রবীন্দ্রসংগীত শিল্পে অভূতপূর্ব নিবেদন

লেখক: সনৎকুমার সাহা

স্বপন দত্ত ও আনন্দময়ী মজুমদার, দুজনেই রবীন্দ্রসংগীত গান। আপন আপন কাজে সার্থকতা ও মর্যাদার আসন তাঁদের দুজনেরই। তবে তাঁদের প্রাণসম্পদ রবীন্দ্রসংগীত। ধ্যান ও নিষ্ঠার একান্ত আয়োজন। এই গানের জগতে তাঁরা আগন্তুক নন। ভাবুক শ্রোতার অভাব ঘটে না। নিবেদনে স্বকীয়তা, কমনীয়তা ও সৃষ্টিশীলতা দুজনের গানেরই বৈশিষ্ট্য।
এদিকে আনন্দময়ী এই গান নিয়ে বিশাল কা– মেতেছেন। রবীন্দ্রনাথের গানগুলো তিনি এক এক করে ইংরেজি অনুবাদে ফুটিয়ে তুলছেন। এমন কয়েকশো গানের অনুবাদ তাঁর সম্পূর্ণ। এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী থাকেন বিদেশে। সমমনা। রুমেলা সেনগুপ্ত। তিনিও হাত লাগিয়েছেন এ-কাজে। লক্ষ্য, গীতবিতানের সবটা তাঁরা ইংরেজিতে মেলে ধরবেন। ভিন্ন ভিন্ন গান বাছছেন দুজনে। পুনরাবৃত্তির সুযোগ থাকে না।
অনুবাদের বাড়তি লক্ষ্য, – আমি বলি, সৃষ্টিশীলতায় অসাধারণ ও অনন্য, – তা হলো, গানগুলোর কাব্যগুণ অক্ষুণ্ণ রেখে রবীন্দ্রসংগীতের নির্ধারিত সুরের কাঠামোয় ফেলে তাদের গাওয়া। আক্ষরিক অর্থেই এ হয় ইংরেজি গীতবিতান। এমন উদ্যোগ আগে কেউ নিয়েছেন বলে জানি না। তার স্বপ্নও বোধহয় কেউ দেখেননি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও নন। গীতাঞ্জলির গদ্য অনুবাদে সুর দেওয়ার কথা তিনি কল্পনাও করেননি। দেবব্রত বিশ্বাস গোটা দুই গান ইংরেজিতে গেয়েছেন। একটু চমক দেওয়ার মতো। তার বেশি কিছু নয়। রবীন্দ্রসাহিত্যের দক্ষ ইংরেজি অনুবাদ যে কিছু হয়নি, তা নয়। যাঁরা করেছেন, তাঁরা অনেকেই কৃতী। সাহিত্যের বাজারে, বিশেষ করে কৌতূহলী বাঙালি পাঠকদের কাছে তাঁদের কারো কারো কদর
যথেষ্ট। কিছু কিছু গানের অনুবাদও আমাদের চোখে পড়েছে। সেসবে উপযুক্ত ইংরেজি শব্দ লাগসই বসাবার দিকেই প্রাথমিক নজর। গানকে জাগিয়ে তোলার দিকে আদৌ নয়। কবিতা হলো কি না, এ নিয়ে তুলনামূলক বিচার-বিবেচনা হয়তো চলে। বেশির ভাগই প–তি (Pedagogic) চালে। তাতে বাহবার কম-বেশি হতে পারে। কিন্তু গানের ভাব ও সুরমাধুর্যের তৃপ্তি-অতৃপ্তির অথবা তাদের সমন্বয়ে সৃষ্টির পূর্ণতায় প্রাণ পাওয়ার কথা ওঠে কদাচিৎ। এ নিয়ে প্রত্যাশাও তেমন জাগে না। কারণ শুরুতেই ধরে নিই, ঐতিহ্যলালিত ভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতির বন্ধনে এমনটির সম্ভাবনা নিতান্তই দুরাশা। সুরের জগৎ প্রত্যেকটি আপন-আপন ঐতিহ্যনির্ভর। তাতে দেওয়া-নেওয়ার পথ সবসময় খোলা। মিলন ও মিশ্রণ স্বাভাবিক। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে সার্থকতার দাবি, সব স্বীকার করে, তার মৌলিকত্বে। ভিন্ন ঐতিহ্যের পরিম-লে ভিন্ন ভাষায় তাকে ফুটিয়ে তোলার কথা ভাবাটাও, তাই মনে হয়, অনর্থক। যদিও সম্ভব হলে শুধু কথায় আপন সৃষ্টির মহিমা প্রায় পুরোটাই ফুটিয়ে তোলা যায় অন্য ভাষা-সংস্কৃতির পরিসরে।
সত্য কথা, সংগীতকলায় ধ্বনি ও সুরবিহারই মুখ্য। কথার অর্থ অনুসরণ প্রায়শই অপ্রাসঙ্গিক। কখনো প্রাসঙ্গিক হলে তার ভূমিকা বড়জোর সহায়কের। পাশ্চাত্যে মোৎজার্ট বা বিঠোফেন ধ্বনিসংগতির বিবিধ সামঞ্জস্যের ওপর ভিত্তি করে ভাবের এক একটি পর্যায়ক্রমিক বিকাশে সমস্ত নাটকীয়তাকে ধারণ করে তাকে পূর্ণতায় পৌঁছে দেন। অপেরা ও ব্যালে নৃত্যনাট্যে এককে ও বৃন্দে কণ্ঠসংগীতও গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাকে যন্ত্রবাদন ও নৃত্যভঙ্গিমার সঙ্গে তাল মেলাতে হয়। ভারতীয় মার্গসংগীতে ধ্বনিরই প্রাধান্য। সুরের আলাপে-বিসত্মারে কথা সহায়ক-অবলম্বন মাত্র। তার অর্থবহ ধারাবাহিকতা প্রাসঙ্গিক নয়। লোকসংগীত অবশ্য সব ঐতিহ্যে কথানির্ভর। আবেগলালিত সরল সুরের ছকে তা বাঁধা। অবশ্য জীবনঘনিষ্ঠ হওয়ায় প্রাণবন্ত।
রবীন্দ্রনাথের কথা ও সুর দুই-ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। সুরের ওঠানামার সঙ্গে কথা যে ভাব-বৈচিত্র্যের বাহন, তার ওঠানামাকে এ অঙ্গাঙ্গি সমসূত্রে বাঁধে। কোথাও টাল খায় না।
পরিণামে কথা ও সুর অনন্য সামঞ্জস্যে একক পূর্ণতা পায়। এখানে বাংলা ভাষার নির্মাণকলা অদৃশ্যে শব্দব্যবহার ও তার স্থানাঙ্ক নির্ণয়ে সুরের সঙ্গে সমঝোতায় অপরিহার্য ভূমিকা রেখে চলে।
ভাষা-কাঠামোয়, বিশেষ করে কর্তা-কর্ম ও ক্রিয়াপদের সংস্থাপনে অথবা ভাববাচ্যের ব্যবহারে এর ধরন ইংরেজি থেকে এতটাই ভিন্ন যে এতে শব্দের সঙ্গে সুরসংগতির ধারাবাহিকতাকে একইভাবে একই ধারায় ইংরেজিতে ফুটিয়ে তোলা প্রায় অসাধ্যই মনে হয়। বোধহয় এই কারণেই রবীন্দ্রসংগীতকে ইংরেজি গানে রূপান্তরের সুপরিকল্পিত সংগত সার্বিক প্রয়াস এতদিন আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি। অবশ্য আমাদের ভূখ– প্রাচীন প্রাকৃত ভূমি যেসব জায়গায় এক, সেসবখানে ভাষা-কাঠামোয় অমিলের চেয়ে মিলই বেশি। ওইসব বিভিন্ন ভাষায় রবীন্দ্রসংগীতের অনুবাদ কেমন বা কতটুকু হয়েছে জানি না। হতে পারে, একই পরিবারভুক্ত হওয়ায় রবীন্দ্রসংগীতের স্বাদ তেমন অন্যরা বাংলা থেকেই পেতে অভ্যস্ত। যেমন বাঙালিরা অভ্যস্ত হিন্দি, উর্দু বা এইরকম অন্যসব ভাষার গানে। হয়তো এ-কারণে অনুবাদের তাগিদ বাঙালি-অবাঙালি কারো মধ্যেই তেমন গড়ে ওঠে না। কিন্তু ইংরেজির বেলায় কাজটা মূলে ভিন্ন, এবং বাস্তবে দুঃসাধ্য। হতে পারে, এই কারণেই যাঁরা প্রতিভাবান, এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও, কাজটা এড়িয়ে গেছেন।
কিন্তু এই ‘অসাধ্য ব্রত’ সাধনে এগিয়ে এসেছেন এখন দুই বাঙালি কন্যা : আমাদের আনন্দময়ী ও তাঁর ওই য়োরোপ-প্রবাসী সখী রুমেলা। আরো একটু যোগ করি – আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁরা সাহিত্যের ছাত্রী নন। এবং আপন আপন বিষয়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাঠ সমাপ্ত করে ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে তাঁরা সেদিকেও মেধার চর্চায় অনলস। তারপরেও রবীন্দ্রনাথ নিয়ে তাঁদের এই অসামান্য সৃষ্টিশীল কাজে মনোযোগী হওয়া – আমাদের অবাক করে বইকি! তাঁদের অনুবাদে অবশ্য ভাগাভাগি আছে। যে-গানের অনুবাদ আনন্দময়ী করেন, সেটি তাঁর সখী রুমেলা করেন না। একই রকম রুমেলার কাজে শুধু তাঁরই হাত থাকে। সহস্র গানের অনুবাদ এর ভেতরে সম্পন্ন। তবে ছাপার অক্ষরে দুই মলাটের মাঝখানে তাঁদের প্রকাশনার উদ্যোগ এখনো কেউ নেননি। আমি শুধু আনন্দময়ীর কাজের কিছু নমুনা দেখেছি। কেবল তার ওপর নির্ভর করে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করা অনৈতিক। এই মহৎ উদ্যোগ পরিণামে কতটা সাড়া জাগায়, তা জানার জন্যে আমাদের আরো কতদিন অপেক্ষা করতে হবে, জানি না। অনুবাদও একটা সৃষ্টিশীল কাজ। এখানে চ্যালেঞ্জটা যে কত বেশি, এবং তা যে বহুমাত্রিক, তা আশা করি, আন্দাজ করা কঠিন নয়। ভিন্ন ভাষার গঠনকলা তার নিজস্ব দাবি নিয়ে সামনে দাঁড়ায়। পুরোটাই তার অবশ্যমান্য। তার ভেতরেই রবীন্দ্রসংগীতের ভাব অবিকল পুরে দিয়ে সুরের আয়োজন অবিকৃত রাখা, করতে পারলে তা অসাধ্য সাধনই।
এই সাধনায় আনন্দময়ীর আপন কাজের এক চিলতে ঝলক আজ পেলাম স্বপন দত্তের সঙ্গে তাঁর যুগল-গানের গুচ্ছে। পরিকল্পনাটি অভিনব : প্রতিটি গানে দুই ভাষার প্রাসঙ্গিক অংশ ধারাবাহিক পরপর সাজিয়ে এটা দেখতে চাওয়া এবং দেখাতেও, – সুরের পরিচিত প্রবাহে ভাষার অদলবদলে গান হোঁচট খায় কি না, শোনার তৃপ্তি এতটুকু ছুটে যায় কি না। তবে এমন নয় যে বাংলার সবটুকু সব জায়গায় ইংরেজিতে আক্ষরিক অনুসৃত হয়েছে। অবশ্য ফিরতি টানে ধুয়ার মতো গানের ইংরেজি মুখ-অংশটাও কোথাও কোথাও ফিরে ফিরে এসেছে। আসলে এ এক বুদ্ধিদীপ্ত মিশ্রণের নমুনা। আমার মনে হয়েছে, অসাধারণ। কোথাও কোথাও বিশেষ কোনো পদ বাংলায় দ্বৈতকণ্ঠে। গানের ওজন তাতে বাড়ে। এমনকি বাংলা
না-জানা শ্রোতার কাছেও। কারণ সুর-সংগতি অবিকল থেকে যায়। দ্বৈতকণ্ঠে প্রয়োজনমতো তারই মন্দ্রিত যোজনা। প্রতিটি গানেই থাকে পূর্ণতার আবেশ। এখানে সবকটি গানই বাংলায় গেয়েছেন স্বপন দত্ত। তাঁর শিক্ষিত কণ্ঠে প্রতিটি গানের ভাব যথাযথ ফুটে ওঠে। ইংরেজিতে গেয়েছেন সবটাই আনন্দময়ী। এবং যে-টুকরোগুলো বাংলায় দ্বৈতকণ্ঠে গাওয়া, সেখানে গলা মিলিয়েছেন তাঁরা একত্রে। যে-গানগুলো এখানে শুনলাম, তাদের তালিকা পুরোটা এরকম : ১. আকাশ-ভরা সূর্য-তারা বিশ্বভরা প্রাণ, ২. আমার মন যখন জাগলি না রে, ৩. আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী, ৪. মাঝে মাঝে তব দেখা পাই চিরদিন কেন পাই না, ৫. এসো শ্যামলসুন্দর, ৬. এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে, ৭. মনে রবে কি না রবে আমারে, ৮. এখন আর দেরি নয়, ধর গো তোরা হাতে হাতে ধর গো, ৯. তুমি কি কেবলই ছবি, ১০. আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর।
আমার মনে হয়েছে, রবীন্দ্রসংগীতের বিপুল সম্ভার থেকে এ এক সার্থক বুদ্ধিদীপ্ত নমুনা চয়ন। সুর ও ভাবের বৈচিত্র্যে, দুই-ই ধরা পড়ে। হয়তো একই রকম আরো নমুনা বাছাই করা যায়। অনুমান, তাতে এই প্রথম পরীক্ষণমূল্য হারাবে না। যাঁরা বাংলা জানেন না, ইংরেজিতেই শুনতে চান, তাঁদের কাছে বাংলা পদাবলী ধাপে ধাপে পার্শ্বসংগীতের মতো সংগতি রাখবে। কোথাও সুর বা তাল কাটবে না। একই প্রবাহে।
তবে এই উদ্যোগ এখানে সম্ভব হয়েছে আনন্দময়ীর অনুবাদগুলো হাতে আসার কল্যাণে। তারাই এই সম্ভাবনার পথ দেখায়। অনুবাদে, শব্দচয়নে ও তাদের কবিতায় জাগ্রত করায় গানের সুরকাঠামোটা তিনি যে মাথায় রেখে অগ্রসর হন, তাতে ভাব ও সুর ভাষাকে জাগ্রত করে, শুদ্ধ পাঠেই তার সুঘ্রাণ মেলে। রবীন্দ্রসৃষ্টি থেকে সঞ্জাত, তারই সাংগীতিক প্রতিধ্বনি নির্মাণ; কিন্তু ভাষা স্বয়ং আত্মনিষ্ঠ। একই সঙ্গে তাতে পূর্ণপ্রাণের নিবেদন। রবীন্দ্রনাথের অনুকরণ নেই। অতিচালাকিও নেই। প্রয়োজনমতো বাক্যগঠনে তিনি স্বাধীনতা নিয়েছেন। কিন্তু ভাবমাধুর্য অক্ষুণ্ণ রেখে। ভাষায় মরচে পড়ার, বা অনুকরণপ্রিয়তার কোনো লক্ষণ নেই। সবটাই তরতাজা, তন্বিষ্ঠ। ওই নিষ্ঠা রবীন্দ্রসংগীতের প্রাণসম্পদ। আমি এর বন্দনা গাই।
অভিনন্দন জানাই স্বপন দত্ত ও আনন্দময়ী মজুমদারের এই নতুনের মাঝে চিরকালীন সৃষ্টিসম্ভারকে। যাঁদের উৎসাহে এটি সম্ভব হলো, তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকি। বিশেষ করে, হাইকোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের কাছে। আনন্দময়ীর অনুবাদ আরো সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয় – একক গানে, যৌথ গানেও। আশা করি, এদিকেও উৎসাহী উদ্যোক্তাদের দৃষ্টি পড়বে। শুভানুধ্যায়ীদেরও। বিশেষজ্ঞদের ইতিবাচক মূল্যায়নও একইভাবে কাম্য – দেশে, এবং ইংরেজিভাষী বিদেশে। দয়ার প্রশ্রয় নয়, হতে হবে সৃষ্টিশীল প্রতিভার যথার্থ স্বীকৃতি। শুদ্ধ মানবিক ভাব-ঐশ্বর্যের অভাবনীয় শিল্পিত উদ্বোধনের মাপকাঠিতে। তার বিসত্মার ও প্রভাব সাংস্কৃতিক বলয়ে ও মানবচৈতন্যে মুক্তির আলো জ্বালাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আশা জাগাবে, এমন স্বপ্ন দেখা অমূলক মনে হয় না।
পুনশ্চ : লেখাটি রবীন্দ্রনাথের গানের দ্বিভাষিক সিডি অ্যালবাম ‘পূর্ব পশ্চিমের রবি’ (Tagore Blends East and West) প্রকাশের স্মারকগ্রন্থে প্রকাশিত হয় ২০ জুলাই ২০১৯। লেখকের অনুমতিক্রমে বৃহত্তর পাঠকের জন্য লেখাটি পুনর্মুদ্রিত হলো।

Leave a Reply

%d bloggers like this: