার্কস ও মার্কসবাদী প্রতিবেশতত্ত্বের আলোচনার চেষ্টা করা হবে সমালোচনাসহ। যাঁরা মার্কসের বক্তব্য যথেষ্ট মনে করেছেন এবং যাঁরা তা যথেষ্ট মনে করেন না – উভয়ের আলোচনার মধ্য দিয়ে মার্কসীয় প্রতিবেশতত্ত্ব প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। মার্কস শ্রমকে পরিবেশ ও মানুষের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেই দেখেছেন। আর মানুষের অগ্রগতি যে-পরিবেশকে শোষণ করেই অগ্রসর হয়েছে তা তাঁর বক্তব্যে সুস্পষ্ট। তাঁর আলোচনায় মানবীয়-অর্থনৈতিক সংগঠন ও সংঘটন গুরুত্ব পেলেও বস্ত্তগত ভিত্তি হিসেবে পরিবেশ-প্রকৃতি-মাটির স্থান নগণ্য নয়। এসব কথা বিভিন্ন প্রত্যয় ও ব্যঞ্জনার মধ্যে দিয়ে পরবর্তী বিশেস্নষকরা তুলে ধরেছেন। বিদ্যায়তনিক পরিসরসহ রাজনীতিতেও মার্কসবাদী তাত্ত্বিকরা সাম্প্রতিককালের পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে মার্কসবাদী পরিবেশতত্ত্বের অনুসন্ধান করছেন। পুঁজিবাদের অন্তর্গত পরিবেশ ও প্রকৃতির সম্যক মূল্যায়ন-কৌশল মার্কস দিয়ে যেতে পারেননি হয়তো, কিন্তু পরবর্তীকালে নব্যমার্কসবাদী চিন্তাবিদরা যথেষ্ট তাত্ত্বিকভাবে মার্কসের ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। মার্কসের পরিবেশসংক্রান্ত ধারণার সমালোচনাকারীরা মনে করেন, তিনি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ব্যবহারিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মাত্র। সামাজিক উৎপাদনে পরিবেশের ব্যবহারের বস্ত্তগত দিকটি তাঁর আলোচনায় যতটা গুরুত্ব পেয়েছে সেভাবে প্রকৃতির অন্যান্য উপলব্ধি, প্রত্যক্ষণ ও ব্যবহার গুরুত্ব পায়নি। সুতরাং তাঁদের মতে, মার্কসীয় চিন্তায় পরিবেশের উপস্থিতি থাকলেও প্রতিবেশতাত্ত্বিক উপলব্ধি ততটা দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। তাই মার্কসীয় প্রতিবেশতত্ত্ব বলে কিছু আবিষ্কার করা কঠিন। বর্তমান আলোচনায় কয়েকজন বিশিষ্ট নব্যমার্কসবাদীর অবদান আলোচনা করা হবে যা থেকে মার্কসবাদী প্রতিবেশতত্ত্ব সম্পর্কে গভীর ধারণা লাভ করা সম্ভব হতে পারে।

দ্বৈতবাদের বেড়াজালে মার্কসবাদী প্রতিবেশতত্ত্ব

মার্কসীয় চিন্তা রাজনীতির ক্ষেত্রে, অনুশীলনের ক্ষেত্রে অনেক ধারার সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতি নিয়ে মার্কসীয় ভাবনারও মূল্যায়ন একরকম থাকেনি। তাত্ত্বিকভাবে হলেও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। এর একটা ভালো দিক হলো, বিভিন্ন ব্যক্তির বিশেস্নষণের সঙ্গে তাঁর নিজস্ব প্রত্যয় ও অর্থগুণে মার্কসীয় প্রকৃতিভাবনা সম্যকভাবে জানার সুযোগ ঘটে। মার্কসীয় প্রকৃতি ও পরিবেশ ভাবনাবিষয়ক দীর্ঘ বিতর্কের পর্যালোচনা করলে দেখা যায় : (ক) মার্কসীয় প্রকৃতি-ভাবনাকে প্রকৃতিবাদী ও সামাজিক নির্মাণবাদী ধারায় বিভক্ত করার চেষ্টা হয়েছে; (খ) একসময় প্রকৃতির মার্কসবাদী তত্ত্বসমূহকে বুর্জোয়া পরিবেশবাদের সারিতে দাঁড় করানো হয়েছে; (গ) সবশেষে প্রকৃতিসম্পর্কীয় মার্কসীয় চিন্তাকে ‘প্রকৃতির উৎপাদনমূলক ধারণা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে সমাধানের পথ পেতে চেষ্টা করা হয়েছে। মনে করা হয়, আজকের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ভাবনা যথেষ্টভাবে পুঁজিবাদের মার্কসীয় ব্যাখ্যার কাছে ঋণী। বুর্জোয়া প্রযুক্তিকেন্দ্রিকতাবাদ ও সামূহিক প্রতিবেশকেন্দ্রিকতাবাদের বিপক্ষে মার্কসের প্রতিবেশতাত্ত্বিক ভাবনাকে ব্যবহারের উপযোগিতা রয়েছে। এখানে প্রযুক্তিকেন্দ্রিকতাবাদ বলতে প্রকৃতিকে সাফল্যজনকভাবে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে চালিত করার সামর্থ্য ও সম্ভাবনায় বিশ্বাস বোঝানো হয়েছে। আর প্রতিবেশকেন্দ্রিকতাবাদের বিশ্বাস অপস্রিয়মাণ প্রকৃতিকে আধুনিক শিল্প-উৎপাদন পরিহারের মাধ্যমে রক্ষা করা সম্ভব। উভয় ধারণাই ভ্রমাত্মক বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রযুক্তিবাদী ধারণার পেছনে ক্রিয়াশীল বিজ্ঞানচেতনার উৎপত্তির ও অতি-প্রতিবেশতাত্ত্বিক রোমান্টিসিজমের মূল কিন্তু ইউরোপীয় রেনেসাঁসের মধ্যেই প্রোথিত। তবে পরিবেশ নিয়ে রচনা, আন্দোলন ও প্রচার যে ব্যাপকতা পেয়েছে গত পঞ্চাশ বছরে তা প্রতিবেশতাত্ত্বিক মার্কসবাদের ধারণাকে সমুন্নত হতে সাহায্য করে বইকি। আবার এমন কথাও বলা হয়ে থাকে যে, বাস্তবে মার্কসবাদীদের মধ্যে ‘মার্কস-প্রকৃতি-পুঁজিবাদ’ বিষয়ক বিতর্কটি প্রাধান্য পেয়েছে। একটি সার্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য মার্কসবাদী প্রতিবেশতত্ত্ব বা প্রতিবেশমার্কসবাদে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে মার্কসের ‘মূল্য’ সংক্রান্ত প্রশ্নে ঐকমত্যের অভাবে। প্রকৃতি ও সমাজকে আলাদাভাবে উপলব্ধি করার আধুনিক দ্বৈতবাদী মানসিকতা মার্কসবাদীদের মধ্যেও অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে। মার্কস ও প্রকৃতি প্রসঙ্গে প্রকৃতিবাদী ও নির্মাণবাদী চিন্তার দ্বৈতস্রোত মূলত প্রকৃতি-সমাজ দ্বৈতবাদের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রকৃতির মার্কসীয় তত্ত্ব বুঝতে হলে ‘প্রকৃতি-সমাজ দ্বৈতবাদের’ ওপর ভিত্তি করে প্রদত্ত ব্যাখ্যা-বিশেস্নষণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

দু-দশক ধরে স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের যে-ডামাডোল লক্ষ করা যাচ্ছে তাও ত্রম্নটিহীন নয়। উন্নয়ন-ভাবনায় ষাটের দশকে ‘প্রবৃদ্ধি’র ওপর জোর দেওয়া হলো; সত্তরের দশকে ‘মৌলিক চাহিদা অভিগমে’র কথা শোনা গেল আর আশির দশকের শেষভাগে এসে ‘স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন’ পেয়ে বসল। দেখা যাবে, স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন পূর্ববর্তী দু-দশকের উন্নয়নতত্ত্বসমূহের ধারাবাহিকতায় আসা কোনো উন্নয়নতত্ত্ব নয়, বরং উন্নয়নে পরিবেশগত মাত্রাকে অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টা মাত্র। সে-কারণে একে একদিকে উন্নয়নতত্ত্বের ব্যর্থতা ঢাকতে যেমন ব্যবহার করা হচ্ছে, তেমনি পুঁজিবাদের পরিবেশবিনাশী রূপকে আড়াল করার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। ঠিক এ-ধরনের আরেকটি তত্ত্ব হলো ‘প্রতিবেশতাত্ত্বিক আধুনিকায়ন’ যা পুঁজিবাদী বর্তমান শিল্প ও অর্থনীতির মধ্যেই পরিবেশ রক্ষার সম্ভাবনা খুঁজে পাচ্ছে। তাই মনে করা হয়, আসলে দুটি বিষয়ই বুর্জোয়া প্রযুক্তিকেন্দ্রিকতাবাদী এবং নৃকেন্দ্রিকতাবাদী। এগুলো প্রকৃতি রক্ষার জন্য প্রবৃদ্ধির ‘প্রাকৃতিক সীমা’ স্মরণ করিয়ে দেয়। নতুন প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনার কথাও বলে। পুঁজিবাদ ধ্বংসাত্মক শোষণ চালিয়ে যেতে চায়। আবার জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে চায়। অপরদিকে প্রতিবেশকেন্দ্রিকতাবাদীরা মানুষের চেয়ে প্রকৃতিকে প্রাধান্য দেয় অথবা উভয়কে সমান মূল্য দেয়। প্রকৃতির প্রশ্নে বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সমকালীন প্রতিবেশকেন্দ্রিকতাবাদীদের ‘প্রকৃতি রক্ষা’ ও প্রযুক্তিকেন্দ্রিকতাবাদীদের ‘প্রকৃতি ব্যবস্থাপনা’বিষয়ক আহবান শুনতে পাওয়া যায়। প্রকৃতিকে এভাবে একটি বাহ্যিক বিষয় হিসেবে অনুধাবনের মধ্যে স্মিথ দ্বৈত মতাদর্শিক দৃষ্টিকোণ খুঁজে পেয়েছেন বলে কাস্ট্রি মনে করেন। তাঁর মতে, Academically Smith detected this dualism in the bourgeois natural science inaugurated during the Enlightenment, romantic reactions to it and also in most Marxist theories of nature … Likewise, he detected the dualism in the discourses of both what he called ‘the new environmental policy establishment’ and its more deep green opponents. 

প্রতিবেশকেন্দ্রিকতাবাদী ধারার মার্কসবাদী চিন্তা ঐতিহাসিকভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ আত্মসাতের সামাজিক প্রক্রিয়া ও সম্পর্ককে ব্যাখ্যার মধ্যে আবদ্ধ থেকেছে এবং পুঁজির প্রেক্ষাপটে প্রকৃতির ধারণা ও নির্মাণকে আত্মস্থকরণের চেষ্টা করেছে। এদের মার্কসবাদী প্রকৃতিবাদী বলা হয়েছে কারণ এরা মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ককে ঐতিহাসিক বিষয়বস্ত্ততে পরিণত করে। প্রকৃতিবাদ এবং নির্মাণবাদ, উভয় ধারা মার্কসবাদী প্রকৃতিচিন্তায় পাওয়া যায়। কাস্ট্রি আরো মনে করেন, মার্কসের চেয়ে এঙ্গেলসের মধ্যেই মার্কসীয় প্রকৃতিবাদের সম্যক রূপ লক্ষ করা যায়। প্রকৃত অর্থে এঙ্গেলসের
‘প্রকৃতির দ্বন্দ্ববাদ’ প্রকৃতিতে দ্বন্দ্ববাদের সূত্র সম্প্রসারণের একটি প্রচেষ্টা যা তৎকালীন হেগেলীয় ভাববাদের বিপরীতে প্রকৃতিকে একটি বস্ত্তনিষ্ঠ বাস্তবতা প্রদানের চেষ্টা করেছে। প্রকৃতির ভিন্নতা, নিজস্বতা, দ্বান্দ্বিক স্বরূপ ও স্বাধীন অবস্থানের কথা থাকলেও এঙ্গেলস কিন্তু ইতিহাস ও সমাজের বিশেষ প্রেক্ষাপটে প্রকৃতির সম্ভাব্যতা ও চ্যালেঞ্জসমূহের বিষয়টি বিবেচনা করেছেন। অর্থাৎ সমাজ, ইতিহাস, প্রকৃতি একটি বিশেষ সময় পরিসরে বিশেষভাবে উদ্ভাসিত হতে পারে। একেই এঙ্গেলসের প্রকৃতির দ্বন্দ্ববাদী ব্যাখ্যা বলা হয়েছে। ম্যালথাসের ‘প্রাকৃতিক সীমা’র বিপরীতে এটি ছিল মার্কস-এঙ্গেলসের প্রকৃতিবাদী অবস্থান।

মার্কসবাদী প্রতিবেশতত্ত্ব

প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে মার্কসের পরে সাহিত্যে, ইতিহাসে ও দর্শনে বিস্তর লেখালেখি হলেও প্রকৃতি ও সমাজকে আলাদা করে অথবা পারস্পরিক আমত্মঃক্রিয়ার আলোকে ভাবতে অনেককে উৎসাহিত করে। এক্ষেত্রে কট্টর নৃকেন্দ্রিকতাবাদ থেকে শুরু করে রোমান্টিক ভাবালুতার বিভিন্ন মাত্রা লক্ষ করা যায়। কারসনের  Silent Spring (১৯৬২), হার্ডিংয়ের The Tragedy of the Commons (১৯৬৮), এরলিচের The Population Bomb
(১৯৭০)-এর মতো লেখাগুলোর ধারাবাহিকতায় পাওয়া যায় অ্যালফ্রেড স্মিড-প্রণীত The Concept of Nature in Marx (১৯৭১) শীর্ষক মার্কসীয় প্রকৃতিবিষয়ক গ্রন্থটি। মিডোস ও তাঁর সহ-লেখকদের The Limits to Growth (১৯৭২) প্রকাশিত হয়। যাহোক, স্মিডের গ্রন্থটির মাধ্যমে জানা গেল নব্যমার্কসীয় চিন্তাবিদদের একাংশ নতুন প্রত্যয়সহযোগে প্রকৃতি ও সমাজের সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। আর সে-সুবাদে মার্কসীয় প্রকৃতি-পরিবেশভাবনা যেমন নতুন রূপে ব্যাখ্যাত হওয়ার সুযোগ পায়, তেমনি মার্কসবাদী প্রতিবেশতত্ত্বও সমৃদ্ধ হতে শুরু করে। সুতরাং এটি অনুধাবনযোগ্য, যে-পরিবেশভাবনার নবতর সূচনা গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে শুরু হয়েছিল তার প্রেক্ষাপটে মার্কসের পরিবেশভাবনার মূল্যায়ন অনুভূত হওয়ারই কথা। তত্ত্বগতভাবেও এ-গ্রন্থটি অপরাপর উলিস্নখিত গ্রন্থগুলো থেকে সমৃদ্ধ ছিল। বর্তমান প্রবন্ধে তিনজন প্রতিনিধিত্বশীল মার্কসবাদী তাত্ত্বিকের বক্তব্য আলোচনা করা হবে, যাতে মার্কসবাদী প্রতিবেশতত্ত্বের মূলকথাকে ধরতে পারা যায়।

জন বেলামি ফস্টার

ফস্টার একজন মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী, প্রতিবেশসমাজতন্ত্রী, জার্নালিস্ট, মান্থলি রিভিউঅর্গানাইজেশন অ্যান্ড এনভার্নমেন্ট পত্রিকার সম্পাদক। বিদ্যায়তনিক জীবনে লেখাপড়া করেন রাজনৈতিক তত্ত্ব ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর। তাঁর ডক্টরাল থিসিস ছিল ‘Theory of Monopoly Capitalism : An Elaboration of Baran and Sweezy’s Approach to Political Economy।’ বর্তমানে তিনি অরিগন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক। ২০০০ সালে ফস্টার মার্কসবাদী পরিবেশভাবনায় নতুন মাত্রা সংযোগ করেন Marx’s Ecology : Materialism and Nature শীর্ষক গ্রন্থ রচনার মধ্য দিয়ে। মার্কসবাদীদের মধ্যে প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশ সম্পর্কে মার্কসের বক্তব্য নিয়ে যে-আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল তা, বিশেষ করে মার্কসের প্রতিবেশভাবনা, এ-গ্রন্থের মাধ্যমে দৃঢ়তা লাভ করে। ফস্টার প্রথমে তাঁর গ্রন্থটির নাম ‘Marx and Ecology’ রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে-সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের একটি বড় কারণ হলো মার্কস সম্পর্কে তাঁর নতুন ধারণা এবং সে-সময়ের বিভিন্ন ব্যক্তির মূল্যায়ন। তিনি জানতেন যে, মার্কসকে ও প্রতিবেশকে সম্পর্কিত করার কিছু চেষ্টা করা হয়ে থাকলেও মার্কসবাদীদের মধ্যেই প্রতিবেশ সম্পর্কে মার্কসকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে দৈন্য ছিল। অনেকে বরং মার্কসকে প্রতিবেশবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করেন। যাহোক, ফস্টারও একসময় ভেবেছিলেন মার্কসের চিন্তায় প্রতিবেশতাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি গৌণরূপে পাওয়া যায়। পরবর্তী বিভিন্নজনের চিন্তা ও আলোচনা তাঁকে মার্কস ও এঙ্গেলসের লেখাগুলো মনোনিবেশ সহকারে পড়তে ও পুনর্মূল্যায়ন করতে সাহায্য করে। এঙ্গেলসের প্রকৃতির দ্বন্দ্ববাদ সম্পর্কেও প্রথমে তাঁর সংশয় ছিল। তিনি স্বীকার করেন যে, হেগেলীয় মার্কসবাদের দার্শনিক আবহ এঙ্গেলসের প্রতিবেশতাত্ত্বিক বস্ত্তবাদের ভিত্তি তৈরি করেছিল।

মার্কসের জগৎদর্শন যে গভীর ও সুষ্ঠুভাবে প্রতিবেশতাত্ত্বিক ছিল তা ধীরে ধীরে তাঁর কাছে উন্মোচিত হয়। তাঁর ভাষায় – Gradually, I realized that the whole issue of science and ecology had to be reconsidered from the beginning. Among the questions that concerned me why Bacon was commonly presented as the enemy within green theory? Why was Darwin so often ignored in discussions of nineteenth century ecology? What was the relation of Marx to all of this? ফস্টার মনে করেন, একসময় প্রতিবেশসমাজতন্ত্রীরা মার্কসের সঙ্গে গ্রিনতত্ত্ব অথবা গ্রিনতত্ত্বের সঙ্গে মার্কসের একীভবনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু বস্ত্তবাদের ভিত্তিমূল ও সামাজিক তত্ত্বের সঙ্গে প্রতিবেশের সম্পর্ক জানা এমন সমাধান সম্ভব নয়। এপিকিউরাসের বস্ত্তবাদী দর্শনের সঙ্গে বেকন ও মার্কসের বস্ত্তবাদের উৎপত্তিগত সম্পর্ক এক্ষেত্রে জরুরি বলে তাঁর কাছে মনে হয়। মার্কস জর্মন কৃষি-রসায়নবিদ জাস্টিন ফন লাইবেগ সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধান করেন, যা তাঁকে মেটাবলিক রিফ্ট (metabolic rift) প্রত্যয় সহযোগে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক জানতে উৎসাহিত করে। মধ্য সতেরো শতকে
কৃষি বিপস্নবের প্রেক্ষাপটে মাটির অবনয়নের দিকটিও এক্ষেত্রে জানা প্রয়োজন বলে তাঁর মনে হয়। এখানে মার্কসের প্রকৃত প্রতিবেশতাত্ত্বিক চিন্তার সূত্রপাত হয়। ম্যাকডফ্ ও বাটেলের সহযোগিতায় ফস্টার লাইবিগের বক্তব্য বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন।

ফস্টার আরো অনেকের মতো মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে মার্কসের সমালোচনার প্রধান বিষয়টি হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর ‘প্রোমিথিয়ানিজম’ বা ‘প্রোমিথিয়ান মোটিফ’। এমন তীব্র আক্রমণ পরবর্তীকালে মার্কসের লেখায় প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশতত্ত্বের অনুপস্থিতির সমর্থকদের প্রচ- সাহস জুগিয়েছে। ফস্টার লক্ষ করেন গিডেন্স,  বেন্টন, গ্রম্নন্ডম্যান ও লাউরির মতো লেখকরা প্রোমিথিয়ানিজমের কারণে মার্কসের প্রকৃতিবিষয়ক উদাসীনতাকে সমর্থন করছেন। গিডেন্স দাবি করেন, মানবীয় সম্পর্কের শোষণমূলক সংঘাত তথা শ্রেণিসংঘাতকে মার্কস সে-কারণেই ‘প্রকৃতিকে শোষণের’ পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারেননি। ফস্টার উল্লেখ করেন, প্রকৃতির সীমাবদ্ধতার বিষয়টিকে মার্কস বিবেচনায় আনতে পারেননি বলে যে-দাবি করা হয় তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাছাড়া, মার্কস পৃথিবীতে জনসংখ্যার সীমার বিষয়টি মোটেও অস্বীকার করেননি। ফস্টার ম্যালথাসের লেখার মূল্যায়ন করে দেখানোর চেষ্টা করেন যে, ম্যালথাসই বরং তাঁর জনসংখ্যাধিক্যের ধারণাটি পৃথিবীর ধারণক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রদান করেননি। অথচ জনসংখ্যাধিক্যের ধারণাটিকে মানবীয় শোষণমূলক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বিচার করতে গিয়ে মার্কসকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে।

ফস্টারের মতে, মার্কস পুঁজিবাদের উৎপাদন-সমস্যা সমাধানের অসমর্থতাকে গুণাত্মক ও সংখ্যাত্মক উভয় দিক থেকে মূল্যায়ন করেন। পুঁজিবাদ শুধু মানবীয় শ্রমের বিচ্ছিন্নতার মধ্যে সমাজকে নিপতিত করেনি, প্রকৃতি থেকে সমাজকেও বিচ্ছিন্ন করেছে। একেই মার্কস ‘হিউম্যান মেটাবলিক রিফ্ট উইথ ন্যাচার’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। মার্কস প্রকৃতি বা মাটিকে উৎপাদনের মূল উৎসধারা হিসেবে প্রত্যক্ষ করেন। পুঁজিবাদ সমাজকে প্রকৃতি ও উৎপাদনে বিভক্ত করার লক্ষ্য সমাজকে ব্যবহার করার মাধ্যমে এই প্রকৃত ঐক্য নষ্ট করেছে। উৎপাদনের যথার্থ সামাজিকীকরণের মধ্য দিয়ে প্রকৃত সামাজিক সম্প্রদায় শুধু পারে মানুষ ও প্রকৃতির সম্ভাবনাময় ঐক্যসাধন করতে। গ্রম্নন্ডিসার আলোকে ফস্টারের এমন মন্তব্য মার্কসের মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক বিচারের জন্য নতুনভাবে সাড়া জাগায়। তিনি মন্তব্য করেন যে, মার্কসের প্রতিবেশতাত্ত্বিক মূল্য বিশেস্নষণের গুরুত্ব সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে প্রকৃতির বিচ্ছিন্নতা এবং মানবীয় উৎপাদনের বিচ্ছিন্নতাকে একটি একক অসংগতির দুটি দিক হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে। আর পুঁজিবাদই এ-অসংগতির স্রষ্টা এবং বৈপস্নবিক সামাজিক রূপান্তর এর সমাধান। সমাজ ও প্রকৃতির দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে অবহেলা করে মার্কসের মূল্যায়ন সম্ভব নয়। যাঁরা সম্ভব বলে মনে করেছেন, তাঁরাই যান্ত্রিক প্রোমিথিউস হিসেবে মার্কসবাদের চরিত্র-চিত্রণের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।

প্রকৃতির সঙ্গে সমাজের জীবদেহসুলভ সম্পর্ক ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতায় ব্যত্যয় ঘটেছে বলে ‘মেটাবলিক রিফ্ট’ দাবি করে। ফস্টারের এমন আবিষ্কার মার্কসীয় প্রকৃতিভাবনার চমকপ্রদ দিক উন্মোচিত করে। মেটাবলিক বিষয়-সংক্রান্ত আলোচনায় অনেকেই অংশগ্রহণ করেন। ১৮৩০ থেকে ১৮৭০ সময় পরিসরে মাটির উর্বরতা-সংকটের প্রেক্ষাপটেই মার্কসের কৃষি প্রশ্ন সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার শুরু। বলা হয়েছে, The depletion of social nutrients was being felt everywhere, as capitalist agriculture broke down the old organic interaction that took place on small, family farms. When peasant plowed a field with ox or horse drawn plows, used an outhouse, accumulated compost piles, etc., as the soils nutrients were replenished naturally. As capitalist agriculture turned the peasant into an urban proletariat, segregated livestock production from grain and food production, the organic cycle was broken and the soil gradually lost its fertility. অর্থাৎ পশুপালনের সঙ্গে মাটির উর্বরতার যে প্রাকৃতিক-জীবদেহতাত্ত্বিক সম্পর্ক ছিল তা ভেঙে যায়। মাটির এই উর্বরতা-সংকট মোচনের লক্ষ্য কৃত্রিম সার আবিষ্কারের জন্য গবেষণার সূত্রপাত ঘটে। পূর্বে উলিস্নখিত জাস্টিন ফন লিবেগ বিষয়টি শহর ও গ্রামের পৃথক হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করেন। শিল্প-বিপস্নবকালীন সময়ে কৃষি থেকে মজুরি শ্রমিকদের শহরে প্রস্থানের ব্যাপারটিও এমন প্রক্রিয়ার আরেকটি রূপ। যাহোক, শহর-গ্রাম পৃথকায়নের বিষয়টিকে মার্কস ‘অপূরণীয় ব্যবধান’ হিসেবে প্রত্যক্ষ করেন বলে ফস্টার দাবি করেন।

কৃত্রিম সার সংগ্রহের লক্ষ্য পুঁজিবাদী বিশ্ব গবেষণা ও উৎস সন্ধানের কাজ চালিয়ে যায়। জানা যায়, পেরু পাখির বিষ্ঠা সংগ্রহের সহজ উৎস হওয়ায় ইংল্যান্ড তাকে নব্য-উপনিবেশ হিসেবে করায়ত্ত করে। ১৮৪৭ সালে পেরু থেকে ২২৭ টন বিষ্ঠা (গুয়ানো) ইংল্যান্ডে আমদানি করা হয়। অনুরূপভাবে সারের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। দশ বছরে সার আমদানির জন্য ইংল্যান্ডের খরচ ১৪,০০০ থেকে ২,৫৪,০০০ পাউন্ড স্টার্লিংয়ে উন্নীত হয়। পরিত্যক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত সৈনিকদের হাড় সংগ্রহের জন্য লোকবল পাঠানো হয়। এসব হাড় মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয়। মার্কস ও লিবেগের অনুসন্ধানের সাদৃশ্যের কথা উল্লেখ করে প্রোয়েক্ট বলেন, ‘Scientist like Von Liebeg … supported the notion of social improvement. This meant looking at the relationship between society and nature in ecological terms. The solution to the problem was the reintegration of the town and country. This overlapped with Marx’s own exploration of the problems in Capital. In volume three of Capital, the discussion of farming is framed within this general dialectic. Soil fertility could only be ensured over the long run through the abolition of capitalist system, which would allow food production to take place along sound ecological guidelines.’

পরিবেশকে এমন প্রতিবেশতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার বিষয়টি সম্পূর্ণত মার্কসের নিজস্ব প্রচেষ্টায় উপস্থাপিত না হলেও তাঁর আলোচনা প্রমাণ করে যে, তিনি যথেষ্ট মাত্রায় প্রতিবেশতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজ ও প্রকৃতির দ্বন্দ্বকে বিচার-বিশেস্নষণের ক্ষমতা রাখতেন। কারণ, মার্কস-পরবর্তী মার্কসবাদীদের ওপর মার্কসীয় প্রতিবেশতত্ত্বের প্রভাব যথেষ্ট মাত্রায় লক্ষ করা গেছে। ফস্টার ধ্রম্নপদী মার্কসবাদ ও প্রতিবেশতত্ত্বের সংযোগ স্থাপন করতে সচেষ্ট থাকেন। মার্কস যে বিশ শতকের প্রাগ্রসর প্রতিবেশতাত্ত্বিক বিশেস্নষণকে সে-সময় ধরতে পেরেছিলেন তার মূল্য কম নয় বলে তিনি মনে করেন। পশ্চিমা বিশ্বে প্রযুক্তির উৎপাদন, ব্যবহার ও বিকল্প অন্বেষণ পরিবেশ সমস্যা মোকাবেলার জন্য জরুরি ভাবা হচ্ছে। ফস্টারের মতে, পুঁজিবাদী সঞ্চয়নের আমলে উৎপাদনকারী প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত দ্রব্যের শক্তি-সাশ্রয়ের ব্যাপারটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। যেমন, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসা পস্নাস্টিক ও পেস্টিসাইড তৈরি করে, যা ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধি সৃষ্টি করে। স্বাভাবিকভাবেই এমন টক্সিন উৎপাদনকারী শিল্প ও ব্যবসার সঙ্গে পুঁজিবাদী কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠী জড়িত আছে। সুতরাং সমাজতান্ত্রিক সমাজই পারে এ-চক্রব্যূহ থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখাতে। তবে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব এমন দৃষ্টান্ত রাখতে সম্পূর্ণ সমর্থ হয়নি।

ফস্টার প্রযুক্তির শক্তি-সাশ্রয়ী উদ্যোগ প্রসঙ্গে বলেন, এমন উদ্যোগও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার বাড়িয়ে দেবে। তাছাড়া, পুঁজিবাদ এমন একটি ব্যবস্থা যা নিজ স্বার্থেই পুঁজির সঞ্চয়ন ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কাজ করে। তাঁর ভাষায়, ‘Capitalists do not restrict their activities to the production of commodities that satisfy basic human needs, such as food, clothing, shelter, and the amenities essential to the reproduction of human beings and society. Instead, the production of more and more profits becomes an end in itself, and the types of goods produced or their ultimate usefulness becomes completely immaterial. The use value of commodities is more and more subordinated to their exchange value. Use values that are devoted to ostentatious consumption, and that are even destructive to human beings and the earth … and the desire for those destructive goods is manufactured along with them through the force of modern marketing.’

পল ব্যারেন ও পল সুইজির রচনার উল্লেখ করে ফস্টার বলেন, তাঁরা পুঁজিবাদকে একটি ঐতিহাসিক ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেন যা যুগসৃষ্টিকারী উদ্ভাবনার ওপর নির্ভরশীল। এমন উদ্ভাবন উৎপাদনের সমস্ত কাঠামো ও উৎপাদনের ভূগোলকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করে দেয়। পুঁজিবাদে মুনাফা বৃদ্ধিকারী শক্তির উৎসই প্রাধান্য পাচ্ছে, মানবতা বা ধরিত্রীর উপকারে আসে এমন উৎস নয়। ফস্টার উল্লেখ করেন, থর্স্টন ভেবলিন বলতে চেয়েছেন একচেটিয়া পুঁজিবাদ যে-কোনো যুক্তিযুক্ত পরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে গৃহীত ব্যবস্থার চেয়ে বেশি অপচয়কারী একটি ব্যবস্থা। গলব্রেইথের প্রসঙ্গ টেনে ফস্টার বলেন, আমরা যা ভোগ করি তা উৎপাদনের প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল, প্রকৃতির উৎপাদনের ওপর নয়। উৎপাদনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও বাজারি শক্তির জোরে পুঁজি আজ আমাদের প্রয়োজন ও প্রত্যাশাও তৈরি করে দিচ্ছে।

পুঁজিবাদ তাই ব্যক্তিমালিকানাধীন উদ্যোগের সামাজিক অবক্ষয় রূপে প্রতিভাত হয়। ফস্টার মনে করেন, উন্নত আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক উৎপাদনী উপায় সম্ভব। কিন্তু উৎপাদন-সম্পর্কই প্রধান বাধা। পুঁজিবাদ শহর ও গ্রাম, মানুষ ও পৃথিবীর মধ্যে শুরু থেকে প্রভেদ সৃষ্টি করেছে। পুঁজিবাদের অনুপস্থিতিতে একটি স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন সম্ভব। আর তার জন্য সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তন দরকার। সমাজকে মুনাফা অনুসন্ধানের নিরিখে নয়, জনগণের যথার্থ চাহিদা পরিপূরণের ও সামাজিক-প্রতিবেশতাত্ত্বিক অব্যাহততা রক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে শাসিত হতে হলে সামাজিক সম্পর্কের রূপান্তরের বিকল্প নেই।

ব্রিটিশ উইকলি ওয়ার্কার পত্রিকায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ফস্টার উল্লেখ করেন, পরিবেশের প্রশ্নে গ্রিন দৃষ্টিকোণ অবলম্বনকারীদের মধ্যে বাম ও ডান উভয় ভাবধারা রয়েছে বিধায় তাদের আন্দোলনের বিষয়কে যেমন গ্রহণ করার ব্যাপার রয়েছে, তেমনি সূক্ষ্মভাবে বিশেস্নষণ করারও দরকার আছে। অর্থাৎ গ্রিন আন্দোলনকারীদের মার্কসবাদ সম্পর্কে তাঁর সন্দেহ রয়েছে। তিনি মনে করেন না যে, মার্কসবাদীদের মধ্যে প্রতিবেশতাত্ত্বিক ভাবনা দেরিতে  এসেছে। তিনি বলেন, ‘I make a distinction here between ecological understanding – which involve the interrelatedness, interdependence and co-evolution of human beings and nature (including ecological science) – and the development of what has been called ecologism or Green thought. The later is a particular political form and, though important, it is not the same as ecology or ecological science.’ লিবেগ থেকে শুরু করে পরবর্তী বিজ্ঞানসমূহের প্রতিটি শাখায় প্রতিবেশভাবনার সঙ্গে মার্কসবাদীদের সংশ্রব ছিল। বিখ্যাত প্রতিবেশতত্ত্ববিদ ওডামস যেমন এমন ধারার চিন্তা দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন, তেমনি সাইলেন্ট স্প্রিংয়ের লেখিকা কারসনের ওপর মার্কসবাদী প্রতিবেশচিন্তাবিদদের প্রভাব ছিল বলে ফস্টার দাবি করেন।

ফস্টার মার্কসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিবেশতাত্ত্বিক রাজনীতি বিশেস্নষণ করতে গিয়ে দূষণ, অব্যাহত উন্নয়ন, পরিবেশগত সংকটের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সাড়া, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মাটির উর্বরতা, প্রাচীন বন রক্ষা ও ইন্টারনেট যুগের ‘নব্য অর্থনীতি’ বিষয়ে বিসত্মৃত আলোচনা করেন। এসব সমস্যার প্রকৃতি ও প্রতিকার বিষয়ে তিনি মার্কস-প্রদত্ত বক্তব্য ও সম্ভাব্য সমাধানের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে ফস্টার বিশ্ব-প্রতিবেশের সংকট ও সাধারণ কল্যাণের পথ দেখানোর চেষ্টা করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি মনে করেন, উৎপাদনের ট্রেডমিলের ধারণাটিকে খাটো করে দেখার প্রবণতা লক্ষ করা যায়, বিশেষত গ্রিন পরিবেশবাদী নীতিদর্শনে। যাহোক, এমন উৎপাদনের মূল কথা হলো সংখ্যালঘু জনসংখ্যার সম্পদ সঞ্চয়নের অভাবিত আকাঙ্ক্ষা। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ সময়-পরিসরে মজুরি শ্রমিকদের নিয়োজন যা অবারিত উৎপাদনের জন্য আবশ্যক। তৃতীয়ত, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে উৎপাদন সম্প্রসারণের জন্য উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সঞ্চিত সম্পদের বিনিয়োগ। চতুর্থত, প্রয়োজনও তৈরি করা হচ্ছে, যা অপূরণীয় আরো প্রয়োজনের ক্ষুধা সৃষ্টি করছে। পঞ্চমত, সরকার ক্রমাগত জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের দায়িত্ব নিয়ে চলেছে যা সত্যিকার অর্থে খুব কমসংখ্যক নাগরিকের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছে। ষষ্ঠত, যোগাযোগের অভাবিত সুযোগ বৃদ্ধি ও শিক্ষর সম্প্রসারণ উৎপাদনের ট্রেডমিলের অংশ হিসেবে কাজ করছে এবং তার অগ্রাধিকারকে নিশ্চিত করছে। ফস্টার বলতে চেয়েছেন যে, এমন সমাজে আমাদের চাহিদা কী তা সমাজ, বিশেষত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই, নির্ধারণ করছে। সুতরাং এমন ব্যবসায়ীদের প্রতি নৈতিক আবেদন ফলপ্রসূ হতে পারে না। উনিশ শতকের জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ারের একটি কথা ফস্টার উল্লেখ করেছেন : ‘A man can do what he wants. But he can’t want what he wants’. ট্রেডমিল আমাদের গ্রহের প্রতিবেশতাত্ত্বিক চক্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সমাজের নিচের শ্রেণির আন্দোলন কেবল এমন ধারার বিপক্ষে দাঁড়াতে পারে। অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং দরিদ্রজনের শোষণের সঙ্গে প্রতিবেশতাত্ত্বিক উৎকণ্ঠাকে একীভূত করলেই তা সম্ভব।

জার্মান ইডিওলজি গ্রন্থে ইতিহাসের বস্ত্তবাদী ধারণা দিতে গিয়ে মার্কস ভূতত্ত্ব ও ভূগোলকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন বলে ফস্টার মনে করেন। ফস্টারের মার্কস ইকোলজির এক পর্যালোচনায় জানা যায়, মার্কস ট্রায়ার জিমন্যাসিয়ামে ভূতত্ত্ব বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। আমাদের গ্রহের ভূতাত্ত্বিক যুগভিত্তিক ইতিহাস জানা ছাড়া মার্কসের পক্ষে বস্ত্তবাদী মতবাদের বিকাশ ঘটানো সম্ভব ছিল না। ঐতিহাসিক ভূতত্ত্বের জনক হিসেবে সমাদৃত ওয়ারনারের তত্ত্বের সঙ্গে মার্কসের পরিচয় ঘটেছিল। এপিকিউরাস ও লিউক্রিটিয়াসের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেই মার্কস ভাবতে পেরেছিলেন যে, ‘The name of mother has rightly been bestowed on the earth, since out of the earth everything is born.’ এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, মার্কসের ওপর ডারউইনের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। ফস্টার উল্লেখ করেছেন যে, ডারউইনের তত্ত্বের মূল কথা হলো পরিবেশে আমূল পরিবর্তন ঘটে থাকতে পারে। আর তখন ভালোভাবে অভিযোজন সম্পন্নকারী কোনো জীব আর নিজেকে টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হয়নি। এমন ধারণা সরল বিবর্তনবাদের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ। মার্কস ১৮৫৯ থেকে ১৮৬৭ সময়কালে ডারউইনের তত্ত্বের ব্যাপারে সাড়া দেন। অরিজিন অব স্পিসিসদাস ক্যাপিটাল (প্রথম ভলিউম) এ-সময়েই রচিত হয়। একজন পর্যালোচনাকারীর মতে, মার্কস মনে করতেন ডারউইনের তত্ত্ব প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে ঐতিহাসিক শ্রেণিসংগ্রামের ভিত্তি প্রদান করে। মার্কস আরো মনে করতেন, জীব ও উদ্ভিদ জগতে ‘প্রাকৃতিক প্রযুক্তি’ এবং মানবেতিহাসে ‘মানবীয় প্রযুক্তি’ কাজ করছে। এঙ্গেলস এমন ধারণাকেই বিধৃত করেন। বুখারিনের প্রতিবেশভাবনাকেও ফস্টার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

পল বারকেট

পল বারকেট ১৯৯৯ সালে Marx and Nature : A Red and Green Perspective শীর্ষক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। তিনি শ্রম ও উৎপাদনের প্রাকৃতিক ভিত্তি ও মার্কসের প্রতিবেশতাত্ত্বিক মূল্য বিশেস্নষণে উদ্যোগী হয়েছেন। তাঁর মূল্যায়ন সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো। বারকেট সদ্য উলিস্নখিত দুটি বিষয়ের প্রেক্ষাপটে প্রকৃতি ও সাম্যবাদের আলোকে মার্কসীয় প্রতিবেশচিন্তাকে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, সম্পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে শ্রম ও শ্রমশক্তির মতো প্রকৃতিও একটি প্রধান উৎস। প্রকৃত সম্পদ হলো প্রকৃতির সাহায্যে উৎপাদিত ‘ব্যবহার-মূল্যসমূহে’র সমাহার। পণ্য তৈরিতে অবদান রাখে এমন যাবতীয় বস্ত্তগত ব্যবহার-মূল্যই শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের ভিত্তিতে অর্জিত নয়; বরং এমন অনেক প্রাকৃতিক ব্যবহার-মূল্য আছে যেগুলো মার্কসের মতে সম্পূর্ণত উৎপাদন-নিরপেক্ষ। কিন্তু সেগুলো ছাড়া  উৎপাদন সম্ভব নয়। আসলে বিশ্বজনীন প্রাকৃতিক মেটাবলিক প্রক্রিয়া উৎপাদনের বলয়কে অতিক্রম করে যায়। মানবীয় উৎপাদন মূলত শ্রমশক্তির ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু শ্রম নিজেই মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যকার মেটাবলিক প্রক্রিয়া। শ্রম প্রাকৃতিক শক্তি অথবা রূপান্তরিত শক্তি হিসেবেই কাজ করে। ফলে বস্ত্তর ধরন পরিবর্তিত হয়। প্রাকৃতিক শর্তাদি ও সীমাবদ্ধতাকে অবজ্ঞা করে মার্কস মানবীয় উৎপাদনকর্ম বিশেস্নষণে প্রাকৃতিক শর্তাদিকে সম্পর্কিত করেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে মানবীয় উৎপাদন-অতিক্রমী স্বভাবের ধারণা প্রদান করেন। তাঁকে কট্টর প্রকৃতিবাদী বলা যেত যদি মার্কস মানবীয় উৎপাদনের প্রাকৃতিক ভিত্তি এবং প্রাকৃতিক শর্তাদির ওপর নির্ভরশীলতাকে চূড়ান্ত জ্ঞান করতেন। মানবীয় উৎপাদন আংশিকভাবে প্রাকৃতিক ভিত্তিকে অতিক্রম করে যায়। সামাজিক ও প্রাকৃতিক শর্তাদির বিচ্ছিন্নতাকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে বিশেস্নষণ করা দরকার। মানবীয় অস্তিত্বের অজৈব পরিপার্শ্ব জগৎ এবং সক্রিয় কর্মকা–র মধ্যকার ব্যবধান মজুরি, শ্রম ও পুঁজির সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যথাযথভাবে বোঝা সম্ভব। বারকেট মনে করেন, It is this general conception that presents Marx from being either a one-sided ‘naturist’ or a one-sided ‘social constructionists’. মানবীয় স্বাধীনতা ও আত্মনির্মাণ অবশ্যই একটি বাস্তব সত্য, কিন্তু এটি প্রাকৃতিক শর্ত ও আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ বারকেটের পর্যালোচনায় মার্কসীয় প্রকৃতিবাদ ও সামাজিক নির্মাণ-সংক্রান্ত বিতর্কের ব্যাপারে একটি সমাধামূলক ব্যাখ্যা প্রদানের চেষ্টা লক্ষ করা যায়। বারকেট যখন প্রকৃতি ও পুঁজিবাদের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন তখন মার্কসের প্রতিবেশতাত্ত্বিক মূল্য বিশেস্নষণকে সামনে নিয়ে আসেন। আদিম সঞ্চয়ন তাই শুধু বিচ্ছিন্ন শ্রমের উৎপত্তির কথা বলে না, বিচ্ছিন্ন প্রকৃতির কথাও বলে। পুঁজিবাদে প্রকৃতিকে এমন একটি ‘মূল্যহীন’ বিষয় হিসেবে দেখার কারণ এটি তৈরিতে কোনো শ্রম-সময় ব্যয় হয়নি। প্রাকৃতিক উৎপাদনকে এ-ব্যবস্থায় ‘প্রকৃতির উপহার’ বিবেচনা করা হয়। এটিকে সম্পদ তৈরির আবশ্যক উপাদান বিবেচনা করা হয়েছে। এভাবেই পুঁজিবাদ প্রকৃতিকে অবমূল্যায়িত করেছে এবং প্রতিবেশতাত্ত্বিক সমস্যা সৃষ্টি করে চলেছে।

ফস্টারের মতে, বারকেটের দৃষ্টিভঙ্গির মূল শক্তি হলো তিনি মার্কসকে শুধু মূল্যের শ্রমতত্ত্বের উদ্গাতা হিসেবেই স্বীকৃতি দেননি, অধিকন্তু পুঁজির মূল্যতত্ত্বের বিরোধিতাকারী বিবেচনা করেছেন। পুঁজিবাদের প্রতিবেশতাত্ত্বিক সংকটকে মার্কসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দুটি রূপে প্রতিভাত হয় বলে বারকেট মনে করেন। প্রথমত, পুঁজিবাদ বস্ত্তগত প্রয়োজন ও কাঁচামাল উৎপাদনের প্রাকৃতিক অবস্থার মধ্যকার ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টির মাধ্যমে পুঁজি সঞ্চয়নের সংকট তৈরি করে; এবং দ্বিতীয়ত, শহর ও গ্রামের বিভাজনের কারণে সৃষ্ট বস্ত্ত ও জান্তব শক্তিসমূহের চলাচলের ক্ষেত্রে বাধা-বিপত্তি সৃষ্টি করে, যা থেকে মানবিক-সামাজিক বিকাশের গুণগত সাধারণ সংকট তৈরি হয়েছে। প্রথমটি পুঁজির পণ্য সরবরাহ বৃদ্ধির প্রবণতা থেকে উৎপত্তি লাভ করে এবং প্রকৃতি সামান্যই মূল্যায়িত হয়। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি বলতে প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার-মূল্য সৃষ্টি বোঝায়। এতে করে সময়ে সময়ে শক্তি ও রসদের প্রাপ্যতার সংকট সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে পুঁজিবাদে সংরক্ষণের বিষয়টি চলে এলেও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নিয়ম সত্যিকারের প্রতিবেশতাত্ত্বিক সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়। ফস্টার বলেন, ‘Burket emphasizes the dialectical character of Marx’s understanding of ecological crises here in order to refute those who contend that Marx addressed ecological problems only in relation to agriculture (the country) and did not consider them also in relation to industry (the city).’

বারকেট তাঁর গ্রন্থে প্রকৃতি ও সাম্যবাদ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মার্কসের প্রতিবেশতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা যে ‘প্রোমিথিয়ান বিশেস্নষণ’ নয় তা তুলে ধরার চেষ্টা করেন। যেহেতু মার্কস মনে করতেন পুঁজিবাদ জীবনে প্রাচুর্য বয়ে আনবে অবারিত উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে, সে-কারণে মার্কসকে প্রোমিথিয়াস হিসেবে প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। বারকেট এক্ষেত্রে মার্কসের সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যকে তুলে ধরেন। বারকেট উল্লেখ করেন, মার্কসের সাম্যবাদ সমাজ ও প্রতিবেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে গুণগত বিপস্নবের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিয়েছে। বারকেট স্বীকার করেন যে, যেহেতু মার্কস সমাজতান্ত্রিক সমাজের অনিবার্যতার কথা বলেন সেহেতু সে-সমাজ বাস্তবায়নের জন্য প্রতিবেশতাত্ত্বিক উদ্যোগের ওপর তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সে-কারণেই অনেকে মার্কসকে ভুল বুঝেছেন এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণে পরিবেশের গুরুতেবর দিকটিকে হালকাভাবে দেখেছেন। অনুরূপভাবে সাম্যবাদী সমাজ নির্মাণের জন্য মার্কস প্রকৃতির যথার্থ সামাজিকীকরণের লক্ষ্য সংগ্রামের ওপর জোর দেন। কারণ, পুঁজিবাদী সমাজের কাছ থেকে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা দ্বারা খর্বিত, বিচ্ছিন্ন ও অবনয়িত একটি ‘প্রকৃতি’ পাবে। বারকেট তাঁর গ্রন্থের শেষে বলেন, ‘If people want to develop as natural beings, they must develop further as social beings, and achieve an explicit socialization of the natural conditions of production. We cannot overcome natural necessity, we cannot conquer nature, but neither can we ignore the conscious, social, and cumulative character of human production by taking refuge in an idealized, unmediated nature that no longer exists. The development of human production is no longer predetermined by nature as such. So, if we want to live with nature we must master our social organization.’

বারকেটের রচনায় অতিসম্প্রতি প্রতিবেশতাত্ত্বিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে মার্কসের অবদান মূল্যায়নসহ এ-বিষয়ে অনালোচিত বহু দিক উদ্ভাসিত হয়েছে। মার্কসবাদের সরল পাঠ অনেক সময় বাজারব্যবস্থার কাছে প্রতিবেশতাত্ত্বিক যৌক্তিকতার পরাজয়সহ সমাজতান্ত্রিক সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে সাহায্য করে। বারকেট এ-বিষয়ে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরে মার্কসবাদ ও গ্রিন দৃষ্টিকোণের মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেন। তবে এমন উদ্যোগ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অবকাশ থাকে, কারণ, গ্রিনদের তেমন কোনো তাত্ত্বিক অবদান নেই। বরং তারা অনেক ক্ষেত্রে সংশোধিত পুঁজিবাদের বা গ্রিন ক্যাপিটালিজমের কথা বলে। যাহোক, এ-গ্রন্থে বারকেট বলতে চেয়েছেন যে, পুঁজিবাদ দুটি অবিচ্ছেদ্য সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। প্রথমটি পুঁজির সঞ্চয়ন-সংক্রান্ত সংকট আর দ্বিতীয়টি হলো মানবীয় উন্নয়নের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের গুণগত মান ধরে রাখা। বিষয় দুটি দু-ধরনের সংগ্রামের জন্ম দেয়। একটি হলো অধিক মজুরি, কাজের সুবিধা ও নিরাপত্তা, কাজের সময় সংকোচন, তথা আরো সমবায়মূলক বা গণতান্ত্রিক মালিকানা এবং ব্যবস্থাপনা। আরেকটি হলো বিচ্ছিন্নতাবিরোধী এবং অব্যাহত মানবীয় উন্নয়ন। এমন আন্দোলন পুঁজিবাদী সঞ্চয়নের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা না করে মানুষ ও প্রকৃতির সুস্থ সহবিকাশের বস্ত্তগত-সামাজিক প্রয়োজন পরিপূরণের ওপর গুরুত্ব দেয়।

বারকেট স্বাভাবিকভাবেই এ-লক্ষ্য অর্জনের জন্য শ্রেণিসংগ্রামের ওপর আস্থা রাখেন যা জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক কার্যক্রমের মতো উদ্যোগের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। বারকেটের মতে, প্রতিবেশতাত্ত্বিক অর্থনীতির তাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠার জন্য অন্তত তিনটি পদ্ধতিতাত্ত্বিক  প্রয়োজন পূরণ করা দরকার। প্রথমত, প্রতিবেশতাত্ত্বিক অর্থনীতিকে একটি বহুশাস্ত্রীয় বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান; দ্বিতীয়ত, একে অবশ্যই তাত্ত্বিক/ পদ্ধতিতাত্ত্বিক বহুত্বের প্রশ্নে দৃঢ় হতে হবে; এবং তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রশ্নে একে অবশ্যই নতুন লক্ষ্য ও সম্ভাবনাকে গ্রহণ করার মতো মানসিকতাসম্পন্ন হতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই মার্কসবাদের রক্ষণশীল মূল্যায়ন এমন প্রয়োজনগুলো পরিপূরণ করতে পারবে না। সোভিয়েত মার্কসবাদের অপূর্ণতা এক্ষেত্রে একটি প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বস্ত্ত ও শক্তির প্রত্যাশিত ব্যবহারমূল্যে রূপান্তরের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য মানুষ ও প্রকৃতির অভিন্ন সম্পর্কবিষয়ক মার্কসবাদী ধারণা লাভ করতে হবে। মানুষ প্রকৃতিকে যেমন ব্যবহার করে, তেমন বর্জ্য নিক্ষেপের স্থান হিসেবে বেছে নেয়। কিন্তু, মানুষ ও প্রকৃতিবিষয়ক মেটাবলিজম অনুধাবন ছাড়া এটি বুঝে ওঠা সম্ভব নয় যে, বস্ত্ত ও শক্তির যুগপৎ রূপান্তর সমাজ ও মানুষের রূপান্তর সাধন করে। মনসত্মাত্ত্বিকভাবে, নন্দনতাত্ত্বিকভাবে এবং অস্তিত্বগতভাবে মানুষ
প্রকৃতির অংশ। উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই মানুষ প্রকৃতি ও সমাজের মধ্যে ব্যবধান তৈরি করেছে। একদিকে শ্রমিকরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে প্রবর্তিত উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে, অন্যদিকে পুঁজিবাদী সঞ্চয়নের ফলাফল মানুষের ওপর বাহ্যিকভাবে বাধা-বিপত্তির সৃষ্টি করেছে। বারকেট তাঁর এ-গ্রন্থে প্রতিবেশতাত্ত্বিক-অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মার্কসীয় তত্ত্বের সম্ভাবনাকে জনসমক্ষে তুলে ধরতে পেরেছেন। যদিও মূলতত্ত্ব, এনার্জি, এনট্রপি, প্রতিবেশতাত্ত্বিক পদচিহ্ন প্রভৃতি প্রত্যয়ের আলোকে আরো আলোচনার সুযোগ ছিল বলে মনে করা হয়েছে।

জেমস ও’কোনার

ও’কোনার মার্কসবাদী প্রতিবেশতত্ত্বের আরেক দিকপাল। আশি ও নববইয়ের দশকে ‘বিশ্ব পরিবেশগত সংকটে’র পরিপ্রেক্ষিতে মার্কসের নতুন মূল্যায়ন শুরু হয়। পুঁজিবাদের ফলাফল হিসেবে পরিবেশ বিপর্যয়কে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে মার্কসকে সত্যিকার সমর্থ তাত্ত্বিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নববইয়ের দশকে পরিবেশ সম্পর্কে মার্কসের যে নতুন মূল্যায়ন লক্ষ করা যায়, তাকে প্রতিবেশমার্কসবাদও বলা হয়েছে। প্রতিবেশমার্কসবাদ মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির নৃকেন্দ্রিকতাবাদকে যেমন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, তেমনি গ্রিন পলিটিক্সকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার চেষ্টা করে। মোটকথা, এটি শ্রেণিসংগ্রামকে প্রতিবেশতাত্ত্বিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে চায় এবং পরিবেশ রাজনীতিকেও শুধু ‘প্রকৃতি’র বাইরে প্রসারিত করতে চায়। এ পর্যায়ে মার্কসকে প্রতিবেশবান্ধব ও প্রতিবেশ-সংবেদনশীল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। ও’কোনার এক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখেন। প্রথমত, ও’কোনারের মূল্যায়ন মার্কসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে উৎপাদন ব্যবস্থার দ্বান্দ্বিক চিন্তার পাশাপাশি পুঁজিবাদের দ্বিতীয় সংকট বা দ্বিতীয় স্ববিরোধকে তুলে ধরে। এ সংকটটি হলো স্বল্প-উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে উৎসারিত ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত সংকট। আর আদি সংকটটি ছিল অধিক উৎপাদনের কারণে জনসৃষ্ট সংকট যা অধিক পুঁজি, শ্রম ও পণ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। যাহোক, স্বল্প উৎপাদন বলতে ও’কোনার যা বুঝিয়েছেন তা হলো পুঁজিবাদ প্রকৃতিকে একটি মুক্ত পণ্য বিবেচনা করে যা শুধু বস্ত্তগত সম্পদ তৈরির কাজে লাগানো হয়। সামাজিক সম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে এর ব্যবহার হচ্ছে না। পরিবেশগত সমস্যার সমাধান শুধু বাজার ব্যবস্থার সংশোধনের মাধ্যমে সম্ভব নয়।

ও’কোনারের চিন্তাবিষয়ক একটি প্রবন্ধের শুরুতে দুটি প্রশ্নের উল্লেখ করা হয়েছে যেমন, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কী? পুঁজিবাদ কী? এমন প্রশ্ন অন্যভাবে হতে পারে; আপনার গাড়ির সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী? এমন প্রশ্ন সামনে আনার প্রকৃত উদ্দেশ্যটি হলো সম্পর্কের বিষয়সহ গাড়ি ও মানুষের দিকটি গভীরভাবে অনুধাবন করা। প্রথমত এটি নিশ্চিত হওয়া দরকার যে, দুটি বস্ত্ত আলাদা। এক্ষেত্রে প্রকৃতি ও মানবজাতির সম্পর্ক আলাদা করা কঠিন হলেও মানুষ ও তার মোটরযানের সম্পর্ক নির্ণয় সম্ভব। তবে পুঁজিবাদী বিশ্বের অনেক মানুষ এমন সম্পর্ক নিয়ে তেমন ভাবিত নয়। কারণ, তাদের কাছে পুঁজিবাদের সরল অর্থ হলো পুঁজি বিনিয়োগ করা, মুনাফা করা এবং আবার বিনিয়োগ করা। এখন তৃতীয় একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া যাক। তা হলো পুঁজিবাদের প্রকৃতার্থ কী যা প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক বিধান করে। ও’কোনার এমন প্রশ্নই উপস্থাপন করেছেন তাঁর গ্রন্থে : ‘The basic (and not very well publicized) fact is that by its nature, capital is bad at preserving things, whether the social well-being of people, land, community values, urban amenities, rural life, nature, or private fixed capital, including structures.’ দীপ্তিযুগের বিজ্ঞান ও দার্শনিক ভাবনার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানব সমাজসত্তাকে বস্ত্তসত্তা থেকে আলাদা ভাবতে অনুপ্রাণিত করা। মানুষ প্রকৃতিকে শুধু নিজগুণে চলমান একটি বিষয়বস্ত্ত হিসেবেই প্রত্যক্ষ করতে অভ্যস্ত হয়েছে তাই নয়, প্রকৃতিকে মানুষের ব্যবহার্য কাঁচামালের চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে উৎসাহিত বোধ করেনি। ও’কোনার এমন দিব্যজ্ঞানকে পুঁজিবাদের ভিত্তিভূমি হিসেবে দেখতে আগ্রহী। মানুষ প্রকৃতি থেকে নিজেকে আলাদা করায় প্রকৃতির মালিক হয়েছে। আবার কেউ হয়তো মালিক হতে পারেনি। ভূমি থেকে আলাদা হয়ে কিছু মানুষ নিজের শ্রমনির্ভর হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে ভূমির মতো তারা নিজেই পণ্যে পরিণত হয়েছে। সোজা কথায় প্রকৃতিকে বিষয় হিসেবে অনুধাবন করতে গিয়ে প্রতিবেশতাত্ত্বিকভাবে ক্ষতিকর পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতিকে সম্ভবপর করেছে।

মার্কস পুঁজিবাদের স্ববিরোধকে শনাক্ত করেছেন। একজন মার্কসবাদী হিসেবে ও’কোনার প্রাকৃতিক পরিবেশ-বিধ্বংসী পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ জানতে চেষ্টা করেন যা প্রকৃত অর্থে পুঁজিবাদের ধ্বংস ডেকে আনছে। অতি-উৎপাদন যদি পুঁজিবাদের প্রথম প্রকৃতির স্ববিরোধ হয় তবে ও’কোনারের মতে, পুঁজিবাদের দ্বিতীয় প্রকৃতির স্ববিরোধের ভিত্তি হলো উৎপাদনের শর্তাদি (conditions of production), উৎপাদনের উপায় নয়। অতি-উৎপাদন যেখানে বিনিময়-মূল্যের কারণে ঘটে, স্বল্প-উৎপাদন সেখানে ব্যবহার-মূল্যের কারণে ঘটে। তিনি মনে করেন যে, ব্যবহার-মূল্যধারী উৎপন্ন (যেমন, কাঁচামাল, পরিসর) উৎপাদনের শর্তাদি বা অবস্থা তৈরি করে। এক্ষেত্রে প্রতিবেশব্যবস্থা ও শ্রমিকের স্বাস্থ্য উৎপাদনের প্রাথমিক শর্ত পূরণ করে। ও’কোনার বলেন, The closer we get to use-value theoretically, the closer we get to real places and real live people practically. পুঁজিবাদী উৎপাদনের উচ্ছিষ্ট যেমন প্রতিবেশকে নষ্ট করছে, তেমনি জীবাশ্ম জ্বালানির মতো অপূরণীয় কাঁচামাল নিঃশেষ করছে। অতি-উৎপাদনের ফলে উৎপাদনের চাহিদার দিক থেকে সংকট ঘনীভূত হয়; আর স্বল্প-উৎপাদনের ফলে সংকট আসে সরবরাহের দিক থেকে। পুঁজিবাদের সরবরাহের দিকটি প্রতিবেশব্যবস্থাসমূহকে কাঁচামাল সংগ্রহ ও বিষাক্ত বর্জ্য পরিত্যাগের ক্ষেত্রভূমিতে পরিণত করে। এছাড়া, শ্রমিকের মানসিক ও শারীরিক কল্যাণ উপেক্ষিত হয়। পুঁজিবাদী শিল্প ও রাষ্ট্র উৎপাদনের শর্তাবস্থাকে নবায়ন ও রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। কারণ, এমন ব্যবস্থা সঞ্চয়নকে অবারিত করতে গিয়ে শ্রমিকদের কল্যাণ ও প্রতিবেশতাত্ত্বিক সুরক্ষার জন্য ব্যয় সংকোচনে ব্রতী হয়। সুতরাং পরিবেশ বিনষ্টের দায়ভার চাপানো হয় তাদের ওপর যারা এর জন্য দায়ী নয়। একসময় এমন অবস্থা সামাজিক আন্দোলনের জন্ম দেয়।

ও’কোনার মনে করেন, শ্রমিক ও পরিবেশবাদী আন্দোলন গণতান্ত্রিক দেশে রেড-গ্রিন রাজনীতির সংযুক্তি ঘটায়। অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে পরিবেশবাদী আন্দোলনের সম্পর্ক গড়ে তোলে। জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, বেলজিয়ামের মতো দেশে এমন মোর্চা লক্ষণীয়। তবে পুঁজিবাদ অন্তর্গতভাবেই ক্ষয়িষ্ণু এবং পরিবেশ রক্ষাসহ উৎপাদনের নিজস্ব শর্তাদি রক্ষার্থে ব্যর্থ। এমন অবস্থা থেকে উদ্ধারের জন্য সংরক্ষণের ওপর প্রথমে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ব্যবসা-বাণিজ্যের লক্ষ্য হওয়া উচিত জীবনের যাবতীয় শর্তাদির সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধকরণ। এর জন্য ভোক্তা সম্প্রদায়কে সংরক্ষক-সম্প্রদায়ে রূপান্তরিত করতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই দেখা যাচ্ছে, এই মার্কসবাদী পরিবেশবাদী গ্রিন আন্দোলনকে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের সহায়ক ভেবেছেন। তাঁর ‘দ্বিতীয় স্ববিরোধ’ বিশেষ প্রাণবন্ত অ্যাকাডেমীয় বিতর্কের সূত্রপাত করে।

ব্রাউন ও ক্যাস্ট্রি

ব্রাউনের ও ক্যাস্ট্রির আলোচনায় ‘প্রকৃতির উৎপাদন’ প্রত্যয়টি বিশেষভাবে এসেছে। তাঁদের মতে, মার্কসীয় পরিবেশতত্ত্বে
‘প্রকৃতির উৎপাদনের’ ধারণা ভূগোলশাস্ত্রের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে আর সে-কারণে মার্কসবাদীদের আলোচনাচক্রে প্রথমে উৎপাদনের ধারণা তেমন শোনা যায়নি। আর ভূগোল প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের সেতু হিসেবে বিরাজমান ছিল বলে ‘নির্মাণে’র ধারণাটি সেখানেই অঙ্কুরিত হতে পেরেছে। ব্রাউন ও ক্যাস্ট্রি মনে করেন যে, বাজার ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, পরিবেশকে শিল্পোদ্যোগের অধীনকরণ, জৈব প্রযুক্তির আবির্ভাব, ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ ও ভৌগোলিক তথ্য সংগ্রহের নতুন ব্যবস্থা একত্রে এমন একটি বাস্তবতা তুলে ধরছে, তাতে সমাজ ও পরিবেশের পার্থক্য কমে আসছে। পরিবেশের প্রতিটি পরিসর আজ আমাদের অনুসন্ধান, হস্তক্ষেপ, ব্যবহার, সংরক্ষণ, অথবা তথ্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং, সব ক্ষেত্রেই পরিবেশ বলতে এখন এমন এক বাস্তবতা বিরাজ করছে যা কোনো না কোনোভাবে নির্মিত বাস্তবের রূপ পরিগ্রহ করছে। এতে করে প্রকৃতির সমাপ্তি অত্যাসন্ন হয়ে পড়েছে। হয়তো কেউ কেউ একে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার কথা বলছে। কিন্তু মানুষ ও প্রকৃতির সকল সম্পর্কই হয়তো মানুষ ও প্রকৃতির ব্যবধানহীনতাকে অনিবার্য করে তুলেছে। সুতরাং ‘প্রাকৃতিক’ সত্তার অনন্যতাকে জানার চেয়ে সামাজিকভাবে নির্মীয়মাণ ও রূপান্তরশীল প্রকৃতির সূক্ষ্মদর্শী অনুধাবন অধিক জরুরি হিসেবে বিবেচনার যুক্তি রয়েছে।

ব্রাউন ও কাস্ট্রির মতে, মানুষের শ্রম ও প্রকৃতি মানুষকে একটি জটিল সম্পর্কজালে আবদ্ধ করেছে। সে-কারণে প্রকৃতির ইতিহাস আর সমাজের ইতিহাস আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। সহস্রাব্দের শুরুতে আমরা একটি সম্পূর্ণ পৃথক ধরনের পুঁজিবাদী প্রকৃতির মুখোমুখি হয়েছি। এ পর্যায়ে পুঁজিবাদী উৎপাদন, প্রতিযোগিতা ও পুঁজি সঞ্চয়নের স্বার্থে নির্মিত ও পুনর্নির্মিত এ-প্রকৃতি পণ্য ব্যতীত কিছুই নয়। সে-কারণে, মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে প্রদত্ত ব্যাখ্যা স্মর্তব্য। তবে, পুঁজিবাদের অন্তর্গত পরিবেশ ও প্রকৃতির যথাযথ মূল্যায়ন-কৌশল মার্কস দিয়ে যেতে পারেননি। কিন্তু বর্তমানে মার্কসবাদী তাত্ত্বিকরা এ-ব্যাপারে যথেষ্ট আলোকপাত করেছেন যাকে এক কথায় ‘প্রকৃতির নির্মাণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

ব্রাউন ও ক্যাস্ট্রির মতে, যাবতীয় অমানবীয় বস্ত্ত ও প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণহীন বাধা মনে করা হয়েছে যার কাছে মানুষকে অবনত হতে হয় এবং অন্যদিকে পরিবেশের সঙ্গে সমাজের সম্পর্ককে অস্বীকার করা হয়েছে। এর ফলে পরিবেশ রূপান্তরের ক্ষেত্রে মানুষের সৃষ্টিশীল সমর্থতাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। বিশ্বজনীনতার ধারণাটিও প্রতিবিপস্নবী কারণ, এর অর্থ হলো সামাজিক সম্পর্কসমূহ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াসমূহের মতোই অপরিবর্তনীয়। পুঁজিবাদী ও আধা-পুঁজিবাদী সমাজসমূহে ‘প্রকৃতির উৎপাদন’ বিষয়ক গবেষণা কর্মকা-কে মার্কস ও প্রকৃতির সম্পর্ক, কৃষির রাজনৈতিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক প্রতিবেশতত্ত্ব এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছে তাৎপর্যপূর্ণভাবে। তবে যেহেতু পুঁজিবাদী প্রকৃতি নববইয়ের দশকের পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত রেখেছে, সেহেতু বেশ কিছু নতুন গবেষণার ক্ষেত্র অনুসন্ধানের অবকাশ রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রকৃতির উৎপাদনের নতুন ক্ষেত্র ও নতুন পদ্ধতি জানা প্রয়োজন যা মার্কসীয় রচনায় যথেষ্টভাবে আসেনি বলে ব্রাউন ও ক্যাস্ট্রি মনে করেন। এ প্রসঙ্গে তাঁরা বিসত্মারিত আলোচনা করেন :

প্রথমেই বিবেচনায় আনতে হয় প্রতিবেশতত্ত্ব। রাজনৈতিক প্রতিবেশতত্ত্বের কিছুটা ব্যতিক্রম ছাড়া প্রতিবেশমার্কসীয় প্রচেষ্টা রূপান্তরিত পরিবেশের প্রকৃতি ও বস্ত্তগত ব্যাখ্যায় যথেষ্ট দুর্বল বলা যায়। অবশ্য বর্তমানে দুটি পরস্পরসম্পর্কিত পা–ত্যধারা প্রকৃতির বস্ত্তময়তা অনুধাবনের সুযোগ করে দিয়েছে। একটি হলো ‘পরিবেশের ইতিহাস’ যা ইতিহাসে প্রকৃতির সক্রিয়তাকে তুলে ধরতে চায় এবং দ্বিতীয়টি হলো ‘নব্য প্রতিবেশতাত্ত্বিক বিজ্ঞান’ যা প্রতিবেশব্যবস্থার স্থিতিশীলতার ধারণাকে নাকচ করতে চায়; বরং অস্থিতিশীলতকে গুরুত্ব দেয়।

পুঁজিবাদী অর্থনীতিসমূহের পরিবেশ-সংলগ্নতাকে অনুধাবনের মধ্য দিয়ে এমন অন্তর্দৃষ্টি লাভ করা যায় যে, রাজনৈতিক-অর্থনীতি ও প্রকৃতির প্রতিবেশবিজ্ঞান জেন্ডার ও এথনিসিটির বা শ্রেণির মতো বিষয় বটে। কৃষিভিত্তিক রাজনৈতিক অর্থনীতি ও তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক প্রতিবেশতত্ত্ব ইতোমধ্যে জেন্ডার, এথনিসিটি ও শ্রেণির দৃষ্টিকোণকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে, যা সামাজিক পরিচয়ের ও ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এসবের ফলে এমনতর একটি মার্কসবাদ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, যেখানে উৎপাদন ও শ্রমকে জেন্ডার ও এথনিসিটি-আক্রান্ত বিষয় হিসেবে দেখা যেতে পারে।

প্রকৃতির উৎপাদন কিছু তাত্ত্বিকদের কাছে বস্ত্তগত ও নিজস্ব ভঙ্গিতে ব্যাখ্যাত হতে দেখা যাচ্ছে। যেহেতু পরিবেশগত ধারণা বা ব্যাখ্যা-বিশেস্নষণ ব্যাপকতা লাভ করছে সে-কারণে পরিপ্রেক্ষিতভিত্তিক বিভিন্ন পরিবেশগত নির্মাণকে আত্মস্থ করার উপায় খুঁজতে হবে।

রাজনৈতিক অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া সত্ত্বেও প্রকৃতি ও উৎপাদনের মার্কসীয় বিশেস্নষণ ‘রাজনীতি’ সম্পর্কে দুঃখজনকভাবে সামান্যই আলোকপাত করা হয়েছে। রাজনীতিকে শ্রেণি বা রাষ্ট্রের কর্মকা–র বাইরে প্রকৃতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত বলে বিবেচনা করতে হবে। মার্কসের সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারণাকে বর্তমানের বেসরকারি সংস্থা, স্থানীয় উদ্যোগ, বিশেষ স্বার্থদল বা সুশীল সমাজের রাজনৈতিক কর্মকা- জটিল করে তুলেছে।

বর্তমান রচনাসমূহ মানুষ-পরিবেশ সম্পর্ককে পর্যালোচনার ওপর জোর দিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে দুটি বিষয় উপেক্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে যার মধ্যে সাম্প্রতিক পুঁজিবাদী প্রকৃতির নির্মাণ লক্ষযোগ্য। এগুলো হলো ‘বৃহৎ বিজ্ঞান’ এবং উচ্চ-প্রযুক্তি ও গণমাধ্যম। এদের নিজস্ব রাজনৈতিক অর্থনীতি রয়েছে এবং এগুলো অর্থগত ও বস্ত্তগতভাবে প্রকৃতির সামাজিক উৎপাদনের বিভিন্ন দিকের গুরুত্ব বহন করে। মার্কসীয় তাত্ত্বিকদের কাছ থেকে এসবের প্রতিবেশতাত্ত্বিক ফলাফল পর্যালোচনা যথেষ্টভাবে আসেনি। আসলে পরিবেশের কৃত্রিমীকরণকে অতিরিক্ত ‘প্রাকৃতিক’ মনে করার ব্যাপারটি সবচেয়ে বেশি অনুসন্ধানের দাবি রাখে। যেমন, ফ্যাশন থেকে শুরু করে জৈব ওষুধ বা গণমাধ্যমে শরীরকে সাম্প্রতিক পুঁজিবাদের কৌশলগত ও উৎপাদনী ভূভাগ হিসেবে উপস্থাপিত হতে দেখা যাচ্ছে। মানবশরীর আজ পণ্যায়িতকরণের অনুশীলনের  বিভিন্ন উপায় হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে যাকে পুঁজিবাদের আরেক ‘সঞ্চয়ন কৌশল’ হিসেবে গণ্য করা যায়।

মার্কসীয় সামাজিক উৎপাদন বিষয়ক আলোচনায় ‘প্রকৃতি ও সংস্কৃতি’, ‘বৈজ্ঞানিক জ্ঞান’ ও ‘রাজনীতি’ আলাদাভাবে রাখা হয়েছে। প্রকৃতিকে মানুষের ব্যবহারের জন্য প্রস্ত্তত একটি সমস্যাহীন বিষয় বলে বিবেচনা করা হয়েছে। এর সামাজিক রূপান্তরকে ঐতিহাসিকভাবে বিবেচনা করা হলেও এর বস্ত্তগত দিককে তা করা হয়নি। মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক মূলত ব্যবহারিক, তাত্ত্বিক নয়। এটি ‘প্রয়োজনের’ মাধ্যমে নির্ধারিত ভাষার মাধ্যমে নির্মিত নয়। কিন্তু ‘প্রয়োজনসমূহের’ সামাজিক নির্মাণ ও সংজ্ঞায়ন মার্কসীয় আলোচনায় গুরুত্ব পায়নি। ব্রাউন ও ক্যাস্ট্রি বলেন, উত্তরকাঠামোবাদ আমাদের প্রকৃতির বিভিন্নমুখী উপস্থাপনার দিকটিকে সামনে এনে ধরেছে। যেমন, ‘অব্যাহত উন্নয়ন’ ও ‘জৈব সংরক্ষণবাদ’ প্রকৃতিকে পুঁজি করার নতুন প্রক্রিয়া মাত্র। এ-ধরনের অনুধাবন ও বিতর্ক উৎপাদনী শর্তের উপাদান তৈরিতে সাহায্য করে। তাছাড়া, প্রকৃতিতে মানুষের হস্তক্ষেপের প্রকৃতি নির্ধারণের বিষয়টিও এমনসব ধারণার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। প্রতিবেশ কীভাবে রূপান্তরিত হয়েছে ও নতুনভাবে সজ্জিত হচ্ছে তা জানার জন্য পুঁজির এ-নতুন অভিযান গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতির সামাজিক উৎপাদন অব্যাহততার মতো নৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিসঞ্জাত নয়। অব্যাহততার মতো প্রত্যয়ের গুরুত্ব প্রকৃতির প্রতি আমাদের মনোভাব ও করণীয়ের মধ্যে সীমিত। কিন্তু প্রকৃতির বস্ত্তকরণ (materialization) অর্থাৎ এর দৃষ্টিগ্রাহ্যতা ও লভ্যতাও সযত্ন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। বস্ত্তকরণ নির্ধারণ করে কতটুকু সামাজিক ও প্রতিবেশতাত্ত্বিক ফলাফল মেনে নিয়ে আমরা প্রকৃতিকে জানব ও পুনর্নির্মাণ করব। ভাষার কৌশলগত ও প্রকাশগত দুটি দিক আছে। প্রথমটি একটি বাস্তবকে উদ্ভাবিত করতে সাহায্য করে। দ্বিতীয়টি এতটাই পরিণতি লাভ করতে পারে যে সে নিজেই একটি বাস্তবতা তৈরি করে যার মধ্যে আমরা বসবাস করি। প্রকৃতি মোট কথা অন্যান্য বস্ত্তর মতো একটি সত্তা যা জগতে বিশেষ কিছু দিক দিয়ে উদ্ভাসিত হয়। সব দিক উদ্ভাসিত হয় না। প্রকৃতিকে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায় মানুষের ইতিহাসের পরতে পরতে প্রকৃতির সংযোগ ও সহাবস্থান কাজ করেছে। প্রকৃতি-সম্পর্কীয় প্রত্যক্ষণ ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত।

মার্কস প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের ব্যবহারিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আসলে আমাদের ভাব, ভাষা ও ভাবনার বাইরে
প্রকৃতির অবস্থান নয়; বরং ক্রমাগত মানুষের ভাবনা ও হিসাবনিকাশের মধ্যে দিয়েই প্রকৃতি সামাজিকভাবে উৎপাদিত হয়ে চলেছে। সুতরাং প্রকৃতির নির্মাণ-পূর্ববর্তী কোনো অস্তিত্ব নেই এমন বক্তব্য উদ্ভট ভাববাদী চিন্তা মনে হলেও এর জ্ঞানতাত্ত্বিক-রাজনৈতিক অর্থ রয়েছে। রাজনীতির লক্ষ্য হতে পারে পরিচিতি, শরীর, অথবা প্রকৃতির বিনাশ। সে কারণে, প্রতিবেশনারীবাদ অধস্তনতা আর শোষণের ক্ষেত্রে নারী ও প্রকৃতিকে সমান ভুক্তভোগী মনে করে। জ্ঞানের সামাজিক ও ঐতিহাসিক উৎপত্তিকে অস্বীকার করা যায় না। পরিবেশের প্রেক্ষাপটেই আমাদের সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক, ও প্রযুক্তিগত সমাবেশ পার্থিবভাবে সম্পন্ন হয়। আর এর পেছনে আমাদের নিয়োজিত জ্ঞান পরিবেশসঞ্জাত বটে। উত্তরকাঠামোবাদের মূল অবদান হলো এ-সময়ের চিন্তাধারা প্রকৃতির নির্মাণের পেছনের সংস্কৃতি-রাজনীতির বিষয়টি সামনে আনতে পেরেছে। অর্থাৎ প্রকৃতি সমষ্টিগত, বস্ত্তগত ও আর্থিকভাবে নির্মিত এমন ধারণাকে তুলে ধরতে পেরেছে।

সংকরায়ণের বিষয়টি হলো বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সামাজিক নির্মাণ ও সামাজিক নির্মাণের সঙ্গে প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক। বস্ত্তনিষ্ঠতার কথা বলে পর্যবেক্ষণ থেকে পর্যবেক্ষককে আলাদা করে ফেলার নিষ্ফল চেষ্টা করে লাভ নেই। বরং এটিই স্বাভাবিক যে, আমাদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের উৎপাদন ঐতিহাসিক মুহূর্ত ও সামাজিক-পারিসরিক প্রেক্ষাপটে সংঘটিত হচ্ছে। উত্তরকাঠামোবাদ প্রকৃতির নির্মাণ সংক্রান্ত এলোপাতাড়ি চিন্তারও প্রণোদনা দেয়। তবে বিজ্ঞান অধ্যয়ন বা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সমাজতত্ত্বও কম যায় না। এটিও প্রকৃতি নিয়ে তাত্ত্বিক ও দার্শনিক চিন্তার সুযোগ করে দেয়। উত্তরকাঠামোবাদ
প্রকৃতির নির্মাণগত দিক নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সমাজতত্ত্ব প্রকৃতির সামাজিক নির্মাণ-সংক্রান্ত ধারণা লাভের ভেতরের দিক দেখার চেষ্টা করেছে। আসলে এমন সমাজতত্ত্ব বলে যে, প্রকৃতি সতত প্রযুক্তিবিজ্ঞানের শিল্পকর্মে পরিণত হচ্ছে। প্রকৃতি এমনভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের অংশ হয়ে পড়েছে যে, কোনো বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বা প্রযুক্তির অবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে
প্রকৃতির পরিবর্তন করে চলেছে। যেহেতু বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের নির্মাণ দেশকাল-নিরপেক্ষ নয় তাই জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তির বিসত্মার, যাবতীয় যোগসূত্র ও নিয়োজিত কর্মীদের আলাদা করা কঠিন। বরং একটি সংকরায়ণ ঘটে চলেছে এদের মধ্যে।

সুতরাং, এটি শক্তভাবেই বলা হচ্ছে যে, Scientific knowledges are made in this forically specific, society situated practices, rather than ‘found’. পশ্চিমা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের একটি প্রধান অনুমান এমন ছিল বা আছে যে,
সমাজ-সংস্কৃতি ‘আধুনিক’ ও ‘আদিম’ রূপে ভাগ করা যায় এদের যথাক্রমে ‘যুক্তি’ ও ‘মিথ’ চর্চার ভিত্তিতে। সুতরাং অনাধুনিক সংস্কৃতি অধ্যয়নের জন্য ‘ethno science’ আর আধুনিক সংস্কৃতি অধ্যয়নের জন্য ‘science’ চর্চাই উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর বিজ্ঞানচর্চার জন্য স্বাভাবিকভাবেই লৌকিক আচার, প্রথা, বিশ্বাস, ধর্ম, রাজনীতি জানার প্রয়োজন হয় না যা আদিম সমাজ অধ্যয়নের জন্য অপরিহার্য। যাহোক, জ্ঞান অর্জন, ক্ষমতা, অনুধাবন ও সংস্কার সাধনের মতো বিষয়গুলো স্বাধীন কর্ম মনে না করে সম্মিলিত ভাবলে এমন সমাজ-সংস্কৃতি-বিচ্যুত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বা প্রযুক্তিবিজ্ঞানের সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়ে। সুতরাং এখন বলার এবং বোঝার সময় এসেছে যে, প্রকৃতির ওপর যে প্রযুক্তিবিজ্ঞানের হস্তক্ষেপ অত্যন্ত শক্তিশালী তার পরিণতি সম্পর্কে সামাজিক ভাবনার অবকাশ রয়েছে। আর এ-কথা আজ অনস্বীকার্য যে, প্রযুক্তিবিজ্ঞানের ও তার মাধ্যমে তৈরি বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, ব্যবস্থাপনা, সংগঠন ও উদ্যোগ গ্রহণ প্রকৃতিকে এবং সমাজকে যথেষ্টভাবে পুনর্বিন্যস্ত ও পুনর্নির্মাণ করে চলেছে। সুতরাং সমাজ, বিজ্ঞান ও প্রকৃতি পরস্পর-সম্পৃক্ত বিষয়। এদের পার্থক্যের চেয়ে সম্বন্ধ অধিক গুরুত্ব বহন করে। আধুনিক মানুষের জন্য যদি প্রকৃতির অংশ হিসেবে নিজেকে ভাবতে অসুবিধা হয়, ছোট হতে হয়, তবে অ-আধুনিক (amodern) হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

যাহোক, ক্যাস্ট্রি ও ব্রাউন অবশেষে সামাজিক প্রকৃতির রাজনৈতিক তত্ত্বের ওপর জোর দিয়ে তাঁদের বক্তব্য শেষ করেন। আমাদের কল্পনায় প্রকৃতি ও সমাজের বিভক্ত ধারণা যথেষ্ট শক্তভাবে ক্রিয়াশীল। যখন আমরা ‘প্রকৃতির সংরক্ষণের’ কথা বলি, তখনো এমন ইঙ্গিত প্রকাশ পায় যেন সমাজ প্রকৃতির বাইরে। এমন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তাই প্রকৃতির সামাজিক ও বহুমুখী নির্মাণকে অস্বীকার করার প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। আমাদের প্রকৃতি বা পরিবেশ রক্ষার কাজ করতে হবে ঠিকই, তবে দেখতে হবে প্রকৃতিতে আমাদের হস্তক্ষেপ কীভাবে হওয়া দরকার এবং কাদের স্বার্থে। কারণ,
প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সীমারেখা টানা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। একবিংশ শতাব্দীর দ্বারপ্রামেত্ম আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ‘প্রকৃতি বিষয়ক একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব’ অনুসন্ধান। এ তত্ত্ব (ক) পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় অন্তর্নিহিত ধ্বংসের স্বরূপ উন্মোচন করবে; (খ) দেখবে জেন্ডার, শ্রেণি, নরগোষ্ঠী ও পছন্দের কারণে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের তারতম্য ঘটে কিনা; (গ) দেখবে সংস্কৃতি-বহির্ভূত একটি স্বনির্ভর প্রকৃতির অসম্ভাব্যতা, এবং (ঘ) বুর্জোয়া ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকৃতিবিচারের ‘সহজাত রোমান্টিকতা’ থেকে আমাদের মুক্ত করবে।

উপসংহার

মার্কসীয় পরিবেশভাবনা ও প্রতিবেশতত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি এর অসম্পূর্ণতা ও কিছু মার্কসবাদীর অতিরঞ্জন করার প্রবণতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে একটি বিষয় দৃষ্টিকটু লাগতেই পারে আর তা হলো মার্কসের অবদানকে অস্বীকার করার চেষ্টা। মার্কসবাদী পরিবেশভাবনা নিয়ে অনেক পর্যালোচনা হয়েছে। প্রকৃতির নির্মাণ ও নির্মাণের প্রকৃতি নিয়ে যে লেখাগুলো দেখা যায় তাতে প্রকৃতির সামাজিক নির্মাণ যেমন ক্ষেত্রবিশেষে অতিরঞ্জিত হয়েছে, তেমনি কট্টর নির্মাণবিরোধী অবস্থানও অযৌক্তিক মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

অর্থনেতিক ও প্রতিবেশতাত্ত্বিক সংশেস্নষ অধিকতর যুগোপযোগী হলেও মার্কসের মূল্যতত্ত্বের সঙ্গে সম্পদ-অভিমুখী শোষণের ধারণা সংযোজনের প্রয়োজনীয়তা মুর অস্বীকার করেন। আলোচনার প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, Even if Marx did not grapple with a global ecological crisis of contemporary standards, and were shaped by, capital accumulation; indeed, Marx studied intensively the works of the leading soil chemists of his day … মুর আয়ারল্যান্ড সম্পর্কে মার্কসের বক্তব্য তুলে ধরেন : Ireland is at present merely an agricultural district of England … for which it provides corn, wool, cattle, and industrial and military recruits … for a century and a half England has indirectly exported the soil of Ireland, without even allowing its cultivators the means for replacing the constituents of the exhausted soil. মুর উল্লেখ করেন যে, এটি মার্কসীয়-এঙ্গেলসীয় তত্ত্বের মূল হলো শ্রম প্রধানত মানবীয় শ্রম ও প্রকৃতির মধ্যে ক্রিয়াশীল একটি প্রক্রিয়া।

Capitalist production disturbs the metabolic interaction between man and earth,. i.e. it prevents the return to the soil of its constituent elements consumed by man in the form of food and clothing; hence it hinders the operation of the eternal natural conditions for the lasting fertility of the soil … In modern agriculture, as in urban industry, the increase in the productivity and the mobility of labor is purchased at the cost of laying waste and deliberating labor-power itself. Moreover, all progress in capitalist agriculture is a progress in the art, not only of robbing the workers, but of robbing the soil; all progress in increasing the fertility of the soil for a given time is a progress towards ruing the more long-lasting sources of that fertility … Capitalist production, therefore, only develops the techniques and the degree of combination of he social process of production by simultaneously undermining the original sources of all wealth …

হর্নবর্গের সমালোচনাকে খর্ব করতে গিয়ে মুর ক্যাপিটাল গ্রন্থের তৃতীয় খ- থেকে উদ্ধৃত করেন যেখানে মার্কস বলছেন, বৃহৎ শিল্প ও শিল্প রূপে অনুসৃত কৃষিতে একই অবস্থা ঘটে। শিল্প বর্জ্য প্রদান করে এবং শ্রম-সমর্থতা বা মানুষের প্রাকৃতিক সামর্থ্য বিনষ্ট করে। অন্যদিকে, কৃষি মাটির প্রাকৃতিক সামর্থ্যকে নষ্ট করে। একসময় উভয় ধারার সম্মিলন ঘটে যখন কৃষিতে শিল্প-ব্যবস্থার প্রয়োগ করা হয়। এতে কৃষিশ্রমিকরা নিঃস্ব হয়। শিল্প ও বাণিজ্য কৃষিকে তার মাটির ক্ষয় সাধনে বাধ্য করে। মুর মনে করেন, মার্কসের এমন বিশেস্নষণ প্রতিবেশতাত্ত্বিক রূপান্তরের শুধুমাত্র জাতীয় রূপ নয়, তিনি সম্পদ লুণ্ঠনের আন্তর্জাতীয় রূপকেও শনাক্ত করতে পেরেছেন। শ্রমের শহর-গ্রাম বিভাজন দেখাতে গিয়েও মার্কস প্রতিবেশতত্ত্বের কথায় ফিরে এসেছেন : বৃহৎ ভূমি সম্পত্তি কৃষিভিত্তিক জনসংখ্যার হার ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনছে; আর তাকে মুখোমুখি করছে সম্প্রসারণশীল শিল্পভিত্তিক শহুরে মানুষেরা। এতে করে সামাজিক মেটাবলিজমের আমত্মঃনির্ভরতার ক্ষেত্রে অপূরণীয় বিভেদ সৃষ্টি করছে। এতে জীবনের নিজস্ব প্রাকৃতিক আইন লংঘিত হচ্ছে। এর ফলে মাটির বিনষ্টি ঘটছে; বাণিজ্যের মাধ্যমে সে-মাটি একটি দেশের সীমানার বাইরে চালিত হচ্ছে। মুর প্রশ্ন তুলেছেন, হর্নবর্গ অর্থনীতি ও প্রতিবেশের সমন্বয় চেয়েছেন; কিন্তু সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কে কিছুই বলেননি। সঞ্চয়ন প্রক্রিয়া তো শুধু পুঁজির সঞ্চয়ন বা পরিবেশের রূপান্তর নয়। এটি নতুন সামাজিক সম্পর্ক ও নতুন শ্রেণিশক্তির আবির্ভাবও বটে। মুর মনে করেন, পুঁজির সঞ্চয়ন, শ্রম, ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংক্রান্ত মার্কসীয় বিশেস্নষণ প্রকৃত অর্থেই সামগ্রিক প্রকৃতির। আজকের পুঁজিবাদী বিশ্বের কেন্দ্র-প্রামেত্মর গভীরতর বৈষম্য, শ্রমিক আন্দোলনের জঙ্গি রূপ ও বিশ্ব প্রতিবেশতাত্ত্বিক সংকটকে একত্রে ভাবতে মার্কসের এই সামগ্রিক পদ্ধতি উপযোগী বটে। কোভেল বলেন, Specifically there is no language within Marxism beyond a few ambiguous and sketchy beginnings that directly addresses the ravaging of nature or expresses the concern for nature which motivates people – Marxist or not – to become engaged in ecological struggle. কোভেল বরং মনে করেন মার্কসের আধ্যাত্মিকতা দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনার অবকাশ রাখে। কারণ, মানুষের মধ্যে এটি একটি শক্তি হিসেবে বিরাজমান। কিন্তু ফস্টার মার্কসের প্রতিবেশভাবনাকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন এবং এ হৃতঐতিহ্য উদ্ধারের মাধ্যমে প্রতিবেশসমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য কাজ করে যাচ্ছেন। মার্কস যে গ্রিক বস্ত্তবাদের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন এবং থিসিস অন ফায়ারবাক, জার্মান ইডিওলজির মধ্য দিয়ে যে বস্ত্তবাদের যথাযথ সুষ্ঠু ভিত্তি দান করেন, তার সঙ্গে প্রতিবেশতত্ত্বের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ডিমোক্রিটাস ও এপিকিউরাসের দর্শন নিয়ে মার্কস গবেষণা করেছেন। এটি শুধু এ দুজনের প্রকৃতিবিষয়ক দর্শনের পার্থক্য নিয়ে নয়, বস্ত্তবাদ নিয়েও আলোচনা।

Leave a Reply

%d bloggers like this: