ছন্দা বিশ্বাস

বিছানার ওপর অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটিকে দেখে চমকে উঠেছিল মিসা। এমন রূপবতী মেয়ে এর আগে কখনো দেখেনি। মেয়েটি এখানে কী করে এলো সেটা ভাবতেই বেশ আশ্চর্য লাগছে মিসার।

মিসার আজ ফুলশয্যা। বাড়ির অমতে বিয়ে করলেও উচ্ছ্বাস ওদের বিয়েতে কোনোরকম কার্পণ্য করেনি। দার্জিলিংয়ের একটি হোটেলে আজ বউভাতের আয়োজন করা হয়েছিল। উচ্ছ্বাসের তরফ থেকে ওর বেশ কিছু বন্ধু তাদের স্ত্রী, কারো গার্লফ্রেন্ড এবং ভাবি-বউরাও উপস্থিত ছিল। সন্ধে হতে না হতেই একে একে সকলে আসতে শুরু করে দেয়। একেবারে জমজমাট রিসেপশন পার্টি। ওদের রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে দিন কয়েক আগে। কিন্তু সকলকে এক জায়গায় করতে কয়েক দিন কেটে গেল। এই কয়েক দিন উচ্ছ্বাস আর মিসা আলাদা রুমেই ছিল। মিসা পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছিল ফুলশয্যার আগে কিচ্ছুটি হবে না। নো টাচ টেকনিকে চলছিল ওরা। সেটা অবশ্য আজ কেউ বিশ্বাস করেনি।

মিসার দিকে তাকিয়ে ঘোষের বউ চোখের ইশারায় এই জাতীয় কিছু একটা ইঙ্গিত করে অদ্ভুত একটি ফিচেল হাসি হাসল এবং সেই হাসি ছড়িয়ে গেল অন্যান্য বন্ধুমহলে।

মিসা শুধু মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলো ওরা যা ভাবছে তা নয়। ও এখনো ভার্জিন আছে।

পাহাড়ে দ্রুত সন্ধে ঘনায়। তাই রাত নটার ভেতরে ওদের ছোট্ট অথচ জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান শেষ হলো।

বন্ধুপত্নীরা একে একে মিসাকে নানান জ্ঞান, উপদেশ, অভিজ্ঞতা এবং রসালো গল্প শুনিয়ে আজকের দিনটা যাতে সর্বতোভাবে সফল হয় সে-ব্যাপারে নিখুঁত পরামর্শ দিয়ে বিদায় নিল।

উচ্ছ্বাসের সঙ্গে মিসার চেনাজানা বহুদিনের। একটা সময়ে ওরা দুজনে উত্তর কলকাতার একই কো অ্যান্ড স্কুলে পড়ত। মাঝখানে বহু বছর অবশ্য উচ্ছ্বাস নামক ছেলেটি মিসার স্মৃতি থেকে হারিয়ে গিয়েছিল।

প্রায় মাস তিনেক আগে হঠাৎ একদিন টাইমলাইনে উচ্ছ্বাস নামটি দেখে ওর স্মৃতির সঙ্গে ছবিটি মিলিয়ে নিয়ে নিশ্চিত হলো এবং সেই মুহূর্তে মিসা ওর প্রোফাইল ঘাঁটতে বসে গেল। আর একে একে ওর স্মৃতির পাতাগুলো ওর সামনে ধরা দিলো। মিষ্টি চেহারা, দারুণ প্রাণবন্ত ছিল উচ্ছ্বাস। এর বেশি কিছু মনে করতে পারল না এতদিন পরে। মিসাই একদিন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাল।

উচ্ছ্বাস বহু বছর বাদে মিসাকে দেখে দারুণ আনন্দ পেল।

সেই কবে স্কুলজীবনের বন্ধু। তখন মিসা শুধুই ভালো বন্ধু ছিল উচ্ছ্বাসের। তিন বছর ক্লাস করার পরে মিসার বাবা ট্রান্সফার হয়ে গেলে ওরা অন্যত্র চলে গেল। ব্যস এই পর্যন্ত।

কিন্তু আজ যখন একটা রেস্তোরাঁয় দুজনে মুখোমুখি বসে আছে তখন এক অন্যরকম ফিলিংস হচ্ছে দুজনার। উচ্ছ্বাস ডেকেছিল মিসাকে, ‘নেক্সট সানডে ফ্রি আছিস কি না বল?’

‘কেন?’

‘থাকলে চলে আয়।’

‘কোথায়?’

‘কোথায় হলে তোর সুবিধা হবে? কালিম্পং নাকি কার্শিয়াং? নাকি দার্জিলিং চলে আসবি?’

‘কার্শিয়াং হলেই ভালো হয় রে। আমার আবার এখন ভীষণ কাজের চাপ।’

মিসা কার্শিয়াংয়ে একটি গার্লস স্কুলে শিক্ষকতা করছে।

উচ্ছ্বাস আগে কিছুদিন একটি বেসরকারি কোম্পানিতে জব করছিল; কিন্তু বস প্রচণ্ড ঠ্যাটা বলে সেই চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে নিজেই স্বাধীন ব্যবসা করছে। মূলত এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের ব্যবসা। ওর সঙ্গে এই কাজে বেশ কয়েকজন বন্ধুও আছে। তেমনটাই বলেছে মিসাকে।

মিসা কথার মাঝে দেখছে উচ্ছ্বাসকে।

ওর কথাবার্তা, চালচলন, পোশাকের ভেতরে সুন্দর রুচিশীলতার ছাপ ধরা পড়ছে। কথাও বলছে কী মার্জিত ভঙ্গিমায়। আর মিসাকে দেখে তো উচ্ছ্বাস একেবারে ফিদা হয়ে গেছে। নিজের মনেই বলেছে, ‘কী সুন্দর দেখতে হয়েছে মিসা। আগেও সুন্দরী ছিল, কিন্তু সেই কিশোরী বয়সের মিসা আজ যেন সব উপমা ছাপিয়ে গেছে।’

দু-একদিন কথা বলতে বলতে, খুব কাছ থেকে দুজন দুজনাকে দেখে নিল। এইভাবে কেটে গেল তিনটে মাস। মাঝে অবশ্য উচ্ছ্বাস কিছুদিন ওর ব্যবসার কাজে ডুব মেরেছিল। একেবারে ফোনের সুইচ অফ ছিল। মিসার খুব অভিমান হয়েছিল প্রথমে। না বলে সুইচ অফ করে রাখল কেন? সেই সঙ্গে বেশ চিন্তাও হচ্ছিল। বাইরে গিয়ে আবার কোনোরকম অঘটন কিছু ঘটল না তো?

পরে জানল, খুব কনফিডেনশিয়াল মিটিং ছিল কোম্পানির। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসাইনমেন্ট ছিল। একেবারে প্যাক্ট শিডিউল। এক মুহূর্ত সময় পায়নি। রাতে কোনোমতে শরীরটা বিছানায় ফেলতেই ঘুম চলে আসতো। সেই কয়দিন মিসার সে কী মন খারাপ। সেই প্রথম মিসা অনুভব করল উচ্ছ্বাসকে এই কয়দিনে ও কতটা ভালোবেসে ফেলেছে।

হংকং থেকে খুব সুন্দর কিউরিও এনেছে মিসার জন্যে। মিসাকে দেখায়নি। একেবারে সারপ্রাইজ দেবে ঠিক করেছে। ভারী অদ্ভুত দেখতে মূর্তিটা।

সেদিন হংকং থেকে ফিরে ওরা ঈগল ক্রেগের সামনে এক জায়গায় মিট করল। সারাদিন প্রচুর ঘোরাঘুরি, আড্ডা এবং গল্পগুজব হলো।

তারপর দিনের শেষে ওরা দুজনের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিলো।

উচ্ছ্বাস জানিয়ে দিলো ওর বাড়িতে সম্ভবত কেউ কোনো আপত্তি করবে না। আর আপত্তি করার মতো আছে কে? কেউই নেই। মা মারা গেছে বছর পাঁচেক আগে, আর বাবা এখন আর কোনো কিছুতেই নিজেকে জড়াতে চান না।

কিন্তু বাদ সাধল মিসার বাড়ির লোকেরা।

মিসার মা আগে থেকে মিসার জন্যে একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পাত্র ঠিক করে রেখেছিলেন। ছেলেটি ওর মায়ের বান্ধবীর ছেলে। থাকে কানাডায়। মা এর আগেও হাবেভাবে মিসাকে জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মিসা প্রতিবারেই বলেছে মাকে ছেড়ে সে কিছুতেই বিদেশে থাকতে রাজি নয়। হ্যাঁ, সেই ছেলে যদি এদেশে ফিরে আসে তবে সে তখন ভেবে দেখবে।

ব্যাস, এই পর্যন্তই কথাবার্তা স্থির ছিল।

দুই

অনুষ্ঠানশেষে মিসা ঘরে ঢুকে মেয়েটিকে ওর বিছানার ওপর দেখে তাজ্জব বনে গেল। কে এই মেয়েটি? কীভাবে এলো এই ঘরে? এই ঘরের চাবিই বা পেল কোত্থেকে? আর এখানেই বা সে কী করছে?

ওদের আজকের এই অনুষ্ঠানে মেয়েটিকে তো দেখেনি মিসা।

তাহলে মেয়েটি কে?

মনে হচ্ছে কোনো চীনা মেয়ে। কেমন কোমল দৃষ্টিতে দেখছে চারপাশ। মিসা যে তাকে দেখছে সে বিষয়েও মেয়েটি উদাসীন।

মনে হচ্ছে বিছানার ওপর কারো জন্যে অপেক্ষা করছে।

মিসা ভাবছে, উচ্ছ্বাসের আবার কোনো বন্ধুর গার্লফ্রেন্ড না তো?

উচ্ছ্বাস বন্ধুদের সি অফ করতে নিচের পার্কিংয়ে গিয়েছে, এখনো ফেরেনি।

মিসার কেমন যেন একটা অস্বস্তি লাগছে।

ভাবছে, এই হোটেলেই হয়তো অন্য কোনো রুমে উঠেছে। ভুল করে আবার ওদের ঘরে ঢুকে গেল না তো?

হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে মিসা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

এই সেভেন সেভেন্টিন রুমে বেশ কিছুদিন ধরে উচ্ছ্বাস আছে। ওর মুখে শুনেছে এখানে যতবার আসে এই ঘরটাতেই সে ওঠে।

মিসা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ভাবল, উচ্ছ্বাসের সঙ্গে দেখা হলে কথাটা বলবে।

কয়েক পা এগিয়ে গিয়েও ফিরে এলো।

নাহ, ঠিক হচ্ছে না এইভাবে মেয়েটিকে ঘরে রেখে আসা।

ওদের রুমের ওয়ার্ডরোবে অনেক টাকা-পয়সা এবং সোনার জিনিসপত্র আছে। মিসাকে এই বিশেষ দিনে কিছু দেবে বলে ডায়মন্ডের সেট কিনেছে উচ্ছ্বাস। আরো কী একটা জিনিস দেওয়ার আছে। সেটা মিসা পরিষ্কার করে শোনেনি।

ইচ্ছা করেই শোনেনি। আজকের দিনটা বিশেষভাবে স্পেশাল দুজনার কাছেই।

মিসা বেরিয়ে উচ্ছ্বাসকে না পেয়ে ফিরে এসে আরো বেশি অবাক হলো।

গেল কোথায় মেয়েটি? এই তো এখানেই ছিল, ও তো খুব বেশিদূর যায়নি?

মাত্র এই ফ্লোরেই তিনটে কি চারটে রুম পার হয়ে সবে রাইট টার্ন নিয়েছিল। মিনিট তিন-চারেকের বেশি কিছুতেই লাগতে পারে না।

এদিক-সেদিক খুব ভালো করে খুঁজল, কিন্তু মেয়েটির দেখা পেল না।

ভাবল, এই ফ্লোরেই হয়তো কোনো ঘরে ঢুকে পড়েছে।

ও নিশ্চিত হলো, হয়তো ভুল করেই ঢুকে পড়েছিল।

উচ্ছ্বাস বেশ কিছুটা সময় পার করে ফিরে এলো।

মিসার ভ্রু-জোড়া কুঞ্চিত দেখে জিজ্ঞাসা করে, ‘হোয়াট হ্যাপেন্ড? অ্যানি প্রবলেম?’

‘নাহ্।’

‘তবে? ’

এরপর মিসা সংক্ষেপে একটু আগে যা যা ঘটেছে তাই জানাল।

‘মেয়েটিকে তুমি সত্যি সত্যিই দেখেছ?’

‘হ্যাঁ, আমাদের বিছানার ওপর বসে ছিল। কী সুন্দর দেখতে, অনেকটা চায়নিজ মেয়েদের মতো মনে হলো।’

‘তোমার চাইতেও সুন্দর।’

‘বাঃ, সত্যি বলছি।’

‘তাহলে তো একবার খোঁজ করতে হয় সেই মূর্তিমতী সুন্দরীকে।’

‘দেখি একবার রিসেপশনে খবর নিয়ে।’

উচ্ছ্বাস ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। ও দ্রুত নিচে নেমে গেল এবং রিসেপশনে কথাটা জানাল।

রিসেপশনিস্ট খাতা খুলে বলল, এরকম বয়সী চীনা মেয়ে বোর্ডার তাদের এখানে আসেনি, তবে উচ্ছ্বাস যখন বলছে তখন খোঁজ নিয়ে দেখতে পারে। হয়তো কারো গেস্ট এখানে এসে দেখাও করতে পারে। ‘ঠিক আছে আমরা সিসি ক্যামেরা চেক করে জানাচ্ছি।’

রিসেপশনিস্ট বেশ কিছুটা সময় আগে থেকেই ভিডিও ফুটেজ দেখতে থাকে। উচ্ছ্বাস পাশেই বসে ছিল। নাহ, এই তো পরপর সব দেখা যাচ্ছে কে কোন ঘরে ঢুকছে, বের হচ্ছে। সেভেন সেভেন্টিনের সামনেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। নাহ, এই যে দেখুন, যে সময়ের কথা বলছেন সেই সময়ে কাউকে ঢুকতে কিংবা বের হতে দেখা যাচ্ছে না।

উচ্ছ্বাসও লক্ষ করল প্রতি সেকেন্ডের নিখুঁত ছবি দেখা যাচ্ছে।

উচ্ছ্বাস রিসেপশনিস্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে ঘরে ফিরে এলো।

সব শুনে মিসা অবাক চোখে বলল, ‘তাহলে?’

‘তুমি ঠিক দেখেছ তো? তুমি আবার ভুল করে অন্যের ঘরে ঢুকে পড়োনি তো?’

‘কী যা-তা বলছ? আমার ঘরে ফুল দিয়ে সব কিছু সাজানো-গোছানো আছে। বন্ধুদের গিফটগুলো সব একপাশে ডাঁই করা আছে। আমি তোমার জন্যে ওই ঘরেই ওয়েট করছি, আর তুমি বলছ আমি ভুল করেছি?’

মিসা মনে মনে একটু বিরক্ত হলো। উচ্ছ্বাস হাসতে হাসতে বলে, ‘রাগ কারো না, এছাড়া আমার তো আর কিছুই মাথায় আসছে না। হয় ভৌতিক, নয়তো অলৌকিক কোনো ব্যাপার ঘটেছে। এছাড়া আর কিই-বা বলতে পারি।’

তিন

‘সত্যি বলছিস, কিচ্ছু হয়নি? যাহ্!’

মিয়ামী হেসে ওঠে।

‘হ্যাঁ, যা বলছি তা ভেতরে এতটুকু মিথ্যে নেই রে। আর শুধু শুধু তোর কাছে মিথ্যে কথা বলতেই বা যাবো কেন?’ এরপর মিসা মিয়ামীকে এই কয়দিনের ঘটনা ডিটেইলে সব বলে।

কথাগুলো বলতে বলতে প্রায় কেঁদেই ফেলল মিসা।

মিয়ামী ফোনের ওপাশে মাথা নেড়ে ভাবতে থাকে, মিসার কথা যদি সত্যি ধরে নিতে হয় তাহলে তো ব্যাপারটা খুবই ভয়ংকর।

আর একটা কথা সেই সঙ্গে মিয়ামীর মনের ভেতরে উঁকি দিলো, মিসার ভেতরে আবার কোনোরকম মানসিক সমস্যা চলছে না তো? অনেক সময়ে অনেক মানসিক রোগীর এই জাতীয় হ্যালুসিনেশন হয়। কেউ কোথাও নেই অথচ সে তাকে দেখতে পাচ্ছে। এবং তার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথাবার্তাও চালিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু মিসার ভেতরে এই ধরনের মস্তিষ্ক বিকৃতি ও কখনো দেখেনি।

এই তো কয়েক মাস আগেই মিসার সঙ্গে দেখা হলো। কলকাতায় এসেছিল মিসা। পার্ক স্ট্রিটের একটা কফিশপে কতক্ষণ গল্প হলো দুজনার। বিভিন্ন টপিক নিয়ে আলোচনা হলো। মিসার পাণ্ডিত্য দেখে মিয়ামী মাঝে মাঝে মুগ্ধ হয়ে ওকে দেখছিল। ও খুব স্টুডিয়াস স্টুডেন্ট ছিল। অগাধ ওর জ্ঞান। ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন কুইজ কম্পিটিশনে প্রতি বছর বিভিন্ন জায়গা থেকে মিসার ভরসাতেই ওরা জিতে আসত।

কেন যে হুট করে বিয়ের মতো এমন একটা ভাইটাল ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল মিসা, কাউকে জানাল না পর্যন্ত। বাড়ির অমতে এমনকি বন্ধু-বান্ধবদেরও পর্যন্ত জানায়নি। মিসা তো কখনো এমন অবিবেচক ছিল না। তাছাড়া টিনএজও নয় যে এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নেবে।

যাকগে, এখন ও যে-সমস্যার কথা বলছে সেটাতেই মনোনিবেশ করল মিয়ামী।

তেমনটা হলে ওকে এখানে আসতে হবে সময় করে। ফোনে এসব ডিসকাস করা যায় না। সামনাসামনি বসে আলোচনা করতে হয়।

আবার অন্যদিকে উচ্ছ্বাসের কথাও ভাবছে। ওরা প্রেম করে বিয়ে করল, কিন্তু এতদিনে ওদের ভেতরে কোনোরকম ফিজিক্যাল ইন্টারেকশন হলো না? এ আবার কী রকম প্রেম। মিসা কি কিছুই বুঝতে পারেনি? একটু চোখের দেখাতেই বিয়ে করে ফেলল?

আর উচ্ছ্বাসই বা কী রকম ছেলে? ওর যদি শারীরিক এমন কোনো সমস্যা থেকেই থাকে তাহলে তো বিয়ের আগেই চিকিৎসা করে সারিয়ে ফেলা দরকার ছিল। একটা মেয়ের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কি কোনো দরকার ছিল? কিছু প্রশ্ন আছে যেগুলো দুজনকে সামনাসামনি বসিয়ে আলোচনা করা দরকার।

মিয়ামী সেই রাতে অনেকক্ষণ ধরে মিসার এই জাতীয় সমস্যা এবং উচ্ছ্বাসের অসুখটা নিয়ে পড়াশোনা করল। দুটো আলাদা প্রবলেম।

দুটোর ভেতরে যে-কোনো একটা সত্যি। মিসার সঙ্গে সামনাসামনি একবার দেখা করা দরকার।

কথাটা সেদিন ফোনে মিসাকে মিয়ামী বলেই ফেলল, ‘কী রে তুই কি একবার কলকাতায় আসতে পারবি?’

মিসা এক মিনিট ভেবে বলল, ‘কবে আসতে বলছিস?’

‘সামনের সপ্তাহে।’

‘দেখছি, টিকিট পেলে তোকে জানাবো।’

সেদিনের পরে আরো দুদিন মিসা ঘটনাটি একেবারে চোখের সামনে ঘটতে দেখেছে।

সেদিন মিসার স্কুলে একটা অনুষ্ঠান ছিল। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়। হোটেলের সামনে এসে মিসা উচ্ছ্বাসকে ফোন করে।

উচ্ছ্বাস মাঝপথে ফোনটা কেটে দেয়।

মিসা কিছুক্ষণ ওয়েট করার পরে আবার ফোন করলে উচ্ছ্বাস ফোন ধরে বলে হোটেলেই আছে। সেই রাতে মিসা বেশ ক্লান্ত ছিল। ডিনার করে বিছানায় শরীরটা ফেলতেই রাজ্যের ঘুম নেমে আসে। মাঝ রাত্তিরে কীসের একটা শব্দে ঘুম ভেঙে যায়।

কেমন যেন শীৎকার ধ্বনি, মিসা উৎকর্ণ হয়ে শুনছে।

কেমন যেন ভালোবাসায় মাখামাখি অর্থহীন অথচ ব্যাপক অর্থবহ কিছু শব্দ তার কানে আসে। ঘরে মৃদু আলো জ্বলছিল। তার ভেতরে মিসা লক্ষ করল পাশের বেডে উচ্ছ্বাস আর সেই সুন্দরী চায়নিজ মেয়েটা। মেয়েটির শরীরে এক টুকরো কাপড় পর্যন্ত নেই। মেয়েটি উচ্ছ্বাসের কোলের ওপরে মুখোমুখি বসে বুকে বুক লাগিয়ে দুই পা দিয়ে উচ্ছ্বাসকে জড়িয়ে ধরেছে। উচ্ছ্বাস আর মেয়েটির মুখ আবেশে চুম্বনরত। ঘাড়ে পিঠে গলায়, নাহ্, আর ভাবতে পারছে না মিসা। মেয়েটির শরীর দলিত-মথিত হচ্ছে উচ্ছ্বাসের বুকের ভেতরে।

উচ্ছ্বাস তখন নিমগ্ন পূর্ণভাবে।

মিসা এই দৃশ্য চোখের সামনে সহ্য করতে পারে না – উঠে আলো জ্বালে এবং চিৎকার করে কেঁদে উঠতেই থমকে যায়। দেখে পাশের বিছানায় উচ্ছ্বাস বালিশে মাথা রেখে ব্ল্যাঙ্কেট গায়ে দিয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।

মিসার শরীর তখনো কাঁপছে।

ও ভয়ার্ত চোখে ঘরটার সমস্ত কোনা দেখতে লাগল। একেবারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। দুটো বেড, একটি ওয়ারড্রোব, একপাশে দুটি গদি আঁটা চেয়ার, সামনে ছোট কাচের সেন্টার টেবিল, ড্রেসিং আয়না, আর অ্যাটাচড বাথরুম, সেটার দরজা বন্ধ দেখাই যাচ্ছে। বাথরুমটা কাচের, ঘর থেকেই মোটামুটি সব দেখা যায় যদি ভেতর থেকে পর্দা না ফেলা থাকে। মিসা ভয়ে ভয়ে ঘরের চারদিকটা তাকিয়ে দেখে নিল আরো একবার। উচ্ছ্বাস গভীর ঘুমে অচেতন। ডিভানে শুয়ে আছে মিংশুক। ওয়ারড্রোব বন্ধ। আর এই ঘরের সবকিছু দিনের আলোর মতো ঝলমল করছে। মিংশুক একসময়ে ঘুম জড়ানো গলায় বলে, ‘কী করছ বলো তো? ঘুমাও আলো জ্বাললে কেন?’

মিসা তখনো কাঁপছে।

আস্তে আস্তে উচ্ছ্বাসের কাছে আসে। ওর গলা জড়িয়ে ধরে; কিন্তু উচ্ছ্বাসের ভেতরে তেমন কোনো আবেগানুভূতি লক্ষ করে না মিসা।

অথচ বিয়ের আগে মিসাকে হাবেভাবে কত কিছুই না বুঝিয়ে দিয়েছিল। এমনভাবে তাকাতো ওর দিকে যে মিসা মরমে মরে যেত। ও আবেগমথিত গলায় উচ্ছ্বাসের দিকে লাজুক হেসে বলত, ‘খবরদার! একদম ওভাবে তাকাবে না।’ মিসাই ওকে বুঝিয়ে বুঝিয়ে ফুলসজ্জা পর্যন্ত সময় চেয়ে নিয়েছিল। বলেছিল, ‘এতদিন যখন পেরেছিস আর দুটো দিন একটু ধৈর্য ধরে থাকতে পারবি।’

মিসার আজ সত্যি কেমন যেন ভয় ভয় করছে। ঘরের আলো নেভাতে পারছে না। যদি আবার সেই দৃশ্য চোখে পড়ে! ও আস্তে আস্তে উচ্ছ্বাসের ব্ল্যাঙ্কেটের ভেতরে ঢুকে যায় এবং আস্তে ওর মাথায় হাত বুলাতে থাকে। সমস্ত গায়ে হাত বুলায়।

উচ্ছ্বাস মুখে একটু শব্দ করে মিসাকে কাছে টেনে নেয়; দুই-একবার কিস করে তারপর আবার নাক ডাকতে শুরু করে। এছাড়া উচ্ছ্বাসের ভেতরে আর কোনো পরিবর্তন লক্ষ করে না।

মিসা এখন উচ্ছ্বাসকে সমস্ত শরীর দিয়ে পেতে চায়। যে-শরীরটাকে এতটা দিন গুছিয়ে সুন্দর এবং পরিপূর্ণ করে রেখেছে, সেই কবে থেকে বসে আছে সুন্দর একজন মানুষকে উপহার দেওয়ার জন্যে।

সমস্ত রকম কলাকৌশল প্রয়োগ করে মিসা।

উচ্ছ্বাসের শরীরে হাত বোলাতে গিয়ে টের পায়, ও নিঃশেষ হয়ে গেছে খানিক আগেই। ওর রাতপোশাকের নিচের দিক ভিজে গেছে। আর তীব্র ক্ষারীয় গন্ধ বের হচ্ছে।

মিসা ওর নিজের বিছানায় ফিরে আসে আর হাউ-হাউ করে কাঁদতে থাকে।

কিন্তু কে শুনবে ওর ব্যাকুল কান্না?

উচ্ছ্বাস তো আকণ্ঠ হুইস্কি পান করে গভীর নিদ্রায় মগ্ন।

মিসা বুঝতে পারছে না এখন সে কী করবে। বাড়ির কাউকে বলতে পর্যন্ত পারবে না।

কিন্তু সে তো এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্রী নয়, ব্যাপারটা কী সেটি জানতেই হবে।

এটা যা ঘটছে কোনো শিক্ষিত আধুনিকমনস্ক মানুষ কিছুতেই বিশ্বাস করবে না।

মিয়ামীকে বলায় ও তো প্রথম শুনে বলেছিল, ‘আবার স্বপ্ন দেখেছিস না তো?’

মিয়ামী একজন সাইকোলজিস্ট, মিসার কলেজজীবনের বন্ধু। দুজনে একসময়ে কয়েক বছর বেলেঘাটার কাছে একটি বাড়িতে পেয়িং গেস্ট ছিল।

মিসার সেই রাতে কিছুতেই ঘুম আসে না। এমনকি পরের রাতগুলোতেও সে ঘুমাতে পারে না।

মনে মনে ভাবে, এমন অসুখের কথা ও আগেও বন্ধুমহলে শুনেছে। ছেলেদের কত রকম সমস্যা থাকে। কারো লিঙ্গ শিথিল, কারো বা খুবই ছোট, কারো কারো ইঞ্জেক্ট করতে না করতেই বীর্যপাত হয়ে যায়।

কত রকম সব সমস্যা। মিয়ামী বলেছিল, ‘সবকিছুর আজকাল ভালো ট্রিটমেন্ট রয়েছে। অযথা ভেঙে পড়িস না; কিন্তু আর যেটা বললি তার তো কোনো মাথামুণ্ডু খুঁজে পাচ্ছি না।’

কিন্তু মিসা যখন ওকে মেয়েটার কথা জানাল এবং পরপর কয়েকদিন লক্ষ করল উচ্ছ্বাসকে প্রায় নিঃস্ব করে দিয়ে সে চলে যাচ্ছে, অথচ মেয়েটিকে আলোতে দেখা যাচ্ছে না।

মিয়ামী মিসার কান্না শুনে বলেছিল, ‘কিচ্ছু ভাবিস না, আমি যদি নাও পারি আমার স্যারের কাছে তোকে নিয়ে যাবো, সেরকম হলে উচ্ছ্বাসকেও নিয়ে আসিস। এরকম কত পেশেন্টকে স্যার সুস্থ করে  তুলেছেন।’

কিন্তু মিসা ভাবছে, মেয়েটিকে সে কেন দেখছে এটা কীভাবে সে ব্যাখ্যা করবে?

উচ্ছ্বাসকে একদিন বলেই ফেলেছিল, ‘তোমার কী বিয়ের আগে কারো সঙ্গে অ্যাফেয়ার ছিল?’

‘কেন বলো তো? আজ হঠাৎ এমন প্রশ্ন?’

সেদিন কথাটা শুনে উচ্ছ্বাস বেশ বিব্রত এবং মনোক্ষুণ্ন হয়েছিল।

প্রথমে এক বিছানায় শুয়ে ছিল দুজনে; কিন্তু সদ্য বিবাহিত বউয়ের প্রতি উচ্ছ্বাসের কোনোরকম আগ্রহ নেই দেখে আশ্চর্য হয়েছিল মিসা। সে উচ্ছ্বাসকে পরিপূর্ণভাবে পেতে চাইছে, অথচ উচ্ছ্বাস এই ব্যাপারে একেবারেই ইনার্ট।

তবে কি অন্য কারো সঙ্গে ওর সম্পর্ক আছে?

রাতের পর রাত মিসা ঘুমায় না। কাকে বলবে তার এই সমস্যার কথা? কে বুঝবে সে কী যন্ত্রণার ভেতর দিন কাটাচ্ছে। কী কুক্ষণে যে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে ওর আবার দেখা হলো।

বিয়ের মতো এত বড় একটা সিদ্ধান্ত সে একা কিভাবে নিল?

উচ্ছ্বাসকে বাইরে থেকে দেখলে কিচ্ছুটি বোঝার উপায় নেই – সকলের সঙ্গে এমনভাবে মেশে, এত কাজপাগল ছেলে। আজ সিঙ্গাপুর তো কাল হংকং, পরের সপ্তাহে দুবাই চষে বেড়াচ্ছে।

উচ্ছ্বাসের ব্যবসাপত্তর এবং রুজি-রোজগার বেশ ভালোই।

দার্জিলিং এলে হোটেলেই থাকে উচ্ছ্বাস। এই হোটেলের একদিনের ভাড়া শুনলে অবাক হতে হয়। সেভেন সেভেন্টিন নাম্বারের ঘরটি তার জন্যে যেন উন্মুক্ত থাকে। সকলেই বেশ খাতির করে উচ্ছ্বাসকে। ঘরটার ব্যালকনি থেকে সুন্দর বরফে ঢাকা টাইগার হিল দেখা যায়।

কিন্তু মিসা এখন আর কোনো সৌন্দর্যই উপভোগ করতে পারছে না।

চার

পাহাড়ের বেশ খানিকটা ওপরে নির্জন ওক-পাইনের নিবিড় বনছায়ায় সাধুবাবার আশ্রম। আশেপাশে জনবসতি প্রায় নেই বললেই চলে। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধুই ঘন বন। মিসা স্থানীয় লোকের মুখে শুনে শুনে অবশেষে আশ্রমে এসে উপস্থিত হলো। ওর কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ আর সেই ব্যাগের ভেতরে রাখা আছে মূর্তিটা। যেদিন থেকে মূর্তিটাকে উচ্ছ্বাস হোটেলে এনে রেখেছে তারপর থেকে একটি রাতও মিসা ঘুমাতে পারেনি।

ওর একজন কলিগ এই আশ্রমের ঠিকানা দিয়ে বলেছে, ‘একজন তান্ত্রিক সিদ্ধ পুরুষ। যা, সাধুবাবাকে সব কথা খুলে বলিস, অনেকের অনেক সমস্যা উনি সারিয়ে দিয়েছেন।

মিসা যখন সাধুবাবার আশ্রমে এসে পৌঁছালো তখন মধ্যাহ্নের সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে। পাইন গাছের শীর্ষে কমলারঙা রোদ্দুর থাকলেও আশ্রমের চারিধার বৈকালিক পরশমাখা।

বনের ভেতরে সাধুবাবার আশ্রম। পর্ণ কুটির নয়, ইটপাথরের বহু প্রাচীন মন্দির। সেটির গড়ন দেখলেই অনুমান করা যাচ্ছে।

মিসা ধীরপায়ে আশ্রমের ভেতর প্রবেশ করল। একেবারে গর্ভগৃহের সামনে এসে দাঁড়াল।

সাধুবাবা তাকে দেখে গর্ভগৃহের দরজার বাঁদিকে বসতে বললেন এবং সে কেন এসেছে সে-সম্বন্ধে অবহিত হলেন। মূর্তিটা হাতে নিয়ে সাধুবাবা খানিকক্ষণ অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলেন। কিছুতেই তাঁর চোখের পলক পড়ছে না। তারপর বিস্মিত নয়নে মিসার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললেন, ‘এই মূর্তি তুমি কোত্থেকে পেলে?’

‘আমার স্বামী যেন কোত্থেকে কিনে এনেছেন। আমি ঠিক বলতে পারবো না।’

সাধুবাবা একটি চিতাবাঘের চামড়ার আসনে উপবিষ্ট। তাঁর সামনে উঁচু বেদির ওপরে কালো পাথরের কিংবা ধাতুনির্মিত ভয়ংকর এক মূর্তি দণ্ডায়মান।

সাধুবাবা একটি নরমুণ্ডের গায়ে রক্ত চন্দন সিঁধুরের ফোঁটা লাগাতে লাগাতে বললেন,

‘এটি একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মূর্তি। এই মূর্তিটির একটি বিশেষত্ব আছে। সেটির ইতিহাস না বললে তুমি বুঝতে পারবে না। তোমার হাতে কি সময় আছে?’

মিসা ঘাড় কাত করে।

সাধুবাবা বললেন, ‘বৌদ্ধ দেব সংঘে হেরুক একজন বিশিষ্ট দেবতা। খুব শক্তিশালী তিনি। তিনি যখন তাঁর শক্তি বজ্রবারাহীর সঙ্গে মিলিত হন তখন তাঁকে ‘বজ্রডাক’ নামে ডাকা হয়। এই বজ্রডাকের আরেকটি নাম হলো সম্বর। তিনি আলীঢ় আসনে ভৈরবের সঙ্গে কালরাত্রিকে পদদলিত করেন।

এনার মূর্তি ভয়ংকর। এনার দুই হাতে থাকে বজ্র এবং ঘণ্টা।

এনার আরেক নাম হল ‘সপ্তাক্ষর’।

‘সপ্তাক্ষর?’

‘হ্যাঁ, তার কারণ হলো যে-মন্ত্র দ্বারা এনার পূজা করা হয় সেটি সাতটি অক্ষর দ্বারা তৈরি। এই মন্ত্রটি হলো – ‘হ্রীঃ হ হ হুঁ হুঁ ফট্।’ হেরুক এই বজ্রবারাহীর সঙ্গে আলিঙ্গনরত অবস্থায় থাকতেই ভালোবাসেন।

তোমার নিকট যে-মূর্তিটি আছে এটি হলো সেই মহাশক্তিরূপী হেরুক – বজ্র ডাকিনীর এক যুগনদ্ধ মূর্তি। নেপাল, তিব্বত এবং চীনে এই যুগনদ্ধের পূজা করা হয়।’

মিসা সাধুবাবার কথা শুনে যেমন ভীত হলো তেমনি বিস্মিতও।

সাধুবাবা মিসাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কিন্তু তুমি আমার এখানে কেন এসেছ? কোনো সমস্যা হয়েছে কি?’

মিসা তখন সাধুবাবার কাছে অকপটে সব বলল।

সাধুবাবা বললেন, ‘তোর তো কপাল পুড়েছে রে বেটি।’

‘কেন, বাবা?’

‘ওই যে মেয়েকে তুই দেখেছিস সে তো সাধারণ কোনো মেয়ে নয়।’

‘তাহলে?’

‘ও হলো দেবী বজ্রবারাহী। এই যে একটু আগেই তোকে বললাম। বজ্রবারাহী সব সময়ে দেবতা হেরুকের সঙ্গ কামনা করে। আলিঙ্গনরত অবস্থায় থাকতে চায়। যে বা যারা তাদের এই জুটিকে ভাঙতে চায় তাদের ওপরে ওনার কোপ এসে পড়ে। তোর স্বামী কি এর আগে কোনো দেবমূর্তি ঘরে এনেছে? বলতে পারবি?’

সাধুবাবার কথা শুনে মিসার সর্বাঙ্গে কাঁপুনি শুরু হলো। এ কী শুনছে ও? মিসা যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো মাথা নেড়ে বলে – ‘না তো, জানি না তো।’

‘তাহলে তো ঘোর বিপদ!’

‘কিন্তু বাবা এর থেকে পরিত্রাণের উপায়?’

সাধুবাবা উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন।

মিসা এই অবসরে মন্দিরের ভেতরের দিকে দৃষ্টি দিলো। দেখল গর্ভগৃহে নানান জীবজন্তুর হাহগোড়, পালক, নরমুণ্ডু, নানান শিকড়-বাকড়, লাল চেলি, রক্তপূর্ণ করোটি, পৈতে, রক্তবস্ত্র, আর বেলপাতা, তুলসীপাতা, কিছু ফুল-ফল রাখা আছে।

মিসার কেন জানি একটু ভয় ভয় করছে। বিশেষ করে সামনে বেদির ওপরে যে-মূর্তিটি আছে সেটির দিকে তাকালেই সমস্ত শরীরে ভয়ের শিহরণ জাগছে। কী ভয়ংকর মূর্তিটা। ঘোর কৃষ্ণবর্ণের মূর্তির দুটি হাত একটি মুখ। কিন্তু সেই মুখমণ্ডল থেকে ক্রোধ ফেটে পড়ছে যেন।

মূর্তিটি তাঁর পায়ের নিচে একটি মহিষকে পদদলিত করছেন। তাঁর ডান হাতে ধরা আছে নরমুণ্ডু অংকিত একটি দণ্ড। বাম হাতে রক্তপূর্ণ করোটি বুকের ঠিক হৃৎপিণ্ডের কাছে ধরা আছে। মূর্তিটা উচ্চতায় প্রায় দেড় ফুট মতো হবে।

মূর্তিটির দিকে একভাবে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না মিসা।

সাধুবাবা মিসার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘এই যে মূর্তিটা দেখছিস, ইনি হলেন দেবতা যমারি। যমের অরি মানে হলো শত্রু হন্তারক। পায়ের নিচে মহিষ দেখতে পাচ্ছিস? এই মহিষ হলো যমের প্রতীক চিহ্নস্বরূপ। ইনি সেই যমকে পদদলিত করছেন।’

সাধুবাবা এরপর মিসাকে একটি নিদান দিলেন। বললেন, আগামী কৃষ্ণ চতুর্দশীর রাতে তিনি পূজায় বসবেন। সেইদিন উচ্ছ্বাসকে নিয়ে আসতে হবে। আর মূর্তিটা যেন সেদিন নিয়ে আসে। মনে করলে আজ রেখে যেতে পারে।

মিসা মূর্তিটা রেখে যেতে পারলেই বাঁচে। এই মূর্তিটা তার জীবনে অভিশাপস্বরূপ।

পাঁচ

বেশ কিছুক্ষণ হতে চলল মিসাকে পাওয়া যাচ্ছে না দেখে উচ্ছ্বাস ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। ওর স্কুল, যে পেয়িং গেস্ট হাউজে ও থাকতো সেখানে, ওর বান্ধবীদের কাছে ফোন করে খোঁজ নিয়েছে। কিন্তু কেউই বলতে পারছে না মিসার কথা। কী যে হয়েছে মেয়েটার উচ্ছ্বাস কিছুই বুঝতে পারে না। দিব্যি হাসিখুশি মেয়েটাকে বিয়ে করল আর বিয়ের দুদিন পর থেকেই ওর আচরণে অস্বাভাবিকতা টের পাচ্ছে। কী হলো ঠিক বুঝতে পারছে না। কোনোভাবেই তো মিসাকে সন্তুষ্ট করা যাচ্ছে না। উচ্ছ্বাস যে মূর্তিটা এনেছিল সেটাও খুঁজে পাচ্ছে না। একটা সন্দেহ ওর হচ্ছে, মিসা যে মেয়েটির কথা বলেছিল চায়নিজ মেয়ে, সেই মেয়েটা আবার মূর্তিটা চুরি করেনি তো?

মিসাকে উচ্ছ্বাস ভুল কথা বলেছিল। মূর্তিটা ও হংকং শহরের একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কিনেছিল। বেশ দামেই। কিন্তু বাস্তবে ওই মূর্তিটার দাম নাকি অনেক অনেক বেশি।

কিছুটা সময় উদ্বেগের ভেতর কাটতে কাটতে মিসার দেখা পেল।

‘কী ব্যাপার, কোথায় গিয়েছিলে? কখন থেকে তোমার নাম্বারে ট্রাই করছি।’

‘তাই? ওহ, আমি মনে হচ্ছে মোবাইলটা নিতেই ভুলে গেছি। ওটা মনে হচ্ছে ঘরেই রয়ে গেছে।’

‘এইভাবে অপরিচিত জায়গায় একলা কেউ বের হয়? জানো আজকাল কতরকম খারাপ লোকজন ঘোরাফেরা করে। প্রতিদিন কত সব ঘটনার কথা শোনা যায়? আমি না পেরে কত জায়গায় ফোন করলাম। কলকাতায় তোমার বান্ধবী মিয়ামীর কাছে পর্যন্ত ফোন করেছি।’

‘ওকে আবার ফোন করতে গেলে কেন?’

‘মানে? তোমার বান্ধবীর কাছে ফোন করলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে শুনি? তুমি ওকে আমার সম্পর্কে যা না তাই বলবে আর আমি একটু কথা বললেই দোষ!’

‘না, তেমন কিছু বলিনি। শুধু মজা করে বলল এতদিন বিয়ে হলো অথচ -’

‘অথচ কী?’

‘তুমি যা বলেছ তাতে মনে হয়েছে আমি একজন ইম্পোটেন্ট। নয়তো অন্য নারীতে আসক্ত।’

‘হায়, যা দেখেছি তাই বলেছি।’

‘ভুল কথা, মিথ্যা কথা বলছ তুমি। তুমি কিছুই দেখনি, কিছুই দেখতে পারো না। এই ঘরে তুমি আর আমি ছাড়া আর কারো পক্ষে ঢোকা সম্ভব নয়।’

‘তাহলে দিনের পর দিন আমি কি ভুল দেখছি? আমাকে এতটাই বোকা ভাবছ?’

‘নাহ, তুমি বোকা নও, আর তুমি কিছু ভুল দেখোনি। যত্তসব মনগড়া কথা। শোনো, আমার মূর্তিটা কোথায় রেখেছ? আমি খুঁজে পেলাম না।’

‘ওটি আর পাবে না।’

‘তার মানে? জানো ওই মূর্তিটা আমি কত সাবধানে এনেছি? ওটির কত দাম জানো?’

‘না, দাম জেনে কি হবে?’

‘জানলে তার মর্যাদা দিতে। ওটির দাম পাঁচশো ডলার। আসল মূল্য আরো অনেক বেশি। আমার পরিচিত একজন আমার কাছে অনেক কম দামে বেচে দিলেন।’

‘অত দাম দিয়ে কিনলে কেন?’

‘আমার ভালো লাগল, তাই।’

‘এত কিছু থাকতে ওই মূর্তিটাই তোমার পছন্দ হলো?’

‘হ্যাঁ, ও তো একটা দেবী মূর্তি।’

‘ওই মূর্তিই যত নষ্টের গোড়া।’

‘কে বলল?’

‘আমি জানি।’

‘মূর্তিটা দেখা মাত্র আমার ভালো লেগেছে তাই কিনেছি তোমায় দেবো বলে। কোথায় রেখেছ সেটা?’

‘আমি একজনার কাছে রেখে এসেছি।’

‘কার কাছে?’

মিসা সংক্ষেপে সাধুবাবার সব কথা উচ্ছ্বাসকে বলে।

মিসার কথা শুনে উচ্ছ্বাসের তো চোখ ছানাবড়া। বলে ‘বলো কী? ওই ভয়ংকর জায়গায় একলা গিয়েছিলে তুমি? জানো, উনি একজন তান্ত্রিক সাধু।’

‘জানি, আর সব জেনেই গিয়েছিলাম।’

‘ওনার কাছে তাহলে সেই মূর্তি রেখে এসেছ? সর্বনাশ! আমায় এখন নিয়ে যেতে পারবে সেই সাধুবাবার কাছে?’

‘এত রাতে সেখানে যাবে? খুব দুর্গম পাহাড়ি পথ, জঙ্গলে পূর্ণ। এখন সেখানে যাওয়া যাবে না। কাল সকালে দেখা যেতে পারে।’

উচ্ছ্বাস ধপ করে সোফার ওপর বসে পড়ে। মাথায় হাত উঠে যায় ওর। মুখ থমথম করছে।

উচ্ছ্বাস বুঝতে পেরেছে ওই মূর্তি একেবারেই হাতছাড়া হয়ে গেল। তান্ত্রিক সাধুবাবা নিশ্চয়ই এই মূর্তির কদর বুঝেছেন। তাই তো তিনি রেখে যেতে বলেছেন।

ছয়

মিয়ামীর অ্যাডভাইস মতো উচ্ছ্বাস আর মিসা কলকাতায় এলো। গোলপার্কের কাছে মিয়ামীর স্যার প্রফেসর মৌলিকের চেম্বার। মিয়ামী আগে থেকে ওদের সমস্যার কথা বলে রেখেছিল।

ডা. মৌলিক প্রথমে উচ্ছ্বাসের মুখ থেকে সব কথা শুনলেন। তারপর মিসাকে ডাকলেন। ওর বক্তব্যও মন দিয়ে শুনে নিলেন। মিসাকে তিনি আলাদা জিজ্ঞাসা করলেন, ছোটবেলায় তার জীবনে মনে রাখার মতো এমন কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি, ভয়ংকর কোনো দুর্ঘটনা, যার দরুন সে ভীত হয়ে পড়েছিল বা দুঃখ পায়।

মিসা স্মৃতি হাতড়েও মনে করতে পারে না।

এরপর ডা. মৌলিক মিসাকে নানা রকম প্রশ্ন করেন। কিন্তু তেমন কোনো সদুত্তর পান না।

ডা. মৌলিক মিয়ামীকে বলেন, মিসার পরিবারের সঙ্গে, বিশেষ করে ওর মার সঙ্গে, একবার কথা বলা দরকার।

ডা. মৌলিক যতবার মিসার সঙ্গে কথা বলেন, ততবারই ও একই কথা বলে, ‘স্যার, আমি এক্কেবারেই সুস্থ। আমার কোনোরকম সমস্যাই নেই। আপনি শুধু শুধু আমাকে এম্বারেসড করছেন।’

ডা. মৌলিক কখনো রাগেন না। মুখে সব সময়ে তাঁর হাসি লেগে থাকে।

এরপর একদিন মিয়ামী মিসাদের বাড়িতে যায় এবং ওর মায়ের সঙ্গে দেখা করে মিসার সমস্যার কথা বলে। ওর স্যারের সঙ্গে একবার দেখা করার জন্যে অনুরোধ করে। বলে, ‘মাসিমা এই মুহূর্তে আপনাকে খুব প্রয়োজন। তবে একটাই অনুরোধ, মিসাকে এ-ব্যাপারে কিছুই বলা যাবে না।’

মিসার মা একদিন মিয়ামীর কথামতো ডা. মৌলিকের চেম্বারে আসেন।

ডা. মৌলিক মিসার মায়ের কাছে জানতে চান, মিসার জীবনে এমন কী ঘটেছিল যার জন্যে ওর ভেতরে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার দেখা যাচ্ছে।

মিসার মা মাথা নিচু করে বসেছিলেন। মিয়ামীও আজ উপস্থিত আছে। মিসার মা জানালেন, মেয়েকে নিয়ে তারও চিন্তার শেষ নেই।

তিনি আস্তে আস্তে যা বললেন তাতে মিয়ামী রীতিমতো বিস্মিত এবং শিহরিত।

মিসা তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। সেদিন ছিল বর্ষার এক রাত। রাতে টিউশান পড়ে দুই বান্ধবী বাড়িতে ফিরছিল। ওদের বাড়ি ফেরার পথে বেশ উঁচু একটা পাঁচিলঘেরা কারখানা ছিল। সারাদিন লোক চলাচল করলেও সন্ধের পরে জায়গাটা নির্জন হয়ে আসে। ওদের তাই বলা ছিল রাতে মেইন রোড ধরে ফিরতে। যদিও তাতে একটু বেশি সময় লাগে।

কিন্তু সেদিন কী ভূত চেপেছিল ওদের মাথায় কে জানে, ওরা সেই পথটাই ধরল।

সেদিন কয়েকটি ছেলে মদ খেয়ে মাতলামো করছিল। ওদের দেখতে পেয়ে বাজে কমেন্ট করতে শুরু করে এবং কয়েকজন এগিয়ে আসে।

ছেলেগুলোর মতলব ভালো নয় বুঝতে পেরে মিসারা পিছন ফিরে পালানোর চেষ্টা করে। ছেলেগুলোও ওদের পিছু নেয়। ছুটতে ছুটতে মিসা একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে কিন্তু ওর বান্ধবীকে ছেলেগুলো ধরে ফেলে।

সেদিন ছেলেগুলো মিসার বান্ধবীর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায় এবং গলায় ফাঁস দিয়ে তাকে মেরেও ফেলে।

একেবারে চোখের সামনে বান্ধবীর আর্তচিৎকার এবং এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ দেখে মিসা ওই ঝোপের ভেতরেই অজ্ঞান হয়ে যায়।

এদিকে বাড়িতে ফিরছে না দেখে মিসার বাবা-মা এবং ওর বান্ধবীর বাড়ির লোকেরাও খোঁজ শুরু করে। খুঁজতে খুঁজতে ওই পথের ধারে মেয়েটির মরদেহ দেখতে পায় আর মিসাকে দেখে ঝোপের ভেতর পড়ে আছে।

‘আমরা তো প্রথমে ধরেই নিয়েছিলাম ওকেও হয়তো …’

মিসার মা কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

ডা. মৌলিক বললেন, ‘আর কিছু বলতে হবে না। আমি বুঝতে পেরেছি। এরকম কিছুই আমি আন্দাজ করেছিলাম।’ মিসার মা বললেন, ‘এরপর মিসা বেশ কয়েক মাস মানসিক আঘাতে বিপর্যস্ত ছিল। ঠিকমতো কথাও বলতে পারতো না। অনেক দিন ধরে ওর ট্রিটমেন্ট চলেছিল। ডাক্তারবাবুর উপদেশমতো আমরাও ওকে আর এ-ব্যাপারে কখনো কোনো প্রশ্ন করিনি। ও-ও এরপরে সেই ঘটনা ভুলে গিয়েছিল বলেই মনে হয়।’

ডা. মৌলিক মিয়ামীকে বললেন, সেটাই ঘটেছে মিসার ক্ষেত্রে। উচ্ছ্বাসের হংকং থেকে আনা যুগনদ্ধ মূর্তিটা দেখে মিসার অবচেতন মনে সুপ্ত থাকা বহু পুরনো স্মৃতি আবার ফিরে আসে। আর তারপর থেকে তার মানসিক লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। সে ভয়ংকর সব দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করে, তার শরীরের ভেতর নানান প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, অকারণ সন্দেহ করতে শুরু করে এবং বেপরোয়া আচরণ করে।’

এরপর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে।

উচ্ছ্বাস মিসাকে নিয়ে পাকাপাকিভাবে কলকাতাতে চলে আসে।

মিসা উত্তর কলকাতার একটি বেসরকারি স্কুলে জয়েন করেছে। ওদের সুন্দর ফুটফুটে একটি মেয়েও হয়েছে। যদিও মেয়েটির নাকটা একটু চাপা আর চোখ দুটো বেশ ছোটখাটো। উচ্ছ্বাস মজা করে যখন ওকে ‘চায়নিজ বেবি’ বলে, তখন মিসা কটমট করে তাকায় উচ্ছ্বাসের দিকে। উচ্ছ্বাস হাত জোড় করে বলে – ‘সরি, ম্যাডাম। আর বলবো না।’

Leave a Reply