রাঙা জল, ফালি ফালি চাঁদ

লেখক:

RIVER STORIES (1)

মোবাশ্বির আলম মজুমদার

পাথর পাথর পাথর আর নদী-সমুদ্রের জল
নীল পাথর লাল হচ্ছে, লাল পাথর নীল – শক্তি চট্টোপাধ্যায়

 

কংক্রিটের সারি সারি দালানের ফাঁকে সোনালি মেঘ। একফাঁকে হেসে উঠছে একফালি কাটা চাঁদ। ভিনিতা করিম বাংলাদেশে এর আগেও এসেছেন। তাঁর স্মৃতিতে এই নগরের জটপাকানো শহরের গল্প জমে আছে। ছবিগুলো তাঁর কথা বলে। শুধু কি ঢাকা? গোটা বাংলাদেশের বড় বড় নদী ঘুরে বেড়িয়েছেন ভিনিতা করিম। এ প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘রিভার স্টোরিজ’। কাজের সংখ্যা ৩৬টি। ক্যানভাসের কাজের বাইরে আছে পোরসেলিনের তৈরি জার, কাঠের তৈরি দুরন্ত বাঘ, ফাইবার গ্লাসে করা বড় আকৃতির ডিম। এসব বস্ত্তর গায়ে শহর আর নদী এঁকে তিনি প্রাণিকুলের অসহায় অবস্থা বর্ণনা করেছেন। তাঁর এ-বিষয়ের সঙ্গে ক্যানভাসে ত্রিমাত্রিক অনুভব তৈরির প্রচেষ্টা দেখা যায় সুতার বুননের সাহায্যে। ক্যানভাসের দ্বিমাত্রিক তলে একটি নির্দিষ্ট অংশ বেছে নিয়ে তিনি তৈরি করেন ত্রিমাত্রিকতা। এমব্রয়ডারির সাহায্যে নানা রঙের সুতোয় বোনেন জ্যামিতিক আকৃতির কাটাকুটি। ভিনিতার শিল্পকর্মের রঙের উৎসব উদযাপিত হয়। রঙের ওপর চড়ানো আরেকটি রঙে উষ্ণতা দৃশ্যমান

ক্যানভাসের গায়ে ব্যবহৃত রঙে এক বিশেষত্ব দেখা যায়, সেটি হলো সোনালি রঙের চড়া প্রলেপ। স্মৃতির রং সবসময়ই উজ্জ্বল – সোনালি। ভিনিতা করিম আশাব্যঞ্জক আগামী-প্রত্যাশী। তাঁর ক্যানভাস সাজানো হয় উদযাপনের রং দিয়ে। কিন্তু কোথায় খানিকটা বেদনা দৃশ্যমান হয়, সেটি বোঝা যায় ছবিতে। রঙের দ্যুতির পাশাপাশি নদীর রং গাঢ় নীল, আকাশে কালো রঙের উপস্থিতি। একফালি কাটা চাঁদ এসে আনন্দের বার্তা দেয়। কিন্তু কর্তিত চাঁদ শিল্পীমনের অবস্থাকে বর্ণনা করে। ক্যানভাসের উপরিভাগে উজ্জ্বল রঙের উল্লম্ব জ্যামিতিক আকৃতির সঙ্গে শান্ত-স্থির একটি আকৃতির অবস্থানে খানিক দৃষ্টি ব্যাহত হলেও পুরো ক্যানভাস ঘিরে বিষয়-বর্ণনায় এক পরিশীলিত রূপ তৈরি হয়। ভিনিতা করিমের চিত্রভাষা সরল ও সাবলীল। দর্শকের সঙ্গে ক্যানভাসের গল্প তিনি সহজ করে বলেন। দুনিয়ার দেশে দেশে ঘুরে বেড়িয়ে তিনি স্মৃতিতে জমা করেছেন অসংখ্য নদী আর শহরের কথা। মানুষ কখনো তাঁর কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে। প্রথমদিকের প্রদর্শনীর কাজে প্রিমিটিভ আর্ট বা প্রাগৈতিহাসিক রেখাঙ্কনের ধাঁচ লক্ষ করা যায়।

তারপর পল গঁগ্যার অাঁকা আফ্রিকার তাহিতি দ্বীপের মেয়েদের অবয়বের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে নেন। ভিনিতার ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পৃথিবীর নানা দেশের স্মৃতি। মানুষে মানুষে, প্রকৃতিতে কত বিচিত্র রূপই খেলা করে। সেসব রূপমাধুর্য ক্যানভাসে হাজির করেন এক একবার নতুন বিষয়ে। রং বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি এক বিশেষ ভূমিকা নেন, সেটি হলো – সোনালি রং। ছড়িয়ে যাওয়া সূর্যের রঙে তিনি ব্যবহার করেন কমলা, উজ্জ্বল হলুদ, বাদামি আর চড়া সোনালি রং। অস্তমিত সূর্যের অবস্থানকে কেন্দ্র করে ছবির আকাশ আলোয় ভরে ওঠে। তারপর ক্যানভাসের উপরিভাগ মিলিয়ে যায়। অ্যাক্রিলিক, তেলরং,  মসলিন, সাধারণ কাপড়, চটের টুকরা, গোল্ডলিফ, কপার লিফ, সংবাদপত্রের কাটাকুটিতে তিনি ক্যানভাস সাজান। অবশ্য এতসব উজ্জ্বল রঙের সমাবেশ দর্শকদৃষ্টিতে আঘাত হানে কি-না সে-প্রশ্ন থেকেই যায়। একটি বড় পরিসরের ক্যানভাসে উজ্জ্বল রঙের আকৃতির দ্যুতি সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে সহনীয় মাত্রার উজ্জ্বলতা নিয়ে হয়তো শিল্পী ভাববেন।

কোলাজ কর্মের সাহায্যে ভিনিতার ক্যানভাস ভিন্নরূপ পরিগ্রহ করে। বাস্তবধর্মী বিষয় বর্ণনের বিপরীতে বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদী আচরণের পক্ষে কাজ করেন ভিনিতা করিম। ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন, সাধারণ কাপড়ের টুকরা, পাট-সুতো, গোল্ডলিফ কাজের মধ্যে যুক্ত করে ভিন্ন রকমের বুনট তৈরি তাঁর অভ্যাসগত। নিরীক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে ছবির ফ্রেমে পরিবর্তন আনেন তিনি। ছবির কাঠে সরল একরঙা ভাব বজায় রাখেন। মিশর ভ্রমণের সময়ে তাঁকে সে-দেশের ঐতিহ্যবাহী ফ্রেমিং পদ্ধতিকে অনুসরণ করতে দেখা যায়। বিশ্বপরিভ্রমণে বিভিন্ন দেশ যেমন – জার্মানি, মিশর, সুইডেন, ফিলিপাইন, লিবিয়া, ভারত ও বাংলাদেশ তাঁর কাছে চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য। ভারতীয় পাঞ্জাব বংশোদ্ভূত হলেও এই উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে তিনি প্রকৃতি ও মানুষকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এটি তাঁর ২৩তম একক প্রদর্শনী। ঢাকায় ইতিপূর্বে ১৯৯৮-এ দৃক গ্যালারি ও ২০১২ সালে বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে দুটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ভিনিতা করিমের এ-প্রদর্শনীর কাজে আমরা নতুন করে দেখি নীল ও সোনালি রঙের আধিক্য। ‘ইনসাইড দ্য সান্স শ্যাডো’ ছবিতে আড়াআড়ি ক্যানভাসের অর্ধেকজুড়ে লালরঙা আকাশ। হলুদ রঙের সূর্য ভেসে উঠছে লাল আকাশ থেকে। নীল জলের বুকে ভেসে আসছে সারি সারি নৌকা আর সারবাঁধা বিল্ডিং। অনেক দূরে শহরের অবয়ব আচ্ছন্ন করেছে লালরঙা আকাশ। ‘মিডনাইট ব্লুজ’ ছবিতে মাঝরাতের নীলে জ্বলতে থাকা শহরের প্রতিবিম্ব দেখা যায় রাতের নীলে। অনেক দূরে ছোট স্থাপনা, ক্যানভাসের কাছে নদীতে ভাসমান জাহাজ, নৌকা অথবা শহরের বিল্ডিংয়ের ছায়া। ক্যানভাসের বড় পরিসরজুড়ে আছে সোনালি রঙের স্পেস। ‘দ্য ব্ল্যাক মুন’ ছবিটির রঙের মাঝে ম্রিয়মাণ রূপ দেখা যায়। ক্যানভাসের উপরিভাগে মসলিন সুতোয় বোনা ফর্মে গাঢ় নীল ও হালকা নীল ভিন্ন আবহ তৈরি করেছে। প্রকৃতির মায়াবী রং, বাংলার নদীবৈভবে ভিনিতা করিমের মনোযোগ আমাদের নতুন দৃষ্টি দেয়। জানিয়ে দেয়, এই দেশ-নগরের নদী উদ্যাপনের কথা। বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে গত ১৬ মে থেকে শুরু হওয়া এ-প্রদর্শনী শেষ হয় ৬ জুন ২০১৫।