রবীন মণ্ডল : ষাটের দশকের প্রধান এক শিল্পী

লেখক: মৃণাল ঘোষ

মৃণাল ঘোষ

রবীন মণ্ডল (১৯২৯-২০১৯) প্রয়াত হয়েছেন ২ জুলাই প্রায় মধ্যরাতে। তাঁর প্রয়াণে ষাটের দশকের শিল্প-আঙ্গিকের আরো একটি ধারা সত্মব্ধ হলো। একে একে আলো নিভছে। সেই আলো ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে যাচ্ছে। একজন শিল্পী বেঁচে থাকেন তাঁর উদ্ভাবিত রূপ-এর (ফর্ম) মধ্যে। সেই রূপের ভেতর তাঁর আত্ম-অভিজ্ঞানের সারাৎসার যেমন থাকে, তেমনি থাকে তাঁর দেশ-কালের নির্যাসও। ষাটের দশকের শিল্পকলায় রূপের নানা প্রবাহের সমন্বয় ঘটেছিল। এই সমন্বয়ের মধ্যে প্রতিটি স্বর আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়। আবার সমসত্মটা মিলেই একটা ঐকতান, যে-ঐকতান আগে কখনো একইভাবে ধ্বনিত হয়নি, পরেও না। আধুনিক বা আধুনিকতাবাদী যুগে ‘ঘরানা’ কথাটি ঠিক সেভাবে প্রযোজ্য হতে পারে না, ‘স্কুলিং’ শব্দটিও নয়। তথাপি যে ঐক্য আভাসিত হয়, তার একটা তাৎপর্য তো থাকেই। আমরা এই বাংলাতেই ষাটের দশকেও প্রধান কয়েকজন শিল্পীর কাজের দিকে যদি তাকাই, তাহলে বৈচিত্র্যই আমাদের নজরে আসে প্রথমে। ঐক্যের কেন্দ্রটি শনাক্ত করতে একটু সময় লাগে।
সেই কেন্দ্রটি খুঁজতে গেলে আমাদের নজর দিতে হয় উত্তরাধিকারের দিকে। চলিস্নশের উত্তরাধিকার রূপান্তরিত হয়েছে ষাটের শিল্পীদের কাজে। এই রূপান্তরণের পথে তা আহরণ করেছে আরো অন্যান্য অনেক উৎস থেকেও। ষাটের দশকের প্রধান যে রূপগত প্রবণতাগুলো আমরা দেখতে পাই তার কয়েকটি হলো – স্বাভাবিকতাবাদী চিত্ররীতি, যা বিবর্তিত হয়ে এসেছে ব্রিটিশ উত্তরাধিকার থেকে। কেউ কেউ এই স্বাভাবিকতাবাদকে সম্পূর্ণ বর্জন করে আত্মস্থ করেছেন পাশ্চাত্যেরই আধুনিকতাবাদী উৎস। এটি যদি দ্বিতীয় হয় তাহলে তৃতীয় ধারার উৎসবিন্দু ছিল নব্য-ভারতীয় ঘরানার ঐতিহ্য-অন্বিত রূপপ্রবাহ। পাশ্চাত্য আধুনিকতাবাদ ও প্রাচ্য ঐতিহ্যের নিবিড় সমন্বয় ঘটেছে ষাটের শিল্পীদের কাজে। এই সমন্বয়ের অনেক প্রবণতার মধ্যে যে-দুটি প্রধান রূপপ্রকল্প বিশেষভাবে সক্রিয় থেকেছে, সে-দুটি হলো – লৌকিক ও আদিমতা-সঞ্জাত।
রবীন মণ্ডল তাঁর রূপনির্মাণে আদিমতার উৎসকে নানাভাবে ব্যবহার করেছেন। আদিমতার সঙ্গে লৌকিকের একটা
আপাত-ব্যবধান আছে। কিন্তু উৎসমূলে তারা একসময় একই ছিল। লৌকিক কৃষিজীবী জীবনপ্রবাহের ছন্দিত সুষমাকে উৎসারিত করে। আর আদিমতা অরণ্যচারী শিকারজীবী আদিবাসী মানুষের সতত সংঘাতময় জীবনসংগ্রামের তীব্রতাকে অনুরণিত করে। রবীন ম-লের কাজে লৌকিকের সূক্ষ্ম ছায়া-প্রচ্ছায়া থাকলেও আদিমতা বা প্রিমিটিভিজমের তীব্র সংক্ষুব্ধতাই প্রধান ভিত্তি ও সুর। তাঁর ‘প্রিমিটিভিজমে’র প্রধান উৎস পাশ্চাত্য আধুনিকতাবাদ হলেও এর ভেতর দিয়ে তিনি দেশীয় আত্মপরিচয়ের একটা আদলও তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এই দ্বৈত কেমন করে সমন্বিত হয়েছিল তাঁর রূপবিন্যাসে, এটাই তাঁর ছবি অনুধাবনের ক্ষেত্রে বিশেষ একটি সূত্র বা মাত্রা।
তাঁর নিজের কিছু উক্তি এ-বিষয়ে আমাদের সাহায্য করতে পারে, যেমন তিনি লিখেছিলেন তাঁর আমার কথা বইয়ের একটি প্রবন্ধে। বলেছিলেন এরকম :
শহর হাওড়ার অবস্থান, তার অনগ্রসরতা, আধুনিক কলকারখানার সমস্যা ও তার প্রতিক্রিয়া নানাভাবে আমাকে বিহবল করে তোলে। মনে হয় এই পরিবেশজাত মানসিকতা আমাকে শিল্পকলার চপল সৌন্দর্য ও অলংকরণের দৃষ্টি থেকে বিমনা করে তোলে। মনে হয়েছিল আমাকে এমন একটা রীতি বা স্টাইলের আশ্রয় নিতে হবে যা আমার ভাবনাকে প্রকাশ করতে সাহায্য করবে। এ কারণে আমাকে Archetypal image এবং archaic
form-এর সাহায্য নিতে হয়েছে – যা কখনও Primitive, tribal অথবা folkish রীতি আশ্রিত। এসব ব্যাপারগুলোর আশ্রয় নেওয়ার কারণ এগুলোর মধ্যে একটা raw vitality, simplicity এবং freshness-এর অস্তিত্ব পাই। আধুনিক ছবির অনেক ক্ষেত্রেই
এক ধরনের feminine
softness-এর মোড়ক আমাকে আকর্ষণ করে না। আধুনিক চিত্রকলায় painting reality বলে একটা কথা আছে। এ সম্বন্ধে সচেতনতা শিল্পীর পক্ষে যতটা জরুরি বিন্যাসগত দিক থেকে গল্প আশ্রিত হওয়া ততটা জরুরি নয় বলে মনে হয়।
এখানে শিল্পী রবীন মণ্ডল যে-কথা বলছেন, সেটা আধুনিকতাবাদ বা মডার্নিজমের একটা লক্ষণ। মডার্নিজম আখ্যান, বর্ণনা, আবেগময়তা – এ সমসত্ম পরিহার করে ছবিতে রূপ বা ফর্মের স্বরাটত্বকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। রূপের সেই সংহতিতে পৌঁছনোর জন্য রবীন মণ্ডল ‘প্রিমিটিভ’কে তাঁর প্রকাশের ভিত্তি করে নিয়েছিলেন।
ষাটের দশকের চিত্রকলায় তাঁর ছবির অবস্থান বুঝতে গেলে আধুনিক চিত্রধারায় ‘প্রিমিটিভিজমে’র গুরুত্ব ও তাৎপর্য একটু অনুধাবন করতে হয়। প্রিমিটিভিজমকে অনেকে নাইভ (Naive) আর্টের সমগোত্রীয় বলে বিবেচনা করেন। কোনো কোনো শিল্পকলার অভিধানেও এটা দেখা যায়। এ-ধারণা একেবারেই ঠিক নয়। ‘নাইভ’ বলতে যদি আমরা দক্ষতাহীন সারল্য বা ‘সানডে পেইন্টার্স’দের কাজ বুঝি, তাহলে এর সঙ্গে ‘প্রিমিটিভিজমে’র কোনোই সম্পর্ক নেই। ‘প্রিমিটিভিজমে’ রূপের সারল্য থাকতে পারে, স্বাভাবিকতাবাদী অনুকরণকে পরিহারের প্রবণতা থাকতে পারে; কিন্তু আধুনিকতাবাদী রূপায়ণে প্রিমিটিভিজমের যে ব্যবহার তা দক্ষতাহীন শিশুসুলভ রূপায়ণ-প্রয়াস নয়। প্রিমিটিভিজমের সঙ্গে শিশুদের অংকনের আপাত-যুক্তির পরিমণ্ডল ভেঙে দেওয়ার একটা সম্পর্ক আছে ঠিকই, কিন্তু প্রিমিটিভিজম ও শিশুচিত্র এক জিনিস নয়। প্রিমিটিভিজমের উদ্ভব ঘটেছিল মানবচৈতন্য বিকাশের আদিলগ্নে। আদিম মানুষ তখন প্রকৃতির প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে নিজের অস্তিত্বকে নিশ্চিত করতে জাদুক্রিয়া-সম্পৃক্ত যে-রূপ সৃষ্টির আশ্রয় নিত, সেখান থেকেই ‘প্রিমিটিভিজমে’র উদ্ভব। তারপর সভ্যতা যুগ যুগ ধরে নানাভাবে বিবর্তিত হয়েছে। সভ্য মানুষ রূপকে অনেক পরিশীলিত করেছে। প্রিমিটিভিজম তখন একটা স্বতন্ত্র শিল্পধারা হিসেবে আদিম বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিজস্ব নিয়মে অনুশীলিত ও প্রবাহিত হয়েছে। এ থেকে আবার কৃষিজীবী মানুষের মধ্যে সুস্মিত ছন্দের বিন্যাসে লৌকিকের উদ্ভব ঘটেছে।
পাশ্চাত্যে আধুনিকতা যখন স্বাভাবিকতাবাদী রূপায়ণের চূড়ান্ত পর্যায়ে গেছে, যার পর আর কোনো পথ নেই, অন্যদিকে মানবিক মূল্যবোধ যখন চূড়ান্ত বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে, তখনই সেই বিপন্ন বিশ্বকে রূপ দিতে প্রয়োজন হলো নতুন রূপচেতনার। আধুনিকতা থেকে আধুনিকতাবাদে উত্তরণের একটি পর্যায়ে পাশ্চাত্যের শিল্পীকে তাই আদিমতার শরণাপন্ন হতে হলো। ১৯০৫ সালে জার্মানিতে শুরু হয়েছিল ‘এক্সপ্রেশনিজম’, আর ১৯০৭-এ ফ্রান্সে ‘কিউবিজম’। এই দুটি আঙ্গিক গড়ে উঠেছিল ‘প্রিমিটিভিজমে’র ভিত্তি থেকে। তারপর তা বহু শাখা-প্রশাখায় পলস্নবিত হয়েছে।
আমাদের দেশে আধুনিকতাবাদ এবং সেই সূত্রে ‘প্রিমিটিভিজমে’র প্রথম প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথের ছবিতে। রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রভাব কোনো কোনো শিল্পীর কাজে দেখা গেলেও তাকে আত্মস্থ করা খুব সহজ ছিল না। এরপর আমাদের দেশে ‘প্রিমিটিভিজমে’র প্রকাশ ঘটেছে একেবারে ভিন্ন পথে। রামকিঙ্কর তাঁর ভাস্কর্য ও ছবিতে অসামান্য ঋদ্ধতায় প্রয়োগ করেছেন দেশীয় আদিবাসী জীবন ও রূপরীতির নানা সারাৎসার। যামিনী রায় গেছেন লাবণ্যময় লৌকিকের দিকে। সোমনাথ হোরের ছবি ও ভাস্কর্যে আদিমতার তীব্রতা নানাভাবে আত্তীকৃত হয়েছে। ষাটের দশকের শিল্পীদের মধ্যে প্রকাশ কর্মকার, বিজন চৌধুরীর কাজের অভিব্যক্তিবাদী আবহে প্রিমিটিভের অনুরণনও থেকে যায়। কিন্তু ‘প্রিমিটিভিজম’ সম্পূর্ণভাবে আত্মস্থ করে সেই ভাষাতেই নিজেকে বিচিত্রভাবে প্রকাশ করেছেন যে শিল্পী, তিনি রবীন মণ্ডল।
এই পথে তিনি এসেছিলেন পাশ্চাত্য আধুনিকতাবাদকে আত্মস্থ করার মধ্য দিয়ে। ষাটের দশক জুড়ে চলে তাঁর অনুসন্ধানপর্ব। তখন রুয়ো ও পিকাসোর প্রভাব খুব বেশি আসত তাঁর ছবিতে। সেই প্রভাবকে রূপান্তরিত করে করে তিনি গড়ে তোলেন নিজের স্টাইল। বঞ্চিত, নির্যাতিত, অবহেলিত মানুষের ভেতরের ক্ষক্ষাভ ও যন্ত্রণাকে রূপ দেন রেখার প্রথাবিরোধী বিচিত্র বিন্যাসে। সত্তরের দশকের শুরু থেকেই তিনি নিজস্ব রূপরীতির স্থিরতায় পৌঁছান। তারপর সারাজীবন জুড়ে, মৃত্যুর আগে পর্যন্ত, একেই নানাভাবে পরিশীলিত করেন। আশির দশক পর্যন্ত তাঁর প্রকাশে ছিল এক ধরনের তীব্রতা, যার ভেতর দিয়ে তিনি যেন বিপন্ন মানুষের অসহায় আর্তনাদের দৃশ্যভাষার সন্ধান করতেন। যন্ত্রণার প্রকাশ ঘটত রেখাবিন্যাসের বিচিত্র ভঙ্গিতে। কখনো এই বিপন্ন মানুষকে তিনি ‘রাজা-রানি’র প্রতীকে রূপায়িত করতেন। কখনো একটি মানুষের মুখ, বা একটি বৃষের অবয়বের মধ্য দিয়ে তিনি উন্মোচিত করতেন যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত মানুষের অন্তরাত্মার নিবিড় ক্রন্দন। এ ব্যাপারে তাঁর সহায়ক হতো রেখার জালিকার তীব্র তমসার ভেতর থেকে নেগেটিভ স্পেস বা শূন্য পরিসরের বিন্যাসে আলো বের করে আনার পদ্ধতি। রেখার জালিকাকে এবং বর্ণের ঘন বুনোট বা টেক্সচারকে ভেঙে ভেঙে তিনি তার মধ্যে আনতেন নানা অলংকরণ, যার ভেতর পরিস্ফুট হতো কখনো দেশীয় তন্ত্রশিল্পের নানা প্রতীক, কখনোবা লৌকিকের লাবণ্যপ্রভা। এভাবে পাশ্চাত্য-উদ্ভূত আদিমতাকে তিনি দেশীয় ঐতিহ্যগত রূপারোপের দিকে নিয়ে এসেছেন। এটাই ষাটের দশকের আধুনিকতায় ঐতিহ্যগত আত্মপরিচয়ের উন্মীলনে রবীন ম-লের শ্রেষ্ঠ অবদান।
একবিংশ শতকে পৌঁছে তাঁর রূপারোপের তীব্রতা অনেকটা প্রশমিত হয়ে ভীষণেরই এক প্রসন্ন রূপ উন্মীলিত হয়েছে। তাঁর নিজস্ব রেখা-বিন্যাস ও বর্ণপ্রয়োগ পদ্ধতিতে তিনি যখন আঁকতেন কোনো স্টিল-লাইফ, পশুপাখি বা নর-নারীর প্রতিমাকল্প তখন তা পরিবৃত আঁধারকেই আলোতে রূপান্তরিত করত। সৌন্দর্যের এই দ্বন্দ্বাকীর্ণ রূপের ভেতর দিয়ে তিনি এই সময়ের নিহিত স্পন্দনকে পরিস্ফুট করতেন, যে-সময় অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা অতিক্রম করে আত্মস্বরূপের সন্ধান পেয়েছে।
১৯৬৪ সালে কলকাতায় তৈরি হয়েছিল যে ‘ক্যালকাটা পেইন্টার্স’ দল, রবীন মণ্ডল ছিলেন তাঁর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সারাজীবন তিনি এই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ষাটের দশকের শিল্প-আন্দোলনকে অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাঁরা অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে নিয়ে গেছেন তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম প্রধান। অনেক ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন কেটেছে। আট-ন বছর বয়সে পায়ের এক অসুখে চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়েছিলেন প্রায় চার-পাঁচ বছর। পড়াশোনা করতে পারেননি। সেই বন্দিদশাতেই তাঁর চিত্রচর্চার সূচনা। দারিদ্রে্যর জন্য আর্ট কলেজের শিক্ষা শেষ করতে পারেননি। পরে চাকরি করতে করতে রাতের ক্লাসে পাঠ নিয়ে ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজ থেকে ডিপেস্নামা পেয়েছেন। তবে পারিবারিক উত্তরাধিকারের মধ্য দিয়ে সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। সেই সংগীতচেতনাকে তিনি চিত্রচেতনায় রূপান্তরিত করেছেন। সুর কেমন করে দৃশ্যতার অন্তর্নিহিত করুণাকে ভিন্ন মাত্রায় ব্যঞ্জিত করে রবীন ম-লের ছবি এর অসামান্য দৃষ্টান্ত। এ সমসত্ম কারণেই ষাটের দশকের চিত্রকলায় তাঁর অবস্থান অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: