যিনি ভিনসেন্টকে বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন

লেখক: আসমা সুলতানা

‘সবকিছু এখন কেবল স্বপ্ন বলে মনে হয়’ – দীর্ঘ একটি বিরতির পর ঠিক এই শব্দগুলো দিয়েই ইয়োহ্যানা ভ্যান গো (সংক্ষেপে সবাই যাঁকে ‘জো’ নামে চিনতেন) আবার তাঁর দিনলিপি লেখা শুরু করেছিলেন। ইয়োহ্যানা ভ্যান গো-বোঙার (৪ অক্টোবর ১৮৬২-২ সেটেম্বর ১৯২৫) থিও ভ্যান গোর (১৮৫৭-৯১) সহধর্মিণী ছিলেন আর থিও ভ্যান গো (তিও) ছিলেন আমাদের অনেকেরই প্রিয় শিল্পী, ভিনসেন্ট ভ্যান গোর (১৮৫৩-৯০) অনুজ। ভিনসেন্টের মৃত্যুর ছয় মাস পরে, থিও ভ্যান গোর মৃত্যু হয়েছিল আর থিওর মৃত্যুর বেশ কয়েক মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর ইয়োহ্যানা নতুন করে লিখতে শুরু করেছিলেন।

মাত্র সতেরো বছর বয়স থেকেই নিয়মিত দিনলিপি লেখা শুরু করলেও স্বামী থিওর সঙ্গে খুব সংক্ষিপ্ত আর তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময় কাটিয়ে যখন বিভীষিকাময় এক ভবিষ্যতের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তখনই আবার হাতে কলম তুলে নিয়েছিলেন, পদ্ধতিগতভাবে সুবিন্যস্ত আর সযত্নে তাঁর দিনযাপন ও সংগ্রামের খুঁটিনাটি বিষয় লিখে রেখে গিয়েছিলেন। ভালোবাসা ও সৃজনশীলতার মিশ্রণে, সবকিছু গুছিয়ে লিপিবদ্ধ করে রেখে যান, যেন ভবিষ্যতে তাঁদের একমাত্র পুত্র ভিনসেন্ট ভিলেম তাঁর সংগ্রামটির অর্থ খুঁজে পেতে পারে এবং সময় হলে যেন ভিলেম তাঁর মা-বাবা ও চাচা ভিনসেন্টের কষ্ট, ত্যাগ ও স্বপ্নকে অনুধাবন এবং অনুভব করতে পারে। বাস্তবে সেটিই ঘটেছিল। ইয়োহ্যানা ভ্যান গো-বোঙার এবং তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র ভিনসেন্ট ভিলেম, যিনি চাচার নামটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন, তাঁরা দুজনেই সারাবিশ্বের কাছে ভিনসেন্টকে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

আজ বিশ্বের প্রথম পাঁচজন বিখ্যাত প্রতিভাবান শিল্পীর মধ্যে ভিনসেন্টের নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে। ভিনসেন্টের শিল্পকর্ম পৃথিবীর প্রতিটি বিখ্যাত জাদুঘরে স্থায়ী ও অস্থায়ী সংগ্রহ হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে। সেসব প্রদর্শনীতে, কফির মগ থেকে শুরু করে টি-শার্ট কিংবা ছাতা, বহু নিত্যব্যবহার্য সামগ্রীতে ভিনসেন্টের শিল্পকর্মের প্রতিলিপি নিয়মিত মুদ্রিত হয়ে থাকে। ভিনসেন্ট ও তাঁর শিল্পকর্ম ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে। পৃথিবীতে শিল্পকলা সম্বন্ধে যাঁরা ন্যূনতম ধারণা রাখেন তাঁদের কাছে ভিনসেন্ট এখন একনামে পরিচিত। অথচ জীবদ্দশায় তিনি কিন্তু অপরিচিত ছিলেন। একটি মাত্র চিত্রকর্ম ‘দ্য রেড ভিনিয়ার্ড’ বিক্রি করতে পেরেছিলেন তাঁর জীবনকালে, এছাড়া নামমাত্র কয়েকটি

শিল্প-প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করতে পেরেছিলেন।

প্রশ্ন হলো, তাহলে আজ কীভাবে আমরা এত সহজেই তাঁর নামটি জানতে পারছি? কী হতে পারে এর কারণ? প্রথমত, ভিনসেন্ট অসাধারণ একজন শিল্পী ছিলেন; দ্বিতীয়ত, তাঁর শিল্পকর্ম মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করতে সমর্থ এবং তৃতীয়ত, ভিনসেন্টের সহজ-সরল, শিশুসুলভ ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর ব্যক্তিত্বে সেই সময় অনেকেই মুগ্ধ হয়েছিলেন। অধিকন্তু ভিনসেন্টের লিখে যাওয়া চিঠিগুলো আজ বিশ্বসাহিত্যের জগতে নিজ যোগ্যতায় বিশেষ গৌরব অর্জন করেছে। তবু ভিনসেন্টের সীমাহীন জনপ্রিয়তার নেপথ্যে এই কারণগুলো যথেষ্ট নয়।

যত সহজে ভিনসেন্ট সম্বন্ধে আমরা আজ জানতে বা তাঁর শিল্পকর্ম দেখতে পারছি অর্থাৎ ভিনসেন্টের এই ব্যাপক জনপ্রিয়তা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি আদৌ খুব সহজ ছিল না। ভিনসেন্টের পরিচিত হওয়ার পেছনে যে-মহাকাব্যটি রয়েছে সেটি মূলত ইয়োহ্যানার অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে রচিত হয়েছিল, এবং পরবর্তীকালে সেটি থিও আর ইয়োহ্যানার পুত্র ভিনসেন্ট ভিলেম অব্যাহত রেখেছিলেন।

তবে খুব সংগত কারণে ইয়োহ্যানাই হচ্ছেন আজকের এই প্রবন্ধের মূল নায়িকা। এই অসাধারণ মানুষটি ছিলেন একাধারে প্রেমময়ী স্ত্রী, মমতাময়ী মা, স্নেহময়ী ভ্রাতৃজায়া, গুণবতী গৃহকর্ত্রী, সফল শিক্ষিকা, অনুবাদক, সম্পাদক, লেখক, শিল্পকলার ইতিহাসবিদ, সর্বোপরি একজন চমৎকার শিল্পকলার বণিক (আর্ট ডিলার)।

থিও ভ্যান গোর সঙ্গে তাঁর যখন সংসার শুরু হয়েছিল, তখন তিনি সাতাশ বছরের সুন্দরী এক তরুণী। মাত্র দেড় বছরের সুখের সংসারে তিনি থিওকে দেখেছেন অন্তরঙ্গভাবে। থিওর কাছ থেকেই শিল্পকলাসহ জীবনের নানা ক্ষেত্র সম্পর্কে শিখেছিলেন তিনি। থিওর অগ্রজ শিল্পী ভিনেসেন্ট ভ্যান গোর আঁকা দেখেছেন খুব কাছ থেকে। স্বামী তাঁকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে প্রকৃত শিল্পকলাকে শনাক্ত এবং সঠিক শিল্প-সংগ্রাহকের কাছে সঠিক শিল্পকর্মটি বিক্রি করতে হয়। ইয়োহ্যানা পরবর্তীকালে তাঁর দিনলিপিতে লিখেছিলেন, স্বামীর কাছ থেকে তিনি শুধু শিল্পকলার লেনদেনই শেখেননি, শিখেছেন জীবনের আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মাত্র এই দেড় বছরের মধ্যে ইয়োহ্যানা যা কিছু শিখেছিলেন থিওর কাছ থেকে, সেটি পুঁজি করে পরবর্তীকালে বিচক্ষণতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ কৌশলের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে ভিনসেন্টের শিল্পকর্মগুলোকে সুরক্ষা ও বিশ্বের কাছে সেগুলো পরিচিত করে তুলতে তিনি সারাজীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।

থিও ছিলেন ইয়োহ্যানার প্রিয় ভাই এন্ড্রেস বোঙারের বন্ধু। এন্ড্রেস থিওর বন্ধু হলেও ভিনসেন্টের সঙ্গে তাঁর কদাচিৎ দেখাসাক্ষাৎও হয়েছিল। এন্ড্রেস ছিলেন একজন শিল্পপ্রেমী ও শিল্পসংগ্রাহক। থিও প্যারিসে ইয়োহ্যানাকে মাত্র তিনবার দেখেছিলেন বিবাহ-পূর্ববর্তী সময়ে, এবং থিও প্রথম দেখাতেই ইয়োহ্যানার প্রেমে পড়ে যান। থিওর প্রস্তাবে ইয়োহ্যানা দোটানায় থাকলেও তাঁর হৃদয়ও থিওকে দেখামাত্র অসাড় হয়ে যেত। তাঁদের মধ্যে চিঠিপত্রের যোগাযোগ হতে থাকে এবং পরিচয়ের প্রায় দুই বছরের মধ্যে ইয়োহ্যানা থিওকে ভালোবেসে ফেলেন। পরবর্তীকালে ১৮৮৯ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। নিয়তির নিষ্ঠুর ছোবলে স্বামী থিওকে ইয়োহ্যানা হারিয়েছিলেন বিয়ের দেড় বছরের মাথায়। তাঁর মৃত্যুর প্রায় এক দশক পর কোহেন গসচক নামে এক স্থানীয় শিল্পীর সঙ্গে আবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ইয়োহ্যানা। যদিও ১৯১২ সালে তিনি আবারো বিধবা হন। ইয়োহ্যানাকে পুত্র ভিনসেন্টের প্রতিপালন এবং শিল্পী ভিনসেন্টের শিল্পকর্ম পরিচিত করার কাজে সবরকম সহযোগিতা করেছিলেন।

ভিনসেন্টের মৃত্যুর সময় থিও এবং ইয়োহ্যানার পুত্রসন্তানের বয়স ছিল মাত্র ছয় মাস আর তাঁর বাবার মৃত্যুর সময় বয়স মাত্র এক বছর। এই শিশুটি পরে যন্ত্রপ্রকৌশলী হয়েছিলেন। ১৮৯০ সালে আঁকা ভিনসেন্ট তাঁর বিখ্যাত ‘অ্যালমন্ড ব­সম’ চিত্রটি উপহার দিয়েছিলেন থিও দম্পতিকে, শিশু ভিনসেন্টের জন্ম উপলক্ষে। বসন্তের ফুলকে তিনি নতুন প্রাণের প্রতীক রূপে দেখিয়েছিলেন। ড. ভিনসেন্ট ভিলেমকে সবাই ‘দি ইঞ্জিনিয়ার’ বলে ডাকতেন।  ভ্যান  গো কালেকশন এবং পরবর্তীকালে ভ্যান গো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। ১৯৭৩ সালে ভ্যান গো ফাউন্ডেশনকে তিনি ভ্যান গো মিউজিয়ামে রূপান্তরিত করেছিলেন। ১৯৭৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন থিওর একমাত্র চিহ্ন পুত্র ভিনসেন্ট।

সময়ের কাঁটা পেছনে ঘুরিয়ে তারও আগে যদি অতীতের দিকে আমরা ফিরে দেখি, তাহলে দেখব ইয়োহ্যানার জন্ম হয়েছিল ১৮৬২ সালের ৪ অক্টোবর, নেদারল্যান্ডসের সাধারণ একটি পরিবারে। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। বাবা ছিলেন ইন্স্যুরেন্স ব্রোকার এবং সংগীতের প্রতি ছিল তাঁর অসীম ভালোবাসা। ইয়োহ্যানা ইংরেজি ভাষায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং আরো তিনটি ভাষায় ছিলেন পারদর্শী। তিনি শৈশবেই পিয়ানো বাজানো শিখেছিলেন এবং সেইসব সন্ধ্যা তাঁর স্মৃতিতে সবসময় উজ্জ্বল ছিল, যে-সন্ধ্যাগুলোতে তিনি বাড়ির বসার ঘরে পিয়ানো বাজাতেন। পরিবারের জ্যেষ্ঠ কন্যা হিসেবে শিক্ষাদীক্ষার পাশাপাশি তিনি তাঁর মাকে গৃহস্থালির নানা কাজে সাহায্য করতেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি ইংরেজির শিক্ষিকা হিসেবে নেদারল্যান্ডসের এলবার্গে মেয়েদের একটি বোর্ডিং স্কুলে যোগদান করেছিলেন।

প্যারিসের দিনগুলোতে থিওর সঙ্গে বসবাসের সময় তিনি নিজ সংসারে মন দিয়েছেন, এরপর কিছুটা সময় শিল্পী ভিনসেন্টের দেখাশোনা করেছেন; পুত্র ভিনসেন্টের জন্ম হলে শিশু ভিনসেন্টের প্রতিপালন করাই তাঁর প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব ছিল। শিশু ভিনসেন্টের কথা চিন্তা করেই তিনি প্যারিসের দূষিত আবহাওয়া থেকে চলে যান দূরে অ্যামস্টারডামের কাছে বোসোম নামের একটি গ্রামে। শুধু পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীলই নন, ইয়োহ্যানা তাঁর সামাজিক দায়িত্বও পালন করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। ইয়োহ্যানা রাজনীতিতে অংশ নিয়েছিলেন এবং ‘অ্যামস্টারডাম

সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাট উইমেন্স প্রপাগান্ডা ক্লাব’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। সেখানে সক্রিয়ভাবে যুক্ত না থাকলেও পরোক্ষভাবে সংযুক্ত ছিলেন। তিনি কোনো এক সময়ে তাঁর দিনলিপিতে ব্যক্ত করেছিলেন, পুত্রকে সঠিকভাবে মানুষ করেই তিনি সবচেকে বড় সামাজিক দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে ১৯১৫ সালে ইয়োহ্যানা নিউইয়র্কে চলে গিয়েছিলেন এবং যুদ্ধশেষে ১৯১৯ সালে অ্যামস্টারডামে ফিরে আসেন। তিনি ভিনসেন্ট ও থিওর সব চিঠি অনুবাদের কাজ করতে থাকেন একটু একটু করে এবং মৃত্যুর আগে ১৯২৪ সালে ডাচ ভাষায় ভিনসেন্ট ও থিওর চিঠিপত্রের একটি সম্পাদিত সংকলন প্রকাশ করেন। তাঁর মৃত্যুর সময় তিনি ৫২৬ নম্বর চিঠিটি অনুবাদ করছিলেন। এমন ধীরস্থির ও ধারাবাহিকতার সঙ্গে ইয়োহ্যানা প্রতিটি কাজ করেছিলেন যে তা সত্যিই অতুলনীয়। ইয়োহ্যানা সম্পর্কে জানলে বোঝা যায়, এই মানুষটি নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, নিজের দায়িত্ব তিনি কখনো অবহেলা করেননি।

১৮৯১ সালের শেষদিকে, যখন ইয়োহ্যানা প্যারিস থেকে বোসোমে চলে আসেন তখন তিনি নিজের পরিবারের সঙ্গে না থেকে, নিজ বাড়িতে একটি পান্থশালা চালু করেন। বোসোম অ্যামস্টারডাম থেকে ১৫ মাইল দূরে ছোট্ট একটি শান্ত গ্রাম। বোসোম এমন একটি জায়গা ছিল, যেখানে আশপাশে বসবাস করতেন অসংখ্য শিল্পী, কবি, শিল্প-সমালোচক এবং জ্ঞানী-গুণী মানুষ। ইয়োহ্যানার বাড়ির পান্থশালায় অনেক শিল্পী অস্থায়ীভাবে ভাড়া নিতেন এবং সেখানে একটি আড্ডার মতো আসর বসত বিভিন্ন সময়ে। ইয়োহ্যানা অনেক সতর্কভাবে জীবনের পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিলেন, এটিও তেমনি একটি। তিনি নিজে, এবং স্বামী ইয়োহেনের সাহায্যে, ভিনসেন্টের কাজকে স্থানীয় সবার মধ্যে পরিচিত করে তোলেন। ইয়োহ্যানার পরিবার তাঁকে বুদ্ধি দিয়েছিল, এই অগণিত শিল্পকর্ম মূল্যবান কোনো বস্ত্ত নয়, সেগুলো ফেলে দিয়ে তিনি যেন তাঁর ও পুত্রের জীবন নিয়ে সামনে এগিয়ে যান। ইয়োহ্যানা বাস্তবিক অর্থেই ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, তিনি তাদের সেই অপরিণামদর্শিতার জবাব দিয়ে দিয়েছেন তাঁর কাজের মাধ্যমে।

থিওর মৃত্যুর পর ভ্যান গোর আঁকা ২০০টি ছবি, ৪০০টি  রেখাচিত্র, প্রায় ৯০০ চিঠি এবং থিওর সংগ্রহে থাকা অনেক ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীর শিল্পকর্ম, যেমন – মনে, মানে, লোত্রেক,  সেজান, বার্নার্ড, গগ্যাঁ, ইয়োহ্যানার দায়িত্বে এসে পড়েছিল। ইয়োহ্যানা এসব শিল্পীর কাজের পাশে ভিনসেন্টের শিল্পকর্ম রেখে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৮৯২ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে ইয়োহ্যানা প্রায় ২০টি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। তিনি খুব সতর্কতার সঙ্গে শিল্পকর্মগুলো বিক্রি করতেন ও বিভিন্ন শিল্পঘর ও প্রদর্শনশালাকে ঋণ দিতেন। বিশেষ করে সূর্যমুখীর সানফ্লাওয়ারস ছবিগুলো ইয়োহ্যানা বেশি বেশি করে ঋণ দিতেন প্রদর্শনীর জন্য, যেন সেগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। বাস্তবে সেটাই ঘটেছিল। ১৯১০ সালে যখন ইয়োহ্যানা লন্ডনে ভিনসেন্টের শিল্পকর্মের প্রদর্শনীর আয়োজন করেন, তখন সেখানকার মানুষ সেগুলোকে ইতিবাচকভাবে নিতে পারেনি। কিন্তু এখন ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব লন্ডনের প্রধান আকর্ষণ হলো ভিনসেন্টের ‘সূর্যমুখী’ (‘সানফ্লাওয়ারস’)। ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব লন্ডন কর্তৃপক্ষ ১৯২৪ সালে ইয়োহ্যানার কাছ থেকে ‘সানফ্লাওয়ারস’ চিত্রকর্মটি কিনে নিয়েছিল।

ইয়োহ্যানা বিচক্ষণতার সঙ্গে এমনভাবে ভিনসেন্টের কাজকে প্রদর্শন করতেন, অসাধারণ শিল্পকর্মের পাশাপাশি ভ্যান গোর খুব সাধারণ শিল্পকর্ম রাখতেন, যেন মানুষ সেই শিল্পকর্মগুলো যা ভিনসেন্ট তাঁর নিজস্ব শৈলী সৃষ্টি করার জন্য অনুশীলনমূলকভাবে করেছিলেন, সহজভাবে নিতে পারে। তিনি ভিনসেন্টের শিল্পকর্মের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকাও তৈরি করেন ধীরে ধীরে। অ্যামস্টারডামে, স্টেডেলিক মিউজিয়ামে ভিনসেন্টের ৪০০টি শিল্পকর্ম নিয়ে প্রদর্শনী হয় ১৯০৫ সালে, যেটি ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রদর্শনী। এরপরে, ইংল্যান্ডে ও জার্মানিতে প্রদর্শনীর আয়োজন করে ইয়োহ্যানা ভিনসেন্টকে নেদারল্যান্ডসের সীমানার বাইরেও পরিচিত করার কাজ শুরু করেন। ভিনসেন্টকে তাঁর নিজ মাতৃভূমিতে বিখ্যাত করতে ইয়োহ্যানার প্রায় এক দশকের বেশি সময় লেগেছিল। ডাচদের কাছে ভিনসেন্ট শুরুতে সে-আবেদন রাখতে পারেননি। শুরুটা খুব সহজ ছিল না ইয়োহ্যানার জন্য। তিনি প্রথমে ডাচদের মধ্যে ভিনসেন্টের শিল্পকর্মগুলোকে পরিচিত করে তোলেন, পরে পর্যায়ক্রমে ভিনসেন্টের অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ চিঠিগুলো ডাচদের কাছে পরিচিত করে তুলতে থাকেন। দুটো কাজ তিনি একসঙ্গে করেননি কোনোভাবেই; রক্ষণশীল ডাচদের বিভ্রান্ত করতে চাননি। এই পদক্ষেপ ভিনসেন্টের শৈল্পিক প্রতিভা ডাচদের অনুধাবন করার পথ সুগম করে তুলেছিল। আর এটাই ছিল ইয়োহ্যানার বিচক্ষণ কৌশলগুলোর একটি। যদিও আজ ভিনেসেন্টের কাজ বিশ্বের সব বিখ্যাত মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হয়, তবে একটির বেশি ভিনসেন্ট পাওয়া বেশ কঠিন সেখানে। ব্যতিক্রম যেমন, প্যারিসে ল্যুভ মিউজিয়ামে তাঁর ছয়টি, মিউজে ডে’ওরসেতে ২৪টি শিল্পকর্ম আছে।

অ্যামস্টারডামে ভ্যান গো মিউজিয়ামে আছে তাঁর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শিল্পকর্ম। নেদারল্যান্ডসের অভিজাত ধনী সংগ্রাহক হেলেন ক্রোলার-মিউলার একক ব্যক্তি পর্যায়ে ভিনসেন্টের শিল্পকর্মের সবচেয়ে বড় সংগ্রহটি সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর সংগৃহীত শিল্পকর্ম দিয়ে পরে বিখ্যাত ক্রোলার-মিউলার মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সতর্কতার সঙ্গে শিল্পকলার ক্রেতা বা সংগ্রাহকদের নির্বাচন করেছিলেন ইয়োহ্যানা।

ভিনসেন্ট বয়সে থিওর থেকে ছোট হলেও থিও তাঁকে নিজের শিশুর মতো আগলে রাখতেন। থিও দম্পতি কার্যত ভিনসেন্টের জীবনে বাবা-মায়ের ভূমিকা পালন করেছিলেন। আমরা জানি, ভিনসেন্ট সারাজীবন একটি কথা বোঝার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন, কেন তাঁর মা তাঁকে কখনো ভালোবাসেননি এবং তাঁর শিল্পকর্মেরও কোনোদিন প্রশংসা করেননি। ভিনসেন্ট মাকে খুশি করতে মায়ের একটি সাদাকালো আলোকচিত্র থেকে একটি অসাধারণ প্রতিকৃতি আঁকেন। আমরা এটাও জানি যে, ভিনসেন্ট তাঁর জীবনে নারীর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। কিন্তু ইয়োহ্যানা নিয়তির সেই কালো জাদুর বৃত্ত ভেঙে দিয়েছিলেন তাঁর মমতায়, ভালোবাসায় এবং অক্লান্ত পরিশ্রমে। ভিনসেন্টের জীবিত অবস্থায় থিও তাঁকে সম্পূর্ণরূপে সহযোগিতা করে গেছেন এবং ইয়োহ্যানা করে গেছেন ভিনসেন্টের মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে।

ইয়োহ্যানা ইচ্ছা করলেই থিও ও ভিনসেন্টের মৃত্যুর পর প্যারিসে থেকে যেতে পারতেন এবং সেটাই বরং তাঁর জন্য সহজ হতো। কারণ থিওর শিল্পকলা নিয়ে ব্যবসা বেশ পরিচিত ছিল প্যারিসের শিল্পীমহলে। তখন প্যারিসে ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীদের জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে। কিন্তু ইয়োহ্যানা সেটি না করে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন। তিনি ভিনসেন্ট ও তাঁর সৃষ্টিকে সবার আগে নিজ

মাতৃভূমি নেদারল্যান্ডসে পরিচিত করাতে চেয়েছিলেন। আর সে-কারণে ছয় মাসের শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে, সঙ্গে করে বয়ে এনেছিলেন অসংখ্য শিল্পকর্ম এবং কিছু আসবাব। আজ সেই শিল্পকর্মগুলো সারাবিশ্বে পরিচিত হলেও ইয়োহ্যানার অবদান সম্পর্কে মানুষ খুব একটা অবগত নন। ১৯১৪ সালে ইয়োহ্যানা আরো একটি অসাধারণ কাজ করেছিলেন, স্বামীর সমাধিকে

অভর-সুর-ওয়াজে স্থানান্তরিত করে নিয়ে এসেছিলেন ভিনসেন্টের সমাধির পাশে। আজ দুই ভাই চিরনিদ্রায় পাশাপাশি শুয়ে আছেন, যা এখন পর্যটক ও শিল্পপ্রেমীদের জন্য একটি তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।

ইয়োহ্যানার অবদান ছাড়া শিল্পকলার ইতিহাসের একটি বিরাট অধ্যায় আমাদের কাছে হয়তো অজানাই থেকে যেত। জীবনের শেষ সময়ে তিনি তাঁর দিনলিপিতে লিখেছিলেন, ‘আমি আজ বেশ তৃপ্ত এটা দেখে যে, থিও ও ভিনসেন্টের স্বপ্নকে আমি পূরণ করতে পেরেছি।’ থিওর মৃত্যুর পর ৩৫ বছর, আমৃত্যু ইয়োহ্যানা একনিষ্ঠভাবে ভিনসেন্টের সৃষ্টিকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে গেছেন। থিও এবং ভিনসেন্টের স্বপ্নপূরণের কাজে তিনি তাঁর বাকি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আজ ইয়োহ্যানা না হলে আমরা কেউ শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গোর নাম জানতাম না। আমি শপথ করে বলতে পারি, শিল্পপ্রেমিকদের কাছে ভ্যান গো-হীন এই পৃথিবী হতো অর্থহীন। ভ্যান গো না থাকলে জন্ম হতো না কোনো সূর্যমুখীর, আর ইয়োহ্যানা না হলে সেই সূর্যমুখীর স্রষ্টার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটত না। ভিনসেন্টের ক্যানভাসের জমিন জুড়ে যে সূর্য ও সূর্যমুখীরা খেলা করে, তা অতীতের কোনো শিল্পীর শিল্পকর্মে দুর্লভ। আমরা মনে করতেই পারি যে, ইয়োহ্যানা ভিনসেন্টেকে সূর্যের মর্যাদা দিয়েছিলেন আর ভিনসেন্ট ইয়োহ্যানাকে তাঁর ক্যানভাসের জমিনে সূর্যমুখী করে অমর করে রেখেছেন।

 

পাদটীকা : ভিনসেন্ট ভ্যান গো নামের উচ্চারণ আমেরিকা বা নর্থ আমেরিকারতে এভাবে করা হয়। এই লেখায় নামটি সেভাবেই রাখা হলো।

Leave a Reply

%d bloggers like this: