যখন বৃষ্টি নেমেছিল

লেখক:

আহমেদ মুনির

কতদিন একটানা বৃষ্টি হয়েছিল এখন আর মনে নেই। জুলাই মাসের মাঝামাঝি এক সন্ধ্যায় আমি তখন গুলশান লেকের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা হাসপাতালটাকে অবিরাম বৃষ্টিতে ভিজতে দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলাম। লেকের পাড়ে বড় একটা গাছের নিচে বসে আমি দেখছিলাম হাসপাতালটা কী নির্মমভাবে ভিজে যাচ্ছে। বড় বড় কাচের জানালায় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এক একটা রেখায় নেমে আসছিল নিচের দিকে। থামার কোনো লক্ষণ নেই। ঝাপসা কালো কাচের ভেতরে কোনো একটা কক্ষে আমার আব্বা শুয়ে ছিলেন। কেবলি মনে হচ্ছিল, বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর জন্য তাঁকে দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছিল তার কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রটা এ-সুযোগে বিকল হয়ে বসে আছে। মনিটরে হৎস্পন্দনের উঁচুনিচু রেখাগুলো সোজা হয়ে গেছে। বৃষ্টি সব ধুয়ে দিয়ে গেছে।
আশ্চর্য বৃষ্টি হচ্ছিল তখন। হাসপাতালের আইসিইউর বাইরে লম্বা করিডোরে বসে থাকার চেয়ে তবু এই গাছতলা আমার কাছে অনেক আরামদায়ক মনে হলো। গুলশান লেকের মাছগুলো সশব্দে লাফ দিয়ে আবার তলিয়ে যাচ্ছিল জলের গভীরে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ইচ্ছে হচ্ছিল মাছ হয়ে যাই। আমি যদি মাছ হতাম লতাগুল্ম আর শ্যাওলার আড়াল থেকে এ-হাসপাতালটা কী চোখে পড়ত! এমন নির্মমভাবে ভিজতে দেখতাম তাকে!
মাত্র ঘণ্টাকয়েক আগে ডা. হায়দার খুব শান্তভাবে আমাকে কথাগুলো বলছিলেন। তাঁর কক্ষের জানালার কাচও কালো। বাইরের তুমুল বৃষ্টির খবর তাই এ-কক্ষে পৌঁছে না। ‘দেখুন আপারেশনটা সাকসেসফুল হয়েছিল কিন্তু ‘হসপিটাল বাগ’ বলে একটা জীবাণু আছে। সম্ভবত ইনফেকশনের কারণ সেটাই।’ হায়দার আর্দ্র কোমল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। বেল টিপে পিয়নকে এক ফাঁকে বলে দিয়েছেন, এখন কোনো রোগী দেখবেন না। তার এই সহমর্মিতা আমাকে স্পর্শ করে না। কেবল কান পেতে বৃষ্টির শব্দ শোনার চেষ্টা করি। না, থামার কোনো লক্ষণ নেই। হায়দার দাড়িতে একটু হাত বুলিয়ে আবার আমার দিকে তাকালেন। ‘মনে হচ্ছে মাল্টি অর্গান ফেইলিউরের দিকেই যাচ্ছে। আমি আর কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।’ হঠাৎ বৃষ্টির শব্দে আমার কানে তালা লেগে গেল। কিন্তু এ-ঘরে তো বৃষ্টির শব্দ শোনা যাওয়ার কথা নয়।
বৃষ্টিতে ভিজে চুপসে যাওয়া এ-হাসপাতালটার ভেতরে কোনো একটা করিডোরে আমার মা বড় খতমের দোয়া পড়ছিলেন। সেনাবাহিনীর কোনো এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আব্বার খোঁজ নিয়ে গিয়েছিলেন তার কিছুক্ষণ আগে। সে-সময় চিফ সার্জন আম্মাকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা আশাবাদী। সাধ্যমতো সবকিছু করা হবে। মেডিকেল বোর্ডও বসবে।’
আম্মার মুখে হাসির রেখা। ‘বলেছিলাম না, বড় খতমের দোয়া অনেক শক্তিশালী।’ আমার বড়ভাই কেএফসি থেকে চিকেন এনে সবার হাতে হাতে তুলে দিচ্ছিলেন। কিন্তু আশাবাদী লোকজনের ভিড় থেকে তখন অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম আমি। ঠিক অনেক দূরে নয়, করিডোরের পরে একটা বড় দেয়াল, তারপর আরো কয়েকটা কক্ষ, তারপর আরো কয়েকটা দেয়াল। শেষ দেয়ালটার বাইরে বড় বাঁধানো চত্বর। তার চারপাশে ফুলের বাগান। সে-বাগানে একটা বড় গাছের নিচে বসে আমি বৃষ্টি দেখছিলাম।

দুই
আমরা যখন খুব ছোট, তখন পাহাড়তলীর রেলওয়ে কোয়ার্টারের বারান্দায় বসে চার ভাইবোন বৃষ্টি দেখছিলাম। আব্বা ‘কলে’ গেছেন। মানে রোগী দেখতে গেছেন। আব্বা হাসপাতালে থাকলে আমাদের আনন্দ। ‘কলে’ গেলে আমরা স্বাধীন। বারান্দায় বসে আমরা বৃষ্টি দেখতে দেখতে বলাবলি করছিলাম, এমন বৃষ্টিতে আব্বা কী করে আসবেন। আমাদের সহচর বাগানের মালি ছিদাম গল্পের ডালা খুলে বসেছিল তখন। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল ওর কণ্ঠস্বর। ‘বুইজঝেননি, আব্বা, হোন্ডা চালায় কেমনে একদিন দেইখলাম। আই তন দোকানে গেছিলাম। একখান সুপিরিয়র কোচ আইয়ের, আব্বা হোন্ডা লই এমন স্পিডে চালাইছে এক্কারে বাসের ছাদের ওসে দি রাস্তার হে মাথায় যাই হইড়সে।’ আব্বা সুপিরিয়র কোচের ওপর দিয়ে বাইক হাওয়ায় ভাসিয়ে উড়ে যাচ্ছে Ñ এ-দৃশ্যটা ছিদাম আমাদের মনে পাকাপোক্তভাবে গেঁথে দিয়েছিল। আমার ছোটভাই আসিফ মাথা নেড়ে বলেছিল, ‘আমি জানি, আব্বার কাছে পিস্তল আছে।’ আলোচনার এক ফাঁকে আব্বার বাইকের শব্দ শুনেই আমরা বিদ্যুৎবেগে যে যার বিছানায়। শুয়ে শুয়ে আব্বার খাওয়ার শব্দ শুনি। যেন কোনো কিছুকে খচখচ করে ফালাফালা করে কাটা হচ্ছিল। ভয়ে চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল আরো। ভাবি, আব্বা খায় কেন? আসে কেন? আর কেনই বা ঘন ঘন ‘কলে’ যায় না? ঘুমের ভান করে পড়ে থাকতে থাকতে একসময় টের পাই, আমার সারা গালে আব্বা চুমু খাচ্ছেন। আমি ভয়ে চোখ খুলি না। যদি চোখ খুললে আব্বা বুঝতে পারেন, আমি জেগে আছি। আর যদি বুঝতে পারেন, আমি টের পেয়েছি তিনি আমাকে চুমু খাচ্ছেন! তখন কী হবে! নিশ্চয় খুব মারবেন।

তিন
সেসব সুপিরিয়র কোচ কবে বৃষ্টিতে ভেসে গেছে। রাস্তায় এখন ওদের কঙ্কালও কেউ খুঁজে পাবে না। হাসপাতালের গাছের নিচে দাঁড়িয়ে এমন একটা বাসের জন্য হাহাকার জাগছিল আমার মনে। আমি অভিশাপ দিচ্ছিলাম বৃষ্টিকে। এই বৃষ্টি কখন শুরু হয়েছিল আমার মনে নেই। আমরা যখন চট্টগ্রাম থেকে উত্তরায় বড়ভাইয়ের বাসায় গিয়ে উঠি, তখন পাঁচ নম্বর সেক্টরের রাস্তাটা ডুবে গিয়েছিল। আর পরদিন হাসপাতালের রিসিপশনে দাঁড়িয়ে আব্বা যখন আমাকে মৃদু শাসাচ্ছিলেন তখনো বৃষ্টির থামাথামি নেই। আব্বা বলছিলেন, ‘জাহাঙ্গীর সহেবের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি চিফ সার্জন। বলেছেন, আপনি নিজেও ফিজিশিয়ান। এমন একটা অপারেশন এখন তো জলভাত।’ আমি তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। বাইরের বৃষ্টির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে কেবল শুনছিলাম। আব্বা মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, ‘সিনক্রিয়েট করিস না। এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো হাসপাতাল। কান্নাকাটি করলে লোকে বাঙাল ভাববে।’ কাগজপত্র, ফরম পূরণ করে আব্বা সোজা উঠে গেলেন কেবিনে। আর আমি তখনো ভাবছিলাম আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টিটা থেমে যাবে, কিন্তু সেটা ঘটল না। হাসপাতালের আইসিইউতে আব্বা আর করিডোরে স্থান হলো আমার। প্রায় মাসখানেকেরও বেশি সময় করিডোরে ঘুমাতে হয়েছে আমাকে। আর সেই সময় এক মুহূর্তের জন্যও বৃষ্টি থামেনি। রোগীদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে হাসপাতালের করিডোরে বিছানা পেতে শুয়ে শুয়ে আমি কেবল হারিয়ে যাওয়া বাসগুলোর কথা ভাবতাম। যে-বাসগুলোর ওপর দিয়ে আব্বা হোন্ডা চালিয়ে অনায়াসে পার হয়ে যেতেন।
একদিন ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠি একটা বাচ্চার হাসির শব্দ শুনে। অপারেশন থিয়েটারের বাইরে হুইল চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে ওকে। বাচ্চাটা চেয়ার ছেড়ে উঠে হাতের গাড়িটা মেঝেতে চালিয়ে দিয়ে তালি দেয়। ‘আমার গালি আমার গালি।’ বলে ছুটে যেত চায় গাড়ির পিছু পিছু। সার্জন, নার্স এসে ওকে আবার হুইল চেয়ারে বসিয়ে দেয়। সবাই ঘিরে ধরে চুমু খাওয়াতে খুব বিরক্ত হচ্ছিল সে। ভিড়ের মধ্যে থেকে কে যেন বলল ‘মা, তুমি তোমার বাবুকে আদর করে দাও একবার।’ অপারেশন থিয়েটারের সামনে বড় একটা পিলারে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে-থাকা তরুণীটি মৃদু স্বরে বলল ‘পারব না।’ কিন্তু বাচ্চাটাকে ওটিতে নেওয়ার পর বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে শোনা গেল তরুণীর বিলাপ। ‘হায় আল্লাহ, আমি আমার সোনাকে কাটাছেঁড়া করতে পাঠালাম! হায় আল্লাহ, কী নিষ্ঠুর আমি!’
এ ঘটনার বহুক্ষণ পর হাসপাতালের খোলা চত্বরে ভিজতে ভিজতে একটা লাশবাহী গাড়ি ফটক দিয়ে ঢুকতে দেখি আমি। গাড়িটি যখন নিচের কার পার্কিংয়ের দিকে নেমে যাচ্ছিল তখনো অঝোরধারায় বৃষ্টি পড়ছিল। বৃষ্টির শব্দ যেন আমার কানের ভেতরে অদ্ভুত একটা ছন্দ তৈরি করছিল। ঝমঝম শব্দটা পালটে গিয়ে শোনা যাচ্ছিল হায় আল্লা, হায় আল্লা।

চার
হাসপাতালে আসার একমাস তিনদিন পর আব্বার লাশ নিয়ে আমরা যখন চট্টগ্রামের পথে রওনা দিয়েছিলাম, তখন মৃত্যুশোক থেকে বড় হয়ে উঠেছিল ঠিকঠাক পৌঁছাতে পারার চিন্তাটা। একবার কাঁচপুর ব্রিজের কাছে আরেকবার দাউদকান্দি সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে গিয়েছিল গাড়ি। বৃষ্টির জন্য দেখা যাচ্ছিল না কিছুই। আমার মামা হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘ড্রাইভার সাহেব পারবেন তো’! ড্রাইভার ধীরে ধীরে গাড়ি টেনে নিচ্ছিলেন। বললেন, ‘সাধারণ গাড়ি হলে কথা ছিল না। লাশের গাড়ির ওপর আসর থাকে। চল্লিশ দিন ছেলেপুলেরে সাবধানে থাকতে হয়। যে যায় সে মায়া ছাড়তে পারে না তো। সবাই দোয়া পড়েন। আল্লার নাম করেন।’ অ্যাম্বুলেন্সের ছাদের ওপর বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটার শব্দে বোঝা যাচ্ছিল না, কেউ দোয়া পড়ছিল কি-না। নিকষ অন্ধকার ফুঁড়ে আব্বা তখন ফিরছিলেন তাঁর প্রিয় বাড়িতে।