যতিচিহ্নের খোঁজে

লেখক: মোস্তফা তারিকুল আহসান

মেয়েটা তার বাঁ-ভ্রু খানিকটা কাঁপিয়ে চোখটা বাইরে আকাশের দিকে ফেরালে যে-দৃশ্যটার জন্ম হয় তার ব্যাখ্যা হাবিব দিতে পারে না; অনুভব করে, বুকের মধ্যে একটা হাহাকার জাতীয় স্বরহীন শব্দ হয় – খানিকটা উত্তেজনাও একে বলা যায়। বাঁ-চোখের তারার মধ্যে যে-সৌন্দর্যময় রং খেলা করছে বিদ্যুৎপ্রভার মতো, তাকে সে কী বলবে? পঞ্চাশের পরে খানিকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে জীবন অতিবাহিত করতে গিয়ে, সংসার-চাকরিতে নিজেকে সঁপে দিয়ে সে সব হারাতে বসেছে বলে একসময় ভাবত, এখন আর ভাবে না, তখন সে কবিতার ডালপালা নিয়ে সময় কাটাত, নতুন শব্দ, শব্দময়তার ইন্দ্রজাল নিয়ে ব্যস্ত দিনরাত কাটাত সেই দিনের ছিটেফোঁটাও তার মধ্যে আর ছিল না বলে সে জানে বা মেনে নিয়েছে। বন্ধুরা তাকে পলাতক বলে মনে করলেও সে নিশ্চুপ থেকেছে; দুটো কবিতার বই বের হওয়ার পরও সে ইউটার্ন দিয়েছে। ব্যাংকের হিসাব-নিকাশ, সংসারের দায়, বউয়ের চোখ রাঙানি-অভিযোগ, সন্তানদের চাহিদারাজ্য সামলে দিব্যি ধারাবাহিক মনুষ্যজীবন যাপন করে চলেছে কুড়ি বছর। তার চোখ তো মরে গেছে, চশমা দিয়ে সে অংকের চেহারা দেখে, টাকার চেহারা দেখে, কাউন্টারে সারি সারি মানুষ দেখে মাছির মতো, আর ম্যানেজার সাহেবের কলিংবেল দেখে কখন সেটা বেজে উঠবে।
কুড়ি বছর পর সামনে সদ্য ফোটা গোলাপের মতো কিশোরী নাকি তরুণীর ভ্রু-কাঁপানোর দৃশ্য হাবিব আবিষ্কার করল কীভাবে, সে ভাবতে থাকে। তার বাম পাশে এক ভদ্রলোক কোট-টাই পরা, সামনে একজন বয়স্ক মহিলার পাশে বসে আছে কলাপাতা রঙের একটা জামা আর সাদা পাতলা ওড়না পরা মেয়েটি। সে অটোতে উঠেই প্রতিদিনকার মতো মানিব্যাগ এবং চাবির গুচ্ছ ঠিকঠাক আছে কি না দেখে; এই কাজে কিছুক্ষণ ব্যস্ত থাকার পর সে পুরু লেন্সের চশমাটা রুমাল দিয়ে বারকয়েক মুছে নতুন করে নাকের ওপর বসায়। বাঁ-চোখে ঝাপসা একটা অন্ধকার-অন্ধকার ভাব হলে সে আবার চশমাটা খোলে। সে টিস্যু খোঁজে। কোটের বাম পকেটে কয়েকটা টিস্যু থাকে বহুদিনের অভ্যাসবশত, সেখান থেকে একটা টিস্যু নিয়ে চশমাটার বাঁ-কাচ ভালো করে মোছে, চকচকে করে তোলে; মুচি যেমন জুতো পালিশ করে চকচকে করে তোলে সেও তেমন চকচকে করে তোলার চেষ্টা করে। পেরেছে বলে মনে হলে চশমাটা আবার নাকের ওপর সটান বসিয়ে দেয়। এখন সে ডানে বামে সামনে তাকায় সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে; আর পরিষ্কার লেন্সের চশমায় সে বিশ বছর পর তরুণীর চোখের দীপ্ত চঞ্চলা চাহনীর প্রপাত আবিষ্কার করে; আবিষ্কার করে বলাটা ঠিক কি না ব্যাখ্যাসাপেক্ষ, তবে সে বুঝতে পারে জীবনঘনিষ্ঠ সূক্ষ্ম সংবেদগুলো বা মোহনীয় সব খেলাধুলা যা সে হারিয়ে ফেলেছিল তা সব লুপ্ত হয়ে যায়নি; চাপা ছিল প্রায় দুই যুগের মতো। হাবিব খানিকটা আনন্দ পায়, এই আনন্দের নাম কি? সৌন্দর্যময় কোনো মহাদেশ আবিষ্কারের আনন্দ? সে কি ক্রিস্টোফার কলম্বাসের মতো পুলকিত? হাবিব পুলকিত হয়, রোমাঞ্চিত হয়, প্রেমে পড়ার মতো আনন্দ এটা নয় সে জানে, তবে সে রোমিও ভাবতে চায় নিজেকে অথবা শেকসপিয়র। বাঁ-পাশের ভদ্রলোক বেশ মোটা হওয়ার কারণে ওর বসতে অসুবিধা হয়; লোকটা সকালে দাঁত ব্রাশ করতে ভুলে গেছে অথবা তার পাইরিয়া রোগ আছে সে শনাক্ত করে আর বিকট গন্ধে তার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলেও সে তেমন কোনো কষ্ট অনুভব করে না। সে আগেও এরকম দন্তজনিত দুর্গন্ধের কবলে পড়েছে এবং তার মনে হয়েছিল, সে আর অটো বা এমায় চড়বে না; ধার করে বা দেনা করে একটা পুরনো গাড়ি কিনে ফেলবে। একটা প্রমোশন পেলে সে গাড়ি কিনতে পারত। সংসারের লাগামহীন খরচের কথা ভেবে সে আর কিনতে পারেনি। তবে মনে মনে ভেবেছিল, পত্রিকায় চিঠিপত্রের কলামে একটা লেখা দেবে। কমনসেন্স বা সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে, কিন্তু সে তৈরি করতে পারেনি।
তবে আজ খুব বেশি পীড়াদায়ক মনে হচ্ছে না ব্যাপারটা। সামনের বাঁ-পাশের বয়স্ক মহিলা খুব সেজেগুঁজে নিজেকে জগতের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী বানানোর চেষ্টা করেছেন সেটা বোঝা যায়। ভারী গহনা, দামি শাড়ি, কাজল লিপস্টিক ইত্যাদি সমবায়ে তাকে জড়বস্তু মনে হচ্ছে, সেটা মহিলা একবারও ভাবতে পারছেন না। এটাই মনে হয় সত্য, কেউ নিজের অযোগ্যতার কথা ভাবতে পারে না। হাবিবের মনে হলো আজ তার চোখের জ্যোতি বেড়ে গেছে, চোখ আগের মতো সূক্ষ্ম সূ্ক্ষ্ম ব্যাপার লক্ষ করতে পারছে, গভীর গহন আনন্দরেখা খুঁজে পাচ্ছে। একবার ভাবে, তার হলোটা কী? সকালবেলা সেই একই খাবার – আলু ভাজি, রুটি-ডিম খেয়ে বের হলো, শ্যামলী বাজারের একটা লিস্ট ধরিয়ে দিলো, ছেলে বড় অংকের একটা টাকা দাবি করল, মেয়ে নতুন ঘড়ি কেনার ঘোষণা দিলো – সব তো রুটিনমতো হলো, তাহলে চোখ খুলে গেল কীভাবে? হাবিব মেয়েটার দিকে একবার খুব সংকোচভরে সামান্য উঁচু করে তাকায়, আবার চোখ নামিয়ে ফেলে। সে বাইরের আকাশ থেকে নিজের আকাশ-বাতাস-পৃথিবী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
হাবিব নিজেকে শোনায় : ব্যাটা তোমার আজ কী হলো? তুমি কি জানো তোমার নন্দনের দরজা আবার উন্মুক্ত হচ্ছে? তুমি আলোকহারা হওনি, তুমি বেঁচে আছ, তুমি আবার প্রজাপতির পাখায় সব রং দেখতে পাবে, গাঙশালিকের চোখে আকাঙ্ক্ষা দেখতে পাবে, প্রগাঢ় সন্ধ্যায় আবিরমাখা কাকাতুয়ার কাছে তোমার মনের সাযুজ্য খুঁজে পাবে, অথবা আকাশ ভেঙে বৃষ্টি আসার পর তুমি চিনতে পারবে আত্মার আকুলতা, পরাজিত রাধার সঙ্গে তোমার দেখা হলে তুমি মন খুলে কথা বলতে পারবে, তুমি তো বুঝতে পারো দীর্ঘদিন অন্ধ থাকার পর চোখের আলো কত তীব্র হয়ে ফিরে আসে। তুমি রাতের অন্ধকার জানালার পৃথিবীর সঙ্গে বাক্যবিনিময় করতে পারবে; সত্য-মিথ্যার মাঝে আরো অনেক জীবনের রং থাকে, যা তোমাকে ভাবাত সবসময়, তা তুমি আবার বুঝতে পারবে।
মেয়েটার দিকে তাকাতেই সে বুঝতে পারে সে কিশোরী নয়, তরুণী, তবে তার স্বভাব চঞ্চলা কিশোরীর। সে ডান হাতে ধরা সেলফোন থেকে নিজের ছবি তোলার চেষ্টা করে। ছবি তোলে না কেন? হাবিব লক্ষ করে বাঁ-হাত দিয়ে সে তার উড়ন্ত চুল শাসন করার চেষ্টা করে। আবার কখনো কপালের কাছে সিঁথির কাছে বাম হাত দিয়ে চুলের গুচ্ছকে ওপরের দিকে তুলে দিয়ে নতুন আকার দেওয়ার চেষ্টা করে। চুল তার শাসন মানে না। যদিও ফাগুনের সকালে বাতাস খুব নেই, তবু অটোর গতি বেশ বাতাস জোগান দেয়। সে তার ছোট্ট আর বাদামি রঙের ব্যাগ থেকে কী যেন খুঁজে চলে। একটু পরে একটা ক্লিপ বের করে বাঁ-কপালের ওপর একগোছা চুল আটকায়। আবার মোবাইলের স্ক্রিনে মুখ দেখে, পরক্ষণে ক্লিপটা খুলে ফেলে আর সেটা হাত থেকে অটো রিকশার মেঝেতে পড়ে গেলে মেয়েটা নিচু হয়ে ক্লিপটা তুলতে যায়; হাবিব খেয়াল না করে পারে না তার পায়ের কাছে ক্লিপটা তুলতে গিয়ে মেয়েটার ক্লিভেজ স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার চোখে, সদ্য তরুণী তার দুই বক্ষের মাঝে অতি মনোহর ত্বকাচ্ছাদিত সৌন্দর্যের লালিমা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। হাবিব তার চোখের আলোতে ক্ষণিকে নতুন জগৎ দেখতে পায়। তার হয়তো উচিত ছিল মেয়েটার ক্লিপটা তুলে তার হাতে দেওয়া, সেটাই সৌজন্য। তবে সে অটোতে ওঠা অবধি খানিকটা উতলা ছিল বা মোহাচ্ছন্নতায় ছিল বলেই হয়তো এই সৌজন্যটুকু দেখাতে পারেনি। তবে মেয়েটা স্বস্থানে বসার পর তার দিকে ফিরে চুপিচুপি হাসে। এর দুটো অর্থ করা যেতে পারে; প্রথমত, মেয়েটার স্বভাবের মধ্যে চুপিচুপি হাসার ব্যাপার রয়েছে। আর দ্বিতীয়ত, ক্লিপটা পড়ে যাওয়ায় যে-চঞ্চলতা তার জন্য ক্ষমাজনিত বা অপরাধবোধজনিত কারণে সে হেসেছে। হাবিব আসলে এসব নিয়ে খুব ভাবে না; সে ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন দেখা একটি ছবির কথা। মার্কিনি একটি ছবি। অস্কার পেয়েছিল সেবার। বন্ধুরা মিলে দেখেছিল। সেখানে নায়িকা যে পেস্ট কালারের একটা দীর্ঘ গাউন পরে আর তার দুই সুডৌল স্তনের মধ্যবর্তী সৌন্দর্য পোশাকের লুকোচুরিতে যেভাবে প্রকাশিত হয়েছিল সে-দৃশ্য সে বহুদিন মনে রেখেছিল। আজ আবার মনে পড়ে। মেয়েটি বাঁদিকে তাকিয়ে ছিল, চোখে আগুনরঙের আহ্বান আর নারীর সৌন্দর্যময় ক্লিভেজের অপূর্ব শোভা। এটা ওদেশের মেয়েদের স্বাভাবিক ঢং, সেটা সে জানত। তবে, সে যে অনাবিল আনন্দিত আর রোমাঞ্চিত হয়েছিল বা যেটুকু উত্তেজিত হয়েছিল তা তাকে সাময়িক মোহাবিষ্ট করেছিল, তা আজো তার মনে আছে।
মেয়েটা মোবাইলের ক্যামেরা চালু করে সেলফি মুডে পরপর কয়েকটা ছবি তোলে; তোলার সময় সে বাইরের পটভূমি ব্যবহার করার চেষ্টা করে। পদ্মা নদীর ধার দিয়ে বড় বড় বটগাছ, কৃষ্ণচূড়ার গাছ আর বাঁধের ঢালু মাটিতে সারি সারি গাঁদা ফুল। বোঝা যায় না চলন্ত গাড়িতে সে কত ভালো ছবি তুলতে পারে। পাশের সুসজ্জিত মহিলা নাসিকা কুঞ্চিত করে আছেন। তারও নিশ্চয় মোবাইল রয়েছে। তবে তিনি বের করেন না। পাশের কোট-বাবুকে দেখে মনে হয় জগতের কোনোদিকে তার খেয়াল নেই। তিনিও হয়তো অফিসে যাচ্ছেন। মহিলা সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছেন অনুমান করা যাচ্ছে না। তরুণী হাবিবের দিকে একবার গাঢ় দৃষ্টিতে তাকায়, তবে কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তার তো সময় নেই, সে মহাব্যস্ত নিজেকে নিয়ে। কলাপাতা রঙের জামাটা আসলে শার্টের মতো, কলার আছে, বোতাম আছে। এর সঙ্গে মেয়েরা সাধারণত আজকাল ওড়না পরে না, সেও আসলে পরেনি, তবে রেখেছে, রেখেছে গলায় ঝুলিয়ে। ফাল্গুনের শেষের দিকে হলেও এবার মোটামুটি ঠান্ডা আছে। সবাই গরম কাপড় পরলেও মেয়েটা পরেনি। ওর কি শীত লাগছে? হাবিব মনে করে, সে কেন এত ভাবাভাবি করছে। প্রতিদিন তো সে অফিসে যায়, কত মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়, এভাবে তো সে কোনোদিন ভাবেনি বা চঞ্চল হয়ে ওঠেনি। সে কারণ খোঁজার চেষ্টা করে। খুব জোরালো কারণ সে খুঁজে পায় না। তবে বুঝতে পারে সে, আজ অন্য এক মানুষ আর তাকে অন্য মানুষে পরিবর্তন করেছে এই মেয়েটা। আবার মনে হয়, তাই বা কেন? মেয়েটা সুন্দরী বা সে নানা রকম চঞ্চলতা দেখাচ্ছে সেটা তো স্বাভাবিক; তাহলে তাকে দায়ী করা তো ঠিক নয়। সে মনে করে এই চঞ্চলতা তার নিজের মধ্যে লুকিয়ে ছিল, আজ উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে আলোতে বের হয়ে এসেছে। বাঁধের সঙ্গে লাগোয়া পলাশ গাছে থোকা থোকা ফুল, সে তাকিয়ে থাকে; আবার দেখে একটা ন্যাড়া শিমুল গাছ। ফুল ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এদের কাজই বোধহয় মানুষের চোখকে রাঙিয়ে দেওয়া। আর কোনো কাজ কি এদের আছে? সকালের রোদের সঙ্গে পলাশের শিমুলের লাল রঙের মিশ্রণে এই অপূর্ব রঙের বিস্তার সে দেখে, যদিও ক্ষণিকের জন্য এবং চলন্ত অটোতে বসে যখন ইচ্ছে করল আরো একটু গভীর করে দেখবে, দেখতে পায় না। তবু সে তাকিয়ে থাকে, দৃশ্যটা চোখ থেকে হারিয়ে গেলেও সে তাকিয়ে থাকে। এই লালের মধ্যে কি আগুন লেগে আছে? এই লালের মধ্যে কি জীবনের রোদ মুকুরিত হচ্ছে? এই সকালের রোদে শিমুল পলাশ কি তাকে আবাহন করছে? চোখ ফিরিয়ে নিয়ে, কিছুক্ষণ চোখ মুদে সে আবার চোখ খোলে। সামনে মেয়েটার ঠোঁটে লাল পলাশ রঙের গাঢ় লিপস্টিক। সে আই লাইনার দিয়ে চোখটাকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। কখন হলো এসব? নাকি আগেই ছিল। সে আশ্চর্য হয়ে যায়, ঠোঁটের গাঢ় লিপস্টিক কি সে আগে দেখেছে? নাকি পলাশ শিমুলের লাল ফুল দেখা চোখে ওই রং গেঁথে আছে; তাই মেয়েটার ঠোঁট লাল? সে খানিকটা বিভ্রমে পড়ে। তার এটাও মনে হয় যে, সে যখন হা করে শিমুল-পলাশ দেখছিল, সেই ফাঁকে মেয়েটা পলাশ রঙের লিপস্টিক মাখিয়ে নিয়েছে ঠোঁটে। সেটা কি আদৌ সম্ভব? সে আবার তাকায় চুপিচুপি – প্রগাঢ় শিমুল-পলাশের লাল রঙে তার দুটো ঠোঁট জ্বলজ্বল করছে, একটু কাঁপছে তিরতির করে। মেয়েটা একবার ডানে কাত হয়ে থাকে আর একবার বাঁয়ে কাত হয়ে থাকে আর ডান হাতের তর্জনী দিয়ে কৃত্রিম গর্ত করে ফেলে কপোলে। আবার সে ডান হাঁটু উঁচু করে সেখানে ডান হাতের কনুই রেখে হাতের তালুতে থুঁতনি রাখে। এভাবে মুখটা তার আরো একটু কাছে আসে এবং ওপর থেকে নিচে আসে। পাশের ভদ্রলোক এখন সিটে হেলান দিয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে গভীর ঘুম। সেটাও ভালোই। তবে হাবিবের মনে হয় এই হা করে নাক-ডাকিয়ে ঘুমিয়ে ভদ্রলোক তার পুলকিত মনোস্তর নষ্ট করে দিচ্ছেন। পরক্ষণে এটাও মনে হয়, এই কুশ্রী ভঙ্গির পাশে এই শিমুল-পলাশ ওষ্ঠ রঙিন ভঙ্গিমাটা বেমানান হলেও পার্থক্যটা খুব স্পষ্ট হয়েছে।
চালক ব্রেক করে অটো থামালে সাজুগুজু ভদ্রমহিলা নেমে যান। নামার সময় হাবিবের দিকে তেরছাভাবে একঝলক তাকান, তাতে স্পষ্ট ঘৃণামিশ্রিত লক্ষণ স্পষ্টভাবে যুক্ত ছিল। ভদ্রমহিলা নামার পর ওই সিটে আর একজন যুবক উঠে বসলে অটো চলতে শুরু করে। ভদ্রমহিলা নেমে যাওয়ার সময় যে ক্রূরভঙ্গিতে তার দিকে তাকালেন তা নিয়ে ভাবতে হাবিব খানিকটা দ্বিধান্বিত হয়। সে কি তরুণীর প্রতি বালখিল্য আচরণ করছে? নাকি অধিক উত্তেজনাবশত যা অনুচিত তাই করছে। বয়স্ক একজন মানুষ একজন তরুণীকে দেখে উৎসুক হলে এদেশের মানুষ ভালোভাবে নেয় না – এই জ্ঞান তার আছে। তবে সে কি দৃশ্যত কোনো কিছু করেছে যা তাকে অপরাধী ভাবতে সাহায্য করে? তার ভেতরের কিছু অর্গল ভেঙে গেছে, সে সংবেদী হয়ে উঠেছে বা কয়েকবার তাকে দেখেছে নিভৃতে। সামনে একজন মানুষ বসে থাকলে দেখাটা খুব স্বাভাবিক; চোখ বুজে বসে থাকা যায়, জানালায় তাকিয়ে থাকা যায় সারাক্ষণ, তবে সেটাও স্বাভাবিক আচরণ নয়। সে তার নিজের মধ্যে অস্বাভাবিকতা খোঁজার চেষ্টা করে। সে কি মানসিকভাবে খানিকটা অসুস্থ? ক্লান্ত, বিধ্বস্ত? যুবকের দিকে তাকিয়ে তার একটু যেন হিংসে হয়। মেয়েটার ওড়না বাতাসে উড়ে গিয়ে ছেলেটার কাঁধের ওপরে পড়ছে। ছেলেটা ভ্রুক্ষেপ করে না, মেয়েটাও না। সেটাই তো স্বাভাবিক। তবে তার একটু রাগ হচ্ছে। ছেলেটার বাম হাতের ভাঁজ করা কনুই মেয়েটার শার্ট স্পর্শ করছে। তার কি সত্যি রাগ হচ্ছে? মনে মনে ভেবে দেখে, হ্যাঁ হচ্ছে। তাহলে এটা কী লড়াই? অদৃশ্য প্রতিযোগিতা? সে কি মেয়েটার পাশে বসতে চায়? আবার মনে করে, সামনে বসেই বরং তার জন্য ভালো হয়েছে। সে তো চঞ্চলা হরিণী মেয়েটার প্রতিটি প্রযোজনা দেখতে পাচ্ছে। পাশে বসলে সেটা তার আর হতো না। হ্যাঁ, ছেলেটা কখনো কখনো মেয়েটার কাপড়ের মৃদু স্পর্শ পাচ্ছে। এই প্রথম সে বুঝতে পারে মানুষ যা মনে করে বা যা সে প্রকাশ্যে করে তার সব ব্যাখ্যা সে দিতে পারে না। কোনো সুপ্ত বাসনা বা অতৃপ্তি থেকে তার কী আচরণগত পরিবর্তন হবে সেটা সে কী করে বুঝবে?
কয়েকদিন থেকেই হাবিব বিধ্বস্ত ছিল; অন্তত তার এমন ধারণা। দুটো ঘটনার পর সে নিজেকে মিলিয়ে নিতে চেয়েছিল বা বুঝে নিতে চেয়েছিল। তার বায়ান্নতম জন্মদিনে ছেলেমেয়ে-বউ মিলে চার পাউন্ড ওজনের একটা দামি কেক সাজিয়ে রেখে তাকে নতুন পাঞ্জাবি পরতে দিয়েছিল। মোমবাতি জ্বেলে তিনজন সমস্বরে ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ’ বলে তাকে বরাবরের মতো উইশ করে। নতুন পোশাকে হাসি হাসি মুখ সবার।
জন্মদিন সে কখনো আগ্রহ নিয়ে পালন করে না, মাঝে মধ্যে সবার চাপে পড়ে করতে হয়। বিশেষত মেয়ে বড় হওয়ার পর সে বাবার জন্মদিন পালন করার রেওয়াজ চালু করেছে। আগে শুধু ওদের দুই ভাইবোনের হতো। সে এটা ঠিক উপভোগ করে না। এই নিস্পৃহতার কারণ সে ব্যাখ্যা করতে পারে না। শ্যামলীকে দেখল খুব খুশি খুশি। মেয়ে বাবার গলা জড়িয়ে বলে, তোমাকে খুব মিস করি বাবা। ছেলেটা মেয়েটার তিন বছরের ছোট, সে মুখ টিপে হাসে। শ্যামলী বলে, বুড়ো খোকা, এবার কেক খাও, ভালো করে। মেয়ে কেক কাটে আর তিনজন মিলে চামচ ধরে তার মুখে পোরার আগে মেয়ে সেলফি তুলে ফেলে। এই ছবি-তোলা তার কাছে অসহ্য লাগে। সে মনে করে এটা একটা রোগ। তবু মুখে কিছু বলতে পারে না। শ্যামলী যখন বলে বুড়ো খোকা, তখনই সে মনে মনে একটা কথা বলবে ভেবে রেখেছিল, এখন তা বলে : একটা গান আছে, জানো তো, সবাই বলে বয়স বাড়ে, আমি বলি কমে রে। শ্যামলী বলে, হ্যাঁ, তবে এর কি অর্থ ভেবে দেখিনি। সে বলে, শোনো আমার যা বয়সের বরাদ্দ তার থেকে তো আজ এক বছর কমল, তার মানে বয়স তো কমে, তাই না? শ্যামলী ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। বলে, তুমি দেখি মর্বিডের মতো কথা বলছ, কেন? সে বলে, না মনে হলো তো তাই। ধরো, আমার আয়ু ষাট বছর। আজ বায়ান্ন পূর্ণ হলো, তাহলে আর আট বছর হয়তো আমি আছি। শ্যামলী হকচকিতের মতো বলে, এসবের মানে কী? – মানে কিছু না, গত সপ্তাহে স্বপন মারা গেছে, জানো? ও আমার তিন বছরের ছোট ছিল। কি জীবন্ত আর হাসিখুশি ছেলে, আমাদের সবসময় রঙিন করে রাখত। ওর কোনো অসুখ ছিল না, ডাক্তারের কাছে যায়নি কোনোদিন, হাসপাতালের বেডে একদিনও শুয়ে থাকিনি। সেদিন আমরা ওকে প্রথমে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। বেডে ডাক্তার ওকে শুইয়ে দিলো, আমার দিকে ডান হাত উঁচু করে হালকাভাবে দোলালো, তার মানে, গুড বাই। চোখ বুজে গেল, ডান কাতে ফিরল, সব শেষ। শ্যামলী হাবিবের মুখের দিকে তাকায়। – তুমি বলোনি তো আমাকে। – বলতে চেয়েছিলাম, বলতে পারিনি। আজ বলতে পারলাম। শ্যামলী বলে, ওটা একটা অ্যাকসিডেন্ট, আর সব বিষয়কে নিজের করে দেখ কেন? হাবিব বলে, নিজের করে দেখতে চাই না, তবে মাঝে মাঝে সবকিছু নিজের মধ্যে প্রোথিত মনে হয়। ধরো, যখন মরমি কবিরা বলেন, আমার বুকের মধ্যে বা আত্মার মধ্যে ঈশ্বর রয়েছেন; আমরা তার সাথে লীন হয়ে বাঁচতে চাই, বেঁচে থাকি, নিশ্বাস-প্রশ্বাসের নামে, বিশ্বাসের নামে, একটা মায়া-বন্ধনের সঙ্গে, জানে সবাই এটা থাকবে না : আমরা একবারে সব ছিন্ন করে দিয়ে হুট করে স্বপনের মতো পাশ ফিরে শোব। ভাবতে পারো, আমার সব অগোছাল পড়ে আছে, কত কত কাজ, কয়েকটা কবিতার বই করব, অজস্র খাতা-ডায়েরি, হিজিবিজি কত লাইন – একটা টিনের বাড়ি হবে আমাদের, অনেক গাছপালা থাকবে, একটা শান-বাঁধানো পুকুর থাকবে। বৃষ্টির দিনে টিনের চালে অবিরাম বৃষ্টি হবে, তুমি হয়তো রবিঠাকুরের গান গাইতে বলবে, গ্রামে ফিরে যাব একদিন কাউকে না বলে; আমার রাখাল নামের বন্ধুর খোঁজ করতে ভারতে যাব, সে অখিল বন্ধুর গান করতো – ও দয়াল বিচার কর। আমি তার মুখ দেখতে পাচ্ছি, হালকা দাড়ি-গোঁফ গজিয়েছে, সে টান দিচ্ছে সুরে। কত স্মৃতি ডাঁই হয়ে আছে, সব খুঁজে খুঁজে বের করব, পারব তো? আমার সবকিছু অস্পষ্ট দোলায়মান – অপস্রিয়মাণ; তারা আমাকে ইশারা করে। তুমি, খোকা-খুকি সবার সঙ্গে আমার কত স্বপ্ন আছে, মেয়ের আঙুল ধরে ওর ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াব, ফুচকা খাবো, আইসক্রিম খাবো। লালনের গান গাইবে খুকি নতুন গলায় অথবা রবিঠাকুরের – তোমার অসীমে প্রাণ মন লয়ে যত দূরে আমি ধাই, কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই। ভাবতে পারো? যতিচিহ্নের খোঁজে আমি হয়তো পথ হাঁটছি, নিজের জন্য যতিচিহ্ন, নিজের স্বপ্ন ভাঙার জন্য যতিচিহ্ন, প্রবহমান নদীর গতিপথ রুদ্ধ করে দেওয়ার জন্য যতিচিহ্ন। হাবিব থামে, থামে মানে অবিরাম কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে যায় যেন। শ্যামলী মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে আসলে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, কী বলবে হাবিবের এই সব কথার জবাবে। তার সুখের সংসার বলা যায়। প্রেম করে বিয়ে না হলেও দুজনের মধ্যে হৃদ্যতার কোনো ঘাটতি নেই। কবিতায় মশগুল থাকে বলে সে মাঝে মাঝে বুঝে উঠতে পারে না ঠিকই বা এটাই হয়তো সামান্য দূরত্বের জায়গা। এর জন্যই কি এইসব মর্বিড চেতনায় ঢুকে যাচ্ছে হাবিব? সে নিজের ত্রুটি খুঁজতে থাকে। তার ত্রুটি তো রয়েছে। সংসার সামলাতে গিয়ে হাবিবের ওপর চড়াও তাকে হতে হয় কখনো, গালমন্দ করতে হয়। তবে সেটা কোন সংসারে নেই? সে কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই হাবিব প্রসঙ্গের ইতি টানে : শোনো, এইসব আমার পাগলামি বলতে পার, মা মারা যাওয়ার পর আমি ভাবতাম আমি আর বাঁচবো না, সে-সময় আমার এক চরম দিন গেছে। কাটিয়ে উঠেছিলাম ধীরে ধীরে। এখনো মা আমার সামনে আছে। যে-কোনো করুণ মুহূর্তে মা আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। আমি ফিরে আসি নতুন বেগে। সব ঠিক হয়ে যাবে, এসব সাময়িক ব্যাপার। শ্যামলী বুঝতে পারে হাবিব তাকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এটাও তার স্বভাবের অংশ। সে নীরব থাকে। কিছু বলতে পারে না।
মেয়েটা এখন তার মোবাইলের স্ক্রিনে গভীর মনোযোগ দিয়ে কী যেন পড়ে, ডান হাতের তর্জনী চলে সমানে। বন্ধুর সঙ্গে চ্যাটিং হচ্ছে বলে মনে হলো হাবিবের, অথবা ফেসবুকে কারো স্ট্যাটাস পড়ে মন্তব্য করছে। খানিক পরে সে কথা বলতে শুরু করে ফোন কানে দিয়ে; বাম হাতে কপালের ওপর, কানের ওপর উড়ে আসা চুলগুলো সরায়। সাদা লালের মিশেলে তার ডান কানের লতিতে একটা উজ্জ্বল ছোট মাকড়ি। আজকালকার মেয়েরা কানে তো ছিদ্রই করে না। অথচ মেয়েটা ছোট দুল পরেছে, কারো অনুরোধে? সে ঝরঝর করে কথা বলে, মনে হয় পাতলা ইস্পাতের টুকরো মেঝেতে পড়ছে ঝনঝন করে – ‘ওকে, আমি সন্ধেবেলা আসব, তুমি লাউঞ্জে বসো, জাস্ট ছটায়, প্ল্যান করবো কী করা যায়।’ আবার মোবাইল বাঁ-হাতের চেটোয় রাখে, ডান হাতের তর্জনী দিয়ে ডানে বামে ওপরে নিচে দাগ কাটে অর্থাৎ কথা চালাচালি হচ্ছে। হাবিব লক্ষ করে, মেয়েটার ডান পাশে যে একটা ছেলেটা বসে আছে সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ছেলেটা অবশ্য সামনে নাক ডাকিয়ে ঘুমোনো লোকটার বিশাল ভুঁড়ির ওঠানামা দেখছে; এটাও হাবিবের অনুমান। চোখটা ওদিকে, তবে সে কী ভাবছে তা তো সে আর জানে না। তবে সে মেয়েটার দিকে একটু সরেই বসে আছে, ইচ্ছে করলে আর একটু ডানে যেতে পারত। হাঠাৎ মেয়েটার ফোন বেজে ওঠে। হাবিব বুঝতে পারে আগে সে কথা বলেছিল মেসেঞ্জারে, তাই রিংটোন বাজার আগেই সে কথা শুরু করে, তবে এবার জোরে রিং টোন বেজে উঠল। একটা গানের প্রথম লাইন গেয়ে উঠল একজন নারী। এটা তার কাছে ব্যতিক্রম মনে হলো। কারণ এই সময়ের উঠতি তরুণ-তরুণীদের রিংটোনে গান বাজে না। বাজলেও ইংরেজি গান। সে শোনে – আঁখি তাই তো এমন করে বলেছে, এ মন আমার তোমার পানে চেয়ে সারাক্ষণ। হাবিব অবাক হয়। এই গান এই মেয়ে কোথায় পেল? এদের তো এই গান শোনার কথা নয়। এই গান তারা শুনেছে কলেজে পড়ার সময়। রেডিওতে বাজত। গোটা গানটা তার একসময় মুখস্থ ছিল। তার ছোট বোন গাইত বেশ সুন্দর করে। সে বেশ কিছু লাইন এখনো মনে করতে পারে। সে গানের মধ্য দিয়ে অনেক বছর আগে ফিরে যেতে চেয়েছিল, মেয়েটা যেন কী একটা শব্দ করলে সে ফিরে আসে বাস্তবে। মেয়েটা ডান পা বাঁ-পায়ের ওপর ভাঁজ করে মোবাইলের স্ক্রিন সেখানে বাঁ-হাতে ধরে নিজের মুখের অবয়ব লক্ষ করে। ব্যাগ থেকে মোটা চিরুনি বের করে মাথার ওপরে কয়েকবার চালান করে দেয়। লিপস্টিক দেওয়া ঠোঁটে আবার আলতো করে লিপস্টিক বোলায়। বাঁ-পা লম্বা করে দেওয়ায় হাবিবের জুতোয় তার পা স্পর্শ করলেও মেয়েটা কিছু মনে করে না। হাবিব মনে করেছিল, সে হয়তো সরি বলবে অথবা পাটা তৎক্ষণাৎ সরিয়ে নেবে। সে মেয়েটাকে উদ্ধত ভাবতে গিয়েও থেমে যায়। ছোট অটোর মধ্যে পায়ে পা লাগা তো স্বাভাবিক। তবে হঠাৎ করে মেয়েটা নতুন করে সাজুগুজু শুরু করল কেন? সে ভেবে পায় না। তবে তার চঞ্চলতাই যে তাকে আবিষ্ট করে রেখেছে সেখানে এই সব বিষয় তুচ্ছ বিবেচনা করা যায়। সে অভ্যাসবশত নিজের পায়ের দিকে নজর দেবার চেষ্টা করে; তার চকচকে কালো জুতোয় মেয়েটার পাতলা হিলের অগ্রভাগ স্পর্শ করে আছে। মেয়েটা কী জানে? জানলে জানুক, না জানলে নয়। সে বরং তার চোখের গভীর প্রসারতা নিয়ে ভাবতে পারে, যা অনেকদিন পর মেয়েটা জাগিয়ে তুলেছে। হালকা ঠান্ডা আর সামান্য উষ্ণতা মিলে ফাল্গুনের এই সকালে সে হিরণ্ময় এক সময় পার করতে যাচ্ছে, তার ভেতরের সব অর্গল খুলে খুলে যাচ্ছে, সেখানে ঠুনকো কোনো বিষয়কে সে পাত্তা দিতে চায় না। অটো চলেছে পূর্বদিকে, রাস্তার বাঁ-ধার দিয়ে। এখনো ধুলো তার শরীর প্রসারিত করেনি, রোদ তার আসল চরিত্র দেখায়নি। এই সময় সে আবিষ্কারের নেশায় মত্ত হয়েছে। এই মেয়েটা কী পৃথিবী? নাকি পৃথিবীর উপমা, অথবা প্রতিরূপ। এই পৃথিবী তাকে ডাকছে তার সব নিপুণ দরজা উন্মুক্ত করে দিতে। সে বলেছে, তোমার চোখ মরে যাইনি, তুমি মরে যাওনি বরং তুমি এখনো ইজেলে রং টানতে পারো ইচ্ছেমতো, ইচ্ছেমতো দেখে নিতে পারো জীবনের নিনাদ – কোনদিকে জীবনের গলি, গভীর আরাধ্য, খুঁটিনাটি ডালপালা, পাতা-ফুলের ব্যঞ্জনা; চোখ খুললেই সব তো নয়, চোখ বুঁজে থেকেও তুমি সব অবলোকন করতে পারো। চঞ্চলা নদীর নূপুর, কিশোরীর ঘুঙুর-রাঙা পা, চোখের মদির চঞ্চলতা, তুমি জীবন-মৃত্যুর ধারাপাত বুঝে নাও, খুঁজে নাও তোমার নোঙর।
বাঁ-পাশের লোকটা নাক ডাকা থামিয়ে দুম করে জেগে ওঠেন। তিনি রুমাল দিয়ে তার মুখের লালা মোছেন। হাত দিয়ে কোটের দুপাশের অদৃশ্য ময়লা ছেড়ে ফেলার চেষ্টা করেন, চোখ মোছেন রুমাল দিয়ে। ম্রিয়মাণ একটা হাই তোলেন। মেয়েটা বোধহয় নামবে। সে উসখুস করে। সে অটোচালককে ‘মামা থামান’ বললে অটো আট-দশ হাত সামনে গিয়ে থেমে যায়। ছেলেটা কোনো ভনিতা না করে নেমে দাঁড়ায়। মেয়েটা ড্রাইভারকে টাকা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেটের দিকে তার সামান্য উঁচু হিলে মৃদু শারীরিক কম্পন তুলে হাঁটতে থাকে। একটা টিয়াপাখি মরা বাবলার ডালে কোত্থেকে এসে বসে। তার ঠোঁট মেয়েটার ঠোঁটের মতো লাল, মেয়েটার জামার রং টিয়াপাখির মতো। ছেলেটা সিটে বসলে অটো চলতে শুরু করে।
হাবিব অফিসে ঢুকে তার ডেস্কে বসে। চাবি দিয়ে তার ড্রয়ার খোলে। কলম সিল প্যাড বের করে। কম্পিউটার চালু করে। এখনো অফিস শুরু হতে মিনিট পনেরো বাকি। পিয়ন মতিন এসে এক কাপ চিনি ছাড়া লাল চা দেয় প্রতিদিনকার অভ্যাসমতো। পাশের ডেস্কেও মেয়েটা হন্তদন্ত হয়ে বসে পড়ে। ম্যানেজার সাহেব এলে সবাইকে একবার ডাকবেন তার রুমে দু-মিনিটের জন্য। উদ্দেশ্য হলো সবাই ঠিক সময়মতো অফিসে এসেছে কি না, তবে তিনি তা না বুঝতে দেওয়ার ভান করবেন, একটা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলবেন। ‘এখানে আমাদের উন্নতি করার চেষ্টা করতে হবে’ জাতীয় কথা শুনে হাবিবের মুখস্থ হয়ে গেছে; রাগ হয়, বমিবমি ভাব হয়। তবু শোনে, শুনতে হয়। অফিসে সবার সঙ্গে তার সদ্ভাব আছে, তবে কারোর সঙ্গে অফিসবিষয়ক কথাবার্তার বাইরে তেমন কিছু বলে না। সে একসময় ভালো কবিতা লিখত, কবি হিসেবে তার বেশ সুনাম ছিল, তা এরা কেউ জানে না। কাউকে সে বলেনি। বললে কী হতো সে জানে না, তবে তার মনে হয়েছে এই অর্থকড়ি হিসাব-কিতাবের মধ্যে কবিতাবিষয়ক আলোচনার কথা বলা মানে মানুষকে বিব্রত করা অথবা নিজেকে তাচ্ছিল্যের পাত্র হিসেবে উপস্থাপনা করা। তবু সে নির্বিবাদে চাকরি করে ঘাড় গুঁজে। কোনো দিন তার কোনো কাজে ভুল হয়নি।
কেন ভুল হয়নি? তার তো হরদম ভুল হওয়ার কথা, কেন হয় না। সে তো ভুলো মানুষই ছিল। এই ব্যাংক, সংসার তাকে টাইপড করে ফেলেছে? নাকি সে-ই এরকম হয়ে গেছে। খয়েরি রঙের ড্রেসে লাবণীকে বেশ ভালো লাগছে আজ। সে তার অনেক ছোট। তাকে কখনো সে ভালো করে দেখেছে বলে মনে করতে পারে না। সে ক্ষণিকের জন্য তার মুখের দিকে তাকিয়ে নিচের ঠোঁটের বাঁ-পাশের নিচে ছোট্ট একটা লাল জড়ুল আবিষ্কার করে। একটা মোহন ভঙ্গিতে মুখ ফিরিয়ে নিলে লাবণী বলে, কী হলো ভাইয়া? হাবিব কিছু বলে না। সে মনে করে পরক্ষণে আসলে সে কিছু দেখেনি। দেখেছে, নাকি দেখেনি – এই নিয়ে সে দ্বিধায় পড়ে যায়। সে কি তার দীর্ঘদিনের অফিসজীবনের বাধাধরা নিয়মকানুন ভুলে যাচ্ছে? কম্পিউটার স্ক্রিনে পুরনো দিনের হিসাব দেখে সে কিছুই বুঝতে পারে না। নতুন হিসাব কীভাবে যেন বের করতে হয়? ম্যানেজার যে স্টেটমেন্ট চেয়েছে সেটা সে খুঁজে পায় না। দশ মিনিটের মাথায় এই প্রথম ম্যানেজার সাহেব তাকে ধমক দেন। সে চোখ পিটপিট করে তাকায় শুধু। লাবণী এসে তার পেছনে দাঁড়ায়। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখতে পায় ওখানে সব ঠিক আছে। একটা ব্যাকক্লিক করে সে বলে, ‘এই দেখুন, সব ঠিক আছে, প্রিন্ট দিন।’ হাবিব বলে, কোথায়? সব তো এলোমেলো মনে হচ্ছে। লাবণী হাবিবকে তার সিটে বসতে বলে। হাবিব উঠলে সে স্টেটমেন্ট দুই মিনিটের মধ্যে প্রিন্ট করে ম্যানেজারের রুমে দিয়ে আসে।
হাবিব লাবণীর ডেস্কে মাথা গুঁজে চোখ বুজে আছে। নাকি সে ঘুমোচ্ছে। লাবণী দুবার ডাকলেও সে উত্তর দেয় না। হাবিব গভীর প্রশান্তির দিকে যাচ্ছে, প্রজাপতির পাখার দিকে যাচ্ছে, নিত্যদিনের কাঠামো থেকে মুক্ত হয়ে বাতাসের সঙ্গে উড়ে উড়ে যাচ্ছে, সে নরিতসু এক জালের ভেতর আটকে যাচ্ছে, তার আনন্দ হচ্ছে, পুলক হচ্ছে, গভীর পুলক। ক্লান্তির বা অবসাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে যাচ্ছে। চোখের দীপ্তিতে দেখতে পাচ্ছে পৃথিবীর সব রং – সব চঞ্চলতা। লাবণী তাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ডাকে। কোনো উত্তর পায় না।
একটু পরেই সবাই হাবিবকে নিয়ে চঞ্চল হয়ে উঠবে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: