রশীদ করীমের চলে যাওয়ার দিন

লেখক:

হামিদ কায়সার

তারা দুজনই তখন গৃহ-অভ্যন্তরে একরকম বানপ্রস্থীয় জীবন বেছে নিয়েছেন – একজন স্বেচ্ছায়, আরেকজন প্রকৃতির হেয়ালিতে; রশীদ করীম পক্ষাঘাতগ্রস্তে আক্রান্ত হওয়ার পর হারিয়েছেন লেখার ক্ষমতা আর মাহমুদুল হক লেখালেখি ছেড়ে স্পর্শ করেছেন অন্য এক অলৌকিকতাকে। কাকতালীয়ভাবে আমি দুজনের সঙ্গেই তাঁদের জীবনের এ-কালপর্বে জড়িয়ে পড়েছিলাম, পৌঁছেছিলাম তাঁদের নৈকট্যে এবং লাভ করেছিলাম গভীর সান্নিধ্য। আরো কাকতালীয় যে, এ দুজনেরই মহাপ্রস্থানের সংবাদটাও আমি শুনেছি প্রায় একই সময়ে, পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্রতম ক্ষণ, নির্জনতার সবচেয়ে বিশুদ্ধতম মুহূর্ত, যখন দিনের আলো ফোটার আয়োজন হয় আর রাতের অন্ধকার বিদায় নেয় গা গুটিয়ে – সেই ধলপ্রহরে। দুই কি আড়াই বছর আগে প্রাবন্ধিক, সংস্কৃতিকর্মী মফিদুল হক মোবাইল ফোনে জানিয়েছিলেন, বটু ভাইয়ের চলে যাওয়ার খবরটা, আর এবার নাবিলা মুরশেদ, রশীদ করীমের একমাত্র সন্তান, সেই মোবাইল ফোনেই রাতের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে বিষণ্ণ স্বরে জানালেন, ‘বাবা আর নেই!’

বাবারা থাকেন না। বাবারা চলে যান এটাই নিয়ম। তবু সান্ত্বনা যে, কোনো কোনো বাবা চলে যাওয়ার আগে বলে যান, জানিয়ে যান চিরবিদায়ের সংবাদটা, হয়তো সরাসরি, না-হয় কোনো ইঙ্গিতময়তায়। যেমন বলে গিয়েছেন রশীদ করীম তাঁর কন্যা নাবিলা মুরশেদকে, নইলে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া থেকে তিনি কেন বাবার মহাপ্রস্থানের ঠিক আগের দিনই এসে হাজির হবেন বাংলাদেশে; ঢাকায় ফিরেই বাবার সঙ্গে দেখা করবেন ইব্রাহিম কার্ডিয়াক সেন্টারে! তাদের মধ্যে বেশ কথোপকথনও হয়েছিল সেদিন, রশীদ করীম মেয়েকে জানিয়েছেন স্বভাবমতোই, ‘এখানে আর থাকতে ইচ্ছে করছে না। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই!’ কোন জায়গায় চলে যাওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি, নিজের বাসায় নাকি সেই অনন্তলোকে? তারপর আর একটা রাতও ঘুরল না। ধলপ্রহরেই তিনি চলে গেলেন, তার নিভৃতির স্বভাবধর্মে।

দুই

সেদিন সেই কাকভোর থেকেই ইব্রাহিম কার্ডিয়াক সেন্টারের চারতলায় ভেতরের একটি রুমে প্রাণহীন রশীদ করীম; আর বাইরের করিডোরে তার প্রিয়তমা জীবনসঙ্গিনী সেলিমা মুরশেদ, মেয়ে নাবিলা মুরশেদ, ভাগ্নে অধ্যাপক এস এম হারুনসহ আরো চার-পাঁচজন আত্মীয়স্বজন শুভাকাঙ্ক্ষী বসে আছেন, অনেকটাই হতবিহবল। তাঁদের মধ্যে সাহিত্য অঙ্গনের কোনো মানুষ নেই, শিল্পাঙ্গনেরও কেউ নেই। প্রথমে স্বাভাবিকই মনে হলো ব্যাপারটা। কেউ হয়তো এখনো সংবাদ পাননি, কেউ হয়তো পেয়েছেন, ভাবছেন আরেকটু আলো ফুটুক, তারপর না-হয় যাওয়া যাবে। কিন্তু আটটা-সাড়ে আটটার সময়ও যখন কারো দেখা পাওয়া গেল না, তখন ব্যাপারটা দৃষ্টিকটুর মতোই বুকের ভেতর খচখচ করতে লাগল। এর মধ্যে তো সংবাদটা অনেককেই জানিয়ে দেওয়া গেছে। মোবাইলে অনেকের নম্বরই ছিল। অনেকের সঙ্গে সঙ্গে বেশ আন্তরিকতার পরিচয়ও রেখেছেন। কেউ কর্মসূত্রে ঢাকার বাইরে থাকা বাংলা একাডেমীর ডিজিকে অবহিত করেছেন, কেউ চ্যানেলে, পত্রিকা অফিসে, শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে খবরটা পৌঁছে দিয়েছেন দ্রুতই।

রশীদ করীমের একমাত্র সন্তান নাবিলা মুরশেদের অবশ্য এসব বিষয় নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। তাঁর একটাই টেনশন, বাবার বিদায়টা ঠিক সম্মানজনকভাবে হবে তো? তাঁর একান্ত ইচ্ছে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে বাবার কবরটা হোক। মোবাইল ফোনে ফোনেই সে-দায়িত্বটা নিয়ে নিলেন মফিদুল হক।

তিন

পৌনে নটার সময় রশীদ করীমকে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক সেন্টার থেকে নিয়ে যাওয়া হলো ধানমন্ডি-৬ নম্বর রোডের তাঁর বাসভবনে। ড্রয়িংরুমে তাঁকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। আমি তখন একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রায় লিখে ফেলেছি রশীদ করীমের মৃত্যুসংবাদ নিয়ে, মিডিয়ার প্রতিনিধিদের দেব বলে। তখনই হঠাৎ নাবিলা মুরশেদ এলেন, হাতে প্লেট, তাতে তিন-চারটে ডালপুরি। আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আবেগ সামলাতে সামলাতে বললেন, ‘এই যে বাবার প্রিয় ডালপুরি। আপনাকে খাওয়াতেন। আজ সেই বাবাই নেই। আপনি খান। এখনো তো নাস্তা করেননি।’

নাবিলা মুরশেদ চলে গেলেন, বোধকরি কান্না লুকাতেই। আমি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লেখা বাদ দিয়ে স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলাম ডালপুরির দিকে। আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠল কত কথা, কত স্মৃতি। রশীদ করীমের বাসায় প্রথম আসা, প্রথম দেখা, তাঁর আচরণে আবিষ্ট হওয়া, তারপর নতুন করে তাঁকে খুঁজে খুঁজে পড়া, তারপর ক্রমাগত কেবল স্মৃতির পর স্মৃতির নতুন নতুন সব – কলরব, আমি আজো স্পষ্ট যা মনে করতে পারি। 

আমি তখন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় গল্প লিখছি আর সাহিত্য চর্চার নানা গ্লানিতে জর্জরিত হচ্ছি। অনেক ধাক্কাগুঁতো খাওয়ার পর কোনোভাবে ১৯৯৯ সালে আমার ছোটভাই আনিসুর রহমান দীপু আর অগ্রজ কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের চেষ্টায় আমার প্রথম ছোটগল্পের বই কলকব্জার মানুষ বেরিয়েছে। সে-বইটারই প্রকাশ-পরবর্তী সময়ে একদিন দৈনিক সংবাদের তৎকালীন সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাত ভাই বললেন, ‘রশীদ করীমের সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে? তাঁর বাসায় গিয়েছেন কখনো?’ আমি না জানাতেই আবুল হাসনাত আর বিশেষ কিছু বলতে চাইলেন না। তখন আমি উল্টো তাঁর কাছে আগ্রহ দেখালাম, রশীদ করীমের সঙ্গে পরিচিত হতে চাই, তাঁর সঙ্গে দেখা হলে আমারও ভালো লাগবে। কথাটা তাঁকে জোরের সঙ্গেই জানালাম। জানালাম এ-কারণে যে, রশীদ করীম আমার শৈশব থেকেই চেনা।

অতি শৈশবেই আমি একদিন আমার নানাবাড়ির ছোটখাটো লাইব্রেরিতে আবিষ্কার করে ফেলি রশীদ করীমের উত্তম পুরুষ। মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদসিন্ধু, নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের আনোয়ারা, মনোয়ারা, আরেকজন কী যেন এক লেখক – শুধু বইটার নামই মনে আছে সালেহা, আকবর হোসেনের অবাঞ্ছিত, শরৎচন্দ্রের উপন্যাসগুলোর সঙ্গে রশীদ করীমের উত্তম পুরষও ছিল খুব দাপটে। বুদ হয়ে পড়া শুরু করেছি আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই। কলকাতার এক মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের আখ্যান। শাকের নামের এক দরিদ্র ছেলের নানা লাঞ্ছনা-বঞ্চনায় বড় হওয়া, প্রেমহীন তিক্ত জীবন, সহজেই মন ছুঁয়েছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, ভাষাটা সাবলীল না হলে এক কিশোরের পক্ষে সে-বই এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলাটা কোনোভাবেই সম্ভবপর হতো না। তখন অবশ্য বোঝার মতো মনন ছিল না যে, নজিবর রহমান-আকবর হোসেনদের চেয়ে তিনি কোন দিক থেকে স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জ্বল, কীভাবে বাংলাদেশের উপন্যাসে আধুনিক নতুন মাত্রার দ্বারোদ্ঘাটন করেছেন! সেসব বুঝেছি আরো অনেক পরে। বুঝেছি, উত্তম পুরুষ শুধু দেশবিভাগ-উত্তর কলকাতার মুসলিম জীবনের বিশ্বস্ত চিত্রায়ণই নয়, দেশভাগের ওপর বাংলা সাহিত্যের এক অসামান্য কীর্তি। একই সঙ্গে ব্যক্তির অন্তঃনৈঃসঙ্গ্যকে আধুনিক মাত্রায় নতুন যুগের দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।

যাহোক, শৈশবের সে-মুগ্ধতা থেকেই হাসনাত ভাইয়ের কাছে রশীদ করীমের বাসায় যেতে আগ্রহ দেখালাম। তিনি তখন কলকাতা থেকে অরুণ সেন-সম্পাদিত বাংলাদেশের উপন্যাসের একটি সংকলন এবং রশীদ করীমকে নিয়ে তাঁর লেখার একটা কাটিং আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এসব তাঁর কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

ঠিকানা নিয়ে সোজা ছোটলাম ধানমন্ডিতে রশীদ করীমের বাসার উদ্দেশে। তিনি তখন গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের ঠিক উল্টোদিকের একতলা বাসাটায় থাকতেন। তখন পড়ন্ত বিকেল। সে-বাড়িটায় বিকেল যেন আরো গাঢ় হয়ে উঠেছে। ড্রয়িংরুমে বসে আমি শেলফের বইগুলো দেখছি। তাঁর উপন্যাসগুলো থরে থরে সাজানো …। সেই উত্তম পুরুষ তো রয়েছেই, আরো আছে আমার যত গ্লানি, প্রেম একটি লাল গোলাপ, সাধারণ লোকের কাহিনী, মায়ের কাছে যাচ্ছি, বড়ই নিঃসঙ্গ … ইত্যাদি ইত্যাদি।

খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না আমাকে। তিনি একটা ক্র্যাচে ভর দিয়ে একা একাই হেঁটে এলেন। দীর্ঘ সুপুরুষ একজন মানুষ। কে বলবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত, শয্যাশায়ী হয়ে আছেন বিছানায়। ভাঙা ভাঙা গলায় সালাম গ্রহণ করে বললেন, ‘বসো’।

অরুণ সেনের বইটি পেয়ে খুব খুশি হলেন। তাঁর উপন্যাস রয়েছে দেখে আত্মতৃপ্তি ছড়িয়ে পড়ল চেহারাজুড়ে। বারবার আমাকে দিয়ে পড়িয়ে নিচ্ছিলেন অরুণ সেনের লেখা ছোট্ট চিঠিটা। সেদিনই তাঁকে দেখে মনে হয়েছিল স্বীকৃতির চেয়ে বড় পুরস্কার আর লেখকের কাছে কিছু নেই। বইটিকে কোলের ওপর থেকে নামাচ্ছিলেনই না।

তারপর যখন সন্ধে ঘনিয়ে এলো, জ্বলে উঠল আলো, তিনি জানতে চাইলেন, ‘তুমি কী খেতে ভালোবাসো’? আমি কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। শেষে বলেছিলাম, ‘ঝাল জিনিসই ভালো লাগে বেশি’। ‘ডালপুরি খেতে ভালোবাসো’? আমি হ্যাঁ বলতেই তিনি দরাজদিল কণ্ঠে বুয়াকে ডেকে এনে ডালপুরি ভেজে নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। একটা-দুটা খেয়ে পার পাচ্ছিলাম না। অন্তত চারটা তো খেতে হয়েছিল মনে আছে। তিনি আমার সে-খাওয়াটা খুব মন দিয়ে দেখেছিলেন। তারপর যতদিন গিয়েছি তার বাসায়, যতবার, ডালপুরি না-খাইয়ে কোনোদিনই ছাড়েননি।

সেদিন চলে আসার সময়, ভয়ে ভয়েই থমকে দাঁড়িয়ে তার হাতে কলকব্জার মানুষ বইটির একটা কপি তুলে দিয়েছিলাম, উদ্দেশ্য ছিল বইটা তাঁর হাতে ধরিয়ে দিয়েই পালিয়ে বাঁচব। কিন্তু তিনি রীতিমতো জেরা করতে লাগলেন, ‘তোমার লেখা? বইটা আগে দিলে না কেন?’ আমি কোনোমতে এটা-সেটা বুঝিয়ে চলে এসেছিলাম।

এর প্রায় বিশ-পঁচিশ দিন পরেরই হবে ঘটনাটা। হাসনাত ভাই আমার অফিসে ফোন করে জানালেন, ‘রশীদ করীম আপনাকে খোঁজছেন। বারবার আমাকে টেলিফোন করছেন। তার সঙ্গে দেখা করুন।’

সেদিন বিকেলেই আবারো ছুটে গেলাম তার বাসায়। কত বড় বিস্ময় যে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল, কল্পনা পর্যন্ত করিনি। কীভাবে কল্পনা করব, রশীদ করীম যে লেখালেখিই বাদ দিয়েছেন। লিখতে গেলে তার হাত কাঁপে, মস্তিষ্ক বিদ্রোহ করে ওঠে। সেই মানুষটিই কিনা আমার কলকব্জার মানুষ নিয়ে ছোটখাটো একটা রিভিউ লিখে ফেলেছেন। তাও আবার আমার সেই কলকব্জার মানুষ বইটার পাতায় পাতায়। শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায় তার পা ছুঁয়ে সালাম করেছিলাম।

পরদিনই প্রায় উড়ে উড়ে ছুটে গেলাম দৈনিক সংবাদে। হাসনাত ভাই আমার চেয়েও বেশি অবাক, ‘ওনি না অসুস্থ’! ছাপা হলো এক নতুন লেখকের কথা। আমি আর কিছু লিখব না বলে বই লিখে নোটিশ দিয়েছি। কিন্তু হামিদ কায়সারের কলকব্জার মানুষ বইটা হাতে এলো। গল্পগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে আমার উৎসাহ বেড়ে গেল। চোখ, কান, হাত ও মস্তিষ্কের বিদ্রোহ সত্ত্বেও ইচ্ছে করল এ-বইটা সম্পর্কে দুকলম কিছু লিখি।

আমি এলোপাতাড়ি আলোচনা করে যাব। আগের কথা              পরে এবং পরের কথা আগে এবং যে-কথা আগেই বলে ফেলেছি, সে-কথাই পুনর্বার বলব – তাই হবে এ-লেখার বৈশিষ্ট্য। যেমন কথোপকথনে হয়। যেখানে কাজের কথার চেয়ে অসংলগ্ন কথা বেশি হয়। তার মধ্যে কাজের কথা হয়।

সর্বপ্রথম আমি হামিদ কায়সারের গদ্য সম্পর্কে কিছু বলব। তাঁর গদ্য আমার খুব ভালো লেগেছে। এবং তা চিরাচরিত গদ্য নয়। পুরনোকে ভেঙে নতুন গদ্য গড়েছেন। এই হচ্ছে বাংলাদেশের গদ্য।

বিষয়বস্ত্তর দিক থেকেও তিনি আনকোরা। যা চিনতাম না, তা চিনিয়ে দিয়েছেন। আমার দৃষ্টিশক্তি অসমর্থ না হলে, একটি বইয়ের ওপর অভিনিবিষ্ট না হয়ে, হামিদ কায়সারের অগ্রগতির দিকে তাকিয়ে থাকতাম…’ এভাবেই লিখে গেছেন আমার সম্পর্কে আরো বেশ কিছু লাইন। আমি কেমন লজ্জাহীনের মতো আজ সেসব প্রকাশ করছি। কী করব, এমন প্রাপ্তির কথা যে আড়াল করেও রাখতে পারছি না। কীভাবে আড়াল করি যে, এটাই রশীদ করীমের সর্বশেষ লেখা!

সেই দুর্লভ প্রাপ্তির পর স্বভাবতই রশীদ করীমের প্রতি আমার আন্তরিকতা কী মুগ্ধতা স্বভাবতই আরো বেড়ে গেল। আমি তাঁর বাকি বইগুলোও খুঁজে কিনে পড়ে ফেললাম। যতই পড়ি সে-মুগ্ধতার আবেশ কেবল বাড়তেই থাকে। প্রচলিত কোনো ছকে বাঁধা নয় তাঁর লেখা এবং প্রত্যেকটি লেখাই স্বতন্ত্র, আলাদা। বিষয়বস্ত্তর দিক থেকে যেমন প্রতিটি লেখারই চিরকালীন আবেদন আছে, তেমনি ভাষাভঙ্গিও সহজ-সরল, আধুনিক এবং মেদহীন।

দ্বিতীয় উপন্যাস প্রসন্ন পাষাণের কথাই ধরি। এতে হয়তো উত্তম পুরুষের মতো বহুবিস্তার ব্যঞ্জনা নেই, সামাজিক চিত্রণ নেই, কিন্তু আছে চরিত্র-বিশ্লেষণের অসাধারণ পটুত্ব। যদি বলা হয়ে থাকে একটি চরিত্রকে আমূলভাবে বিশ্লেষণ এবং তাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় এবং সে-চরিত্র অন্যকেও স্পর্শ করে, তখন উপন্যাস সার্থক হয়ে ওঠে – সে-অর্থে বিচার করলে প্রসন্ন পাষাণ অবশ্যই একটি সার্থক উপন্যাস। তিশনা, কামিল এবং আলিম নামের তিন যুবক-যুবতী এবং কামিলের মা ও তিশনার ছোট চাচার জটিল মনস্তত্ত্ব গভীর সংবেদনায় বিশ্লেষণ হয়েছে এ-উপন্যাসে। কামিলের আম্মা অর্থাৎ তিশনার ছোট ফুপু ধর্মপরায়ণ এক সুশীলা নারী, যে তার সন্তানের জন্য যৌবনকে বিসর্জন দিয়েছে, অথচ উল্টো শিকার হয়েছে অপবাদের – তবু, সে-অপবাদ মাথায় নিয়েও শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে প্রেমময়ী এক নারী – এমন জটিল দ্বন্দ্বযুদ্ধ অথচ মহৎ নারীচরিত্র আধুনিক মুসলমান সাহিত্যিকদের রচনায় নেই বললেই চলে।

আমার যত গ্লানিতে আমি পাই একজন ইতিহাস-সচেতন রশীদ করীমকে। এখানেও নায়ক কথা বলেছেন উত্তম পুরুষে – তিনি সমাজের একজন উঁচু স্তরের মানুষ, একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা। আমরা ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এ-মানুষটিকে আবিষ্কার করি ভীষণ দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ অবস্থায়। যেন কাফকার দ্য ট্রায়াল উপন্যাসের মতোই এক ঘোর আচ্ছন্ন জগতে স্বেচ্ছাবন্দি। অর্থাৎ এরফান চৌধুরী ঘুরপাক খাচ্ছেন এক অদৃশ্য কুহকে। সেইসঙ্গে পাঠককেও নিয়ে যাচ্ছেন সেই ঘোর লাগা জগতে। তখনকার বাস্তবতাকে আশ্চর্য এক প্রতীকী মাত্রায় উন্মোচন করেছেন রশীদ করীম। একদিকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত আয়োজন, অন্যদিকে পাকিস্তানি শাসকদের নানা রকম কূটজাল – দেশজুড়েই সংশয় আতঙ্ক-সন্দেহ। আর এর সবকিছু থেকেই নিজেকে একরকম বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলেন এরফান চৌধুরী, একজন আউটসাইডার। সে বিপুল গণজাগরণের সঙ্গে নেই, আবার এই আন্দোলনের বিরোধীও নয়। নিজের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নিয়েই সে ব্যস্ত – মদ্যপানের সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন নারীর প্রতি তার লোভ, তার হৃদয়ে কামনার অতৃপ্ত শিখা। আয়েশা এবং কোহিনূরের প্রতি সেই কামনারই তীব্র আকর্ষণ। অবশ্য আয়েশা এবং কোহিনূর বেগমের সংস্পর্শে এসে পরস্পরকে গভীর উপলব্ধির পর, কামনার আগুন অনেকটাই দপ করে নিভে যায়, ওদের প্রতি জেগে ওঠে হৃদয়ের টান। তাই আয়েশার জীবনের অলিখিত অধ্যায় উন্মোচিত হওয়ার পর এরফান চৌধুরীর মধ্যে আমরা লক্ষ করি খানিকটা অস্বাভাবিকত্ব; সে মনোবিকলনের শিকার হয়। আয়েশার অধঃপতিত জীবন যেমন তার মানসিক জগৎকে তোলপাড় করে দেয়, তেমনি কোহিনূর বেগমের সান্নিধ্যে এসেও তীব্র এক হলাহলের মধ্যে পড়ে যায় সে – কোহিনূর বেগমের স্বামী তারই অধঃস্তন কর্মকর্তা এহসান একজন পুরুষত্বহীন মানুষ। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও এখানে জটিল, সংকটাপন্ন। বস্ত্তত সেই ’৬৯ সালটিই যেন গোটা এক প্রহেলিকা – কাফকার দ্য ট্রায়ালের ঘোর আচ্ছন্ন জগৎ। নারী, মদ, নিজের ব্যক্তিজীবন নিয়ে ঘোরে থাকা এরফান চৌধুরীর মাঝে মাঝে স্বদেশপ্রেম জাগরূক হয় প্রবাসী আবেদ, আববাস নামক তরুণ দেশপ্রেমিক শিক্ষক, গণঅভ্যুত্থানের মিছিলের এক যুবক প্রমুখের সান্নিধ্যে এসে। এরফান চৌধুরীর ক্লীবসত্তা থেকে ক্রমে ক্রমে বেরিয়ে আসতে থাকে একজন দেশপ্রেমিক জান্তব মানুষ। কিন্তু উত্তীর্ণতা নেই, তার মনে দ্বন্দ্ব প্রবল হয়ে ওঠে, নিজের ভীরু পৌরুষহীন সত্তাকে অতিক্রম করে সে বারবারই হতে চায় মিছিলের মানুষ। ব্যক্তিসত্তাকে এড়িয়ে হতে চায় সমাজনির্ভর। তা হতে পারে না বলেই তার যত গ্লানি, যত যন্ত্রণা।

লেখক রশীদ করীম আশ্চর্য কুশলতার সঙ্গে ’৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যায়ে সমাজের রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা ভয়-বিবমিষা সংকট উত্তেজনাকে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন এরফান চৌধুরী চরিত্রের ভেতর ও বাহিরের সত্তাকে খুঁড়ে খুঁড়ে নানা কৌণিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে। এরফান চৌধুরী মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির সেই প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্র, যিনি বা যারা প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি, কিন্তু মনেপ্রাণে দেশের স্বাধীনতা চেয়েছেন। এ-শ্রেণিটি প্রতিটি আন্দোলন এবং সামাজিক বিপ্লবেই দ্বিধান্বিত অথবা নিষ্ক্রিয় থাকে। সেই ভাষা-আন্দোলন থেকে নববইয়ের গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপট এবং পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করলেই এ সত্য অতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এদেশের প্রতিটি আন্দোলন এবং সামাজিক বিপ্লবে অংশ নিয়ে থাকে মূলত ছাত্র, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী এবং মধ্যবিত্ত একটি শ্রেণির রাজনৈতিক কর্মী।

আমার যত গ্লানি উপন্যাসের এরফান চৌধুরীর গ্লানি এবং  মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আসলে উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তঃসারহীন মানসিক সত্তারই প্রতিরূপ। কথাটি রূঢ় শোনালেও চরম বাস্তবতা এই যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আবেগটি শ্রেণিভেদে বিভিন্ন। ধণিক, উচ্চবিত্ত, শ্রেণি কিংবা উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে স্বাধীনতার তাৎপর্য অর্থহীন; সামাজিক পটপরিবর্তনে তারা খানিকটা ভীত এবং সংশয়াচ্ছন্নই ছিল। আমার যত গ্লানির কাহিনির অভ্যন্তর থেকে            এ-সত্যটি আপনা-আপনিই পরিস্ফুট হয়েছে। সে-কারণেই এ-উপন্যাসটির একটি নির্দিষ্ট মূল্য রয়েছে। শিল্পমানগত দিক থেকে বিচার করলেও আমার যত গ্লানি বাংলাদেশের উপন্যাস সাহিত্যে একটি অভিনব সংযোজন। রশীদ করীম নির্মেদ, স্বচ্ছ এবং অভিজাত ভাষার বুননে কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন উপন্যাসের প্রচলিত রীতিপন্থাকে রীতিমতো ভেঙেচুরে। কিন্তু তা এতটাই শৃঙ্খলিত বুনন এবং পরিশীলিত বিশ্লেষণে যে, কোথাও উপন্যাসের ছন্দপতন ঘটেনি – কি কাহিনি-বিশ্লেষণ, কি চরিত্র-পরিস্ফুটনে।

আমার যত গ্লানি আধুনিক তো আধুনিক, শিল্পমানগত দিক থেকে সার্থক স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং অভিনব। লেখক তাঁর স্বভাবসুলভ পারঙ্গমতায় কখনো উপন্যাসের কাহিনিকে হঠাৎ থামিয়ে দিয়ে পাঠকের সঙ্গে মেতে উঠেছেন সরস রসিকতায়, পাঠকের মনোজগৎকে উপন্যাসের চরিত্র ও ঘটনার সঙ্গে সঞ্জাত করে আবার খানিকটা এগিয়েছেন। পাঠকের সঙ্গে তাঁর এ-খেলার মেতে ওঠাটা কখনই উপন্যাসের অঙ্গহানি ঘটায়নি, বরং পাঠকের কৌতূহল, পাঠকের আগ্রহকে তাতিয়ে দিয়েছে। পাঠকও চরিত্রের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়তে তাড়িত হয়েছেন। এখানে কাহিনির  সে-ক্ষণটির কথাই উদাহরণস্বরূপ স্মরণ করা যায়। এরফান চৌধুরী অফিস ফেলে চলে এসেছে কোহিনূরের কাছে। কোহিনূর অবাক হয় না, তার নারীমনটি ততদিনে এরফান চৌধুরীকে চিনে নিয়েছে। স্বামীর সঙ্গে ওর সম্পর্কও যে তখন জটিল, দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ। অনেকটা খেলাবশতই সে এরফান চৌধুরীর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায় যে। পরদিন সন্ধ্যায় শীতলক্ষ্যায় এরফান চৌধুরীর সঙ্গে নৌকায় ঘুরবে। কথা হয়, সন্ধে ৭টায় একে অপরের জন্যে নদীর ঘাটে অপেক্ষা করব। পাঠকরা যখন এই দুই বিপরীত জগতের  নর-নারীর অভিসার পর্বকে চাক্ষুষ করার জন্য চূড়ান্তভাবে প্রস্ত্তত, তখনই লেখক এই উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে পাঠকের সঙ্গে মেতে ওঠেন এক অভূতপূর্ব খেলায়। এই এখনই কোহিনূর বেগম এসে মেতে ওঠবে এরফান চৌধুরীর সঙ্গে শীতলক্ষ্যায় নৌকাভিসারে… এরকম টোপ ফেলে, পাঠকের উত্তেজনাকে মন্থন করে করে তিনি অনেক দূরই এগিয়ে যান; কিন্তু সেই অভিসারপর্ব আর আসে না। পাঠকও কাফকার দ্য ট্রায়াল উপন্যাসের সেই বিখ্যাত চরিত্রকে অফের মতো ঘোরাচ্ছন্ন জগতে ঘুরপাক খান – আশ্চর্য এক পারঙ্গমতায় রশীদ করীম এভাবেই পাঠককে কাহিনির কুহকে বেঁধে ফেলেন। এরফান চৌধুরীর মনে জেগে ওঠা স্বদেশপ্রেমের আলোয় পাঠককে স্নাত করে শেষ হয় আমার যত গ্লানি।

প্রেম একটি লাল গোলাপ সম্ভবত উত্তম পুরুষের চেয়েও বহুল পঠিত উপন্যাস। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের বিকাশমান ঢাকা শহরের এলিট শ্রেণিকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে এ-উপন্যাসের কাহিনি। লক্ষণীয় যে, যে-আধুনিকতার বীজ বপন করে গেছেন রশীদ করীম আজ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আগে, তার রেশ এখনো সমান বজায় আছে ঢাকাসহ দেশের করপোরেট ওয়ার্ল্ডের কালচারে। চিন্তার দিক থেকে তিনি কতটা অগ্রসর ছিলেন, এ-উপন্যাস তারই সাক্ষ্য দেয়। স্বার্থ এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার লড়াইয়ে ব্যক্তির সম্পর্কে শুরু হয়ে গেছে নতুন দ্বন্দ্ব নায়ক উমর এবং প্রতিনায়ক সুফি একই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের যথাক্রমে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ এবং জেনারেল ম্যানেজার। উমর ম্যানেজিং ডিরেক্টরের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র তাই জেনারেল ম্যানেজার ওকে মোটেই সুনজরে দেখে না। উমর আর সুফির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আরেক নারী – রানু। উমরের স্ত্রী। তার প্রতি সুফির লালসা কাহিনিকে জটিল আবর্তে নিয়ে যায়। বুর্জোয়ার অবক্ষয়িত দিকটি রশীদ করীম এ তিনটি চরিত্রের নিপুণ বিশ্লেষণে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

এভাবে রশীদ করীমের প্রতিটি উপন্যাসই – মায়ের কাছে যাচ্ছি, এ কালের রূপকথা, বড়ই নিঃসঙ্গ, শ্যামা, পদতলে রক্ত, চিনি না এবং লাঞ্চ বক্স আলাদা মাত্রায় উজ্জ্বল এবং বিশিষ্ট।

চার

বাংলা সাহিত্যের সেই মহীরুহই শুয়ে আছেন বেডরুম, কফিনে, আর আমি তার পাশে বসে আছি, টেবিলে ডালপুরি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। খেতে পারছি না। খাওয়ার রুচি হচ্ছে না। সামনে শুয়ে আছেন রশীদ করীম। জীবিত থাকলে এতক্ষণে বেশ কয়েকবারই ধমক দিয়ে ফেলতেন, খাচ্ছ না কেন? আমি যেন তাকে খুশি করতেই একটা তুলে নিলাম হাতে, অসংকোচেই মুখে দিলাম।

এর মধ্যেই এসে গেছেন সময় পত্রিকার টিভির রিপোর্টার এবং ক্যামেরাম্যান, আত্মীয়স্বজন। কিন্তু যে-সাহিত্যজগতের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন রশীদ করীম, সে-জগতের মানুষগুলোর কোনো দেখা নেই, হাতে গোনার মতো করে ধীরে ধীরে এলেন তাঁর প্রিয়বন্ধু জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ইতিহাসবিদ সালাউদ্দিন আহমেদ, লেখিকা সুস্মিতা ইসলাম – যিনি রশীদ করীমের সেই কলকাতা জীবনের শৈশবেরই চেনা, আবুল হাসনাত, মফিদুল হক, সিরাজুল মজিদ মামুন, লেখক ইমতিয়ার শামীম।

ধানমন্ডিরই বায়তুল আমান মসজিদে জানাজা শেষে বাংলা একাডেমীর ডিজি শামসুজ্জামান খানের পরম আগ্রহে এবং আন্তরিক আহবানে রশীদ করীমের মরদেহ বিকেল ৪টায় নিয়ে যাওয়া হলো বাংলা একাডেমী চত্বরে। তিনি কুষ্টিয়ায় মীর মশাররফ হোসেনের ওপর এক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে রশীদ করীমের চলে যাওয়ার সংবাদ শুনেই তড়িঘড়ি করে ছুটে এসেছেন ঢাকায় এবং ছুটির দিনেই বাংলা একাডেমীতে আয়োজন করেছেন রশীদ করীমের দ্বিতীয় জানাজা এবং শ্রদ্ধার্ঘ্য অনুষ্ঠানের এবং দ্রুততর সময়ের মধ্যেই তিনি বাংলা একাডেমীতে আরেকটি স্মরণসভার আয়োজন করেছিলেন বিশাল পরিসরে।

পাঁচ

বাংলা একাডেমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। নাবিলা মুরশেদ তাঁর প্রতিক্রিয়া লুকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর কয়েকজন স্বজন কবরের জায়গা দেখে ঠিক সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না। তারা আশা করেছিলেন আরো একটু মর্যাদাসম্পন্ন জায়গায় আরো একটা সম্মানের সঙ্গে দাফনের ব্যবস্থা হতে পারত রশীদ করীমের। যে-মানুষটি সারাজীবন সাহিত্যের স্নিগ্ধছায়াতেই থাকতে চেয়েছেন,               সে-জগতের মানুষের প্রায় অনুপস্থিতিতেই আত্মীয়স্বজনের শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসায় মাটির বিছানায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন।